মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৮
jannatul firdaus mithila
“ বিয়ে খেতে এনেছে। খাবে, দাবে তারপর জম্পেশ একটা ঘুম দেবে তাই এনেছে! আরকিছু?”
মিয়ানের কন্ঠে একরাশ ঝাঁঝ! তার চোখেমুখে লেপ্টে আছে মহা বিরক্তির ছাপ। দাঁতে দাঁত চেপে আধবুড়ো মহাশয় ঘাড় ঘোরালেন অন্যত্র। এদিকে দামিয়ান কেমন বাঁকা চোখে তাকিয়ে রইল মিয়ানের পানে। নাক ফুলিয়ে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ সন অফ আ ফা*কিং ইডিয়ট।”
ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় মিয়ান। ভ্রু-দ্বয়ের মাঝখানে বেশ খানিকটা তীক্ষ্ণ ভাঁজ ফেলে দাঁত খিঁচে আওড়ায়,
“ হোয়াট ডিড ইউ সে?”
হকচকায় দামিয়ান। তৎক্ষনাৎ মিয়ানের অলক্ষ্যে জিভে দাঁত কাটল বেচারা। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে আমতা আমতা করে শুধালো,
“ কোথায়? কখন কী বললাম?”
সরু দৃষ্টিতে চোখ পাকিয়ে রেখেছে মিয়ান। কটমট করতে করতে বলে ওঠে,
“ না বলে থাকলে তো ভালোই!”
দামিয়ান ভ্যাবলার ন্যায় জোরপূর্বক হাসলো। নড়েচড়ে কিছুটা স্থির হতেই বিমানের প্রশস্ত দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল একজোড়া ব্যুট পরিহিত পা। দামিয়ানের সন্দেহী নজর গিয়ে তক্ষুনি আঁটকায় সেথায়। ধীরে ধীরে দৃষ্টি উঁচাতেই দেখে — সে-ই মুখোশধারী লোকটা দাঁড়িয়ে আছে গেটের কাছে। দু’হাত তার প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। অজ্ঞাত লোকটাকে ফের দেখমাত্রই দামিয়ানের সম্পূর্ণ মুখাবয়বে ছড়িয়ে গেল একরাশ কৌতুহলতা। সে কেমন আগ্রহী কন্ঠে হড়বড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ হু আর ইউ? আমাদের এভাবে বেঁধে রেখেছো কেনো?”
মুখোশধারী যুবক মোটেও রা করল না। উল্টো ঘাড় কাত করে তাকিয়ে রইল মিয়ান এবং দামিয়ানের দিকে। মিয়ান ভড়কায়! ক্ষনে ক্ষনে ঢোক গিলে, শুষ্ক অধরজোড়া খানিক ভিজিয়ে নেয় জিভ দিয়ে। রয়েসয়ে ভয়াতুর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ বাকিদের কোথায় নিয়ে গিয়েছেন? না-কি আবার ওদেরকে মে’রে ফেলেছেন?”
এহেন বাক্যে যারপরনাই অবাক দামিয়ান! হতচকিত নেত্রে ত্বরিত ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মিয়ানের মুখপানে। হতভম্বতায় জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ বাদবাকি বলতে? আমরা ছাড়াও আর কাউকে তুলে আনা হয়েছে না-কি?”
মিয়ান ঠায় তাকিয়ে আছে যুবকের পানে। তারমধ্যে উত্তর দেবার তেমন একটা তাড়া নেই। অজানা ভয়ে বেচারার মুখটা এইটুকুন হয়ে গেছে! সে ধীরে ধীরে প্রতিত্তোরে বলল,
“ হয়েছে! একজন দু’জন নয় বরং ৩৫জনকে।”
এহেন বাক্য কর্ণকুহরে পৌঁছানো মাত্রই প্রতিক্রিয়া জানাতে ভুলে গেলেন দামিয়ান। হা করে মিয়ানের পানে তাকিয়ে থাকতেই কোত্থেকে যেন ছুটে এলেন চারজন সশস্ত্র গার্ডস। মিয়ান এবং দামিয়ান দুজনেই হতভম্ব! একে-অপরের সঙ্গে এক-আধবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করতেই, গার্ডস এসে কোনরূপ কথাবার্তা ছাড়া দু’টো কালো কাপড়ের মুখোশ দিয়ে ঢেকে দিলেন মিয়ান এবং দামিয়ানের মুখমণ্ডল। বেচারা দামিয়ান! ভয়ে এবার হাউমাউ জুড়ে কেঁদে উঠলেন বাচ্চাদের ন্যায়। অনুনয় করে আওড়ালেন,
“ প্লিজ মে’রো না আমায়! আমার তো এখনো বিয়েও হয়নি।”
এহেন সংকটাপন্ন মুহুর্তে দামিয়ানের ওমন উদ্ভট কথাবার্তায় মুখ কুঁচকায় মিয়ান। বিরক্তিতে তেঁতো মুখে কেমন দূরছাই করে বলে ওঠে!
“ রোজ নতুন নতুন আইটেম ছাড়া যার চলেনা, সে না-কি আবার বিয়ের জন্য কাঁদছে! বলি দামিয়ান… এমন সিরিয়াস মোমেন্টে এহেন ফানি কথাবার্তা বলো না তো! তখন দেখা যাবে, প্রাণ বাঁচানোর ভয়ে কাঁদার বদলে হেসে ফেলব!”
ইশশ্! এহেন সঙ্গীন মুহূর্তে মনকষ্ট থেকে আওড়ানো ওতোবড় কথাটাকে, শেষে কি-না এরূপ নগন্য তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে হাসিরছটা বানিয়ে দিলো মিয়ান? দামিয়ান বড্ড কষ্ট পেলো বোধহয়! বেচারার কান্না বাড়ল বৈ কমল না। ঠোঁট কামড়ে ফোপাঁতে লাগলেই টের পেল — ডানহাতের কনুইয়ে টান পড়েছে বেশ! গা থেকে একে একে বেড়িগুলো খুলে নিয়েছে বোধহয়। কেউ বুঝি হাত ধরে টানছে তাকে। দামিয়ানের এইটুকুন কলিজাটা লাফিয়ে উঠল অজানা আতঙ্কে। তার পাদু’টো কোথায় এগুচ্ছে কে জানে!
ঝর্ণার ঝিরিঝিরি শব্দ ভেসে আসছে কানে! গায়ে এসে বারবার দোল দিয়ে যাচ্ছে প্রাণজুড়নো ঠান্ডা বাতাস। চারদিক থেকে এক অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস কেমন ভুরভুর করে নাকে এসে বারি খাচ্ছে! দামিয়ানের পা চলছে অজানা গতিতে। তবে মস্তিষ্ক বড্ড সচল তার। কানখাড়া করে শুনছে চারপাশের প্রতিটি শব্দ। কিয়তক্ষন বাদেই তার পা উঠল খানিকটা উঁচু জায়গায়। দামিয়ান বুঝল — এ হয়তো সিঁড়ি। মধ্যবয়স্ক ভারী শরীরটা নিয়ে অন্ধের মতো হাঁটছে তারা। সে-ই কতক্ষণ আগে গাড়ি জাতীয় কিছু দিয়ে এসে পৌঁছেছে কোনো এক অজানা জায়গায়। এরপর? এরপর শুরু হাঁটার যাত্রা! মাগো মা… পথ বোধহয় আর ফুরোবে না আজ। চারপাশের আবহাওয়া বেশ স্বস্তিদায়ক হলেও দরদর করে ঘামছে মিয়ান। বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে রেখেছে সে-ই কখন থেকে!হুটহাট মৃত্যুর ভয়ে না আবার হার্ট অ্যাটাক করে বসে বেচারা।
নিরবতায় বেষ্টিত চারপাশ! একযোগে বেশ ক’জনের নিশ্বাস ফেলা’র শব্দ ভেসে আসছে কানে। কয়েকজন সশস্ত্র গার্ড এগিয়ে এসে ধীরে ধীরে মিয়ান এবং দামিয়ানসহ বাদবাকি ৩৫জন ডক্টরের মুখ থেকে কালো কাপড়খানা সরিয়ে দেয় আলগোছে। সেই কতক্ষন পর হুটহাট তীব্র আলোর ঝাপটা এসে চোখে পরতেই চোখমুখ কুঁচকে ফেলে প্রত্যেকে। কিন্তু দামিয়ান আবার বড্ড কৌতূহলী মানুষ। চোখের সামনে হাত এনে পিটপিট করে তাকাল আঙুলের খাঁজ দিয়ে। তক্ষুনি যা দেখল তাতে বেচারার নিশ্বাস আঁটকে যাবার যোগাড় যেন। বিশালাকৃতির এক কক্ষ! কক্ষের মাঝখানে আবার দরজা! বোধহয় ওপাশেও এটাচ কক্ষ। দামিয়ান হকচকিয়ে তাকায় চারপাশে। পুরো ঘর ভরে আছে হসপিটালের সকল ধরনের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে। ইসিজি মেশিন হতে শুরু করে, এক্সরে মেশিন! তাও আবার কি সুন্দর গোছগাছ করে রাখা সবকিছু। দামিয়ান বাদেও বাদবাকিদের চক্ষু ছানাবড়া। প্রত্যেকেই কেমন অবোধের ন্যায় তাকাচ্ছে চারিদিকে। তাদের কৌতূহল যখন শৃঙ্গে পৌঁছেছে ঠিক তখনি কক্ষে আগমন ঘটে এডউইনের। গম্ভীর পুরুষ দু-কদম এগিয়ে এসেই মুখের কাছে হাত ঠেকিয়ে গলা খাঁকারি দিলেন সামান্য। উদ্দেশ্য — সকলের মনোযোগ তার দিকে টানা। সেকেন্ড খানেক যেতে না যেতেই প্রত্যেকের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি এসে আছড়ে পড়ল এডউইনের মুখপানে। পরমুহূর্তেই এডউইনের ভয়ানক দাগওয়ালা মুখ এবং উদ্ভট চোখের মনি দেখে ভড়কে গেলেন সবাই। কেউ কেউ বোধহয় ভয়ও পেলেন বেশ! এডউইন সেদিকে পাত্তা দেয়নি মোটেও। সে উল্টো গম্ভীর মুখে সবাইকে জানালো,
“ ওয়েলকাম টু দ্য শ্যাডো মনস্টার’স প্যালেস।”
❝ শ্যাডো মনস্টার!❞ ব্যস! এটুকু শোনামাত্রই আতঙ্কে হকচকালেন সবাই। প্রত্যেকের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল এক ভিন্ন উৎকন্ঠা। ভয়ার্ত মিয়ানের ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো — শ্যাডো মনস্তার?
এডউইন ঠোঁট পিষে হাসল বোধহয়। ওপর নিচ হালকা মাথা নাড়িয়ে জানায়,
“ হুম! দ্য গ্রেট রুশদী কিং — শ্যাডো মনস্তার।”
ভয়ে গলা থেকে শুরু করে জিভ অব্ধি শুকিয়ে কাঠ প্রত্যেকের। কপালে মরণ এতো তারাতাড়ি চলে আসবে সে খবর কি আর আগে জানতো কেউ? জানলে থোড়াই আজ ঘর ছেড়ে বেরুতো তারা! দামিয়ানের কপাল বেয়ে দরদরিয়ে ঝরছে ঘাম। উম্মুক্ত ভুঁড়িওয়ালা পেটখানাও ঘেমে-নেয়ে একাকার অবস্থা! তিনি খানিক এগুলেন। মনের কোণে ভীষণ সাহস যুগিয়ে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন,
“ আমাদের কেনো?…মানে এখানে?”
লোকটার কথাবার্তা ভীষণ অগোছালো এমুহূর্তে। বোধহয় ভয়ের চোটেই এহেন অবস্থা বেচারার। এডউইন গম্ভীর মুখেই প্রতিত্তোরে বলল,
“ একজন পেশেন্টের জন্য আনা হয়েছে আপনাদের।”
হোঁচট খেলেন সবাই! একজন? মাত্র একজন? ওতো কান্ডকারখানা করে টপ লিস্টে থাকা গোটা ৩৭জন ডক্টরকে কি-না একজনের জন্য তুলে আনা হয়েছে? মিয়ান কেমন ঠোঁট বাকিয়ে তাকিয়ে আছে এডউইনের পানে। মনে মনে তার বেশ আগ্রহ জন্মেছে সে-ই একজনকে দেখার জন্য। না জানি কোন দেশের রাজা-বাদশা সে-ই একজন খ্যাত মানুষটা। এদিকে দামিয়ান নিজেকে সামলায়। খানিক দোনোমোনো করে যেইনা কিছু বলবে ওমনি এডউইন হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দেয় তাকে। গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,
“ কক্ষের ওপাশে সাতটা এটাচ কেবিন রয়েছে। আপনারা আপাততঃ ফ্রেশ হোন। আমরা পেশেন্টকে নিয়ে আসছি। আর শুনুন!”
থামল এডউইন। একবার প্রত্যেকের মুখপানে দৃষ্টি বুলিয়ে ফের বলতে লাগল,
“ ভুলেও মনস্টারের মুখের দিকে চোখ তুলে চাইবেন না। কেননা এর পরিণাম কিন্তু মোটেও শুভ নয়।”
ত্বরিত ঘাড় কাত করল সবাই। এডউইন না বললেও তারা তো জানে এ ব্যাপারটা। দি আন্ডারওয়ার্লড কিং শ্যাডো মনস্টারের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাধ্যি করা আর নিজের মৃত্যুর পয়গাম নিজ হাতে লেখা তো একই ব্যাপার। সেক্ষেত্রে এতবড় রিস্ক কে নিবে শুনি?
অচেতন মাহি! টানা ৭২ ঘন্টা হতে চললো — মেয়েটার এখনো হুঁশ ফিরেনি। ওদিকে তার মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। নাক বরাবর অক্সিজেন মাস্ক লাগানো, বেডের পাশেই O2 সিলিন্ডার। পারস্যের সুন্দরী খ্যাত দক্ষ ডক্টর — হায়া! গত দু’টো রাত নির্ঘুমে কাটিয়েছেন তিনি এবং মিলা। দু’জনার মধ্যে কেউই একটাবারের জন্য চোখদুটো বুঁজেননি। সর্বক্ষণ থেকেছেন মেয়েটার আশেপাশে। হায়ার মুখাবয়বে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ। মেয়েটার পালস রেট ক্রমশ কমছে তো কমছেই। বাড়ার নামগন্ধও নেই! এ যেন এক বিশাল বিপদ সংকেত! ওদিকে মাহির ঠান্ডা হয়ে যাওয়া হাত-পা দু’টোতে একাধারে মালিশ করে যাচ্ছে মিলা। এমনিতেই তার হাতদুটো পুড়ে গিয়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা! অথচ মিলার নিজের প্রতি তেমন হুঁশ জ্ঞান নেই। সে-তো ব্যস্ত মাহির সেবায়। মেয়েটাও কেমন ভয়ে জর্জরিত! আনমনে কিছু একটা বিড়বিড় করতে যেইনা মুখ খুলবে ওমনি কক্ষে আগমন ঘটে এডউইনের। তার পিছুপিছু দু’জন গৃহ পরিচারিকা স্ট্রেচার ঠেলতে ঠেলতে এসে ঢুকলেন। এডউইন তখন ভারী কন্ঠে ডক্টর হায়ার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“ উনাকে স্ট্রেচারে উঠান। ডক্টররা চলে এসেছে।”
কথাটা শুনতেই ফোসঁ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন হায়া। তৎক্ষনাৎ ব্যস্ত হলেন মাহিকে নিয়ে। তবে মেয়েটাকে স্ট্রেচারে তুলতে গিয়েই বাঁধল যেন বড় বিপত্তি! হায়া তো নিজেও মহিলা মানুষ। হাতদুটোতে খুব একটা শক্তি নেই। এদিকে মিলার হাতদুটোও তো পোড়ানো। এখন রোগীকে কিভাবে স্ট্রেচারে তুলবেন? হায়া কিয়তক্ষন অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে রইল বিছানার একপাশে। এডউইন তখন মাথা নুইয়ে রেখে ফের তাড়া দেখিয়ে বলল,
“ কি হলো? উনাকে তুলছেন না কেনো?”
হায়া আর চুপ করে থাকতে পারলোনা। খানিকটা কদম বাড়িয়ে, অসহায় মুখে বলতে লাগল,
“ দেখুন এডউইন! মেয়েটাকে একা একা স্ট্রেচারে তোলা সম্ভব নয়। আই নিড ইউর হেল্প। সো কাম!”
ভড়কায় এডউইন। তক্ষুনি দু-কদম ছিটকে সরে গেল পেছনে। হাতদুটো সঙ্গে সঙ্গে আড়াল করে ফেলল কোমরের পিঠে। হায়া হতভম্ব! লোকটা এমন ভয় পেয়ে গেল কেনো সামান্য একটা কথায়? হায়া কেমন সরু দৃষ্টিতে তাকায় এবার। সন্দেহাকুল কন্ঠে আওড়ায়,
“ এডউইন? আপনি শুনছেন আমার কথা? মেয়েটাকে তারাতাড়ি স্ট্রেচারে তুলুন।”
এডউইন গম্ভীর মুখে কিয়তক্ষন ঠায় দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। পরক্ষণে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো পাশে। বাকি মেইডদের দিকে একপ্রকার আদেশ ছুড়েঁ বলে ওঠে,
“ এভাবে হা করে দাঁড়িয়ে আছেন কেনো? উনাকে তারাতাড়ি ধরে ধরে স্ট্রেচারে তুলুন। যান!”
কঠিন ধমকে তৎক্ষনাৎ বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন নারী মেইডরা। শক্তপোক্ত গায়ের গড়নের — আফ্রিকান দুই নারী। যেন তারা একাই একশো। আলতো করে মাহির পাদু’টো ধরলেন একজন, আরেকজন ধরলেন বাহু। তারপর ধীরে ধীরে মেয়েটাকে তুলে নিলেন স্ট্রেচারে। এদিকে হায়া এখনো কেমন সন্দিহান চোখে তাকিয়ে আছে এডউইনের পানে! এ প্যালেসে আসলে হচ্ছেটা কী? কেন যেন তার মনে হচ্ছে — এ পর্যন্ত যা যা হয়েছে তার আগাগোড়ায় একমাত্র এ- মেয়েটাই দায়ী! কিন্তু কেনো?
মার্বেলের তকতকে মেঝেতে ঠেলতে ঠেলতে এগুচ্ছে স্ট্রেচার। আফ্রিকান নারী মেইড দুটো কেমন গম্ভীর মুখে এগুচ্ছেন সামনে। তাদের থেকে সামনে খানিকটা দুরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে এডউইন। মাথাটা এতক্ষণ গর্বিতভাবে উঁচিয়ে রাখলেও হঠাৎ করেই দাম্ভিক পুরুষ মাথা ঝোঁকালেন আচমকা। বা-দিকের করিডর দিয়ে হেঁটে আসছে মনস্টার। তার দু’ধারে কমব্যাট গার্ডস। এডউইন সঙ্গে সঙ্গে তাড়া দেখালো মেইডদের।
“ তারাতাড়ি চলো সবাই!”
হুকুম তামিল হলো যথার্থ। মেইডেরা গতি বাড়ালেন পায়ের। মনস্টারের পৌঁছানোর আগেই তারা স্ট্রেচার নিয়ে এলেন ডক্টরদের কক্ষের বাইরে। তবে এরইমধ্যে ঘটল আরেক অঘটন! মেইডরা তাড়াহুরো করতে গিয়ে স্ট্রেচারটা খানিক জোর ঠেলে দিলেন। আর ওমনি মার্বেলের মেঝেতে পিছলে গেল স্ট্রেচারের গোলাকার চাকা! ফলস্বরূপ অচেতন মাহির হাতখানা বেরিয়ে গেল স্ট্রেচার থেকে। মেইডদের মধ্য থেকে একজন তড়িঘড়ি করে মাহির হাতখানা ফের স্ট্রেচারে তুলতে গেলেই কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন গার্ড মাথা নুইয়ে রেখেই সাহায্যের হাত বাড়ালেন সামান্য। মাহির হাতে খুব একটা স্পর্শ না লাগলেও, হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে টুকটাক আঙুলের ছোঁয়া লাগলো বুঝি। তবে এর আগেই মেইড তুলে ফেললেন মাহির হাত। অস্থির বদনে আবারও স্ট্রেচার নিয়ে এগোলেন কামরায়। এদিকে এতক্ষণের পুরো ঘটনাটার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছেন স্বয়ং মনস্টার! আজব হলেও সত্যি, মনস্টারের চোখদুটো কেমন লাল হয়ে গেছে কেন যেন। দৃঢ় চোয়ালটা কটমট করছে মনে হচ্ছে। তার আগুন দৃষ্টি কেমন একমনে তাকিয়ে আছে গার্ডের হাতের দিকে। তার মস্তিষ্কে আবার হুট করে কি চলছে কে জানে!
স্ট্রেচারে অবচেতন মাহিকে দেখে হতবাক সকলে। এ যে অতিসাধারণ এক মেয়ে! এরজন্যই কি-না ওতো কাঠখড় পুড়িয়ে আনা হয়েছে তাদের? দামিয়ান কেমন নাক কুঁচকে রেখেছে! মিয়ান একবার দক্ষতার সাথে এগিয়ে এসে মাহির আই স্কিন স্পর্শ করতে গেলেই চেঁচিয়ে ওঠে এডউইন!
“ ওয়েট!”
এহেন কান্ডে হকচকান বেচারা মিয়ান। ঘাড় ঘুরিয়ে তক্ষুনি পিছু ফিরে জিজ্ঞেস করলেন,
“ হোয়াটস নাউ?”
এডউইন ভীষণ গম্ভীর! শক্ত গলায় সবাইকে সর্তক করে বলে ওঠে,
“ প্লিজ উনার গায়ে ভুলক্রমেও কেউ উম্মুক্ত হাতে স্পর্শ করবেন না!”
হতবুদ্ধি ভাব নিয়ে তাকিয়ে রইলেন সবাই। খালি হাতে স্পর্শ করবে না মানে কী? এখন কী তারা নিজ হাতে কাঁদা লেপ্টে স্পর্শ করবে রোগীকে? দামিয়ান পেছন থেকে কেমন তিতিবিরক্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ কি বলতে চাইছেন আপনি? খোলাখুলি বলুন।”
এডউইন ঘাড় কাত করল সামান্য। রয়েসয়ে জবাব দিলো,
“ উনাকে স্পর্শ করার আগে অবশ্যই হাতে মোটা গ্লাভস পরে নিবেন।”
মিয়ান মুখ কুঁচকায়। তার কেন যেন ইচ্ছে করছে এডউইনের মুখের ওপর বলে দিতে — শালা পাগল! রোগীকে সবসময় গ্লাভস পরে স্পর্শ করতে হয় না-কি রে? তবে মনের কোণে উত্থাপিত হওয়া এহেন দুঃসাহসিক কথাটুকু গলা অব্দি এনেও গিলে নিলেন মিয়ান। মুখে কপট গম্ভীর ভাব ধরে বললেন,
“ দেখুন মিস্টার! এটা সম্ভব নয়।”
“ সম্ভব নাহলেও তোরা সম্ভব করবি!”
মিয়ানের কথার মাঝেই শোনা গেল অতি ভারী এক গম্ভীর কন্ঠ! মিয়ান ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকানোর আগেই এডউইন জোর গলায় বলে ওঠে,
“ ইট’স মনস্তার!”
ত্বরিত মাথা নোয়ায় সকলে। গা কাঁপছে সবার। শরীরটা কেমন হুট করেই ঘামতে শুরু করল। ওদিকে কালো রঙা ওভারকোট পড়ুয়া মনস্টার নিজের দাম্ভিক কদমে কক্ষে ঢুকল। ঠোঁটে ফাঁকে গুঁজে রাখা সিগারটা একহাতে সরিয়ে এনে গম্ভীর গলায় থ্রেট ছুড়ঁল,
“ ইফ এনিওয়ান ডেয়ার্স টু টাচ হার উইথ বেয়ার হ্যান্ডস, দ্যান লিসেন — দেয়ার হ্যান্ডস উইল বি সেপারেটেড ফ্রম দেয়ার বডি ইন নো টাইম।”
শুকনো ঢোক গিললো সবাই। ত্বরিত নিজেদের হাতদুটোতে একে একে হসপিটাল গ্লাভস পরে নিলো আলগোছে। মিয়ান এবার ভয়ে ভয়েই এগোয় মাহির পানে। একটু একটু করে মেয়েটার বন্ধ চোখ, হাতের পালস রেট চেক করতেই ললাটে শঙ্কিত ছাপ ফুটলো কেন যেন। তিনি কোনরূপ বাছ-বিচার না করেই স্বাভাবিক স্বরে জানালেন,
“ মেয়েটার অবস্থা তো মারাত্মক খারাপ! আমরা নিজেদের সর্বচ্চ চেষ্টা করব বাট তাতেও যদি মেয়েটার জ্ঞান না ফিরে তাহলে… ”
কথাটা শেষ হতে না হতেই মিয়ান টের পেলো তার মাথার খুলির ঠিক মাঝ বরাবর লৌহ নল জাতীয় কিছু একটা ঠেকানো হয়েছে আচমকা। মিয়ান হকচকায়! নিশ্বাস আঁটকে হাতদুটো ত্বরিত উঁচিয়ে তোলে। ঘনঘন নিশ্বাস ফেলে নিজের ভয়টাকে কাবু করার প্রয়াস চালাতেই কর্ণকুহরে ভেসে আসে — মনস্টারের ক্রুর কন্ঠ!
“ আগামী ২৪ ঘন্টার মধ্যে ওর জ্ঞান না ফিরলে, তোদের জ্ঞান হারাবে চিরতরে। মনে রাখিস!”
কী এক বিপদে পড়ল সবাই! রোগীর জ্ঞান ফেরানোর দায়িত্বটাও কী তাদের হাতে? মিয়ান ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়িয়ে জানায়,
“ জ্বি মনস্তার…”
মনস্টারের কঠিন আদেশে পুরো কক্ষ জুড়ে এক হুলস্থুল অবস্থা! ডাক্তাররা উম্মাদের ন্যায় ছুটছে এদিক-ওদিক। তাদের ভাব এমন, তারা বুঝি পারলে মেয়েটার পায়ে ধরে বলে — এবার উঠে পড়ো মেয়ে! অন্তত আমাদের প্রানভিক্ষায় হলেও। এদিকে এডউইন গম্ভীর মুখে পা বাড়িয়েছে মনস্টারের পিছুপিছু। মুগ্ধ কেমন শক্ত মুখে কক্ষের দুয়ার ছাড়িয়ে দু-কদম এগিয়ে আবারও কি মনে করে দাঁড়িয়ে পড়ল হঠাৎ! এডউইনও সঙ্গে সঙ্গে পায়ের গতি থামায়। উৎসুক দৃষ্টিতে মুগ্ধের বলিষ্ঠ পিঠের দিকে তাকিয়ে রয় কিয়তক্ষন। এদিকে মুগ্ধ কেমন ঘাড় কাত করল! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডের দিকে তাকায় আলগোছে। গার্ড বেচারা বরাবরের ন্যায় মাথা নুইয়ে রেখেছে। মুগ্ধের তখন কী হলো কে জানে! সে কেমন শক্ত মুখে পিছিয়ে এসে দাঁড়ালো গার্ডের মুখোমুখি। অতঃপর কোনরূপ বলা কওয়া ছাড়াই চট করে চেপে ধরে গার্ডদের মধ্য থেকে একজনের বামহাতের কব্জি। গার্ড বেচারা ভয়ে তটস্থ! হাত ছাড়িয়ে নেবার সাহস কিংবা ক্ষমতা কোনোটাই নেই তার। সে কেবল কাঁপছে! তার হাতটাও কাঁপছে থরথর করে। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মুগ্ধের চোয়াল শক্ত হচ্ছে ক্রমশঃ। চোখদুটোর দৃষ্টি হলো ক্রুর!
সে কেমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো গার্ডের হাতখানার পানে। তার কল্পনার মানসপটে ফের ভেসে উঠল তখনকার চিত্র! এই হাত! হ্যাঁ৷ এ-ই হাতের আঙুলগুলো আলগোছে স্পর্শ করেছে মাহিকে। একটু করে ছুঁয়ে দিয়েছে মেয়েটাকে। কথাটা মনে পরতেই চট করে চোখদুটো বুঁজে নেয় মুগ্ধ! দাঁতে দাঁত চেপে বেচারা গার্ডের হাতের কব্জিটা কেমন উল্টে ফেলে একপলকে। এহেন কান্ডে তীব্র যন্ত্রণায় জর্জরিত গার্ড! নিজের ঠোঁট নিজে কামড়ে ধরেই গোঙাচ্ছে বেশ। ওদিকে ব্যথার চোটে জান বেরিয়ে আসবার যোগাড় তার। ঠোঁটের ওপর দাঁতের তীব্র চাপ প্রয়োগে ঠোঁট ফেটে লহু গড়াচ্ছে। ওদিকে মুগ্ধ এবার করে বসল আরেক পাগলামি। তক্ষুনি নিজের অতি পছন্দের চাকুটা পায়ের গোড়ালির কাছ থেকে বের করে এনে, গার্ডের আঙুল গুলোর ওপর চালালো একে একে!
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৭
চাকুর অতিরিক্ত তীক্ষ্ণতায় গোঁড়াসহ কাটলো আঙুল। একে একে পাঁচটা র*ক্তে ভেজা আঙুল টস টস করে গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। লহুর বিন্দু বিন্দু ছড়িয়ে যাচ্ছে মেঝের বুকে। অথচ থামেনি নির্দয় মানব! আঙুল গুলো সব কেটে নিয়ে কেমন অদ্ভুত শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঝেতে পড়ে থাকা আঙুল গুলোর পানে। রয়েসয়ে একহাঁটু দু-হাটুঁ ঝুকে বসল কেমন! ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ ক্রুর হাসি ঝুলিয়ে রেখে, চাকুর ডগা দিয়ে আঙুলগুলোয় একটার পর একটা আঘাত বসিয়ে আনমনে বিড়বিড় করল,
“ কি দরকার ছিল নিষিদ্ধ জিনিসে ছুঁতে যাওয়ার? শেষে গা থেকে খসে পড়লি তো!”
