মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৯
jannatul firdaus mithila
নিস্তব্ধতায় মোড়ানো কক্ষটি! আপাতত যা ব্যবহৃত হচ্ছে আইসিইউ হিসেবে। চারিদিকে মেশিনের বিপ বিপ শব্দ! বিছানায় চিৎ হয়ে নিস্তেজ আকারে পড়ে আছে — মাহি! নাক-মুখ বরাবর অক্সিজেন মাস্ক, ঠোঁটদুটো কেমন ফ্যাকাশে রঙ ধারণ করেছে। বুকের ওঠা-নামার গতি বেশ ধীর তার। কয়েক জোড়া চিন্তিত দৃষ্টি আপাতত মেয়েটার মুখপানেই নিবদ্ধ। ড.মিয়ানের হাতে একখানা রিপোর্ট পেপার। তার কপালখানা কুঁচকে রাখা, সেই সাথে নিচের ঠোঁটের চামড়ায় বসানো উপরিভাগের ক’টা দাঁত। আধবুড়ো ফরাসী লোকটার চোখেমুখে সে-কি দুশ্চিন্তা! তিনি খানিকক্ষণ গম্ভীর থেকে আওড়ালেন,
“ স্ট্রেঞ্জ! এত কমবয়সী একটা মেয়ের কি-না ড্রাগ ওভার ডোজের সাথে ফাইট করছে? হোয়াট দা হেল ইজ দিস! শি ইজ সাফারিং উইথ ড্রাগ ওভারডোজ সিডেটিভ। আই ডোন্ট থিংক সো সে বাঁচবে!”
মুহূর্তেই মাথায় বোধহয় আকাশ ভেঙে পড়ল সকলের। মনের কোণে ছড়িয়ে গেল একরাশ ভয়! মেয়েটার জ্ঞান না ফিরলে তারা কী আর বাঁচবে? ঐ মনস্টার যদি সত্যি সত্যিই মে’রে দেয় তাদের, তখন? ভয়ে গলা অব্ধি শুকিয়ে কাঠ সবার। প্রত্যেকেই কেমন হাসফাস করছে দেখো! দামিয়ান কিয়তক্ষন চুপ থেকে আচমকাই কেমন মেকি ভালো মানুষীর ভাবস্রোত ধরল। ভীড়ের মধ্য থেকে দু-কদম এগিয়ে এসে উকুন মে’রে বলে উঠল,
“ ঠিক আছে ড.মিয়ান। মেয়েটার অবস্থা যেহেতু খুব ক্রিটিকাল সেক্ষেত্রে আর রিস্ক নেওয়া ঠিক হবে না। আপনি বরং মনস্টারকে সবটা জানিয়ে দিন।”
এহেন কথায় যারপরনাই হকচকিয়ে ওঠলেন মিয়ান। বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন দামিয়ানের পানে। কপালে গোটাকতক রাগী ভাঁজ টেনে দাঁত খিঁচে শুধালেন,
“ এভাবে না বলে তুমি নাহয় সরাসরিই বলতে — ড.মিয়ান, আপনি ম’রে যান। কেনো আমায় বলির পাঠা বানানোর জন্য ওমন উৎ পেতে রয়েছেন দামিয়ান? আমি এখনো বেঁচে আছি সেটা কী আপনার সহ্য হচ্ছে না?”
মিয়ানের তেতেঁ ওঠা কন্ঠে মুখ টিপে হাসছে বাকিরা। ওদিকে দামিয়ান মুখ ঘুরিয়েছে অন্যত্র। আধবুড়ো মহাশয় হাসছেন কি-না কে জানে! মিয়ান থামলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। ঘাড় বাকিয়ে ফের মাহির মুখপানে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর হলেন কেমন। একহাতে কপাল চুলকে দুশ্চিন্তায় আওড়ালেন,
“ মেয়েটার সেন্স না ফিরলে আমরা বাঁচব কি-না সন্দেহ! সো আই থিংক, আমাদের শেষবারের মতো একটা রিস্ক নেওয়া উচিত। কী বলেন সবাই?”
সবাই মোটামুটি সায় জানালেন মিয়ানের প্রস্তাবে। তবে দামিয়ান রইলেন কাঠ হয়ে। হাসিখুশি লোকটার মুখাবয়ব শক্ত এমুহূর্তে। তিনি বোধহয় আনমনে ভাবছেন কিছু। মিয়ান সেদিকে পাত্তা দিলেন না। জুনিয়র চিকিৎসককে উদ্দেশ্য করে আদেশ ছুড়ঁলেন,
“ অ্যান্টিডোট শুরু করুন, তবে খেয়াল রাখবেন — সবটা যেন একদম ধীরে ধীরে এগোয়। আগে পেশেন্টের বডি রিয়্যাক্ট দেখে নেই, তারপর বাকিটা করব।”
জুনিয়র ডক্টর আদেশ মোতাবেক কাজে লেগে গেলেন। তক্ষুনি এগিয়ে এসে অ্যান্টিডোট শুরু করলেন। আরেকজন ডাক্তার ততক্ষণে স্যালাইন চেক করছেন। একহাতে আইভি ফ্লুইডের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে জানালেন,
“ অল সেট স্যার!”
ড.মিয়ান এবার ফের নামলেন যুদ্ধক্ষেত্রে। বাহাতের কব্জি উল্টে ঘড়িটার পানে নজর রাখলেন খানিকক্ষণ। যেইনা মিনিটের কাটাঁ দুবার ঘুরলো ওমনি মনিটরের স্ক্রীনে দৃশ্যমান লাইনগুলো কেমন অস্বাভাবিক হয়ে উঠল। শব্দ পরিবর্তীত হয়ে শোনালো,
“ বিপবিপবিপ…..”
ডক্টররা ঘাবড়ে গেলেন কেমন। পাশ থেকে জুনিয়র ডক্টর তক্ষুনি চেচিয়ে উঠে বললেন,
“ স্যার! পেশেন্টের শ্বাসপ্রশ্বাস কমে যাচ্ছে।”
দামিয়ান আর দেরি করলেন না এবার। এতক্ষণ নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেও এবার কেমন নিজে থেকেই ডক্টর হায়ার হাতে অ্যাম্বু ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলে ওঠলেন,
“ অক্সিজেন বাড়াও।”
জুনিয়র তা-ই করলেন। অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন অনেকটাই। ডক্টর হায়া দ্রুত অ্যাম্বু ব্যাগ চাপতে লাগলেন। মেয়েটার নিশ্বাস আঁটকে আঁটকে যাচ্ছে কেমন! বুকটা একবার উঁচুতে উঠছে তো আরেকবার নিচুতে! হায়া বোধহয় কেঁদেই ফেলবেন এখন। এইটুকুন একটা মিষ্টি মেয়ে! তার সাথে এমন পাষবিক কান্ড ঘটাতে গিয়ে একটাবারও বুক কাঁপেনি মেইডেনের? অথচ তিনিও না-কি সন্তানহারা। তবুও একটা বাচ্চা মেয়ের কষ্ট বুঝলেন না তিনি। আশ্চর্য!
সময়ের কাটাঁ পেরুলো মিনিট পাঁচেক। মাহির হার্টবিট এখন বেশ নরমাল। তবুও ডাক্তারদের মুখাবয়ব থেকে চিন্তার লেশমাত্রও কমেনি। মেয়েটার শরীর থেকে ধীরে ধীরে ড্রাগস বেরুলেও ব্রেনে ঠিক মতো অক্সিজেন পৌঁছাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় মেয়েটার ব্রেইন ডেথ কিংবা কোমায় চলে যাওয়ার মতো সম্ভাবনা রয়েছে। আগত বিপদ সংকেত আচঁ করতে পেরে অস্থির সবাই। বারবার একে-অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছেন কেমন।
ধুপধাপ জোরালো শব্দে বসছে একেকটা পাঞ্চ। আজ দু-হাতে গ্লাভস নেই মনস্টারের। কিসব উদ্ভট ট্যাটু আকাঁ মুষ্ঠিযুগল ইতোমধ্যেই লালচে আকার ধারণ করেছে তার। ফর্সা মুখখানা কেমন লাল হয়ে গেছে! ব্লেডের ন্যায় তীক্ষ্ণ তার চোয়াল, কটমট করছে কেন যেন। মুগ্ধ একের পর এক শক্ত পাঞ্চ বসাচ্ছে পাঞ্চিং ব্যাগে। মাথাটা তার রীতিমতো ফেটে যাচ্ছে রাগে। হুট করেই তার ওতো রাগ কেন উঠল তার হদিস যেন তার কাছেই নেই! মস্তিষ্কে বারবার বাজছে একটা কথাই। কেনো ঐ বান্দীর মেয়েকে অন্য কেউ ছোঁবে? কেনো ছোঁবে? তারা জানে না, ঐ বান্দীর মেয়ে শুধু ওর! হোক সে শত্রু তবুও তো একমাত্র ওর। কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই মুগ্ধ হাতের জোর বাড়ালো। এবারের তীব্র জোরে হাতের চামড়াগুলো কেমন থেঁতলে যেতে লাগল। যুবকের বিন্দুমাত্র উদ্বেগ নেই সেথায়। সে কেমন কটমট করতে করতে পাঞ্চ বসাচ্ছে। এরইমধ্যে হঠাৎ তার কানে বেজে উঠল সিদ্ধার্থের বলা কথাগুলো,
“ তোর ভোগে তোর ভাগ বসানোর আগেই আমি ভাগ বসিয়েছে। আধিপত্য দেখিয়েছি ওর ভেতর।”
কথাটা মনে পরতেই থেমে গেল মুগ্ধের হাত। দাঁতের কটমট বাড়ল ক্রমশ। মাথায় এই বুঝি কেউ আগুন ধরিয়ে দিলো! মুহুর্ত যেতে না যেতেই ছেলেটা কেমন আঘাতপ্রাপ্ত হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠল। পুরো বক্সিং ক্লাবের প্রতিটি দেয়াল জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো সে-ই গর্জন। সে এবার আর বাঁধ মানলো না। হাতদুটোকে একদম থেঁতলে নিয়েও পাঞ্চ বসাচ্ছে পাঞ্চিং ব্যাগে। মাথার তালু জ্বলছে তার। মন কিছুতেই ভুল পারছেনা কথাটা। সে এবার হাতের বদলে পা উঁচায় কিক বসাতে। তবে কান্ড দেখো! অত্যন্ত রাগে পাঞ্চিং ব্যাগ বরাবর কিক বসাতে গেলেই হঠাৎ করে তার অক্ষিপটের সামনে ভেসে ওঠে মাহির ক্রন্দনরত নির্মল মুখখানা। প্রবল বেগে ছোটা পা’টা কেমন হুট করেই থেমে গেল মুগ্ধের। বেচারা একপায়ে ভর দিয়ে, আরেকপা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল হতবিহ্বলের ন্যায়। মাথাভর্তি রাগের আগুনে এক পশলা বৃষ্টি নামলো কোত্থেকে? মুহূর্তের মধ্যেই অবাধ রাগগুলো কেমন পালিয়ে গেল সাইড কেটে। কুঁচকে রাখা ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে শিথিলতার ছাপ পড়ল বেশ। তার অবচেতন মন উল্টো তাকেই প্রশ্ন ছুড়ঁল — এমুহূর্তে পাঞ্চিং ব্যাগটা ঐ বান্দীর মেয়েতে রুপান্তরিত হলো কিভাবে? আর এই বান্দীর মেয়ে এভাবে কাঁদছে কেনো?
মুগ্ধ নামক নির্দয় মানব ফের থমকেছে একমুহূর্তের জন্য। তার চোখের সামনে এখন পুরোপুরি মাহিকে দেখছে সে। মেয়েটা কাঁদছে! গাল ফুলিয়ে রেখেছে পটকা মাছের মত। ঠোঁটগুলো সে-কি লাল অবস্থা! যুবক আবারও নিজের খেই হারালো। সচল মস্তিষ্কে হুট করে ঝং ধরল! সে ধীরে ধীরে নিজের পা’টা নামিয়ে আনলো নিচে। হতবুদ্ধির ন্যায় একটু একটু করে এগোয় সামনের দিকে। নিজ অজান্তেই হাতখানা কিভাবে কিভাবে উঠে এলো ব্যাগের গায়ে। আলতো করে তাতে স্পর্শ করতেই হঠাৎ ঘোর ভাঙল যুবকের। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় নিজের হাতপানে। কি করছে সে? পাঞ্চিং ব্যাগের গায়ে হাত রাখল কেনো? মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ নিজের হাত সরালো। বুকটা কেমন যেন করছে তার। বড্ড অস্থিরতায় হাসফাস লাগছে! ছেলেটা তক্ষুনি শক্ত হাতে নিজের ঘাড়ে হাত বুলালো কিয়তক্ষন। চোখদুটো বুঁজে নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ হোয়াট দা ফা*ক আ’ম সিইং? হোয়ায় দা হেল ইজ শি কামিং ইন মাই ইমেজিনেশন? আই ডোন্ট ওয়ান্না সি দ্যাট বি*চ! আই জাস্ট হেট হার।”
মস্তিষ্ক এবং জেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে মনস্টার। সে কি আর জানে? সাইকোলজির ভাষায় তার এহেন অবস্থাকে বলে — সাইকোলজিক্যাল কনফ্লিক্ট এন্ড প্রি সাইন অফ ডার্ক অবসেশন ! মন যাকে বারবার ঘৃণা করি, ঘৃণা করি বলে আওড়ায়, মস্তিষ্ক ঠিক তার উল্টোটা করে। নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে ব্যাপকভাবে তৈরী করে ফেলে এক ভিন্ন অবসেশন। যা চোখে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। মাঝেমধ্যে উপলব্ধিও করা যায় না। তবুও তারা মাথা চড়া দিয়ে ওঠে বারংবার। যার শুরুটা ধরতে পারা খুব সহজ নয়! আপাতত নির্দয় মনস্টারের সাথেও তা-ই হচ্ছে। সে নিজেও জানেনা, সে কোন ফাঁদে আটকা পড়েছে। তার মন-মস্তিষ্ক একপ্রকার ঘুষ খেয়ে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতায় নেমেছে, অথচ সে খবর তার থোড়াই আছে! মুগ্ধ কেমন ঘাড় উঁচিয়ে হা করে নিশ্বাস ফেলছে। শরীরটা কেমন জ্বলে যাচ্ছে তার। মাথাটা ফেটে যাচ্ছে রাগে! হাতদুটোও কাঁপছে রীতিমতো। এমুহূর্তেই মাথা ঠান্ডা করতে হবে তার। নাহলে হয়তো আগুন জ্বলবে পুরো পেন্টহাউজে। শক্তপোক্ত পুরুষ তক্ষুনি জোরালো পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো বক্সিং রিংয়ের সামনে। অতঃপর একলাফে বেরিয়ে এলো রিং থেকে। তারপর আর কোনোদিক না তাকিয়ে গটগট পায়ে প্রস্থান ঘটালো বক্সিং ক্লাব থেকে।
হাত-পা কাঁপছে মুগ্ধের! চোখের সামনে সবটা ঝাপ্সা হচ্ছে ক্রমশ। যুবক তড়িঘড়ি করে ছুটলো নিজের নিষিদ্ধ কক্ষে। সম্পূর্ণ কাঁচের তৈরী বিশালাকার কক্ষটির চারিদিকের দেয়ালজুড়ে সাজিয়ে রাখা বিদেশি বিভিন্ন ভেরিয়েন্টের ড্রা*গস, নামীদামী এলকোহলের বোতল। মুগ্ধ টলমল পায়ে ঢুকল কক্ষে। ঝাপ্সা চোখে খানিকটা এগিয়ে এসে হাত রাখল কাঁচের দেয়ালে। অতঃপর একটানে কাঁচের দরজাটা ঠেলে দিয়ে, সে কেমন উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হাতড়ে হাতড়ে দু’টো সিরিঞ্জ ভর্তি করল তরল ড্রা*গস দিয়ে। অতঃপর আর এক সেকেন্ডও দেরি করেনি মনস্টার। দাঁত খিঁচে তক্ষুনি নিজের বা-হাতের মোটা শিরায় বসিয়ে দিলো সিরিঞ্জের তীক্ষ্ণ সুচঁ। ধীরে ধীরে শরীরে ঢুকছে নিষিদ্ধ কিছু, তবুও আজ স্বস্তি মিলছেনা যুবকের। মাথায় এখনো চলছে তার সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষটার কথা। তাকে আরেকজন ছুঁয়েছে এ ব্যাপারটাই যেন মানতে পারছেনা যুবক! তাকে বড্ড পোড়াচ্ছে কথাটা। তারওপর হুটহাট ঐ বান্দীর মেয়ের মুখ। কেনো দেখছে সে? কেনো বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে মেয়েটা? উত্তর পাচ্ছে না যুবক। হাতের দু’টো তরল ভর্তি সিরিঞ্জ একে একে শরীরে পুশ করেও ঠান্ডা হচ্ছেনা তার উপচে পড়া রাগ। বাদবাকি সময় এটুকুতেই শরীর শিথিল হয় তার তবে আজ? মস্তিষ্ক তার এখনো সচল। ভাবছে মেয়েটার কথা! চোখের সামনে ভেসে উঠছে মেয়েটার হাসি! হ্যাঁ হ্যাঁ ঐ তো দেখতে পাচ্ছে মুগ্ধ। মেয়েটা কেমন খিলখিল করে হাসছে। সিড তাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে দিচ্ছে, আর সে কতো খুশী! মুগ্ধের সহ্য হচ্ছেনা এহেন দৃশ্য। বরাবরের ন্যায় গুরুগম্ভীর থাকা রুশদী কিং — দ্যা শ্যাডো মনস্টার আজ বেপরোয়া হয়েছে। হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জন তুলে নিজের মাথা বরাবর নিজেই জোরালো থাপ্পড় বসাচ্ছে একে একে। পাগলের ন্যায় বলছে,
“ আসবি না আমার সামনে। ইউ স্লাট! আসবি না তুই আমার সামনে। মে’রে ফেলব তোকে আমি। আই সয়্যার আমি তোকে মে’রে ফেলব।”
উঁহুম! এতোকিছু বলেও মুগ্ধ শান্ত হতে পারলোনা। উম্মাদ ছেলে তক্ষুনি ছুটে গিয়ে ড্রয়ার থেকে দুটো সফেদ পাউডারের প্যাকেট নিয়ে এসে টেবিলের সামনে বসল। তড়িঘড়ি করে টেবিলের গায়ে একটু পাউডার ছিটিয়ে নাক দিয়ে টেনে নিলো সবটা! এটাও যে মারাত্মক নেশা জাতীয় দ্রব্য, তাতে বিলকুল সন্দেহ নেই। মনস্টারের নিশ্বাস টানার গতি বাড়লেও মস্তিষ্ক পাগল করে ফেলছে তাকে। মনের কোনো এক জায়গা থেকে বারবার কিছু একটা চিৎকার দিয়ে বলছে,
“ এখন চুপ করে আছিস কেনো তুই? যে ছেলে তোর শিকারে হাত দিয়েছে তাকে প্রাডা এবং সাইকির পেটে চালান করলি কিন্তু যে-ই মেয়ে তোর শিকার হওয়া স্বত্বেও অন্যজনের হয়েছে তাকে কিছু করবিনা? ওকে কেনো বাচিয়ে রেখেছিস এখনো? কেনো বাঁচিয়ে রাখলি ওর মতো নষ্ট মেয়েকে? না-কি তুই সত্যি সত্যি ওকে পছন্দ করা শুরু করলি?”
পছন্দের কথা কানে বাজতেই কটমটিয়ে ওঠে মুগ্ধ। স্বচ্ছ কাঁচের টেবিলের বারকয়েক শক্তপোক্ত পাঞ্চ বসিয়ে আওড়াল,
“ ইম্পসিবল! আই জাস্ট হেট দ্যাট বি*চ। আই হেট হার। ও মরবে…খুব শীঘ্রই মরবে আমার হাতে। এন্ড দিস ইজ মা’ই ওয়ার্ডস।”
“ এক্সকিউজ মি! কে আপনি? আর হুটহাট এভাবে বাড়ির ভেতর ঢুকে এলেন কেনো?”
বাড়ির দায়িত্বশীল কেয়ার টেকারের ঝাঁঝাল কন্ঠে থামল না এডউইন। গুরুগম্ভীর মুখে যুবকের পায়ের কদম এসে দাঁড়ালো অতিপরিচিত বাড়িটার লিভিং রুমের একদম মাঝখানে। তার পিছুপিছু দু’জন বডিগার্ড বেশ বড়সড় একটা কার্টুন ঠেলে ঠেলে আনছেন। কার্টুনটা কি সুন্দর গিফট পেপারে মোড়ানো! এডউইন খানিকক্ষণ গম্ভীর থেকে মুখ খুললেন। দু’হাত পকেটে গুঁজে রাখা তার, গায়ে ফ্রেঞ্চ কোট! মাথার চুলগুলো জেল দিয়ে স্পাইক করে রাখা। সে কেমন গমগমে গলায় বাড়ির কেয়ারটেকারকে বলে ওঠে,
“ কল নিকোলাস!”
বাড়ির কেয়ারটেকার বড্ড গুমরো মুখী। মনে মনে ভাবছে, হুটহাট চেনা নেই, জানা নেই, অপরিচিত মানুষ গুলো বাড়িতে ঢুকল কিভাবে? এদের ভেতরে আসতে অনুমতিই বা দিলো কে? কেয়ারটেকার খানিকক্ষণ নিজ ভাবনায় ডুবে থেকে পা বাড়ালেন সম্মুখে। সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন চারজন কালো পোশাকধারী গার্ডস। কেয়ারটেকার তাদের নিকট এগিয়ে এসে কন্ঠ উঁচিয়ে বললেন,
“ স্যারকে ডাকুন তো।”
একজন গার্ড তক্ষুনি পা ঘোরালেন সিঁড়ির দিকে। কয়েক লাফে সিঁড়ি ডিঙিয়ে চলে গেলেন দোতলায়। এদিকে এডউইন কেমন গম্ভীর মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সময় গড়াতে গড়াতে মিনিট পাঁচেক গেল বোধহয়। এরইমধ্যে দোতলার রেলিঙের দ্বার ঘেঁষে দাড়িয়ে কেউ একজন বলে উঠল,
“ আরে! এডউইন যে। দি মনস্তারস রাইট হ্যান্ড! আজ হঠাৎ আমার আস্তানায়?”
এডউইন মাথা উঁচায় সামান্য। দোতলায় দাঁড়িয়ে আছে নিক। গায়ে স্রেফ নাইট কোট। এডউইন ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ মনস্টার তোমার জন্য একটা গিফট পাঠিয়েছে নিক। কাম এন্ড ডিসক্লোজ দিস।”
ভ্রু গোটায় নিক। মনস্টার তারজন্য গিফট পাঠিয়েছে? সিরিয়াসলি? এতো ভালো কবে থেকে হলো সে? অথচ সে-তো এতদিন জানতো মনস্টার সাপ হলে সে হচ্ছে নেউলে। নিক বিচক্ষণতার সঙ্গে কিয়তক্ষন চুপ করে থেকে আচমকা আদেশ ছুড়ঁল গার্ডদের। কন্ঠ উঁচিয়ে বলল,
“ গো এন্ড চেক দ্যাট।”
দু’জন বডিগার্ড রয়েসয়ে এগিয়ে এলেন কার্টুনের দিকে। দু’জনার চোখেমুখে স্পষ্ট ভীতি। যদি এ কার্টুনে বোম জাতীয় কিছু থাকে তখন? মনের মধ্যে একরাশ ভয়ডর নিয়েই কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে,বেচারারা উদ্যত হলেন কার্টুনের বাঁধন খুলতে। ধীর হাতে কার্টুনের গা থেকে বাঁধন খুলে যেইনা মুখটা খুলবে ওমনি এক বিকট উটকো গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে গার্ডদের। বেচারা দু’টো তক্ষুনি ছিটকে পড়লেন মেঝেতে। তড়িঘড়ি করে নাকমুখ চেপে ধরে একযোগে আওড়ালেন,
“ ইয়াক!”
ওদিকে নিকও কেমন নাক মুখ চেপে ধরেছে তীব্র দুর্গন্ধে। কপালে গোটাকতক সন্দেহজনক ভাঁজ ফেলে তক্ষুনি ঝাঁঝাল কন্ঠে এডউইনকে জিজ্ঞেস করে ওঠে,
“ হোয়াট দা ফা*ক হি হেভ সেন্ট?”
এডউইন ক্রুর হাসলো বোধহয়। জিভটা খানিক ঠোঁটের ওপর নাড়িয়ে চাড়িয়ে বলল,
“ খুলেই দেখো নিক। আই হোপ ইউ উড লাইক ইট।”
সন্দেহ তীব্র হলো নিকের। যুবক তক্ষুনি গটগটিয়ে নেমে এলো সিঁড়ি বেয়ে। কার্টুনের দিকে যত এগুচ্ছে, ততই যেন দুর্গন্ধের তীব্রতা বেড়ে যাচ্ছে। নাকমুখ কোনমতে চেপে রেখে নিক এসে দাঁড়ালো কার্টুনের কাছে। একহাতে তৎক্ষনাৎ কার্টুনের মুখটা খুলে দিতেই দেখল — কালো রঙা কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা কিছু। নিক কেমন গমগমে গলায় গার্ডদের আদেশ ছুড়ঁল,
“ এটার ভেতর কী আছে বের কর।”
গার্ডদের আর কি’বা করার আছে? মনিবের আদেশ বলে কথা। শত গু গুলিয়ে উঠলেও খুলতে তো হবেই। গার্ড দু’জন কোনমতে নিজেদের নিশ্বাস আঁটকে রেখে হাত বাড়ায় কার্টুনের ভেতর। মোটা মোটা দুটো গোলাকার বস্তু! হাতে নিতেই আঠালো কিছু হাতে ঠেকল তাদের। তড়িঘড়ি করে বস্তু দুটো হাতে তুলে নিকের সামনে ধরতেই নিক মুখ ঘোরায় অন্যত্র। ইশারায় বোঝায় — কাপড় সরাতে। যে-ই কথা সে-ই কাজ। গার্ড দু’জন তক্ষুনি কাপড় সরালেন বস্তু দুটোর গা থেকে। আর ওমনি ভয়ে শীরঁদাড়া অব্দি কেঁপে উঠল সবার। গার্ড দু’জন আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারলেন না। বস্তু দুটো হাতে রেখেই মুখভরে বমি করে দিলেন বেচারা দুটো। সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা নিক নাক সিটকে ঘাড় ঘুরাতেই চোখের সামনে যা দেখল তাতে ছেলেটা কেমন হা হয়ে গেল! গার্ডদের হাতে দু’টো মাথা। একটা সিডের আরেকটা ইরার। কী বিধ্বস্ত তাদের মুখ! কপালে গভীর ক্ষত করে লিখে রাখা — আ সিম্পল গিফট ফ্রম রুশদী কিং টু নিকোলাস!
নিক ভড়কায়। ত্বরিত বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকায় এডউইনের পানে। এডউইন কেমন ক্রুর চোখে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে তার খেলছে এক চিলতে বাঁকা হাসির রেশ। সে কেমন শান্ত কন্ঠে আওড়ায়,
“ এখনো সময় আছে শুধরে যাও নিক। নয়তোবা কোনো একদিন দেখা যাবে তোমার মাথাটাও এভাবে অন্যের হাতে থাকবে।”
নিক শুনলো। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে তক্ষুনি চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“ গার্ডস! হোল্ড দিস মাদারফা*কার।”
হুকুম তামিল করলেন সবাই। এক ডাকে কোত্থেকে সব ছুটে এসে গান পয়েন্ট করল করল এডউইনের মাথা বরাবর। অথচ এডউইনের মুখাবয়বে নেই বিন্দুমাত্র বিচলিত ভাবসাব। যুবক কেমন শান্ত হেসে, নিজের চোখ থেকে নীল রঙা চশমাটা খুলে নিলো একহাতে। আঙুলের ভাঁজে চশমাটা গুছিয়ে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে শুধালো,
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৮
“ ওহো নিক! স্টপ দিস কাইন্ডা বুলশিট। তুমি নিজেও জানো, একদিকে আমার গায়ে সামন্যতম আচড় পড়লে, অন্যদিকে তোমার পুরো সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেবে মনস্টার! তাও আবার এক চুটকীতে। এতকিছু জেনেও এহেন বোকামি?”

পরের পর্ব গুলো তাড়াতাড়ি দেন