Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬১

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬১

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬১
সাইদা মুন

তাহিয়া এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ভয়ে তার বুক ফেটে বেরিয়ে এলো এক আত্মচিৎকার,
—আম্মুউউউউ বাচাও…
চিৎকার করেই অন্ধকারে সামনের দিকে দৌড় দিতে উদ্যত হলো সে। কিন্তু পেছন থেকে ফারিস তার দুই বাহু ঝট করে ধরে ফেলল। এই অন্ধকারে এভাবে দৌড়ালে কোনদিক না কোনদিক হোঁচট খেয়ে পড়ে, এই ভেবেই তাকে থামানো। কিন্তু এতে যেন উল্টো হলো, তাহিয়ার ভয়ের মাত্রা যেন হাজার গুণ বেড়ে গেল। তার ভাস্যমতে ভূতটাই তাকে ধরে ফেলেছে। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে।
ভে ভে করে কেঁদে উঠল মুহূর্তেই। কাঁপতে থাকা শরীর আর কান্নায় ভেজা কণ্ঠে এক নিঃশ্বাসে বলতে লাগল,
—প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও আমি আর আসব না ছাদে। প্লিজ..
ফারিস হকচকিয়ে উঠল। মেয়েটা এতটা ভয় পাবে, তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল। বাচ্চাদের মতো কাঁদতে দেখে সে সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিল। তাহিয়াও ছাড়া পেয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। দৌড়ানোর শক্তি নেই। চোখ-মুখ শক্ত করে গুটিশুটি মেরে বসে আছে মেঝেতে, মাঝে মাঝেই ফুপিয়ে উঠছে, আর বারবার একই কথা বলছে,
—প্লিজ ছাড়ো আর আসব না প্রমিস।

ফারিস তো তাজ্জব বনে গেছে। দ্রুত নিজের মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাল। তাড়াতাড়ি তাহিয়ার সামনে এক হাঁটু গেড়ে বসল। লাইটটা তার দিকে ধরতেই, আলোয় ভেসে উঠল এক ভীত, অপূর্ব মুখ। সেজেগুজে এসেছে মেয়েটা। চোখের ওপর টানা সরু আইলাইনার, ঠোঁটে রঙিন প্রলেপ, কান্নার ফলে নাক লাল হয়ে আছে। কি সুন্দর লাগছে তাকে, কিন্তু আতঙ্কে এলোমেলো হয়ে গেছে সব। তাও ভালোই লাগছে। ফারিসের মনে প্রশ্ন জাগল, হঠাৎ সাজলো কেন সে? এত রাতে তো এমনি এমনি সাজবে না। তবে কি ছাদে আসবে বলেই সেজেছে? তাহিয়া কি তবে তার জন্যই সেজে এসেছে? কথাটা মনে আসতেই বিবেক উত্তর দিল,” তা নয় তো কি? এত রাতে কি কেউ এমন করে সেজে থাকে? নিশ্চয়ই এখানে আসবে বলেই সেজেছে।” বিস্মিত হলো ফারিস, তাহিয়ার হাবভাব বুঝতে পারছে না সে। নানান ভাবনায় মগ্ন হতেই হঠাৎ ফ্যাসফ্যাস শব্দ কানে আসতেই তার ধ্যান ভাঙল। টনক নড়ল, তাহিয়া এখনও কাঁদছে, সে তো ভুলেই বসেছিল।
নিজেকে ভাবনা সাইডে রাখল। মেয়েটার এই অবস্থা দেখে তার যেমন হাসি পাচ্ছে, তেমনি নিজের কাজের জন্য বিরক্তিও লাগছে। কেন ফাজলামো করতে গেল এই নিয়ে নিজেকে গালি দিতে মন চাচ্ছে। হাত বাড়িয়ে আলতো করে তাহিয়ার গালে কয়েকবার চাপড় দিল। আশ্বাস দিয়ে বলল,

—হেই তাহিয়া দেখো আমি, কোনো ভূত টূত নয়। ভয় পেয়ো না। এই মেয়ে।
কিন্তু তার সেদিকে খেয়ালই নেই। বরং আবার একই স্পর্শ পেয়ে তাহিয়া আরও ভয় পেয়ে গেল। তার মনে দৃঢ়ভাবে বসে গেছে, এটা কোনো মানুষ নয়, ভূতই তাকে ছুঁয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ঝটকা মেরে হাত সরিয়ে দিল। দু’হাতে পুরো মুখ ঢেকে এবার দ্বিগুণ স্বরে কান্না জুড়ল। ফারিসের এবার দেয়ালে মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করল। কি এক বিপদে পড়ল সে। এভাবে কান্না চলতে থাকলে বাড়ির সবাই তো জেগে উঠবেই, আশেপাশের লোকজনও চলে আসবে। পরে এক কেলেংকারী কান্ড বাধবেই। যেভাবেই হোক মেয়েটাকে শান্ত করতে হবে।
এই ভেবে মোবাইলটা মেঝেতে রেখে তাহিয়ার দুই কবজি শক্ত করে চেপে ধরল। হাতদুটো টেনে পেছনে নিয়ে নিজের এক হাতে শক্ত করে আটকে রাখল। তাহিয়া ছটফট শুরু করতেই সে আরও টাইট করে ধরল। এবার তো তার জানে পানি নেই। আর কিছু না ভেবে সে চিৎকার করতে উদ্যত হতেই ফারিস অন্য হাতে তার মুখ চেপে ধরে জুড়ে ধমক দিয়ে উঠল,

—চুপপপ আর একটা সাউন্ড হলে ছাদ থেকে এক ধাক্কা মেরে নিচে ফেলে দিব বেয়াদব। বলছি আমি ফারিস, আমি ফারিস, কোনো ভূত নই, শুনছো না?
এমন রাম ধমক খেয়ে তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল। নিজের ছটফটানিও বন্ধ করল। এতক্ষণ শক্ত করে বন্ধ করে রাখা চোখ দুটো সাথে সাথে খুলল। ফ্ল্যাশলাইটের আলোয় ফারিসের মুখটা স্পষ্ট হয়ে উঠতেই, যেন গভীর সমুদ্রে ভেসে থাকতে থাকতে হঠাৎ কোনো দ্বীপ খুঁজে পাওয়ার মতো স্বস্তি আর আনন্দে ভরে উঠল মন। তার ভেতরের আতঙ্ক ধীরে ধীরে কমতে লাগল। অসহায় ছলছলে চোখজোড়া নিয়ে ফারিসের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখের মাধ্যমেই বলতে চাইছে অনেক কথা।
তাহিয়ার চোখে চোখ পড়তেই ফারিসের রাগ উবে গেল। বিরক্তি নিমিষেই শেহয়ে গেল। ভরসার সুরে নরম কন্ঠে বলল,

—ভয় পাচ্ছ কেনো আমি তো আছি পাগল। কোনো ভয় নেই। দেখো আমি।
সে প্রতিটা কথা দিয়ে যেন তাহিয়ার ভরসা জোগাচ্ছে। তাহিয়াও শান্ত হলো। এতক্ষনের এই বিশ্রী অনুভূতি থেকে যেন নিস্তার পেল। একটু স্বস্তি অনুভব হতে লাগল। এবার চোখ টলমলে উঠল ফারিসকে কিছু বলতে চাইল তাহিয়া। কিন্তু মুখ চেপে ধরে রাখায় মুখ দিয়ে অস্পষ্ট “উম উম” শব্দ বের হলো। এতে হুঁশ ফিরল ফারিসের। সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে আনল। সঙ্গে সঙ্গে তাহিয়া বলতে লাগল,
—এখানে কেউ ছিল, এ..এখানে ছিল।
বলেই তার পেছনের দিক দেখাতে লাগল। চোখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট তখনল। চারপাশে তাকিয়ে খোঁজতে লাগল কিছু। তা দেখে ফারিস তাহিয়ার গাল হাতের আজলায় নিয়ে শান্ত করতে বলল,
—কিছু নেই তো দেখো কিছু নেই।
তার কথায় বিশ্বাস না করলেও সাহস পেল মনে। আগের থেকে অনেকটা শান্ত হতেই ফারিস তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিল। তা দেখে তাহিয়া ঝাপটে তার বাম হাত চেপে ধরল। ভীতু কন্ঠে বলল,
—প্লিজ আমাকে রেখে যাবেন না। আমিও আপনার সঙ্গে যাবো।
ফারিস থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল তাহিয়ার টলমলে, আকুতিভরা চোখের দিকে। এই প্রথমবার নিজের কোনো কাজে এতটা অপরাধবোধ কাজ করছে। বার বার মনে হচ্ছে কেন করতে গেল এমনটা। নিজের উপরই নিজে বিরক্ত হয়ে উঠল সে। সত্যিই একটু বেশিই করে ফেলেছে।
গভীর এক নিঃশ্বাস ফেলে অন্য হাতটা আলতো করে তাহিয়ার হাতের ওপর রাখল। নরম, আশ্বাসভরা কণ্ঠে বলল,

—আমি আছি তো।
তারপর দু’জনই ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তাহিয়া তখনও ফারিসের হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে, যেন ছেড়ে দিলেই আবার অজানা ভয় তাকে গ্রাস করবে। ফারিস একবার সেদিকে তাকিয়ে হাতের দিকে চাইল, ঠোঁটের কোণে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল। তারপর দৃষ্টি তুলল তাহিয়ার মুখের দিকে।
যা ভেবেছিল, ঠিক তাই। চোখের কোণে টানা আইলাইনার কাঁদতে কাঁদতে জলের সাথে মিশে একাকার। পুরোপুরি নষ্ট হয়নি ঠিকই, তবে এলোমেলো হয়ে গেছে। তা দেখে ফারিস পকেট থেকে রুমাল বের করল। নিজের হাত ছাড়িয়ে নিতেই তাহিয়া এবার তার শার্ট এর এক কোণা খামচে ধরল। তা দেখে বলল,
—আরে বাবা আমি যাচ্ছি না তোমার সাথেই আছি।
বলেই তাহিয়ার হাতে মোবাইলটা ধরিয়ে দিল। পরপর তার থুতনি ধরে মুখটা একটু উপরে তুলল। ফারিসের এই হঠাৎ আচরণে তাহিয়া ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ভয় যেন কিছুটা ভুলে গিয়ে অবাক হয়ে তার কাজকর্ম দেখছে। সে করতে চাচ্ছে টা কি সেটাই যেন বুঝতে চাইছে।
রুমালের এক কোণা দিয়ে ধীরে ধীরে মুছে দিতে লাগল চোখের কোণে ছড়িয়ে থাকা আইলাইনার। সেভাবেই জিজ্ঞেস করল সে,

—এত সাজগোছ বুঝি আমার জন্য?
প্রশ্নটা শুনে মুহূর্তেই তাহিয়ার চোখের ভাষা বদলে গেল। বিস্ময় আর লজ্জা মিশে চোরাই দৃষ্টিতে পরিণত হলো। সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নিল সে। ভয় ভ্রান্তি ভুলে এবার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। ফারিস কি তবে বুঝে ফেলল? এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে আমতা আমতা করে বলল,
—আ..আপনার জন্য কেন সাজতে যাবো। আমি এমনি সেজেছি।
ফারিসের কপালে ভাঁজ পড়ল। রুমাল চালানোর গতি কিছুটা থেমে এলো। চোখ পিটপিট করে প্রশ্ন করল,
—এত রাতে মানুষ এমনি এমনি বুঝি সাজে?
তাহিয়া তাড়াতাড়ি জবাব দিল,
—আ..আমি সাজি, আমি প্রায়ই রাতের বেলা সাজি।
ফারিস ঠোঁট কামড়ে হালকা হাসল। মেয়েটা যে ধরা পড়েও ধরা দিতে চাইছে না, সেটা তার বুঝতে বাকি নেই। লজ্জা পাচ্ছে দেখে আর লজ্জা দিতে চাইল না। চুপচাপ রুমাল গুটিয়ে সরে দাঁড়াল। তারপর বুকে দু’হাত গুঁজে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল সে। তাহিয়াও তার পাশ ঘেঁষেজ দাঁড়াল, শরীরটা এখনও গুটিয়ে আছে। ভয়টা পুরোপুরি কাটেনি, এমন অভিজ্ঞতা কি এত সহজে ভুলে যাওয়া যায়?
ফারিস চুপচাপ তাকিয়ে আছে তাহিয়ার দিকে। মনে মনে খুব আফসোস হলো, মেয়েটা কত সুন্দর করে সেজে এসেছিল, আর সে কিনা সব নষ্ট করে দিল। নিরবতার মাঝে হঠাৎজ নিচু স্বরে বলে উঠল,

—আ’ম সরি লিলিপুট।
তাহিয়া অদ্ভুত চোখে তাকাল তার দিকে। হঠাৎ এই “সরি” বলার কারণ বুঝতে না পেরে কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
—কেন?
তারও সরল স্বীকারোক্তি,
—ভয় দেখানোর জন্য।
কথাটা শুনতেই তাহিয়া স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে চেয়ে রইল তার পানে। মাথার ভেতর যেন হিসাব কষতে লাগল। ভয় দেখানোর জন্য মানে একটু আগের ওই কান্ড কি তবে ফারিসের? কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে সব মিলিয়ে নিতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চোখে ফুটে উঠল রাগের ঝিলিক। কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর উঁচু স্বরে বলল,
—তারমানে ওটা আপনি ছিলেন?
ফারিস অপরাধী চোখে মাথা উপর-নিচ করল,
—হুমম।
তাহিয়া আবারও প্রশ্ন করল, এবার স্বর আরও কঠোর,
—আপনি এমনটা করেছেন?
ফারিস ফের মাথা নাড়তেই যেন আগুন জ্বলে উঠল তাহিয়ার মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে চেচিয়ে উঠলো,

—আপনি কি জানেন আমি কতটা ভয় পেয়েছিলাম? সবকিছু আপনার ফাইজলামি মনে হয়? কেন করলে৷ এমনটা? জানতেন না আমি এসবে খুব ভয় পাই? আপনার ধারণা আছে আমি কতটা পরিমাণ ভয় পেয়েছি?
একেরপর এক কথা ফারিস শান্ত হয়ে মাথা নিচু করে শুনছে। তাহিয়া থামতেই থমথমে মুখে উত্তর দিল,
—আই এম এক্সট্রিমলি সরি। একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম। তবে তুমি যে এত ভয় পাবে, জানতামই না।
তাহিয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার কথায় যেন রাগ তিরতির করে বাড়ছে। নাকটা রাগে বারবার ফুলছে, চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি। কয়েক মুহূর্ত সেই দৃষ্টি ধরে রেখেই আচমকা শরীর ঝাঁকিয়ে এক পা এগিয়ে এসে ফারিসের একেবারে সামনে দাঁড়াল। তা দেখে ফারিস সামান্য মাথা সামান্য পেছ। তাহিয়া হাত তুলে এক আঙুল তার দিকে তাক করে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। যেন কথাগুলো গলায় আটকে গেছে। আবার হাত নামিয়ে নিল। তারপর একটু পিছিয়ে এসে দু’হাত বুকে গুঁজে দাঁড়াল।
প্রচন্ড অভিমান জমছে ভেতরে ভেতরে। এমনটাও কেউ করে? এতটাই অভিমানী হয়ে উঠেছে সে যে এখন কিছু বলতে গেলেই হয়তো কেঁদে ফেলব। তাই নিজেকে সামলে নিল কথা বলল না। ঠিক করল, আর এক মুহূর্তও এখানে থাকবে না। যার জন্য এত কিছু করল, এই রাত জাগল, সেই যদি এমন করে, তাহলে থাকা কী মানে হয়? এই ভেবে সিদ্ধান্ত নিল এখানে আর একমুহূর্ত ও থাকবে না। পেছন ফিরে হাঁটা দিল। অভিমানে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল দু’ফোঁটা জল।
তাকে এভাবে চলে যেতে দেখে ফারিস ডেকে উঠল,

—আরে কোথায় যাচ্ছো?
তাহিয়া থামল, তবে পেছন ফিরে তাকাল না। ভরা কণ্ঠে বলল,
—ঘরে যাবো।
তার কণ্ঠ শুনেই ফারিস বুঝল, মেয়েটা কাঁদছে। এগিয়ে গিয়ে বলল,
—দেখো তাহিয়া সরি তো আর এমন করবো না।
কিন্তু এতে যেন তাহিয়ার কান্না আরও বেড়ে গেল। ফুপিয়ে উঠল সে। নাক টেনে টেনে বলল,
—আপনি আর একটাও কথা বলবেন না।
বলেই আবার হাঁটা শুরু করল। চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারেই, ফারিসের কোনো কথাই শুনছে না। বেশ কয়েকবার থামানোর ট্রাই করেছে। তবে সে তার কথাতেই অটল। শেষমেশ আর উপায় না পেয়ে ফারিস বলে উঠল,

—যাচ্ছো, ভালো কথা যাও। তবে ছাদের দরজার সামনে কিন্তু তানারা থাকতে পারে, দেখে শুনে যেও। তানাদের দেখলে সালাম দিও।
তাহিয়া তখন ছাদের দরজার দিকেই এগোচ্ছিল। এমন সময় এই কথা শুনতেই তার পা থেমে গেল। বুকটা কেঁপে উঠল। রাগ অভিমান যেন দৌড়ে
পালাল। এক মুহূর্তও দেরি না করে ঘুরে প্রায় একপ্রকার দৌড়ে ফিরে এল ফারিসের ঠিক পাশে। তবে তার দিকে তাকাল না, মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে দাঁড়িয়েছে।
এই কান্ড দেখে ফারিস হু হু করে হেসে উঠল। অট্টহাসির শব্দ যেন পুরো পরিবেশ ভরিয়ে দিল। কিন্তু তাহিয়ার কাছে এই হাসিটা ভীষণ বিরক্তিকর লাগল। আরও শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। চোখের পানি মুছে মুখ শক্ত করে ফেলল। আর ফারিস সে তো হাসতে হাসতে নিজের উরুতেই দু’বার চাপড় মেরেছে। যেন ভীষণ মজার কিছু দেখেছে।
এভাবেই অনেক্ষন ধরেই এই হাসি চলতে দেখে আর সহ্য করতে না পেরে তাহিয়া ঝাঁঝালো স্বরে বলে উঠল,
—আজব! এমন দাঁত কেলাচ্ছেন কেন? জোকস বলেছে কেউ?
ফারিস একইভাবে উত্তর দিল,

—জোকস শুনিনি, তবে জোকার দেখেছি।
বলেই আবারও হেসে উঠল। এতে তাহিয়াকে আরও রেগে যেতে দেখে সে এবার নিজেকে থামাল। বড় বড় শ্বাস নিয়ে হাসি চেপে রাখার বৃথা চেষ্টা চালাল। গলা খাকারি দিয়ে বলল,
—সরি সরি ডোন্ট মাইন্ড, আর হাসছি না।
এই বলে ফারিস এগিয়ে এসে তাহিয়ার সামনে দাঁড়াল। তাকে সামনে দেখতে পেতেই তাহিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিল অন্যদিকে। ফারিসও দেরি না করে সেই দিকেই এগোল। আবারও তাহিয়া ঘুরে গেল। এভাবে কয়েকবার চলতেই থাকল, সে যেদিকেই ফিরছে, ফারিস ঠিক সেদিকেই এসে দাঁড়াচ্ছে। অবশেষে বিরক্ত হয়ে উঠল তাহিয়া। কোমড়ে দু’হাত গুঁজে সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বলল,
—সমস্যা কি?
ফারিস নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
—আমার সমস্যা তুমি।
—আমি?
—হু।
—আমি কিভাবে?
—এই যে তুমি ডেকে এনে রাগ দেখাচ্ছো। এটাই সমস্যা।
—আমার এখন রাগ দেখানোটা কি জায়েজ না?
ফারিস সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—একদম জায়েজ। তবে সরি বলেছি তো। প্লিজজজ এবারের মতো মাফ করুন আমাকে।
তার এসব নাটক তাহিয়া কড়া চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল। হাসি পাচ্ছে তবে হাসা যাবে না। কিছু একটা ভেবে বলল,

—সরি তে আমার হবে না।
ফারিস কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল,
—তাহলে কিসে হবে?
তাহিয়া এবার দু’হাত বুকে গুঁজে ভাব নিয়ে দাঁড়াল। পৈশাচিক এক হাসি দিহে কোনাচোখে তাকিয়ে বলল,
—কান ধরে দশবার ওঠবস করুন।
ফারিস বিস্ফোরিত চোখে তাকাল। কথাটা শুনা মাত্রই তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল,
—হোয়াট!
তাহিয়াও সমানতালে বলল,

—ইয়েস।
ফারিস নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে বলল,
—তাহিয়া, আর ইউ কিডিং?
তাহিয়া নির্বিকার গলায় জবাব দিল,
—আ’ম নট।
ফারিস মাথা ঝাকিয়ে না না করে বলল,
—দেখো এসব ফাজলামো করো না।
তাহিয়াও বলল,
—আমি কোনো ফাজলামো করছি না, ফাজলামো আপনি করেছেন।
—দেখো তাহিয়া, আমি ছোট বাচ্চা নই।
ফারিসের কথা শেষ হতে না দিতেই তাহিয়া থামিয়ে বলল,
—সেটা আমার দেখার বিষয় না।
—আরে কানে ধরে ওঠবস, এটা কোনো কথা?
কিন্তু তাহিয়া নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল। তার চোখেমুখে জেদের ছাপ স্পষ্ট। ফারিস নানাভাবে বুঝাতে চাইল। তবে সে তো নাছুরবান্দা। যা বলেছে বলেছেই। আর কথায় কাজ হবে না। একপর্যায়ে কপালে দু’আঙুল ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। সময় কেটে গেল কয়েক মুহূর্ত। তাও এই মেয়ে নরম হচ্ছে না।
শেষ পর্যন্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ইগো সাইডে রেখে সামনে এগিয়ে এল সে। তাহিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে একটু ঝুঁকল। তারপর ফুস করে একটা শ্বাস ছেড়ে ইতস্তত করতে করতে দুই কান ধরে বলল,

—সরি তাহিয়া।
বলেই চোখমুখ অন্ধকার করে ফেলল। তার অবস্থা যেন বর্তমানে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। বেহাল অবস্থা দেখে তাহিয়া আর নিজের রাগ ধরে রাখতে পারল না। ফিক করে হেসে ফেলল। ফারিসের দু’হাত কান থেকে নামিয়ে বলল,
—এবারের মতো এতেই মানলাম। এরপর আর এমন করলে কিন্তু খবর আছে।
ফারিসও মৃদু হেসে বলল,
—যথা আজ্ঞা সাহেবা।
দুজনেই এসে দাঁড়িয়েছে ছাদের রেলিংয়ের পাশে। কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে রইল তাদের মধ্যে। হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, তবুও পরিবেশটা শান্ত। নীরবতা ভাঙল ফারিস,
—এত রাতে ছাদে ডেকেছো যে।
কথাটা শুনেই হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়ল তাহিয়ার। মুহূর্তেই তার মুখের ভাব বদলে গেল। চিন্তিত হয়ে চারপাশে তাকাতে লাগল। আচমকা এমন অস্থিরতা দেখে ফারিস সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

—এনি প্রবলেম?
তাহিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
—আমার হাতের বক্সটা যেন কোথায় পড়েছে, পাচ্ছি না।
ফারিস সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—ওয়েট।
মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট অন করে দুজনেই আগের জায়গায় গেল। ভয় পেয়ে তখনই কোথাও ছুড়ে ফেলেছিল তাহিয়া। এদিক সেদিক খুঁজতেই নিচে পড়ে থাকতে দেখা গেল তা। বক্সটা দেখে তার মনটা ধক করে উঠল। তাড়াতাড়ি তুলে নিল হাতে। এত যত্ন করে সাজানো জিনিসটা এভাবে অবহেলায় পড়ে আছে। ওড়না দিয়ে আলতো করে মুছতে লাগল।
ফারিস কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—এটা কি?
তাহিয়া কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ মুছতে মুছতেই আবার রেলিংয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ফারিসও তার পিছু পিছু এল। দাড়াতেই তাহিয়া বক্সটা বাড়িয়ে দিল তার দিকে। ফারিস বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হাতের দিকে। ঠিক তখনই তাহিয়া বলল,

—হ্যাপি বার্থডে।
ফারিস স্তব্ধ হয়ে গেল। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। এই দুইটা শব্দ শুনে যে সে অবাক তা নয়। বরং অবাক এই ভেবে যে, তাহিয়া তার জন্মতারিখ জানল কীভাবে। সে তো কখনো বলেনি। তাহলে কি খোঁজ নিয়ে জেনেছে? তার প্রতি কি আগ্রহ আছে তার? ভাবতেই বুকের ভেতর স্নিগ্ধ বাতাসের ঝাপটা লাগল, শিহরিত হয়ে উঠল শরীর। মেয়েটা শুধু মনেই রাখেনি এই রাত অব্দি তার জন্য অপেক্ষাও করছিল? এত রাত পর্যন্ত জেগে আছে তাকে উইশ করার জন্য? সবকিছু মিলিয়ে ব্যাপারটা পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত। চোখমুখে অবাক ভাবটা লেগেই আছে।
ফারিসকে চুপ থাকতে দেখে তাহিয়া বক্সটা তার চোখের সামনে ধরে বলল,
—কি হলো? নিবেন না এটা?
ফারিস ধীরে ধীরে ছোট্ট বক্সটা হাতে নিল,
—এটা আমার জন্য?
তাহিয়া মাথা নাড়তেই সে আবার জিজ্ঞেস করল,
—কি আছে এতে?
—খুলেই দেখুন।

ফারিস আস্তে আস্তে খুলতে শুরু করল। ছোট্ট বক্সটা খুলতেও যেন তার হাত কাঁপছে, খুব এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে মনের ভেতর। কি আছে এতে সেটা নিয়ে না, তাহিয়া কি দিয়েছে সেটা নিয়েই এক্সাইটমেন্ট। ধীরে ধীরে প্যাকেট খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা ঘড়ির বক্স। তা খুলতেই ভেতরে রাখা সিলভার রঙের ঘড়িটি দেখতে পেল।
পরক্ষণেই ফারিসের ঠোঁট প্রসারিত হয়ে উঠল শীতল এক হাসিতে। চোখে খুশির ঝিলিক নিয়ে তাকাল তাহিয়ার দিকে। তাহিয়া একটু সংকোচ নিয়ে বলল,
—আসলে টাকা কম ছিল, তাই এটাই…
ফারিস তাকে থামিয়ে দিল। এক হাতে বক্সটা এগিয়ে দিয়ে অন্য হাতটা সামনে বাড়িয়ে বলল,
—পড়িয়ে দাও।
তাহিয়া ফট করে ফারিসের চেহারার দিকে তাকাল। মুখের ঝলমলে হাসিটা দেখে বলল,
—পছন্দ হয়েছে আপনার?
ফারিস মাথা নেড়ে বলল,
—খুববব।
কথাটা শুনতেই তাহিয়ার মুখেও এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। আর দেরি না করে সে ঘড়িটা নিয়ে ফারিসের হাতে পরিয়ে দিতে লাগল। ফারিস অপলক তাকিয়ে আছে তাহিয়ার দিকে। মেয়েটাকে আজ অন্যরকম লাগছে। ঘড়ি পড়ানো শেষ হতেই ফারিস বলে উঠল,
—থ্যাংক ইউ তাহিয়া, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। তুমি নিজেও জানো না তুমি আমার দিনটা কতটা স্পেশাল করে দিয়েছো।
তাহিয়া উৎফুল্ল নয়নে প্রশ্ন করল,
—ভালো লেগেছে আপনার?
ফারিস চোখ সরিয়ে ঘড়িটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে মুচকি হেসে বলল,
—বেস্ট।
তাহিয়ার মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল। যাক, রাত জেগে থাকা বিফলে গেল না তবে। ফারিস এবার তাহিয়ার পাশে ঘেঁষে দাঁড়াল,

—এজন্যই এত রাত অব্দি জেগে ছিলে?
উত্তরে তাহিয়া মাথা নিচু করে নিল। এতেই যেন উত্তর পেয়ে গেল ফারিস। হঠাৎই এক অদ্ভুত আবদার করে বসল ফারিস, যা শুনে তাহিয়া বড় বড় চোখ করে তাকাল।
—তোমাকে একটু আদর করতে পারি?
—ম..মানে?
ফারিস স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
—মানে, তোমাকে দেখে অনেক আদর আদর পাচ্ছে। একটু আদর করব?
তাহিয়া ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল। তা দেখে মৃদু হেসে ফারিস তাহিয়ার দু’গাল টেনে দিল। গালে হালকা লাগতেই তাহিয়া সঙ্গে সঙ্গে গালে হাত দিয়ে বলল,
—কি ছিল এটা?
ফারিস আস্তে করে বলল,
—আদর।
তাহিয়া অবাক কণ্ঠে বলল,
—আমি কি বাচ্চা?
ফারিস আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
—তাহলে কি তুমি বড়দের আদর চাচ্ছো?

কথাটা শুনে তাহিয়া কিছুক্ষণ পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। কয়েক সেকেন্ড পরেই কথার মানে স্পষ্ট হতেই লজ্জায় গরম হয়ে উঠল বেচারির গাল। সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। কেশে উঠল সে শুষ্ক। কাশতে কাশতে অন্যদিকে ফিরল বেচারি।
তাকে হঠাৎ এমন কাশতে দেখে ফারিস বিচলিত হয়ে উঠল,
—আর ইউ ওকে?
কাশি থামতেই তাহিয়া গলা ঝেড়ে বলল,
—আ..আমি নিচে নামব এখন।
—এখনই?
তাহিয়া এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে বলল,
—রাত হয়েছে, ঘুমাতে হবে।
ফারিস তাহিয়াকে পরখ করতে করতে বলল,
—আচ্ছা যাও, তবে..
তাহিয়া জিজ্ঞেস করল,
—তবে?
—শর্ত ভুলে গেলে?
—কি শর্ত?
—আমি যা চাইব, তা দিবে বলেছিলে।
—কখন?
—কলে..

তাহিয়ার তখনই মনে পড়ল কলে বলা কথাগুলো। তাড়াহুড়ায় সে তো বলেছিল যা চাইবে তাই দিবে। তবে তার কি সেই সাধ্য আছে? চিন্তায় পড়ল বেচারি, এখন ফারিস কি চাইবে এই ভেবে। মিনমিনিয়ে প্রশ্ন করল,
—কি চাই আপনার?
ফারিস দু’হাত পকেটে গুজে বলল,
—চাইলেই পাবো?
—আমার সাধ্যের মধ্যে থাকলে অবশ্যই দিব।
ফারিস চুপ করে গেল। তাহিয়া ভ্রু উঁচিয়ে ইশারায় “কি চাই?” ফের জিজ্ঞেস করতেই ফারিস সময় নিয়ে বলল,
—আমার সত্তরতম জন্মদিনেও তোমার থেকে এমন উইশ চাই।
কথাটা শুনে তাহিয়া হতভম্ব। এমন আবদার কেউ করে? তাছাড়া ওই বুড়ো বয়সে কি তারা একে অপরের দেখা পাবে? কথাগা ভাবতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস। মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল, আস্তে করে বলল,
—বুড়ো বয়সে আপনাকে পাবো বুঝি?
ফারিস ভেবে বলল,
—উমম.. এমন উইশ পাওয়ার জন্য নাহয় রেখে দিব তোমাকে।
কথাটা শুনামাত্রই তাহিয়ার মনটা খারাপ হয়ে গেল। উইশের জন্য রাখবে? তাকে এমনিতে রাখবে না? মন ঢেকে গেল আধারে। জোরপূর্বক হেসে বলল,

—আপনি বড্ড স্বার্থপর, সামান্য উইশের জন্য আমাকে ততদিন অব্দি রেখে দিবেন?
ফারিস চুল ঠিক করতে করতে বলল,
—তোমার জন্য একটু স্বার্থপরই নাহয় হলাম।
তাহিয়া অবাক হয়ে বলল,
—আমার জন্য?
ফারিস একটু থেমে মাথা চুলকে বলল,
—মানে, উইশের জন্য।
তাহিয়া আবারও একগাল হেসে বলল,
—ওক্কে মিস্টার সেলফিশ, আপনার এই কথা আমি রাখলাম। এবার আমাকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসুন।
ফারিস মাথা নেড়ে এক হাত সামনে বাড়িয়ে যেতে ইশারা করল। তাহিয়াও খুশিমনে এগিয়ে গেল। তবে মনের কোণে কিছুটা খারাপ লাগার আনাগোনা দেখা দিল। ছাদের দরজার সামনে এসে থামল সে। হাত উঁচিয়ে টাটা দিয়ে বলল,
—গুড নাইট।
বলেই হাতটা নামাতে নিলেই ফারিস হাতটা খপ করে ধরে ফেলল। তাহিয়া চমকে তাকাল সেদিকে। পলকে ফারিস এক কদম এগিয়ে এল, তাদের মধ্যে দূরত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।
মাথা একটু ঝুঁকিয়ে কানের কাছে এসে ফিসফিসিয়ে বলল,
—গুড নাইট না বেস্ট নাইট এভার….
কথা শেষ করেই হাত ছেড়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে সরে গেল সে। তাহিয়া হা করে এখনো জায়গায়ই দাঁড়িয়ে। রেলিঙ বেয়ে নিজেদের ছাদে যেতে যেতে বলল,
—দাঁড়িয়ে থেকো না লিলিপুট, দরজা লাগিয়ে ঘুমাতে যাও।
তাহিয়া ঘোরের মাঝেই আস্তে করে দরজা লাগিয়ে দিল। ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল সে। চোখে এখনো একটু আগের আচমকা ঘটনাতেই আটকে।

মেহরীন বসে আছে তালহার মোবাইল নিয়ে। একা একা কি করবে ভেবেই সে গ্যালারিতে ঢুকেছে। উদ্দেশ্য তালহার ছবি দেখা। তবে ঢুকতেই সর্বপ্রথম চোখে ধরা পড়ল একটা ফোল্ডার, যেখানে তারই একটা ছবি দেখা যাচ্ছে। সে চমকাল ফোল্ডারটার নাম দেখে। “Wifey” নামটা দেখতেই ঠোঁটে চমৎকার এক হাসি ফুটে উঠল। কৌতূহল নিয়ে ফোল্ডারে ঢুকতেই একের পর এক নিজের ছবি দেখে সে চমকাল। এত ছবি তো সে আজ অব্দি তুলেনি। গুনে গুনে একহাজার তিনশ চারটা পিক। কৌতুহল নিয়ে সে দেখতে লাগল একেরপর এক ছবি।
কোনোটা কলেজ গেট থেকে বের হওয়ার সময়, কোনোটা গাড়িতে তালহার পাশের সিটে বসে থাকা, কোনোটা খাবারের টেবিলে বসে খেতে খেতে, আবার কোনোটা বইয়ে মুখ গুঁজে পড়াশোনায় ব্যস্ত, সবই যেন নিঃশব্দে ধরে রাখা মুহূর্ত। ছাদে দোলনায় বসা, এমনকি তালহার সঙ্গে লিপস্টিক কিনতে মার্কেটে যাওয়ার ছবিও পর্যন্ত আছে সেখানে। তার সাথের প্রতিটা মুহুর্তই যেন সে ক্যামেরায় বন্দি করে রেখেছে।
মেহরীন তো চরম অবাক, তালহা এসব ছবি তোলে কখন? সে তো আজ পর্যন্ত টেরই পায়নি। তবে তার অগোচরে এসবই চলে? সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট কামড়ে হাসল মেহরীন। বিরবিরিয়ে বলল,

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬০

—জামাই তো দেখছি হেব্বি সেয়ানা!
আবার নিজেই হেসে ফেলল। তারপর একের পর এক ছবি দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে একদম শেষের দিকে এসে হঠাৎ থমকে গেল সে। মুখটা নিজের অজান্তেই হা হয়ে গেল। নড়েচড়ে বসে লাস্ট ছবিটায় মনোযোগ দিল। এটা তো বিয়ের রাতের ছবি, জুম করে দেখল লেহেঙ্গাটা এটা তো তারই বিয়ের লেহেঙ্গা। ছবিতে তার এক সাইড দেখা যাচ্ছে, সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে সে।
তালহা না তখন গাড়ি চালাচ্ছিল। তবে এই ছবি তুলল কবে? আর তুললই বা কেন? সে তো সেদিন বিয়েটাই মানেনি। মনে নানান প্রশ্নের জন্ম নিল একমুহূর্তেই…

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৬২