Home তাকদিরে তুমি তাকদিরে তুমি পর্ব ২২

তাকদিরে তুমি পর্ব ২২

তাকদিরে তুমি পর্ব ২২
মোনালিসা মেহরোজ

সারাদিনের ব্যাস্ততা শেষে মির্জা বাড়ি এখন একদম নিরব নিস্তব্ধ হয়ে পরেছে। চারিদিকের কোলাহল নিভে গেছে। ফাতিহাসহ মেইডরা মিলে সবকিছু গোছগাছ করেছে সবে। গোধূলি লগ্ন চলমান। সায়না মির্জা, কাশফিয়া মির্জা ও তার দু’মেয়েকে বিদায় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফাতিহা সোফায় এসে বসলো৷ এরমধ্যেই কাশফিয়ার দু’মেয়ে ব্যাগপত্র গুছিয়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নামলো। সায়না মির্জা উঠে এগিয়ে গেলেন। ফাতিহা নিজেও পিছু নিলো তার।
—সাবধানে যেয়ো মা। আর আবার এসো!
ছোটমাকে জড়িয়ে মৃদু হাসলো দু’বোন। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। অতঃপর এগিয়ে গেলো ফাতিহার পানে। হাসিমুখে জড়িয়ে আওড়ালো—-
—ভালো থাকবেন, ভাবি। আর আমাদের ওখানে বেড়াতে আসবেন। অপেক্ষা করবো।
—নিশ্চয়ই।

মিষ্টি হেঁসে উত্তর করলো ফাতিহা। কাশফিয়া ব্যাগপত্র নিয়ে নিচে নামলেন। ফাতিহা-সায়না মির্জা ও আযান মির্জার থেকে বিদায় নিলেন। তখনি সেখানে এসে থামলো আসিফ নিজেও। কাশফিয়া ব্যাগ রেখে এগিয়ে গেলেন তার পানে। এতোদিন যেই ছেলেকে তিনি দেখে এসেছিলেন আজ যেনো তার অন্যরূপ। কাশফিয়া তাকিয়ে থাকেন। আসিফের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলেন—–
—আল্লাহ তোমায় সুবুদ্ধি দিক।
বিনিময়ে সৌজন্যমূলক হাসলো আসিফ।
—সাবধানে যাবেন।
অতঃপর গাড়িতে চরে মির্জা বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে বেড়িয়ে গেলেন তারা। আযান মির্জা ছেলের পানে একপলক তাকিয়ে উপরের দিকে পা বাড়ালেন। আসিফ মায়ের পানে তাকালো।
—মা! আমি একটু বাহিরে যাচ্ছি। স্বাধীন সামনের দোকানে আছে, বললো একটু দেখা করতে। আধা ঘন্টার আগেই চলে আসবো।

সায়না মির্জা বাঁধা দিলেন না। মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালেন। আসিফ গটগট পায়ে এগিয়ে গেলো সদর দরজায় পানে। ফাতিহা তাকিয়ে রইলো সেদিকপানে। আচমকায় তার ঠোঁটের কোণায় এক চিমটি হাসি ফুটলো। স্বামীর যাওয়ার পান হতে নজর সরিয়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদার করে উপরের দিকে পা বাড়ালো রমণী।
নিজের ঘরে আসতেই আজ একটু অন্যরকম অনুভূতি হলো। সারাদিনের ঘটা সকল ঘটনা তার মস্তিষ্ক বিচরণ করতে লাগলো। অদ্ভুত প্রশান্তিতে তার হৃদয় শীতল হয়ে এলো। নজর দিলো এলোমেলো বুক শেলফের পানে। সবসময় গুছিয়েই রাখে সে। তবে কাশফিয়া মির্জার দু”মেয়ে আয়াত ও হায়াত আজ একটু নড়াচড়া করে ফেলেছে সবকিছু। হয়তো বই খুঁজেছে পছন্দসই। ফাতিহা মৃদু হাসলো। ধীর পায়ে এগিয়ে এলো শেলফের পানে। বিছানার উপরে রাখা তিনটে বই এনে গুছিয়ে রাখলো সেথায়। অতঃপর এলোমেলো বইগুলোও নরম হাতে গুছিয়ে রাখলো শেলফের প্রতিটি তাকে।

এরমধ্যেই ফাতিহার নজর কাড়লো অন্য একটা জিনিস। একটা বইয়ের ভেতর হতে উঁকি দিচ্ছে শুভ্র রঙা ডাইরির পৃষ্ঠা। ভ্রু কুঁচকে গেলো রমণীর। হাত বাড়িয়ে বইয়ের মাঝ হতে তা বের করে আনতেই কপালের ভাজ গাঢ় হলো। একটা নারীর মুখের একাংশ কাঁচা হাতা অঙ্কন করা। ঠোঁটের নিচে গাঢ় জ্বলজ্বলে তিল। যার পানে নজর পরতেই বেশ অবাক হয় ফাতিহা। ছবিটা বেশ ভালো করে খুঁতিয়ে দেখে। আর শেষ অবদি যখন মনের সন্দেহ গাঢ় হয় তখনি ঝটকা খায় রমণী। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ছবিটির পানে। মুখের গঠন তার চিনতে অসুবিধা হয়না এ পর্যায়ে। বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। ঠোঁট আচানক ভেঙে আসে কান্নায়। তবে সে কাঁদে না। শুধু নিঃশব্দে এক ফোঁটা নোনা জল টপ করে গড়িয়ে পরে কাগজটিতে। জানালা দিয়ে আসা ডুবন্ত সূর্যের কোমল রশ্মি ছুঁয়ে যায় তার সুশ্রী মুখ। আলতো হাতে ছবিটিতে হাত বোলায় ফাতিহা। অজানা অনুভূতির জোরার খেলে যায় হৃদয়ে।
—আমি কি ভুল করছি?সহজ পথ রেখে কি কঠিন পথে চলছি?
ফাতিহা এর উত্তর পেলো না। নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো ছবিটির পানে।

—ফাতিহা! আম্মা, কি করছো?
সায়না মির্জা ফাতিহাকে ডাকতে ডাকতে দরজা ঢেলে ভেতরে এলেন। ফাতিহা উল্টো ঘুরে ছিলো। শাশুড়ীর আগমনে চমকে উঠলো সে। তড়িৎ নিজেকে সামলে চোখের পানি মুছে নিলো। জিভ দ্বারা অধর ভিজিয়ে কাগজখানা শেলফে রেখে ঘুরে এগিয়ে গেলো শাশুড়ীর পানে। সায়না মির্জা ততক্ষণে তার অভিমুখে এসে দাঁড়িয়ে পরেছেন। ঠোঁটের কোণায় তার মিষ্টি হাসি। ফাতিহাও হাসলো।
—ঠিক আছো আম্মা? মুখটা ওমন লাগছে কেনো?
—এমনিই, একটু ক্লান্ত লাগছে।
—বিরক্ত করলাম?
ফাতিহা চোখ পাকালো। শাশুড়ীর হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে কোমল গলায় আওড়ালো—-
—এমন কথা কেনো বলছেন, মা? আপনার যখন ইচ্ছে আপনি তখন আমার কাছে আসতে পারেন। আমি একটুও বিরক্ত হইনি।
সায়না মির্জা মৃদু হাসলেন। ফাতিহার মাথায় হাত বুলালেন অতি স্নেহের সহীত।
—আসলে তোমার বাবা তোমায় একটু ডাকছিলেন৷ তাই ডাকতে এসেছিলাম।
ফাতিহার কপালে সরু ভাজ পরলো।
—কেনো, মা?
—তা তো জানি না। গেলেই দেখতে পাবে। চলো।
ফাতিহা মাথা নাড়িয়ে শাশুড়ির পিছু নিলো।

স্বাধীনকে বিদায় দিয়ে আনমনে মির্জা বাড়ির গেটের কাছে এসে থামতেই স্বশব্দে বেজে ওঠে আসিফের ফোন। আসিফ থামে। ভ্রু কুঁচকে পকেট হতে ফোনটা বের করে সামনে ধরতেই মৃদু হেঁসে কল রিসিভ করে।
—হ্যাঁ, মৃন্ময়! বল। কি খবর তোর?
ওপাশে মৃন্ময় মৃদু হাসলো।
—আমি এই তো ভালো। তোর খবর বল! কেমন চলছে লুকোচুরি সংসার?
আসিফ তপ্ত শ্বাস ফেলে। কপালে স্লাইড করতে করতে আওড়ালো—-
—আগের মতোই।
—ভাবলি কিছু?
—কি নিয়ে?
—কি নিয়ে মানে? তুই কি বোকা? একবার দেখবি না মেয়েটার এতো লুকোচুরির কারণ? সেদিন কি কথা হলো রেস্টুরেন্টে?
আসিফের মনে পরে সেদিন বন্ধুমহলে হওয়া কথাগুলো। মনটা কেমন বিষন্ন হয়ে যায় তার। বাগানের দিকে তাকিয়ে নিগুর গলায় আওয়াড়—-
—আচ্ছা দেখি কি করা যায়।
—ওকে, দেখ। কোন হেল্প লাগলে জানাস।
আসিফ মাথা নেড়ে ফোন কেটে দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করে৷ পকেটে ফোন পুড়ে বিষন্ন মুখে বাড়িতে পা রাখে। ড্রয়িংরূমে কেউ নেই। একদম ফাঁকা। আসিফ কিচেনে উঁকি দিলো। দু’জন মেইড সেখানে নিজের মতো করে টুকটাক কাজ করছে। আসিফ ঘুরে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো। সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের ঘরে এসে দেখতে পেলো রূমটা পুরোপুরি ফাঁকা। আসিফের ভ্রু কুঁচকে গেলো। ফাতিহা নেই? এসময় কোথায় গেলো? মাগরিবের আযান তো পরে যাচ্ছে!
আসিফ বড় বড় পায়ে বারান্দায় এলো ফাতিহার আশায়। তবে রমণী এখানেও নেই। এবার আসিফের ভ্রু আরো কুঁচকে গেলো। ফিরে এলো ঘরে। ধপ করে বসে পরলো বিছানায়। ঠোঁট কামড়ে আওড়ালো—
—এ আবার কোথায় গেলো?

বিছানার উপর স্বযত্নে পরে আছে কয়েকটা ফাইল। গহনার বাক্স। একটা লকারের চাবি। ফাতিহা সেদিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে। বুকটা কাঁপছে থরথর করে। তবুও রমণী বাহিরে পানির ন্যায় শান্ত। শুধু চোখের কোণে এক ফোঁটা নোনা জল চিকচিক করছে। ওড়নার একাংশ হাতের মুঠোই শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ভেতরের কাঁপুনি নিবারণে ব্যাস্ত সে।
তন্মধ্যে আযান মির্জা বিছানা হতে চাবিটি তুলে মৃদু হেঁসে এগিয়ে এলেন ফাতিহার পানে। সামনের তুলে ধরলেন তা। ফাতিহার নজর সেদিকে স্থির হয়ে গেলো। সায়না মির্জা বিছানায় বসে তাদের পানে তাকিয়ে। ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসির রেশ। আযান মির্জা এক হাতে আলতো করে ফাতিহার মাথায় বুলিয়ে দিলেন।
—সায়নার উপর আমি বরাবরই বেশ ভরসা করতাম। তার পছন্দ-অপছন্দের গুরুত্ব ছিলো আমার কাছে সবার আগে।
একটু থামলেন তিনি। ফাতিহা চোখ তুলে বাবা সমতুল্য মানুষটার পানে তাকালো। আযান মির্জা তার তাকানোতে ফের হাসলেন।
—বাড়ির কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সাথে পরামর্শ না করে আমি কখনোই এগোইনি। কারণ আমি জানতাম, এই সংসারের ভালো-মন্দ সে আমার চেয়েও ভালো বোঝে। আর সে যখন তোমায় পছন্দ করলো তখন আমি কোন দ্বিধা ছাড়াই রাজি হয়ে গেলাম৷ ওর কন্ঠে আমি তোমার মধ্যে এমন কিছু গুন উপলব্ধি করেছি যা আজ আমি স্বচক্ষে দেখতে পারছি। সাথে এটাও আমি বলতে পারি বুক ফুলিয়ে, সায়না সঠিক মানুষকেই বেছেছে। তার দ্বায়িত্ব সে সঠিক ভাবেই পালন করেছে।
আযান মির্জার কণ্ঠে মিশে থাকা কোমলতা ফাতিহার হৃদয় ছুঁয়ে গেলো। সায়না মির্জাও স্বামীর পানে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।

—কিন্তু এখন সময় এসেছে, সায়নার সেই দায়িত্বের একটা বড় অংশ তোমার হাতে তুলে দেওয়ার।
ফাতিহার বুকটা ধক করে উঠলো। সে বুঝলো, এরপর কি হতে পারে। রমণী তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়লো।
—না বাবা, এসব আমাকে কেনো দিচ্ছেন? আমি তো এখনো এই বাড়ির অনেক কিছুই ঠিকমতো জানি না। আপনারা আছেন, মা আছেন। আপনারাই সব সামলাবেন। আমি শুধু যতটুকু পারি, পাশে থাকবো।
আযান মির্জা মৃদু হাসলেন পূত্রবধূর কথায়। চাবিটা তার হাতের মুঠোয় রেখেই শান্ত গলায় বললেন—-
—তুমি পারবে না, এই কথাটা আমি বিশ্বাস করি না, আম্মা। বরং তুমি পারবে বলেই তোমাকে দিচ্ছি।
ফাতিহা নীরব হয়ে গেলো এবার। ছলছলে চোখে বাকহারা হয়ে চেয়ে রইলো কেবল। আযান মির্জা ধীরে ধীরে বিছানার উপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলেন।
—এগুলো মির্জা বাড়ির কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। জমিজমা, বাড়ির হিসাব, কিছু ব্যক্তিগত নথি আর কয়েকটা প্রয়োজনীয় কাগজ আছে এখানে। এগুলো কোথায় কীভাবে রাখা আছে, এতদিন সায়না জানতো। এখন থেকে তুমিও জানবে। কারণ সংসার শুধু রান্নাঘর আর ঘর গোছানোর নাম নয়, আম্মা। একটা বাড়িকে সামলে রাখা, মানুষের প্রয়োজন বোঝা, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া—এসবও সংসারেরই অংশ।
ফাতিহা নির্বাক হয়ে ফাইলগুলোর পানে তাকিয়ে রইলো। এরমধ্যেই আযান মির্জা লকারের চাবিটা তার হাতের তালুতে রেখে দিলেন। ফাতিহার বুকটা যেনো ছ্যাঁৎ করে উঠলো। তড়িঘড়ি করে হাত সরিয়ে নিতে চাইলো।

—বাবা, এটা আমি নিতে পারবো না।
—কেনো?
—কারণ এটা আপনাদের আমানত। আমি… আমি তো এখনো…
কথাটা শেষ করতে পারলো না ফাতিহা। কেননা আযান মির্জা এবার একটু গম্ভীর হলেন। তবে সেই গাম্ভীর্যের ভেতরেও ছিলো পিতৃসুলভ মমতা। তিনি অতি কোমল গলায় ফের আওড়ালেন—-
—আমানত বলেই তো তোমার হাতে দিচ্ছি, আম্মা। আমানত এমন কারও হাতে দেওয়া হয় না, যার উপর ভরসা নেই। আমি আমানত তার হাতেই দিচ্ছি, যাকে আমি চোখ বন্ধ করে ভরসা করতে পারি।
ফাতিহার চোখজোড়া অজান্তেই ভিজে উঠলো।
—কিন্তু বাবা, যদি আমি কোনো ভুল করি?
—ভুল করলে শিখবে। আবার ঠিক করবে। কিন্তু আমি তোমাকে সুযোগই না দিলে তুমি শিখবে কীভাবে?
সায়না মির্জা এতক্ষণ নীরবে সব শুনছিলেন। এবার মৃদু হেসে বললেন—
—নাও আম্মা। তোমার বাবা যখন নিজের হাতে দিচ্ছেন, তখন আর না করো না। আমি এত বছর এই বাড়িটা সামলেছি। এখন আমারও তো একটু নিশ্চিন্ত হওয়ার অধিকার আছে। এটা লকারের চাবি। কাগজপত্র গুলো যথাসময়ে সেখানে রেখে দিয়ো। তোমায় বুঝিয়ে দিবো বলে বের করেছিলাম। লকারে যা আছে সব এখন তোমার দ্বায়িত্বে। এই গহনাগুলো আমার আলমারিতে ছিলো। এসবও নিয়ে যাও।
ফাতিহা শাশুড়ীর পানে তাকালো। সায়না মির্জার চোখে কোনো দ্বিধা নেই। বরং সেখানে যেনো পুত্রবধূরূপে আসা মেয়ের প্রতি অগাধ আস্থা।
আযান মির্জা ফের বললেন—-

—আমি তোমাকে শুধু চাবি বা কাগজপত্র দিচ্ছি না, আম্মা। আমি তোমার হাতে এই বাড়ির দায়িত্ব তুলে দিচ্ছি। এই বাড়ির মানুষগুলোর খেয়াল রাখবে। কে কী চায়, কার কী প্রয়োজন—যতটুকু সম্ভব দেখবে। কোনো সিদ্ধান্ত একা নিতে না পারলে সায়নার সাথে কথা বলবে। আর আমার প্রয়োজন হলে আমাকেও বলবে।
এক মুহূর্ত থামলেন তিনি। ভাবলেন হয়তো কিছু একটা। পরের মুহূর্তেই অতি মিইয়ে যাওয়া গলায় বললেন—-
—আর, সবকিছুর সাথে সাথে আমি তোমায় আমার ছেলের দ্বায়িত্বও দিলাম, আম্মা। মনে রেখো, এটাই হয়তো তোমার সবচেয়ে বড় দ্বায়িত্ব। যা আমি একজন বাবা হয়ে তোমায় দিলাম। আমার ছেলেটাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনো। ব্যাস, এতটুকুই। এরপর ম*রার পরেও আমি শান্তি পাবো।
ফাতিহা ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। সায়না মির্জা আঁচলে চোখ মুছলেন স্বামীর কথায়। বড় অভিমানও জন্মালো স্বামীর প্রতি তার মনে। এ কিরূপ কথাবার্তা? ম*রার কথা কেনো বলবে সে? সায়না মির্জা মুখ ফিরিয়ে নিলেন। বুকটা ভারি হয়ে উঠলো কেমন।
আযান মির্জা অশ্রুসিক্ত নয়নে মাথা নিচু করে থাকা ফাতিহার পানে তাকালেন। মনে পরলো আজ সারাদিনে তিনি নিজ ছেলেকে কিভাবে আবিষ্কার করেছিলেন। কিভাবে হাসিমুখে তার ছেলেটা মসজিদ গিয়ে নামাজ আদায় করে আবার খাবার দিয়ে এলো। কত স্নেহের সহীত বাচ্চাদের পাতে খাবার বাড়লো। আর এতোসব কার জন্য হলো? নিঃসন্দেহে ফাতিহার জন্য!

—তুমি এই বাড়িতে পুত্রবধূ হয়ে এসেছো ঠিকই, কিন্তু আমার কাছে তুমি এখন আর শুধু পুত্রবধূ নও। তুমি আমার মেয়ে। তাই তোমার হাতে দায়িত্ব তুলে দিতে আমার ভয় হয় না, মা।
এক ফোঁটা অশ্রু এবার ফাতিহার গাল বেয়ে নেমে এলো। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো। কাঁপা হাতে চাবিটা চেপে ধরলো। অতঃপর ফাইলগুলোর দিকে তাকিয়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো রমণী। একহাতে তা তুলে নিজের কাছে টেনে নিলো।
—আমি চেষ্টা করবো, বাবা।
আযান মির্জা তৃপ্তির হাসি হাসলেন।
—চেষ্টা নয়। নিজের বাড়ি এটা, তাই করবে।
ফাতিহার বুকটা কেঁপে উঠলো কথাটায়।
নিজের বাড়ি। এই বাড়িটাকে নিজের বাড়ি বলার অধিকার কি সত্যিই সে পেয়ে গেছে? স্বামী নামক মানুষটা কি আদৌও তাকে গ্রহণ করেছে? আর আসিফের’ই বা দোষ কোথায়? সে তো এই বিয়েতে রাজি ছিলো না। সেটা তো আগেই জানতো ফাতিহা। তাহলে কেনো আসিফের উপর দায় চাপাবে?
অজান্তেই ফাতিহার চোখের কোণে আবারও পানি জমলো। সায়না মির্জা উঠে এসে মেয়েটার কাঁধে হাত রাখলেন।
—আজ থেকে এই বাড়ির অনেক কিছু তোমার হাতে, আম্মা। আমার ছেলেটার জীবনটাও কিন্তু তোমার সাথে জড়িয়ে।
ফাতিহা মৃদু হাসলো।
—জি, মা।
আযান মির্জা সন্তুষ্ট চোখে পুত্রবধূর পানে তাকিয়ে রইলেন। বহুদিনের সংসার, বহু বছরের অর্জন—সবকিছুর পর আজ যেনো তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। নিজের ঘরের আমানত তিনি এমন একজন মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন, যার চোখে লোভ নেই, কথায় অহংকার নেই, অথচ দায়িত্ববোধে কোনো কমতি নেই।
ফাতিহা দু’হাতে ফাইলগুলো আগলে ধরলো। লকারের চাবিটা মুঠোয় শক্ত করে রাখলো।
এই ছোট্ট ধাতব চাবিটা যেনো তার কাছে শত কেজি ওজনের এক পাথর অনুভূত হলো। যার ওজন বহন করতে ফাতিহা প্রায় মিশে যাচ্ছে মাটির সাথে। তবে সে হাল ছাড়বে না। কখনো না।

গুটিগুটি পায়ে নিজের ঘরের সামনে আসতেই ভ্রু কুঁচকে যায় ফাতিহার। সে তো ঘরের দরজা আঁটকে দিয়ে গেছিলো। তবে এখন এরূপ মেলানো কেনো? আসিফ ফিরেছে? মনের মধ্যে খানিক আশংকা নিয়েই নিজের ঘরে পা রাখলো রমণী। তবে পা রাখতেই খানিক চমকে গেলো। বিছানায় বসে আছে আসিফ। মাথায় দু’হাত চাপানো। একদম নুইয়ে মাটির পানে তাকিয়ে। ফাতিহার ভ্রু কুঁচকে গেলো। সে হাতের ফাইল ও গহনাগুলো টেবিলে রাখলো। শুকনো ঢোক গিলে এগিয়ে এলো স্বামীর অভিমুখে। অতন্ত্য ক্ষীন আওয়াজে ডেকে উঠলো রমণী—-
—শুনছেন! কি হয়েছে আপনার? ঠিক আছেন?
ফাতিহার প্রশ্ন করলেও বিপরীতে কোন প্রতিত্তর করে না পুরুষটি। কেমন এক দৃষ্টিতে মেঝের পানে তাকিয়ে। ফাতিহা এবার ভিষন অবাক হয়। সে ফের ডাকে—
—কি হলো? কথা বলছেন না কেনো? ঠিক আছেন?
এবার আসিফ বেশ রয়েসয়েই মুখ তুলে তাকালো স্ত্রীর পানে। আর সে তাকাতেই আচমকা স্বামীর দৃষ্টিতে থমকায় ফাতিহা। শিরদাঁড়া বেয়ে নামে শীতল স্রোত। ঘেমে ওঠে কপোল। আসিফের দৃষ্টি অতন্ত্য তীক্ষ্ণ, বরফশীতল। শরীরে কাঁপুনি দেওয়ানোর মতো। যা ফাতিহার কাছে বড্ড ভয়ংকর ঠেকলো। শুকনো ঢোক গিলে দু’পা পিছিয়ে গেলোল সে। আসিফের চোখের কোণ লাল। কপালে শিরা কেমন ফুলে আছে। তবে কেনে? আসিফের এই অদ্ভুত রূপের কারণ কি? ফাতিহা বুঝলো না। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইলে মাত্র।

—ক…কি হয়েছে আপনার?
—তুমি আমার সামনে পর্দা করো কেনো?
আকস্মিক এতোদিন বাদে একদম হুট করেই অনাকাঙ্ক্ষিত এই প্রশ্নে নিজের জায়গায় জমে গেলো রমণী। হাত ফসকে চাবিখানা পরে গেলো মেঝেতে। এতোক্ষণের ভয় খানিকটা কমে সেখানে জন্ম নিলো অজানা আশংকা। বুকের ভেতরটা অজান্তেই মোচড় দিয়ে উঠলো৷ গলা শুকিয়ে কাঠ। চোখের পলকও ফেলাতে পারলো না আর। বরং অদ্ভুত এক স্থিরতায় থমকে গেলো সে।
অন্যদিকে ফাতিহার দিকে সুক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যুবক। তার কথায় ফাতিহার হাত থেকে চাবি পরা থেকে শুরু করে তার চোখের স্থির চাহুনি সবটায় লক্ষ করলো আসিফ। কুঞ্চিত ভ্রু যুগল কুঁচকে গেলো দ্বিগুন। আগের তুলনায় দৃষ্টি আরো শীতল হয়ে উঠলো। ফাতিহা তখনো ফ্যাল ফ্যাল করে বোবার ন্যায় তাকিয়ে আছে। যা দেখে আসিফ নিজের খেই হারিয়ে বেশ কড়া স্বরেই ফের আওড়ালো—–

—মেনে নিলাম তুমি অতন্ত্য ধার্মিক একজন নারী। ধর্মের ব্যাপারে তুমি ভিষন পজেসিভ। অ্যান্ড আই হ্যাভ নো প্রবলেম অ্যবাউট দ্যাট। তুমি পর্দা করো, আমি বারণ করছি না এটা করতে। বাট তুমি আমার সামনে কেনো পর্দা করো? চোরের মতো কেনো থাকো সবসময়?সমস্যা কি তোমার?কি লুকাচ্ছো আমার থেকে?অ্যান্সার মি ফাকিং বুলশিট!
এক ঝটকায় বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো আসিফ। ফাতিহা চমকে পেছনে সরে গেলো। তবে ঠিক সুবিধে করে উঠতে পারলো না। খেই হারিয়ে ওভাবে সরে যাওয়ার ফলে আচমকা পিঠ গিয়ে ধাক্কা খেলো আলমারিতে। মুখ দিয়ে অস্ফুট আর্তনাদ বেড়িয়ে এলো রমণীর। ওড়নার একাংশ শক্ত হাতে চেপে ধরলো। চোখের কোণে জমলো পানি। তবে আসিফ সেদিকে পাত্তা দিলো না আজ। সে এগিয়ে এলো। একদম ফাতিহার সম্মুখে। ফাতিহা তখনো লেপ্টে আছে আলমারির সাথে৷ আসিফ ঝুঁকে এলো। দু’হাতে মাঝখানে পিন করে নিলো ফাতিহাকে। ফাতিহার বুকের ধুকপুকানি বাড়ে। ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। আসিফের চোখের দৃষ্টি গাঢ়, ঠান্ডা আর অদ্ভুত ভয়ংকর।

—কেনো? হু!
—আ….আমি…!
—হ্যাঁ, বলো?কাম অন!
ভিষন উতলা হয়ে ওঠে আসিফ। ফাতিহা তার পানে তাকিয়ে কাঁপতে থাকে।
—আ…আমি….আসলে..
ফাতিহার গলা কাঁপলো। তবে উত্তর করতে পারলো না ঠিক। আসিফের আগুনের ন্যায় উতপ্ত নিশ্বাস ওড়নার ফাঁক গলিয়ে তার মুখে গিয়ে লাগলো। ফাতিহার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে। আসিফের দৃষ্টি তখনো তার ধূসর রঙা আঁখির পানে। ফাতিহার থেকে উত্তর না পেয়ে তাচ্ছিল্য হাসলো আসিফ। হুট করেই সরে এলো ফাতিহার কাছ থেকে। অতঃপর দু’হাতে তালি দিতে দিতে আওড়ালো—-
—বলতে পারবে না, রাইট? জানি পারবে না। তবে আমি জানি কেনো তুমি এমনটা করো। কেনো এবাড়ির বউ হয়ে এসেছো যেখানে তুমি জানতে আমি বিয়েটাতে রাজি ছিলাম না। বলবো কেনো?
ফাতিহার বুক কাঁপে। গলার কাছে সকল কথা এসে দলা পাকিয়ে যায়। চোখের পানি টলমল করছে সেখানে। কম্পনরত ওষ্ঠযুগল নাড়িয়ে সুধায়—-

—জ…জানেন?
—হ্যাঁ জানি!
কেঁপে উঠল রমণী। কি জানে আসিফ? কিসের কথা বলছে? মনের মধ্যে অজানা আশংকা নিয়ে ফের সুধায়—-
—কে…কেনো করছি এমনটা?
আসিফ এবার আগের তুলনায় আরো জোড়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে থাকে৷ যা দেখে কলিজা ছিঁড়ে যেতে থাকে ফাতিহার। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সামলায়। আর এরমধ্যেই আসিফ তার আঙুল তোলে। সোজা তাক করে টেবিলে রাখা গহনা-ফাইলগুলোর পানে। আর সেই মুহূর্তেই ফাতিহার পৃথিবী থমকে যায়। পরে যেতে চায় মেঝেতে। অদ্ভুত ভাবে জোড় হারায় নিজের শরীরের। আসিফ তখনো হাসছে। তার ঠোঁটের কোণায় তাচ্ছিল্যের হাসি দেখে ফাতিহা ভাষা হারিয়ে ফেলে৷

—ইয়েস। এটাই কারণ। তুমি এবাড়িতে এসেছিলো শুধুমাত্র এসবের জন্য৷ আর আমার সামনে লুকিয়ে থাকতে যাতে আমি তোমায় ধরতে না পারি। তুমি সকলকে তোমার ওই ইনোসেন্ট ফেস দিয়ে বশ করতে পারলেও আমাকে পারতে না। এতে ভবিষ্যতে তোমার পালাতেও সুবিধে হবে। আমার মা-বাবা তো অতন্ত্য দয়ালু মানুষ। তবে আমি তো নয়। আর তাই জন্যই তুমি আমার থেকে লুকিয়ে থাকতে, রাইট? হাহ!
আসিফ ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো। ফাতিহা বিমুঢ় হয়ে রইলো। কি বলবে, কি বলা উচিত বুঝে উঠতে পারলো না আর। আদৌও কি তার কিছু বলার আছে?
ফাতিহা মাথা নুইয়ে নিলো। চোখের সামনে সবকিছু কেমন ঝাপসা দেখছে। মাথা ঘুরছে। বুকটাও পুড়ছে ভিষন। তন্মধ্যে রমণী খেয়াল করলো আসিফ তার পানে এগিয়ে আসছে। তার পা ধীরে ধীরে এসে থামলো তার পানে। ফাতিহা মাথা তুললো না। আসিফ তার পানে সেই একই দৃষ্টিতে তাকিয়ে শেষ বারের মতো আওড়ালো—-
—তুমি যেই খেলাটা খেলেছো সেটা তোমার জন্যই বেশ ভারী পরবে ফাতিহা নূর। তোমার এই পর্দার খেলা আমি খুব শীঘ্রই শেষ করবো। অ্যান্ড আই মিন ইট, লোভী কিট….।
আসিফ শেষ বারের মতো ঘৃণিত চোখে তাকিয়ে গটগট পায়ে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যায়। ফাতিহা মাথা তুলে তাকায় না। আলমারির গা ঘেঁষে সেখানেই হাঁটুতে বসে পরে ধপ করে৷ নোনা পানি ভিজিয়ে দেয় হাতের পৃষ্ঠভাগ। ঠোঁট কামড়ে ধরে রমণী। বিরবির করে আওড়ায়—-

—আমি সত্যিই অপরাধী। কেননা আমি আপনার জন্য চুরি করেছি। ওই যে কথায় বলে না! যার জন্য করি চুরি সেই বলে চোর! সেই দশা আজ আমার।
অন্যদিকে আসিফ।
গটগট পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। তীব্র রাগে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে তার। মনে হচ্ছে সবটা ধংস করে ফেলতে। তখন বাড়িতে পৌঁছে ফাতিহাকে না পেয়ে আগ্রহ বশত সে এগিয়ে গিয়েছিলো বাবার ঘরের পানে৷ আর গিয়ে যখন দেখলো এতো এতো গহনাসহ লকারের চাবি—যেখানে মির্জা পরিবারের সকল সম্পত্তি রাখা আছে, এতো গুলো ইম্পর্ট্যান্ট ফাইল সব ফাতিহার হাতে তুলে দিলো আর ফাতিহা তা নিয়ে ফিরে এলো—তখন আসিফ আর নিজেকে সামলাতে পারেনি। তার মনে পরলো সেদিন রেস্টুরেন্টে তার বন্ধুদের কথাগুলো। তাহলে সত্যিই ফাতিহা তার থেকে আড়াল থাকে নিজেকে বাঁচাতে। যেনো সে তার কাছে ধরা না পরে। এ বাড়িতে বউ হয়ে এসেছে টাকার লোভে। যা আসিফ মানতে পারেনি। অদ্ভুতভাবে এই কথাগুলো তার মস্তিষ্কে হানা দিতেই সবকিছু ধংস করে দিতে ইচ্ছে করছে৷ ফাতিহা কিভাবে এটা করতে পারলো—এটা আসিফ মানতে পারছে না।

তাকদিরে তুমি পর্ব ২১

বড়বড় পা ফেলে আসিফ শক্ত চেহারায় এসে থামলো বাগানে। চারিদিকে তখন অন্ধকারের ছেয়ে গেছে। সূয্যিমামা ডুবেছে কবেই। আসিফ ধপ করে বাগানের দোলনায় বসে পরলো। মাথা এলিয়ে দিয়ে তাকালো শূন্যে। না চাইতেই বুকে তার জ্বলন হচ্ছে। বড্ড যন্ত্রণা হচ্ছে, যা আসিফ পেতে চায় না।
—তোমাকে আমি ছাড়বো না ফাতিহা। ছাড়বো না, নেভার।
দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলো বলে পকেট হতে সিগারেট বের করে ঠোঁটের ফাঁকে চেপে ধরে আসিফ। লম্বা শ্বাস টেনে ধোঁয়া ছাড়ে শূন্যে।

তাকদিরে তুমি পর্ব ২৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here