Home শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৭

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৭

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৭
‎আফীফা আফনান

রাতের দ্বিপ্রহর। চরাচরজুড়ে এখন নিঝুম নিস্তব্ধতা। শহরের কোলাহল থমকে গিয়ে কেবল দূরের কোনো পাহারাদারের বাঁশির সুর আর হিমেল বাতাসের শনশন শব্দ ভেসে আসছে।
​তবে মায়াপুর অ্যাপার্টমেন্টের তিনতলার বারান্দায় মেহুলের চোখের কোনে ঘুম নেই। বরং তার চোখে হালকা পাওয়ারের চশমা, আর কোলে খোলা একটি ডায়েরি। বিগত কয়েকদিন ধরে হসপিটালের ব্যস্ততা আর পুঁচকুর শরীর খারাপের কারণে ডায়েরিটা ধরে দেখাই হয়নি। তাই এই নির্জন মাঝরাতে ঘুম না আসার সুযোগে সময়ের সুব্যবহার করতেই সে ঝুলবারান্দার বেতের চেয়ারটায় এসে বসেছে।

​মেহুল ধীরহাতে একে একে বিগত দিনগুলোর বিশেষ কিছু মুহূর্ত কলমের প্রতিটি আঁচড়ে বন্দি করে চলেছে। কখনো হাসিখুশি কোনো স্মৃতি মনে পড়ে ঠোঁটের কোণ প্রসারিত হচ্ছে, আবার কখনো হুট করে হাসপাতালে ঘটে যাওয়া কোনো গা শিউরে ওঠা জটিল কিছুর বর্ণনায় কপাল কুঁচকে উঠছে।
​একসময় সে নিশ্বাস ফেলে ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল। চশমাটা খুলে পাশে রেখে তার স্নিগ্ধ দৃষ্টি মেলে ধরল তারায় ভরা খোলা আকাশের দিকে। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত আর পথের বাঁকে অজস্র স্বার্থপর মানুষের ভিড়েও যে ডক্টর ফেরদৌস, নার্স ললিতা কিংবা হুমার মতো কিছু নিঃস্বার্থ আপন মানুষ খুঁজে পেয়েছে—এই উপলব্ধিটাই যেন গভীর রাতে তার মনে এক টুকরো স্বর্গীয় প্রশান্তি ছড়িয়ে দিচ্ছে।

​ঠিক সেই মুহূর্তেই তার পাশে রাখা ফোনটা কাঁপুনির সাথে মৃদু টুং শব্দে নোটিফিকেশন জানান দিল। শব্দ হতেই ​মেহুল মোবাইলটা হাতে নিতেই দেখতে পেল স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে তার সুখ দুঃখের পরম সাথী মিনারের মেসেজ—
‘জেগে আছিস?’

​মেহুল এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা ভিডিও কল দিল। স্ক্রিন জুড়ে কলের রিং হতেই ওপাশ থেকে মিনার হাসিমুখে রিসিভ করল। মেহুলকে দেখেই ​মিনার নিজের দুষ্টামির স্বভাব বজায় রেখে চুলে হাত চালাতে চালাতে স্টাইল করে ভ্রূ নাচিয়ে শুধাল,

—”কীরে, না ঘুমিয়ে এত রাতে বারান্দায় বসে কী করিস, হ্যাঁ? সামথিং, সামথিং! হুমমমম……”

​মেহুল ফোনটা একটু উঁচুতে ধরে মৃদু হেসে বলল,— “নাথিং ব্রো! ঘুম আসছিল না, তাই এমনি বারান্দায় বসে খোলা বাতাস উপভোগ করছি।”

​মিনার গলার স্বর একটু খাদে নামিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, “হুম… তো আমার সিস্টারের চোখে এত রাতেও ঘুম আসছে না কেন? খুব বেশি প্রেসার পড়ে নাকি হাসপাতালে?”

​মেহুল গা এলিয়ে দিয়ে বলল, “তা একটু পড়েই। সারাদিন দৌড়াদৌড়ি, তার ওপর পেশেন্টদের তদারকি! তা তুই না ঘুমিয়ে এত রাতে কেন জেগে, শুনি? সকালে অফিস নেই?”

​মিনার পেছনের গুছিয়ে রাখা কিছু জামাকাপড় ও ল্যাপটপ ব্যাগের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “রুমের কিছু জিনিসপত্র গোছগাছ করছি। কাজটা শেষ করেই ঘুমাব।”

​মেহুল কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করল, “গোছগাছ? কোথাও যাবি নাকি তুই? কোনো ট্যুরে যাচ্ছিস নাকি? তাহলে তো মিস করলাম।”

​মিনার একরাশ আক্ষেপ নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “কই আর ট্যুর ! তুই ঢাকা ছেড়ে রাজশাহী যাওয়ার পর থেকে আমাদের আর কোনো ট্যুরই জমে না। ভেবেছিলাম তুই ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প শেষ করে এলে আমরা কত জায়গায় যাব, কত ঘুরব! কিন্তু তুই তো হুট করে ওখানেই আটকে গেলি।”

​মেহুল কিছুটা বিষণ্ণ হেসে বলল, “কী করব বল, ব্যাড লাক! আচ্ছা… তোকে যে একটা বিষয়ে খোঁজ নিতে বলেছিলাম, খবর নিয়েছিস? আমার হুট করে এখানকার হসপিটালে বদলি হওয়ার আসল কারণটা কী?”

হঠাৎ মেহুলের কথাতে ​মিনারের মুখের সেই হাসি হাসি ভাবটা মুহূর্তেই উবে গেল। সে স্ক্রিনের দিকে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে বলল, “হুম… খোঁজ তো নিয়েছিলাম। তবে বিশেষ কিছু আর জানতে পারলাম না।”

​মেহুল চমকে উঠে শরীরটা সোজা করল, “কিছুই জানতে পারিসনি তাহলে?”

​মিনার একটু ইতস্তত করে নিচু কণ্ঠে বলল, “সরাসরি কিছু বের করা যায়নি রে মেহু। শুধু এটুকুই জানতে পারলাম যে… মানে রাজনৈতিকভাবে কারো সুপারিশে আর সেই ব্যাক্তিই নাকি প্রেসার ক্রিয়েট করে তোকে ওই জায়গায় বদলি করেছে। কিন্তু আদো এটা কতোটুকু সত্য জানা নেই।”

​কথাটা শুনতেই মেহুলের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল! চশমার পেছনের ডাগর চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল তার।
​”রাজনৈতিক প্রেসার?”—মেহুল থমকে গিয়ে বলতে লাগল, “কে রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখাবে ভাই? আমাদের পরিবারে বা গুষ্টিতে তো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডের কেউ-ই নেই! আর হাজারটা ডাক্তারের ভিড়ে তারা আমাকেই কেন টার্গেট করল?”

​মিনার ল্যাপটপটা বন্ধ করে চিন্তিত ভঙ্গিতে কপালে হাত দিয়ে বলল, “সেটাই তো আমিও ভেবে পাচ্ছি না মেহু! তোর মতো এক শান্ত-শিষ্ট লেজ বিশিষ্ট ডাক্তারের পেছনে কোন মানুষ হাত ধুয়ে লেগেছে… এটাই এখন সবচেয়ে বড় ধাঁধা!”

মেহুল চোখ রাঙালো, “মিনারের বাচ্চা!”

“সরি সরি!” মিনার হেসে উঠলো।

অতঃপর মেহুল মিনারের মুখের দিকে তাকিয়ে কৌতূহল নিয়ে শুধাল, “তা কোথায় যাবি তুই?”

​মিনার ফোনের ক্যামেরাটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে গুছানো স্যুটকেসটা দেখিয়ে বলল, “দুবাই যাচ্ছি রে, বিজনেস পারপাসে। আমি আর ইকবাল আঙ্কেল।”

​মেহুল হালকা চমকে উঠে বলল, “বাবাও যাচ্ছে?”

​”হুম।”

​”কয়দিন থাকবি ওখানে?”

​মিনার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “সঠিক বলতে পারছি না, যতদিন আঙ্কেল থাকেন আর কি! কেন, তোর কি কথা হয় না খালুর সাথে?”

​মেহুল কিছুটা লজ্জিত ভঙ্গিতে কপালে হাত দিয়ে বলল, “আজ সারাদিন আর কথা বলা হয়ে ওঠেনি। বাবা বিকেলে কল করেছিল ঠিকই, কিন্তু আমার ফোনে তখন চার্জ ছিল না। পরে নিজের নানাবিধ ব্যস্ততায় আর কল ব্যাক করতে ভুলেই গেছি!”

​মিনার আলতো হেসে বলল, “হুম, বুঝতে পেরেছি। এজন্যই হয়তো আজ রাতে রাতের খাবারের টেবিলে খালু তোর কথা বলছিলেন।”

​মেহুল মন খারাপ করে বলল, “তাই নাকি, তাহলে সকালে উঠে আগে বাবাকে কল করব…। আচ্ছা, মনি কোথায় রে? ঘুমিয়ে গেছে নিশ্চয়ই?”

​”আছে তো, কথা বলবি নাকি তোর মনির সাথে?”—মিনার এটুকু বলতেই পাশ থেকে চট করে একজন মিনারের হাত থেকে ফোনটা একপ্রকার কেড়ে নিল!

​”আরে! দে তো মোবাইলটা আমার কাছে! তোদের ভাই-বোনের কথা আর শেষ হবে না।”—স্নেহমাখা এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ফোনে।

​পর মুহূর্তেই ভিডিও কলের স্ক্রিন থেকে মিনারের অবয়ব সরে গিয়ে ফুটে উঠল মেহুলের একমাত্র আপন ও আশ্রয়স্থল—খালামণি মিনারা বেগমের শান্ত ও মায়াবী মুখখানা।

​মিনারা বেগম মিষ্টি করে হেসে পরম মায়ায় বলে উঠলেন, “কেমন আছিস রে মা আমার?”

​মেহুলের মনটা মুহূর্তের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে ভরে উঠল। সে সশ্রদ্ধ হেসে ধীরস্বরে বলল, “আমি ভালো আছি মনি। তুমি কেমন আছো? তোমার শরীর কেমন আছে মনি?”

​মিনারা বেগম এক বুক গভীর নিশ্বাস ফেলে স্ক্রিনে মেহুলের মুখের ওপর হাত ছুঁইয়ে আদরের ভঙ্গিতে বললেন, “এই তো মা… একরকম আছি। তোকে খুব মনে পড়ে রে সোনা…”

​মেহুল নরম গলায় উত্তর দিল, “আমিও তোমাকে খুব মিস করি, মনি।”

​”কবে ফিরবি বাড়িতে?” মিনারা বেগমের কণ্ঠে এক ব্যাকুল মায়ের আকুতি।

​মেহুল আশ্বাস দিয়ে বলল, “ছুটি নিয়ে খুব দ্রুত যাওয়ার চেষ্টা করব মনি।”

​মিনারা বেগম এবার চোখ দুটো উজ্জ্বল করে কৌতূহলী কণ্ঠে শুধালেন, “তা… আমাদের নতুন মেহমান কোথায় রে? কেমন দেখতে সে?”

​মেহুল একলহমায় ভীষণ অবাক হয়ে গেল, “কর কথা বলছো? কোন নতুন মেহমানের কথা বলছ মনি?”

​”কেন রে? আমাদের নাতনি!”

​মেহুল কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে রইল। মনের ভেতরে ধক করে একটা অজানা ধুকপুকানি শুরু হলো। অতঃপর সে ঢোক গিলে ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করল, “মিনার তোমাকে সব বলেছে তাই না, মনি?”

​মিনারা বেগম হালকা হেসে চটপট করে বললেন, “কেন, বারণ ছিল বুঝি বলতে?”

​”তেমনটা নয় মনি…”

​”তবে কেমন?”

​মেহুল মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বলল, “ভেবেছিলাম তোমরা জানতে পারলে যদি অন্য কিছু ভাবো… বা মেনে না নাও…”

​মিনারা বেগম ভিডিও স্ক্রিনেই একচিলতে মিষ্টি ও মায়াবী হাসি হাসলেন, “বোকা মেয়ে আমার! এতে কিছু মনে করার বা না মানার কী আছে রে? কারও ‘মা’ হওয়া কি অতটা সোজা কথা? একটা অনাথ, মা-হারা, আশ্রয়হীন বাচ্চাকে টেনে নিয়ে আপন করে বুকে তুলে নেওয়া কি চাট্টিখানি ব্যাপার? কজনই বা পারে এমনটা করতে!”

​মেহুল আনমনে অস্ফুটে বলে উঠল, “আমার মতো… তাই না মনি?”

​আকস্মিক মেহুলের মুখ থেকে বের হওয়া এই তীব্র বাস্তব কথাটায় মিনারা বেগম একমুহূর্তের জন্য পুরোপুরি চুপসে গেলেন। বুকের গহীনে পুরোনো এক করুণ অতীত মোচড় দিয়ে উঠল। তবে পরক্ষণেই সামলে নিয়ে ঠোঁটের কোণে মায়াবী হাসি ফুটিয়ে তিনি বলে উঠলেন, “ছাড় এসব, তা আমার নাতনিকে একটু দেখা না মেহু! কেমন দেখতে, একটু দেখি?”

“সত্যি দেখবে মনি?”​

মিনারা হেসে তার জবাব জনালো, যা দেখেই মেহুল ঠোঁট কামড়ে হাসিমুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে সোজা ঘরের দিকে পা বাড়াল। খাটের পাশে এসে সে ভিডিও কলের ব্যাক ক্যামেরা অন করতেই কাঠের ছোট দোলনাটায় পরম শান্তিতে ঘুমানো নিষ্পাপ পুঁচকুর চেহারাটা ফুটে উঠল স্ক্রিনে।
​মিনারা বেগম আবেগপ্লাবিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, “মাশাআল্লাহ! কী যে সুন্দর লাগছে একদম যেন পরি! তার কী নাম রেখেছিস মেহু?”

​মেহুল মৃদু হেসে বলল, “এখনো রাখি নি মনি। এমনিতে হুমা ওকে ভালোবেসে ‘পুঁচকু’ বলে ডাকে, তাই ওই নামেই ডাকছি সবাই।”

​”ওমা! এটা কেমন কথা? এখনো নাম রাখিসনি! এত সুন্দর একটা বাচ্চার তো একটা ফুটফুটে মিষ্টি নাম রাখা দরকার।”

​মেহুল ভাবনায় পড়ে গেল। আসলেই তো! আর কত দিন বাচ্চাটা একটা নাম ছাড়া এভাবে থাকবে? এবার ওর জন্য একটা বড্ড সুন্দর, অর্থপূর্ণ নাম তো রাখাই যায়!
অতঃপর ভাবনার মাঝেই ​বাচ্চার ঘুমে পাছে ব্যাঘাত ঘটে, তাই মেহুল বাধ্য হয়ে আবার পা বাড়াল বারান্দার দিকে। এরপর মিনারা বেগম ও মিনারের সাথে আরও বেশ কিছু সময় হাসিগল্প আর টুকটাক আড্ডা হলো। একপর্যায়ে রাত ক্রমশ গভীর হতে থাকায় মেহুল ভালো থাকার শুভকামনা জানিয়ে মিষ্টি হেসে কলটা কেটে দিল।

এদিকে ​আজ যেন কত দিন পর মেহুলের বুকের ওপর জমা হয়ে থাকা এক অদৃশ্য পাথর নেমে গেল! মনটা হালকা লাগছে ভীষণ। হয়তো পরম মমতাময়ী মিনারার সাথে কথা বলারই সুফল এটা। মেহুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে খোলা বাতাসে গভীর একটা নিশ্বাস নিল।
​অতঃপর মোবাইলের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিয়ে শোবার উদ্দেশ্যে দরজার দিকে পা বাড়াবে—ঠিক তখনই তার চোখ চলে গেল নিচে!

সোজাসুজি তার বারান্দার ঠিক বিপরীত কোণের নির্জন রাস্তার ধারের ল্যাম্পপোস্টটার দিকে!
​চোখ পড়তেই মেহুলের চোখ দুটো বিস্ময়ে ও আতঙ্কে বড় বড় হয়ে আসার উপক্রম হলো! কারণ… নিচে সেই নিঝুম রাস্তায় শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং সালমান শাহ নেওয়াজ!
​তার চাইতেও শত গুণ বেশি অবাক আর থমকে যাওয়ার বিষয়—লোকটা সোজা আটতলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে এবং মেহুলের দিকে চেয়ে হালকা হাতে আঙুল নাড়িয়ে ইশারা করছেভ! যেন সে আগে থেকেই শতভাগ নিশ্চিত ছিল যে মেহুল এই গভীর রাতে ঠিক এই বারান্দাটাতেই বসে আছে!

এদিকে মেহুল অবাক হতবাক, কারন লোকটা এত রাতে নিঃশব্দে এখানে এলো কীভাবে তা তার মাথায় প্রবেশ কছে না? মেহুল যখন থেকে বারান্দায় বসেছে, এ পর্যন্ত নিঝুম রাস্তায় তো কোনো গাড়ির শব্দ মেলেনি! গাড়ি গেলে স্পষ্ট ইঞ্জিন বা চাকার ঘর্ষণের শব্দ পাওয়ার কথা ছিল। তাহলে ​হঠাৎই কি ভেবে মেহুলের চোয়াল যেন প্রায় ঝুলে পড়ল! বুকের ভেতর অজানা এক আশঙ্কার হিমস্রোত বয়ে গেল—তবে কি লোকটা আরো আগেই এখানে এসেছে আর সেই গভীর রাত থেকে এভাবে নিচে একদৃষ্টে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রয়েছে…?

হঠাৎ মেহুলের মনে পড়ে গেল—ঠিক এমন দৃশ্য সে আরও একদিন দেখেছিল! তবে সেদিন আবছা আলোয় ভালো করে বুঝে উঠতে না পেরে মনের ভুল ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ? আজ তো কোনো সন্দেহ নেই! লোকটা সশরীরে দাঁড়িয়ে, সরাসরি চোখ মিলিয়ে হাত নাড়িয়ে নিজের স্পষ্ট উপস্থিতি জানান দিচ্ছে—যেন তার মনে বা হৃদয়ে কোনো ধরনের ভয়ডর কিংবা দ্বিধার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই।

অপরদিকে ​মেহুলের মনে হাজারটা প্রশ্ন দানা বাঁধতে লাগল। কে এই লোক? কি চায়? আর এভাবে মাঝরাতে ছায়ার মতো তার পিছু নেওয়ারই বা মানে কী?

​নাঃ! আর চুপ থাকা সম্ভব নয়। আজ এই মুহূর্তে সব সত্যি সামনে আনতেই হবে!
​মেহুল আর এক মুহূর্ত কালবিলম্ব করল না। সে দ্রুত বারান্দা থেকে ঘরে ফিরে এলো। ঘুমন্ত হুমা আর পুঁচকুর দিকে একবার নজর বুলিয়ে, নিজের সুতি ওড়নাটা গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে নিল। তারপর ড্রয়ার থেকে ছোট টর্চলাইটটা হাতে নিয়ে একদম নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল অ্যাপার্টমেন্টের গেট পেরিয়ে নিচে নামার উদ্দেশ্যে।

​অপরদিকে, নিঝুম রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিচে নিজের কালো চকচকে গাড়িটার গায়ে একহাতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সালমান শাহ নেওয়াজ। মুখে তার সেই চিরচেনা প্রখর ও রহস্যময় প্রশান্তি। যেন সে আগে থেকেই আক্ষরিক অর্থে জানত—তার জীবনের এক ও একমাত্র অপ্সরা সব শঙ্কা ভুলে সোজা নিচে নেমে আসবে!

​ঘটেছিলও ঠিক তাই। প্রায় পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে অ্যাপার্টমেন্টের ভারি মেটাল গেটটা হালকা শব্দে খুলে গেল। প্রাঙ্গণ পেরিয়ে সোজা সালমানের মুখোমুখি এসে থামল মেহুল।
​চকমকে টর্চের আবছা আলোয় মেহুলের সেই রাগে ও কৌতূহলে থমথমে মুখটা দেখে সালমানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা, মোহিত হাসি ফুটে উঠল।
​মেহুলকে নিয়ে এ পর্যন্ত সে যা যা শুনেছিল—আর নিজে মেয়েটাকে দেখে যা অনুধাবন করেছে সে ঠিক হুবহু তেমনই! এই যেমন বুকের ভেতর একবুক অকল্পনীয় সাহস আর জেদ না থাকলে কি আর এমন গভীর রাতের অন্ধকারে ঘর ছেড়ে একা অচেনা পুরুষের মুখোমুখি হতে আসে?

​সালমান ধীরপায়ে এক পা এগিয়ে এলো। তার প্রখর ও গাঢ় দৃষ্টি মেহুলের চোখে রেখে নিচু ও গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “এত রাতে ঘুম না বাড়িয়ে সোজা আমার কাছে চলে এলেন, ডক্টর? এমন নির্জন রাতে একটা অচেন পুরুষকে এভাবে দেখতে আসা কিন্তু বড্ড বিপজ্জনক…”

সালমানের ওই ধৃষ্টতাপূর্ণ কথা শুনে মেহুলের সুন্দর কপাল জুড়ে গভীর বিরক্তির ভাঁজ পড়ল। সে দুই ভ্রূ কুঁচকে তীব্র অসন্তোষ নিয়ে লোকটার দিকে তাকাল।
​এই লোকটা যে আস্ত একটা রহস্যের জ্যান্ত ভান্ডার, তা এখন একদম দিনের আলোর মতো স্পষ্ট! কোনো কোনো দিন হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই আবোল-তাবোল আর উদ্ভট সব কথা বলে তাকে চরম বিভ্রান্তির সাগরে ভাসিয়ে দেবে, আবার কখনো বিপদের চরম মুহূর্তে হুট করে অলৌকিক ভাবে উদয় হয়ে ত্রাণকর্তার মতো বাঁচিয়ে নেবে। এই তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, ভরসন্ধ্যায় নির্জন রাস্তায় অচল ক্যাব থেকে নামার পর তাকে কীভাবে নিঃশব্দে উদ্ধার করে আনল! আর এখন? এই গভীর রাতে সশরীরে তার অ্যাপার্টমেন্টের নিচে গাড়ি ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে একেবারে অবলীলায় তাকে টিজ করছে!

​মেহুল নিজের রাগ আর চরম বিভ্রান্তি একসাথে চেপে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার বুকটা ক্ষোভে ওঠানামা করছিল, কিন্তু চেহারায় সে বিন্দুমাত্র ভয়ের ছাপ প্রকাশ পেতে দিল না। চশমার পেছনের তীক্ষ্ণ চোখ দুটোতে লোকটার প্রতি জমে থাকা একরাশ প্রশ্ন আর বিরক্তি ফুটিয়ে মেহুল এক পা এগিয়ে এলো।
​সে বাঁকা চোখে টর্চলাইটের আলোটা সামান্য নিচে নামিয়ে, সোজা সালমানের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় ও বরফশীতল কণ্ঠে বলে উঠল—
​”আপনার সমস্যাটা ঠিক কোথায়, বলুন তো? সন্ধ্যায় ভদ্রলোকের মতো হেল্প করে হিরো সাজলেন, আর এখন গভীর মাঝরাতে চোরের মতো অন্যের বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে থেকে এমন আচরণ করছেন! আপনার এই রহস্যময় নাটকের মানে কি?”

মেহুলের মেজাজ চড়ে যাওয়া কড়া কথার বিপরীতে সালমান কোনো বিরক্তি দেখাল না, কেবল ঠোঁটের কোণে নিঃশব্দে এক চিলতে মোহিত হাসি ফোটাল।
যা তেখে ​মেহুল আরো চটলো তড়িঘড়ি করে এক পা এগিয়ে এসে ক্ষোভ চেপে শুধাল, “হাসছেন কেন? আপনি আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের নিচে ঠিক কী করছেন, তা-ও আবার এই গভীর রাতে? আর সবচেয়ে বড় কথা—আপনি জানলেন কী করে যে আমি এখানে থাকি? তার মানে কি…”

​বলতে বলতে মেহুলের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় হঠাৎ সজাগ হয়ে উঠল! গত কয়েক দিন ধরে সে প্রায়ই অনুধাবন করত—কার যেন এক অদৃশ্য, গভীর ও প্রখর নজর সর্বদা তাকে ছায়ার মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে! কেউ তাকে নিরন্তর পর্যবেক্ষণ করছে।

অতঃপর ​মেহুল ভ্রূ দুটো সাংঘাতিকভাবে কুঁচকে সোজা সালমানের গভীর চোখের দিকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে বলে উঠল, “তাহলে কি এতদিন ধরে আমার ভাবনাই সঠিক ছিল? আপনি… আপনিই আমাকে সার্বক্ষণিক ফলো করছেন? আপনিই সেই লোক যে আমাকে স্টকিং করছেন?”

“যদি বলি হ্যাঁ তাহলে কি রাগ করবেন?” সালমান দুষ্টামির ছলে বলে উঠলো।

“স্টকিং আইনগত ভাবে অপরাধ, আমি পুলিশে অভিযোগ করতে পারি আপনার নামে সেটা জানেন নিশ্চয়!” মেহুল হুঙ্কার ছাড়লো।

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৬

​সালমানের হাসির রেখাটা এবার একটু গাঢ় হলো, তবে সেই হাসিতে উপহাস ছিল না—ছিল এক অচিন্ত্যনীয় প্রগাঢ় অধিকারবোধ। অতঃপর
​সে ধীরপায়ে মেহুলের আরও এক ধাপ কাছে এগিয়ে এলো। মেহুলের টর্চের আবছা আলো আর ল্যাম্পপোস্টের হলুদ ছায়ায় সালমানের প্রখর ও গম্ভীর মুখাবয়ব যেন আরও বেশি রহস্যময় হয়ে উঠল।
​সালমান মেহুলের একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার গভীর, সম্মোহনী ও নিম্নস্বরে বলল, “ওটাকে স্টকিং বলে না, ডক্টর… ওটাকে নিজের জিনিসকে চোখের আড়াল হতে না দেওয়া বলে। নিজের বুকের ভেতর গেঁথে থাকা অপ্সরাকে সাবধানে ‘দেখে রাখা’ বলে।”

শ্রাবণ শেষের রোদ্দুর পর্ব ২৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here