কাজলরেখা পর্ব ৫৯
তানজিনা ইসলাম
-“তুমি সত্যিই আর ফিরে যাবে না, আম্মা?”
চাঁদনী উদাস হয়ে বেলকনিতে বসে ছিলো। আকিব শিকদারের প্রশ্নে ওনার দিকে তাকালো৷ চাঁদনী এতোটাই অন্যমনস্ক ছিলো যে, ওর বাবা এসেছে সেটা ও টেরই পায়নি। আকিব শিকদার ওর পাশে হাঁটু মুড়ে বসলেন।
চাঁদনী ঢোক গিললো। ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বললো
-“না। যাবো না আর।কক্ষণো না।”
-“সেটা তুমি, চট্টগ্রামে যাওয়ার সময়ও বলেছিলে।”
-“হ্যাঁ বলেছিলাম৷ কিন্তু তোমার ভাইয়ের ছেলে কথার জালে ফেঁসে গিয়েছিলাম, আবারো। ম্যানিপুলেট করে ফেলেছিলো আমাকে। জানো তো, সে কতোটা ম্যানিপুলেটিভ। আমি সত্যিই আসতাম না বাবা। এটা ভেবেই গিয়েছিলাম, মনকে শক্ত করেছিলাম যা-ই হয়ে যাক আমি ফিরবো না। কিন্তু সে গিয়ে সব উলোটপালোট করে দিলো। কিন্তু এবারে পাক্কা। চলে এসেছি, মানে এসেছি। আর যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না।”
-“শিউর তুমি?”
-“হুম। আঁধার ভাইকে এখানে আসতে দিবে না। সে একটা বলে বুঝ দিলে, তুমি দশটা বলবে। চাঁদনী কে আমি যেতে দেবো না, এ কথায় অনড় থাকবে তুমি। ভাতিজার কাছে দুর্বল হবে না, প্রমিজ করো।”
-“আচ্ছা, করলাম। কিন্তু হয়েছে টা কী? তুমি কিন্তু আমাকে পুরোপুরি বলোনি।আগের কথা শুনেই আমি চোটপাট করে এসেছি আঁধারের সাথে।”
-“ওই, আগের কথায়। নতুন কিছু হয়নি।”
-“বলো আমাকে। নতুন কিছু না হলে, এতোদিন পর আগের বিষয়গুলো নিয়ে ঝামেলা করবে, কেনো তুমি! তুমি তো আগের কথা ধরে বসে থাকার মেয়ে নও! আগের কথা গুলোর জন্য আঁধারকে মাফ করে দিয়েছিলে বলেই তো, তুমি চট্টগ্রাম থেকে ফিরে এসেছো। কাল পর্যন্ত ঠিক ছিলে তুমি। তাহলে আজ কী হলো? লুকোচ্ছো কেনো বাবা থেকে! বলো না।”
চাঁদনী পাংশুটে মুখে তাকালো আকিব শিকদারের দিকে। আজই তো সব হলো। চাঁদনী নিজের জায়গাটা ভালোভাবে জানতে পারলো। যদিও অতীতে আঁধার নিজের কথায় অনেকবার বুঝিয়ে দিয়েছিলো চাদনীকে। কিন্তু পরবর্তীতে আঁধার যেভাবে ক্ষমা চেয়েছে, ওর সাথে থাকতে চেয়েছে সেখানে চাঁদনী নিজেকে অনেক দামী কিছু মনে করে ফেলেছিলো আঁধারের জীবনে। কিন্তু এটা তো মিথ্যা! আঁধারের কথাগুল সয়ে নিলেও, শাবিহার কথা চাঁদনী সহ্য করতে পারেনি। ওঁকে বেহায়া, ছ্যাচড়া কতো কী বললো! আসলেই তো, বেহায়ার মতোই তো কাজ করেছিলো ও। বেহায়া না হলে, ও আঁধারকে ছেড়ে চলে আসার ক্ষমতা রাখতো। এতো অপমান সহ্য করে তার কাছে পরে থাকতো না। ক্ষমা চায়লেই ক্ষমা করে দেওয়া যায়! ফরগিভ, বাট নেভার ফরগেট। ক্ষমা করে বারবার তার কাছে ফিরে যাওয়া এটা তো ছ্যাচড়ামিই। শাবিহা যেহেতু ওঁকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, তাহলে চাঁদনী আর ছ্যাচড়া হবে না। ও ফিরে যাবে না। এবার সত্যিই ও ফিরবে না। আঁধার, ওর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল কোনোকিছুই টলাতে পারবে না ওঁকে।
আকিব শিকদার প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, চাঁদনীর দিকে। চাঁদনী বলতে পারলো না, ওর সাথে কী কী ঘটেছে। খুব লজ্জার কথা এসব। তার চেয়েও বেশি লজ্জার কথা, ওর স্বামী ওর জন্য কিছুই করলো না। সে তার বউয়ের চেয়ে তার বান্ধবী কে বেশি দাম দিলো। সে বান্ধবী যার জন্য, চাদনীর ইজ্জত সম্মান সব শেষ হয়ে যেতে পারতো। যার জন্য চাঁদনীর গায়ে কলঙ্ক লাগতো, তাকে আঁধার ভাই কিছুই বললো না। চাঁদনীর প্রতি এতো বড় অন্যায় সে জাস্ট একটা বন্ধুত্ব ভাঙার বিনিময়ে মেনে নিলো। প্রভাবশালীর দোহাই দিয়ে, সব কথা হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো। ওর আঁধার ভাই তো এমন ছিলো না। শুধু শাবিহা আপু বলেই পার পেয়ে গেলো। অন্য কেও হলে অবশ্যই শাস্তি দিতো, আঁধার। শাবিহা কেনো পার পাবে, কেনো শাবিহা আঁধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে, চাঁদনী এটাই মানতে পারছে না। ওর জন্য ভালোবাসার বুলি আওড়ায় অথচ ভালোবাসা দেখায় আরেকজনের জন্য। চাঁদনী এটা কী করে সহ্য করবে!
চাঁদনী বিষাদ দৃষ্টিতে তাকালো আকিব শিকদারের দিকে। বিরস স্বরে বললো
-“জেনে কী করবে?”
-“বাবা সলিউশন দেবে তোমাকে।”
-“দরকার নেই। সলিউশন একটাই, আর ফিরবো না। না মানে না। এবার আর কোনো ব্লেকমেইল আমার উপর এফেক্ট ফেলবে না।”
-“মনকে শক্ত করে নিয়েছো? আঁধার কল করলেই গলে যাবে না তো!”
-“তুমি দেখো, তোমার মেয়ে এবারে আর দুর্বল হবে না। আঁধার ভাই টেকেন ফর গ্রান্টেড ভেবে নিয়েছে আমাকে। সে মনে করে নিয়েছে, সে আমার সাথে যেমন ব্যবহারই করুক। যা-ই বলুক আমাকে, যা-ই করুক, আমি তাকে ছেড়ে যাবো না।রেগে গেলে, সে ইমোশনাল ব্লেকমেইল করে মানিয়ে নেবে। ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু এবারে আর না। আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকলাম।”
-“তুমি যে সিদ্ধান্ত নেবে, আমি সেটাই সাপোর্ট করবো। তুমি যেটা চাও।”
আঁধার মন খারাপ করে নিজের কক্ষে গেলো। অসহ্য লাগছে ওর সবকিছু। চাঁদনী টা ওঁকে কোনোদিন বুঝলোই না।৷ শুধু ভুল বুঝে গেলো। ওর দিকটা বোঝার চেষ্টাই করেনি কখনো। কক্ষে যেতেই, ওর খালি খালি লাগে খুব। হাহাকার লাগে। চাঁদনীর কথা মনে পরলেই বুকে চাপ পরে। চাঁদনী চট্টগ্রামে চলে যাওয়ার পর এমন হয়েছিলো। তখন তো তাও এটা বলে মনকে বুঝ দেওয়া গিয়েছিলো, চাঁদনী চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে যেতেও অনেকটা সময়ের ব্যাপার। বেস চায়লো আর দৌড় দিলো এমন তো না। তবুও কতোক্ষনই বা মানাতে পেরেছিলো নিজেকে। চব্বিশ ঘন্টারও কম সময়। এখন ও কী বলে নিজেকে বুঝ দিবে! চাঁদনী ওর সামনের বিল্ডিংয়েই আছে। একটু নিচে নেমে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই ও চাঁদনীকে দেখতে পাবে। কিন্তু আকিব শিকদার যে দেখতে দেবে না। সে আজ ভয়ঙ্কর ভাবে রেগে গিয়েছিলো। চাঁদনী যে এমন নাকি কান্না কাঁদতে পারে, আঁধারের জানা ছিলো না। ওর কান্না দেখেইতো, আকিব শিকদার এভাবে রাগলো। চাঁদনী কাছে আছে জেনেও, ওঁকে দেখতে না পাওয়ার কষ্টটা যে সহ্য করার মতো না। আঁধার, ধীর পায়ে হেটে গিয়ে চাঁদনীর বালিশে মাথা রাখলো। ওর ঠোঁট কাঁপছে। চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে বারবার।চাঁদনীর বালিশে হাত রাখলো ও। কাঁপা ঠোঁট নাড়িয়ে বললো
-“সরি তো। ফিরে আয় না। আর কীভাবে ক্ষমা চায়বো বল! ফিরিয়ে নিয়ে আসার সব রাস্তা তো বন্ধ করে দিয়েছিস। চাচ্চু যে খুব খেপে গেছে।”
এই একাকিত্ব কে আঁধার বড্ড ভয় পায়। ওর নিজের বলতে শুধু চাঁদনী ছিলো। যে শুধু ওর, একান্ত নিজের। যাকে ও কখনো হারাতে চায়নি। চেপে চেপে হলেও রাখতে চেয়েছিলো। ও সুন্দর করে বুঝিয়ে বলতে পারে না। হম্বিতম্বি শুরু করে। রাগটা দেখিয়ে দিলেও ভালোবাসা দেখাতে পারে না। এজন্য ওর ভালোবাসাকে চাঁদনীর মেকি মনে হয়। মিথ্যা মনে হয়। চাঁদনী কেনো ওর অপ্রকাশিত কথাগুলো বুঝতে পারে না। কেনো ওঁকে একা করে দিয়ে চলে যায়, বারবার।
চোখের জল গড়িয়ে পরার আগে, আঁধার শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছলো। বাইরের শার্ট পর্যন্ত বদলায়নি এখনো ও। নিজের উপর খুব রাগ হচ্ছে ওর। আকিব শিকদারকে এখানে আনা উচিত হয়নি। নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারলো ও।হাহ! সে কী ভেবেছে, চাঁদনীকে আসতে দেবে না! আঁধার এখন বুঝতে পারছে না কী করবে! বুঝে উঠার পর, ও আকিব শিকদারের সাথে কেওয়াজ করে হলেও চাঁদনীকে নিয়ে আসবে। আঁধার উঠে বসলো। নাক ফুলিয়ে বললো
-“যাহ। আনলাম না তোকে। তুই বসে থাক, তোর রাগ নিয়ে। মরে যাবো আমি, তোকে ছাড়া?”
আঁধার চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ক্ষণকাল নীরবতার পর বললো
-“মরে গেলে, ফিরে আসবি? মাফ করে দিবি আমাকে? এবারে, সত্যিই ব্লেকমেইল করছি না তোকে আমি।”
ওর খুব উল্টাপাল্টা চিন্তা মাথায় আসে। ছোটবেলার মতো। হয়তো মরে গেলে ও মাফ পেয়ে যাবে। বা বড় কোনো ধরণের এক্সিডেন্ট ঘটলে হয়তো বিপরীত মানুষটা ওঁকে দাম দেবে। ও এখনো এসব বাচ্চা বাচ্চা চিন্তা করে। ওর কোনোরকম ক্ষতি হলে, সবাই খুব কাঁদবে। খুব দাম পাবে ও। আঁধার তো বরাবরই অ্যাটেনশন সিকার। নিজের প্রিয় মানুষগুলোর অ্যাটেনশন পাওয়ার জন্য ও সব করতে পারে। ও গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পর যদি চাঁদনী মেনে যায়, ফিরে আসে। ওর কাছে আবার থাকে। এ লোভেই ও নিজেকে অসুস্থ করে ফেলবে। মির্জা গালিব বলেছিলো না, প্রিয়তমার বাড়ির রাস্তা ধরে তার জানাজা বেরোবে, এই লোভ দেখিয়ে আজরাইল তার জানটাই নিয়ে নিলো।
সেভাবে, চাঁদনী ফিরে আসবে এই লোভেই আঁধার নিজেই অসুস্থতা ডেকে আনবে। জান দেওয়া খুব কঠিন। ও এতো তাড়াতাড়ি মরতে চায় না। চাঁদনীর সাথে এখনো অনেকদিন থাকা বাকি ওর। আঁধার দু’হাতে নিজের মুখ ঢাকলো। আকিব শিকদার ওর কল রিসিভ করছে না। চাঁদনী ওর সামনেই যে যে কথা বলেছে। একা পেয়ে তো আরো কান ভারী করছে ওর চাচ্চুর। বেয়াদব একটা! আঁধার বিরবির করে বকলো ওঁকে। সামনের বিল্ডিংয়ের উনিশ তলায় আকিব শিকদারের ফ্ল্যাট। আঁধারের ফ্ল্যাট এ বিল্ডিংয়ের, বিশ তলায়। এখান থেকে সরাসরি ওই, ফ্ল্যাটের একটা বেলকনি দেখা যায়। আঁধার জুরমি নিয়ে এসে দাঁড়ালো, বেলকনিতে। খালি চোখে বেলকনি দেখা গেলেও, বেলকনিতে কোনো মানুষ দাঁড়ালে সেটা, ভালো করে দেখা যাবে না। আঁধার মনে মনে খুব দোয়া করলো, চাঁদনী যেনো সে বেলকনির রুমেই থাকে। ও তো খোলামেলা বেলকনি খুব পছন্দ করে। রুমের চেয়ে বেশি বেলকনিতেই সময় কাটায়। একঘন্টা উঁকিঝুকির পরও চাঁদনীর দেখা পাওয়া গেলো না। ভাগ্য খুব খারাপ! বিপদ যখন আসে সব দিক দিয়েই আসে।
আঁধার একঘন্টা জুরমি নিয়ে দাড়িয়ে থাকলো। একটুও জুরমিটা নামালো না চোখ থেকে। এর মধ্যে যদি চাঁদনী চলে আসে! আঁধার যদি ওঁকে দেখতে না পায়। অথচ চাঁদনী সে বেলকনিটার রুমে আছে কি-না আঁধার জানেও না। আঁধারের একঘন্টার অপেক্ষা সার্থক হলো। চাঁদনী বেলকনিতে এলো। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকালো। ওর মুখটা পাঁংশুটে। আঁধার ঠোঁট উল্টালো। ওখানে গিয়েও খুব খুশি আছে এমন তো না। চোখে-মুখে অঢেল বিরহ নিয়ে,দূরত্ব বাড়ানোর কী খুব দরকার! এরচেয়ে ফিরে আসুক।
চাঁদনী হয়তো দেখলো ওঁকে। ছোট ছোট চোখ করে তাকালো ওর দিকে। কোনোভাবে ঠাওর করতে পেরে দৌড়ে, বেলকনি থেকে কক্ষে চলে গেলো। আঁধার জুরমি নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মেয়েটা দেখলো কী করে ওঁকে! আন্দাজ করলো হয়তো। ওখান থেকে আঁধার কে ঠিকমতো দেখা যাবে না। ভালো করে বোঝারও কথা না। আঁধার কক্ষ থেকে ফোন এনে বেলকনিতে দাঁড়ালো। দেনামোনা করে কল করলো চাঁদনীকে। চাঁদনী মুহুর্তেই কল রিসিভ করলো। আঁধার ভেবেছিলো চাঁদনী কল কেটে দেবে! তবে ওর ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো।
চাঁদনী কল রিসিভ করেই, বাজখাঁই গলায় বললো
-“কী?”
আঁধার কী বলবে ভেবে পেলো না। এমন প্রশ্নের উত্তরে কী বলা যায়! ও সুক্ষ্ম স্বরে বললো
-“ফিরবি না?”
-“না। বলেছিনা একবার।”
-“সরি তো।”
-“সরি ওয়ার্ড টা খুব সস্তা তোমার জন্য। ভুল করার পর, এক-দুবার বললে মানা যায়। কিন্তু তুমি বারবার বলে, বারংবার সেইম কাজ করো।”
-“ফিরে আয় না। খারাপ লাগছে আমার। কান্না পাচ্ছে, বিশ্বাস কর।”
-“নাটক। সব নাটক তোমার।”
-“সত্যি। মিথ্যা না।”
-“কাঁদো তাহলে।”
-“কাঁদলাম। এসে আমার কান্না দেখে যা। আহ! মরে গেলে ফিরে আসবি?”
-“মৃত্যু এতো সোজা না আঁধার ভাই। এ কথাটা কতোবার বলেছো তুমি আমাকে! কেনো বলতে হয় এটা তোমাকে?”
-“যাতে,তোর মন নরম হয়।”
-“ব্লেকমেইল, তাই না! খুব ভালো পারো তুমি। আর নরম হবো না আমি। এবার যে মনটাকে শক্ত বানালাম, তোমার আর কোনো কথায় গলবে না।”
-“কিন্তু এবার আমি সত্যিই মরে যাবো।”
চাঁদনীর অসহ্য লাগলো। আঁধার কিছু হলেই কথাটা বলে। সরির মতো এ কথাটাও খুব সস্তা আঁধারের কাছে। চাঁদনী বিরক্তিকর স্বরে বললো
-” মরে যাও।”
আঁধার অবাক হলো ভীষণ। চাঁদনী এ কথাটা বললো! ওর একটুও বাঁধলো না!
-“কী? কী বললি? মরে যেতে বললি আমাকে? ওয়াও! ভালো, ভালো।”
-“খারাপ ভাবে নিও না। সবসময় তো তুমি বলো। এবার নাহয় আমিই বললাম। একটা কথা মানুষ কয়বার শুনতে পারে?যদি এমন ভাবনা থাকে তোমার, তাহলে তো তোমার কার্যকর করে দেখানোর কথা! তুমি একবারো নিজের এই কথাটা রচানোর চেষ্টা করোনি। বারবার বলেই যাও খালি।হাহ!”
আঁধার চুপ করে গেলো। চাঁদনী ভাবলো ও কথায় জিতে গেছে। আঁধারের ওর কথার বিপরীতে কথা বলতে না পারাটাই তো ওর জিত। কারণ আঁধারকে কখনো তর্কে হারানো যায় না। আঁধার কেনো বারবার এভাবে ভয় দেখাবে চাঁদনীকে। চাঁদনী ভয় পায়, খুব করে ভয় পায়। ওর খুব চিন্তা হয়। ও ফিরে যায় আঁধারের কাছে। ওর মন গলে যায়। কিন্তু এবারে আর না। আঁধারের সব কথাকে এভাবেই কাটাতে হবে।
চাঁদনী হেঁসে বললো
-“কী? কথা বন্ধ হয়ে গেলো? বলা সহজ আধার ভাই। করা কঠিন। সবকিছু বলে দিলেই হয়ে গেলে, এমন তো হয় না।”
-“দেখাবো? সত্যি? তুই চাস? তোর জন্য এটুকু করতে পারবো না আমি! আঁধারের জন্য সব সহজ। কোনো কিছুই কঠিন না।”
-“তোমার ফালতু কথা শুনতে ইচ্ছে করছে না আমার।”
-“তোর শুনতে হবে না। চাচ্চু কই? চাচ্চুকে ফোনটা দে। আমার কল রিসিভ করছে না কেনো?”
-“ও, এখন বাবাকে ম্যানিপুলেট করবা।”
আঁধার অস্বীকার না করে, তাড়াহুড়ো করে বললো
-“হ্যাঁ। বুঝেছিস যখন ফোনটা দে। কথা আছে আমার। তোর সাথে কথা বলে লাভ নাই।”
-“না, বাবার তোমার সাথে কোনো কথা নাই। আমি ফোন দেবো না। কল কেটে দিচ্ছি।”
-“এই, দাঁড়া দাঁড়া। এমন করছিস কেনো তুই আমার সাথে? আমার কোনো কথার দামই দিচ্ছিস না।”
-“দাম যখন পাচ্ছো না,বলছো কেনো?”
-“এই শোন না। ফিরে আয় না, প্লিজ। আচ্ছা, চাচ্চুকে ফোন দিতে হবে না। আমি ওখানে যাই! আসবি আমার সাথে?”
-“না।”
-“চাচ্চু রাগলেও সমস্যা নেই। যদি তুই আসতে মেনে যাস, চাচ্চু আর কিছু বলবে না। প্লিজ, চাঁদ। চলে আয়। আমার চাঁদ না তুই, প্লিজ মেনে যা।”
-“না।”
-“আর কীভাবে বলবো?”
-“বলার দরকার নেই। যাবো না আমি। তুমি আসলেও ফ্ল্যাটে ঢুকতে দেবো না। দরজা খুলবো না। বাইরে থেকে ফিরে যাবে।”
-“আমি জানি, তুই এমন করতে পারবি না আমার সাথে। এমনিই বলছিস তাই না! আমি জোর করে নিয়ে আসবো তোকে।”
-“হ্যাঁ, মগের মুল্লুক পেয়েছো৷ সব খালি তোমার কথামতো হবে, এমন ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছো কেনো, তুমি? তুমি আসো তো আগে। দেখো আমি কী করি! পরের স্ক্রিপ্ট রেডি করে রেখেছি আমি। তোমাকে আমি দেখাবো, তোমার চেয়ে ভালো নাটক পারি আমি।”
-“এমন শত্রুতা করছিস কেনো তুই আমার সাথে? আমি কী তোর শত্রু? মানুষ এমন ব্যবহার তো শত্রুর সাথেও করে না।”
-“হ্যাঁ, শত্রু তুমি আমার। আর কিছু?”
-“চাঁদ। প্লিজ, জান।”
-“কল কেটে দিচ্ছি।”
-“শোন…
কাজলরেখা পর্ব ৫৮
আঁধার বলা শেষ করতে পারলো না। চাঁদনী কল কেটে দিলো। আঁধার ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেভ করা চাঁদ নামটার দিকে তাকিয়ে আঁধারের খুব হাহাকার লাগলো। ও চাঁদনীর নামের পাশে লাভ ইমোজি দেয়নি। অর্পিতা নিজের নামের পাশে লাভ ইমোজি দিয়ে নাম্বার সেভ করেছিলো বলে, চাঁদনী খুব কষ্ট পেয়েছিলো। আঁধার সেভ করেনি জেনেও, ওঁকে বাঁশ মারা থামায়নি। আঁধার দ্রুত এডিট করে চাঁদ নামের পাশে লাভ ইমোজি দিলো।
