কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮২ (২)
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
অয়ন স্তম্ভিতের ন্যায় চেয়ে রইল। বাকরুদ্ধ, বিহ্বল দৃষ্টিতে। আকাশ ভেঙে মাথায় পড়লে যেমন হয়,অতটা বিধ্বস্ত লাগল ওর মুখ। দু দণ্ড সময়ে সময়ে শ্বাস টেনে
কিংকর্তব্যবিমুঢ় বনে বলল,
“ কীহ?”
ইউশা নিজের মাঝে নেই। মেয়ের হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে। ভালোবাসা হারানোর শঙ্কায় ওষ্ঠাগতপ্রাণ নিয়ে ফের হুহু করে কেঁদে ফেলল মেয়েটা। অয়নের শার্টের কলার দুহাতে খামচে ধরে পাগলের মতো বলল,
“ ঠিক,ঠিক বলছি আমি। একটা বাচ্চা হলে তুমি আমাকে ছাড়তে পারবে না। ওর মায়ায় পড়ে হলেও তুমি আমাকে রেখে দেবে। বাচ্চাকে তো মা ছাড়া করবে না বলো। আমি,আমি তোমার সন্তানের মা হব অয়ন ভাই। আমি আর কিচ্ছু জানি না।”
অয়ন চুপ করে মেয়েটার কান্না শুনল,দেখল ওকে। বের হওয়ার আগে ইউশা একটু সেজেছিল। সেই কাজল লেপ্টে গালে ধুয়ে নামছে। কপালের টিপটা নড়ে গেছে বা দিকে। কিছুই ঠিক নেই। অয়ন প্রশ্রয়ের বাহানায় ওর মাথাটা টেনে নিজের বুকে এনে রাখল। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ শান্ত হ। আমি কেন তোকে ছাড়ব? শান্ত হ একটু শান্ত হ। শোন আমার কথাটা…”
ইউশা মুচড়ে ওঠে,
মাথা তুলতে চায়। বাচ্চামো করে। জেদ ধরে বলে,
“ না,আমি শুনব না। আমার কথা তুমি মানবে কিনা বলো অয়ন ভাই। বলো…”
অয়নের কি রাগ হওয়ার কথা? ইউশা এত পাগলামো করছে,কথা শুনছে না এসবে কি জেদ আসা উচিত.?
কিন্তু বড্ড আশ্চর্য হলো সে। ইউশা ওকে এত ভালোবাসে কেন? যে মেয়ে ওর মুখে শুধু একবার তুশির ব্যাপারে শুনে,কোনোদিন নিজের ভালোবাসার কথা মুখে আনেনি; নিজে ওদের দুজনকে মিলিয়ে দিতে চেয়েছে, সে আজ ওকে হারাতে হবে ভেবে এমন আবদার করে বসল? অয়নের বুকের ভেতরটা কেন যেন খুব তুলতুলে হাওয়ায় শীতল হয়ে গেল।
নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যবান মনে হলো। ভাগ্যিস ইউশাকে বিয়েটা করল, নাহলে এই ভালোবাসা,
এত প্রখর ভালোবাসার আঁচ ও পেতো কখনো? ইউশা ছটফট করে বিড়বিড় করছিল। বিলাপ বকছিল তখনো। অয়ন সেই মূহুর্তে চট করে কোলে তুলল ওকে।
থেমে গেল মেয়েটা। ধড়ফড়িয়ে গলা প্যাঁচিয়ে ধরতেই সোজা কামরায় হাঁটা ধরল অয়ন।
হোটেলরুমের বিলাসি ধবধবে সাদা বিছানা মাথার নিচে পড়তেই ইউশার চোখের পাতা পড়ল এতক্ষণে। কিছুটা বিভ্রান্তি,কতক বিস্ময় নিয়ে ও চেয়ে চেয়ে দেখল অয়ন দরজা লক করে দিয়েছে। তারপর মানুষটা এসে ওর পাশে বসল। পেলব হাত থেকে ঘড়ি,ব্রেসলেট, কানের দুল গলা থেকে স্কার্ফ খুলে নিয়ে রেখে দিলো পাশে। এমনকি নিসঙ্কোচে ইউশার পায়ের হিলটা অবধি খুলে দিলো অয়ন। ডিমবাতি জ্বালিয়ে কামরার ঝকঝকে আলো বন্ধ করে বিছানায় শুলো ওর পাশে। হাত বাড়িয়ে ডাকল,
“ বুকে আয়!”
ইউশা হাঁ করে দেখছিল ওকে। ঢোক গিলে অল্প এগিয়ে বুকে মাথা রাখল। অয়ন ওর মসৃণ চুলে আঙুল নাড়তে নাড়তে বিলি কেটে বলল,
“ একটা বাচ্চা কখনো একটা সম্পর্কের ভীত হয় না। তাহলে কি কখনো সমাজে এত ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের সেপারেশন দেখে বড়ো হতো? কিংবা আমার বাবাকেই দ্যাখ,সে তো তার তিনজন সন্তান রেখেও জেসমিন নামের এক নারীর সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। তাই
যে সম্পর্ক থাকার তা এমনিই থাকবে। সম্পর্ক একটা বৃক্ষের মতো ইউশা। প্রথমে ও এমনিই জন্মাবে। কিন্তু সেটা একটু একটু করে পানি, সার, যত্ন, খুঁটি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আমাদের। ফুল ফোটার সময় দিতে হবে। তাড়াহুড়ো করলে হয় না ওসব। আমরা স্বামী স্ত্রী! সারাজীবনের জন্যে একসাথে পথ চলার ওয়াদাবদ্ধ হয়েছি। এক দুদিনের তো নয় এই ওয়াদা। কিছু দিন যাক, আমরা দুজন দুজনের সাথে আরো সহজ হই, তারপর তো আর পাঁচটা স্বামী স্ত্রীর মতোই আমরা থাকব। কিন্তু
আজ যদি তোর কথায় আমি স্বায় দিই, সেটা মনের বাইরে গিয়ে তোকে ছোঁয়া হবে ইউশা। একরকম সম্পর্ক টেকানোর স্পর্শ। এটা আরো তোকে অসম্মান করা হবে। আমি তা চাই না। আমি তোকে প্রথম স্পর্শ ভালোবেসে করব। সম্পর্ক বাচ্চা দিয়ে কেন টিকতে যাবে? আমাদের সম্পর্ক টিকবে ভালোবাসা দিয়ে। আজ তুই আমাকে যেমন ভালোবাসিস,একদিন আমি এর চেয়েও বেশি ভালোবাসব তোকে। তুই শুধু একটু মানিয়ে নে! একটু বিশ্বাস রাখ। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, তোকে ভালোবাসব তাই। আর আমি যে আমার চেষ্টায় সফল হব, এটুকু কনফিডেন্স আমার নিজের প্রতি আছে। বুঝলি?”
শেষ কথায় নাকটা টেনে দিলো অয়ন। কত্ত স্বাভাবিক ও! দেখে মনেই হলো না একটু আগে বাইরে স্ত্রী কী অদ্ভুত হাবভাবের সম্মুখীন হয়ে এলো!
ইউশা সব কথা ভদ্র মেয়ের মত শুনল। অয়ন শ্বাস টানল,ছাড়ল আবার। ইতস্তত করল কিছু একটা নিয়ে। তার সাবলীল চেহারায় স্পষ্ট ফুটে উঠল সেই ছাপ। ইউশার বিমুঢ় নজরের মাঝেই হুট করে ঠোঁট নামিয়ে একটা চুমু খেল ওর কপালে।
বলল – “ আজকের জন্যে এটুকুই, ঘুমা এখন।”
চমকে গেল ইউশা। এক চোট দোলে কাঁপল ওর শরীর। বিস্মিত বনে চেয়ে থাকতে দেখে অয়ন চোখ রাঙিয়ে বলল – “ ঘুমা।”
চট করে মেয়েটা চোখ বুজে নিলো। পাঁচ -দশ মিনিট পর অয়ন টের পেলো ইউশা সত্যিই ঘুমিয়ে গেছে। স্বস্তির শ্বাস নিতে নিতে নিজের মাথাটা পেছনে হেলে দিলো ও। কিছুক্ষণ ওইভাবেই কাটল ওদের। তারপর আস্তে করে মেয়েটাকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে,বিছানা থেকে নেমে গেল অয়ন। এখন ওর ফ্রেশ হওয়া বাকি!
গাইনি ডাক্তারের চেম্বারে তুশির সিরিয়াল ছিল ৬। একবার দেখিয়েছে। আলট্রাসাউন্ড করিয়ে হাতে রিপোর্ট পেলো মাত্র। এখন দেখাতে হবে আবারো। চশমা পরা,অভিজ্ঞ নারীর ডাক পরতেই ফাইল হাতে উঠে গেল তুশি। চেয়ারে বসতেও পারেনি,সার্থ দরজা ঠেলে বলল,
“ এ্যাম আই অ্যালাউড?”
ভদ্রমহিলা শুধালেন,
“ আপনি ওনার হাজবেন্ড?”
“ হুঁম। “
“ জি, আসুন।”
সার্থ এসে পাশের চেয়ার টেনে বসল। ওর গায়ে ইউনিফর্ম। তুশিকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে,আবার থানায় যাবে।
ভদ্রমহিলা একপল চশমার ভেতর থেকে ওর বুকের ওপর লাগানো নামের অংশটুকু পড়লেন।
হেসে বললেন
“ ওহ আই সী, মিস্টার সার্থ আবরার। আপনাকে তো একটা ধন্যবাদ জানানো বাকি!”
সার্থ ভ্রু বাঁকাল,
“ কীসের?”
“ লাস্ট কটা কেস দেখলাম তো!”
“ ইটস মাই ডিউটি!”
ফাইল চাইতে তুশির দিকে হাত বাড়ালেন তিনি। মেয়েটা স্বদ্যোগে এগিয়ে দেয়। ভদ্রমহিলা উল্টেপাল্টে দেখে বললেন,
“ বললাম না, ৯ সপ্তাহ চলছে। হার্টবিট ভালো। তবে আপনার হিমোগ্লোবিন কম। ওষুধ যা যা দেব সব নিয়ম করে খাবেন। লং জার্নি করা যাবে না। উপুড় হয়ে শোবেন না। কাচা পেঁপে এড়িয়ে যাবেন। এখন থেকে কোনো এন্টিবায়োটিক নেয়া বন্ধ। বেশি বেশি ডিম,দুধ,ফল খাবেন। মিষ্টি কম খাবেন। স্যুগার বেড়ে যায় এ সময়।”
তুশি বাধ্যের ন্যায় ঘাড় কাত করল। সার্থ ফট করে জিজ্ঞেস করল,
“ ইন্টিমেসিতে কোনো ঝামেলা আছে?”
ভদ্রমহিলা একটু ভ্যাবাচেকা খেলেন। তুশিও লজ্জায় হাঁ করে চাইল ওর দিকে। সার্থর মাঝে প্রভাব পড়ল না। উলটে ফের বলল,
“ ক্যান উই…!”
ভদ্রমহিলা ধাত সামলে বললেন,
“ জি পারবেন। ওনার তেমন কোনো কমপ্লিকেশন নেই। বরং রিপোর্ট খুব ফ্রেশ!”
সার্থ হাপ ছাড়ল, যেন বাঁচল বড়ো। তুশির দিক তাকাতেই দেখল মেয়েটা তাজ্জব চোখে চেয়ে। ও নির্লিপ্ত চিত্তে বলল,
“ কী? দরকারি প্রশ্ন করব না?”
ভদ্রমহিলা হাসলেন,
“ কোনো সমস্যা নেই। ইটস নরমাল। আপনি তাহলে আসুন। নিয়মিত চেইক আপে থাকবেন। নিজের খেয়াল রাখবেন।”
সার্থ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“ ওর রাখতে হবে না। আমিই যথেষ্ট। আপনি প্রেসক্রিপশন আমাকে দিন।”
ভদ্রমহিলা ফের হাসলেন। তুশিকে বললেন,
“ আপনি লাকি কিন্তু হু? বেশ ভালো হাজবেন্ড আপনার!”
তুশিও এ পর্যায়ে মাথা নুইয়ে হাসল। বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিতে নিতে সার্থকে দেখে ভাবল,
“ সে আর বলতে!”
তুশির ছাদের দোলনায় বসে পা দোলাচ্ছিল। মা হওয়ার খবর পেয়ে বাড়িতে ওর খুব কদর বেড়ে গেছে। এখন কাজের মধ্যে দুই,খাই আর শুই। দাদিও আর সকাল সকাল ঘুম থেকে তুলতে আসে না।
তুশির হাতে তেঁতুলের আঁচারের কাচের বৈয়াম ছিল। রোদে শুকোতে দিয়েছিলেন তনিমা। ও এসেই ঢাকনা খুলে আঙুল ডুবিয়ে দিয়েছে। আজকাল টক দেখলে এত্ত লোভ হয়!
কিছু সময় পর, নিচ থেকে হাসনা হাঁক ছুড়লেন।
কর্কশ গলায় ডাকলেন,
“ এ ছেরি,সন্দ্যা হইতাছে। নামোস না ক্যা?”
তুশি চ্যাঁচিয়ে জানাল,
“ নামি দাদি!”
“ দুই গন্টা বইয়া হুনতাছি নামি নামি। নাম ছেরি। পিছা লইয়া আসমু?…
ওহ হো,তুমিতো অহন পোয়াতি। তোরে পিডান যাইব না। তুই নাম তুশি। সন্দ্যাকালে ছাদে থাকোন ভালা না। জিন আইসা চুমা দি….”
হাসনার বকবক মাঝরাস্তায় থামল। কী দেখে যেন কথা আটকে নিলেন। তুশি একবার পিছু চেয়ে ভাবল, দাদি হয়ত নিজেই আসছে এখানে।
আসুক না,একটু কথা শোনালেও তুশি ছাদে আরো সময় বসবে। এত নরম নরম বাতাস। বৈশাখ মাসেও আবহাওয়া এত ঠান্ডা থাকে! আহা,কী যে ভালো লাগছে।
সেসময় মাথার পেছন দিকে দু আঙুল দিয়ে টোকা মারল কেউ একজন। চমকে ফিরল মেয়েটা। ইউনিফর্ম পরা সার্থ ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ এখানে কী?”
তুশি উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
“ আপনি, এত আগে চলে এলেন! ভালোই হয়েছে। চলুন ঘরে যাই।”
“ ঘরে গিয়ে কী করবে? কিছু কি ভাবছো?”
“ কী ভাবব?”
“ কাল ডাক্তার কী বলেছে শুনেছ?”
“ কী?”
“ এটা সেইফ জোন!”
“ আপনার মাথায় খালি ওসব ঘুরতে থাকে তাই না! আমি মোটেই সেজন্যে ঘরে যেতে চাইনি। আমি তো গল্প করব ভাবছি।”
সার্থ হাত পাতল। তুশি লাফিয়ে লাফিয়ে ধরল ওর হাতটা।
সার্থ সামনে পা বাড়িয়ে বলল,
“ মা হচ্ছো ভালো, কিন্তু পড়াশোনার কথা ভুলে গেলে চলবে না। তোমার ক্লাস ফোরের ফাইনাল আসছে খুব সুন। পড়তে হবে তুশি! নাস্তা খেয়ে সোজা পড়ার টেবিলে।”
তুশি থেমে দাঁড়াল অমনি। ঠোঁট গোজ করে বলল,
“ আমার এখন পড়তে ইচ্ছে করছে না।”
“ শুনছি না ওসব।”
“ এখন পড়ে কী করব? এর চেয়ে দুজন চা খেতে খেতে গল্প করি চলুন!”
শেষটুকু বলতে বলতে দুহাতে সার্থর গলা প্যাঁচিয়ে ধরল তুশি। ও সঙ্গে সঙ্গে হাত দুটো নামিয়ে দিয়ে বলল,
“ এত সহজে আমাকে পটানো যায় না।
ইউশাকে না কেঁদে কেঁদে বলছিলে পড়ার খুব শখ? শখ পালাল কেন?”
তুশি মাথা নুইয়ে ঠোঁট উলটে বলল,
“ আসলে আমার লজ্জা লাগছে!”
“ লজ্জা! কীসের?”
“ দুদিন পর মেয়ের মা হব, মেয়ের সাথে একইসঙ্গে স্কুলে যাব বলুন? ইস, কী বাজে লাগবে।”
সার্থ তাজ্জব হয়ে বলল,
“ এসব ঢুকেছে মাথায়? নিজে নিজে ঢুকিয়েছ,না কেউ ঢুকিয়েছে?”
“ কে ঢোকাবে? আমিই ভেবে দেখলাম।”
“ আর ভাবার দরকার নেই। তোমার এরকম চিন্তাভাবনার জন্যেই তোমাকে নরমাল কোনো স্কুলে আমি দিইনি। যেখানে ভর্তি করিয়েছি সেখানে কত বয়সের লোক পড়ে দেখোনি? তারপরেও এসব কথা আসবে কেন?”
তুশির মুখটা নুইয়ে গেল। মিনমিন করে বলল,
“ কিন্তুউউউ, আপনি হাসবেন না?”
“ হাসব কেন?”
তুশি অসহায় মুখে বলল,
“ আপনার বাচ্চাও পরীক্ষা দিচ্ছে,আমিও দিচ্ছি। হাসবেন না আপনি?”
সার্থর দীপ্ত চোখটা নিভে গেল অমনি। খারাপ লাগল এ যাত্রায়। একটু এগিয়ে দুহাতে মেয়েটাকে নিয়ে এলো বুকে। প্রশ্রয়ের সুরে বলল,
“ বোকা!
তুমি কি ইচ্ছে করে পিছিয়ে আছো?
ভাগ্য পিছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই পিছিয়ে থাকা বেশিদিনের হবে না। তুমি একদিন অনেক এগিয়ে যাবে তুশি। সেদিন পেছনে ফিরে তুমি যতবার তাকাবে,আমি ততবার তোমাকে আরো এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দেব।”
তুশি ঐ বুকটায় মিশে রয়। প্রাণ ভরে শুষে নেয় স্বামীর শরীরী উষ্ণতা। বলে,
“ আমি একা কখনো এগোবোই না। তাও আপনাকে পেছনে রেখে। আমি সব সময় আপনার হাত ধরে ধরে হাঁটব। জীবনের প্রত্যেক বাঁকে আমি আপনার সঙ্গে সঙ্গে থাকব।”
সার্থর হৃদয় জুড়িয়ে গেল। এমন প্রাণে লাগার মতো কথা ওকে কেউ কখনো বলেনি। প্রশান্তির নিঃশ্বাসটা লুকিয়ে দুষ্টুমি করে বলল,
“ আচ্ছা? তাহলে তো পড়তে হবে। কারণ সার্থর শিক্ষিত বউ চাই। সে ক্লাস ফোরের মেয়েদের সাথে হাঁটে না।”
তুশি কপাল কুঁচকে চাইল। মৃদূ রেগে বলল,
“ হাঁটে না, কিন্তু বাকিসব করে।”
সার্থ চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ অ্যাই! “
“ কী? ভয় পাই না।”
“ তাই?”
ও মাথাটা একটু এগোতেই,তুশি সাথে সাথে নিজের ঘাড় পিছিয়ে বলল,
“ না না, পাই।”
হেসে ফেলল সার্থ। ভ্রু দিয়ে ইশারা করল নিচে নামার জন্যে এগোতে।
তুশি যেই মারবেল সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে,ঝট করে কোলে তুলল ওকে। মেয়েটা অবাক হলেও,চমকায়নি। হাসল বরং। সার্থ সেই আলোর মতো হাসি দেখে মুগ্ধ চোখে বলল,
“ তোমার চেহারায় কেমন অন্যরকম মায়া এসেছে। শুধু তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে তুশি!”.
তুশি লজ্জা পেলেও মিহি স্বরে বলল,
“ আগে বুঝি করতো না?”
“ আগে তো আমার স্ত্রী ছিলে,এখন আমার সন্তানের মা হবে। দুটো সৌন্দর্য আলাদা! তাকিয়ে থাকাও আলাদা।”
হাসনা ছিলেন সিঁড়ির গোড়ায়। তখন সার্থকে দেখেই কথা থামিয়েছিলেন। অপেক্ষা করছিলেন ওদের নেমে আসার জন্যে। পায়ের শব্দে চোখটা তুলেই ভড়কে গেলেন কিছু। দুজনকে দেখে অবাক হয়ে বললেন,
“ ও মায়া মায়া গো,কালে কালে কত কী দেখমু!
গেলি লাফাইতে লাফাইতে,আইলি সোয়ামির কোলে। ঘোড়া দেইখা খোড়া হইসো তুমি?”
তুশি বলল,
“ আমি? আমি কি নিজে উঠেছি? উনিই তো তুললেন।”
“ হ,এমনেই সব বাঘে হরিণের যত্ন লয়। বুঝি সব বুঝি!”
সার্থ পাশ কাটাতে কাটাতে বলল,
“ দাদি, খুব বেশি হিংসে হলে বলুন,ওকে নামিয়ে আপনাকে নিচ্ছি!”
হাসনা জিভ কাটলেন। লজ্জায় থতমত খেয়ে, “ আমারে নেওন লাগতো না, এমনে কইসি’’
বলেই নেমে গেলেন ত্রস্ত।
তুশি দাদির মুখটা দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। সার্থ ওকে বিছানায় এনে বসাল।
হঠাৎ বলল,
“ আচ্ছা,তখন তুমি বললে মেয়ের কথা। মেয়ে হবে আমাদের? ডাক্তার বলেছেন কিছু?”
“ না তো। এত তাড়াতাড়ি তো বোঝা যাবে না। আর আমি জিজ্ঞেসও করব না। কারণ আমি জানি,আমার মেয়েই হবে। মন বলছে বুঝলেন!”
সার্থ পাশে বসে কামিজের ওপর থেকে তুশির পেটে হাত রাখল। ভ্রু কুঁচকে কী যেন ভেবে বলল,
“ কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ছেলে হবে। আর আমার মতো হবে!”
“ না। মেয়েই হবে!”
“ আচ্ছা হোক,যা হবে আমাদেরই তো।”
তুশি যত্ন নিয়ে নিজের পেটে হাত বোলায়। ওর মুখটা চকচক করে মাতৃত্ব অনুভব করার শান্তিতে। হাসিহাসি চেহারায় বলে,
“ আমি আমাদের মেয়ের একটা সুন্দর নাম রাখব। সারাদিন ওকে সাজাব,সুন্দর করে শাড়ি পড়াব। একটা পুতুল বানিয়ে রাখব দেখবেন!”
পাটায়ায় আজ বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল থেকে ভালোই রোদ ছিল,তবে বৃষ্টি বেড়েছে দুপুরের পর।
সেজন্যে ঘরে আটকা পড়েছে অয়নরা।
বড়ো বিশাল থাই গ্লাসের পাড় দিয়ে ও আরেকবার বাইরেটা দেখল। নাহ, প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। বের হওয়া যাবে না। অয়ন পর্দা টেনে দিলো যাতে বাঁজ পড়লেও আলো রুমে না আসে। ইউশা আবার সিনেমার নায়িকাদের মতো বজ্রপাতে ভীষণ ভয় পায়।
ভাবতে গিয়ে নিজেই হেসে ফেলল অয়ন।
পরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল৷ ইউশা সকাল থেকে কথাবার্তা বলছে না। চোখে চোখ রাখছে না।
আবদারও করছে না খাবার দাবার নিয়ে।
ঘুম থেকে দেরিতে ওঠায় ওরা এখনো লাঞ্চ করতে নামেনি। তার আগেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হোটেলে লাঞ্চের সুবিধা আছে,আজ সেখানেই খেতে হবে তাহলে।
ইউশা গোসলে গিয়েছে। মেয়েটা কি কালকের ব্যাপার নিয়ে লজ্জা পাচ্ছে ওকে? বা অস্বস্তি হচ্ছে ওর? ওসব কেন হবে? বাচ্চা তো নিজের বরের কাছেই চেয়েছিল। বিয়ে যখন হয়েছে বাচ্চা আসাও স্বাভাবিক। কিন্তু অয়ন কবে পারবে সহজ হতে? এত চেষ্টা করছে, এত! এতবার মন্ত্রের ন্যায় স্বামী-স্ত্রী শব্দ জপছে মুখে, কিন্তু কোথাও গিয়ে ইউশাকে ধরতে ওর জড়োতা হয়। পাছে মেয়েটা ভাবে, তুশিকে ভুলতে ছুঁচ্ছে!
অয়ন ফোস করে শ্বাস টেনে পিছু ফিরল। চমকে গেল অমনি। আনত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউশা। অয়ন ওয়াশরুমের খোলা দরজাটা দেখল এক পল। অবাক হয়ে বলল,
“ কখন এলি তুই?”
ইউশা জবাব না দিয়ে ঠোঁট টিপে নিচের দিকে চাইল৷ হাতের আঙুল কচলে কচলে দোনামনা করল দু এক পল। অয়ন বলল,
“ কিছু বলবে,ইউশা?”
ওর তুমি ডাকে চোখ তুলে চাইল মেয়েটা। শুষ্ক দৃষ্টিতেও গলা ধরে এলো। ছোটো করে খুব আস্তে বলল,
“ সরি!”
“ কেন?”
“ কালকের জন্যে। আমার মাথা ঠিক ছিল না। বুঝতে পারিনি কী থেকে কী করে ফেললাম। তোমাকে বিব্রত করলাম অনেক তাই না?
সরি!”
অয়ন মুচকি হেসে বলল,
“ শাড়ি পরবি?”
প্রসঙ্গ পালটে যাওয়ায় একটু ভড়কে গেল মেয়েটা। নিশ্চিত হতে শুধাল,
“ হু?”
“ শাড়ি পর।”
“ এ- এখানে? তুমি যে বললে…”
অয়ন বারান্দা ছুঁয়ে যাওয়া মুষলধারার বৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“ বৃষ্টি দেখে ইচ্ছে করল। পরবি?”
“ পরলে তোমার ভালো লাগবে?”
ঘাড় নাড়ল অয়ন। সঙ্গে সঙ্গে চপল পায়ে লাগেজের কাছে ছুটে গেল ইউশা।
ও দুটো শাড়ি এনেছিল সমুদ্রের পাড়ে পরে ঘুরবে,ছবি তুলবে বলে।
দুটোই বের করে বলল,
“ কোনটা পরব অয়ন?”
অয়ন একটু চমকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
এগিয়ে এসে কালো শাড়িটা বেছে হাতে দিয়ে বলল,
“ একা পরতে পারবি?”
“ হ্যাঁ পারব তো। তোমার ইউশা সব পারে। জুতো থেকে চন্ডিপাঠ সব কাজ পারি বুঝেছ। খালি হুকুম করবে, দেখবে সব হাজির।”
পাখির মতো বকবক করতে করতে শাড়ি-ব্লাউজ সহ ফের ওয়াশরুমে দৌড়ায় সে। তবে অয়ন,ও স্তব্ধের ন্যায় চেয়ে রয় সে পথে। কী বলে গেল মেয়েটা? তোমার ইউশা!
হ্যাঁ ওরই তো। বউ যখন ওর,ইউশা পুরোটাই ওর তাহলে।
খট করে দরজা খোলার শব্দে অয়নের টনক নড়ল। দাঁড়াল নড়েচড়ে। ইউশার কালো শাড়িটা প্লেইন,কোনো কাজ নেই প্রিন্ট নেই। সাথে একটা থ্রি কোয়ার্টার স্লিভের কালো ব্লাউজ পরেছে। চুলটা খোলা,তবে এলোমেলো একটু। বেরিয়ে এলো স্ফূর্তিতে।
খুব চঞ্চল সুরে শুধাল,
“ কেমন লাগছে?”
অয়ন তাকানোর আগে দম নিলো। মন থেকে চাইল, ও যেন আজ ইউশাকে বউয়ের চোখে দেখতে পারে। যেন একজন স্বামীর মতোই কমপ্লিমেন্ট দিতে পারে। তারপর ঘুরে চাইল ছেলেটা। ইউশাকে সত্যিই চোখ জুড়িয়ে দেয়ার মতো লাগছে। জর্জেটের ফিনফিনে কাপড় থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে লতানো কোমরের দুপাশের বাঁক। মেদহীন পেটের সাথে লেগে যাচ্ছে শাড়িটা। গায়ে গয়না নেই,সাজ নেই মুখে। এইত গোসল করে এসছিল। চুল আধভেজা এখনো। আচড়ায়ওনি। প্রকৃত সুন্দর বুঝি একেই বলে? কী আশ্চর্য,এত সুন্দর মেয়েটা ওর চোখের সামনে ঘুরল এতদিন, ও তাহলে খেয়াল করল না কেন? এতটা অন্ধ কবে হয়ে গেছিল ও! ইউশার আপাদমস্তক চেয়ে চেয়ে দেখল অয়ন। মেয়েটা ফের শুধাল অধৈর্য হয়ে,
“ কেমন লাগছে?”
“ আদর আদর!”
ইউশার মুখটা লাল হলো। মাথা নোয়াতেই থাই গ্লাস টেনে দেয়ার শব্দটা প্রকট হয়ে ভেসে এলো কানে। সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির ছাঁট হূলস্থুল করে কামরায় ঢুকল। ভিজে গেল চকচকে মেঝে। ইউশা বিভ্রম নিয়ে বলল,
“ ভিজবে অয়ন?”
অয়ন ফের হেসে ফেলল। ইউশা মিইয়ে গিয়ে বলল- না মানে অভ্যেস করছি। শুনতে বাজে লাগছে?”
“ না। এসো।”
অয়ন হাত বাড়িয়ে দেয়। সহাস্যে এগোয় ইউশা। মসৃণ পায়ের তালু বারান্দার ফ্লোর ছুঁতেই পুরো শরীর ভিজে গেল দুজনের। চুল থেকে কাপড় সব লেগে গেল গায়ে।
ইউশা চোখ খিচে বুজে নিলো। এত বেগ নিয়ে ত্যারছা ভাবে বৃষ্টি ধেঁয়ে আসছে,তাকানো দুষ্কর।
অয়নের পরনে অফ হোয়াইট ট্রাউজার,আর সাদা পেলো টিশার্ট। তালু থেকে চুল চুইয়ে এসে কপালের ওপর পড়ছে। হাত দিয়ে ঠেলে পূর্ণ দৃষ্টিতে ইউশার দিকে তাকাল ও। আজ সেই চাউনিতে সঙ্কোচ আসতে দিলো না। দিলো না কোনো জড়োতা কিংবা অস্বস্তির জায়গা।
ভেজা শাড়িতে ইউশার পেট চেয়ে আছে। আকর্ষণীয় মেয়েলি গতর ধরাছোঁয়ার মধ্যে।
ধনুকের মত বাঁকানো শরীরের সব থেকে নিবেশিত অংশ,বুকের খাজটায় নজর পড়তেই অয়ন চোখ সরাতে চাইল।
পরপর মনে হলো সরালে হবে না। ইউশাকে ওর দেখতে হবে। যতভাবে, যেভাবে ইচ্ছে হয় দেখার সাহস করতে হবে।
ইউশা তক্ষুনি বলল,
“ বাবাহ,এত মুষলধারায় বিদেশেও বৃষ্টি হয়? তাকানোই তো যায় না।”
বলতে বলতে ঘাড় ফেরাতেই,থমকাল এক চোট। সহজ মুখটা নুইয়ে পড়ল লাজে।
“ কী দেখছো?” অয়ন উত্তর দিলো না। চেয়ে রইল অমন। ইউশার শরীরটা কেমন বিবশ হতে শুরু করল। ছটফটিয়ে পাশ কাটিয়ে ফিরতে নিলেই হাত টেনে ধরল অয়ন। ডাকল ধীর স্বরে,
“ ইউশা?”
“ হু?”
এক হ্যাচকা টানে পাশ থেকে মেয়েটাকে নিজের সামনে এনে দাঁড় করাল অয়ন। ঠিক মুখোমুখি। মূহুর্তে কোমর জড়িয়ে ধরল এক হাতে। ইউশার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। চিবুক মিশে গেল গলায়। অয়ন বলল,
“ আমার দিকে তাকা।”
বর্ষার তাণ্ডব ছাপিয়ে নিভু নিভু নয়ন জোড়া তুলল ও। অয়ন ঢোক গিলল চোখাচোখি হতেই। কাজল দেয়ার পরেরদিন মেয়েদের চোখ হয়ত আরো বেশি সুন্দর লাগে। এই যে,ইউশার ভাসা ভাসা আঁখিদুটো যেন কবিতার মতো! এই চোখে চেয়ে শুধু জীবনে মুভ অন নয়, শত জনম এমনিই কাটিয়ে দেয়া যাবে।
অয়ন বলল,
“ এবার আমাকে জড়িয়ে ধর। ঠিক কালকের মতো, শক্ত করে ধরবি।”
ইউশা হতবাক হয়ে বলল,
“ হ্যাঁ?”
হ-হঠাৎ, কেন?”
“ তুই কাল জড়িয়ে ধরায় আমার হার্ট খুব জোরে বিট করছিল। আজকেও করে নাকি দেখব। ধর।”
ইউশার চোখে বিস্ময়ের ভেলকি। বুঝল না কী করবে! অধৈর্য হয়ে নিজেই ওর হাতদুটো নিজের শরীরের দুপাশে প্যাঁচিয়ে দিলো অয়ন। তুরন্ত ইউশার বুক এসে লাগল তার বুকে। ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যেতেই অয়ন হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরল ওকে৷
ইউশা কাঁপতে কাঁপতে মিশে গিয়ে শুধাল,
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮২
“ ক-করছে?”
“কথা বলিস না। আই হ্যাভ টু ফিল ইট!”
ইউশা সত্যিই চুপ করে গেল। এখনো বৃষ্টি পড়ছে। তার মাঝে অয়নের সাথে মিশে মিলে একাকার হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। খুব দূরে বাজ পড়ল তক্ষুনি। ইউশা ভয়ে এতক্ষণের শিথিল হাত দুটো দিয়ে খামচে ধরল ওর পিঠ। মুখ আলগোছে লুকিয়ে নিলো বুকের ভেতরে।
অয়ন সঙ্গে সঙ্গে শ্বাস নিয়ে বলল,
“ করছে! মাই হার্ট বিটেড সো ফাস্ট।”
