প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬০
সাইদা মুন
তালহা শুয়ে তবে অন্ধকারে তার কোমরের চারপাশে শক্ত হয়ে থাকা এই হাতের বাঁধনটা কার? ভয়ে যেন কাঁপতেও ভুলে গেল। এটা কার হাত? বুকের ভেতরটা ধকধক করে উঠছে বারবার, শ্বাস যেন গলায় আটকে আছে। এই গভীর রাতে, এমন সময়, তালহার ঘরে কে আসতে পারে? শুকনো ডুক গিলল। মনে সাহস সঞ্চয় করে কে এটা তা দেখার জন্য ধীরে পেছনে ফিরতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে কোমরে হঠাৎ এক টান অনুভব করল। কেউ যেন তাকে জোর করে পেছনে টেনে নিতে চাইছে।
এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না মেহরীন। ভূত প্রেতের ভয় বরাবরই বেশি। ভয়ের চোটে চিৎকার করতে উদ্যত হলো। কিন্তু তার আগেই দ্রুত এক হাত এসে চেপে ধরল তার মুখ। মুহূর্তেই ছটফট করতে শুরু করল সে। আতঙ্কে চোখ দুটো বিস্ফারিত, হাত ছাড়াতে মরিয়া হয়ে পড়ল সে। কিন্তু কোনো সুযোগ না দিয়ে সেই মানুষটি তাকে টেনে নিয়ে এলো দরজার কাছে।
দরজার সামনে এসেই ফিসফিসিয়ে ভেসে এল এক কণ্ঠ,
—আরে গাধির গাধি! এটা আমি, তাহিয়া। তিড়িংবিড়িং বন্ধ কর, নয়তো বাঁশ সবদিক দিয়ে খাবো।
পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনতেই মেহরীনের ছটফটানি কিছুটা থামল। এক মুহূর্তে যেন ভয়টা স্তিমিত হলো, কিন্তু শরীরের কাঁপুনি তখনও থামেনি। তাহিয়া একহাতে মেহরীনের মুখ চেপে রেখেই আস্তে করে দরজা খুলল, তারপর তাকে নিয়ে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এলো। বেরোনোর পর পরই আবার দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল।
দুজনে কোনোরকমে নিজেদের ঘরে ফিরতেই মেহরীন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। বুক উঠানামা করছে দ্রুত, জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে সে। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেছে মেয়েটার। তার এই অবস্থায় ভড়কে গেল তাহিয়া। দ্রুত দরজা লাগিয়ে এসে তার পাশে বসল। পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
—মেহরীন, ঠিক আছিস?
তবে কোনো উত্তর এলো না। বেশ কিছুক্ষণ ধরে এভাবেই বসে রইল। তাহিয়া বুঝতে পারল ভয় থেকেই ওর শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। নিজের কাজটায় ভীষণ রাগ লাগল। বোকামি মনে হলো তা। পেছন থেকে এভাবে ভয় দেখানো ঠিক হয়নি। অবশ্য সে ইচ্ছে করে তো ভয় দেখায়নি। চিন্তায় পড়ে নখ কামড়াতে লাগল সে। কি করবে কি করবে ভাবতে ভাবতে, একবার উঠে গিয়ে ইনহেলার এনে দিল মেহরীনকে। তারপর চুপটি করে বসে রইল মেহরীনের পাশেই।
মেহরীন ইনহেলার নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকল। কিছু সময়ে শ্বাস স্বাভাবিক হতে না হতেই সে উঠে তাহিয়ার পিঠে বসাল এক কিল। তারপর ঝাড়ি দিয়ে উঠল,
—বেয়াদব কোথাকার। এভাবে কেউ আসে? আর একটু হলেই তো ভয়ে আত্মা বের হয়ে যেত।
তাহিয়া মুখটা মিয়িয়ে বলল,
—বা*ল! আমি কি জানতাম আমার ভাই এমন রোগী বিয়ে করে এনেছে, যাকে ধরলেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়।
মেহরীন রাগী চোখে তাকাতেই তাহিয়া চুপ করে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দাঁত বের করে এক হাসি দিল। মেহরীন কপট রাগে প্রশ্ন ছুড়ল,
—তুই ওই ঘরে গিয়েছিলি কেন?
তাহিয়ার ঠোঁট উল্টে গেল, ইতস্তত করতে করতে বলল,
—মানে তুই এত দেরি করছিলি যে ভাবলাম ধরা পড়লি নাকি। তাই উঁকি দিতে গিয়েছিলাম। তারপর দেখি মোবাইল তোর হাতে, পেয়েছিস খুশিতে তোকে ধরতে দৌড়ে গেলাম।
—তাই বলে তোর ভাইয়ের রুমে এভাবে ছুটে যাবি? চুরি করতে গিয়েছিলাম আমি মাথায় কি ছিল? উনি যদি জেগে যেতেন?
—আরে এক্সাইটমেন্টে এসব মাথায় ছিল নাকি। যাই হোক, জাগেনি তো! এবার মোবাইলটা দে, ফাস্ট।
মেহরীন মোবাইলটা এগিয়ে দিতেই তাহিয়া খাটে উঠে দু’পা তুলে বসল। মেহরীনও পাশে এসে বসল। দুজনের মনোযোগ এখন পুরোপুরি মোবাইলের স্ক্রিনে। কিছুক্ষণ গুতোগুতি করে তাহিয়া অসহায় ভঙ্গিতে তাকাল,
—লক কী?
মেহরীন কপাল কুচকে বলল,
—আমি জানি নাকি?
—তোর জামাইর মোবাইল, আর তুই জানিস না?
—আমি কি উনার মোবাইল ইউজ করি নাকি?
মেহরীনের কথা শুনে তাহিয়া নাক সিটকে বলল,
—ছিঃ ছিঃ! কেমন বউ রে জামাইর দিকে খেয়ালই নেই।
এভাবে একেরপর এক খোঁচা মারা কথা সেই তখন থেকে বলেই যাচ্ছে তাহিয়া। এবার আর চুপ থাকল না মেহরীন। সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়ার কান মুচড়ে ধরল,
—এই শা*লি! সেই কখন থেকে কুটনি ননদের মতো খালি খোঁচাচ্ছিস, তোর সমস্যা কী?
তাহিয়া ফিক করে হেসে ফেলল। কান ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
—তোর ননদ লাগি তো! একটু ফিল নিচ্ছি।
মেহরীন কান ছেড়ে দিল। কিছু একটা ভেবে গলা ঝেড়ে বলল,
—তাহলে আমিও ভাবি হয়ে দেখাব নাকি?
কথার ইঙ্গিত কোনদিকে যাচ্ছে তা বুঝতে সময় লাগল না তাহিয়ার। তড়িঘড়ি বলে উঠল,
—মেহুর বাচ্চা, একদম না।
—কী না? ভাবি হিসেবে তোর ভাইকে বলতে হবে তো এই বয়সে তার বোন প্রেমে পড়েছে, আবার ভাইয়ের মোবাইল দিয়েই প্রেমিককে কল দিচ্ছে।
তাহিয়া তাড়াতাড়ি তার মুখ চেপে ধরল,
—একদম ফালতু কথা বলবি না। আমি কোনো প্রেম-ট্রেম করছি না। এখন চুপচাপ লক খুলতে হেল্প কর।
দুজনের খুনসুটির মধ্যেই বেশ কয়েকবার চেষ্টা করল লক খুলতে, তবে ব্যর্থ হল। মেহরীনের নাম দিয়েও চেষ্টা করল, তাতেও কিছুই কাজ হলো না।
হতাশ হয়ে মেহরীন বলল,
—এখন কী করবি?
—কি করব আবার? চেষ্টা করতে হবে।
—বাদ দে না, পারবি না। কালকে উইশ করিস।
কিন্তু তাহিয়া তো আজই উইশ করবে এই জেদ পুষে রেখেছে মনে। জেদি কন্ঠে বলল,
—না, আজই করব।
কিছুক্ষণ তর্কবিতর্কের পর হঠাৎ তাহিয়া জিজ্ঞেস করল,
—আইডিয়া, এই তোদের স্পেশাল ডে গুলোর তারিখ মাস বল ফাস্ট।
মেহরীন কপাল কুঁচকাল,
—কিসের স্পেশাল ডে?
—আরে, কোনো স্মরণীয় দিন নেই? যেই দিনটা তোদের লাইফে অনেক স্পেশাল। সেলিব্রেট করবি ফিউচারে এমন দিন।
মেহরীন একটু ভেবে ধীর স্বরে বলল,
—উমম তেমন কোনো দিন তো নেই৷ তবে আমাদের বিয়ের দিনটা আমার জন্য খুব স্পেশাল। ওইদিনই তো প্রথম উনাকে পেয়েছিলাম…
কথা শেষ হওয়ার আগেই তাহিয়া চেঁচিয়ে উঠল,
—পেয়েছি!
চমকে উঠে মেহরীন। নিজের কথা থামিয়ে প্রশ্ন করল,
—কি পেয়েছিস?
—পাসওয়ার্ড পেয়েছি।
—পাসওয়ার্ড কি?
—আগে তোদের বিয়ের ডেটটা বল, ফাস্ট।
—২৫ জুন ২০২৫”
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যাগুলো বসাল মোবাইলে। মুহূর্তেই মোবাইল আনলক হয়ে গেল। তা দেখতেই খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল তাহিয়া। আর মেহরীন? সে তো থমকে গেল। ঠোঁটে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক অমায়িক হাসি। বুকের ভেতর দিয়ে অদ্ভুত এক উষ্ণ শিহরণ বয়ে গেল।
তালহার পাসওয়ার্ড, তাদের বিয়ের ডেট। এমনটা তো সে কখনো ভাবেনি। তবে কি তালহার জীবনের প্রতিটা জায়গায় সে জায়গা করে নিচ্ছে। আচমকাই কানের পাশে যেন বাতাস ফিসফিস করে উঠল, “মেহরীন, তুই তো তার সবটুকু জুড়েই ছড়িয়ে যাচ্ছিস রে। পুরো তালহাটাতেই কি রাজত্ব করার পরিকল্পনা করেছিস?” এদিকে তাহিয়াও বলছে নানান কথা। একদিকে তাহিয়া অন্যদিকে নিজের ভাবনা সবকিছু মিলিয়ে যেন সরমেরা এসে ভর করল তার উপর। লজ্জাটা আরও বেড়ে গেল।
বসা থেকে উঠে দৌড়ে গেল ওয়াশরুমে। ভেতরে ঢুকে দরজা আটকে দিয়ে সোজা আয়নার সামনে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাতেই দেখতে পেল, গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে দু’গালে হাত রেখে নিজেকেই ধমকাল,
—এই বেয়াদব, এত তাড়াতাড়ি লজ্জায় লাল হলি কেন? তুই লজ্জা পাচ্ছিস তা মানুষকে দেখাতে ভালো লাগে বুঝি?
কিন্তু পরক্ষণেই নিজের কথায় নিজেই ফিক করে হেসে ফেলল। এ কেমন বোকামি করছে সে। গালকে কেউ বুঝি বকে? গাল কি শুনে কথা? হেসে ফেলল সে। প্রেমে পড়লে মানুষ কি এমনই হয়ে যায়? নিজের সঙ্গেই কথা বলে? নিজের কথাতে নিজেই বুঝি লজ্জা পায়? এভাবেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে একান্ত আলাপে মগ্ন হয়ে রইল মেহরীন।
চারবার রিং হওয়ার পর, অবশেষে হাল ছেড়ে দিল তাহিয়া। ফারিস কল ধরছে না। তবে কি সে ঘুমিয়ে পড়েছে? অবশ্য এত রাতে জেগে থাকারই বা কারণ কী! ক্লান্ত মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বালিশে মাথা রাখল তাহিয়া। মোবাইলটা বুকের ওপর রেখেই মন খারাপ করে শুয়ে রইল। তবে কি আজ আর ফারিসকে উইশ করা হবে না? তাহলে এতক্ষণ জেগে থাকার মানেটা কী হলো? হুদাই তবে জেগে রইল সে? এইসব ভাবতে ভাবতেই ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই হঠাৎ মোবাইলটা কেঁপে উঠল। চমকে লাফিয়ে উঠল তাহিয়া। বসে দ্রুত স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল, ফারিস কল করেছে।
মুহূর্তেই বুকের ভেতরের ধকধক শব্দটা বেড়ে গেল। এক হাতে বুক চেপে ধরল। কেমন একটা অস্বস্তি কাজ করছে এখন, ধরবে কি ধরবে না? এই দ্বিধায় পরেছে। তবে নিজেকে সামলে একটা গভীর শ্বাস নিল সে। তারপর কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল ফারিসের ব্যস্ত কণ্ঠ,
—তালহা, কল করেছিলি? আমি গাড়িতে ছিলাম, দেখিনি। মাত্রই বাসায় ঢুকলাম। এত রাতে কল এনি প্রবলেম?
কথাগুলো শুনতেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তাহিয়া। সে এতক্ষণ ভেবেছে ছেলেটা নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে। আর এদিকে সে নাকি এখনই বাসায় ফিরল। ঘড়ির দিকে তাকাল সে। রাগ হলো অনেক। তারপর রাগ মিশ্রিত গলায় প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
—রাত করে কোথায় ছিলেন?
এদিকে নিজের ঘরে ঢুকে সদ্য বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল ফারিস। কানে ফোন, কিন্তু তালহার বদলে তাহিয়ার কণ্ঠ শুনেই সে চমকে উঠে বসল। দ্রুত মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে নম্বর মিলিয়ে নিল। হ্যাঁ, এটা তো তালহার নম্বরই। কিন্তু তাহিয়ার গলা? কিছুটা বিস্ময় নিয়ে সে প্রশ্ন করল,
—তাহিয়া তুমি?
তাহিয়া এবারও গম্ভীর গলায় বলল,
—জ্বি। এবার বলুন, এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলেন?
—ফ্রেন্ডদের সাথে ছিলাম।
—ছেলে না মেয়ে ফ্রেন্ড?
তাহিয়ার পরপর প্রশ্নগুলো কেমন যেন অদ্ভুত লাগল ফারিসের কাছে। একদিকে এত রাতে তার কাছ থেকে কল অপ্রত্যাশিত। অন্যদিকে এই প্রশ্ন করার ভঙ্গি, যেন অজান্তেই একটু অধিকার খাটাচ্ছে মেয়েটা। সে চুপ করে থাকতেই তাহিয়া গলা উঁচিয়ে ডাকল,
—কি হলো? বলুন।
ফারিস এবার ভাবনা সরিয়ে উত্তর দিল,
—ছেলে।
শুনেই যেন হালকা হলো তাহিয়া। অজান্তেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। তারপর আবার প্রশ্ন,
—ওহ, তা এত রাত পর্যন্ত বাহিরে কী করছিলেন?
—ওরা ডেকেছিল, তাই গিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি বলো, তুমি এত রাতে তালহার মোবাইল নিয়ে কী করছ?
প্রশ্নটা শুনে থমকে গেল তাহিয়া। নিজের কাজ মনে পড়ল। আস্তে করে বলল,
—দরকারে।
—কী দরকার?
কিছুটা সময় নিয়ে, কণ্ঠটা আরও নিচু করে বলল,
—আপনাকে কল দিতে..
কথাটা শুনে ফারিসের কপালে ভাঁজ পড়ল। তাহিয়া তালহার মোবাইল নিয়ে তাকে কল দিচ্ছে? বিষয়টা অদ্ভুত হলেও, অজান্তেই একধরনের ভালো লাগা ছুঁয়ে গেল তাকে। মুঁচকি হেসে বলল,
—ওহ আচ্ছা।
তাহিয়া ইতস্তত করতে করতে জিজ্ঞেস করল,
—আপনি কি এখন ঘুমাবেন?
—না, আগে ফ্রেশ হবো। তারপর ঘুমাবো।
—ওহ, তাহলে ফ্রেশ হন।
বলেই থেমে গেল তাহিয়া। আরও কিছু বলতে চেয়েও বলল না। কথাটা কিভাবে বলবে তা যেন বুঝে উঠতে পারছে না। আসলে যে সে ফারিসকে ছাদে ডাকতে কল দিয়েছে তা কি ডিরেক্ট বলে দিবে? কিন্তু এত রাতে ছাদে ডাকলে, সে কী ভাববে? নানান দ্বিধাতেই আটকে যাচ্ছে তার কথা। তাকে চুপ দেখে ওপাশ থেজে ফারিস জিজ্ঞেস করল,
—ব্যস? এজন্যই কল করেছিলে?
তাহিয়া এবার সাহস সঞ্চয় করে বলল,
—আসলে না..
—তাহলে?
—আসলে, কিছু বলার ছিল।
—হুম, বলো।
—না মানে কিছু মনে না করলে, একবার ছাদে আসবেন?
প্রশ্নটা শুনতেউ ফারিস চোখ ছোট করে কয়েকবার পলক ফেলল। এই মেয়ে তাকে এত রাতে ছাদে ডাকছে? এই ভীতুর ডিম? মৃদু কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—ছাদে? কেন?
তাহিয়া মিনমিনিয়ে বলল,
—দরকার আছে একটু আসবেন?
ফারিস ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে নিল। তারপর মৃদু দুষ্টুমিভরা স্বরে বলল,
—যদি না আসি?
মুহূর্তেই তাহিয়ার মুখটা যেন মলিন হয়ে গেল।
কণ্ঠে অসহায়তা মিশে গেল। এভাবে তার সব প্ল্যান শেষ? না না। রিকোয়েস্ট করে হলেও আনাবেই। যেই ভাবা সেই কাজ।
—প্লিজ একবার আসবেন।
ফারিসের ঠোঁটে এবার দুষ্টু হাসি ফুটল। মেয়েটাকে এবার হাতেনাতে পেয়েছে। এ সুযোগ ছাড়া যায় নাকি? ভেবে বলল,
—উমম ছাদে গেলে আমি কী পাবো?
তবে প্রশ্নটা তাহিয়া না ভেবেই বলে ফেলল,
—যা চাইবেন তাই।
—সত্যি?
—হুম..
—পাক্কা?
—হুমম।
—ওকে। তাহলে ফ্রেশ হয়ে আসছি। দশ মিনিট পর ছাদে আসো।
তাহিয়া “আচ্ছা” বলেই কল কেটে দিল। মুহূর্তেই তার মুখে খুশির আলো ফুটে উঠল। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল একরাশ উত্তেজনা নিয়ে। এদিকে মেহরীনও ততক্ষণে রুমে ফিরে এসেছে। তাহিয়ার হাবভাব দেখেই বুঝে গেছে, কথা হয়ে গেছে। তাই আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
তাহিয়া পড়ার টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট গিফট বক্সটা হাতে তুলে নিল। একবার দেখে নিল সব ঠিকঠাক আছে কিনা। তারপর আবার যত্ন করে জায়গামতো রেখে দিল। এরপর ছুটে গেল ড্রেসিং টেবিলের সামনে। নিজের পড়নের আকাশী রঙের জামাটা টেনে ঠিকঠাক করল, মাথার ওড়নাটা গুছিয়ে নিল।
মেয়েটার এত উত্তেজনা দেখে মেহরীন মুঁচকি হাসছে। মনে পড়ছে নিজেদের কথা, সেও তো তালহার সঙ্গে দেখা করতে যেতে কতই না এক্সাইটেড থাকত। বিছানায় শুয়েই বলল,
—একটু সেজেগুজে যা।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল,
—সাজব?
মেহরীন মাথা নেড়ে বলল,
—হুম।
তাহিয়া একটু ভেবে বলল,
—যদি বুঝে যায়?
মেহরীন হালকা হাসল,
—তোর কি মনে হয় ফারিস ভাইয়া বোকা? তুই এমনিতেই ধরা পড়ে যাবি। তুই যে তারই জন্য রাত জেগে ছিলি তা কি ধরতে পারবে না?
তাহিয়া কিছুক্ষণ ভেবে মন খারাপ করে ফেলল। এভাবে ধরা পরল? তাকে কি ছ্যাছড়া বলবে ফারিস? নানান কথা মাথায় নিয়ে মুখে হালকা ক্রিম মাখল, একটু পাউডার দিল, ঠোঁটে লিপবাম ছুঁইয়ে নিল। এতেই যেন সাজ হয়ে গেল। উঠতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে মেহরীন তাকে আটকালো,
—দাঁড়া! এটা কোনো সাজ হলো?
বলেই নিজেই এগিয়ে এল। তারপর খুব যত্ন করে ঠোঁটে হালকা ন্যুড কালার লিপস্টিক লাগিয়ে দিল, চোখের উপর চিকন করে আইলাইনার টানল। তারপর গালে ব্লাশার ছুঁইয়ে দিল, যার ফলে দুগালে গোলাপি আভা ফুটে উঠল। এবার থুতনি ধরে মুখটা দেখতে লাগল, সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। তালহার চেয়ে উজ্জল তাহিয়ার গায়ের রং। শুনেছে তাহিয়া নাকি তার বাবার গায়ের ফর্সাটা পেয়েছে। আর তালহা তার মায়ের মতো উজ্জ্বল শ্যামলা।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সন্তুষ্ট হয়ে বলল,
—এই তো! এবার ঠিক আছে। মাশাআল্লাহ। দেখিস, ফারিস ভাই পাগল হয়ে যাবে।
তাহিয়া লজ্জা পেয়ে আয়নায় নিজেকে দেখল। মন্দ লাগছে না বরং ভালোই লাগছে। তবুও একটু চিন্তিত গলায় বলল,
—এভাবে যাব? সেজেগুজে?
মেহরীন কিছু না বলে তার খোপা করা চুল এক টানে খুলে দিল। মুহূর্তেই চুলগুলো পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
সাথে সাথে অবাক হয়ে তাকাল তাহিয়া,
—আরে! করছিসটা কী?
মেহরীন ধমক দিয়ে উঠল,
—তুই চুপ করে থাক।
তারপর ওড়নাটা একপাশে গুছিয়ে পিন মেরে দিল, অন্যপাশে কিছু চুল এনে রাখল। এরমাঝেই ফারিসের কল। তা দেখে দ্রুত ঘড়ির দিকে তাকাল, দশ মিনিট হয়ে গেছে। আর দেরি করল না তাহিয়া। টেবিল থেকে গিফট বক্সটা তুলে নিল, তালহার মোবাইলটা মেহরীনের হাতে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল ছাদের উদ্দেশ্যে।
তাড়াহুড়ো করে ছাদের দরজার কাছে এসে থামল। এবার শব্দ না করে আস্তে করে খুলল দরজাটা। ধীরে পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ থমকে গেল সে। রাত প্রায় তিনটা। চারপাশে ঘন অন্ধকার। ছাদ এতটা অন্ধকার থাকবে, তা তো সে একবারও ভাবেনি। কোনো আলো নেই, এমনকি চাঁদের আলোটুকুও মেঘের আড়ালে লুকিয়ে গেছে। ভয় লাগতে লাগল বেচারির। এভাবে সামনে এগোবে কীভাবে? ভয়ে ঢুক গিলে, নিজেকে ধাতস্থ করল যে ফারিস তো আছেই সে একা না। সেই সাহস নিয়েই আস্তে আস্তে হাতড়ে হাতড়ে কয়েক পা এগোল। কয়েকপা গিয়েই থামল, তার ভাস্যমতে ছাদের মাঝামাঝি এসে দাঁড়িয়েছে। ঝিঝি পোকার আওয়াজ আর এই নিরিবিলি সুনসান নীরবতায় ভয়ে তার আর এগোতেই ইচ্ছে করছে না। কেন এত রাতে আসতে গেল পাকনামি করে। নিজের কাজে নিজেকেই বকতে লাগল সে,
—কি দরকার ছিল এখন আসার।
বিরবির করতে করতে আরেকটু এগিয়ে থামল। চোখ কুঁচকে অন্ধকারে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল, সামনের ছাদে ফারিস এসেছে কি না। কিন্তু কিছুই দেখা গেল না। দেখতে না পেরে সে ডেকে উঠল,
—এই ফারিস ভাই আপনি কি এসেছেন?
কোনো সাড়া নেই। আবার ডাকল সে, তবুও নিস্তব্ধতা। এবার ভয়টা স্পষ্ট হয়ে উঠল। এই অন্ধকার ছাদে সে একা। মুহুর্তে শ্বাসটা ভারী হয়ে এলো তাহিয়ার। ওড়নার এক কোণা মুঠো করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। নড়চড় করতেও ভয় লাগছে যেন। মনে মনে দোয়া পড়ছে সে, শুধু অপেক্ষা করছে কখন ফারিস আসে।
এভাবেই মিনিট খানেক যেতেই ঠিক হঠাৎ ছাদের উপর “দুম” করে কিছু পড়ার শব্দ হলো। চমকে উঠল সে। যেদিক থেকে শব্দটা এলো, অন্ধকারে সেদিকে তাকিয়ে তোতলাতে লাগল,
—ক.. কে? কে ওখানে?
তবে কোনো উত্তর নেই। ভয় আরও দ্বীগুন হারে বেড়ে গেল। মনে হচ্ছে আশেপাশে কেউ আছে। তবে কি তানারা? এত রাতে ওদেরই তো আড্ডা থাকে। আর কিছু ভাবতে পারল না সে। মাথা যেন ভয়ে হ্যাং মেরেছে। কি করবে না করবে ভেবে না পেয়ে ধীরে ধীরে পেছাতে লাগল সে।
এউ বুঝি চোখে পানি চলেই এলো প্রায়। আরেকটু ভয়ে হয়তো কেঁদেই দিবে। বার্থডে উইশ করতে এসে এমন নাজেহাল অবস্থা হবে আগে জানলে তো রাতে উইশ করার চিন্তাই মাথায় আনতো না। আফসোস করছে বেচারি কেন, মেহরীনের কথা শুনল না এই নিয়ে। কাল উইশ করলে কি এমন ক্ষতি হতো?
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৯
এইসব ভাবতে ভাবতেই কয়েক কদম পেছাতেই আচমকা কারও সঙ্গে ধাক্কা খেল। মুহূর্তেই চোখ বড় হয়ে গেল তাহিয়ার। গলা শুকিয়ে এলো। শরীর জমে গেল, নড়ার শক্তিটুকুও যেন উড়ে গেছে। এরই মাঝে কানের কাছে উষ্ণ নিশ্বাসের স্পর্শ পেল। এরপরই এক চিকন, কাঁপন ধরানো হাসির শব্দ হলো কানের কাছে। ঠিক যেন ঠাকুমার ঝুলির সেউ পেত্নির হাসি। সঙ্গে সঙ্গে কানে ভেসে এলো চিকন ফিসফিসানো এক কন্ঠ,
—হিহিহি বল তো আগে তোর ঘাড় মটকাব, নাকি চুল টেনে গাছে ঝুলাবো?
