Home কাছে আসার মৌসুম কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮২

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮২

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮২
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

সারাটা পথ ছটফটিয়ে, তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসা সার্থ,বাড়ির চৌকাঠ পেরোতেই একটু ধীরুজ হয়ে গেল। সদরের দরজাটা ঠাঁ করে খোলা তখন। বসার ঘরে তুশি বাদে, নারীমহল সকলেই আছেন। সেই সবার দৃষ্টি একইসাথে ওর ওপর এসে পড়ল। তারপর চেয়েই রইল তারা। যে দৃষ্টি দেখে মনে হলো, আকাশ থেকে একটা অযাচিত বস্তু এসে টপকেছে। আর সেই বস্তু হলো সার্থ! অবশ্য ও এর কারণটাও জানে! দুপুরবেলা বউ বমি করা নিয়ে ও যা হম্বিতম্বি করেছে! এখন ওনারা নিশ্চয়ই মনে মনে হাসছেন খুব? সার্থর হলদে মুখটায় অস্বস্তির বিশদ গাঢ় চিহ্ন।। সবাইকে একবার একবার দেখল চুপচাপ। তবে কাউকে কিছু বলল না। চোখ নামিয়ে চুপ করে হাঁটা ধরল ঘরে। এক পা এগোতেই তনিমা বললেন,

“ ওমা,চলে এলি? আম্মা না মাত্রই ফোন করেছিলেন। তুই এত তাড়াতাড়ি এলি কেন?”
সার্থ একটু থমকায়,কিছু না বলে আবার হাঁটা ধরে। মাও মজা নিচ্ছে এখন? তার ঝটপটে গতি দেখে জয়নব বললেন,
“ দাঁড়াও,দাঁড়াও! একটু দাঁড়াও দাদুভাই!”
সার্থ দাঁড়িয়ে গেলেও,অস্বস্তি অস্বস্তি ভাব করে চাইল ঘুরে। গোটা শক্ত চেহারায় এক প্রস্থ জড়তা। কিন্তু বুঝতে দেবে না বলে খুব স্বাভাবিক থাকার প্রয়াস করে বলল,
“ কিছু বলবে?”
“ অবশ্যই বলব। কত কিছুইতো বলতে চাই,তোমারই সময় হয় না। হাহ,আমরাও যদি তুশির মতো হতাম! তাহলে কত জন আমাদের জন্যে কত কী করতো,তাই না হাসনা আপা?”
হাসনা দাদি জোরে জোরে মাথা নাড়লেন। কথার সাথে বড়োসড়ো আকারে সহমত তিনি। বাকি দুই মা,হাসলেন ঠোঁট টিপে। সার্থ এদিক ওদিক চেয়ে বলল,

“ কী বলবে দিদুন!”
“ কেন,তাড়া আছে তোমার?”
অবশ্য তোমার যে সবেতেই খুব তাড়া তার প্রমাণ আমরা হাতেনাতে পেয়েছি।”
খুকখুক করে কেশে উঠল সার্থ। রেহণূমা হাসিটা খুব কষ্টে চেপে একটু উদ্বেগের ভান করে বললেন,
“ পানি খাবি, পানি খাবি?”
সার্থ মাথা নাড়ল।
জয়নব বললেন,
“ তখন তো পুরো কথা না শুনেই কল কেটে দিলে। বউমাদের কাছে শুনলাম দুপুরে নাকি খুব চোটপাট করে গিয়েছ। আমরা সবাই মিলে নাকি তোমার বউকে অসুস্থ বানিয়ে দিয়েছি। তা দাদুভাই এবার নিশ্চয়ই বুঝেছ,তুশির অসুস্থতার পেছনে তোমার হাতই সবচেয়ে বেশি?”
এইবার সার্থ কেশে উঠল প্রবল গতিতে। এদিক ওদিক দেখতে দেখতে ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ আসি!”

তারপর একদম ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়িতে উঠে গেল সে। টের পেলো পেছনে নারীদের হাসাহাসির শব্দ। ও চোখটা বুজে চ সূচক শব্দ করল। সবাই বাগে পেয়ে আচ্ছা মতো মজা নিয়ে নিলো?
জয়নব হাসতে হাসতেই মুক্ত শ্বাস ফেললেন।
বললেন“ ভাবলেই অবাক লাগছে,দুটো দিন আগে এই বসার ঘরে দাঁড়িয়েই বলছিল- এ মেয়েকে বউ মানবে কে?
আর আজ,আজ মুখে ‘ত’ উচ্চারণ করলেই লাফিয়ে প্রশ্ন করছে – তুশি ঠিক আছে?”
তনিমা হেসে বললেন,
“ সবই ভালোবাসা আম্মা! সবই ভালোবাসা!”
রেহণূমা বললেন,
“ দোয়া করি, ওদের এই ভালোবাসা সারাজীবন অটুট থাকুক!”

তুশি বসে বসে বাদাম ছিলে খাচ্ছে। পরনে একটা জলপাই রঙের সুতির জামা। ওরনাটা পরে আছে পাশে। ঘরে এসি আছে,কিন্তু তাও গরম লাগছে ওর। মা বলেছেন, অন্তঃসত্ত্বা মেয়েদের গরম বেশি বেশি থাকে। তুশিও টের পাচ্ছে ব্যাপারটা। এত হাত-পায়ের তালু ঘেমে যাওয়া গরম ওর কখনো লাগেনি। এদিকে
বাড়িতে ওর প্রেগন্যান্সির খবর ছড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে খাবার দাবারে কামরা ভরে গেছে। রোজই কিছু না কিছু এনেছেন বাবারা। ডিম খেতে হচ্ছে,দুধ খেতে হচ্ছে। এই বাদামগুলো মিন্তু দিয়ে গেল। দিদুন পাঠিয়েছেন। বিষাদ মুখেও ভালো লাগছে খেতে। তুশি টিভি দেখছিল। কেবল কানেকশন ফেলে ইউটিউবের একটা পুরোনো খবর দিয়ে রেখেছে। সার্থকে দেখা যাচ্ছে সেখানে। ইউনিফর্ম পরা,মাথায় পিক ক্যাপ ছেলেটার। এক খু-নীর খু-নের বিবরণ দিচ্ছিল মাইক্রোফোনের মিডিয়ার সামনে। সে যখন কথা বলে,তুশি সব ভুলে চেয়ে রয়। সার্থর বাচনভঙ্গি, চোখেমুখের ভঙ্গিমা মন দিয়ে দেখে। পরপর দীর্ঘশ্বাসে ফেঁপে ওঠে বুক। সার্থ এসেছিল দুপুরে,অথচ দু দণ্ড কথাও হলো না। মন ভরে তাকে ছুঁতে পারল না। কেন যে তুশি ডিম মুখে দিয়েছিল,নাহলে ও বমি করতো, না অজ্ঞানও হতো না। এখন মানুষটা কোন কালে ফিরবে? কখন দেখা হবে আবার?

তুশি অনেকগুলো বাদাম ছিলে হাতের তালুতে নিলো। মুখের সামনে ধরে ফুঁ দিলো। উড়ে যাওয়া বাদামের লালচে আবরণের সাথে সাথে চোখটাও গিয়ে পড়ল দরজায়। আবরণ চারদিক ছড়িয়ে যায়,ফাঁকা হয় সামনেটা। আর সেখানেই ভেসে ওঠে কাঙ্খিত পুরুষের সুতনু মুখ। ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যে। দুটো হাত ট্রাউজারের পকেটে রেখে ঘাড়টা একটু কাত করে,ঠোঁটে নিঃশব্দ হাসি ঝুলিয়ে চেয়ে আছে সার্থ। যার ঘোলাটে,কামুক চাউনিতে
তুশির বুক ভীষণ জোরে ধক করে উঠল। তড়াক করে খাট থেকে উঠে দাঁড়াল ও স্বামীর কাছে ছুটে যাওয়ার জন্যে। অথচ এক পা এগোতেও পারল না, তক্ষুনি লম্বা কদমে এগিয়ে এসেই সার্থ ওকে সহ শুয়ে পড়ল বিছানায়।
তুশি হকচকাল কিছুটা। পিঠ গিয়ে পড়ল নরম,কোমল তোষকে। শ্বাস নেয়ার আগে শরীরের ওপর ওই ভারি শরীর,আর তাকানোর সাথে সাথে সার্থর প্রথম চুমুটা পড়ল তার কপালে। এরপর দুই চোখে,নাকে,দুই গালে,ঠোঁটে -থুত্নিতে,গলায়,বুকে চুমু দিতে দিতে সার্থ যতক্ষণ না ক্লান্ত হলো,ততক্ষণ মেয়েটাকে যেন ভাসিয়ে দিলো সে। স্বামীর এত অস্থিতায় হেসে ফেলল তুশি। বলল,

“ হয়েছে তো!”
সার্থ থামল। একটু মুখটা তুলল। পরপর দীর্ঘ সময় নিয়ে ঠোঁট বসিয়ে রাখল ওর কপালে। হাস্কি স্বরে ডাকল,
“ অ্যাই চোর!”
তুশির বুক জড়িয়ে গেল,যেন কত শতাব্দি পর শুনলো ঐ ডাক। শশব্যস্ত উত্তর দিলো,
“ হু হু?”
“ “Congratulations on being the mother of my child.”
তুশি ছোটো বাচ্চাদের মতো বলল,
“ বাংলায় বলুন না!”
সার্থ হেসে ফেলল।
তুশির মুখচোখে এসে পড়া চুল, কানের কাছে নিতে নিতে বলল,
“ আমার সন্তানের মা হচ্ছো তুশি, বলো কী চাই?”
তুশি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ আপনার সন্তানের মানে, আমার কি অন্য কারো সন্তানের মা হওয়ার কথা ছিল?”
সার্থ সঙ্গে সঙ্গে দু আঙুল দিয়ে ওর ঠোঁটে টোকা মারল। মুচড়ে উঠল মেয়েটা,

“ আ… লাগলো।”
“ বলো কী চাই?”
“ চাই তো আপনাকে।”
“ আমি আপনারই আছি। আরো অন্যভাবে চাইলে… আগে একবার চেইক আপে যাব,শুনব এই সময় সেইফ কিনা। তারপর!”
“ কী সেইফ কিনা! কী বলছেন?”
সার্থ দুষ্টু হেসে কানের কাছে ফিসফিস করে কিছু একটা বলতেই,তুশি মূহুর্তে ওর শক্ত বাহুতে কিল মেরে বলল
“ আমি ওসব বুঝাইনি। ইস…”
“ কী চাই বললে না?”
“ যা চাইব, দেবেন?”
“ তুমি এই মূহুর্তে আমার কলিজা চাইলেও দিয়ে দেব।
ওহ না,তাহলে তো মরে যাব। আমাকে যে এখন অনেক দিন বাঁচতে হবে। বাবা হব না? প্রাণ ছাড়া অন্য কিছু চাও তাহলে।”
তুশির মুখটা মিইয়ে এলো অল্প। কমল ওর স্ফূর্ত হাসিটুকু। সার্থ কপাল কুঁচকে বলল,
“ খুব দামি কিছু?”
“ একটু উঠবেন?”
“ এটা চাও?”
“ আহ না,নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”
সার্থ সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল ওপর থেকে। তুশি অবাক হয়ে বলল,
“ বাবাহ,আজ বলতেই এত ভদ্র…”
কথা শেষ করার আগেই সার্থ ওকে টেনে নিজের কোলে এনে বসাল। তুশির চুল খোপা করা ছিল। খোপাটা খুলে দিলো সে। সিল্কি চুলগুলো ঝরঝর করে পিঠে নামল ওর। সার্থ কাঁধের চুল সরিয়ে মুখটা ছোঁয়াল গলায়। অগণিত চুমুতে ঘাড়ের ভাঁজ ভিজিয়ে দিতে দিতে লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,

“ খুব মিস করেছি!”
তুশি নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কথাটা ওকে বলতে হবে,এটাই সময়। ফের প্রসঙ্গ তুলল মিনমিন করে,
“ চাইব কিছু?”
সার্থ তাকায় ওর দিকে।
“ কী চাই!”
তুশি ঠোঁট জিভে ভেজাল।
“ যা চাইব দেবেন তো?”
সার্থ এক হাত ওর গালে রাখে,বলে,
“ মানুষ তো,যা সাধ্যে আছে তা দেব না?
বউ তুমি আমার। পারলে তোমার পায়ের কাছে আসমান,জমিনের সব এনে দিতাম!”
তুশির মুখে আলো ফিরল না। জিভে বারবার ঠোঁট চুবিয়ে দোনামনা করল৷ সাহস আনল বুকে। এরপর একদমে বলল,

“ বাবাকে এবার মাফ করে দিন। দুজন আবার আগের মত হয়ে যান, প্লিজ!”
বজ্রাঘাতের ন্যায় নিস্তব্ধ মুখটা পলকেই বদলে গেল সার্থর। তুশির গাল থেকে হাতটা নামতে নিলেই, ধড়ফড়িয়ে আকড়ে ধরল মেয়েটা। ব্যাকুল হয়ে বলল,
“ অনেক বছর তো হলো,আর কত? মানুষটার বয়স হয়েছে। আজ বাদে কাল তো থাকবে না। আপনার সাথে ওনার সম্পর্ক ঠিক নেই। বাচ্চাটা এসেও তাই দেখবে। ও কী শিখবে তখন? পুরোনো সব ভুলে একবার কথা বলুন না ওনার সাথে।”
সার্থ তুশির থেকে হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলো। ঠেলে কোল থেকে উঠিয়ে দিলো ওকে। নিজেও উঠতে নিয়ে,থামল আবার। কী যেন ভেবে ফের বসল আগের জায়গায়। সেই আগের মতোই তুশিকে টেনে আনল কোলে। ওর মোলায়েম গালে হাত রেখে দুবার চাপড় কেটে , ঠান্ডা হেসে বলল
“ ফারদার যেন এসব না শুনি!”
তুশি শুকনো মুখে বলল,

“ কথা দিলেন তো।”
“ রাখতে পারছি না।”
নীরস শ্বাস ফেলল মেয়েটা। হতাশ হলো। ভাবল মোক্ষম সুযোগে চেয়ে নেবে এটা। নাহ,বছর ফুরালেও লোকটার ক্ষোভ এক ছটা মেটেনি এখনো। সেইসময় ঘরের বাইরে থেকে কাশি দিলেন হাসনা। জিজ্ঞেস করলেন,
“ আসমু?”
ওরা একই সাথে দরজায় চাইল। তুশি নড়তে চাইলেও সার্থ দিলো না। ওভাবেই বলল,
“ আসুন।”
বৃদ্ধা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,
“ ওরে মা,আইসাই বউয়ের কোলে উইঠা গেছ।”
“ দাদি চোখ খেয়েছেন,বউ আমার কোলে বসেছে।”
“ একই তো কথা হইল।”
তুশি আরো বেশি মোচড়ামুচড়ি করতেই সার্থ ছেড়ে দেয়। চটজলদি উঠে দাঁড়িয়ে বলে
“ দাদি,বসো।”
হাসনা সার্থর পাশে বসলেন। মাথাটা ঝুঁকিয়ে এনে বললেন,
“ তয় নাতজামাইর কাম কারবারডা কী?”
সার্থও একইরকম মাথা ঝুঁকিয়ে ভ্রু উঁচাল,
“ কী?”

“ বিয়ে হইল তিন মাস৷ খালি পেটে নাতি দিছি, এর মইধ্যে পেট ভরাই ফালাইছো?
আমার সুয়ামি তো তাও আমারে নয় নাস টেম দিসিল। আমার ছাওয়াল হইসে আরো নয় মাস পর। তুমি দেখি মিঁয়া ভাই মেলা চালু!”
“ আমি খুব পরিশ্রমী দাদি। পরিশ্রম বেশি ছিল,তাই ফলও দ্রুত এসছে! আপনার স্বামী তো নেই,থাকলে বলতাম আমার থেকে শিখতে।”
এক উত্তরে হাসনা বোল্ড আউট! বৃদ্ধা ভাবেনইনি সার্থও এমন জবাব জানে। দুই ভ্রু উঁচিয়ে বললেন,
“ পরিশ্রোম?”
“ হু,একটু তো খেটেছি। আপনার নাতনিকে জিজ্ঞেস করুন,একটা রাতও ঘুমোতে দিইনি!”
তুশি লজ্জায় অতীষ্ঠ হয়ে বলল,
“ উফ আপনারা থামবেন৷ কীসব নিয়ে আলাপ করছে!”
“ আমি কী করলাম,দাদি শুনতে চাইলেন দেখলে না!”
“ না না মাফ চাই আমি। কইতে হইব না।”
তারপর একটু দম নিলেন তিনি। ফের বললেন,
“ তয় নাতজামাই,বাপ হইতেছ এইবার। মেলা দায়িত্ব কইলাম। স্বামী ভালাই আছো। ভালা বাপ হইবারও পারবা তো?”

তুশি আগ বাড়িয়ে হইহই করে বলল,
“ পারবে না কেন? উনি তো সব কিছুতে সেরা।”
হাসনা মজা নিতে দুষ্টুমি করে হাসলেন।
“ সব কিছুতে স্যারা হুম?”
তুশি দাদির এই হাসির মানে বুঝল। লাজুক চিত্তে চোখ রাঙাল তাকে। হাসনা আঁচলে মুখ চাপেন হাসি কমানোর জন্যে।
এর মাঝে সাইফুলের কণ্ঠ ভেসে এলো।
“ কই রে সার্থ? নিচে আয়। একটু দেখি আমাদের উড বি পাপাকে…”
সার্থ উঠে যেতে যেতে হাসনার উদ্দেশ্যে বলল,
“ হাসি লুকোতে হবে না। দাদি যেটা ভাবছেন আমি সেটাতেও সেরা।”
তারপর তুশিকে ভ্রু নাঁচিয়ে শুধাল,
“ তাই না?”
তুশির মুখ হাঁ হয়ে গেল। হাসনাও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। সার্থ বেরিয়ে যেতেই হুহা করে হেসে উঠলেন তিনি। তুশি ঠোঁট টিপে রইল দু পল। বিড়বিড় করে বলল,
“ ছি,বেশরম সব। কারোর লজ্জা নেই!”

একটা ছোট্টো খোলা জায়গা হৈচৈ-এ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। হাত তালি দিয়ে দিয়ে জড়োতায় মুখ শুকনো করে থাকা দম্পতিকে উচ্ছ্বাস দিচ্ছে তারা। এখানে বাংলাদেশ থেকে আসা দম্পতির সংখ্যা হাতে গোনা! বাকিরা বাইরে থেকে আগত। কেউ বা এখানকার। ওদের সংস্কৃতিতে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া ভীষণ স্বাভাবিক ব্যাপার।
তাই সবাই মিলে চ্যাঁচিয়ে অয়ন-ইউশার জন্যে চিয়ার আপ করছিল। ইউশা বিব্রত হয়ে পড়ল আরো। মাথা নত হয়ে চলে এলো বুকে। একইরকম অস্বস্তি অয়নের চেহারায়। দুজন দুজনের দিকে তাকাচ্ছে না। ফিরছেও না। এত সময় নিতে দেখে ম্যানেজার তাড়া দিলেন,
“ জলদি করুন মিস্টার অয়ন। আরো অনেক কাপল বাকি এখনো।”
অয়ন দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ভাবছিল কী করবে? এর মাঝে আড়চোখে একবার ইউশাকেও দেখল। মেয়েটার চিবুক গলায় মিশে গেছে।
ও ঘুরে ম্যানেজারকে বলল

“ হোয়াট’’স দ্য পানিশমেন্ট?”
ভদ্রলোক কিছু অবাক হলেন। তাও
পাশের টেবিল দেখিয়ে বললেন,
“ ওখানে করলার জুস আছে। এক গ্লাস খেতে হবে!”
করলার কথায় আঁতকে উঠল ইউশা। করলা খাওয়া অয়ন ভাইয়ের বারণ। দুনিয়ার সব রেখে এই জিনিসেই ওনার মুখ চোখ লাল হয়ে,জিভ ফুলে যায়। আর ইউশা জানে, অয়ন ভাই কোনোদিন সবার সামনে ওকে চুমু খাবে না। তাও ঠোঁটে? একা রুমটাই যেখানে পড়ে রয় সেখানে এই জায়গায়?
অয়ন এক বার চেয়ে দেখল সবুজ তেতো পানীয় ভরা গ্লাসগুলো। কিছু করবে, বা নড়বে জায়গা থেকে এর মাঝেই একছুটে গিয়ে একটা গ্লাস তুলে ঢক করে গলায় ঢেলে দিলো ইউশা। আর সেই মূহুর্তে পরিবেশ বদলে গেল এখানে। অয়ন নিজেই হতভম্ব, হতবাক। বাকিরাও একইরকম বিস্মিত বনে যায়। একটা হানিমুন কাপল,যারা এত রোমান্টিক জায়গায় এসে বসেছে তারা একে-অন্যকে চুমু খেতে পারল না?
ইউশা ভেজা মুখটা উলটো হাতে মুছতে মুছতে বলল,

“ ডান! উই আর ফেইল্ড বাট ডান।”
তারপর পাশ ফিরে চাইল সে। অয়ন মূক হয়ে চেয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই মাথা নামিয়ে শ্বাস ফেলল সে। ইউশা এসে বলল,
“ চলো,এখানে আর ভালো লাগছে না!”
মেয়েটা হাঁটা ধরল সামনে। অয়ন বিরস মুখে পেছনে আসে। এক ঝাঁক বেদনায় ওর মুচড়ে ওঠে সব। শুধায়,
“ কেন করলি এটা?”
ইউশা পায়ের গতি বাড়িয়ে বলল,
“ তোমাকে বাঁচিয়ে দিলাম!”
অয়নের মুখচোখ ঝিম মেরে গেল। চুপ করে এগিয়ে যাওয়া মেয়েটার পানে চেয়ে রইল সে।
ইউশার খারাপ লাগার কথা ছিল না। ও তো জানতোই এমন হবে। এমনটাই স্বাভাবিক। তাও লাগল। গলায় এসে ভিড়ল কিছু চাওয়া, কিছু না পাওয়া। এমন প্রকাশ্যে না হোক,অন্তত বদ্ধ চার দেওয়ালেও কি অয়ন ভাইয়ের আদর ওর কপালে লেখা হয়নি?

সার্থ নিচে নেমে দেখল বাড়িতে মিষ্টি আনা হয়েছে। মতিচুর লাড্ডু থেকে দিদুনের পছন্দের ছানার পায়েস রাখা। দুই ট্রে ভরতি ব্যোলে সার্ভ করার পর,বাকিটা ফ্রিজে তোলার জন্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মিন্তুর পর,প্রায় অনেক বছর বাদে এ বাড়ি আবার নতুন সদস্য আসবে। সে নিয়ে উৎসব যে লেগেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আজকের নতুন ব্যাপার হলো,সোফায় মায়ের পাশে বসে থাকা নতুন কটা মুখ। রোকসানা,নাসীর আর আইরিন এসছে। সার্থ একটু অবাকইহলো। আইরিন,কী মনে করে? মেয়েটাকে শেষ কবে দেখেছিল ওর সেটাই মনে নেই। অয়নের বিয়েতেও আসেনি। ও
এসে ফুপু-ফুপাকে সালাম দিলো। ভদ্রমহিলা টেনেটুনে হাসলেও,নাসীর উঠে এসে কোলাকুলি করলেন। গদগদ হয়ে বললেন,

“ তোমার ছবি পত্রিকায় বেরিয়েছে। একটা কন্ট্রাক্ট কিলার চক্র ধরেছ দেখলাম!”
সার্থ আশ্চর্য হয়ে বলল,
“ নিউজটা লিক হয়ে গেছে? আমার নিষেধ ছিল।”
সাইফুল এগিয়ে এসে বললেন,
“ আরে ওসব বাদ দাও নাসীর।
কী রে ব্যাটা,বাপ হয়ে যাচ্ছিস তো হুঁ? আয় আয় মিষ্টি খা। তুই এসেছিস শুনে কত কী নিয়ে এলাম।”
( তোর যে ছোচা কতগুলো পাঠক আছে,খালি মিষ্টি চায় লেখকের কাছে, ওদেরকেও দিস!😒)
শওকত পাশ থেকে বললেন,
“ যাক এবার যদি নিজে বাবা হয়ে কেউ বাবার মূল্য বোঝে। বোঝে, বাবা হলে কেমন লাগে!”
উদ্বেল পরিবেশ হালকা ফিকে হয়ে পড়ল। সার্থ দৃঢ় গলায় ফটাকসে বলে দিলো,
“ আমি শওকত আলী হব না। আমি সার্থ আবরার,সার্থ আবরারই থাকব। যে তার স্ত্রী সন্তানকে মাথায় করে রাখবে।”
শওকতের মুখটা কালো হয়ে গেল। রোকসানা বললেন,

“ ভাইজান,কেন যে আগ বাড়িয়ে অপমান হতে যাও! জানোই তো তোমার ছেলে তোমাকে এক ফোঁটা সম্মান দেয় না।”
আরো কিছু বলতে গেলে জয়নব ওনার হাত চেপে ধরলেন। প্রসঙ্গ কাটাতে বললেন,
“ আচ্ছা থাক,বাদ্দাও এসব। ও ছোটো বউমা অয়নদের ফোন করেছিলে?”
“ না মা,তুশি বারণ করল তো। বলল ইউশা এলে ও নাকি নিজে জানাবে। একেবারে সামনে থেকে দেখবে খালামণি হওয়ার খবর পেয়ে ও কেমন খুশি হয়!”
“ আচ্ছা, তা বেশ।”
সার্থ এসে টেবিল থেকে মিষ্টি তুলল। মিন্তু বলল,
“ ভাইয়া আমি কিন্তু তোমার বাচ্চার এক মাত্র মামা। এখন এই খুশিতে আমাকে একটা বাইক কিনে দিতে হবে।”
রেহণূমা বললেন,

“ ওমা এ কী আবদার!”
“ ভাইয়া বলো দেবে না?”
“ আচ্ছা দেব।”
সাইফুল বললেন,
“ না,মোটেও না। পরে উল্টোপাল্টা চালিয়ে হাত পা ভাঙবে।”
“ ওতো নিজে চালাবে বলেনি। বাইক চেয়েছে, সেটা খেলনা বাইক হলেও চলবে।”
মিন্তু তব্দা খেয়ে বলল,
“ ইইই না, ভাইয়া আমি আসল বাইক চেয়েছি আয়ায়া…”
সার্থ ওর কথাই কানে নিলো না। বয়স পনেরো,বাইক চাইছে। মিন্তু বড্ড দুঃখ পেয়ে বলল
“ এই দুনিয়ায় একটা ফাটা বোতলের যে দাম আছে, আমার তাও নেই।”
সাইফুল হঠাৎ বললেন,
“ হ্যাঁ রে সার্থ,জামিলের কী খবর রে? আসেনি এখনো?”
“ এসছে।”
তনিমা কিছুটা বিচলিত হয়ে বললেন,
“ ওমা, তাহলে বাসায় এলো না যে? আগে তো প্রতিদিন আসতো। ঝামেলা হয়েছে নাকি তোদের?”
“ আমরা কি বাচ্চা,মা?”
“ তবে ডাক না একদিন ছেলেটাকে।”
“ ও আসবে না। প্রেসারে আছে। এই সপ্তাহে ওর অস্ট্রেলিয়া ব্যাক করার কথা।”
রেহণূমা অবাক হয়ে বললেন,

“ সে কী, বলল তো এবার বিয়ে সাদি সব এখানেই সারবে।মেয়ে না দেখেই যাবে?”
সার্থ দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
“ কী জানি!”
কথাবার্তা চলছিল। রোকসানা গো ধরে বসে আছেন। আসতে চাননি। নাসীর আর আইরিন ঘ্যানঘ্যান করে এনেছে। এখন এসব আলাপ-আলোচনা সইছিল না তার। জামিলের কথায় যা আগ্রহ এলো,সেটাও পালাল মিনিটে।
জয়নব সেসময় দুষ্টুমি করে বললেন,
“ দাদুভাই, বাবা যে হচ্ছো আমাদের গিফট দেবে না?”
“ কার কী চাই লিস্ট দাও। এনে দিচ্ছি।”
“ যাহ,এক কথায় রাজি হয়ে গেলে?”
তনিমা বললেন,
“ বাপ হচ্ছে না! মুখের হাসি দেখেছেন আম্মা? মনে হচ্ছে সে পৃথিবী কিনে ফেলেছে।”
সার্থ সেই চিরচেনা গালের ভেতর জিভ ঠেলে হাসতে হাসতে মিষ্টি মুখে দিলো। তার হলদে মুখায়ব আরো উজ্জ্বল লাগল খুব। আর ওই উজ্জ্বলতা প্রহৃত হৃদয়টা নিয়ে চেয়ে চেয়ে দেখল আইরিন। এই বাচ্চাটা ওর আর সার্থর হতে পারতো। আজ হয়ত ওর এই বাচ্চার মা হওয়ার কথা ছিল! অথচ হচ্ছে তুশি। প্রথম থেকে মাকে অকারণে ভয় পেয়ে চুপ না থাকলে,সার্থ ঠিক একদিন স্বায় দিত ওর ডাকে। আচ্ছা, খোদা সবাইকে কেন সব দেন না?
ছোটো থেকে আইরিন দুঃখ দেখেনি। আদরে আদরে সবার মাথায় বসে বড়ো হয়েছে। যখন যা চেয়েছে তাই পেয়েছে।

কত শিক্ষিত ও! সুন্দরী! সেখানে তুশি কি ওর পায়ের যোগ্য ছিল? সার্থ ভাইয়ের কেন ওকেই মনে ধরল তবে?
সার্থর ধারালো কাটের মুখ,ডান ভ্রুয়ের ওপর একটা ত্যারছা কাটা চিহ্ন যা একবার মিশনে গিয়ে ক্রিমিনালের ছুরিতে কেটেছিল। আটটা সেলাই লেগেছিল সেখানে। দাগ যায়নি এখনো। আর বাম চোখের কার্নিশের ঠিক পাশে যে একটা লাল ছোট্ট তিল,খুব কাছে না গেলে বোঝা যায় না যা, সেই গভীর দুটো চোখ,পরিপাটি-স্টাবল হালকা দাঁড়িটা,দুপাশের ফেড করে মাঝের লম্বা চুল ঠেলে কথা বলার ভঙ্গি, কব্জির ওপর থেকে চেয়ে থাকা সুদৃশ্য শিরাগুলো, তাতে বাঁধা স্ট্র‍্যাপের ঘড়ি, আর ঐ নিঁটোল হাসিহীন ঠোঁটজোড়া আইরিন কি আদৌ ভুলতে পারবে কখনো?
এই চমৎকার দেখতে শুনতে, এমন মন মাতানো ব্যক্তিত্বের মানুষটা ওর হলো না কেন? আইরিনের চোখেমুখে আজও না পাওয়ার ব্যথা খুব তীব্র ভাবে ফুটে উঠল। সবার মাঝেই বলে বসল,
“ সার্থ ভাইয়া,একটু আলাদা কথা বলা যাবে?”
সার্থ তাকাল না। ফর্ক দিয়ে মিষ্টির এক পাশ কেটে মুখে তুলতে তুলতে বলল,

“ না।”
ততক্ষণে সবার কথা থেমেছে। রোকসানা চ সূচক শব্দ করলেন। মেয়েটাকে বলেছিলেন কোনো হ্যাংলামো না করতে। অথচ আইরিন ফের বলল,
“ প্লিজ,দু মিনিট!”
রেহণুমা বললেন,
“ সার্থ শোন না কী বলে! এমনিতেও ও চলে যাচ্ছে কাল। দেখা করতে এলো।”
সার্থ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ চলে যাচ্ছে বলতে?”
“ কিঊটি আমাদের সাথে ডেনমার্ক শিফট হচ্ছে। এখানে ওকে মানায় না তো,তাই।”
সার্থ কিছুটা বিস্ময় নিয়ে চাইল এবার। আইরিনের বিষণ্ণ নয়নজোড়া দেখে মায়া হলো একটু। ওপরের ঘরের দিকে চেয়ে দেখল পরপর। মনে মনে চাইল – তুশি যেনে এক্ষুনি না বের হয়!
উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ এসো।”
তারপর ঘরের একটা কোণে এসে দাঁড়াল ওরা। সার্থ বলল,

“ কী বলবে?”
“ আমি চলে যাচ্ছি শুনে কষ্ট পেলে?
“ না।”
“ তাহলে কথা বলতে রাজি হলে যে?”
“ অনেক গুলো বছর এ বাড়িতে থেকেছ। আজ বরাবরের মতো দেশ ছাড়ছো, সেই জায়গা থেকে খারাপ লেগেছে বলে।”
আইরিনের মুখে অন্ধকার নামল।
“ আমাকে খুশি করতে নাহয় একটু মিথ্যেই বলতে আজ।”
সার্থ স্পষ্ট জবাব দিলো,
“ আইরিন, আ’ম টেইকেন এন্ড ম্যারিড। হু’স ঠু লয়াল টু হিজ ওয়াইফ।
তাই একমাত্র নিজের বউ ছাড়া দ্বিতীয় নারীকে খুশি করা তো দূর,তাকে নিয়ে ভাবতেও চাই না।”
আইরিন ফের আঘাত পেলো। হাসল বিদ্রুপ করে। বলল,
“ এ এস পি সার্থ আবরারও তাহলে বউ পাগল হয়ে গেল?”
“ হইনি,বানিয়ে ফেলেছে। তুমি কী বলবে,বলো।”
“ খুব তাড়া তোমার তাই না!”
“ যা বলার,সেটা বলো। আমরা এখানে আলাদা দাঁড়িয়ে কথা বলছি,তুশি দেখলে খারাপ লাগতে পারে।”
“ এত ভাবো ওকে নিয়ে?”
“ না ভাবার কী আছে? ভালোবাসি ওকে!”
আইরিনের চোখে জল ছুটে এলো। ভেজা গলায় বলল,

“ এই ভালোবাসাটা আমায় কেন দিলে না?”
“ এক প্রশ্ন আর কত?
যাচ্ছো, যাও। ভালো থেকো। কেন হয়নি,কী জন্যে হয়নি এসব থেকে যত তাড়াতাড়ি মুভ করবে তোমার জন্যেই ভালো।”
“ আমাকে মিস করবে না তুমি?”
সার্থ মুখের ওপর বলে,
“ না।”
“ এতটা অপছন্দ আমায়?”
“ অপছন্দ নয়,তবে পছন্দ না। আর কিছু?”
আইরিন দুপাশে মাথা নাড়ল। চোখে টলটলে পানি দেখে সার্থর খারাপ লাগল একটু। যাবার সময়, এতটা কঠোর হওয়ার তো কিছু নেই। হাতটা বাড়িয়ে ওর মাথায় রাখল সে।
“ বেস্ট অফ লাক। যেখানে থাকো,ভালো থেকো।”
আইরিন পোড়া শ্বাস ফেলতে ফেলতে চোখ মুছল।
“ তুমিও ভালো থেকো। এন্ড কংগ্রাচুলেশনস!’’
সার্থ কিছু বলার আগেই,চোখ পড়ল ওর পেছনে। তুশি দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা গোমড়া।
আইরিন ওকে অনুসরণ করে পিছু ফিরে চাইল। তুশিকে দেখেই মেজাজ ঘুরে গেল অমনি। সঙ্গে সঙ্গে তড়বড় করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল সে। তুশি সেদিক চেয়ে একটা ভেঙচি কেটে আবার সার্থর দিক ফিরল। মন খারাপ করে বলল

“ দেখেছেন? আপনার বাচ্চার মা হয়ে যাচ্ছি, তাও কেমন করল আমার সাথে? কথাও বলেনি। হিংসুটে ডাইনি একটা!”
সার্থ এগিয়ে এসে। পেছন থেকে তুশির শরীরটা দুহাতে প্যাঁচিয়ে ধরে বুকে নিয়ে নেয়।
“ তোমার খারাপ লাগেনি?”
“ কোনটা?”
“ এভাবে আলাদা ওর সাথে কথা বললাম?”
“ খারাপ লাগবে কেন? আমি কি আপনাকে চিনি না?”
সার্থ তাজ্জব হলো বৈকি! পরপরই অস্থির হাবভাব করে বলল,
“ কিন্তু আমার থেকে এই এক জিনিস আশা করবে না। আমি তোমার মতো হতে পারব না, তুশি। তোমাকে কোনো ছেলের সাথে এভাবে এক কোণে দেখলে আমি হয়ত সেখানেই শেষ!”

রুমের চাবি না নিয়েই,অয়ন ওপরে চলে এসেছে। ঠিক দরজার সামনে এসে মনে পড়ল। একবার পকেট হাতিয়ে রিসেপশনে ফের ছুটল সে। এত রাতে স্টাফ কেউ নেই এখানে। ও যাওয়ার পর গোটা করিডোরে ইউশা একা পড়ে গেল। যদিও ভয়-ডর লাগছে না। চারপাশে অনেক আলো। সরব জায়গা। ক্যামেরা আওতাধীন। বরং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক দেখল ও। এই হোটেলের একটা চমৎকার ব্যাপারে হচ্ছে প্রতিটা রুম ডুপ্লেক্সের মতো! একটার ওপর সিঁড়ি বেয়ে উঠলে আরেকটা রুম। আর প্রতি ফ্লোরে একটা করে বড়ো বারান্দা,ঠিক রুফটপের মতো খোলা। প্রত্যেকটা রুমেও আলাদা বারান্দা আছে। আবার এখানেও বানিয়েছে। এটা অবশ্য এই ফ্লোরের সবার ব্যবহারের জন্যে।
তক্ষুনি দুই সিরিয়াল পরের রুমটার দরজা খট করে খুলল কেউ। চ্যাঁচামেচি শুনে তাকাল ইউশা। এক মেয়ে লাগেজ হাতে বেরিয়ে এসেছে। পেছনে আরেক পুরুষ।
মেয়েটা রেগেমেগে বলল,
“ তুমি জাহান্নামে যাও। আমি আর এক মূহুর্তে এখানে থাকব না।”
ছেলেটা পালটা ক্ষিপ্ত হয়ে চ্যাঁচাল,
“ না থাকলে নেই। আটকাচ্ছে কে? এমনিতেও সারাক্ষণ মাথা চিবিয়ে খাচ্ছো। তোমাকে বিয়ের পর আমার ফ্রিডম চলে গেছে।
আই ওয়ান্ট আ ব্রেক ঠু!”
দুজনেই ফরেইনার। চোখেমুখে আভিজাত্য। ইংরেজির একেকটা অক্ষর শুনে ইউশা বুঝতে পারল এদের ঝগড়া লেগেছে। মেয়েটি বলল,

“ হ্যাঁ তুমিতো চাইছই সুযোগ। আমি যাই তারপর তোমার কোনো পছন্দের মেয়ে এনে তুলবে। সারাক্ষণ তো ওসব নিয়েই মজ-মস্তি করছো। আর আমি বললেই দোষ? আমিও এত অবলা নই যে তোমার পা ধরে থাকব।”
“ থেকো না। আমি যাস্ট ফেড আপ হয়ে গেছি। তোমার থেকে রুচি উঠে গেছে আমার। এবার বন্ধ হোক এসব, বন্ধ হোক।”
“ বন্ধ কী? ডিভোর্স চাইছ?”
“ হ্যাঁ “
মেয়েটির চোখেমুখের আগুন নিভে গেল সহসা।
“ কী বলছো তুমি জানো,? আমরা না ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম!”
“ ভালোবাসা মাই ফুট। তোমার মত ওভার পসেসিভ মেয়ের সাথে থাকা যায় নাকি। যেখানে যাচ্ছিলে যাও। যাস্ট গো টু হেল।”
তারপর স্ত্রীর মুখের ওপর দরজাটা ধড়াম করে আটকে দিলো সে। আর ওই শব্দে বুকটা কেঁপে উঠল ইউশার।
কোনো এক ভবিতব্য শঙ্কায় বিবর্ণ হয়ে গেল মুখশ্রী। টলতে টলতে খোলা বারান্দার দিকটায় হেঁটে এলো ও। বেঞ্চে বসল কোনোরকম। হাত পা ঘামছে। বুক ধড়ফড় করছে। বারবার কানে ভাসছে,
“ আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম!”
“ ভালোবাসা মাই ফুট!”

ইউশা কেমন করে ঢোক গিলল। চেহারা আরো ফ্যাকাশে লাগল তখন। যাদের একটু আগে দেখল, তারা ভালোবেসে বিয়ে করেও এভাবে দুজনের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে? ছেলেটা এইভাবে বলছে রুচি নেই আর? সে বিরক্ত?
তাহলে অয়ন ভাই,অয়ন ভাই তো ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেনি। করেছেন মুভ অন করতে। যদি দুদিন পর সেও পালটে যায়। ওকেও এভাবে বলে?
যদি সেও বলে, ইউশা গো টু হেল। তোর থেকে রুচি চলে গেছে! বিদেয় হ।
একবারে তাকে না পাওয়ার জ্বালা ইউশা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু পেয়েও, হারাবে কী করে? একবার তার বউ হয়েও আবার দূরে যাবে কী করে? কাঁপতে কাঁপতে হুট করে ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেল মেয়েটা। দুটো মানুষ ভালোবেসে বিয়ে করল,অথচ এই পর্যায়ে তারা এক সাথে থাকতে পারছে না? আর অয়ন ভাই সে যে ভালোই বাসেননা। তাহলে সেও চলে যাবে!
অয়ন সারা করিডোর খুঁজে, শেষে রুফটপের এই বারান্দায় ওকে পেলো। ঘনঘন পা ফেলে এসে দাঁড়াল ওর সামনে।

“ ইউশা,চাবি এনেছি,আয়।”
ইউশা মুখ তুলে চাইল। টলমলে চোখ দেখে চমকে গেল অয়ন।
উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,“ কী হয়েছে?”
ফুঁপিয়ে উঠল ইউশা। চোখের জল ঠিকড়ে পড়ল উরুতে। অয়ন চিন্তায় উত্তেজিত হয়ে পড়ে। দু হাঁটু গেড়ে ওর সামনে বসে বলল,
“ কী হয়েছে ইউশা? কাঁদছিস কেন?”
ইউশা হেচকি তুলে কাঁদছে। অয়ন হাতের আজোলে ওর দুইগাল তুলে বড়ো প্রশ্রয়ের সুরে বলল,
“ আমায় বল,
কী হয়েছে?”
তুরন্ত ধড়মড়িয়ে অয়নের বুকের ভেতর ঝাঁপ দেয় মেয়েটা। বেঞ্চ থেকে নেমে এসে হাঁটুমুড়ে বসে পড়ে সামনে। দুহাতে গলা প্যাঁচিয়ে ধরে
, বুকের সঙ্গে স্বীয় মাথাটা ঠেসে রেখে বলে,

“ অয়ন ভাই,অয়ন ভাই…
তোমার যদি আমাকে কোনোদিন সহ্য না হয়,কোনোদিন আমাকে দেখতে ইচ্ছে না করে তাও আমাকে ছেড়ে দিও না। আমি মৃত্যু অবধি তোমার বউ হয়ে বাঁচতে চাই।”
অয়নের চোখমুখ ঠান্ডা হয়ে গেল। হৃদয়ের আনাচে-কানাচে কোপ পড়ল সজোরে। আরো ধীর স্বরে শুধাল,
“ কী হয়েছে?”
ইউশা মুখ তুলে অধৈর্য হয়ে বলল,
“ তুমি আগে বলো, আমায় কখনো ছাড়বে না তো! আমাকে ভালো না বাসলে, কখনো দূরে সরিয়ে দেবে না তো!”
“ ছাড়ব না সেতো আগেও বলেছি। তাহলে আবার এই কথা কেন?”
ইউশা ছটফটিয়ে বলল,

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮১

“ কিন্তু আমি ভরসা পাচ্ছি না। আমার ভয় করছে। তোমার ছেড়ে যাওয়ার ভয়।”
“ কী করলে ভয় করবে না?”
ইউশার কান্না থামল একটু। ভেজা,নিষ্পন্দ চোখে চেয়ে রইল দু সেকেন্ড। অশ্রু জলটা চাঁদের আলোয় ওর গালে চিকচিক করছে। খোলা হাওয়ার নিষ্প্রভতা বাড়িয়ে দিতে,অয়নের চোখে চোখ রেখে বলল,
“ আমাকে একটা বাচ্চা দাও!”

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮২ (২)