Home কাজলরেখা কাজলরেখা পর্ব ৪০ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪০ (২)

কাজলরেখা পর্ব ৪০ (২)
তানজিনা ইসলাম

চাদনী কোলবালিশ কোলে নিয়ে আসলো আঁধারের কক্ষে। আঁধার ওর বালিশ নিয়ে এসেছে। ও যখন কক্ষে এসে ঢুকলো, আঁধার তখন বিছানায় বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছিলো। চাদনীর উপস্থিতি টের পেয়ে ওর দিকে না তাকিয়ে বললো

-“তবুও,তুই তোর কাপড়চোপড় নিয়ে আসলি না? এতোবার করে বলার পরও।”
-“না। আমি শুধু রাতে থাকবো এখানে।”
-“যা মন চায় কর।”
চাদনী ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। আঁধার তাকালো ওর দিকে। কপালে ভাজ ফেলে বললো
-“দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
-“কোথায় শোবো?”
-“আমার মাথায়!”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

চাদনী মুখ বাকিয়ে বিছানার একপাশে জায়গা করে শুয়ে পরলো। বেডের মাঝবরাবর বালিশ দিয়ে আঁধারের দিকে পিঠ করে শুলো। আঁধার একপলক তাকালো ওর দিকে। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে আবার ল্যাপটপে মনোযোগ দিলো। ভার্সিটির ওয়েবসাইটগুলো চেক করছে ও। কুয়েশ্চন দেখে মনটা ভীষণ ভাবে খারাপ হয়ে গেলো আঁধারের। ও এক্সামের জন্য আলাদা করে আগের রাতে প্রিপারেশন নেয়নি। তারপরও আগের পড়াই এনাফ ওর জন্য। ও সত্যিই অনেক কষ্ট করেছে। প্রজেক্ট নিয়ে অনেক খেটেছে। প্রিপারেশন ছাড়া এক্সাম দিলেও অনেক ভালোই হতো। আঁধার ল্যাপটপ বন্ধ করে রেখে দিলো পাশে। ও বাইরে দেখাচ্ছে না কিন্তু ভেতরে ভেতরে সত্যিই অনেক কষ্ট হচ্ছে ওর। আঁধার পাশ ফিরে তাকালো। বিছানার একেবারে শেষপ্রান্তে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে। আঁধার ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে দিলো ওর গায়ে।নিচে নেমে দরজা বন্ধ করতে গেলো।
চাদনী হুড়মুড়িয়ে উঠে, চিল্লিয়ে বললো

-“দরজা কেন বন্ধ করছো তুমি?”
আঁধার দ্রুত পিছনে ফিরে বললো
-“ঘুমোসনি তুই? চিল্লাচ্ছিস কেন এভাবে?”
-“দরজা বন্ধ করবে না!”
-“দরজা খোলা রাখবো? ভাই, তোর কমনসেন্স নাই কোনো।
-“কমনসেন্সের কী আছে? ঢাকাতে যখন আমরা এক রুমে থাকতাম, তখন তো দরজা বন্ধ করার প্রয়োজন পরতে না। এখানে কেন করতে হবে?”
-“তো ওখানকার ব্যাপার আর এখানকার ব্যাপার এক? কে কখন চলে আসে। সকালে কেও যদি এসে আমাদের একসাথে দেখে!”

-“একসাথে কী? জাস্ট এক বিছানায় ঘুমানো, দেখলেও কী? দরজা বন্ধ করবে না।”
আঁধার ওর কথা না শুনে দরজা বন্ধ করে দিলো।
-“তুই তোর ব্রেইন, রুমের বাইরে রেখে চলে এসেছিস, তাই না চাদনী!”
-“আমি এভাবে থাকতে পারবো না।”
আঁধার বিছানায় এসে আধশোয়া হয়ে বসলো। কোলবালিশটা জড়িয়ে ধরে বললো
-“বিয়ের পরও আমার কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে হচ্ছে! কী কপাল!”
-“দরজা খুলে দিচ্ছি!”
-“ভয় পাচ্ছিস? বদ্ধ ধরে তোর সাথে জোরাজোরি করবো?”
চাদনী পাংশুটে মুখে চেয়ে থাকলো। বললো না কিছু।

-“চিন্তা করিস না। তুই ছোট মানুষ, তোর সাথে আর কি জোর করবো আমি! তারপর তো আবার আমাকে জঘন্য বলবি!”
চাদনী ওপাশ ফিরে শুয়ে পরলো আবার।আঁধার বললো
-“লাইট অফ করে দেই?”
চাদনী চিল্লিয়ে বললো
-“না।”
-“ঠিক আছে মা,কানের মাথা টা খাস না আমার! আস্তে বললেও আমি শুনতে পাই।”
অনেকটা সময় দু’জনের নীরবতায় কেটে গেলো। আঁধার কোলবালিশ সরিয়ে চাদনীর কাছে ঘেঁষলো। ওর মনে হলো চাদনী আবার চেঁচাবে! কিন্তু ও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।ও কী ঘুমিয়ে গেছে? আঁধার ডাকলো

-“চাঁদ!”
-“হু।”
আঁধার ওর পিঠে হাত দিলো।
-“তোকে একটু জড়িয়ে ধরি?”
-“হু।”
-“কী হু? সত্যিই তুই চেঁচামেচি করছিস না?আমাকে জড়িয়ে ধরতে দিচ্ছিস?”
-“দিচ্ছি।”
আঁধার একহাতে জড়িয়ে ধরলো চাদনী কে।ওর মাথার তালুতে থুঁতনি রেখে বললো
-“কী হয়েছে রে?”
-“কিছু না।”
-“এদিকে ফিরবি?”
চাদনী আঁধারের দিকে ফিরলো। চোখ তুলে দেখলো ওর মুখ। আঁধার গালে হাত রেখে বললো
-“এতো বাধ্য হয়ে গেছিস,হঠাৎ?”
চাদনী মাথা নিচু করে ফেললো। আঁধার ওর মাথা ঠেসে জড়িয়ে ধরলো বুকের সাথে।

-“দম বন্ধ হয়ে মারা যাবো!”
-“মরে যা, আমার বুকেই না-হয়। অন্য কারো কাছে যাস না।”
-“কার কাছে যাবো? সবসময় এটা কেন বলো!”
-“আমার ভয় লাগে।”
-“কেন? আমাকে কে চয়েস করবে?কার চোখের পাওয়ার এতো কমে গেছে!”
-“জানি না। তুই নিজেকে যেমন ভাবিস আসলে তুই তেমন না। চোখের পাওয়ার ঠিক থাকলেও তোকে চয়েস করে ফেলতে পারে কেও না কেও।তুই বুঝবি না!”
-“তুমি বোঝো?”
-“হ্যাঁ, তাই তো ভয় পাই।”
চাদনী হা করে শ্বাস নিলো। একে ব্ল্যাঙ্কেট গায়ের উপর। তারউপর আঁধার সাপের মতো পেঁচিয়ে রেখেছে ওঁকে।
চাদনী বললো

-“আমি শ্বাস নিতে পারছি না!আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! এভাবে শক্ত করে ধরেছো কেন?”
আঁধারের ভাবাবেগের কোনো পরিবর্তন হলো না।
-“চাঁদ! চল না, আমরা ঢাকায় চলে যাই। ভালো লাগছে না এখানে।”
-“না।আমি এখানেই থাকবো। তুমি কেন নিজের পরীক্ষা বাদ দিয়ে এখানে আসতে গেলে বলোতো! শুধু শুধু একটা বছর কেনো নষ্ট করলে!”
-“ওই যে বললাম, তোর কথা খুব মনে পরছিলো!”
-“তাহলে এখন আফসোস কেন করছো?”
-“কারণ তুই এখনো আমাকে বুঝছিস না তাই। একটু দাম দিচ্ছিস না আমাকে।”
চাদনী হাসলো।
-“আমার দাম দেওয়া এতোই জরুরি? আমি তো খুব ক্ষুদ্র একটা মানুষ। তোমার সমকক্ষ তো দূর, তোমার বউ হওয়ারও যোগ্যতা নেই।”
-“শুধু তোর জন্য চলে আসছি আমি। নিজের ক্যারিয়ার,ভবিষ্যৎ কিচ্ছুর কথা ভাবিনি। তুই বলছিস তোর দাম নেই।”
-“আছে?”
চাদনীর দৃষ্টি টলমলে হলো।আঁধার চুলে হাত বুলিয়ে বললো

-“ঘুমা। কাদিস না। কেন কথায় কথায় ইমোশনাল হয়ে যাস?”
চাদনী ঘুমানোর চেষ্টা করলো। ও ঘুমিয়ে যাওয়ার পর আঁধার তাকালো ওর দিকে। একটু সময়ের মধ্যেই ঘেমে উঠেছে মেয়েটা। আঁধার এসির পাওয়ার বারিয়ে দিলো। কক্ষের লাইট বন্ধ করে, টেবিল ল্যাম্প জ্বালালো। আঁধার হাত বুলিয়ে দিলো ওর মুখে। মলিন হেঁসে বললো
-“বশ হয়ে যাচ্ছিস আমার। দোয়া এতো তাড়াতাড়ি কবুল হওয়া শুরু করেছে।”
আঁধারের খুব ইচ্ছে করলো, চাদনীকে একটা চুমু খেতে। ঠোঁট নামিয়ে থুঁতনিতে শক্ত করে চুমু খেলো ও। ওর কেন যেন চাদনীর থুতনিতেই শক্ত চুমু খেতে ইচ্ছে করে! লোভ জাগে! তবে সেটা শুধুই মেয়েটার অগোচরে। জেগে থাকলে এক্ষুণি চিল্লিয়ে কান ঝালাপালা করে দিতো।
আঁধার আবার জড়িয়ে ধরলো ওঁকে।ওর ঘুম আসলো না কোনোমতেই।এই নিস্তব্ধ শীতের রাতে,চাদনীর দিকে তাকিয়ে ওর হঠাৎ একটা গানের কথা মনে পরলো।

কাজলরেখা পর্ব ৪০

এই পাঁজর ভরা ভালোবাসা
দু’হাত ভরে নাও
এই আধো আলো আধো ছায়া
দু’চোখ ভরে নাও
এই আমায় কিছু নাইবা দিলে
নিজের করে নাও।
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
শুকনো নদীতে ডিঙি ভাসিয়েছি
মোহনার কাছে এসে।
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
ঝড়ের সামনে দাঁড়িয়েছি একা
ছেঁড়া পতাকার বেশে।
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে,
তোমাকেই ভালোবাসবো ভেবেছি শত যুদ্ধের শেষে।
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে।

কাজলরেখা পর্ব ৪০ (৩)