শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৮
আফীফা আফনান
“আমাকে স্টক করা বন্ধ করুন, মিস্টার সালমান শাহ নেওয়াজ!”
—মেহুল নিজের কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব কড়া ও স্পষ্ট করে আবার বলল, “আমার পেছনে লাগবেন না। নেহাত আমার বিপদের দিনে আপনি সাহায্য করেছিলেন বলেই সভ্য মানুষের মতো এখনো কথা বলছি, নাহলে…”
”নাহলে কী করতেন ডক্টর? হাত ছোঁয়াতেন নাকি এই গালে?”—সালমান ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল।
সালমানের এই প্রচ্ছন্ন উসকানি আর হালকা রসালো ভঙ্গিতে বলা কথাটা মেহুলের স্বাভিমানের একদম তলানিতে গিয়ে আঘাত করল। কিন্তু সে তার ভেতরের তীব্র রাগটা বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না; বরং সালমানের মতোই চোখের তারায় প্রখর তেজ ফুটিয়ে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বরফশীতল বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুলল। অতঃপর
মেহুল অত্যন্ত স্থির ও ধারালো কণ্ঠে বলে উঠল, “হাত নয় মিস্টার নেওয়াজ, জুতোপেটা করতাম! কারণ অযথা কোনো পরপুরুষের শরীরে স্পর্শ করার মতো বাজে স্বভাব আমার নেই।”
মেহুলের এই ক্ষুরধার ও সোজা শরীর জ্বালানো জওয়াবে সালমানের বুকের ভেতর যেন উল্টো এক আনন্দের প্রদীপ জ্বলে উঠল! মেয়েটার এই দুর্ভেদ্য তেজই তো তাকে প্রতিনিয়ত পাগল করে তোলে।
সালমান দুই হাত বুকের কাছে আড়াআড়ি বেঁধে সামান্য ঘাড় কাত করে বলল, “ভালোই তেজ আছে আপনার মধ্যে… আই লাইক ইট!”
এদিকে মেহুল একচিলতে উপহাসের হাসি হেসে চোখ দুটি ছোট ছোট করে বলল, “মনে রাখবেন মিস্টার নেওয়াজ, মাঝে মাঝে অতি-পছন্দের জিনিস কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়!”
মেহুলের কথাতে সালমান এক পা এগিয়ে এসে নিচু ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জবাব দিল, “আর আমি বিপজ্জনক জিনিস নিয়েই খেলতে বেশি পছন্দ করি, মিস।”
মেহুলের সহ্যশক্তির সীমা যেন এবার পেরিয়ে যাচ্ছিল। সে এবার সরাসরি সালমানের চোখের দিকে আঙুল উঁচিয়ে চরম হুঁশিয়ারির কণ্ঠে ওয়ার্নিং দিয়ে বলল, “আমাকে নিয়ে খেলার চেষ্টা ভুলেও করবেন না! কারণ আপনি আমাকে ঠিক মতো এখনো চিনেনই না। আমার সীমানা আপনার কল্পনার বহু বাইরে! তাই নিজের ভালো চাইলে আমাকে এড়িয়ে চলুন, অন্যথায় এর পরিণতি শুভ হবে না।”
কথাটা শেষ করেই মেহুল আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানো প্রয়োজন মনে করল না। সালমানকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সে যেই না ধীরপায়ে বাড়ির দিকে পা বাড়াবে, ঠিক তখনই সালমান আলতো করে পিছিয়ে গিয়ে গাড়ির বনেটের ওপর গা এলিয়ে দিয়ে শব্দ করে হেসে উঠল!
মেহুল অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে থমকে দাঁড়াল। কিন্তু পেছন ফিরে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই রাতের সেই নিঝুম বাতাসে সালমানের এক গম্ভীর, স্পষ্ট ও গা ছমছমে কন্ঠস্বর ভেসে এলো—
”নাম… অপ্সরী মেহুল ইকবাল।”
মেহুল ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল!
সালমান থামল না। ধীরেসুস্থে যেন মুখস্থ কোনো পবিত্র পুঁথি আওড়াচ্ছে। সে শান্ত কণ্ঠে একের পর এক বলে চলল—
“পিতা—শিকদার জাবেদ ইকবাল।
মাতা—মোহনা শিকদার।
স্থায়ী ঠিকানা—চট্টগ্রাম।
পড়াশোনা—চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, আর বর্তমানে কর্মক্ষেত্র—রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।”
সালমানের ঠোঁটের কোণে তখন এক অদ্ভুত বিজয়ের হাসি। সে যেন কোনো রোবটের মতো নিখুঁতভাবে একের পর এক মেহুলের জীবনের গোপন সব পাতা উন্মোচন করে চলেছে—
“ব্যবহারিক মোবাইল হ্যান্ডসেট—আইফোন ফোরটিন প্রো। সিম নম্বর… ডাবল এইট জিরো ওয়ান সেভেন… ”
সালমান অবলীলায় মেহুলের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর, এমনকি রক্তে কোন গ্রুপ বইছে তা পর্যন্ত গড়গড় করে বলে গেল!
রাতের সেই ঘুটঘুট আঁধারে সালমানের মুখ থেকে নিজের অস্তিত্বের এত নিখুঁত, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ শুনে মেহুল যেন সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেল! সে স্তব্ধ, বাক্রুদ্ধ হয়ে কেবল ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকাল—যেন তার সামনে কোনো রক্তমাংসের মানুষ নয়, বরং তার পুরো জীবনের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দুর্ধর্ষ, ভয়ংকর শয়তান!
মেহুলের বুকের ভেতরটা তীব্র আশঙ্কায় তোলপাড় হয়ে উঠল। সে কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে ঢোক গিলে অস্ফুটে শুধাল, “আপনি… আপনি আমার সম্পর্কে এত কিছু কীভাবে জানেন?”
সালমান গাড়ির বনেটে হেলান দিয়েই পকেটে হাত পুরে স্বাভাবিক গলায় বলল, “জোগাড় করেছি।”
”কিন্তু কীভাবে?! আমার এত নিখুঁত ডিটেইলস তো সাধারণ কারো জানার কথা নয়!”—মেহুলের গলায় স্পষ্ট বিস্ময় ও ভয়ের ছাপ।
সালমান ধীরপায়ে এক পা এগিয়ে এসে চোখের তারায় একরাশ গম্ভীর মাদকতা ফুটিয়ে বলল, “ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব, ডক্টর। চাইলে পরম শত্রুর সবকিছু জোগাড় করা যায়, আর সেখানে ভালোবাসার মানুষ হলে তো কথাই নেই!”
সালমানের মুখ থেকে ‘ভালোবাসার মানুষ’ শব্দটা শুনে মেহুল নিথর হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। হঠাৎই মেহুলের তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে একটা সন্দেহ ভীষণভাবে ঘুরপাক খেতে লাগল।
তবে কি এই লোকটা তাকে চট্টগ্রাম থেকেই অনুসরণ করে আসছে? কিন্তু সে তো আগে কখনো এই লোকটির মুখোমুখি হয়নি! এমনকি এর আগে কখনো কোনো অচেনা মানুষের ছায়াও অনুধাবন করেনি। তাহলে এই দুর্ধর্ষ মানুষটা কেন অহেতুক তার পেছনে হাত ধুয়ে লেগেছে?
”অপ্সরা…”
সালমানের আকস্মিক ডাকে মেহুলের ভাবনার জট ছাড়াল। রাতের নিঝুম বাতাসে সালমানের ডাকটা যেন মেহুলের কানে বাজল। এত সব কথার ভিড়ে মেহুল এতক্ষণ খেয়ালই করেনি যে লোকটা বারবার তাকে ‘অপ্সরা’ বলে সম্বোধন করছে!
মুহূর্তের মধ্যে মেহুলের চোখমুখ শক্ত আর কঠোর হয়ে উঠল। সে শক্ত কণ্ঠে বলে উঠল, “আমাকে এই নামে কখনো ডাকবেন না!”
সালমান ভুরু উঁচিয়ে মৃদু হাসল, “তাহলে কী বলে ডাকব?”
”কোনো কিছু বলেই ডাকবেন না! আর প্রথম কথা—আপনি আমার সামনেই কখনো আসবেন না! আপনাকে দেখলে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়। ধোঁকাবাজ মানুষদের আমি তীব্র ঘৃণা করি, আর আপনিও সেই তথাকথিত সবার মতোই একজন!”
মেহুল এক পা এগিয়ে এসে গলার স্বর আরও শক্ত করল, “নিজেকে ভীষণ সৎ দেখাচ্ছিলেন, তাই না? অথচ আড়ালে আড়ালে আমাকে স্টকিং করেছেন, আমার পুরো লাইফের খবর নিয়েছেন! তারপর সুযোগ বুঝে আমার সামনে এসে ভালো মানুষ সাজলেন! আমার তো এখন একশো পারসেন্ট সিওর মনে হচ্ছে—ওই দিনের বাচ্চা প্রাচারকারী ওই ঘটনার সাথে আপনি যুক্ত আর আজ সন্ধ্যার সেই ক্যাব নষ্ট হওয়ার নাটকটাও আপনারই সাজানো ছিল! ক্ষমতার দাপট আর টাকা থাকলে মানুষ তো সবই করতে পারে, তাই না?”
মেহুলের এই বিষাক্ত ও দাগ কেটে যাওয়া অভিযোগগুলো শোনামাত্রই সালমানের মুখের সেই প্রশান্তির হাসিটা একলহমায় উবে গেল!
এতক্ষণ যে লোকটার চেহারায় এক ধরনের নরম রোমান্টিকতা আর শান্ত ভাব ছিল, তা নিমেষেই উধাও হয়ে সেখানে জায়গা করে নিল এক হিংস্র, জমে থাকা বরফের মতো হাড়হিম করা গাম্ভীর্য!
সালমান ধীরপায়ে মেহুলের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ সুগঠিত শরীরটার ছায়া গিয়ে পড়ল মেহুলের ক্ষুদ্র অবয়বের ওপর। সালমানের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখের তারা দুটি হয়ে উঠল ভয়ংকর প্রখর…
এদিকে আকস্মিক সালমানের ওই হাড়হিম করা পরিবর্তন দেখে মেহুল ভেতরে ভেতরে একটু কেঁপে উঠলেও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেবেছিল তার কঠোর অভিযোগে হয়তো লোকটা অপরাধীর মতো ডিফেন্স করবে, ব্যাকফুটে চলে যাবে।
কিন্তু সালমান মেহুলের আশা পুরোপুরি গুড়িয়ে দিল!
বরং সে ধীরপায়ে মেহুলের আরও এক ধাপ কাছে এগিয়ে এলো। রাতের নির্জনতায় তাদের মাঝে দূরত্ব তখন মাত্র কয়েক ইঞ্চির। সালমানের চোখে তখন কোনো লজ্জা বা অপরাধবোধের লেশমাত্র নেই; বরং সেখানে ফুটছিল এক বেপরোয়া, বুনো আর তীব্র রোদের মতো এক অবসেসিভ ঔদ্ধত্য!
অতঃপর সালমান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় ও তীক্ষ্ণ হাসি ফুটিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল—
—’ শুনেছি মেয়েদের নাকি হাটুর নিচে বুদ্ধি থাকে আপনাকে দেখে আজ তারই প্রমান পেলাম। যাক গে তো কথা হলো, আপনি আমাকে চেনেন না মেহুল, তাই আমার বাহ্যিক রূপ দেখে কখনোই ভাববেন না আমি খারাপ বা অসৎ! আমি ভীষণ ভদ্র একটা ছেলে, আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন, তবুও আপনি যদি মনে করেন কাজটা আমি করেছি তাহলে আমি ক্ষমা চাইছি, আমার এই কাজটার জন্য আমি সত্যি খুব অনুতপ্ত!’ বলেই সালমান মাথা নোয়ালো। কিন্তু পরক্ষণেই মাথা তুলে নিলো। অতঃপর…….
হঠাৎ সালমান বাঁকা হাসলো, কিন্তু পরক্ষণেই সেই হাসি তার ঠোটের কোন থেকে মিলিয়ে গেলো,—”কী ভাবছেন? আমি হাতজোড় করে আপনাকে এসব বলব!”
—উহু, একদম ভুল ধারণা আপনার! আমার সম্পর্কে কেউ মনগড়া কোনো মিষ্টি অথবা ভুল ধারণা মনে পুষে রাখুক, তা আমি অন্তত চাই না।”
সালমানের কণ্ঠস্বর হঠাৎ আরও নিচু, আরও ভারী হয়ে এলো। তার চোখের প্রখর চাহনি যেন মেহুলের আত্মাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
সে ঝুঁকে মেহুলের কানের কাছে এসে বরফশীতল কণ্ঠে বলল, “আপনি আমাকে নিয়ে মনে মনে যা যা ধারণা বানিয়েছেন… তার মাত্র বিশ পার্সেন্ট সঠিক! আর বাকি আশি পার্সেন্ট? ওটা আপনার কল্পনার চাইতেও বহু গুণ বেশি ভয়াবহ আর বিপজ্জনক, অপ্সরা!”
কথাটা বলেই সালমান সামান্য পিছিয়ে গিয়ে মেহুলের চোখে চোখ রাখল। তার চোখে তখন এক বেপরোয়া উন্মাদনা—যা কোনো বাঁধা, কোনো নিয়ম কিংবা কোনো সামাজিক ভয়ের তোয়াক্কা করে না!
”সালমান শাহ নেওয়াজ তার পুরো জীবনে আজ পর্যন্ত কোনো মেয়েমানুষের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও প্রয়োজন বোধ করেনি, স্টকিং করা তো বহুদূরের কথা!”—সালমান অত্যন্ত স্পষ্ট ও অহংকারী কণ্ঠে বলল, “কিন্তু আপনাকে যেহেতু আমি সার্বক্ষণিক নজরে রাখছি, আর আপনিও সেটা ধরে ফেলেছেন… তার মানে আপনি অন্য দশটা সাধারণ মেয়ের মতো নন! কিছু তো মারাত্মক বিশেষত্ব আছে আপনার মাঝে, যা আমাকে এভাবে বেপরোয়া বানিয়ে ছাড়ছে! আমাকে আমার ব্যাক্তিত্ব থেকে দূরে সড়িয়ে দিয়েছে।”
সালমানের কথাবার্তা, কথা বলার ধরন আর বেপরোয়া চোখের চাহনি দেখে মেহুল অলক্ষ্যেই নিজের অজান্তে একটা শুকনো ঢোক গিলল।
হঠাৎ করেই এই নিঃশব্দ মাঝরাতে লোকটাকে মেহুলের চরম লাগামহীন এক পাগলা ঘোড়ার মতো মনে হতে শুরু করল! তার মনে হলো এই মানুষটার অভিধানে ‘না’ বলে কোনো শব্দ নেই, তাকে থামানোর মতো কোনো অদৃশ্য ক্ষমতাও যেন এই পৃথিবীতে তৈরি হয়নি!
মেহুল নিজের ভেতরে জমে ওঠা ভয়ের হিমস্রোতকে আপ্রাণ চেষ্টায় চেপে রাখল। তার হাতজোড়া হালকা কাঁপছিল, কিন্তু মেহুলের তেজ আর আত্মসম্মানবোধ তাকে এক চুলও পিছু হটতে দিল না। সে সরাসরি সালমানের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন ও মোহগ্রস্ত চোখের দিকে তাকিয়ে তীব্র গাম্ভীর্যের সাথে বলল—
”আপনার এই চরম বেপরোয়া আচরণ আর উম্মাদনাকে আপনি যা-ই নাম দিন না কেন, মিস্টার নেওয়াজ… আমার কাছে এটা নিছকই এক মানসিক অসুস্থতা! আর যা-ই হোক, ডক্টর অপ্সরী মেহুল ইকবাল কোনো রোগীর এই ভয়ংকর সাইকোটিক গেমের অংশ হতে রাজি নয়।”
মেহুলের কণ্ঠে কঠিন ও বরফশীতল অবজ্ঞা স্পষ্ট।
কথাটা শেষ করেই মেহুল এক মুহূর্ত থামল না। সোজা নিজের বিল্ডিংয়ের গেটের দিকে হনহন করে পা বাড়াল। সে আর সালমানের কোনো কথা শোনার প্রয়োজনবোধ করছে না।
কিন্তু সালমান কি অত সহজেই ছাড়বার পাত্র?
মেহুল চার-পাঁচ পা এগোতেই পেছন থেকে সালমানের কোনো পদক্ষেপের শব্দ পাওয়া গেল না, কিন্তু ভেসে এলো তার চরম আত্মবিশ্বাসী, স্পষ্ট ও গম্ভীর কণ্ঠ—
”রোগ বলছেন ডক্টর? তাহলে জেনে রাখুন, এই রোগের কোনো ওষুধ এই পুরো ধরাধামে নেই! আর আপনি চাইলেও এই খেলা থেকে দূরে সরতে পারবেন না। কারণ খেলার ছক আপনি আঁকেননি… ছক একেছে সালমান শাহ নেওয়াজ!
তাহলে আগামীকাল সকাল ৯ টা ১০এ দেখা হচ্ছে, ওই সময়েই তো হসপিটালে প্রবেশ করেন তাই না।”
মেহুল গেটের পকেট ডোর খুলে ভেতরে ঢুকতেই তার কানে কথাগুলো আছড়ে পড়লো মুহূর্তের মধ্যে সে শক্ত করে দরজাটা বন্ধ করে দিল। লোহায় লোহায় বারি খেয়ে বিকট শব্দ হলো। তবে পেছন না ফিরেও গেটের ওপাশে দাঁড়িয়েও মেহুল অনুভব করতে পারছিল, সালমান ঠিক একইভাবে হাত পকেটে পুরে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার চোখ দুটো এখনো দরজার ওপার ভেদ করে তাকেই দেখছে!
—————★—————
নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে এসে মেহুল ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। বুকের ভেতর হূৎস্পন্দন তখন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে চলছে। রাতের নিস্তব্ধতায় ঘরটা যেন ভীষণ অচেনা ঠেকছিল তার। মেহুল এগিয়ে গেলো সোফার কাছে। সালমানের মুখ থেকে গড়গড় করে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটা নিখুঁত তথ্য শোনার দৃশ্যটা বারবার তার মস্তিষ্কে বিকট শব্দে আঘাত হানছিল।
অতঃপর সে কাঁপাকাঁপা হাতে টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটা তুলে নিল। ঢক ঢক করে পুরো গ্লাসের পানি খালি করে খালি গ্লাসটি সশব্দে টেবিলে রাখল সে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসায় শরীরটা এলিয়ে দিল সোফার নরম গদিতে, বিষণ্ণ মনে চোখ জোড়া শক্ত করে বন্ধ করল সে।
কিন্তু হঠাৎই কোনো এক অজানা শঙ্কায় কিছু একটা ভেবে সে দ্রুত সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ধীরপায়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পর্দাটা সামান্য একপাশে সরিয়ে নিচে তাকাল।
রাস্তার সেই ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আবছা আলোয় সালমানের কালো চকচকে গাড়িটা এখনো ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। সালমান গাড়ির বনেটে গা এলিয়ে ধীরেসুস্থে আকাশের দিকে তাকিয়ে একমনে সিগারেট টানছে। নিকোটিনের ধোঁয়ার ধবল কুণ্ডলীগুলো রাতের হিমেল বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর তার তীক্ষ্ণ চোখের তারায় ফুটে আছে এক অদম্য, অনমনীয় মগ্নতা।
কিন্তু হঠাৎ করেই সালমান নিজের চোখজোড়া সোজা মেহুলদের আটতলার অন্ধকার জানালাটার দিকে ঘোরাল—ঠোঁটের কোণে সেই চেনা, রহস্যময় বাঁকা হাসি! যেন সে ওপর থেকে চোখ সরানোর আগেই অলৌকিকভাবে জেনে গেছে যে তার অপ্সরা ঠিক এই পর্দাটার আড়ালেই দাঁড়িয়ে আছে! আর তা দেখে মেহুল বুক চিরে আসা এক অনাকাঙ্ক্ষিত শিহরণে একঝটকায় পর্দার কাপড়টা ছেড়ে দিল। দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে সে পিছিয়ে এলো জানালা থেকে। নিজের অজান্তেই তার মনে হলো—যে অদৃশ্য অন্ধকারের সঙ্গে সে এতদিন ধরে না চাইতেও মানসিকভাবে লড়াই করে আসছিল, সেই ভয়াল অন্ধকার আজ আক্ষরিক অর্থেই তার ঘরের দোরগোড়ায় এসে কড়া নাড়ছে!
”তুই এত রাতে এখানে কী করছিস, মেহু?”
আকস্মিক অন্ধকারের বুক চিরে হুমার চাপা কণ্ঠ ভেসে আসতেই মেহুল চমকে উঠে শরীর ঝাঁকি দিয়ে এক লাফে ছিটকে পিছিয়ে গেল! বুকটা ধড়ফড় করে উঠল তীব্র আতঙ্কে, হাত লেগে পাশে থাকা ফুলদানিটা পড়তে পড়তে অল্পের জন্য বেঁচে গেল। ভীতিতে তার চোখের মণি দুটো যেন ছানাবড়া হয়ে গেছে, একহাতে বুকের মাঝখানে চেপে ধরে ঘন ঘন হাঁপাতে লাগল সে। হঠাৎ হুমার আগমনের ধাক্কা আর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সালমানের সেই হাড়হিম দৃষ্টির আতঙ্ক—সব মিলে মেহুলের সমস্ত শরীর যেন মুহূর্তে বরফের মতো হিম হয়ে গিয়েছিল অতঃপর সে কোনমতে আওড়ালো, “তুই আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিস হুমা!”
হুমা নিজের ভুলের জন্য জিভ কেটে তড়িঘড়ি এগিয়ে এলো, “সরি সরি মেহু! আল্লাহ, আমি সত্যি বুঝতে পারিনি রে তুই এভাবে ভয় পেয়ে যাবি!”
“আসলে তোকে রুমে না দেখে কই আছিস দেখতে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম।”
মেহুল কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না। শুকনো ঢোক গিলে বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা সামলে নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব নিচু আর স্বাভাবিক রেখে বানিয়ে বলল, ” বেশ কিছুক্ষণ ধরে খুব তেষ্টা পেয়েছিল, তাই পানি খেতে রান্নাঘরের দিকে এসেছিলাম।”
ওহ বলে হুমা টেবিলের খালি গ্লাসটার দিকে তাকালো, অতঃপর সহানুভূতির সাথে শুধাল, “খেয়েছিস পানি?”
”হুম, খেয়েছি…”—মেহুল বুক চিরে আসা একটা ভারী নিশ্বাস গোপন করে জবাব দিল।
”তাহলে আর দেরি করিস না, চল শুয়ে পড়বি। সকালে তোকে আবার উঠে হসপিটালের ডিউটিতে যেতে হবে,” হুমা হাই তুলতে তুলতে মেহুলের হাত ধরল।
”চল…” মেহুল হালকা মাথা নেড়ে রুমের দিকে পা বাড়াল, আর হুমাও হাই তুলতে তুলতে তার পিছু পিছু পা বাড়াল।
মেহুল এসে বিছানায় গিয়ে শুলো বটে, কিন্তু তার চোখ দুটো আর বন্ধ হতে চাইল না। ঘরের মৃদু আলো-আঁধারিতে সে বারবার ভাবছিল জানালার ওপাশে ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বেপরোয়া মানুষটার কথা। আজ রাতের এই অলিখিত মুখোমুখি দাঁড়ানো যেন তাদের দুজনের জীবনের মোড় চিরতরে এক নতুন, বিপজ্জনক ঝড়ের দিকে ঘুরিয়ে দিল!
—————★—————
ভোরের স্নিগ্ধ আর শীতল আবেশ চারপাশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সাথে মেহুলের অশান্ত হৃদয়জুড়েও এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তির অনুভূতি দোলা দিচ্ছে।
এই তো মাত্র মিনিট দশেক আগেই বাবার সাথে ফোনে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলল সে। সারা রাতের সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আর মনের ভেতরে চেপে রাখা ঝড় একপাশে সরিয়ে রেখে, নিজের জীবনের এক ভীষণ বড় ইচ্ছার কথা অকপটে প্রকাশ করেছে বাবার কাছে। পুঁচকুর সব কথা নিজ মুখে বাবাকে বিস্তারিত জানিয়েছে মেহুল, আর সাথে দৃঢ় কণ্ঠে নিজের সিদ্ধান্তের কথা স্পষ্ট করে বলেছে—সে পুঁচকুকে আনুষ্ঠানিকভাবে লিগ্যালি দত্তক নিতে চায়!
কথাটা বাবাকে জানানোর পূর্বে মেহুলের মনটা ভীষণ দোলাচলে ছিল। তার ভেতরে একটাই ভয় আর দ্বিধা কাজ করছিল—জাবেদ ইকবাল যদি তার এই আকস্মিক ও জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তকে অমত করেন বা নাকচ করে দেন! কারণ সমাজ-সংসারের চোখে এক কুমারী মেয়ের কোলে হঠাৎ কোনো বাচ্চাকে তুলে নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই সহজভাবে নেওয়ার কথা নয়।
কিন্তু ফোনে বাবার প্রশান্ত আর স্নেহে ভরা কণ্ঠস্বর যেন মেহুলের সমস্ত সংশয় এক নিমিষে ধুলোয় উড়িয়ে দিল!
জাবেদ ইকবাল তাঁর মেয়ের মনের ভেতরের খাঁটি মাতৃত্ব আর ভালোবাসার গভীরতা এক লহমায় বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি কোনো বাধা তো দেনইনি, বরং সহাস্যে মেয়ের এই মানবিক ও মাতৃসুলভ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। বাবার কাছ থেকে এমন অকুন্ঠ সমর্থন আর ভালোবাসার সবুজ সংকেত পেয়ে মেহুলের বুকের ওপর জমে থাকা ভারী বিষাদের পাথরটা যেন মুহূর্তে উবে গেল।
ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে মেহুল বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসের ছোঁয়া তার গালে লাগতেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একরাশ পবিত্র ও স্নিগ্ধ হাসি। জীবনের সব জটিলতা অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনার মাঝেও, নিজের এই ছোট্ট পৃথিবীটাকে আপন করে নেওয়ার আনন্দ তাকে যেন মানসিকভাবে অন্যরকম শক্তিশালী করে তুলল…
দেখতে দেখতে ঘড়ির কাটায় তখন সকাল সাড়ে আটটা। মেহুল সুন্দরভাবে রেডি হয়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং স্পেসে এলো।
সামনে এগোতেই তার চোখ পড়ল বসার ঘরের সোফাটার দিকে। সেখানে হুমার কোলে শুয়ে আপনমনে হাত-পা ছুড়ে খেলছে ছোট্ট পুঁচকু। মেহুল চটজলদি এগিয়ে গিয়ে পুঁচকুর সামনে ঝুঁকলো। পরম মমতায় তাকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে নরম দু-গালে ভালোবাসার কয়েকটি ছোট্ট চুমু এঁকে দিল।
তারপর বাচ্চার চোখের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলে উঠল, ” মাম্মাম ডিউটিতে যাচ্ছে, কেমন? হুমা-মাম্মামকে একদম জ্বালানো যাবে না কিন্তু! একদম লক্ষ্মী সোনা হয়ে থাকবে, মনে থাকবে?”
পুঁচকু যেন তার মাম্মামের মিষ্টি কথাটা বুঝতে পারল! চট করে হাত দুটো শূন্যে নাচিয়ে মিহি গলায় ডেকে উঠল— “আআই… আআআ!”
মেহুল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। খিলখিল করে হেসে বাচ্চার নাকের সাথে নিজের নাকটি আলতো ডলে দিল। তারপর পুঁচকুকে পরম যত্নে আবার হুমার কোলে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “আমি চললাম রে হুমা! কোনো রকম দরকার বা সমস্যা হলে সাথে সাথে আমাকে একটা কল দিবি, বুঝলি?”
”এক মিনিট দাড়া!”—হুমা তড়িঘড়ি করে পুঁচকুকে সোফায় রেখে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেল।
খানিক বাদে এতে তার হাত থেকে একটি টিফিন বক্স মেহুলের দিকে বাড়িয়ে দিল হুমা। মেহুল অবাক হয়ে টিফিন বক্সটির দিকে তাকিয়ে শুধাল, “কী রে এটাতে?”
”ভুনা খিচুড়ি বানিয়েছি। তোর খুব ফেভারেট, না?”
মেহুল অবাক চোখে তাকাল, “তুই কীভাবে জানলি যে আমার ভুনা খিচুড়ি পছন্দ?”
হুমা এক হাত কোমরে রেখে বলল, ” মিনারা আন্টি সকালে আমাকে ফোন করেছিলেন তখন বললেন। তোকে নিয়ে আন্টির একরাশ চিন্তা! বললেন তোকে যেন একটু দেখে রাখি, তুই নাকি বড্ড কেয়ারলেস! নিজের শরীরের কোনো যত্ন নিস না, বাড়িতে থাকতেও নাকি ঠিকমতো সময়মতো খাওয়া-দাওয়াও করতিস না। আর সত্যি বলতে, এখন আমারও তা-ই মনে হয়! তুই দুনিয়ার সবার চিন্তা করিস, শুধু নিজের কথাটাই বেমালুম ভুলে বসে থাকিস!”
মেহুল বকে যাওয়া হুমার দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, “হে হে! এখন আমার শতভাগ বিশ্বাস হচ্ছে যে তুই একদম মিনারা মনির কার্বন কপি! আগে একটু সন্দেহ ছিল, তবে এখন পুরোপুরি শিওর হয়ে গেলাম। মুরুব্বি একটা!”
হুমা চোখ বড় বড় করে বলল, “কীহ্?! আমি মুরুব্বি?!”
”জী, হুমা-খালাম্মা!”—মেহুল মুখ বাঁকিয়ে জবাব দিল।
“তবে রে দাঁড়া!” হুমা ভুয়া রাগ দেখিয়ে মেহুলের দিকে তেড়ে আসতে চাইল, আর মেহুল চটপটে ভঙ্গিতে হেসে এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে গেটের দিকে ছুটে গেল।
মিনিট পনেরো পর মেহুলের সিএনজি যখন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে এসে থামল, তখন চারপাশের চিরচেনা ব্যস্ততা আর মানুষের হুড়োহুড়ি চোখে পড়ার মতো। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, রোগীর স্বজনদের ছোটাছুটি আর অন্য ডাক্তার-নার্সদের ব্যস্ত পদচারণায় চারপাশ মুখরিত।
মেহুল দ্রুত হেঁটে নিজের কেবিনে গিয়ে বসল। অ্যাপ্রনটা গায়ে চাপিয়ে স্ট্রেথোস্কোপটা গলায় ঝুলিয়ে চেয়ারে বসতেই শুরু হয়ে গেল তার নিত্যদিনের সংগ্রাম। একে একে প্রেসক্রিপশন দেখা, রোগীদের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া আর জরুরি ফাইল চেক করার কাজে ডুবে গেল সে। সকালের পর থেকে সময়টা একদম স্বাভাবিক আর নিরবচ্ছিন্ন গতিতেই কাটতে লাগল—যেন তার জীবনে কোন টেনশনই নেই।
টানা কয়েকজন জটিল পেশেন্ট দেখার পর মেহুল যখন সামান্য ক্লান্তি মেটাতে এবং ইনডোর ওয়ার্ডের হালচাল দেখতে কেবিন থেকে বের হলো, তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর গড়িয়েছে।
অতঃপর করিডোর ধরে হেঁটে যেতে যেতে সে একটু রিফ্রেশমেন্টের আশায় স্টাফ রেস্টুরেন্টের দিকে পা বাড়াল। কিন্তু ক্যাফেটেরিয়ার কাছাকাছি পৌঁছাতেই হুট করে একটা পরিচিত শব্দ তার কানে এসে বাড়ি খেল! রেস্টুরেন্টের দরজাটা অর্ধেক খোলা ছিল। মেহুল পা থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
ভেতরে দুজন নার্স আর একজন ওয়ার্ডবয় চা-সমুচার আড্ডায় মেতে উঠেছে, আর তাদের সেই রসালো আড্ডার মূল মুখরোচক বিষয়বস্তু অন্য কেউ নয়—স্বয়ং মেহুল!
কিন্তু গল্পটা শুধু মেহুলকে নিয়ে আটকে থাকলে কথা ছিল না, মেহুলের নামের সাথে অত্যন্ত কুরুচিকর আর মুখরোচকভাবে জড়িয়ে পড়েছে প্রভাবশালী এমপির ছেলে—সালমান শাহ নেওয়াজের নাম!
”আরে ভাই, এমনি এমনি কি আর ওই লোক মাঝরাতে হসপিটালের চত্বরে এসে বসে থাকে? পৌরসু দিনও তো নাকি মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিল! কালকে মেডাম বাচ্চা নিয়া বাড়ি গেলো আর উনিও আইলো না। ম্যাডামের সাথে যে লোকটার একটা গভীর চক্কর চলছে, তা তো স্পষ্ট…আমরা কি কানা নাকি সবই বুঝি।”—ওয়ার্ডবয়ের ফিসফিসানি মাখা নোংরা হাসিটা মেহুলের কান স্পর্শ করতেই তার সমস্ত শরীর রি রি করে উঠল!
নার্স দুজনও সাথে সাথে সায় দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। তাদের একের পর এক বানিয়ে বলা রসালো আর নোংরা মন্তব্যগুলো যত মেহুলের কর্ণগোচর হতে লাগল, ততই তার ফর্সা চেহারার রক্তিম রং লাল থেকে ক্রমশ গাঢ় বেগুনি হতে শুরু করল। অপমান আর তীব্র ক্ষোভে মেহুলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন এক অনিয়ন্ত্রণযোগ্য আগ্নেয়গিরির লাভা ফুটতে লাগল! চোখের কোণ দুটোতে যে রাগে কামড়ে ধরল । গায়ের রগগুলো টান টান হয়ে উঠল। তার সম্মান, তার ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লোকগুলো কায়দা করে চর্বিতচর্বণ করছে—আর এই সমস্ত বিষাক্ত নাটকের মূলে রয়েছে সেই এক ও একমাত্র লোক—সালমান শাহ নেওয়াজ!
অপরদিকে হসপিটালের সুবিশাল আউটডোর চত্বরের একপাশে নিজের কালো চকচকে গাড়িটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সালমান। পরনে রাজকীয় ফর্মাল শার্ট আর প্যান্ট, একহাতে হালকা ধোঁয়া ওঠা সিরামিকের চায়ের কাপ।
সকাল থেকে ব্যাপক ব্যস্ত ছিলো সে, বাবা মিনহাজ শাহ নেওয়াজের সাথে বিভিন্ন কাজে এদিক সেদিক হেঁটে চলেছে। এখনো মূলত বাবার সাথেই হসপিটাল ট্রাস্টি বোর্ডের এক বিশেষ মিটিং আর সেমিনারে যোগ দিতেই আজ দুপুরে এখানে আগমন তার। সেমিনার শুরু হতে এখনো কিছুক্ষণ বাকি তাই নিজের বিশ্বস্ত সঙ্গী ধ্রুব, কবির আর রবির সাথে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে স্বাভাবিক গল্পে মগ্ন সে।
সালমান যখন রবির দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে গম্ভীর গলায় একটা নির্দেশ দিচ্ছিল, ঠিক তখনই একদম অপ্রত্যাশিতভাবে পেছন থেকে ঝড়ের বেগে ধেয়ে এলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত তাণ্ডব!
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই, চোখের পলকে পেছন থেকে একটা ক্ষিপ্ত হাত এসে সজোরে সালমানের দামী শার্টের কলারটা খামচে ধরে পেছন দিকে এক হেঁচকা টান মারল!
আর তার ঠিক পরমুহূর্তেই—সবাইকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ ও বাক্রুদ্ধ করে দিয়ে সালমানের সুগঠিত, প্রখর গালে চটাশ করে সপাটে এসে পড়ল ভয়াবহ এক বারি!
ঘটনাটা এতটাই আকস্মিক আর অবিশ্বাস্য গতিতে ঘটল যে সেখানে উপস্থিত ধ্রুব, কবির কিংবা রবির মতো ক্ষিপ্র মস্তিষ্কের লোকেরাও কয়েক সেকেন্ডের জন্য কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারল না! কিন্তু সালমানের ফর্সা গালে লেগে হঠাৎ এক তীক্ষ্ণ শব্দ হতেই চা ভর্তি সিরামিকের কাপটা হাত থেকে নিচে পড়ে চুরমার হয়ে গেল।
পরমুহূর্তেই পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে রবি তড়িৎ গতিতে নিজের কোমরের বেল্ট থেকে পিস্তলটা বের করে সামনে তাক করল! রক্তচক্ষু নাচিয়ে হিংস্র এক হুঙ্কার ছেড়ে চেঁচিয়ে উঠল সে—
”কোন বাই*ন***দের বাচ্চা ভাইয়ের গায়ে হাত তোলে? কার এতো সাহস, এত বড় কলিজা কার!”
রবি পিস্তলের ট্রিগারে তর্জনী চেপে শত্রু ভেবে সামনে তাক করতেই ঠিক তার চোখের সামনে আক্রমণকারীর চেহারাটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। আর সেই চেহারা দেখা মাত্রই রবির পুরো শরীর একলহমায় হিম হয়ে গেল! বাতাসে উঁচিয়ে থাকা পিস্তলসহ তার হাতটা শূন্যেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
কারণ—তাদের ঠিক সামনে প্রলয়ংকরী মূর্তি ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং মেহুল!
মেহুলের চোখে-মুখে তখন এক বিধ্বংসী আগুনের উত্তাপ—যেন সেই আগুনের তাপে চারপাশের যা কিছু আছে, সব পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে পারে! রাগে, ক্ষোভে আর চরম অপমানে তার ফর্সা বুকটা হাঁপানির রোগীর মতো ওঠানামা করছে। ইতিমধ্যে হাতে থাকা স্যান্ডেলটিও ছিঁড়ে গিয়েছে, আর হাতটাও থরথর করে কাঁপছে।
যা দেখে রবি নিমিষেই বুঝে গেলো তখন শব্দটা কিসের ছিলো, আর মেহুল যে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে সালমানের গালে স্যান্ডেল মেরেছে তা ছিঁড়ে যাওয়া স্যান্ডেলটি তার প্রমান।
এদিকে, আকস্মিক এই মারাত্মক আঘাতের তীব্রতায় সালমানের মাথাটা একপাশে ঘুরে গিয়েছিল। তার শক্ত চোয়ালের চামড়ায় জোড়েসোড়ে স্যান্ডেলের তিব্র আঘাত লেগে সঙ্গে সঙ্গে রক্ত জমে লালচে কালশিটে দাগ ফুটে উঠেছে সেখানে।
সালমান ধীর গতিতে নিজের মাথাটা সোজা করল। তার চোখের তারায় একলহমার জন্য কোনো অনুভূতি প্রকাশ পেল না, কিন্তু পরমুহূর্তেই তার চোখ-মুখের সেই থমথমে ভীতিপ্রদ ভাবটা এক ভয়াল, দানবীয় রূপ নিল!
শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৭
সালমান স্তব্ধ হয়ে মেহুলের অগ্নিকন্যা রূপের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। সঙ্গে সঙ্গে তার হাতজোড়া সশব্দে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল, গলার শিরাগুলো ফুলে লাল হয়ে গেল। চারপাশের বাতাস যেন মুহূর্তের মধ্যে ভারী আর শ্মশানের মতো শান্ত হয়ে গেল—যেন এই একটা পুরুষের ভেতরে থাকা দানবটা এখনই জাগবে আর চোখের সামনে যা কিছু পাবে, সব ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে!
আর ঠিক এরি মাঝে আকস্মিক সবাইকে অবাক করে দিয়ে সালমানের হাত গিয়ে আকড়ে ধরলো মেহুলের গলা…..”
