রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩৫
ইয়ুশরা রিমু
বেলকনিতে হালকা হাওয়া ধীরে ধীরে বইছিলো। কিছুক্ষণ আগের তর্কের উ’ত্তাপ যেন একটু কমে এলেও বেলা আর সায়রের মাঝের নীরবতাটা অদ্ভুতভাবে ভারী হয়ে ছিলো। সায়রের কথাটা শুনে বেলা যে কতটা অপ্রস্তুত হয়ে গেছে, সেটা তার মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছিলো। সে কিছুক্ষণ কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু সায়রের দিকে তাকিয়ে রইলো।
সায়রও কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বেলার মুখের দিকে তাকালো। তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি এনে বললো,
—রাজি আছিস আমার শর্তে?
বেলা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।
—কখনো না!
সায়র ভান করে গম্ভীর হয়ে বললো,
— তাহলে বলবো না।
বেলা এবার বিরক্ত হয়ে বললো,
— বলেন না! এমন করছেন কেন? আপনি তো জানেন আমি কী জানতে চাইছি।
সায়র কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো,
—-জানি। কিন্তু শর্ত মানবি না, আবার উত্তরও চাইবি এটা তো হতে পারে না।
বেলা ভ্রু কুঁচকে বললো,
— আপনি আমাকে এভাবে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলছেন কেন? আমি আপনার কাছে একটা সহজ প্রশ্নের উত্তর চাইছি।
সায়র মৃদু হেসে বললো,
—তুইও একটু রাজি হয়ে যা। তাহলে বলে দিবো।
বেলা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। তারপর বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বললো,
— আপনি একটা লু’ইচ্ছা বেটা!
সায়র সঙ্গে সঙ্গে হেসে ফেললো।
— বউয়ের কাছে সব স্বামীই লু’চু।
বেলা বিরক্ত হয়ে বললো,
—নিজের ব্যাপারে নিজেই এত বড় ঘোষণা দিতে লজ্জা করে না?
— লজ্জা করার মতো কী বললাম?
—আপনি জানেন না?
— না। তুই বুঝিয়ে বল।
বেলা আর কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলো। সায়রের দুষ্টু হাসি দেখে সে বুঝতে পারলো, ইচ্ছে করেই তাকে আরও বিরক্ত করছে। সে একবার চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকালো।
সায়র ধীরে ধীরে বেলার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলো।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেলো। সায়রকে এগিয়ে আসতে দেখে সে একটু পিছিয়ে গিয়ে বললো,
— আপনি এভাবে এগোচ্ছেন কেন?
সায়র থেমে মুচকি হাসলো।বেলা তখনও অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।সায়র বেলার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ মুচকি হাসলো। তারপর আগের দুষ্টুমি একটু কমিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,
—আচ্ছা, একটা কাজ কর। চল ঘুরতে যাই। তাহলে তোকে সব বলবো।
বেলা সঙ্গে সঙ্গে চোখ ছোট করে তাকালো।
—কোথায়?
—সেটা এখন বলছি না। আগে রাজি হ।
বেলা মাথা নেড়ে দৃঢ় গলায় বললো,
— না। আমি আপনার সঙ্গে একা কোথাও যাব না।
সায়র হেসে বললো,
— আবার শুরু করলি? তোকে তো আগেই বলেছিলাম, সামনের সপ্তাহে কলেজে কয়েকদিন অফ আছে। এতদিনের ছুটি, বাসায় বসে থেকে কী করবি?
— বাসায় থাকবো। তবুও আপনার সঙ্গে একা কোথাও যাব না।
সায়র কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললো,
— ঠিক আছে। একা যেতে হবে না। বিহান আর ইরাকেও নিয়ে যাব।
বেলা একটু থেমে গেলো।
সায়র এবার বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো,
— তাহলে তো আর তোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সবাই মিলে শহরের এই কোলাহল থেকে একটু দূরে, শান্ত কোনো জায়গায় ঘুরে আসবো। কয়েকটা দিন ভালোভাবে কা”টাবো, তারপর ফিরে আসবো।
বেলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। আগের মতো সরাসরি না করল না। বরং কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— কোথায় যাবেন?
সায়রের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠলো,
—সাজেক ভ্যালি যাই চল। পাহাড়ে গেলে তোর ভালো লাগবে। চারপাশে পাহাড়, মেঘ আর সুন্দর একটা শান্ত পরিবেশ শহরের এত ব্যস্ততার বাইরে কয়েকটা দিন থাকলে সবারই ভালো লাগবে।
বেলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। সাজেকের নাম শুনে তার অনিচ্ছা একটু হলেও নরম হয়ে গেলো। পাহাড় আর মেঘের কথা মনে হতেই মনে মনে তার কৌতূহল জেগে উঠলো, যদিও সায়রের সামনে সেটা প্রকাশ করতে সে রাজি নয়।শেষ পর্যন্ত একটু মুখ ভার করেই বললো,
—আচ্ছা, যাবো।
সায়র যেন আগে থেকেই এই উত্তরটার অপেক্ষায় ছিলো। সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললো,
— সত্যি?
বেলা ভ্রু কুঁচকে বললো,
—হ্যাঁ। তবে শর্ত আছে।
— আবার শর্ত?
— হ্যাঁ। আপনি আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে কোনো অদ্ভুত শা’স্তি দিতে পারবেন না।
সায়র হেসে মাথা নাড়ে বললো,
—- ঠিক আছে। তবে তুইও সেখানে গিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া করতে পারবি না।
বেলা মুখ বাঁকিয়ে বললো,
— সেটা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।
সায়র হেসে বললো,
—বুঝেছি। তোর ওপর কোনো ভরসাই করা যায় না।
বেলা এবার সামান্য হেসে ফেললো। কিছুক্ষণ আগের অভিমান আর রাগের মাঝেও সাজেকে যাওয়ার চিন্তাটা তার মনে অদ্ভুত এক আনন্দের জন্ম দিলো। তবে তার মাথায় তখনও একটা প্রশ্ন ঘুরছিলো।সায়র সত্যিই কি তাকে তার মা-বাবাকে নিয়ে পুরোনো সেই অজানা কথাটা বলবে?
বেলা ধীরে ধীরে বললো,
—কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন, আপনি কথা দিয়েছেন। সেখানে গিয়ে সবকিছু আমাকে বলতে হবে।
সায়র এবার হাসি থামিয়ে গম্ভীরভাবে বললো,
— কথা দিয়েছি। তোকে সব বলবো।
বেলা আর কিছু বললোনা। শুধু দূরের আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলো, এই ঘুরতে যাওয়াটাই হয়তো তাকে সেই রহস্যের উত্তরটা এনে দেবে।
সায়র বেলার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। বেলার সরল মুখ দেখে মনে মনে ভাবলো,
—বোকা বেলা, তুই বুঝবিও না! তোকে শুধু ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছি না, গাধী একটা বিয়ে করেছি আমি। এবার তোকে নিয়ে একটু ভালোভাবে সময় কা’টাবো বলেই এত পরিকল্পনা।
মুখে অবশ্য এসবের কিছুই প্রকাশ করলো না। বরং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললো,
— তাহলে ঠিক হলো। সামনের ছুটিতে সাজেক।
বেলা সন্দেহভরা চোখে তাকিয়ে বললো,
— কিন্তু আপনি কিছু লুকাচ্ছেন না তো?
সায়র সঙ্গে সঙ্গে মুখ গম্ভীর করে বললো,
— আমি আবার কী লুকাবো?
বেলা চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলো।
—জানি না। আপনার ওপর একদম বিশ্বাস নেই।
সায়র হেসে মাথা নাড়লো।
— সময় হলে সব বুঝবি।
বেলা কিছু না বুঝে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। আর সায়র মনে মনে নিজের পরিকল্পনার কথা ভেবে মৃদু হাসতে লাগলো।
রাতে খান বাড়ির ড্রয়িংরুমে বেশ জমজমাট আড্ডা বসেছিলো। সারাদিনের নানা ঘটনা একে একে বলতে শুরু করেছে। গল্পগুজব শেষ করে খাওয়া-দাওয়া শেষ হতে হতে রাত অনেকটাই হয়ে গেলো। একে একে সবাই যার যার ঘরে চলে গেলো। বেলাও ক্লান্ত হয়ে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো। সারাদিনের ব্যস্ততা আর আগামী দিনের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই কিছুক্ষণের মধ্যে তার চোখ লেগে গেলো।
সায়রও কিছুক্ষণ পর ঘরে এসে দেখলো, বেলা গভীর ঘুমে। সে চুপচাপ লাইটটা কমিয়ে নিজের পাশে শুয়ে পড়লো। কিন্তু আজ তার মাথায় অন্যরকম একটা দুষ্টু বুদ্ধি ঘুরছিলো।বেলাকে একটু বিরক্ত না করলে যেন তার রাতটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।কিছুক্ষণ পর বেলা ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরতেই সায়র মজা করে কাঁথা একটু টেনে নিলো। বেলা ঘুমের মধ্যেই বিরক্ত হয়ে বললো,
— কাঁথাটা ছাড়ুন…
সায়র মুখ চেপে হাসলো।
—ঘুমের মধ্যেও টের পায় দেখি!
বেলা কিছু না বুঝেই আবার চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেলো।
সায়র আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে মজা করার জন্য আলতো করে কাঁথার একপাশ ঠিক করে দিলো, যাতে বেলা আরামে ঘুমাতে পারে। তারপর নিজেও চোখ বন্ধ করলো।কিন্তু কিছুক্ষণ পর বেলা ঘুমের মধ্যে এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতে করতে এমনভাবে ঘুরে গেলো যে দুজনের মাঝের দূরত্বটুকুও আর থাকলো না। সায়র হেসে ফিসফিস করে বললো,
— সারাদিন এত রাগ দেখাস, আর ঘুমের সময় আবার নিজেই কাছে চলে আসিস!
বেলা অবশ্য কিছুই শুনলো না। সায়র আর তাকে বিরক্ত না করে চুপচাপ শুয়ে রইল। মনে মনে শুধু ভাবলো,
— কাল সকালে এভাবে দেখলে আমাকে দোষ দেবে। বলবে, সবই আপনার দোষ! আপনি ইচ্ছে করে আমার কাছে এসে ঘুমিয়েছেন।
পরদিন, সকালেও প্রতিদিনের মতো সায়রের বাইকেই বেলা কলেজে গেলো। আগের দিনের অভিমান পুরোপুরি কা”টেনি, তবে সাজেকে যাওয়ার কথা মনে পড়তেই তার মনটা মাঝে মাঝে ভালো হয়ে যাচ্ছিলো। কলেজের গেটের সামনে পৌঁছে দুজন বাইক থেকে নেমে আলাদা আলাদা পথে ক্লাসে চলে গেলো।
কিছুক্ষণ পর ক্লাস শুরু হওয়ার সময় সায়র হাতে বই আর কিছু নোট নিয়ে শ্রেণিকক্ষে ঢুকতেই আগের দিনের মতোই পুরো ক্লাসের পরিবেশ এক মুহূর্তে বদলে গেলো। যে শিক্ষার্থীরা এতক্ষণ নিজেদের মধ্যে গল্প করছিলো,তারা দ্রুত বই খুলে সোজা হয়ে বসে পড়লো। সায়র টেবিলের ওপর বই রেখে একবার পুরো ক্লাসের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
— সবাই বই বের করো। আজকে আগে গত ক্লাসের পড়া থেকে কয়েকটা প্রশ্ন করবো। দেখি কে কতটা মনে রেখেছ।
সায়র প্রথমে কয়েকজনকে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করতে লাগলো। কেউ ঠিকঠাক উত্তর দিলো, আবার কেউ উত্তর দিতে না পারায় সায়র ধৈর্য ধরে বিষয়টা বুঝিয়ে দিলো। এরপর বোর্ডে কয়েকটি প্রশ্ন লিখে পুরো ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বললো,
— এবার সবাই খাতায় লিখে চেষ্টা করো। আমি পরে কয়েকজনকে বোর্ডে ডাকবো।
বেলা মনোযোগ দিয়ে নিজের খাতায় লিখছিলো। কিন্তু সামনের বেঞ্চে বসা তানিয়ার মন পড়ায় ছিলো না। সে বারবার বেলার দিকে তাকাচ্ছিলো। আগের দিনের ঘটনাগুলো তার মাথায় ঘুরছিলো, আর বেলাকে কোনোভাবে অপদস্থ করার সুযোগ খুঁজছে।কিছুক্ষণ পর সায়র আবার বই বন্ধ করে বললো,
—ঠিক আছে। এবার দেখি কার উত্তর কতটা ঠিক হয়েছে। বেলা, তুমি বোর্ডে এসে এই প্রশ্নটার উত্তরটা লিখে দাও।
বেলা মাথা তুলে বললো,
—জি স্যার।
সে খাতা হাতে নিয়ে নিজের জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগে। সায়র তখন বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটার দিকে তাকিয়ে ছিলো।
বেলা প্রথম বেঞ্চের কাছে পৌঁছাতেই তানিয়া একবার চারপাশে তাকিয়ে নিচু হয়ে নিজের পা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিলো। তার উদ্দেশ্য ছিল বেলাকে হোঁচট খাইয়ে সবার সামনে বিব্রত করা।
বেলা কিছুই বুঝতে পারেনি।হঠাৎ তার পা তানিয়ার পায়ে আটকে গেলো। আহ্। বেলা চিৎকার করে উঠে ভয়ে।
এক মুহূর্তেই বেলার শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে যায়।হাতে থাকা খাতাটাও প্রায় ছিটকে পড়ে গেলো। সে সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতে যাচ্ছিলো।ঠিক সেই মুহূর্তে সায়র দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে সামলে নিলো।হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনায় পুরো ক্লাস যেন পাথর হয়ে গেলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য কেউ কোনো কথা বললো না। সবাই বড় বড় চোখে বেলা আর সায়রের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
বেলা প্রচণ্ড অপ্রস্তুত হয়ে গেলো। সে দ্রুত নিজেকে সামলে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মুখটা ল”জ্জায় লাল হয়ে গেছে, আর চোখে বিস্ময়ের সঙ্গে রাগও ফুটে উঠেছে। সে বুঝতে পারছিলো না, ঠিক কীভাবে হঠাৎ এমনটা হলো।
সায়র প্রথমে বেলার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো সে ঠিক আছে কি না। তারপর ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি গিয়ে থামলো তানিয়ার ওপর।
তানিয়া তখন নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বসে আছে, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু তার মুখের অস্বস্তি দেখে বোঝা যাচ্ছিলো, ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত ছিলো।সায়রের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে গেলো।সে ঠান্ডা গলায় বললো,
— বেলা, তুমি ঠিক আছো?
বেলা মাথা নেড়ে বললো,
— জি।
সায়র কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর পুরো ক্লাসের দিকে তাকিয়ে বললো,
—সবাই নিজের জায়গায় বসে থাকো।
তারপর তানিয়ার দিকে তাকিয়ে খুব গম্ভীর স্বরে বললো,
রইলো প্রেমের নিমন্ত্রণ পর্ব ৩৪
—তানিয়া, দাঁড়াও।
তানিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।পুরো ক্লাসের চোখ তখন তার দিকে।আর বেলা বোর্ডের পাশে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারলো, এবার হয়তো তানিয়ার করা কাজটা আর সায়রের চোখ এড়ায়নি।
