Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫০

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫০
jannatul firdaus mithila

“ আর ইউ্য ওকে সিগনোরা?”
দমকা হাওয়ার ন্যায় বাক্যটা এসে হুটহাট দোল খেলো সপ্তদশীর আন্দোলিত হৃদমাঝারে। প্রগাঢ়তা বাড়ল দৃষ্টে। যুবকের উদ্বিগ্ন দু’টো বাদামী চোখ, কার্নিশে জমেছে নিছক অশ্রু! সুশ্রী গৌরবর্ণ মুখখানায় ফ্যাকাশে প্রলেপ বসেছে। তামাকে পোড়া ঠোঁটদুটো তিরতির! মানবীর গায়ের ওপর ঝুঁকে থেকে মুগ্ধ ফের উৎকন্ঠায় আওড়াল,
“ কথা বলছিস না কেনো সিগনোরা? তুই ঠিক আছিস? কোথাও ব্যথা লাগেনি তো?”
হুঁশ ফিরল মাহি’র! কন্ঠ হলো ভারী। রয়েসয়ে বরফের স্তুপের মধ্য দিয়ে হাত বার করল কোনমতে। মুহুর্তব্যয়ে আলগোছে স্পর্শ করল মুগ্ধের আহত ঘাড়। কচি আঙুলের ডগাগুলো তক্ষুনি যুবকের ঘাড় হতে নিঃসৃত ক্ষারীয় তরলের উপস্থিতিতে সিক্ত হতেই আঁতকে উঠে মাহি। বিচলিত কন্ঠে বলে ওঠে,
“ একি! আপনার ঘাড়….র*ক্ত!”
অতিরিক্ত ভয় এবং আকস্মিকতার মিশেল অনুভুতিতে এলোমেলো বাক্য ছুড়ঁল মেয়েটা। তা কর্ণধার হওয়া মাত্রই চিড়বিড়িয়ে ওঠে মুগ্ধ। নিজ আঙ্গিক ব্যথাগুলো একপ্রকার বেমালুম ভুলে গিয়ে উল্টো বাণ ছুড়েঁ শুধালো,

“ ওহ ফা’ক অফ এভরিথিং বান্দীর মেয়ে! আগে বল, তুই ঠিক আছিস?”
তড়িঘড়ি করে ওপর নিচ মাথা নাড়ায় মাহি। ঢোক গিলে পরপর। যুবক এতক্ষণে গম্ভীর হলো। দৃষ্টি করল তীক্ষ্ণ। দৃঢ় চোয়ালখানা শক্ত করে ফুটিয়ে দাঁতে দাঁত পিষলো খানিক! পরমুহূর্তেই সর্বাঙ্গ ঝাঁকিয়ে গা থেকে বরফ স্তুপের ছোট-খাটো টুকরোগুলো একযোগে ছিটকে সরিয়ে ফেলে রূঢ় মানব। ত্বরিত বেগে উঠে আসে মেয়েটার ওপর থেকে। দাঁত কিড়মিড় করছে মুগ্ধ! চোয়াল তুলছে কটমট শব্দ। চোখদুটোতে আগুন লেপ্টে, নির্দয় মানব তড়াক ঘাড় বাকিয়ে তাকাল অদূরের জঙ্গল পানে। অন্ধকারে দৃষ্টি ক্রমশ তীর্যক হচ্ছে তার! মুখভঙ্গি হচ্ছে শক্ত। কোমরের পিঠে দু’হাত ঠেকিয়ে রূঢ় মানব কেমন ফোঁস ফোঁস করতে লাগল দাঁড়িয়ে থেকে।মুখগহ্বরে সিক্ত জিভখানা কিছুটা নাড়িয়ে-চাড়িয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ কু***বাচ্চা! ভুলে যাস না, ছাড় দেয়া মানে ছেড়ে দেয়া নয়।”
অন্ধকার গহীন জঙ্গলের আদৌপ্রান্ত নিরব। মাঝেমধ্যে ধূ ধূ স্বরে ভেসে আসছে খেকঁশেয়ালের কান্না! মুগ্ধ গজগজ করছে এখনো। তড়াক ঘাড় কাত করে আচমকা ক্রুর দৃষ্টিতে তাকাল মেয়েটার পানে। এহেন দৃষ্টিতে চোখ আটঁকাতেই আঁতকে উঠে মাহি। বরফের নরম কোলে বদনখানি তার আরেকটু নড়চড় করে ওঠে ভয়ে। এরইমধ্যে সম্মুখ থেকে ধেয়ে আসে মুগ্ধের কঠিন হুংকার!

“ ওঠ বান্দীর মেয়ে!”
শুনল মাহি! ভয়ে-নির্ভীকে ব্যস্ততার সনে চটজলদি উঠে দাঁড়ায় কোনরকম। নির্বিকার ভঙ্গিতে দু’হাতে গা থেকে বরফের ছিটেফোঁটাগুলো সরাতে তৎপর মাহি। ঠিক তখনি নিষ্পাপ রমণী শিকার হলো রূঢ় মানবের ক্ষুব্ধ রাগের। মুগ্ধ আচানক কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই মেয়েটার সুদীর্ঘ কোমল কন্ঠায় বসিয়েছে হিং স্র থাবা। এহেন ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কায় মাহি! হকচকান দৃষ্টিযুগল একত্রে নির্দয় মানবের পানে তাক করতেই দেখে — মুগ্ধ কেমন ক্ষুব্ধতার সাথে হিসহিসিয়ে যাচ্ছে। রমণী স্তব্ধ! কন্ঠার ব্যথায় গোঙাচ্ছে মৃদু। ওমনি মুগ্ধ কেমন গর্জে উঠে বলল,
“ কার সাথে দেখা করতে এসেছিলি তুই? কোন বাস্টা’র্ডের সাথে কথা বলছিলি? উত্তর দে জানোয়ারের বাচ্চা! নাহলে আজকে কিন্তু তোর মরণ নিশ্চিত।”
ভয়ে বাকরুদ্ধ মাহি! মনে মনে যা ভেবেছিল তাই হলো। লোকটা ঠিক টের পেয়ে গেল সব। বোকা রমণী অভ্যন্তরে কথা লুকতে ব্যস্ত। ঠিক তখনি রূঢ় মানব ফের গর্জে বললেন,

“ তুই কি চাচ্ছিস, আমি তোকে আবারও আঘাত করি? তুই কী চাচ্ছিস, আমি আবারও নিজের পশুত্বটাকে তোর সামনে নিয়ে আসি? তুই কি চাস না আমি ভালো থাকি? এই কু***বাচ্চা উত্তর দে! তুই চাস না আমি তোর সাথে ভালো থাকি? আমার মা’র গুলো এতো মিস করছিস তুই? গা চুলকাচ্ছে তোর?”
সহসা পিলে চমকে উঠে সপ্তদশীর। চোখদুটো আনমনে নেমে এসে তাক হলো বরফ ঘেরা জমিনে। পেলব মুখখানায় তার ছেয়ে গেল রাজ্যের আধাঁর! ঠোঁটের আগা বাকশূন্য মাহি’র। ক্ষুদ্র বদনখানি নিশ্চল! এদিকে তার ওমন নিস্তব্ধতা যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে রূঢ় মানবকে। ঘাড়ের গভীর ক্ষত হতে অবলীলায় লহু গড়ালেও সেদিকে বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই তার। আপাতত তার সকল উদ্বেগের আগায় স্থানরত মাহি। যুবক ক্রুরতা বাড়াল হাতের। দক্ষ কৌশনে তক্ষুনি এক এক হেঁচকা টানে মেয়েটাকে ঘুরিয়ে এনে, তার সুকোমল রাজহংসীর ন্যায় কোমল কন্ঠনালী আবদ্ধ করে নেয় নিজ বাহুডোরে। এহেন হুটহাট ঘটনার পরিক্রমায় নিশ্বাস ফেলবার জো নেই মাহি’র। হতবাকতার শীর্ষে আবির্ভূত হতেই কানের কাছে স্পর্শ পেলো — রূঢ় মানবের রুক্ষ অধরযুগলের। তক্ষুনি রমণীর শীরঁদাড়া বেয়ে সোজা নেমে গেল একখানা শীতল স্রোতের আবহ। বেড়ে গেল হৃৎস্পন্দন! পাদু’টোয় তার হুট করেই নামল এক অদ্ভুত অসারতা। মুগ্ধ ক্ষুব্ধ! চিড়বিড় কন্ঠে তৎক্ষনাৎ আওড়াল,

“ চোখের সামনে বরাবর যেটা দেখা যায়, তা সবসময় সত্যি হয় না বান্দীর মেয়ে! তুই নিষ্পাপ! তাই বলে নিজের নিষ্পাপতার জেরে বুদ্ধিহীন হোস না। এ পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ আলাদা আলাদা মুখোশের আড়ালে আবৃত। কে আসলেই ভালো, কে আসলেই খারাপ, তা বোঝার সঠিক জ্ঞান তোর এখনো হয়নি সিগনোরা! সাপেদের ভালো মানুষীর মুখোশ দেখে, নিজ হাতে নিজের বিপদ ডেকে আনিস না। ট্রাস্ট মি সিগনোরা, এ নিয়ে আজকে তোকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম। তবে নেক্সট টাইম কোনো ওয়ার্নিং দিব না। ডিরেক্ট সুইটিদের আস্তানায় গিয়ে ফেলে দিয়ে আসব তোকে। মাইন্ড ইট!”
প্রথম কথাগুলো ভীষণ মনোযোগের সাথে গ্রহণ করলেও মানবের শেষ কথাটায় আচমকা কৌতুহল জাগলো মাহি’র। বোকা মানবী কেমন নিষ্পাপ কন্ঠে জিজ্ঞেস করে উঠল,
“ সুইটি? ওরা… কারা?”

কপাল গোছায় মুগ্ধ। এমন একটা সিরিয়াস মুহুর্তে যেখানে তার রাগ পারদ প্রায় আকাশ ছুঁই ছুঁই, সেখানে মেয়েটা এতটা শান্ত রইল কি করে? ওমন একটা সিরিয়াস কথার পিঠে কেমন বাচ্চাদের ন্যায় প্রশ্ন ছুড়ঁল! মুগ্ধ রাগ ভুলে হতভম্ব হবে কি-না তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে জড়ালো খানিক। আকাশসম রাগটা তার প্রশমিত হচ্ছে ক্রমশ। কন্ঠা কমল রূঢ় ভাব। তবুও মুখাবয়বে কপট গাম্ভীর্যের ছাপ ফুটিয়ে নির্দয় মানব তৎক্ষনাৎ ঝটকা মে’রে ছেড়ে দিলো মেয়েটাকে। মাহি সঙ্গে সঙ্গে পিছিয়ে গেল দু-কদম। নিজেকে সামলে নেবার প্রয়াস চালাতেই সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মাফিয়া বিস্ট, কপালের চামড়া বেশ গুটিয়ে আচানক আঁকড়ে ধরে মাহি’র নরম কব্জিসন্ধি। অতঃপর সপ্তদশীকে কোনকিছু বলতে না দিয়ে নিজের সাথে করে নিয়ে যেতে যেতে গমগমে গলায় শুধালো,
“ দে আর মা’ই ডিয়ারেস্ট — শার্কস!”

দাম্ভিকতার সুস্পষ্ট চাদরে মোড়া ব্যস্ত পদযুগল ধীরগতিতে প্যালেসের অভ্যন্তরে নিজেদের আবির্ভাব ঘটাচ্ছে। গায়ে স্রেফ একখানা কালো রঙা ওভারকোট, সবগুলো বোতাম হা করে খুলে রাখা! ফলে দৃশ্যমান যুবকের লোমহীন পেটানো দেহখানা। ঠোঁটের কোণে জ্বলছে সিগার, টান বসছে তার শেষভাগে। পিছুপিছু হাঁটছে সপ্তদশী। হাঁটছে বললে ভুল হবে, সে-তো রীতিমতো ছুটছে! বলিষ্ঠ পুরুষের পদযুগলের সনে পদ মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বেচারি। তাতে অবশ্য ধ্যান থাকলেও উদ্বেগ নেই মনস্টারের। সে-তো নির্বিকার। ব্যুট পরিহিত পাদু’টো তার মর্মর শব্দ তুলতে তুলতে হুট করেই নামতে লাগল গ্রাউন্ড ফ্লোরের লাউঞ্জে। যার কাঁচের মেঝের বিপরীতে সুইমিংপুল। মাহি তৎক্ষনাৎ থেমে গেল। চলন্ত যুবকের উদ্দেশ্যে ভয়ার্ত কন্ঠে শুধালো,

“ আমি নামব না বিস্ট! আমার ভয় করছে।”
বক্রহাসির টান পড়ল মুগ্ধের বাদামী ঠোঁটজোড়ার প্রান্তে। মেয়েটার ওসব কথা বিন্দুমাত্র কানে না তুলে, আচমকা টান বাড়াল হাতের। ওমনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও হুড়মুড়িয়ে লাউঞ্জের কাঁচের মেঝেতে পা পড়ল সপ্তদশীর। মুহুর্তেই ভয়ে সিটিয়ে গেল সে। দিনদুনিয়া ভুলে নিষ্পাপ ভঙ্গিতে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এসে আঁকড়ে ধরল মুগ্ধের পেশীবহুল ইস্পাত-দৃঢ় বাহুখানা। চোখদুটো কুঁচকে মুখ লুকলো সেথায়। এদিকে তার এহেন কান্ডে ঘাড় বাকিয়ে নিরবে তাকিয়ে রইল। অলক্ষ্যে ধারালো দাঁতের ছোঁয়ায় পিষ্ট করল নিজ নিম্নাংশের অধর। দৃঢ় চোয়ালটা আরেকটু নামিয়ে এনে দুষ্ট কন্ঠে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“ ভয় লাগছে আমার সিগনোরার?”
চোখদুটো কুঁচকে রেখেই ওপর নিচ মাথা ঝাঁকায় মাহি। কাঁদো কাঁদো ভাব নিয়ে বলে ওঠে,
“ ওপরে চলুন বিস্ট! মেঝেটা যদি এক্ষুণি ভেঙে যায় তখন? ঐ শার্কস….”
“ উঁহুম! দে আর মা’ই সুইটিস।”
মাঝপথেই মানবীকে শুধরে দিলো মুগ্ধ। তা শুনে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকায় মাহি! অস্ফুটে বলেই বসল,
“ আস্ত মানুষ খেঁকো শার্কদের কোনদিক থেকে সুইটি মনে হয়?”

জিভের ডগায় গাল ঠেললো মুগ্ধ। একহাতে ঠোঁটের কোণ থেকে সিগারটা নামিয়ে, অন্যহাতে আলগোছে বন্ধনীর ন্যায় আঁকড়ে ধরল মাহি’র নরম ঘাড়। পাহাড়সম মানুষটার তুলনায় মাহি বেশ নিচু! উচ্চতায় কোনমতে ছুঁয়েছে রূঢ় মানবের বুক। অথচ এ মেয়েটাকে নিয়েই তুলোর ন্যায় সোফা গুলোর দিকে কি সুন্দর করে এগোচ্ছে মুগ্ধ। রয়েসয়ে পায়ের গতিতে রুখ টেনে আচমকা নিজ পাহাড়সম দেহটা এলিয়ে দিলো বড় সোফার ডুবন্ত কোমলতায়! মাহি চোখ কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। সর্বাঙ্গ জুড়ে মৃদু ঝংকার বইছে তার। হাতদুটো গুটিয়ে আছে বুকের কাছে। মুগ্ধ গম্ভীর! নির্বিকারে তক্ষুনি রমণীর নরম কব্জিসন্ধি চেপে, তাকে এক হেঁচকা টানে কাছে এনে বসিয়ে দিলো নিজ ইস্পাত-দৃঢ় প্রশস্ত উরুর ওপর। মাহি তখনো বুঁজে রেখেছে দুচোখ। মুগ্ধ আলগোছে ঘাড় কাত করে চাইল মেয়েটার পানে। কিয়তক্ষন গভীরদৃষ্টে পরোখ করল রমণীর ভয়ার্ত পেলব মুখখানা। পরক্ষণেই ঠোঁট বাকিয়ে হিং স্র গর্জন তুলল সে,

“ এলেক্স!!!!”
মনস্টারের এহেন বজ্রকঠিন হুংকার যেন প্যালেসের প্রতিটি দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। যার রেশে কেঁপে উঠল বোকা মানবী। ভয়ে সিটিয়ে গেল আরও! ওদিকে ততক্ষণে এলেক্স এসে হাজির। তবে নতমুখী গম্ভীর পুরুষের পা থেমেছে গ্রাউন্ড ফ্লোরের সিঁড়ির ডগায়। লাউঞ্জে নামার সাধ্যি নেই তার। সুইটিদের যা ভয় পায় না বেচারা! মুগ্ধ তখন ফের হুংকার ছুঁড়ল,
“ সবাইকে নিয়ে আয়!”
সহসা কপাল গোটায় এলেক্স। আবারও সবাইকে একযোগে আনার পেছনে কারণটা কী? কি করতে চাইছে মনস্তার? অভ্যন্তরীণ ভাবনাগুলো একপ্রকার ধামাচাপা দিয়ে রাখল এলেক্স। গম্ভীর মুখে তক্ষুনি পা বাড়াল উল্টোপথে। দু’টো কদম পিছিয়ে এসে গলা উঁচিয়ে ডাকল,
“ সবাই তারাতাড়ি এসো! মনস্তার ইজ কলিং ইউ্য গায়েস!”

একটি ডাক! কেবলমাত্র এই একটি ডাকেই কাজ হলো বেশ। মেইডরা যে যেখানে ছিলো, তক্ষুনি বেরিয়ে এলো সবেগে। মাথা নুইয়ে, ভীতসন্ত্রস্ত কদমে এসে দাঁড়াল প্যালেসের ঠিক মাঝখানে। এরইমধ্যে আগমন ঘটল এডউইনের। এলেক্স গম্ভীর মুখে ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকিয়ে যে-ই না দুটো কঠিন বাক্য আওড়াতে যাবে, ওমনি তার আনমনে দৃষ্টি গিয়ে ঠেকল এডউইনের হাতের দিকে। মুহুর্তেই বিস্ফোরিত হলো এলেক্সের চোখ! সেকেন্ড খানেকের জন্য কম্পিত হলো তার সর্বাঙ্গ। এডউইনের হাতে লম্বা একখানা কালো স্ট্র্যাপ। যে স্ট্র্যাপের গোড়াঁয় বাধা আছে মনস্তারের স্যান্ডি ওরফে মাংসাশী ক্রোকোডাইল। প্রাণীটা কেমন দম্ভের সাথে এগোচ্ছে। মুখের ওপর স্ট্র্যাপ বাঁধা তার। তবুও সে নির্বিকার! এলেক্স বেচারা কেমন ভয়ে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে তক্ষুনি সরে দাঁড়াল মাঝপথ হতে। তা দেখে বাঁকা হাসল এডউইন। ধীর কদমে এগিয়ে এসে এলেক্সকে পাশ কাটিয়ে চলে যাবার পথে হুট করেই ফিসফিসিয়ে বলে গেল,

“ প্রে ফর ইউ্যরসেলফ রাস্কেল!”
কপালের ভাঁজ গাঢ় হলো এলেক্সের। তন্মধ্যে ডুবল হতবিহ্বলতায়। এডউইনের এ কথার গভীরতা কী? কি বোঝাতে চাইলো সে? গম্ভীর মুখে নিজস্ব ভাবনায় বুদ এলেক্স। এরইমধ্যে লাউঞ্জ থেকে ভেসে আসে মুগ্ধ ওরফে মনস্টারের হুংকার!
“ কাম ডাউন এলেক্স!”
ভয়ার্ত শুকনো ঢোক গিললো এলেক্স। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে পা রাখল লাউঞ্জে নামার সিঁড়িতে। একটা কদম বাড়ালেই পরক্ষণে আপনাআপনি কদম পিছিয়ে যাচ্ছে তার। তবুও এলেক্স থামেনি। বুক ফুলিয়ে লম্বা একটা নিশ্বাস টেনে ধীরপায়ে নতমস্তকে এগিয়ে গেল মনস্টারের পানে। পায়ের গতি থামতেই কর্ণে পৌঁছুল মুগ্ধের ভারী অথচ দাম্ভিক কন্ঠ!

“ নিল ডাউন এলেক্স!”
হতবাকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এলেক্স। আড়দৃষ্টে একবার পরোখ করল মনস্তারের উরুতে বসে থাকা সপ্তদশীকে। মেয়েটার সামনে সে হাঁটু গেঁড়ে বসবে? এমনও দিন দেখতে হলো তার? যাকে মা-রার জন্য ওতো কারসাজি তার, শেষে কি-না তার সম্মুখেই নত হবে? দম্ভ চুর্ণ বিচূর্ণ হবার আশঙ্কায় অভ্যন্তরে কুন্ঠা যাচ্ছে এলেক্স। কিন্তু মনস্টারের আদেশ বলে কথা। বসতে তো হবেই! বুকের ওপর একমণ ওজনের একখানা অদৃশ্য পাথর চাপা দিয়ে গম্ভীর পুরুষ ধীরে ধীরে হাঁটু ছোঁয়ালেন মেঝেতে। মাথা নুইয়ে কম্পিত কণ্ঠে আওড়ালেন,

“ জ্বি মনস্তার!”
“ গ্রিট হার!”
সহসা হোঁচট খেল এলেক্স! অস্ফুটে আওড়াল,
“ কিন্তু!”
বলতে না বলতেই গম্ভীর পুরুষের নত হাঁটুতে ব্যুট পরিহিত পা তুলল মুগ্ধ। জুতোর শক্ত পৃষ্ঠে এলেক্সের পা-টা খানিক রুষ্টতায় পিষ্ট করতে করতে চিবিয়ে চিবিয়ে আওড়াল,
“ গ্রিট মা’ই গার্ল এলেক্স! ডু ইউ্য নো হু শি ইজ? শি ইজ মা’ই সিগনোরা! দ্য রুশদী’স সিগনোরা। সো গ্রিট হার!”
তৎক্ষনাৎ অদৃশ্য ঝটকা খেল এলেক্স। সিগনোরা? রুশদীর সিগনোরা? তা-ও আবার এ মেয়েটা? কবে হলো? কিভাবে হলো? দুদিন পেন্টহাউজে না থাকায় এতকিছু ঘটে গেল তার অজান্তে? আর সে-কিনা টেরই পেলো না! এলেক্স দাঁত কিড়মিড় করছে। নাকের পাটা ফুলিয়ে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস ফেলছে অনবরত। মাথাভর্তি আগুন নিয়ে গম্ভীর মুখো মানব দাঁতে দাঁত চেপে মাহি’র উদ্দেশ্যে আওড়াল,

“ হোলা…রুশদী’স সিগনোরা! নাইস টু মিট উইথ ইউ্য।”
ঠোঁটের আগায় এহেন কথা থাকলেও মনে মনে যুবক বলে যাচ্ছে প্রতিশোধের আঙ্গারে জ্বলন্ত বাক্য!
“ আজকের এই অপমান আমি মনে রাখব দু’দিনের সিগনোরা! একদিন আমার সময়ও আসবে।”
কয়েক মুহূর্ত নিরবে কাটল। রূঢ় মানব তখন আলতো করে হাত রাখল সপ্তদশীর পাতলা বাঁকানো কোমর বরাবর। পরক্ষণে ফের বজ্র কন্ঠে গর্জে বলল,
“ কল ইউ্যর গার্লফ্রেন্ড এলেক্স!”
মনস্টারের মুখে এহেন বাক্য কর্ণধার হওয়া মাত্রই কেঁপে ওঠে এলেক্স। শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে অলক্ষ্যে। ওদিকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে দাঁড়িয়ে থাকা ডঃ হায়া ভয়ে কাঁপছে রীতিমতো। বারবার কচলাচ্ছে হাত! মনস্তার তাকে কেনো ডাকছে? এলেক্স তখন নতমুখে খানিক প্রসঙ্গ এড়ানোর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“ মনস্তার! আমি আসলে…. ”

বাকিটা বলার আর ফুরসত হলো না এলেক্সের। তার আগেই বেচারার বুক বরাবর সজোরে পড়ল রূঢ় মানবের শক্তিশালী লাথি। মুহুর্তেই অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়ে কয়েক হাত দুরত্বে ছিটকে পড়ল এলেক্স। দু’হাতে বুক চেপে ককাতে লাগল বেশ। মনস্টার ফের তেজ বাড়িয়েছে নিজের। মুখাবয়বে নামিয়েছে চিরচেনা হিং স্রতা। একহাতে মানবীর কোমর আঁকড়ে রেখে, অন্যহাতে তক্ষুনি নিজ কোমরের পেছন হাতড়ে বের করে আনলো AR7 মডেলের রাশিয়ান বন্দুকটা। তার শীতল লম্বাটে নলখানা এলেক্সের দিকে তাক করে মুগ্ধ ফের হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,
“ এক্ষুণি ডাক তোর গার্লফ্রেন্ডকে!”
ব্যথায় নীল হয়ে যাচ্ছে শ্যামপুরুষ এলেক্স। বুকের ওপর হাত চেপে হাঁপাচ্ছে ভীষণ। ওদিকে প্রিয় মানুষের এহেন করুণ পরিস্থিতি দেখে আর অটল পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না হায়া। তক্ষুনি ছুটে আসতে তৎপর হলো সে। কিন্তু পথিমধ্যে শোনা গেল এলেক্সের কাঁপা কাঁপা ব্যথাতুর কন্ঠ!

“ মিলা!”
সহসা থমকে গেল পারস্য সুন্দরী! থমকে গেল তার হৃৎস্পন্দন। সর্বাঙ্গে নামল অদ্ভুত নাম না জানা অসারতা। সুশ্রী গৌরবর্ণা মুখখানা তার মুহুর্তেই রং ধরল ফ্যাকাশে। হৃদয়টা এই বুঝি কেউ চুরমার করে দিলো তার। পারস্য সুন্দরী এখনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে অপারগ। হতবুদ্ধির ন্যায় ছলছল দৃষ্টিজোড়া তাক করল অদূরের লাউঞ্জে। এলেক্স নতজানু! কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আবারও ডাকছে,
“ মিলা-হ!”
ফের সম্পূর্ণ পৃথিবীটা দুলে উঠল হায়া’র। মস্তিষ্ক হয়ে গেল ফাঁকা। টলমল পাদু’টো তার দাঁড়িয়ে থাকার সাধ্যি পাচ্ছে না আর। টলতে টলতে পেছাতে লাগলেই আচমকা তার গা ঘেঁষে সম্মুখে ছুট লাগাল মিলা। সে-কি দৌড় মানবীর! পেছন থেকে হায়া কেবল আহত চোখে চেয়ে দেখল দৃশ্যটা। মিলা ছুটছে! ছুটতে ছুটতে কয়েক লাফে গিয়ে আচমকা আঁকড়ে ধরেছে তার প্রিয় মানুষকে। হায়া নিস্তব্ধ! চোখদুটো তার নিরবে ঝরাচ্ছে অবাধ অশ্রু। বুকের মধ্যিখান এবং গলার কাছটা হুট করেই এতো ব্যথা করছে কেনো তার? এই অল্প বয়সেই হার্ট অ্যাটাক হবে না-কি তার?
এদিকে মিলা কাঁদছে! দু’হাতে আহত এলেক্সকে আলগোছে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে বলছে,

“ আর ইউ্য ওকে? আর ইউ্য ওকে এলেক্স?”
তরুণী নিজ প্রিয়তমকে ডাকতে ব্যস্ত। এরইমধ্যে রূঢ় মানব মাহি’কে আলগোছে নিজ উরু থেকে উঠিয়ে এনে বসালো পাশে। আলতো করে মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে আওড়াল,
“ চোখ খোল সিগনোরা! পরবর্তী দৃশ্যটা কেবলই তোর জন্য।”
কপালের চামড়া সংকুচিত হলো মাহি’র। অদম্য হতবাকতার চোখদুটোর পর্দা সরে গেল আপনা-আপনি। তা দেখে বাঁকা হাসে মুগ্ধ। মেয়েটার নরম মসৃণ গালের ত্বকে আলতো করে নাক ঘষে দিয়ে অতি শান্ত অথচ ভয়ানক কন্ঠে শুধালো,

“ দ্যাট’স মা’ই গার্ল!”
হৃৎপিণ্ড কম্পিত হলো সপ্তদশীর। ভয় বাড়ল মানে। অশনি আভাসে হাসফাস বেরে গেল কয়েকগুণ। মুগ্ধ আলগোছে তাকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল ততক্ষণে।পকেট থেকে একখানা সিগার বের করে এনে ঠোঁটের ফাঁকে গুঁজল মহাশয়। লাইটার ধরিয়ে পা দু’হাত রাখল পকেটে। ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত সিগার চেপেই গমগমে গলায় আওড়াল,
“ এডউইন! কাম।”
এতক্ষণ বোধহয় মনস্টারের আদেশের অপেক্ষাতেই ছিল এডউইন। এক ডাকেই স্যান্ডিকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে নামতে লাগল লাউঞ্জের সিঁড়ি বেয়ে। চোখের সামনে এই প্রথম ওতোবড় একটা কুমির দেখে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠে মাহি। বোকা মেয়েটা তক্ষুণি একলাফে পা উঠিয়ে বসল সোফায়। এদিকে রূঢ় মানব সিগার ফুঁকছে। এডউইনকে ফের আদেশ ছুঁড়ে বলছে,

“ ঐ বি’চের গায়ে এক্ষুণি মধু ঢাল।”
এবার বুঝি মুখাবয়বে আধার নামল এডউইনের। বুক কাঁপছে দুরুদুরু। কি করে কাজটা করবে সে? তার গ্লুপায়াকে নিজ হাতে কিভাবে খাবার বানাবে এই রাক্ষুসসে কুমিরটার? এডউইন দাঁড়িয়ে রইল ঠায়। এতক্ষণের তার সকল কঠোরতা হুট করেই উবে গেল কোথাও। হাতদুটো কাঁপতে লাগল আপনা-আপনি। মুগ্ধ আড়দৃষ্টে বিচক্ষণতার সাথে পরোখ করল এডউইনের মুখভঙ্গি। পরমুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ হিউম্যান এন্ড দে’র ফা’কিং লাভ!”
মুহূর্ত কতটুকু পার হলো কে জানে! মনস্টার তখন চোয়াল শক্ত করে ফের গর্জন তুলে আওড়াল,

“ কিছু বলেছিলাম তোকে এডউইন? না-কি আমার হাতে গর্দান ত্যাগ করার শখ জেগেছে তোর?”
দু’ধারে নিরবে মাথা নাড়ায় এডউইন। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ধীরে ধীরে পা আগায় সম্মুখে। একহাতে তার কালো স্ট্র্যাপ ধরে রাখা, অন্যহাতে একখানা কাঁচের শিশি। ক্রন্দনরত মিলার অভিমুখে এসে থমকায় গম্ভীর মানব। নিজের ছলছলে দৃষ্টিজোড়া তড়িঘড়ি করে অন্যত্র লুকিয়ে কাঁচের শিশিটা খুলে নিলো আলতো করে। অতঃপর বুক ফুলিয়ে এক লম্বা নিশ্বাস টেনে, শিশিতে থাকা সবটুকু তরল মিলার গায়ে ছড়িয়ে দিলো সে। এতক্ষণে মিলার সম্বিৎ ফিরল! বদনে ছিপছিপে তরল মাখামাখি হতেই ভড়কে তাকাল নিজের পানে। কান্না ভুলে হতবাক চোখে গা থেকে একটুখানি তরল আঙুলের ডগায় নিয়ে পরোখ করতেই বুঝল — এ যে মধূ! তৎক্ষনাৎ আঁতকে উঠে মিলা। চমকিত দৃষ্টে সম্মুখে তাকাতেই দেখে — এডউইন দাঁড়িয়ে আছে, তার ঠিক পাশে স্যান্ডি! বিস্ফোরিত হলো মিলার চোখ। হতভম্বতায় গাঢ় হলো দৈহিক কম্পন। মেয়েটা কেমন ভয় পেয়ে তক্ষুনি ছুট লাগাল অন্যত্র। তবে বালাইষাট! গায়ে ছিপছিপে তরল পরার দরুন তার পা মাঝপথেই হোঁচট খেল বেশ। সহসা কাঁচের মেঝেতে উল্টে পড়ল বেচারি। মুগ্ধ হাসল! নিরব, পৈ*শা*চিক হাসি। ধীরলয়ে এগিয়ে এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল স্যান্ডির কাছে। মেরুদণ্ড সামান্য বাঁকিয়ে আলতো করে হাত ছোঁয়াল কুমিরটার উষ্ণ গায়ে। ধীরে ধীরে তার মুখের বাঁধন খুলতে খুলতে রূঢ় মানব কেমন ভয়ানক শান্ত কন্ঠে আওড়াল,
“ গো স্যান্ডি! হেভ আ নাইস ট্রিট!”

বলতে বলতেই স্যান্ডির মুখের ওপর থেকে সম্পূর্ণ স্ট্র্যাপ খুলে দেয় মুগ্ধ। মুখের বাঁধন খোলা পেতেই লম্বা হামির সহিত গর্জন দিয়ে নিজের উপস্থিতি বোঝালো স্যান্ডি। তক্ষুনি বিগড়ানো গতিতে শিকারের পানে অগ্রসর হয় সে। এদিকে স্যান্ডিকে ক্রমশ নিজের পানে আগাতে দেখে ডুকরে উঠে মিলা। মেঝেতে গড়িয়ে গড়িয়ে পেছাচ্ছে সে। স্যান্ডি মাত্র একহাত দুরত্বে তখন। ক্ষ্যাপাটে গতিতে আরও এগোতেই অদূর থেকে তক্ষুনি ছুটে আসে মাহি। ভয়ডর সব চুলোয় চড়িয়ে আচমকা এগিয়ে এসে দু’হাতে আঁকড়ে ধরে মিলাকে। এহেন কান্ডে ভড়কায় মুগ্ধ! ত্বরিত হুংকার ছুঁড়ে বলে ওঠে,
“ হোয়াট দা ফা’ক আর ইউ্য ডুয়িং সিগনোরা! লিভ হার।”

শুনল না মাহি! দু’হাতে আড়াল করে আগলে ধরল মিলাকে। ওদিকে স্যান্ডি আগাচ্ছে! দু-দুটো শিকার পেয়েছে সে। অবস্থা বেগতিক দেখে তক্ষুনি ছুটে আসে মুগ্ধ। দক্ষ এথলেটিক গতিতে দৌড়ে এসে আচমকা আঁকড়ে ধরে স্যান্ডির গলায় পেচিয়ে রাখা স্ট্র্যাপের আগা। ক্ষিপ্ত গতিতে তা টেনে ধরতেই হুট করে মাঝপথে থেমে গেল স্যান্ডি! সদ্য এক বিশাল হা করেছিল বেচারা। ইশশ! খাবার সামনে পেয়েও খেতে পারেনি সে। মুগ্ধ স্ট্র্যাপ ধরে টানছে। ওতবড় কুমিরটাকে একপ্রকার টেনেহিঁচড়ে সরিয়ে আনছে মাহি’র কাছ থেকে। এডউইন এবার এগিয়ে গেল। মুগ্ধের হাত থেকে আলগোছে নিয়ে নিলো স্ট্র্যাপটা। রূঢ় মানব থামল! মাথায় আগুন জ্বলছে তার। চোয়াল ফুটেছে শক্ত ভাবে। সে কেমন ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে গেল মাহি’র নিকট। শক্তপোক্ত হাতের হিং স্র থাবায় আচমকা পেছন থেকে আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর নরম তুলতুলে বাহু। এক ঝটকায় তাকে মিলার কাছ থেকে সরিয়ে এনে দাঁড় করালো নিজ সম্মুখে। অতঃপর কোনরূপ স্থান-কাল বিবেচনা না করে তৎক্ষনাৎ নিজ রুক্ষ পাঁচ আঙুলের রুষ্ট চপেটাঘাত বসিয়ে ছাড়ল মেয়েটার নরম গালে। এহেন আক্রমনে গাল বেঁকে যায় মানবীর। কেটে যায় ঠোঁটের একাংশ। মুগ্ধ থামেনি। ক্ষুব্ধ বাঘের ন্যায় আবারও আঁকড়ে ধরল সপ্তদশীর দু-কাধ। সেথায় নিজ শক্ত আঙুলের নখর দাবিয়ে কঠিন হুংকার ছুঁড়ে শুধালো,
“ ইউ্য ফা’কিং গ্লুপায়া! এটা কি করতে যাচ্ছিলি তুই? কুমিরের মুখের সামনে চলে এলি কেন জানোয়ারের বাচ্চা? ম’রার এতো শখ কবে থেকে হলো তোর?”
ডুকরে কাঁদছে মাহি। ফোপাঁতে ফোপাঁতে চেপে ধরেছে জ্বলতে থাকা গালটা। নাক টেনে কাঁদো কাঁদো গলায় আওড়ায় সে,

“ মিলাকে মা’রবেন না। আমি যখন এ প্যালেসে প্রথমবার এসেছিলাম — তখন ও-ই ছিল যে আমাকে সামলিয়েছে। খেয়াল রেখেছে বড় বোনের মতো! সর্বদা প্রটেক্ট করেছে।”
সপ্তদশীর এহেন নিষ্পাপ স্বীকারোক্তিতে হতবুদ্ধির ন্যায় তাকিয়ে রইল মিলা। শুরু থেকে যে মেয়েটার বিরুদ্ধে এতো এতো কারসাজি করেছে সে, আজ কি-না সে-ই মেয়েটাই তাকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করছে? এদিকে মুগ্ধ রাগে ফেটে পড়ছে যেন! বোকা মানবীর এহেন নিষ্পাপ স্বীকারোক্তি গায়ে কাটা ফোঁটাচ্ছে তার। সে কেমন রাগের তোড়ে হিতাহিতজ্ঞান হারাচ্ছে ক্রমশ! মেয়েটার চোয়াল বরাবর শক্ত করে চেপে ধরে গজগজ করতে করতে শুধালো,

“ এতো ভালো হতে কে বলেছে তোকে জানোয়ারের বাচ্চা? আমার বিরুদ্ধে যাচ্ছিস কোন সাহসে? আমি যাকে মা’রতে চেয়েছি, তাকে বাঁচানোর তুই কে?”
চোয়ালের ব্যথায় ফোপাঁচ্ছে মাহি। কাঁদছে কেবল ফুপিয়ে ফুপিয়ে। মুগ্ধ কেমন ঠায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেয়েটার পানে। তার দৃষ্টিতে অবোধ্য অসন্তোষের ছাপ। যুবক আবারও দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ আমি আমার বিরুদ্ধে যাওয়া মানুষদের বাঁচিয়ে রাখি না বান্দীর মেয়ে! আমার গড়া রাজ্যত্বে অনিয়ম নিয়ে আসিস না। ধ্বংস করে ফেলব কিন্তু!”
সপ্তদশী নিশ্চুপ! লাল হয়েছে তার মুখশ্রী। মুগ্ধ তখন ঝটকা মে’রে ছেড়ে দিলো মেয়েটার চোয়াল। এক আকাশসম রাগে গজগজ করতে করতে তৎক্ষনাৎ চলে গেল প্যালেসের সদর দরজার পানে। এদিকে মাহি কেমন নাক টানছে! ভয়ে কাঁপছে তার বদন।

রাত গভীর! পেন্টহাউজে অতি দক্ষশৈলীতে গড়া মন্সটারের রাজকীয় বেডরুম। কক্ষ তো নয়, এ যেন ফুটবল মাঠ! রূঢ় মানব কাঁচের দেয়ালের অভিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড়ের ক্ষত এখনো উম্মুক্ত তার। অথচ সেদিকে তার ধ্যান নেই। সে অনবরত ফুঁকছে সিগার। মনটা বড়ো অশান্ত এমুহূর্তে! কিছুটা স্বস্তি প্রয়োজন। আপেক্ষিক স্বস্তির খোঁজে রূঢ় মানব পায়চারি চালাচ্ছেন। ঠোঁটের ফাঁকে সিগার চেপে বিশাল কক্ষে হাঁটতে হাঁটতে হুট করেই তার অবচেতন মনের কোণে উত্থাপিত হলো — স্বস্তি পাবার বহু পুরাতন উপায়খানা। মুহুর্তেই থমকে দাঁড়ায় মুগ্ধ। যার জন্য অশান্ত হয়েছে মন, তাকে দিয়েই কি শান্ত হবে অবচেতন হৃদয়? মস্তিষ্কের কোনো এক জায়গায় তড়াক করে বেজে উঠল প্রশ্নটা। সন্দিহান সুদর্শন ফের মুখভর্তি সিগারের কলুষিত ধোঁয়া টানলেন। কিয়তক্ষন মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে পরক্ষণেই খেয়াল করলেন — তার পাদু’টো কোনো এক অশরীরির ভরে আপনা-আপনি এগোচ্ছে যেন। যুবক কপাল গোছালো। ব্যপক অনিহা নিয়েই নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল বিশাল কক্ষের বা-দিকের দেয়াল ঠেসে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল বুকশেলফের পানে। খানিক দোনোমোনো করতে করতে বুকশেলফের পাঁচ নম্বর তাঁকে থাকা মোটা বইটায় আলতো করে টান বসায় মুগ্ধ। মুহুর্তেই বিশাল লাইব্রেরিটা নিঃশব্দে স্লাইডিং দরজার ন্যায় সরে গেল দুপাশে। উম্মুক্ত হলো একখানা গোপন কামরা। মুগ্ধ ধীরলয়ে প্রবেশ করল সেথায়। তার পায়ের প্রথম স্পর্শ মেঝে ছোঁয়ার সাথে সাথেই ঝলমলে আলোতে আলোকিত হলো সম্পূর্ণ কামরাটি। দৃশ্যমান হলো কোনো এক বিষাক্ত আসক্তিতে আসক্ত পুরুষের সকল কালোচিট্টা।

দক্ষ কারিগরের হাতে নির্মিত গোপন কক্ষটি। চারপাশের দেয়ালজুড়ে অসংখ্য ফ্রেম! কোথাও দৃশ্যমান কিশোরী মাহি’র হাসিমাখা মুখ, তো আবার কোথাও দৃশ্যমান মেয়েটার অন্যমনস্ক দৃষ্টি। কোনো কোনো ছবিতে দেখা যাচ্ছে — সদ্য কৈশোরে পা দেয়া মানবীর মনের সুখে বৃষ্টিবিলাসের মূহুর্ত! কোথাও আবার লুকিয়ে আছে বৃষ্টিভেজা বিকেলে ছাতা হাতে মাহি’র হাঁটার দৃশ্য। সবক’টা ছবি অজান্তে তোলা হয়েছে বিধায় মেয়েটা ভারী অন্যমনস্ক। প্রতিটি ছবির ফ্রেমের একদম নিম্নাংশে ছোট ছোট অক্ষরে লিখে রাখা — তারিখ, সময় এবং স্থানের নাম। যেন এক সুক্ষ্ম তদন্তকারী বছরের পর বছর ধরে মেয়েটার প্রতিটি পদক্ষেপ নিখুঁতভাবে পরোখ করে যাচ্ছে!

দেয়ালের এককোনে বিশাল কর্কবোর্ড। সেথায় লাল সুতোয় জোড়া লাগানো রয়েছে ব্যস্ত এক শহরের মানচিত্র, ছোট-বড় বিভিন্ন লোকেশন ট্র্যাকিং ওয়ার্ডস। বা-দিকের দেয়ালে কোনঠাসা আকারে দাঁড়িয়ে আছে একখানা বিশাল কাঁচের শেলফ! তার প্রতিটি তাকে পরম যত্নে সাজিয়ে রাখা বেশকিছু কাগজ, কফিশপের বিল, শুকিয়ে যাওয়া একখানা কাঠগোলাপের পাপড়ি। তিন নম্বর তাকে ঠাঁই পেয়েছে ছোট্ট একটা কাঁচের বক্স। যেথায় সংরক্ষিত মাহি’র কোনো এককালে ব্যবহৃত রুমালখানা!
কক্ষের মাঝখানে বিছিয়ে রাখা কালো চামড়ার একটি একাকী চেয়ার। তার ঠিক সামনে কাঁচের টেবিল, সারি সারি অ্যালবাম সেথায়। অ্যালবামের প্রতিটির মলাটে একটি করে সাল লেখা থাকলেও অ্যালবাম গুলোর ভূমিকায় কেবল একটি তারিখের নামই জ্বলজ্বল করছে,

◑ ২৮-০৬-২০২৩ ◑ যেদিন প্রথমবার কিশোরী বোকা মানবী হৃদয়ে ঝড় তুলেছিল রূঢ় মানবের। অ্যালবামের প্রতিটি পৃষ্ঠে বন্দী মাহি’র কিছু বিচ্ছিন্ন মুহূর্ত— স্কুল, রাস্তা, ক্যাফে, হাসপাতাল, পার্ক— যেন তার প্রতিটি নিঃশ্বাসও এই ঘরের নীরব সাক্ষী মাত্র! পুরো দুনিয়ার কাছে শক্ত খোলসে আবৃত রূঢ় মানব — অধীর রায়! খুব একটা আসে না এ কক্ষে। তবে যতবার নিজের অবচেতন মনটাকে সামলাতে না পেরে বেহায়ার ন্যায় কক্ষটিতে ছুটে এসেছে, ঠিক ততবার সে নিজের খোলস পাল্টিয়েছে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। ভেতরে ঢোকবার শুরুতে সুদর্শন যতটা না অনীহা দেখাচ্ছিলো, এখন যেন সে অনীহায় লেপ্টে গিয়েছে বিষাক্ত আসক্তির ছায়া। রূঢ় মানব এগোয় সম্মুখে। টেবিলের ওপর পড়ে আছে বেশকিছু ছবি। মাহি প্যালেসে আসার পর থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে তোলা হয়েছে ছবিগুলো। মুগ্ধ আলগোছে ঘাড় কাত করল। দু’হাতে অতি-সন্তর্পণে তুলে নিলো সবগুলো ছবি। গভীর দৃষ্টিতে ছবিগুলো উল্টেপাল্টে পরোখ করতে করতে আচমকা তার দৃষ্টি আটকালো অন্য একটা ছবিতে। যেথায় মাহি খিলখিল করে হাসছে। তার দু’হাতে আদুরে কিউটি! মুহুর্তেই কপালের চামড়ায় হিংসাত্মক ছাপ ফুটল মুগ্ধের। চোয়াল হলো শক্ত। সে তক্ষুনি ছবিটা আলতো করে ছিঁড়তে লাগল। মাহি যেখানে আছে তা আস্ত রেখে বাকিটুকু ছিঁড়ে এনে টুকরো টুকরো করে পুরো ঘরময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছাড়ল। হিসহিসিয়ে দাঁত খিঁচে আওড়াল,

“ বাস্টা’র্ডটার মৃ ত্যু ঘনিয়ে এসেছে!”
রাগের পারদ আবারও আকাশ ছুঁই ছুঁই। যুবক ধীরেসুস্থে ফের নিজের দৃষ্টি তাক করল হাতে থাকা ছবিগুলোর পানে। সেগুলো নিয়ে গিয়ে আলতো করে পিন করে আঁটকে রাখল কর্কবোর্ডে। ল্যাম্পশেডের টিমটিমে আলোয় খানিকক্ষণ নিরব চোখে তাকিয়ে রইল মেয়েটার ছবিগুলোর দিকে। অতি যত্নে সবগুলো ছবিতে হাত বুলিয়ে রূঢ় মানব শুধালো,

“ ঐসব বিয়ে-শাদি এন্ড দোস ফা’কিং লাভস আর নট ইন মা’ই ক্রাইটেরিয়া সিগনোরা! তুই আমার, তোকে সারাজীবন আমার কাছে রাখার জন্য যা যা করা লাগে, তা সব করতে প্রস্তুত আমি! দরকার পড়লে পুরো দুনিয়ার বিরুদ্ধে যাবো, ধ্বংস করে ফেলব সবকিছু! তবুও দিনশেষে তোকে নিজের করে রাখবই!”
থামল মুগ্ধ! বিবাহ এবং নারীবিদ্বেষী মন তার। তবুও দিনশেষে আসক্ত হয়েছে এক সপ্তদশীর জন্য! নিজের এহেন মনোভাবে আনমনেই গাল বাকিয়ে হাসল সুদর্শন। শরীর ঘুরিয়ে দাঁড়াল পরক্ষনেই। অদূরে একখানা পিয়ানো। বাজানো হয়নি বহুদিন! তার আজ ইচ্ছে হলো — দক্ষ হাতে পিয়ানোর সুর তুলতে। শেষবার গেয়েছিল মেয়েটাকে প্যালেসে আনার আগে। রূঢ় মানব পা বাড়ায় সেথায়। আঙুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে দেয় কালো রঙা পিয়ানোটার গা! ধীরেসুস্থে টুলের ওপর বসল সে।আঙুল রাখল পিয়ানোর চাবিগুলোতে। তৎক্ষনাৎ পুরো ঘরময় ছড়িয়ে গেল পিয়ানোর টুংটাং শব্দ! ওপরে ডেস্কে এখনো নিরবে পড়ে আছে একখানা খাতা। সেথায় লিখে রাখা বেশ পুরনো এক সুর। গত তিনবছর আগে মেয়েটার চলে যাওয়ার, পুরো শহরে তল্লাশী চালিয়ে আনমনে গেয়েছিল মুগ্ধ। তবে এরপর আর গাওয়া হয়নি তার। যুবক কিয়তক্ষন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল খাতায় নোট করা সুরের দিকে। অজান্তেই তার কন্ঠায় সুর উঠল। আঙুলগুলো স্বেচ্ছায় দক্ষতার সাথে নড়তে লাগল চাবির সনে। গাইল……

“ নাম জানি না তোর
আর রাত জানিনা ভোর
মন যায়রে চলে যায়
প্রেম জানিয়ে
হাল মেলাবি আয়
দিন কাল মেলাবি আয়
মন ফিরবে নারে আজ
তোকে না নিয়ে…….”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৪৯ (২)

থামে মুগ্ধ! বুক ফুলিয়ে নিশ্বাস টানে লম্বা। দৃষ্টিতে প্রগাঢ়তা নামিয়ে সহসা তাকাল অদূরের দেয়ালপানে। সেথায় ঝুলন্ত মাহি’র অসংখ্য ছবি! তার দিকে তাকিয়ে থেকে রূঢ় মানব কেমন ঠোঁট কামড়ে বলে ওঠে,
“ মস্তিষ্ক বলে তোকে মে’রে ফেলি, মায়ের প্রতিশোধ বলে কথা! আর পাগলাটে মন বলে — তুই শুধু আমার থাক! বিনিময়ে দুনিয়া গোল্লায় যাক।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৫০ (২)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here