Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪ (২)

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪ (২)
‎আফীফা আফনান

মানুষের ভাবনাচিন্তা আর কল্পনার ক্যানভাস সর্বদা সঠিক সমীকরণে মেলে না। দৃশ্যমান জগতের পেছনেও যে অদৃশ্য কত সত্য লুকিয়ে থাকে, মানুষ তা টের পায় না বললেই চলে। কত অদ্ভুত এই মানবমন! বহু বছরের পুরোনো অতি পরিচিত কাছের মানুষকেও অনেক সময় এক লহমায় চেনা যায় না যেন অপরিচিত ঠেকে; আবার কখনো কখনো একদম হুট করে জীবনে আসা অচেনা কোনো পরিব্রাজককেও যেন ক্ষণিকের দেখায় সহজে পড়ে ফেলা যায়।

​মেহুলের জীবনের সমীকরণটাও যেন ঠিক তেমনই এক রহস্যময় গোলকধাঁধায় এসে ঠেকেছে।
​সালমান শাহ নেওয়াজ—এই নামটা যেন এক ঘোরলাগা ধাঁধার নাম। মানুষটার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে শেষবারের দেখা—দুবারই মেহুল একদম ভিন্ন দুই অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছে।
​প্রথম দেখায় একটি অনাকাঙ্ক্ষিত আর বাজে পরিস্থিতিতে লোকটির নমনীয় আর সৌন্দর্যবর্ধন রূপ দেখেছিল সে। আর দ্বিতীয়বার? সেই দিন মাঠে বড় কৃষ্ণচূড়া গাছটার আলো ছায়ার নিচে অযাচিত কিছু গম্ভীর কথার পিঠে আরেক অচেনা রূপ!

দুবারেই মানুষটাকে তার চরম বৈপরীত্যে ঘেরা, ঠিক দুটি আলাদা সত্তার মানুষ বলে মনে হয়েছিল।মেহুলের কাছে। ​অথচ সেই মানুষটাই নাকি জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে, বিষাক্ত শীতল পানিতে নেমে তাকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরিয়ে এনেছে!
​ভাবতেই মেহুলের মস্তিষ্কের প্রতিটি কোণে একরাশ প্রশ্ন উইপোকার মতো কিলবিল করে উঠল। বুকের ভেতর কৌতূহল আর সংশয়ের তীব্র তোলপাড়! কিন্তু এই পাহাড়প্রমাণ প্রশ্নগুলোর জবাব সে কার কাছে চাইবে?

​হ্যাঁ, একটা বৈধ পথ অবশ্য খোলা আছে—যাকে ঘিরে মনের অন্দরে এত শত প্রশ্নের জন্ম, সশরীরে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ানো। হয়তো সেই মানুষটার মুখোমুখি হলেই সব ধোঁয়াশা কেটে গিয়ে সত্যের আলো ফুটে উঠবে।
​কিন্তু… মেহুল সে কি আদৌ তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে? অতটা সাহস কি সে নিজের ভেতর সঞ্চার করতে পারবে, নাকি সম্মোহনী সেই দৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে সব প্রশ্ন বুদবুদের মতো মিলিয়ে যাবে? হয়তো আগে হলে পারতো কিন্তু এখন….!

“এই মেহু, কী হয়েছে তোর? এভাবে জীম ধরে বসে আছিস কেন?”—হুমা মেহুলের কাঁধে আলতো ধাক্কা দিয়ে শুধাল।

​মেহুল এক দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরস্বরে বলল, “ভাবছি…”

মেহুলের কথা শুনেই ​হুমা সান্ত্বনার হাসি হেসে বলল, “কী এত ভাবছিস তুই? পুঁচকুকে নিয়ে? ওর কিছু হবে না, তুই একদম টেনশন নিস না। দেখবি ও খুব তাড়াতাড়ি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে।”

​মেহুল মাথা তুলে হুমার দিকে তাকাল, “পুঁচকুকে নিয়ে তো ভাবনা আছেই… তবে এখন অন্য একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি।”

​হুমা ভীষণ কৌতুহল নিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল, “অন্য কিছু? কী নিয়ে এতো ভাছিস বল তো?”

​মেহুল অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে গলার আওয়াজ একধাপ নামিয়ে বলল, “হুমা… আমি না একটা কাজ করে ফেলেছিলাম! কিন্তু বিশ্বাস কর, ওটা একদম আনএক্সপেক্টেডলি হয়ে গিয়েছিল…”

​”কী হয়েছে বলবি তো স্পষ্ট করে!”—হুমার অধৈর্য ধমক ভেসে উঠলো।

​”ওই যে… তোদের এমপির ছেলে, মানে সালমান শাহ নেওয়াজ… আমি না ওনাকে একবার ‘আঙ্কেল’ আর আরেকবার ‘পাগল’ বলে ফেলেছিলাম!”

​”কীইইই—?”

​হুমা এত জোরে চিৎকার করে উঠল যে করিডোরে থাকা কয়েকজন ক্লিনার আর রোগীদের অভিভাবকরা চমকে উঠে তাদের দিকে তাকাল!
​পরিস্থিতি বেগতিক দেখে হুমা তৎক্ষণাৎ নিজের মুখ দুই হাতে চেপে ধরল। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে কণ্ঠ একদম ফিসফিসানি লেভেলে নামিয়ে এনে বলল, “কী বললি তুই মেহু? আমার ক্রাশকে তুই কিনা ‘আঙ্কেল’ ডেকেছিস? লাইক সিরিয়াসলি মেহু! কোন আক্কেলে তুই এমন একটা কাজ করলি!”

হমা থামলো, “তুই সালমানকে ভালো করে দেখেছিস? কী ড্যাশিং, কী হ্যান্ডসাম চেহারা! গলার গাম্ভীর্য দেখলে যেকোনো মেয়ের হার্টবিট মিস হয়ে যায়! আর তুই কিনা তাকে সরাসরি আঙ্কেল আর পাগল ডেকে পুরো বারোটা বাজিয়ে দিলি?”
সালমানের কথা ​বলার সময় হুমার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক মুগ্ধতা আর আফসোস ফুটে উঠল, যা মেহুল ভালো করেই লক্ষ করলো। অতঃপর ​মেহুল আর কি করবে ভেবে না পেয়ে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল হুমার দিকে।

এদিকে হুমা দুঃখী দুঃখী ভাব নিয়ে কপালে হাত দিয়ে বলে উঠল, “এই খবর যদি কোনোভাবে ‘রাজশাহী উইমেন ক্লাবে’ জানাজানি হয় না, তোকে নিয়ে তো রাস্তায় মিছিল বের করবে এই আঙ্কেল ডাকার অপরাধে!”

হুমার কথা শুনেই ​মেহুল ভ্রু জোড়া ভীষণভাবে কুঁচকে ফেলল, “কিসের ক্লাব?”

মেহুল জিজ্ঞেস করতেই হুমা বলে উঠলো, “রাজশাহী উইমেন ক্লাব! এটা মেয়েদের একটা বিশাল সিক্রেট গ্রুপ বলতে পারিস—একপ্রকার সালমান শাহ নেওয়াজের অফিসিয়াল ফ্যান ক্লাব! আমিও আছি ওই গ্রুপে। প্রতিদিন সেখানে সালমানকে নিয়ে পোস্ট, ছবি আর মেয়েদের যে কী পরিমাণ পাগলামি চলে, তুই চিন্তাও করতে পারবি না! ওকে নিয়ে কেউ একটা উল্টোপাল্টা কথা বললে সাবান ছাড়া ধুয়ে দেয় সবাই! আর তুই কিনা তাকে একেবারে আঙ্কেল… ইশশ! …. আমার তো ভাবতেই কেমন গা গুলিয়ে উঠছে!”

এদিকে ​মেহুল হুমার এই অতিরঞ্জিত নাটকীয়তা দেখে একহাতে কপাল চেপে ধরল। তার রিতিমত এখন বিরক্ত লাগছে এই কথাগুলোতে। একে তো সে অনুশোচনাতে ভুগছে তজর ওপর এখন হুমার এই ধরনের কথা —

“তুই চুপ করবি হুমা! আমি তোকে কথাগুলো বলেছি মনটাকে শান্ত করতে আর তুই কিনা এমন ভাব করছিস যেন আমি লোকটার মুখে থুথু মেরে এসেছি!”

“চুপ কর! “হুমা রিতিমত মেহুলের মুখ চেপে ধরলো। সঙ্গে সঙ্গে মেহুল হুমার দিকে ভ্রু কুচকে তাকালো ঠিক তখনি একজন ওয়ার্ডবয় তড়িঘড়ি করে মেহুলের সামনে এসে দাঁড়াল। বিনীত ভঙ্গিতে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে বলল, “ডক্টর হাসপাতালে যে শিশুটি মারা গিয়েছিল… পানিতে ডুবে যাওয়া সেই বাচ্চাটির দাফনের সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিকটতম এক কবরস্থানেই ওর দাফন সম্পন্ন হবে।”

​মেহুল মুহূর্তে চুপ হয়ে গেল। বুক চিরে নিঃশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার। যে নিষ্পাপ শিশুটিকে সে নিজের হৃদয়ে ‘স্মৃতি’ নামে ধারণ করে নিয়েছে, তাকে শেষ বিদায় জানানোর সময় চলে এসেছে।
​ওয়ার্ডবয়টি আবার বলে উঠল, “ম্যাম, দাফনের আগে কিছু জরুরি পেপারওয়ার্ক সম্পন্ন করতে হবে। আর হাসপাতালের সিনিয়র স্যার আপনাকে উনার কার্যালয়ে ডেকেছেন। জয়েনিং সম্পর্কিত কিছু বিষয় চূড়ান্ত করার জন্য উনি আপনার অপেক্ষা করছেন।”

​মেহুল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে হুমার দিকে একনজর তাকিয়ে বলল, “হুমা, তুই রুমের সামনে একটু থাক। ওকে দেকে রাখিস আমি পেপারওয়ার্ক আর স্যারের সাথে দেখা করা শেষ করে আসছি।”

​”তুই যা মেহু, আমি পুঁচকুকে দেখে রাখছি,” হুমা আশ্বস্ত করে বলল।

অতঃপর ​মেহুল প্রথমে হাসপাতালের সিনিয়র স্যারের রুমে গেল। নিজের শারীরিক অবস্থা খারাপ থাকা সত্ত্বেও এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে যেভাবে সে মানসিক শক্তি বজায় রেখেছে, সিনিয়র স্যার তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। কোনো রকম জটিলতা ছাড়াই জয়েনিংয়ের বাকি সব আনুষ্ঠানিকতা ও দাফনের পেপারওয়ার্ক শেষ হলো। ​সব কাজ শেষ করে মেহুল কেবিনের সামনে এসে দেখল হুমা দাঁড়িয়ে । অতঃপর মেহুল হুমাকে সাথে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হলো। একজন নার্স এবং সরকারি কিছু প্রতিনিধি নিয়ে মেহুল আর হুমা ধীরপায়ে গন্তব্যের দিকে রওনা দিল—যেখানে একটু পরই চিরদিনের জন্য শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়বে মেহুলের পরম যত্নে নাম রাখা শিশু ‘স্মৃতি’।

​কবরস্থানের সীমানায় পা রাখতেই চারপাশের শান্ত আর থমথমে বাতাস মেহুলের মনকে যেন ব্যাকুল হাহাকারে ভরিয়ে দিল। সাদা কাপড়ে মোড়ানো সেই ছোট্ট দেহটিকে যখন শেষবারের মতো বিদায় জানানোর প্রক্রিয়া শুরু হলো, মেহুলের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা নীরব অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই ​সে মনে মনে অস্ফুটে বলে উঠল, “শান্তিতে থেকো আমার স্মৃতি… এই মা তোমাকে আজীবন নিজের হৃদয়ের খুব গহীনে আগলে রাখবে।”

স্মৃতিকে শেষ বিদায় জানিয়ে মেহুল যখন ভারাক্রান্ত ও ব্যাকুল হৃদয় নিয়ে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ফিরে আসছে, ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল ২০৫ নম্বর কেবিনের দরজার দিকে। ডক্টর জান্নাতুল ফেরদৌস মাত্রই রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসছেন।
​মেহুলকে দেখে ডক্টর ফেরদৌস দরজার বাইরেই থমকে দাঁড়ালেন। ডক্টরকে ওভাবে বেরিয়ে আসতে দেখে মেহুলের বুকের ভিতরটা এক মুহূর্তের জন্য শাঁ করে উঠল! পুঁচকুর খারাপ কিছু হয়ে গেল না তো?—এই ভয়ার্ত ভাবনা মাথায় আসতেই মেহুল দৌড়ে ডক্টর ফেরদৌসের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

​”ডক্টর… পুঁচকু…?”—মেহুলের গলায় চরম আকুলতা আর ভীতি।

​মেহুলের ভয়ার্ত চেহারা দেখে ডক্টর জান্নাতুল ফেরদৌস ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফোটালেন। অত্যন্ত নরম ও আশ্বস্তকারী গলায় বললেন, “শান্ত হও মেহুল, তোমার পুঁচকু এখন একদম ঠিক আছে! ও চোখ মেলেছে, আর খুব ধীরগতিতে নিজের আঙুলগুলো নাড়াতে শুরু করেছে।”

​এই একটিমাত্র সংবাদ শুনতেই মেহুলের কান দুটি যেন জুড়িয়ে গেল! সব ভয়, সব শোক আর দীর্ঘ রাতের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষে উবে গেল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে মেহুল আবেগ ধরে রাখতে পারল না, ডক্টর ফেরদৌসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
​ডক্টর ফেরদৌসও মেহুলের পিঠে হাত রেখে একজন মমতাময়ী মায়ের মতোই তাকে পরম স্নেহে আগলে নিলেন। একজন মায়ের হৃদয়ের আকুলতা তিনি একজন নারী ও চিকিৎসক হিসেবে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছিলেন।

​মেহুল ডক্টরের থেকে নিজেকে সামান্য সরিয়ে ব্যাকুল চোখে শুধাল, “আমি কি আমার বাচ্চার সাথে একটু দেখা করতে পারি, ডক্টর?”

​ডক্টর ফেরদৌস পরম মমতায় উত্তর দিলেন, “অবশ্যই, ডক্টর মেহুল। আপনি ভেতরে যেতে পারেন।”

​মেহুল একটু ধীর গলায় অনুরোধ করল, “ম্যাম… আপনি আমাকে ‘ডক্টর’ না বলে শুধুই ‘মেহুল’ বলে ডাকবেন, প্লিজ? আই রিকোয়েস্ট…”

​ডক্টর ফেরদৌসের ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তিনি পরম আদরে মেহুলের গালে হাত ছুঁইয়ে বললেন, “ঠিক আছে মেহুল, তুমি এখন ভেতরে যাও। তোমার বাচ্চা তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে।”

​কথাটা শোনামাত্রই মেহুল আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সমস্ত ব্যাকুলতা বুক নিয়ে সে তড়িঘড়ি করে কেবিনের দরজার সিটকিনিটা ঠেলে সোজা ভেতরে প্রবেশ করল!

কেবিনের ভেতর পা রাখতেই মেহুলের চোখ দুটো এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে গেল। যান্ত্রিক আর একঘেয়ে নিঃশ্বাসের যে কঠিন নীরবতা পুরো ঘরটাকে আঁকড়ে ধরেছিল, তা যেন ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই মিটে গেছে।
​বিছানার ওপর ছোট্ট পুঁচকুটা নিজের ডাগর ডাগর নিষ্পাপ চোখ দুটি মেলে ইতিউতি তাকাচ্ছে। কৃত্রিম অক্সিজেনের মাস্কটা খুলে নেওয়ার পর ওর সেই ফর্সা কোমল গাল দুটোতে আবার গোলাপী আভা ফিরে এসেছে। যদিও শরীরটা এখনো ভীষণ দুর্বল, ক্যানুলা বাঁধা ছোট হাতটা নড়াতে ওর কষ্ট হচ্ছে, তাও মেহুলকে দরজার সামনে দেখে পুঁচকুটা কেমন যেন আধো-আধো চোখে মেহুলের দিকে চেয়ে আছে।

​মেহুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে সশব্দে হাঁটু গেড়ে বসল। পরম মমতায় পুঁচকুর ছোট ছোট আঙুলগুলো নিজের ঠোঁটের কাছে এনে বারবার চুমু খেতে লাগল।

​”আমার সোনা… আমার পুঁচকু!”—মেহুলের কণ্ঠ ভেজা, কিন্তু চোখে আজ পরম আনন্দের অশ্রু। এদিকে ততক্ষণে ​পাশে এসে দাঁড়িয়েছে হুমা তার চোখেও আনন্দের অশ্রু টলমল করে উঠল। ও মেহুলের পিঠে হাত রেখে খুশিতে আত্মহারা গলায় বলে উঠল, “দেখলি মেহু? আমি বলিনি ও ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবে! আমাদের পুঁচকু কত সাহসী দেখ!”

​পুঁচকুটা যেন হুমার কথা বুঝতে পারলো, তাই নিজের ছোট ঠোঁট দুটো সামান্য প্রসারিত করে মেহুলের আঙুলটা নরম তুলতুলে হাতে খামচে ধরল। যে শিশুটিকে কিছুক্ষণ আগেও নিথর আর বরফশীতল ভাবা হচ্ছিল, তার এই বেঁচে ওঠার আনন্দ যেন কেবিনের প্রতিটি কোণকে এক নতুন জীবনের স্পন্দনে ভরিয়ে তুলল। অপরদিকে মেহুল ও হুমা দুজনেই নিজেদের সব কষ্ট আর ক্লান্তি ভুলে গিয়ে পরম তৃপ্তিতে পুঁচকুকে ঘিরে হাসিতে মেতে উঠল।

দেখতে দেখতে কেটে গেল পুরো দুটো দিন। পুঁচকু এখন আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ, তবে সাবধানতার জন্য তাকে এখনো ডাক্তারের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
​এদিকে মেহুলও নিজের পেশাগত দায়িত্ব পালনে পুরোদমে যুক্ত হয়ে পড়েছে। তবে কাজের ব্যস্ততা বাড়লেও পুঁচকুর প্রতি তার টান একটুও কমেনি বরং যত্ন আরো বেড়েছে। যখনই একমুহূর্ত সুযোগ পাচ্ছে, তখনই ছুটে গিয়ে কেবিনে ঢুকছে সে। আর হুমা? সে তো নিজের কাজকর্মের কথা ভুলেই যেন একপ্রকার পুঁচকুর কেবিনে ডেরা বেঁধেছে!

​বর্তমানে গাইনি ওয়ার্ডে সকালের রুটিন রাউন্ড শেষ করে করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছে মেহুল। ডক্টর জান্নাতুল ফেরদৌসের সুবাদে হাসপাতালের জরুরি সব কাজকর্ম ইতিমধ্যেই তার নখদর্পণে চলে এসেছে। যখনই কোনো জটিলতায় পড়ছে, প্রবীণ এই ডাক্তার তাকে মাতৃস্নেহে সাহায্য করছেন। মাত্র দু দিনে মানুষটার সাথে মেহুলের যেন এক গভীর, আত্মিক সম্পর্কের টান তৈরি হয়ে গেছে।

নিজের কাজ শেষ করে ​হাঁটতে হাঁটতে মেহুল যখন পুঁচকুর কেবিনের দিকে পা বাড়াল, ঠিক তখনই সামনের করিডোরে একজনকে দেখে তার পা দুটো যেন সশব্দে থমকে গেল! কারণ তার সামনে ​অভিজাত সুতির সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা, চোখে সানগ্লাস আঁটা একজন নিখুঁত তরুণ রাজনীতিকের মতো ব্যক্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সালমান শাহ নেওয়াজ!

​সানগ্লাসের কালো কাঁচের আড়ালে লোকটার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন সোজা মেহুলের দিকেই নিবদ্ধ। মেহুল যেন তা অনায়াসে বুঝতে পারলো, অতঃপর সে প্রথমে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে উল্টো ঘুরে অন্যদিকে সরে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু পরক্ষণেই ওইদিন রাতের কথাগুলো মনে পড়ল তার—এই মানুষটাই তো নিজের জীবন বাজি রেখে তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে! আর তা মনে পড়তেই সালমানের প্রতি প্রতি ​এক বুক অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতায় মেহুলের মন আবেশিত হয়ে উঠল। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে একদম সালমানের কয়েক হাত সামনে এসে দাঁড়াল।

অপরদিকে ​বিগত দুই দিনেও কিন্তু সালমান বেশ কয়েকবার হাসপাতালে এসেছিলেন, মেহুল আর পুঁচকুকে দেখতে। তবে প্রতিবারই আড়াল থেকে দেখে চলে গিয়েছে, যা মেহুল বা অন্য কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।

এদিকে​ সালমানের ঠিক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ধ্রুব। সে মেহুলকে সামনে থেকে আসতে দেখে চট করে সোজা হয়ে দাঁড়াল এবং বেশ উৎসাহ নিয়ে বলে উঠল, “আসসালামু আলাইকুম ভা… আই মিন, ডাক্তার ম্যাম! এখন কেমন আছেন আপনি?”

​মেহুল মৃদু হেসে উত্তর দিল, “ওয়ালাইকুমআসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন ভালো আছি।”

​অতঃপর সে সালমানের দিকে তাকাল। কিছুটা অপরাধবোধ নিয়ে মেহুল বলল, “আই অ্যাম সো সরি স্যার! আসলে ওই দিন আপনার আসল পরিচয় আমার জানা ছিল না, আর তার ওপর ভুলবশত ‘আঙ্কেল’…”

​কথা শেষ হওয়ার আগেই সালমান চট করে গম্ভীর ভাবে গলা খাঁকারি দিয়ে উঠল! যেন ‘আঙ্কেল’ শব্দটা তার চরম অপছন্দের আর বিরক্তির এক নাম।

​মেহুল সালমানের মুখের অস্বস্তিটা বুঝতে পেরে আর কথা বাড়াল না। কিন্তু নিজের মনের ভেতরের মূল কথাটা প্রকাশের জন্য পরক্ষণেই বলে উঠল, “ধন্যবাদ স্যার!”

​সালমান আলতো হাতে চোখের সানগ্লাসটা খুলে পকেটে রাখল। ফলে তার গভীর, রহস্যময় চোখ জোড়া সোজা মেহুলের মুখপানে নিবদ্ধ হলো। অতঃপর ধীর গলায় শুধাল, “ধন্যবাদ? কিন্তু কেন?”

​মেহুল হালকা হেসে বলল, “আসলে আপনাকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাইছি না। তবুও… আপনি আমার জন্য যা করেছেন, তার জন্য আমি চিরকাল আপনার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ থাকব। আমার বান্ধবী হুমার কাছে শুনলাম, আপনিই নাকি আমাকে ওই রাতে পানির তল থেকে বাঁচিয়েছেন? সেদিন আপনি না থাকলে হয়তো আজ আমি এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলতেই পারতাম না। তাই প্লিজ… আমার এই সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকু গ্রহণ করুন।”

​সালমান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “কৃতজ্ঞতা জানাতে চান, কিন্তু শুধু এই শুকনা ধন্যবাদ দিয়ে কি আর মন ভরে?”

​মেহুল খানিকটা অবাক হয়ে শুধাল, “তাহলে আপনাকে কীভাবে কৃতজ্ঞতা জানাব বলুন, স্যার?”

​সালমান মেহুলের চোখের সোজাসোজি নিজের চোখ রেখে, একদম ধীমান ও গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল, “চলুন, প্রেম করি! তারপর বিয়ে, এরপরে সংসার… যেখানে চার-পাঁচটা ছোট ছোট বাচ্চা আপনাকে ‘মা’ আর আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকবে! কেমন হবে বলুন তো? আমার মতে, এটাই হতে পারে আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম!”

​মেহুল স্তব্ধ হয়ে গেলো, সে পুরো হতবাক! নিজের কানে যেন বিশ্বাস হচ্ছিলো না সে কি শুনলো অতঃপর চোখ দুটো প্রকাণ্ড করে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল, “আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন?! কী বলছেন এসব, সেন্স আছে আপনার?”

​সালমান একটু থামল। তার চোখের দৃষ্টি পরক্ষণেই গভীর ও ঘোরলাগা নেশালো হয়ে উঠল, “সেন্স? সেটা তো পাঁচ বছর আগেই হারিয়ে গিয়েছিল… এখন আপনাকে দেখার পর মনে হচ্ছে, ওটা আস্তে আস্তে আবার ফিরে আসছে।”

​মেহুল যেন একলহমায় পুরো তাজ্জব বনে গেল! বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে! সে কী ভেবে ধন্যবাদ জানাতে এসেছিল, আর এই রাশভারী লোকটা তাকে কীসব বলছে! প্রেম, বিয়ে, তারপর আবার চার-পাঁচটা বাচ্চা! পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে মেহুল সম্পূর্ণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইল।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৪

অন্যদিকে ​মেহুলকে এভাবে হতভম্ব আর বোকার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে সালমানের মুখে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ হাসি খেলে গেল। সে ধীরপায়ে মেহুলের দিকে দু-কদম এগিয়ে এলো। খুব কাছে এসে মেহুলের স্থবির মুখের ওপর আলতো করে এক ফুঁ দিয়ে মুচকি হাসল।
​অতঃপর মেহুলকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত আর বাকরুদ্ধ অবস্থায় ফেলে রেখে, নিজের স্বাভাবিক রাশভারী ভঙ্গিতে তাকে পাশ কাটিয়ে করিডোর ধরে সোজা হেঁটে চলে গেল!

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৫

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here