শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৮ (২)
আফীফা আফনান
আশপাশের নরম বাতাস যেন মুহূর্তে থমকে এক বীভৎস শ্মশানের নীরবতায় পরিণত হলো! স্যান্ডেল পেটার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ধাতব আওয়াজটি বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চারপাশের দৃশ্যপট ভয়ংকর এক রূপ নিল। ধ্রুব আর কবির হা করে তাকিয়ে থেকে কী করবে ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিল না। অন্যদিকে রবির হাত পিস্তল উঁচিয়ে শক্ত হয়ে ধরা, তবে একটু আগে তা থমকে গেলেও—এখন তার চোখের তারায় হিংস্র তেজ।
অপরদিকে সালমানের চোখ দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করেছে, আর মেহুলের চোখেও ছিল প্রলয়ংকরী আগুন। কিন্তু সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়ে সালমানের দীর্ঘ, বলশালী হাতটি তড়িৎ গতিতে গিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল মেহুলের শুভ্র গলা!
মেহুল মুহূর্তের মধ্যে হাঁসফাঁস করে উঠল। তার ফুসফুসের সমস্ত বাতাস যেন আটকে গেল। শ্বাস নেওয়ার কোনো উপায় না পেয়ে সে প্রাণপণ চেষ্টা করল সালমানের হাত সরাতে।
কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে গেল আসল বিপত্তি!
এতক্ষণ যে সাধারণ মানুষ, অটোচালক, রোগীর স্বজন আর স্থানীয় দোকানদারেরা অলস ভঙ্গিতে আশেপাশে ঘোরাঘুরি করছিল—তাদের রূপ যেন মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল! এমপির ছেলে, রাজশাহীর নয়নের মনি সালমান শাহ নেওয়াজের গায়ে এক অচেনা যুবতী জুতো ছুঁড়ে মেরেছে—এই দৃশ্য দেখার সাথে সাথে সেই শান্ত চত্বর যেন এক হিংস্র পশুর পাল দিয়ে ঘিরে ফেলা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো!
শাহ নেওয়াজ পরিবারের প্রতি এই অঞ্চলের মানুষের অন্ধ আনুগত্য আর উন্মাদ ভালোবাসার নমুনা মেহুলের চোখে একমুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে উঠল।
এদিকে কাছেই থাকা এক মাঝবয়সী লোক রাগ দেখিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে তেড়ে এলো, “অ্যাই! কার এত বড় সায়াস হেই? আমাগোরে ছাওয়ালের গায়ে হাত তোলে? হাত একদম ধইরে টাইনে ছিঁড়ে ফেলমু না!”
কথাটা শেষ হতে না হতেই আশপাশের আরও জনাদশেক লোক চারপাশ থেকে হোই হোই করে তেড়ে এলো। কেউ হাতের কাছে থাকা বাঁশ উঁচিয়ে ধরল, কেউ চায়ের দোকানের কাঠ কিংবা ভাঙা ইটের টুকরো তুলে নিয়ে মেহুলের দিকে হিংস্র ভঙ্গিতে এগোতে লাগল! তাদের চোখে-মুখে তখন এক উগ্র, রক্ত তৃষ্ণার্ত আক্রোশ। মেহুল যে একজন নারী কিংবা হাসপাতালের ডাক্তার—সেকথা ভাবার মতো অবস্থায় তাদের অন্ধ ভক্তি তখন বাকি রাখেনি।
ভিড়টা যখন প্রায় মেহুলের ওপর চড়াও হতে যাবে, ঠিক তখনই নিজের প্রখর হাতটি শূন্যে তুলে এক ইশারায় সবাইকে স্তব্ধ করে দিল সালমান!
একমাত্র সালমানের ওই একটা হাতের ইশারাতেই হিংস্র হয়ে ওঠা পুরো উন্মত্ত জনতা যেন একলহমায় জাদুমন্ত্রের মতো যে যেখানে ছিল, ঠিক সেভাবেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল! কারো মুখে আর একটা শব্দও রইল না।
একই সাথে, মেহুলের গলার ওপর রাখা নিজের হিমশীতল হাতের চাপটা একলহমায় হালকা করে দিল সালমান। ছাড়া পেতেই মেহুল হাঁটু গেড়ে ধসে পড়ার উপক্রম হলো অতঃপর একহাতে গলা চেপে ধরে বিকট শব্দে কাশতে লাগল সে। কাশির দমকে তার চোখ দুটো দিয়ে গলগল করে পানি বেরিয়ে এলো। কিন্তু সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই কারন বর্তমানে তার নজর সামনে, যেখানে সে যেন এক গিরগিটি দেখছে। কেননা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সালমানের মুখে এতোক্ষণ যে হিংস্র ভাবটা ছিলো তা নিমেষেই উবে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল এক চরম কুটিল আর মিষ্টি অভিনয়ের হাসি!
পরক্ষণেই মেহুলকে সামলানোর সুযোগ না দিয়ে সালমান আকস্মিক সবাইকে তাজ্জব বানিয়ে তাকে হাত বাড়িয়ে টেনে নিজের শক্ত বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল!
আকস্মিক সালমানের এহেন কান্ডে মেহুল যেন বরফের মতো জমে নিথর হয়ে গেল। তার গলার পেশি ব্যথায় কুঁকড়ে থাকায় সে চাইলেও চিৎকার করতে পারছে না।
আর ঠিক এই সুযোগেই সালমান মেহুলকে নিজের একহাতে আঁকড়ে ধরে তেড়ে আসা জনতা আর দূর থেকে উঁকি মারা কৌতূহলী সবার উদ্দেশ্যে একটু উঁচু গলায়, পরম আদুরে ভঙ্গিতে বলে উঠল—
”তোমরা সবাই শান্ত হও! ওকে কেউ কিছু বলবে না। তোমরা তো জানোই না ও কে! পরিচয় করিয়ে দেই ও তোমাদের হবু ভাবি, ডক্টর মেহুল!”
আর মেহুলের দিকে তাকিয়ে, “আমি তো মাত্র একটা দিন ব্যস্ততার কারণে তোমার ফোন রিসিভ করতে পারিনি, তাই এমন অভিমান করতে হবে জান! একটু রাগ করাও, তোমার এই রাগ সামলাতে সামলাতেই আমি ক্লান্ত।”
কথাটা বলেই সালমান আলতো করে মেহুলের পায়ের কাছে পড়ে থাকা স্যান্ডেলটি কুড়িয়ে নিজের হাতে তুলে নিল। সেটা মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মায়াবী কণ্ঠে বলল, ” এখনো রাগ কমেনি জান, তাহলে নাও , তোমাকে এত কষ্ট দেওয়ার শান্তিস্বরূপ আরও দুটো মারো তো আমাকে! তাও নিজের মনকে শান্ত করো।”
সালমানের এই অবিশ্বাস্য চাল আর কথা শুনে তেড়ে আসা জনতা মুহূর্তে পুরোপুরি গলে পানি হয়ে গেল! তাদের হাতের লাঠি-ইট নিমেষে নিচে নেমে এলো নিচে। সেই সাথে লোকগুলোর হিংস্র মুখগুলোতে ফুটে উঠল এক গাল চওড়া হাসি আর আনন্দ।
”ওহ! এমপির ছাওয়ালের বউ! আমাগোর নতুন নেওয়াজ পরিবারের নতুন সদস্য!”—একজন আরেকজনের গায়ে কনুই দিয়ে গুঁতো দিয়ে হেসে উঠল।
এদিকে মেহুল যেন মাথার ভেতর তীব্র ঘূর্ণন অনুভব করল। গলার যন্ত্রণার চেয়েও সালমানের এই ভয়ংকর মিষ্টি জাল তাকে বেশি নাস্তানাবুদ করে তুলল! সে বুঝতে পারল, নিজের ওপর হওয়া এই প্রকাশ্যে আক্রমণকেও এই দুর্ধর্ষ লোকটা সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে এনে পুরো রাজশাহীর সামনে এক সেকেন্ডে বাজি পাল্টে তাকেই তার “হবু স্ত্রী” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিল!
মেহুল সম্পূর্ণ হতবাক ও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সালমানের দুর্ধর্ষ বুদ্ধির চাল দেখে! যে বিপদ তাকে শেষ করে দিতে পারত, সেই বিপদকেই এক নিমেষে নিজের রাজকীয় ঢাল বানিয়ে নিল লোকটা। অপরদিকে একটু আগেই যে লোকটা বাঁশ উঁচিয়ে মেহুলের দিকে হিংস্র ভঙ্গিতে ধেয়ে এসেছিল, সে-ই এখন অপরাধীর মতো বিনীত মুখে এগিয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে আন্তরিকতার এক গাল হাসি ফুটিয়ে মেহুলকে উদ্দেশ্যে করে বলল, “আমারে মাফ কইরা দিবা মা, তোমারে তো চিনবার পারি নাই! এমপির ছাওয়ালের বউ… ওই তো আমাগোও পোলা তাই তুমিও আমাগো পোলার বউ! আমরা তো নেওয়াজ ভাইজানেরে পরাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসি, তাই তার ছাওয়ালের গায়ে হাত দিছ দেইখা হুট কইরা মাথা গরম হয়া গেছিল।”
মেহুলের বুকের ভেতরটা তীব্র আক্রোশে ফেটে যেতে চাইল! তার ইচ্ছে করছে সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে পুরো জনতাকে সত্যিটা বলে দিতে—’সব মিথ্যা! এই লোকটা এক নম্বর ধোঁকাবাজ, এক ভয়ংকর প্রতারক!’
কিন্তু গলার অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে চাইলেও কন্ঠনালী দিয়ে একটা স্পষ্ট শব্দ ফুটছে না। সালমানের হাতের সেই নির্মম চাপের ফলে গলার প্রতিটি পেশি তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে, শুধু চোখ দিয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভের অশ্রু।
এদিকে সালমানের ঠোঁটে বিজয়ের ঔদ্ধত্য মাখা হাসি। পুরো গেমের নিয়ন্ত্রণ এখন পুরোপুরি তার মুঠোয়।
সে জনতার দিকে তাকিয়ে একহাতে মেহুলের কাঁধ জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত আন্তরিক গলায় বলল, “আপনারা সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন। খুব শীঘ্রই বিয়ে করছি আমরা। আর হ্যাঁ, আমার অবর্তমানে আমার অপ্সরার সব দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের! আপনারা তো জানেনই আমি আপনাদের কতটা ভালোবাসি… তবে ওকে,” মেহুলকে আলতো করে দেখিয়ে সালমান নিচু গলায় যোগ করল, “ওকে ভালোবাসি তারচেয়েও হাজার গুণ বেশি!”
কথাটা শেষ করেই সালমান কবির আর ধ্রুবকে চোখের ইশারায় কিছু একটা নির্দেশ দিল। ইশারা পাওয়া মাত্রই তারা দুজন অত্যন্ত দক্ষ হাতে উৎসুক ভিড়টাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওখান থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে গেল।
জনতা সরে যেতেই চত্বরটা আবার ফাঁকা হয়ে এলো। মেহুল নিজের শারীরিক ধকল সামলাতে সামলাতে হঠাৎ চোখ তুলে তাকাল পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা রবির দিকে।
মেহুল স্তব্ধ হয়ে গেল! এতদিন রবি যতবার মেহুলের আশেপাশে থেকেছে—কখনো মাথায় ক্যাপ নামিয়ে, কখনো আড়ালে লুকিয়ে থেকেছে। কিন্তু আজ? আজ কোনো লুকোচুরি নেই! রবি একদম সামনাসামনি দাঁড়িয়ে আছে, তবে তার মুখে তখন একদম থমথমে।
এদিকে মেহুলের যখন রবির দিকে তাকিয়ে তখন তার এই উৎসুক নজর খেয়াল করে সালমান হালকা হেসে রবির দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “কী দেখছেন অপ্সরা? ওকে তো চিনই, ও রবি… অবাক হওয়ার কিছু নেই। ও আমার ভাই, বন্ধু, অনুচর, শুভাকাঙ্ক্ষী—সব!”
মেহুলের চোখের সামনে এখন পুরো ছকটা আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। সব কটা সুতো এই একটা মানুষের হাতেই বাঁধা! সে কোনোমতে গলার তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে অস্ফুটে বলল, “কী… কী গেম খেলছেন আপনি?”
সালমান ধীরপায়ে এক পা এগিয়ে এলো। তার চোখের প্রখর চাহনিতে কোনো খেলা নয়, ছিল এক নির্মম স্থিরতা।
”এটা কোনো খেলার মাঠ নয় অপ্সরা যে আমি আপনার সাথে গেম খেলব,” সালমানের গলায় গা ছমছমে গাম্ভীর্য, “তবে হ্যাঁ… খেলা যদি বলতেই হয়, তবে আসল খেলা তো এবার শুরু হবে! প্রথমে টেস্ট, তারপর টি-টোয়েন্টি, আর শেষে ওয়ানডে!”
মেহুল নিজের সমস্ত তেজ এক করে চোখ শক্ত করে বলল, “আমি… আমি আপনাকে ছাড়ব না!”
সালমান একচিলতে বাঁকা হেসে জবাব দিল, “আমিও তো ঠিক সেটাই চাই অপ্সরা—আপনি আমাকে না ছাড়ুন! এমনকি আপনি নিজে ছেড়ে চলে যেতে চাইলেও আমি ছাড়ব না। কারণ সালমান শাহ নেওয়াজ একবার যাকে ধরে, সে সহজে আর মুক্তি পায় না।”
মেহুল ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই সালমান ভয়ংকর এক সম্মোহনী গতিতে তার দিকে এগোতে শুরু করল! সালমানের এই আচমকা আগ্রাসী ভঙ্গিতে মেহুল বাধ্য হয়ে পেছনে হঠতে লাগল। হঠতে হঠতে একপর্যায়ে পেছনে থাকা কালো গাড়িটার বডির সাথে শক্তভাবে লেপ্টে গেল তার পিঠ। পালানোর আর কোনো পথ রইল না!
ফলে সালমান একদম মেহুলের গায়ের সাথে ঘেঁষে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ সুগঠিত অবয়বের ছায়ায় মেহুল পুরোপুরি ঢেকে গেল। সালমান তার ঝুঁকে আসা মুখটা মেহুলের একদম কানের কাছে নিয়ে এসে থমথমে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল—
”আই অ্যাম ইমপ্রেসড, বেবি! কাল রাতে বললেন জুতোপেটা করবেন, আর আজ সকালেই তা দিয়ে দিলেন তাও জনসম্মুখে? নট ব্যাড! আপনার প্রচুর সাহস আর আমি ঠিক এমনটাই চেয়েছিলাম। একদম আমার মতো… বিশ্বাস করুন, আমাদের জুটিটা কিন্তু ভীষণ জমবে!”
সালমানের গরম নিশ্বাস মেহুলের কানে এসে বিঁধছিল।
সালমান অত্যন্ত গম্ভীর ও বিষাক্ত কণ্ঠে যোগ করল, “সত্যি বলতে কী, আপনি এখন আমার চরম এক নেশায় পরিণত হয়েছেন অপ্সরা! তাই আপনাকে পাওয়ার তৃষ্ণা আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এতদিন আপনাকে আপন করে পেতে আমার ব্যবহার ছিল খুব নমনীয়… নিজের আসল খোস ছাড়িয়ে চেয়েছিলাম ভালোবাসার অনুভূতি দিয়ে আপনাকে জয় করতে।”
কথাটা বলে সালমান ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে এক অদ্ভুত নিঃশব্দ হাসি হাসল।
অতঃপর তার কণ্ঠস্বর মুহূর্তের মধ্যে বরফের মতো হাড়হিম হয়ে এলো— “কিন্তু আপনি ভালোবাসার সেই সবকটা রাস্তা নিজের হাতে বন্ধ করে দিলেন! আর এখন থেকে… আপনাকে নিজের করে পাওয়াটা আমার জেদে পরিণত হয়েছে! তাই আপনাকে পেতে ঠিক যা যা করতে হয়, আমি তার সবটুকু করব—ঠিক নিজের স্টাইলে! আপনি তো জানেনই … অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার! কাল রাতে বলেছিলাম না, আপনি আমাকে এখনো চেনেননি? এবার চিনবেন… খুব ভালোভাবে চিনবেন সালমান শাহ নেওয়াজকে!”
সালমানের ওই বরফশীতল হুমকির পর মেহুলের শিরদাঁড়া দিয়ে যেন এক হিমশীতল বাতাস বয়ে গেল! তার ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। কিন্তু সে আর কিছু বলে ওঠার সুযোগ পেল না, কারণ তার আগেই সালমান ধীরপায়ে সেখান থেকে সরে গিয়ে গাড়িতে উঠে পড়েছিল।
ঘটনার আকস্মিকতায় আর মানসিক যন্ত্রণায় মেহুলের পক্ষে সেদিন হাসপাতালে আর কাজ করা সম্ভব হলো না। ফলে শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে সে তৎক্ষণাৎ ডিউটি ছেড়ে বাড়িতে ফিরে এলো।
ক্লান্ত আর বিদ্ধস্ত শরিরটা টেনে কোনমতে ফ্ল্যাটে এসেই সোজা বাথরুমে গিয়ে ঢুকল মেহুল। ভেতর থেকে শক্ত করে ছিটকিনি আটকে দিল। তার সমস্ত শরীর যেন ঘৃণায় আর অপমানে রি রি করছে! সালমানের বলা প্রতিটি বিষাক্ত শব্দ—‘অল ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার’—মেহুলের মস্তিষ্কে যেন একটানা হাতুড়ির মতো পেটাচ্ছিল। বারবার তার মনে পড়ছিল সবার সম্মুখে জনসম্মুখে সালমানের তাকে ওই বেপরোয়াভাবে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটা!
প্রচণ্ড রাগ, ক্ষোভ আর আত্মগ্লানিতে মেহুলের পুরো শরীর থরথর করে কাঁপছিল। অতঃপর সে শাওয়ারের নিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। বরফশীতল পানি তার ওপর অনবরত ঝরতে লাগল, কিন্তু মেহুলের গায়ের মেজাজ কমল না। ঠিক কতটা সময় সে ওভাবে জমাট বরফের মতো পানির নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, তা তার জানা নেই। অনবরত ভিজতে ভিজতে তার ঠোঁট দুটো নীলচে হয়ে আসছিল, ফর্সা চামড়া ফ্যাকাশে আর চোখের কোণ রক্তবর্ণ ধারণ করেছিল।
অবশেষে তার ধ্যান ভাঙল যখন বাথরুমের দরজায় হুমা অনবরত করাঘাত করতে লাগল। একসময় মেহুল ভেজা কাপড়ে ধীরপায়ে বাথরুম থেকে বের হলো। মাথার দীর্ঘ চুল থেকে গড়িয়ে পড়ছে পানি, গায়ের চামড়া থরথর করে কাঁপছে, আর চোখ দুটো রক্তজবার মতো লাল। মেহুলকে এমন আপাদমস্তক ভেজা আর নিষ্প্রাণ অবস্থায় বের হতে দেখে হুমায়রা চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে ছুটে এলো।
”কী হয়েছে তোর মেহু?! আল্লাহ! তুই এভাবে, কতক্ষণ বাথরুমে ছিলি! কী করছিলিস? শরীরটা তো নীল হয়ে গেছে! কী হয়েছে এমন করছিস কেন বলবি তো?”—হুমায়রার গলায় স্পষ্ট আতঙ্ক।
মেহুল কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট জোড়া কাঁপছিল ঠিকই, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
হুমা অবস্থা বেগতিক দেখে মেহুলকে আলতো করে ধরে রুমে নিয়ে গেল। মেহুলকে কোনোরকমে বিছানায় বসিয়ে ড্রাই টাওয়াল দিয়ে চুল গাল মুছে দিল, তারপর দ্রুত মেহুলের ভেজা জামা বদলে অন্য একটা শুকানো ড্রেস পরতে সাহায্য করল। এরপর হুমা তড়িঘড়ি রান্নাঘরে গিয়ে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম কফি বানিয়ে নিয়ে মেহুলের হাতে ধরিয়ে দিল।
কফির কাপটি মেহুলের হাতে দিয়ে হুমা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় বলল, “কী হয়েছে হসপিটালে? কোনো ঝামেলা হয়েছে কি না আমাকে খোলসা করে বলবি মেহু! কেউ তোকে কিছু বলেছে?
আমাকে বল, আমি এখনই ব্যবস্থা করছি! কে কী বলেছে আর কে কী করেছে বলবি তো? দাঁড়া, আমি এখনই পুলিশকে ফোন দিচ্ছি!”
কথাটা শোনামাত্রই মেহুল তড়াক করে হুমার দিকে তাকাল! তার নিভে আসা চোখে হঠাৎ একরাশ শূন্যতা ফুটে উঠল।
মেহুল কাঁপাকাঁপা গলায় নিচুস্বরে বলল, “কিচ্ছু হবে না হুমা… পুলিশ আমাকে কোনো সাহায্য করতে পারবে না।”
”কেন পারবে না? কী হয়েছে অন্তত খোলসা করে বলবি তো! আমার যে ভীষণ ভয় করছে মেহু!”—হুমা মেহুলের পাশে বসে তার হাত দুটো চেপে ধরল।
অতঃপর হুমার অনবরত জোরজুলুমের কাছে নতি স্বীকার করল মেহুল। ভারী এক নিশ্বাস ফেলে সে সকালের ঘটনার জট খুলতে শুরু করল—
তখন কেবল সকালের রাউন্ড শেষ করে একটু ফ্রেশ হওয়ার জন্য স্টাফ রেস্টুরেন্টের দিকে যাচ্ছিল মেহুল। হাফ-ওপেন দরজার ওপাশ থেকে যখন সেই দুজন নার্স আর ওয়ার্ডবয়টি মেহুলকে নিয়ে মুখরোচক আড্ডায় মেতে ছিল, ঠিক তখনই মেহুল আকস্মিক ঝড়ের বেগে সেই ঘরে প্রবেশ করে। মেহুলকে এভাবে হঠাৎ দোরগোড়ায় দেখে তাদের আড্ডা নিমেষে থমকে যায়, হাত থেকে কমবেশি সবার চায়ের কাপ পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়!
মেহুল সরাসরি তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “আমার সম্পর্কে এত সব আজগুবি কথা আপনারা কোথায় শুনেছেন? আপনাদের সাহস কীভাবে হয় আমাকে নিয়ে হসপিটালে এমন নোংরা গসিপ করার?”
এক নার্স থতমত খেয়ে কোনোরকমে মুখ সামলে জবাব দিয়েছিল, “ম্যাডাম… আমরা তো নিজেরা বানাইনি। এসব তো হাসপাতালের আনাচেকানাচে সবাই আড়ালে বলাবলি করছে…”
মেহুল কঠোর স্বরে প্রশ্ন করেছিল, “কী শুনেছেন আপনারা?”
তখন ওয়ার্ডবয়টি মাথা নিচু করে ইতস্তত করে বলে উঠেছিল, “ম্যাম, ওই যে লোকটা… সালমান সাহেব! আপনি যেদিন থেকে এক্সিডেন্ট করে এখানে ভর্তি ছিলেন, সেদিন থেকেই নাকি প্রতিটা রাতে হসপিটালের চত্বরে এসে গাড়ি নিয়ে বসে থাকতেন। এমনকি আপনার স্পেশাল কেয়ার আর সিকিউরিটির ক্ষেত্রেও ওনার লোকজনের খুব কড়াকড়ি নির্দেশ ছিল। ম্যাম… কেউ তো আর খোঁজখবর ছাড়া অহেতুক কারও জন্য এমনটা করে না। তাই সবাই সন্দেহ করছিল ওনার সাথে আপনার কোনো… সম্পর্কের কথা।”
মেহুল দুই হাতের মুষ্টি শক্ত করে বেঁধে নিয়েছিল। তবে সে ভুল বুঝে বসলো। মেহুল মনে মনে ভাবনার বিন্দুমাত্র বাকি রইল না যে লোকটা আড়ালে আড়ালে কী ভয়ংকর জাল বুনেছে! কীভাবে তাকে পুরো হাসপাতালের স্টাফদের সামনে ছোট আর চরিত্রহীন বানানোর ছক কষেছে! মেহুল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি; ডিউটি ফাঁকি দিয়ে এমন বাজে আড্ডা দেওয়ার অপরাধে নার্স আর ওয়ার্ডবয়টিকে প্রচণ্ড বকাঝকা করে ভেতর থেকে বের হয়ে আসে।
তবে মেহুল দরজার বাইরে পা দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ঠিক তখনই পেছনের খোলা জানালা দিয়ে ভেসে এসেছিল এক নার্সের তীব্র অবজ্ঞা মাখা বিষাক্ত মন্তব্য—
”আসছে সতীসাবিত্রী! রূপ আর শরীর দেখাইয়া বড়লোকের পোলা ধরব, ফুর্তি-ফার্তা করব… আর কেউ কিছু কইলেই দোষ! আমরা কি কিছু বুঝি না নাকি? সবই তো চোখের সামনে দেখি! আসছে সতী সাজতে!”
পাশ থেকে অন্য এক নার্স মৃদু গলায় বাধা দিয়ে বলেছিল, “আস্তে বল! কেউ শুনে ফেলবে তো!”
কিন্তু প্রথম নার্সটি আরও একধাপ গলা চড়িয়ে বিশ্রীভাবে হেসে উঠেছিল— “শুনলে শুনুক! আমি কি ওনারে ডরাই নাকি? আরে শোন, এই ডাক্তার ম্যাডাম তো এই হাসপাতালে আইছেই আমাদের এমপির ছেলের সুপারিশে! তাইলে বোঝ সম্পর্ক কত গভীর! তারা তলে তলে টেম্পু চালাব, আর আমরা কইলেই হরতাল? এখনো তো ওই সাহেব বাহিরেই দাঁড়াই আছে একটু আগেই দেখলাম।”
দ্বিতীয় নার্স অবাক হয়ে শুধিয়েছিল, “সত্যি নাকি! আ তুই এতোসব কেমনে জানলি রে?”
নার্সটি অহংকার করে বলেছিল, “আরে, বড় স্যারের অ্যাসিস্ট্যান্ট রফিকের সাথে আমার ভালো পরিচয় আছে না? ওই বলছে! ওই সালমান সাহেবের কাছের লোক নাকি স্যারের সাথে কথা বলতে আসছিল এই ম্যাডামের চট্টগ্রাম থেকে ট্রান্সফার নিয়ে। তখনই রফিক নিজ কানে শুনছে আর আমারে বলছে!”—বলেই তাদের মধ্যকার রসালো হাসাহাসি আবার শুরু হয়েছিল।
আর ঠিক সেখানেই… মেহুলের সহ্যের শেষ বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়! তার পুরো জীবনের প্রতিটা পাতা যেন সেই লোকটার ইশারায় নাচছে! মেহুল আর এক মুহূর্ত চিন্তা করেনি। ক্ষোভ আর অপমানের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে সে সোজা আউটডোরের দিকে ধেয়ে যায়। আর বাইরে পা রাখতেই তার চোখে পড়েছিল নিশ্চিন্তে চা পানরত সালমান শাহ নেওয়াজকে! তারপরের রক্ত গরম করা দৃশ্য তো ইতিহাস…
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৮
কথাগুলো একশ্বাসে বলে একটা দীর্ঘ, ক্লান্ত হাঁফ ছাড়ল মেহুল। আর ওদিকে হুমা সমস্ত ঘটনা শুনে স্তব্ধ হয়ে হা করে বসে রইল—তার মুখের ভাষা যেন একলহমায় হারিয়ে গেছে!
