প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৯
সাইদা মুন
দোতলায় ওঠার শেষ সিঁড়িটায় এক পা রেখে থমকে দাঁড়িয়ে আছে তাহসান। হাতের পানির বোতলের ঢাকনাটা এখনও অর্ধেক খোলা, আঙুলগুলো সেখানে স্থির হয়ে আছে, সময়টাও যেন হঠাৎ থেমে গেছে। হয়তো উঠতে উঠতেই ঢাকনাটা লাগাচ্ছিল, কিন্তু মাঝপথেই তার সমস্ত মনোযোগ আটকে গেছে সামনে ঘটে যাওয়া এক দৃশ্যে।
দৃষ্টি তার স্থির, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেই মুহূর্তের দিকে। একটা রোমাঞ্চকর দৃশ্য। যদিও সেই রোমাঞ্চ কেবলমাত্র সামনে থাকা দু’জন মানুষের জন্য, তাহসানের জন্য সেটা নিছকই তীব্র বেদনাদায়ক একটা মুহুর্ত। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে আছে সে। দাঁতে দাঁত চেপে যেন নিজেকেই ধরে রেখেছে। তালহা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তেই তাহসান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের আটকে রাখা নিশ্বাস যেন ছাড়ল। একটা ফাঁপা, শূন্য হাসি ফুটে উঠল মুখে।
—হাহ.. তাহসান! এই দীর্ঘশ্বাস ছাড়া তোর আর কিছু নেই, কিছুই নেই..
নিজের সঙ্গে নিজেই কথা বলছে সে। বিড়বিড় করতে করতে হাঁটা ধরল সামনে। পা দুটো বড্ড ভারি লাগছে যেন এগোতেই চাচ্ছে না। তালহার ঘর পেরিয়ে মেহরীনের দরজার সামনে এসে থেমে গেল। এ জায়গা থেকে আর পা এগোচ্ছে না। শরীর মন সবই যেন চাচ্ছে এখানে থাকতে। বন্ধ দরজার দিকে একবার তাকাল।
চোখে ভাসল অসম্ভব একটা দৃশ্য, যা বাস্তবে হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য পার্সেন্ট ও নেই। তবু সে তা কল্পনা করছে, যেন ঠিক এই মুহূর্তে দরজাটা খুলে যাবে, আর মেহরীন দাঁড়িয়ে থাকবে সেখানে। তাহসানকে দেখে মুঁচকি হেসে ছুটে আসবে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলবে, “আমি আছি তো তোমার সাথে”। ভাবনাতেই ঠোঁটে মৃদু তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল, নিজের অহেতুক কল্পনাতে যেন নিজেই মজা লুটলো। মুখের হাসি আরও গাঢ় হলো, সেই হাসিতে মিশে আছে হাজারো না-বলা অভিমান, চাপা কষ্ট, না হওয়া নানান স্বপ্ন। মেহরীনকে কিছু বলতে ইচ্ছে করল তার। খুব বলতে ইচ্ছে করল কয়েকটি কথা। কিন্তু আবার নিজের ইচ্ছেতে নিজেকেই বড় বেহায়া মনে হলো। অন্যের বউকে নিজের মনের কথা বলবে বুঝি? তাও ভাইয়ের বউকে? নিজেকে নির্লজ্জ উপাধিতে ভূষিত করল সে।
নিজেকেই নিজে নানান লজ্জা দিয়েও শান্ত হতে পারল না। অকথিত কথাগুলো বুকের ভেতর থাকলে যে আরও বেশি কষ্ট দেবে! শেষ মেশ খুব নিচু স্বরে, ফিসফিস করে বলে উঠল,
—একটু ভালোবাসলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত? বড্ড স্বার্থপর তুমি মেহরীন। তালহাকে সুখ দিলে, আর আমায় দিলে দুঃখ?
কথাগুলো বলেই একটু থামল সে। নিজের কথাতেই যেন নিজেই হেসে ফেলল, সে কি অসহায়, পরাজিত এক হাসি।
আবার বলে উঠল,
—তোমার দেওয়া এই দুঃখটাও অদ্ভুতভাবে মিষ্টি লাগছে। পুড়তে ভালোই লাগছে। যাই হোক, তুমি সুখের রাজ্যের রানী হয়ে থেকো। আমার সব সুখ তোমার হোক, আমি নাহয় এই দুঃখই সই।
নিস্তব্ধ করিডোরে তার কণ্ঠ মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে। তাহসান চলল ভারি মন নিয়ে নিজের ঘরের দিকে।
—রাত কয়টা বাজে, সে খেয়াল আছে?
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল ফাইজার বিরক্ত মুখ।
ওপাশে শুয়ে থাকা আরিয়ান মুচকি হেসে বলল,
—তুমি সামনে থাকলে কোনো কিছুরই খেয়াল থাকে না, সময় আবার কী?
—নাটক অফ হবে কখন?
—নাটক লাগছে বুঝি?
—তা নয়তো কী!
ফাইজা তীক্ষ্ণ সুরে কথাটা বলতেই আরিয়ান বিছানা থেকে উঠে বসল। তার মুখের মজার ভঙ্গি মুহূর্তেই বদলে গম্ভীর হয়ে উঠল। কপাল কুঁচকে কঠিন স্বরে বলল,
—আমি কিন্তু সিরিয়াস।
ফাইজা বিরক্ত গলায় উত্তর দিল,
—ওটা তো এক বছর ধরেই শুনে আসছি।
কথাটা যেন সরাসরি আঘাত করল আরিয়ানের ইগোতে। ফাইজা কি তাকে উপহাস করে বলল? গলার স্বর উঁচু হয়ে গেল ধমক দিয়ে বসল,
—ফাইজা..!
সঙ্গে সঙ্গে ফাইজা ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল,
—আমি ঘুমাবো। এই ফালতু বকবক শোনার আর কোনো ইচ্ছে নেই।
কথা শেষ করেই তাকে কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে মুখের উপর ধাম করে কল কেঁটে দিল। কল কাঁটা মাত্রই আবার স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরেকটা কল। সঙ্গে সঙ্গে সেটাও কেঁটে দিল। ফাইজা একের পর এক কল কেটে দিতে লাগল, রাগে, বিরক্তিতে। ওদিকে আরিয়ান থামার পাত্র নয়, অবিরাম কল দিয়েই চলেছে।
শেষমেশ ক্লান্ত হয়ে যখন আর কল এল না, তখন ফাইজা এক গভীর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিল, চোখ বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই টুন করে ম্যাসেঞ্জারের শব্দ। আবার বিরক্তি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল আরিয়ানের মেসেজ,
“রেডি থেকো, কাল আসছি।”
মেসেজটা পড়তেই ফাইজার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দিল,
—মজা পেলাম।
তারপর আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিল। আজ আর অনলাইনে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন বোধ করল না সে। রাতটা এবার নিঃশব্দেই কাটুক, হয়তো একটু শান্তিতে।
দরজার সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে, চোখ বন্ধ করে মেঝেতে বসে হাঁপাচ্ছে মেহরীন। বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে, ভেতরে এখনো ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে, কোমড়ে হাত রেখে, একদৃষ্টে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে তাহিয়া। মেয়েটার এই অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি দেখে সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, এ কি হাসছে, ভয় পেয়েছে, নাকি লজ্জায় গলে যাচ্ছে। কিছুই যেন ঠাহর করতে পারছে না সে। নিজের কৌতূহল আর ধরে রাখতে না পেরে, দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর অবশেষে তাহিয়া প্রশ্ন করল,
—কেউ কি তোকে ধাওয়া করেছে মেহু?
অনেক্ষনের নিস্তব্ধতার ভেতর নিজের অদ্ভুত কাজকর্ম নিয়ে ভাবছিল মেহরীন। হঠাৎ কারো কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল সে। তড়িঘড়ি করে মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে সামনে তাকাতেই ড্রিমলাইটের আবছা আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা তাহিয়াকে ঠিকমতো চিনতে পারল না। অন্ধকারে তাকে যেন এক কালো ছায়ামূর্তি মনে হলো।
কয়েকসেকেন্ড তাকানোর পরের মুহূর্তেই,
—আয়ায়ায়ায়া.. ভূউউউউত!!
মেহরীনের এই আকস্মিক চিৎকারে তাহিয়ার সমস্ত কৌতূহল মুহূর্তেই উড়ে গেল। সে নিজেও ভয়ে কেঁপে উঠল। তার পেছনে ভূত ভেবে, এক লাফে মেহরীনের পাশে বসে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, আর নিজেও চেঁচিয়ে উঠল,
—ভূউউউউউত!!
যাকে ভূত ভেবে চিৎকার করেছিল, সেই-ই আবার তাকে জড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠতে দেখে মেহরীন হতভম্ব হয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল। একটু ভালো করে দেখতেই চিনতে পারল, এ তো তাহিয়া। অন্ধকারে তাকেই তবে ভূত ভেবেছিল সে।
নিজের এই বোকামি বুঝে মাথায় একটা গাট্টি মারতে ইচ্ছে হলো তার। এদিকে মেহরীনকে হঠাৎ চুপ হয়ে যেতে দেখে তাহিয়া ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কিরে ভূত কই?
মেহরীন নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
—জানালা দিয়ে পালিয়েছে।
তাহিয়া তার সঙ্গে সঙ্গে ওড়না আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়িয়ে সত্যি সত্যিই জানালার দিকে তাকাতে লাগল,
—কই? জানালা তো বন্ধ! পালালো কেমনে?
মেহরীন ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে, আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
—ভূত কি আর মানুষ, যে জানালা খুলে পালাবে?
তাহিয়া একটু ভেবে, গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল,
—আসলেই তো, ভূতের তো জানালা খোলার দরকারই পড়ে না। তারা জানালার ভেতর দিয়েই যেতে পারে।
তার এই সরল যুক্তিতে হাসি আসল মেহরীন। মেয়েটাকে বোকা বানানো সেকেন্ডের কাজ। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে এবার মেহরীন তাকাল তার দিকে, কড়া, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে।
সেই দৃষ্টি যেন সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে। হঠাৎ এহেন তাকানো দেখে তাহিয়া ভড়কে গেল। ছোট করে ঢুক গিলল, এদিক সেদিক তাকাতে লাগল সে। যেন চোর ধরা পড়ে গেছে। তবু মেহরীনের চোখের কবল থেকে বের হতে না পেরে অস্বস্তিতে তোতলানো গলায় বলল,
—আ…আজব! এভাবে তাকাচ্ছিস কেন?
এবার ধীর, স্থির কণ্ঠে মেহরীন বলল,
—ঘটনা কী? বল।
তাহিয়া থতমত খেয়ে না বুঝার ভাণ করে বলল,
—ক..কিসের ঘটনা?
—এখনো ঘুমাসনি। অথচ আমি যাওয়ার আগে তোকে দেখে গেলাম, ঘুমিয়ে একদম কাহিল। এখন আবার জেগে আছিস, কাহিনি কী?
—না মানে ঘুমিয়েছিলাম.. এখনই উঠলাম।
মেহরীন ভ্রু তুলে তাকাল,
—আমাকে বোকা পেয়েছিস? ঘুম থেকে উঠেছিস, অথচ মুখে ঘুমের লেশমাত্র নেই!
এবার তাহিয়া কি অযুহাত দিবে আর ভেবে পেল না। যেন পুরোপুরি ধরা পড়ে গেল। এমনিতেও মেহরীনের সামনে মিথ্যা বলতেই পারে না মেয়েটা। এই কথাগুলোও কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে তার। মেহরীন আরও চাপ দিতেই শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
—আরে ভাই আজ উনার বার্থডে।
মেহরীন চোখ ছোট ছোট করে প্রশ্ন করল,
—উনি আবার কে?
—আরে উনি মানে উনি!
—হ্যাঁ, সেই উনিটাই তো কে?
মেহরীনের ইচ্ছাকৃত খোঁচাখোঁচি বুঝে রেগে গেল তাহিয়া। ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। তার সেই অভিমানী চেহারা দেখে ফিক করে হেসে ফেলল মেহরীন। আলতো করে তার গাল টেনে নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল,
—ওলেলেলে লাগ কলেতো বাবু?
তাহিয়া এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিয়ে অভিমানভরা কণ্ঠে বলল,
—তুই বুঝেও না-বোঝার ভান করিস। খালি আমাকে লজ্জায় ফেলিস।
মেহরীন হাসতে হাসতেই তাকে জড়িয়ে ধরল,
—বাহ রে! লুকিয়ে লুকিয়ে ভালোবাসতে লজ্জা নেই, আর মুখে নাম নিতে এত লজ্জা?
তাহিয়া নাক ফুলিয়ে, গলা চড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
—মেহরীইইন!!!
মেহরীন ঠোঁটে এক আঙুল ছুঁইয়ে বলল,
—আচ্ছা আচ্ছা, আর বলছি না। এবার বল, এত রাতে হঠাৎ জন্মদিনের কথা মনে পড়ল বুঝি?
তাহিয়া গালে এক হাত রেখে, মুখটা কেমন যেন নিস্তেজ করে বলল,
—মনে তো ছিল অনেক আগ থেকেই। কিন্তু রাত বারোটায় উইশ করিনি, যদি উনি বুঝে ফেলেন উনার বার্থডে আমার মনে আছে।
মেহরীন হালকা করে তার কাঁধে চাপড় দিল,
—বুঝলে তো ক্ষতি কী?
তাহিয়া মাথা ঝাকিয়ে বলল,
—না না আমার লজ্জা করে।
—হুহ! এই লজ্জা নিয়েই থাক। একদিন দেখবি, অন্য কোনো মেয়ে তোর চোখের সামনে দিয়ে ফারিস ভাইকে নিয়ে চলে গেছে আর তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু লজ্জা পাচ্ছিস, কিছু বলতেই পারছিস না।
কথাটা যেন সরাসরি গিয়ে বিঁধল তাহিয়ার মনে। বিরাট বড় প্রভাব ফেলল তার মস্তিষ্কে। মুখটা সঙ্গে সঙ্গে ম্লান হয়ে গেল। ঠোঁট উল্টে চুপচাপ বসে রইল সে, গভীরভাবে কিছু একটা ভাবতে লাগল। মনে হচ্ছে মাথার ভেতর ঝড় বইছে। তাহিয়ার এই অবস্থা দেখে মেহরীনের আবার হাসি পেয়ে গেল। বুঝতে পারল, মেয়েটা বেশ ইনসিকিউর হয়ে পড়েছে। এ যেই নরম তুলো কি না কি ভেবে কষ্ট পেয়ে না বসে। নিজের কথাতে অপরাধবোধও কাজ করল, এভাবে ইচ্ছে করে ভয় দেখানো ঠিক হয়নি। দেরি না করে তাহিয়াকে হালকা ঝাঁকিয়ে বলল,
—আরে বোকা, মজা করছিলাম। এসব ভাবিস না। এবার বল, কীভাবে উইশ করবি?
তাহিয়া একটু নড়েচড়ে বসল,
—আমিও তো সেটাই ভাবছিলাম, কীভাবে করব?
মেহরীন বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,
—কল করে।
তাহিয়া ধপ করে এসে তার পেটে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—এই মুহূর্তে আম্মুর মোবাইল আনা ইম্পসিবল।
মেহরীন তার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
—তাহলে থাক, কাল দিনের বেলা করিস।
—না না! আমি আজই করতে চাই।
—তাহলে উপায়?
তাহিয়া নখ কামড়াতে কামড়াতে হঠাৎ উঠে বসল। চোখে একরকম উজ্জ্বলতা ভেসে উঠল। ঝলমলে চোখে বলল,
—একটা উপায় আছে!
—কী উপায়?
প্রশ্নটা করতেই দেখা গেল, তাহিয়া কেমন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে মেহরীনের দিকে। সেই চাহনি দেখেই মেহরীনের বুকের ভেতর যেন সতর্কতার ঘণ্টা বেজে উঠল। আধশোয়া থেকে সোজা হয়ে বসল মুহুর্তে। তাহিয়ার চোখের কথা যেন পড়ে ফেলেছে এক চাহনিতেই। মুখ কুঁচকে সরাসরি বলে ফেলল,
—আমি পারব না!
কথা শেষ হতেই তাহিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরল,
—প্লিজ দোস্ত! তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই। একটু হেল্প কর, প্লিজজজ!
মেহরীন তাকে ছাড়াতে ছাড়াতে বলল,
—না বাবা, আমি এসবের মধ্যে নেই। আমি এখন ঘুমাবো, সর তো দেখি।
—না না তুই-ই একমাত্র ভরসা। প্লিজজজ দোস্ত।
তাহিয়ার একের পর এক অনুরোধে বিরক্ত হয়ে মেহরীন তার মুখ চেপে ধরল,
—আজব, এত সহজ ভাবছিস নাকি? ধরা পড়লে তোর ভাই আমাকে তুলে আছাড় মারবে।
তাহিয়া তার হাত সরিয়ে জোর গলায় বলল,
—না না, ভাইয়া তোকে কিছুই বলবে না, দেখিস। প্লিজ, যা না।
—তুই খুব জানিস?
—হ্যাঁ, জানি আমি, এবার যা।
—না, একদম না।
অনেকক্ষণ চেষ্টার পরও যখন মেহরীন রাজি হলো না, তখন হতাশ হয়ে বসে পড়ল তাহিয়া। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। এই মুহুর্তে তালহার ফোন ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাহিয়াকে এমন মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে মেহরীন ফুস করে উঠল, একটু নরম হলো। পাশে এসে বসে বলল,
—ফাইজা আপুর ফোন আছে তো, ওটা নিয়ে এলে হয় না?
তাহিয়া অসহায় চোখে তাকাল,
—ফারিস ভাইয়ার নাম্বার আপুর কাছে নেই। ভাইয়ার ফোনেই আছে। তাই তো তোকে বলছিলাম।
মেহরীন ঠোঁট উল্টে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল,
—রাত বাজে দুইটা। এখন আমি তোর ভাইয়ের রুমে ঢুকব? যদি ঘুম ভেঙে যায়, এই রাতে আমাকে জেগে থাকতে দেখে কী ঝাড়টাই না দেবে।
তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে আকুতিভরা গলায় বলল,
—না না! ভাইয়া তোকে কিছুই বলবে না। মাঝরাত এমনেও এখন গভীর ঘুমে থাকবে। তুই আস্তে করে গিয়ে ফোনটা নিয়ে চলে আসবি, হয়ে যাবে। প্লিজ না করিস না, বান্ধবীর জন্য এইটুকুও করতে পারবি না? প্লিজ মেহুউউউউ, ভাবিইইই, বনুউউউউ।
তাহিয়ার সেই অদ্ভুত, অতিরঞ্জিত ডাক শুনে বিরক্ত হয়ে উঠল মেহরীন। এক দমকা গরম নিশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
—চুপ কর। কিছু হলেই বন্ধুত্বের দোহাই দিতে শুরু করিস। বেয়াদব একটা।
ধপধপ শব্দ তুলে পা ফেলতে ফেলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। যেতে যেতে ওড়নাটা মাথায় টেনে ঠিক করে নিল। দরজা খুলে বাইরে বের হতেই পেছন পেছন খুশিতে প্রায় লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে এলো তাহিয়া। ফিসফিস করে, উত্তেজিত কণ্ঠে একের পর এক নির্দেশনা দিতে লাগল,
—দেখ, আস্তে যাবি, কোনো শব্দ করবি না, ধীরে ধীরে ফোনটা নিবি, প্লিজ সাবধানে..
তালহার ঘরের সামনে পৌঁছাতেই হঠাৎ করে থেমে গেল তাহিয়া। তারপর এক ছুটে নিজের ঘরের দিকে পালাল। যেন সব দায়-দায়িত্ব এখন একেবারে মেহরীনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্ত। মেহরীন রাগে চোখ পাকিয়ে একবার তাকাল তার দিকে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে দরজায় আলতো ধাক্কা দিল। দরজাটা ঠেলে দিতেই সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল। তা দেখতেই, একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিল সে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল। একটু সাহস সঞ্চয় করে এগোতে লাগল। শুধু ভয় থাকলে এক কথা ছিল। লজ্জাও লাগছে তার এ কথা কিভাবে বোঝাবে তাহিয়াকে। বললেই তো চেপে ধরত লজ্জার কারণ। তখনের কথা কি বলা যায় নাকি? নিজের ভাবনা সাইডে রেখে ধীরে, খুব সাবধানে ভেতরে পা রাখল।
ঢুকে প্রথমেই ঘুরে দাঁড়িয়ে দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করে দিল। কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে অন্ধকারের সঙ্গে। ধীরে ধীরে আশপাশের আবছা আকারগুলো স্পষ্ট হতেই সে নিঃশব্দে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। দৃষ্টি বিছানায় যেতেই দেখতে পেল, ব্ল্যাঙ্কেটটা মাঝ বরাবর টানটান করে রাখা।
বুঝতে আর বাকি রইল না, তালহা সেখানেই শুয়ে আছে।
মেহরীন গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানার একেবারে ধারে এসে থামল। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল, তার নিঃশ্বাসও যেন থামাতে চাচ্ছে, যাতে শব্দ না হয়। চেষ্টা করল বোঝার, তালহা ঘুমিয়ে আছে কি না। বেশ কিছুক্ষন কোনো নড়াচড়া নেই দেখে নিশ্চিত হলো গভীর ঘুমে ডুবে আছে।
মনে একবার ইচ্ছে জাগল, একটু উঁকি মেরে দেখতে তালহাকে। কিন্তু বালিশ আর কম্বলের আড়ালে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তাই আর নিজের সেই কৌতূহলকে দমন করল সে। আর সময় নষ্ট না করে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে বালিশের পাশের দিকে তাকাতেই, যা খুঁজছিল, সেটাই চোখে পড়ল। মোবাইল! মুহূর্তেই তার মুখে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। যা নেয়ার জন্য এত ভয়, এত দুশ্চিন্তা, তা এত সহজেই পেয়ে যাবে, ভাবেনি।
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৮
সে ভেবেছিল, ফোনটা হয়তো বালিশের নিচে থাকবে। তা বের করা কঠিন হয়ে পড়বে, কিন্তু এ তো একেবারে সামনে। খুশিতে তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা তুলে নিতেই হঠাৎই পেছন থেকে শক্ত করে কোমড় জড়িয়ে ধরল এক হাত। এক নিমেষে জমে গেল মেহরীন। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো তার। চোখ তার সামনে শুয়ে থাকা তালহার দিকে। তালহা শুয়ে তবে অন্ধকারে তার কোমরের চারপাশে শক্ত হয়ে থাকা এই হাতের বাঁধনটা কার? ভয়ে যেন কাঁপতেও ভুলে গেল…
