Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৪

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৪

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৪
জান্নাত নুসরাত

নুসরাতের কথায় আরশ হেসে ফেলল। চোখ তুলে তাকাল তার দিকে। বৃষ্টির পানি মুখে চোখে পড়ে অপ্রাথিব এক সৌন্দর্যে আবৃত হয়েছে মেয়েটা। নিয়ন আলোয় উদাস চোখের রমনীকে আরশ দেখল। কেমন করে নুসরাতের কাছে জানতে চাইল,”ডিভোর্স নিয়ে নিবি? এই সম্পর্কের ভার বহন করতে পারবি না আর?
আরশের কথায় নিজের জায়গা অনড় থাকা নুসরাত একই জবাব দিল,”না, আমি আর এই সম্পর্কের ভার বহন করতে পারব না। এই দেখুন, তেরো বছর ধরে মিথ্যে একটা সম্পর্কের ভার বহন করতে করতে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি। আমাকে মুক্তি দিন, আমি মুক্তি চাই এই সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে।
আরশ শব্দের সহিত হাসল। হাত দু-দিকে ছড়িয়ে অদ্ভুতভাবে বলে ওঠল,”যাহ্ মুক্তি দিয়ে দিলাম তোকে, আর এই সম্পর্ক বয়ে বেড়াতে হবে না।

নুসরাত শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ভেজা হাতের তালু দিয়ে মুখ মুছে নিল। আবারো ভিজে উঠল তা। ঠোঁট টিপে নিজেকে সামলাল। বলল,”আর কোনোদিন আমার সামনে অধিকার নিয়ে দাঁড়াবেন না।
“কোনো অধিকার নিয়ে দাঁড়াব না! মুক্ত করে দিলাম তোকে।
নুসরাত ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্য করে হাসল। আরশকে জিজ্ঞেস করল,”করুনা করছেন নাকি আমার উপর?
“আমার এত সাহস, নুসরাত নাছিরকে করুনা করব। আমি তো নিজেই তার কাছে করুনার পাত্র।
নুসরাত ঢোক গিলে বাঁ-পাশে তাকাল। ঠোঁট টিপে চোখের পাতা ঝাপ্টাল। আরশ তার বাহু ধরে কাছে টানল একটু। হা করে হাপড়ের মতো শ্বাস ফেলে আবদার করল,”শেষবারের মতো একটা আবদার করব, রাখবি?
নুসরাত তাকিয়ে রইল আরশের দিকে। চোখের পানিতে গাল ভেসে যাচ্ছে তা ধারণা করা বড় মুশকিল। গলার কাছে দলা পাঁকাচ্ছে কিছু একটা। কন্ঠ শীতলতা বিরাজ রেখে জানতে চাইল,”কী?

“তোকে একটা চুমু খেতে পারি, শেষবারের মতো? না করবি না কিন্তু, না করলে, না মানব না, আজ!
নুসরাত থমকাল, ভড়কাল! অথচ আরশ চেয়ে আছে তার দিকে উত্তরের আশায়। সে ও তাকাল তার দিকে, তাকিয়ে রইল অভাল আকৃতির গাম্ভীর্যে মোড়া মুখটার দিকে। যেন বুঝেনি কী বলেছে লোকটা।
রেস্টুরেন্টের ভেতর থেকে ভেসে আসা রঙ বেরঙের আলোক সজ্জায় আরশ দেখল নির্মল, নির্লিপ্ত মুখটা।৷ মুখের প্রতিটা কোণ দেখল। দু-হাতে গাল চেপে ধরে বুড়ো আঙুলের সাহায্যে মুখের পানি মুছে দিতে চাইল, হলো না.! বৃষ্টি এসে আবার ভিজিয়ে দিয়ে গেল। আরশের প্রখর দৃষ্টি নিজের দিকে টের পেয়েও নড়চড় বিহীন থাকল নুসরাত।
সময় গড়াল। উত্তর পেল না আরশ,পাবে বলে আশাও করল না। বাতাসে বেদনার ঘ্রাণ দ্রবীভূত হলো। সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ল ঝড়ো হাওয়া। সেই ঝড়ো হাওয়া উড়িয়ে দিল চিপচিপে হওয়া শার্ট। আরশ ধীরে ধীরে নুসরাতের ঠোঁটের দিকে ঝুঁকে আসলো। একহাতে চোখের গ্লাসটা সরিয়ে নিয়ে নিজের পকেটে পুরল। নাকের সাথে ঘর্ষণ হলো নাকের। ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের।

নুসরাত অনুভব করল তার শরীর কাঁপছে। অনুভূতির তীব্র জোয়ারে সমগ্র নারী দেহের অঙ্গ প্রতঙ্গ, শিরা, উপশিরা দুলছে। শরীর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। মনে পোষে রাখা অভিমান চোখ দিয়ে ঝড়ে পড়ছে অশ্রু হয়ে। সময়ের সাথে ঠোঁটের তীব্রতা শীতিল হওয়ার তুলনায় আরো বাড়ল। নাসারন্ধ্রের অলিতে গলিতে ছেয়ে গেল দারুচিনি, পুদিনা পাতা আর মিটে কস্তুরির সুগন্ধি। শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল সে! শরীরের ভেতরে চলল নীরব এক হরতাল, তবুও বাহিরের নারী দেহ থাকল নির্বিকার।। বৃষ্টির ছটাও সময় বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে আরো বাড়ল। এক চিলৎ ঝড়ো হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিল মুখোমুখি দাঁড়ানো দু-জনকে। ঝমঝম বৃষ্টির শব্দের সাথে বজ্রপাতের কান ধাধানো শব্দ ভেসে এলো দূর দূরান্ত হতে। অন্ধকার ভেদ করে দিনের আলো ফুটল বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে, আবার তা নিভে গেল সেকেন্ড কয়েকের ভেতর। গুমোট প্রকৃতির সেই করুন নিস্তব্ধতা ভেঙে খুব কাছ হতে ভেসে এলো চেনা পরিচিত আরশের মন্ত্রমুগ্ধকর সেই সুর!

“Rakh Loon Chhupaa Ke Main Kahin Tujhako
Saayaa Bhi Teraa Naa Main Doon
আরশের একহাত তার ঘাড় চেপে ধরে রেখেছে। অন্যহাত মুখের একপাশে। ধীরে ধীরে ঠোঁটের তীব্রতা কমে আসলো নুসরাতের উপর থেকে। আরশ ঝুঁকে গেল নিচের দিকে। কংক্রিটের রাস্তায় হাঁটু গেড়ে বসল। বিড়বিড় করে নুসরাতের কাছে ক্ষমা চাইল,”আ’ম স্যরি, আ’’ম স্যরি! পারিস তো মাফ করে দিস আমাকে।
নুসরাত দাঁড়িয়ে রইল শক্ত ভঙ্গিতে। গলায় দলা পাকানো কান্নার জন্য ভাঙা ভাঙা স্বর ভেসে এলো,” আপনাকে ক্ষমা করা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আপনি আমার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলেছেন।
কথাটা শেষে ঝুঁকল নুসরাত। অবেহেলায় পড়ে থাকা ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে উঠল। চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, হলো না। হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের দিকে। বুট পরা একজোড়া পা ভাসল চোখের সামনে। তাকে চেপে ধরার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াতেই দূরে সরে গেল সে। চোখের পাতা ঝাপসা হয়ে আসলো, তবুও দূরে সরে যেতে যেতে আওড়াল,” স্পর্শ করবেন না আমাকে। দূরে থাকুন..!
নাহিয়ান জ্বলে উঠল যেন। বলল,” আমি স্পর্শ করলেই সমস্যা?

“হ্যাঁ, সমস্যা। একবার কোনো বিষয়ে আমি না করলে তা শুনবেন, একদম আমার কাছ ঘেঁষবেন না, পূর্ব।
কথা শেষ হওয়ার আগেই মাথা ঘুরে উঠল নুসরাতের ২য় বারের মতো। নাহিয়ান কাছ ঘেঁষতে নিলেই দু-হাত উপরে তুলে দূরে সরিয়ে নিল নিজেকে সে। ল্যাম্পপোস্ট চেপে ধরে নিজেকে ক্যারি করল,”স্পর্শ করবেন না, আমায়৷
নাহিয়ান দূরে সরে গেল। নুসরাতের অবস্থা খারাপ হতে দেখে বলল,”আমি আপনাকে পৌঁছে দেই বাড়িতে৷ প্লিজ এ বিষয়ে না করবেন না। প্রমিস, স্পর্শ করব না আর।
নুসরাত মেনে নিল৷ ব্যাগ থেকে গাড়ির চাবি বের করে নাহিয়ানের দিকে এগিয়ে দিল। তখনো একপাশে নির্জীব বসে আছে আরশ। নড়চড় নেই! যেন কোনো যন্ত্রমানব সে। নিষ্পলক কংক্রিটের রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ। গাড়ির হেডলাইটের আলো এসে পড়ল চোখ-মুখে। হিলবুট পরা এক জোড়া পা দেখা গেল নিজস্ব ভঙ্গিতে হেঁটে ফ্রন্ট সিটে বসছে। অতঃপর তার পাশ কাটিয়ে শো করে গাড়িটা চলে গেল।
বৃষ্টি আর কমল না পুরোদমে বাড়ল । চুপচাপ এক জায়গায় পা ছড়িয়ে ভিজতে থাকল আরশ৷ লিপি বেগম বলেছিলেন, আল্লাহ খুশি হলে বৃষ্টি দেন।৷ বৃষ্টির সময় যে দোয়া করা হয় তা কবুল হয় আল্লাহর দরবারে। ওই বৃষ্টির দিন রাতে আরশ খুব করে চাইল নুসরাতকে।। নিজের ভেঙে পড়া হৃদয়ের প্রতিটা স্পন্দনের সাথে করে চাইল ওকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।..!

গাড়িতে গ্লাসগুলো আটকানো। চারিদিকে বৃষ্টির পানি পড়ছে। গাড়িতে বসে জানালার দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে নুসরাত। হাত দিয়ে আঁকিবুঁকি করছে গ্লাসের মধ্যে। নাহিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল। মন স্থির করল ড্রাইভিং এ। নুসরাত জানালার দিকে ধ্যান রেখে নাহিয়ানের নাম ধরে ডাকল,”পূর্ব..
নাহিয়ান আনমনে উত্তর দিল,”হু..!
নুসরাত ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল গাড়ি চালানোতে ব্যস্ত লোকটাকে। অতঃপর আবার বাহিরের দিকে চোখ স্থির করে জানতে চাইল,”আপনি জানেন পূর্ব, বৃষ্টির সময় যে দোয়া করা হয়, তা কবুল করা হয় আল্লাহর দরবারে?
নাহিয়ান হাসল। যেন হেসে উড়াল কথাটা। বলল,”আমি কখনো এমন কথা শুনিনি।
নুসরাত নিজের বোকামিতে মাথা দোলাল। বলল,”আপনি জানবেন কীভাবে, বেশি তো রিসার্চ করেননি এখনো ধর্ম নিয়ে!
তারপর সে চুপ হয়ে গেল।।নাহিয়ান নুসরাতের উদাস মুখটা দেখে নিজেরও বুক ভার হলো। দোয়া করলে যদি নুসরাত খুশি হয় তাহলে সে দোয়া করবে,এই ভাবনা নিয়ে গাড়ি একপাশে সাইড করল। দো-হাত উপরে তুলে দোয়া করল কিছু একটা৷ দোয়া শেষে আবারো গাড়ি চালাতে ব্যস্ত হয়ে গেল। নুসরাত জানতে চাইল আগ্রহ ভরা কন্ঠে,”দোয়াতে কী চেয়েছেন, পূর্ব?
নাহিয়ান হাত হুইলে স্থির রেখে নুসরাতের দিকে তাকাল। কন্ঠে আদুরে ভাব এনে, ছোট্ট করে জবাব দিল,”আপনাকে।

সকাল সাড়ে দশটা। সৈয়দ বাড়ির খাবার রুমে এক সারিতে সবাই বসে আছে। আরশ কী যেন বলবে বলেছে এর জন্য জরুরী তলোব দিয়েছে। শোহেব সাহেব একটু চিন্তিত বটেই। স্পষ্ট গাঢ় দু তিনটে ভাঁজ কপালে ফুটে উঠেছে। গতকাল রাতে নুসরাতকে বাড়িতে প্রবেশ করতে দেখেছিলেন। হয়তো কাঁদছিল! চোখ দুটো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পরিস্কার করছিল। উনি এগিয়ে গিয়ে যখন জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে! উত্তর দিল নাকি সুরে একটু মাথা ব্যথা করছে। কিন্তু উনার মনো হলো না মাথা ব্যথার জন্য এমন অবস্থা, কোনো কিছু হয়েছে যা চেপে গিয়েছে। ছোট থেকে বড় হয়েছে মেয়েটা চোখের সামনে, হঠাৎ এমন কান্না করছে তা দেখেই তো কষ্ট হচ্ছে। এক কথার বিপরীতে যে হাজারটা কথা বলত আজ সে একটা উত্তর দিচ্ছে। দেখা হলে যে জিজ্ঞেস কর‍ত পায়ের ব্যথা কমেছে, গতকাল সে কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞেস করল না। এমনকি লাইট জ্বালাতে চেয়েছিলেন তিনি, তা ও জ্বালাতে দেয়নি চোখের সমস্যা বেড়েছে বলে।

সৈয়দ বাড়ির ছোট থেকে বড় বেশিরভাগ সবারই চোখে সমস্যা। সমস্যার শুরুটা হয়েছে নাছির সাহেবের থেকে, আর এখন সবার যেন এউ চোখের রোগটা হচ্ছে। যাকেই জিজ্ঞেস করা হয় তার নাকি চোখে সমস্যা, মাথা ব্যথা করে সবসময়। স্বাভাবিকের তুলনায় নুসরাতের চোখের সমস্যাটা বেশি, তার মধ্যে চোখে আবার মেয়েটার এলার্জি। যখন বৃদ্ধি পায় চোখ ফুলে গিয়ে আলুর মতো হয়ে যায়। চোখে আলো পড়লে সমস্যা হবে ভেবেই আর লাইট জ্বালাননি তিনি। কিন্তু এর এক ঘন্টা পর আরশকে বাড়িতে আসতে দেখেছেন। নুসরাতের তুলনায় অবস্থা আরো বেশি খারাপ। সর্দি লেগে যা তা অবস্থা হয়ে আছে। হাচ্চি দিতে দিতে নিজের রুমে গিয়েছে। চোখ দুটো জ্বরের জন্য লাল হয়ে আছে মোটামুটি। দু-জনের অবস্থা দেখে ঠাহর করলেন কোনো আকাম ঘটিয়েছে একে অপরের সাথে। এখন দেখার পালা কী ঘটিয়েছে!
এর মধ্যে আরশ এসে বসল চেয়ার টেনে। আজ দেরিতে নাস্তা করা হচ্ছে আরশের জন্য। গায়ে ক্যালভিন ক্লাইন এর একটা হুডি, আর শী-ইন এর ডেনিম প্যান্ট৷ নিজের প্লেট টেনে নিল সামনে। কয়েকদিন যাবত ডায়েটে থাকার জন্য লিপি বেগম তার জন্য ফ্রুটস সালাদ্ করেছেন। ফর্ক দিয়ে কাটা আপেলের টুকরো মুখে দিতে দিতে বলে ওঠল,”নুসরাত আমাকে ডিভোর্স দিতে চাচ্ছে, আই মিন তালাক চাচ্ছে আমার কাছে।
সোহেদ সাহেবের খাওয়ারত হাত থামল। হেলাল সাহেব নিজেও থামলেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য। বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”কী বললে? আবার বলো?

আরশ আগের মতোই নির্লিপ্ত। মাথা ঝোঁকানো প্লেটের দিকে৷ ঠোঁট টিপে আগের মতোই করে বলল,”ডিভোর্স চাচ্ছে।
হাত গোটালেন খাবার খাওয়া থামিয়ে। কন্ঠে তখনো অবাকতা রয়েছে,”তুমি তালাক দিতে রাজী হয়েছ?
আরশ মুখে আরেকটুকরো নাসপাতি ঢোকাল। বলল,”জ্বি..!
হেলাল সাহেব যেন কথা শোনেননি। অত্যাশ্চার্য কন্ঠস্বর উনার,”সত্ত্যিই..?
আরশ বাবার দিকে সরাসরি তাকিয়ে আগের মতো নির্বিকার স্বরে বলল,”আমি মিথ্যা কথা বলি না, পাপা। আর তালাকের মতো সেনসেটিভ বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলব আপনার মনে হয়।
রুহিনী বেগম, ঝর্ণা বেগম, লিপি বেগম নীরব ভূমিকা পালন করছেন। শোহেব সাহেব তাকালেন আরশের দিকে। জিজ্ঞেস করলেন,”তাহলে তুমি তালাক দিচ্ছো নুসরাতকে?
আরশ হেসে উড়িয়ে দিল কথাটা। বলল,”পাগল নাকি? কোন দুঃখে দিব?
হেলাল সাহেব খ্যাক করে উঠলেন,”তাহলে এই যে বললে তালাক দিবে বলে রাজী হয়ে এসেছ?
“বাচ্চা মানুষকে বোঝ দিয়ে এসেছি। লিখিত তালাক নিবে কীভাবে রেজিস্ট্রি পেপার আছে নাকি?
আরশ কথা শেষে একটু হাসল। বিগলিত কন্ঠে বলে ওঠল,” সৈয়দ আজমল আলী আর যাই করুন জীবনে, আমাদের রেজিস্ট্রি পেপার না করে দারুণ একটা কাজ করেছেন।
আরশের হাস্যরত মুখ দেখলেন চেয়ারে বসা সবাই। ইসরাত ঠোঁট টিপল। বলল,”আগেই দুঃখিত বড়দের ভেতর কথা বলছি, ভাইয়া…

আরশের দৃষ্টি আকর্ষণ করল ডেকে। জায়িন তাকিয়ে আছে তার দিকে বুঝতে পেরেও ফিরে তাকাল না তার দিকে। একটু সময় নিল, অতঃপর বলল,”আপনাদের রেজিস্ট্রি পেপার আছে।
আরশ শক্ত চোখে তাকাল। চোয়ালের পেশি ও সাথে শক্ত হলো। কন্ঠ রুঢ় তার। হিসহিসিয়ে বলল,”নেই, ইসরাত..!
ইসরাত নিজের কথায় অটল রইল। চোখেচোখ রেখে বলল,”আমি বলছি, রেজিস্ট্রি পেপার আছে ভাইয়া।
আরশ ঠোঁট বাঁকিয়ে শ্বাস ফেলল। বলল,”ইসরাত, আমি বিরক্ত হচ্ছি। যখন বলেছি নেই তখন কেন তুমি বারবার বলছো আছে?
হেলাল সাহেব ইসরাতের কথার সাথে জোর দিলেন। বললেন,”আরশ, রেজিস্ট্রি পেপার আছে। এবং সরকারি ভাবে সেটা অনুমোদন হয়েছে নয় মাস পূর্বে।
আরশ অবাক হয়ে তাকাল হেলাল সাহেবের দিকে। তারপর ইসরাতের দিকে। বলল,”বাহ্, আমার রেজিস্ট্রি হয়ে গেছে আর আমি জানি না! সাইন কোথায় পেলেন আপনারা আমার?
হেলাল সাহের কাঁধ ঝাঁকালেন। আগের মতোই নির্লিপ্ত থেকে বললেন,”তুমি নিজেই তো করেছ। মনে করো, একবার কিছু ডকুমেন্টস সাইন করিয়েছিলাম তোমাকে দিয়ে, তোমাকে বলেছিলাম পড়ে নিতে, তুমি পড়লে-ই না। না পড়ে সাইন করে দিলে।

আরশ তাচ্ছিল্য করে হেসে দিল,”রেজিস্ট্রি পেপার রেজিস্ট্রার অফিসে কে জমা দিয়েছে?
ছেলের দিকে চোখ রেখে আগের মতোই ভদ্রলোক বললেন,”ইরহাম জমা দিয়েছে।
আরশ উঠে দাঁড়াল। চোয়াল শক্ত! রাগে ভেতরটা দপদপ করছে। জিজ্ঞেস করল,”কে কে জানত আপনাদের মধ্যে আমাদের রেজিস্ট্রি হয়েছে?
ইসরাত উত্তর দিল এই কথার,”আমি, নুসরাত, ইরহাম, আর বড় আব্বু..!
আরশ বিস্ময়ে বিমূঢ় নেত্র নিয়ে তাকিয়ে থাকল ইসরাতের দিকে। বেঘোরে বিড়বিড় করল,”নুসরাত ও জানত?
ইসরাত মাথা দোলাল। বলল,”ও সাইন করার সময় আমার সামনে বসে করেছিল।
আরশ শ্লেষ মিশ্রিত হাসল। কটাক্ষ করল সবাইকে নিয়ে,”তাহলে আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল বিয়ে ভাঙার, এজন্য এতো আয়োজন করে আমাকে দেশে আনা হয়েছে। ইম্প্রেসিভ..! নাইস ভেরি নাইস! আমি আনন্দে আত্মহারা, কথা হারিয়ে ফেলছি, এত দারুণ সারপ্রাইজ পেয়ে।

আরশ থামল। হাতের মধ্যে দলা পাকিয়েছে টেবিলের উপর রাখা সৌন্দর্য বর্দক নরম, তুলতুলে টেবিল ক্লথ। বাঁ-হাতে নিজের ঘাড়ে হাত বোলাল। ঘাড় বাঁকাল বাবার দিকে। চোখ দুটো ঘুরিয়ে হেলাল সাহেবকে দেখল। ঠোঁটের কোণ উচাল কটাক্ষ করে,”আমি এক বোকা যে ভাবছিলাম রাগের মাথায় বলেছে ডিভোর্সের কথা। কিন্তু এত আয়োজন করে রেখেছেন চাচা ভাতিজি মিলে তা তো বুঝিনি। স্পিচলেস হয়ে গিয়েছি আমি। দু-হাজার পঁচিশ সালে আমি বেস্ট একটা সারপ্রাইজ পেয়েছি। যখন আমার তালাকের জন্য এত আয়োজন, তাহলে আরেকটু আয়োজন করে না হয় তালাক দিলাম, সমস্যা নেই! কোর্ট থেকে ডেট নিয়ে আসবেন, কোথায় সাইন করতে হবে বলে দিবেন, সাইন করে দিব! আমি তো খেলনার পুতুল, যে যেভাবে পারছেন নাচাচ্ছেন, এবার ও নাচিয়ে নিতে দিলাম।
আরশ থামল। শ্বাস নিল টেনে। বলল,”ওহ হ্যাঁ, আপনার ভাতিজি নুসরাতকে বলবেন এসে এই বাড়িতে আমার সামনে বসে সাইন করতে। আমি ও দেখব কতটা সাহস ওর, আমার সামনে বসে সিগনেচার করে কীভাবে ও?
হাতের দলা পাঁকানো টেবিল ক্লথ টেনে ধরল শক্ত করে। কথা শেষ করেই পিছু ঘুরল। প্লেটে খাবার পড়ে আছে ওভাবেই। যেতে যেতে হাতে মুষ্টি পাঁকানো টেবিল ক্লথ ধরে এমনভাবে টান দিল পুরো খাবার টেবিলের চামচ, প্লেট, পিরিচ, বাটি উলটে খাঁজ কাটা টাইলসের মেঝেতে পড়ল ঝনঝন করে। শব্দ তুলে ধড়াম ধড়াম করে ভাঙল সবকিছু। রুহিনী বেগম ভয়ে এক লাফে ছিটকে সরে গেলেন দূরে। শোহেব সাহেবের উপর গরম গরম গোস্তের তরকারি এসে পড়েছে। ছিটকে গিয়ে মশলা লাগল ঝর্ণা বেগমের গায়ে। আরশ যেতে যেতে এমন কান্ড ঘটাবে কেউই টের পায়নি। তাদের মধ্যে বেঁচে গিয়েছে জায়িন আর ইসরাত। স্বামী স্ত্রী বিপদ দেখেই দু-জনেই আগেভাগেই তল্লি-ত্রপা গুটিয়ে সরেছে।

রাতের আলো নিভে গিয়ে দিনের আলো ফুটেছে অনেক পূর্বে। রাতের বেলা এসেই বিছানায় কাঁতা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছিল নুসরাত। ঘন্টাখানেক বৃষ্টিতে ভিজার জন্য, আবার আধঘন্টা ভিজে কাপড়ে থাকার জন্য, শরীরে গা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছে। তবুও কী বলার জন্য সকাল এগোরোটায় বাড়িতে থাকা সবাইকে বলেছে ড্রয়িং রুমে থাকার জন্য। ও বাড়িতে আবার সাড়ে দশটা আরশ বলেছে কিছু একটা বলবে। দু-পক্ষের সবাই টেনশনে আছে কী হবে! ঘড়ির কাটা দশটা পেরিয়ে এগোরোটায় ঠেকতেই সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসলো নুসরাত। জ্বরের জন্য একদিনে মুখ এইটুকুনি হয়ে আসছে। ঠোঁট ফেটে গেছে। চোখের নিচে দাগ পড়েছে। ঘুমহীনা চোখগুলো লাল হয়ে কোটর ছেড়ে যেন বের হয়ে আসবে। গায়ে ক্যালভিন ক্লাইন এর একটা টি-শার্ট। মাথার উপর মোটা কম্বল। পা খালি। ঠান্ডা মেঝেতে আঙুলে ভর দিয়ে গোড়ালি উঁচু করে হাঁটছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে ধড়াম করে বসল সোফায়। গলা ছেড়ে ডাকল,”আব্বা..!
নাছির সাহেব রেডি হয়ে আছেন অফিস যাওয়ার জন্য। নুসরাতের জরুরী আলোচনার জন্য এখনো যাওয়া হয়নি অফিসে। ফর্মাল গেট-আপে নেমে আসলেন। নাজমিন বেগমের কথায় মুখে দাড়ি রাখতে শুরু করেছেন। তা লম্বা হয়েছে কিছুটা। মাথার চুলে পাক ধরেনি একদম। শুধু দাড়িগুলোতে দেখা যাচ্ছে পাক ধরেছে মোটামুটি। নুসরাত তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল বাবার নেমে আসা। একে একে এসে বসল বাড়ির সবাই সোফায়। সৌরভি নিজেও যোগ দিয়েছে আলোচনায়। গতকাল থেকে তার ব্যবহারের অদ্ভুত পরিবর্তন হয়েছে। সবাই মোটামুটি অবাক, তবুও মানিয়ে নিচ্ছে ভেবে খুশি ভেতরে ভেতরে। নুসরাত গলা খাঁকারি দিল। নাছির সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,”এত জরুরী আলাপ কেন ডেকেছো? ইম্পর্ট্যান্ট কিছু?

নুসরাত বাবার কথা শোনে তাকাল মায়ের দিকে। ভদ্রমহিলা চিন্তিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ভাবছেন এখনো কী এমন ইম্পর্ট্যান্ট কথা যে এভাবে সবাইকে ডেকে এনে বলছে। নুসরাত সময় নিল। ঢোক গিলে বলল,”হ্যাঁ, গুরুত্বপূর্ণ কিছু। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
ইরহাম এতক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেও এবার জিজ্ঞেস করল,”কী সিদ্ধান্ত?
নুসরাত মায়ের থেকে দূরত্ব বাড়াল। ইরহামকে চোখের ইশারায় কিছু বোঝাল। কন্ঠ শান্ত করে একটানা বলে চলল,”আমি তালাক নিচ্ছি আরশ ভাইয়ের কাছ থেকে।
নাজমিন বেগম কথা বিশ্বাসই করলেন না, হেসে উড়িয়ে দিলেন। বললেন,”দূর, এসব কেমন কথা..! সবাইকে ডেকে এনে মজা করছিস?
নুসরাত হাসল না মায়ের কথায় আগের মতো। গম্ভীর মুখটা আগের মতো গম্ভীর রেখে বলে ওঠল,”আমি মজা করছি না, মা। আমি ডিভোর্স নিচ্ছি।
নাজমিন বেগম হাসলেন নুসরাতের কথায়। বললেন,”অফিসিয়াল ডিভোর্স তোদের হবে না।
নুসরাত ঠোঁট টিপল, হাসল সামান্য। বলল,”হবে আম্মা, হবে। বড় আব্বু আমার সিগনেচার অনেক আগেই রেজিস্ট্রি পেপারে নিয়েছিলেন।

নাজমিন বেগম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”কবে?
নুসরাত তপ্ত শ্বাস ফেলল। বলল,”জানুয়ারিতে।
“তুই কীভাবে জানুয়ারিতে সিগনেচার করলি রেজিস্ট্রি পেপারে, আর উনিই বা পেল কীভাবে তোকে?
নুসরাত হাসল এবারো। বলল,” ইরহামের হাতে করে পাঠিয়েছিল।
নাজমিন বেগম ইরহামের দিকে তাকালেন সত্যি বলছে নাকি মিথ্যা জানার জন্য, ইরহাম মাথা দুলিয়ে কথার সত্যতা জানাল। অতঃপর আবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে, ভীষণ আশা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“আর আরশের সিগনেচার?
যেন আরশের সিগনেচার না থাকলেই বাঁচেন। কিন্তু উনার সেই খুশিতে এক বালতি জল ঢেলে নুসরাত উত্তর দিল প্রশ্নের,”আগে থেকেই সাইন করা ছিল।
নাছির সাহেব এখনো চুপচাপ তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে, একটা বাক্য ব্যয় করেননি তখন থেকে৷ বিষয়টা যেন তিনি বুঝতে পারেননি ঠিক। বিড়বিড় করলেন,”তুমি ডিভোর্স নিবে? এত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে আর আমাদের সাথে একটাও আলোচনা করলে না?

নুসরাত বাবার দিকে তাকাল। বলল,”এখানে আলোচনা করার মতো কিছু নেই আব্বা।
নাছির সাহেব চোখ তুলে তাকালেন এমনভাবে, তাকাতেই নুসরাতের সমগ্র হৃদয় কেঁপে উঠল। নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল, সে কী কোনোভাবে কষ্ট দিয়ে ফেলেছে লোকটাকে! নাছির সাহেব চোখ সরালেন না, থমকে গিয়ে গা ছমছম করা চাহনি দিয়ে চেয়ে রইলেন অনেকক্ষণ যতক্ষণ না তিনি ক্লান্ত হলেন। অতঃপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,”যা ইচ্ছে করো! তখন বাবার কথা রাখতে গিয়ে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম আর এখনো পস্তাচ্ছি। যা করবে বোঝে শোনে করবে নুসরাত, আমি তোমাকে ভেঙে যেতে দেখতে পারব না। আমি তোমার সাথে আছি। মনে রাখবে, বাবা সবসময় তোমার সকল সিদ্ধান্তের পাশে আছে। তোমার হাত আমি কখনো ছাড়ব না।
নুসরাত ঠোঁট টিপল। চোখ তুলে তাকাল বাবার দিকে। চোখচোখি হলো! দু-জনেই তাকিয়ে রইল দু-জনের দিকে । নাজমিন বেগম চ্যাঁচালেন,”তোর কাছে বিয়ে ছেলেখেলা মনে হয়, বললি আর ছেড়ে দিলি? আমাদের কারোর মতামত নিবি না তুই? আর আরশ মানল কীভাবে? ও কীভাবে তোর বাচ্চামোতে সায় দেয়?
নুসরাত মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। নাজমিন বেগম অতিরিক্ত ক্রোধ আর রাগে চৈতন্য যেন হারিয়ে ফেললেন। ঠাস করে বসালেন মেয়ের গালে একটা চড়। নুসরাত নড়ল না, চড়ল না, ওইরকম বসে রইল। ঠোঁট ফুলিয়ে হাসল। জিজ্ঞেস করল,”আরেকটা মারবে? মারো!

বলে গাল পাতিয়ে দিল। নাজমিন বেগম মারলেন না, অশ্রুসিক্ত চোখে চেয়ে রইলেন তার দিকে। নুসরাত থুতনি ঠেকাল মায়ের কোলে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল হলো না। এক পশলা বৃষ্টির ন্যায় তা ঝড়ে পড়ল গাল বেয়ে। মাথা এলিয়ে দিল কোলে। বিড়বিড় করল পাগলের ন্যায়,”আমি ভালো নেই আম্মা, আমি ভালো নেই। আমার দম আটকে আসছে, এই সম্পর্ক বয়ে বেড়ানো আমার দ্বারা আর সম্ভব না।
নাজমিন বেগম কথা বলার ভাষা খুঁযে পেলেন না। কাঁপা একটা হাত রাখলেন মেয়ের মাথায়। নাছির সাহেব তখনো স্থির দাঁড়িয়ে দেখছেন স্ত্রীও মেয়ের কান্ড। ইরহাম তড়িৎ উঠে দাঁড়াল। থাই গ্লাস লাগিয়ে দিল শক্ত হাতে। এর মধ্যে এ বাড়িতে প্রবেশ ঘটল জায়িন ইসরাতের। ইরহামকে এমন হন্তদন্ত হয়ে জানালা লাগাতে দেখে ইসরাত ভ্রু কুঁচকাল। জিজ্ঞেস করল,”কী হয়েছে?
ইরহাম ইশারায় দেখাল নুসরাতকে। মিহি কন্ঠে বলল,”কাঁদছে!
ইসরাত আঁতকে উঠল যেন। বলল,”আগে বলবি না, গাধা একটা।
জায়িন, ইসরাত আর ইরহামের কথোপকথন শোনে এগোতে চাইল কিন্তু তাকে ঠেলে বাড়ির বাহিরে বের করে দিল ইসরাত। সে আশ্চর্য হওয়ার সময়টুকু পেল না, মুখের উপর দরজা আটকাতে আটকাতে মেয়েটা বলল,”যা দেখেছেন ভুলে যান।

জায়িন ভ্রু কুঁচকাল। শক্ত কন্ঠে জানতে চাইল,”কেন ভুলে যাব?
ইসরাত রাগী মুখ বানাল। নাকের পাটাতন চূড়ায় তুলে বলল,”আমি বলেছি তাই।
জায়িন পকেটে হাত পুরল। বলল,”আমি মসজিদের মাইকে গিয়ে বলে আসব আপনার বোন কাঁদছে।
ইসরাত তেড়ে আসলো দরজা ছেড়ে। বলল,”আপনার সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি, আপনি ঘরের খবর বাহিরে দেওয়ার স্পর্ধা দেখান কীভাবে, জায়িন?
জায়িন নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে রইল। গাম্ভীর্যের সহিত বলল,”আমার সাথে বেয়াদবি করছেন কেন আপনি?
আমি সামান্যই তো দেখতাম। বেচারি, আরশকে ছেড়ে দেওয়া দুঃখে কীভাবে কাঁদছে?
ইসরাতের ইচ্ছে হলো জায়িনকে মাটিতে ফেলে কয়েকটা লাথি বসিয়ে দিতে, কিন্তু সে এটা পারবে না, তাই কোনোরকমে রাগ গিলে নিল ভেতরে। হাসার চেষ্টা করে বলল,”জায়িন, এই বাড়িতে যা দেখেছেন ও বাড়ি যেতে যেতে সব ভুলে যাবেন। প্লিইইজ..!
জায়িন গাল টেনে দিল ইসরাতের। বলল,”এভাবে কিউটি পায় হয়ে বললেই তো আমি মেনে যেতাম। এতক্ষণ কষ্ট করলেন ইসরাত।
কথা শেষে শক্ত করে গালে চিমটি কাটল জায়িন। অতঃপর হেলেদুলে চলে গেল সামনে।

কাবার্ডের ভেতর পা গুটিয়ে বসে আছে আহান। তাকে আলোচনায় নেওয়া হচ্ছে না, এজন্য সে এখানে এসে ঠাঁই নিয়েছে। শুনতে চাচ্ছে নুসরাত কি বলে! কান দুটো খাঁড়া করে খরগোশের মতো কাবার্ডের দরজায় কান লাগিয়ে বসে আছে। কথা শোনার জন্য।
ইসরাত নাখোশ মুখে নুসরাতের সামনে বসে আছে, তার পাশে আবার ইরহাম বসে। চোখ মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে ভীষণ খেপেছে দু-জন। নুসরাত ভাবাবেগ হীন বসে আছে তাদের সম্মুখে। চুপচাপ! ঘোৎ ঘোৎ করে উঠেই ইসরাত প্রশ্ন করল প্রথমেই,”ডিভোর্স যখন দিবি কাঁদছিলি কেন?
নুসরাত আকাশ থেকে পড়ল যেন। সেকেন্ডের ভেতর অস্বীকার আসলো,”আমি কেঁদেছি? আশ্চর্য, কখন?
ইরহামের দু-হাতে গলা টিপে ধরতে ইচ্ছে হলো নুসরাতের। বলল,”নাটক কমিয়ে করবি। আর মিথ্যা তো একদম বলবি না।
“আমি মিথ্যা বলি না ইরহাম!
ইরহাম ঠাট্টা করল নুসরাতকে,” তা তো জানি খুব ভালো করেই। কতটা সত্যবাদী আপনে!
ইরহামকে থামিয়ে দিল ইসরাত। বলল,”আমরা পয়েন্ট রেখে অন্যদিকে চলে যাচ্ছি।৷
ইসরাত তাকাল নুসরাতের দিকে। জিজ্ঞেস করল কঠোর গলায়,’”তুই ভালোবাসিস আরশকে?
নুসরাত ঘোরাতে গেল কথা, ইসরাত ধমকে উঠল,”একদম কথা ঘোরাবি না। এক থাপ্পড়ে দাঁতের মাড়ি থেকে দাঁত ফেলে দিব।
নুসরাত আর কথা ঘোরাল না। স্পষ্ট কন্ঠে বলে ওঠল,”আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী না, ইসরাত।

“ঠিক আছে ভালোবাসিস না, পছন্দ করিস তো? নাকি তা ও করিস না?
নুসরাত রুঢ় গলায় ইসরাতের ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্নের উত্তর দিল,”তা ও করিনা। আমি ঘৃণা করি আরশ ভাইকে।
ইরহাম আর ইসরাত হাত তালি দিল। কটাক্ষ মিশ্রিত কন্ঠে বলল,”ভদ্রমহিলার জন্য হাত তালি দেয় তো ইরহাম।
ইরহাম হাত তালি দিল। দু-জনে খ্যাক খ্যাক করে হাসল। ইরহাম শিওরিটি নিতে জিজ্ঞেস করল,”তুই শিওর তো তালাক নিবি? পরে কিন্তু আর কোনো রাস্তা থাকবে না ফিরে আসার?
“আমি ফিরে আসার চেষ্টা ও করব না। আমি যে দিক থেকে একবার মুখ ফিরিয়ে নিই, সেই পথে নিজের ছায়া ও ফেলি না।
ইসরাত বলল,”ভালো! মনে থাকে যেন। নিজের সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে যাতে পস্তাতে না হয়।
নুসরাত কঠোর কন্ঠে বলল,”আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে তা নিয়ে কখনো পস্তাই না, ভবিষ্যতে ও পস্তাব না।
ইরহাম বিড়বিড় করল,”দুটোই খবিস! ভাঙবে তবুও মচকাবে না।

ইসরাত জোর দিল নিজের কথায়। অবিচল চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে, তুঙ্গে উঠা কন্ঠে বলল,”আমি ভেবে পাই না দাদা তোদের বিয়ে দিল কোন কারণে। তুই জানিস নুসরাত, তুই আর আরশ ভাইয়া, দু-জনেই একই প্রকৃতির। বিন্দুমাত্র ব্যবধান নেই তোদের আচার আচরণে।
আহান কাবার্ডের ভেতর থেকে ইসরাতের কথার জের ধরে মুখ ফসকে বলে ফেলল,”দু-জনেই রেড ফ্ল্যাগ, টক্সিক। কেউর থেকে কেউ কম না। উনি পুরুষ ভার্সন হলে মহিলা ভার্সন আপু।
ইসরাত খেয়াল করল না কে কথা বলেছে, সহমত পোষণ করার মতো কথা মনে হলো তাই করল ও। ইরহাম তাল মিলাল। বলল,”চাচাতো ভাই বোন বোঝা যায় কম, মায়ের পেটের ভাই বোন বোঝা যায় বেশি। আল্লাহ জোড়া মিলিয়ে দেন, এদের দেখলেই বোঝা যায়। ত্যাড়া পুরুষের জন্য ত্যাড়া মহিলা আল্লাহ বানান। খাপে খাপ, আব্বাসের বাপ দু-জনেই ।

আহান উত্তেজনায় কাবার্ডের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলো। ভুলে বসল সে লুকিয়ে কথা শুনছিল।বলল,”কুরআনে সূরা আন-নূর লিখা আছে আল-খাবিসাতু লিল-খাবিসিনা ওয়াল খাবিসুনা লিল-খাবিসাত। দুশ্চরিত্র পুরুষের জন্য দুশ্চরিত্র নারী, স্বঃচরিত্র নারীর জন্য স্বঃচরিত্র পুরুষ..
আহানের কথা শেষ হতে পারল না বাজিয়ে একটা গালে থাপ্পড় পড়ল তার। থাপ্পড়টা নুসরাত মারেনি মেরেছে ইসরাত। প্রথমবারের মতো ইসরাতের হাতে থাপ্পড় খেয়ে আপনা আপনি গালে হাত চলে গেল। কানে আসলো অত্যাধিক ক্রোধ মিশ্রিত বড় বোনের স্বর,”তোকে নিষেধ করেছিলাম না, আমাদের আলোচনায় না আসতে তাহলে কাবার্ডের ভেতর লুকিয়েছিস কেন? বেয়াদব..!
আহান কথার উত্তর দিবে কী, থাপ্পড় খেয়ে ভুলে বসল এখানে লুকিয়ে কী কী শুনেছে সে। নুসরাত তখনো নির্লিপ্ত তাকিয়ে তার দিকে। আহানের ভীষণ কান্না পেল। একহাতে গাল চেপে ধরল। ঠোঁট টিপে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল হলো না, উল্টে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল সে। চোখ দিয়ে অশ্রু পড়ল টপটপ করে। মিনমিন করে বলল,”ব্যথা লেগেছে? মানুষের হাত নাকি পশুর?
শেষ হলো কথাটা, তাকে অত্যাশ্চর্য করে দিয়ে ইসরাত আরো দুটো থাপ্পড় বসাল চটাস চটাস করে। কঠোর চেহারা বানিয়ে বলল,”অসভ্য! বইদমাশ ছেলে।

০৪-০৯-২০২৫
মঙ্গলবার
… সকাল দশটা কুঁড়ি মিনিট।
সৈয়দ বাড়ির ড্রয়িং রুমে পাশাপাশি বসে আছে আরশ নুসরাত। আসার পর থেকেই দু-জন দু-জনের চেহারা দেখেনি সরাসরি। চুপচাপ ড্রয়িং রুমে মুখ গম্ভীর করে বসে আছে তারা। সেন্টার টেবিলে ডিভোর্স পেপার লেখা একটা কাগজ রাখা। শোহেব সাহেব দশমিনিট পূর্বেই এনে রেখেছেন। নাজমিন বেগম আসেননি। শুধু নাছির সাহেব এসেছেন। ইরহাম ভ্রু উপরে তুলে বাবার কাছে কিছু একটা ইশারায় জানতে চাইল, ভদ্রলোক চোখের পাতা ফেলে শান্ত থাকতে বললেন। কিন্তু বেচারা শান্ত হতে পারল না। সেন্টার টেবিলে রাখা কাগজটায় ইংরেজি অক্ষরে কিছু লিখা শব্দ। আরশ নুসরাত পড়ার প্রয়োজন বোধ করল না। কী লিখা আছে তা ও দেখার প্রয়োজন বোধ করল না। নুসরাতের দিকে পেপার ঠেলে দিয়ে বলল,”সাইন কর..!

নুসরাত সাইন না করে আরশের দিকে কলম আর পেপার এগিয়ে দিল। বলল,”আপনি আগে করুন।
নুসরাতের দিকে এক পলক তাকিয়ে কলম হাতে তুলে নিল। চটপট হাতে সাইন করে দিল নিজের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গা। তারপর নুসরাতের দিকে ঠেলে দিল। কন্ঠ গম্ভীর তার,”কর সাইন এবার। আমি করে দিয়েছি।
নুসরাত কলম চেপে ধরল নিজের দু-আঙুলের ভেতর। হাত আগাতেই থরথর করে কেঁপে উঠল। কলম হাত ফসকে পড়ে গেল। হাত থেকে পড়ে যাওয়া কলম সেন্টার টেবিল থেকে নির্বিকার চিত্তে তুলে দিল সে। নুসরাতের হাতের মুঠোয় ভরে দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,”হু, সাইন কর!
নুসরাত নিজের নাম লিখল খালি জায়গাটায়। অতঃপর তা গছিয়ে দেওয়া হলো ইরহামের কাছে সিলেট কর্পোরেশনে জমা দিয়ে আসার জন্য। নুসরাত তাকাল না উপরের দিকে। সেন্টার টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল নিষ্পৃহ ভঙ্গিতে। হাত তখনো কাঁপছে। আরশ উঠে দাঁড়াল। ভীষণ অনিহা নিয়ে ক্ষমা চাইল নুসরাতের কাছে,”পারিস তো ক্ষমা করে দিস, আর সুখে থাকিস।

হাসল সামান্য। বলল,”ভুলে গেছিলাম, আমি না থাকলে তো তুই সুখেই থাকবি। সুখ আর সুখ থাকবে চারিদিকে।
কথা শেষে দাঁড়াল না। নুসরাতকে অমন বিমূর্ত বসা রেখেই চলে গেল সিঁড়ি ভেঙে ধুপধাপ। মাহাদি নিজেও আরশের পিছু পিছু গেল, সকলের অগোচরেই ত্যক্ত নিঃশ্বাস ফেলল।
বৃষ্টির মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাতাস বইছে, গুরুম গুরুম শব্দ আর বজ্রপাত হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। ইরহাম হাতে থাকা কাগজগুলো শক্ত করে না ধরায় বাতাসের উত্তাল ঝাপটায় উড়ে গেল তা। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। বৃষ্টির পানি লেগে কাগজের লেখা সামান্য লেপ্টে গেল। শোহেব সাহেব ছেলের এমন কান্ডে বিরক্ত হলেন। এগিয়ে এসে সাহায্য করলেন কাগজ গুলো তুলে দিতে। গায়ে বৃষ্টির বড় বড় ফোটা লাগল। অতঃপর সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এগোলেন সিলেট কর্পোরেশন এর দিকে, কাগজগুলো জমা দিতে। গাড়ি চালিয়ে ভোঁ করে চলে গেলেন।
গাড়ি স্থান ত্যাগ করতেই ঝড়ো হাওয়ার তাল উড়ে এসে কংক্রিটের রাস্তায় পড়ল একটা কাগজ। বৃষ্টির বড় বড় কণা ঝড়ে পড়ল কাগজটার উপর। বৃষ্টির সাথে সাথে ভিজে গেল কাগজের টুকরোখানা। কুটি কুটি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল রাস্তার চারিদিকে।

০৯-০৯-২০২৫
মঙ্গলবার
গত চার দিন ধরে কেমন ধ্যান মেরে বসে ছিলেন নাছির সাহেব। মেয়ের তালাক হয়েছে মেনে নিতে পারছেন না৷ বাবার কথা রাখতে গিয়ে মেয়ের জীবন নষ্ট করে ফেলেছেন তিনি তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলেন সপ্তাহখানিক ধরে। যে মেয়ে ওই বাড়ি ছাড়ার পর থেকে কাঁদতে দেখেননি, সেই মেয়ে সেদিন কিনা কাঁদল হাউমাউ করে। কষ্ট পেয়েছে ভীষণ! না হলে এভাবে কাঁদার মেয়ে তো নয় নুসরাত! ও এমন না! নাছির সাহেব ভাবতে চান না, নুসরাতের কোনো দোষ ছিল কিনা, তিনি জানতে ও চাননা, তিনি শুধু জানেন উনার মেয়ের নামে ডিভোর্সি ট্যাগ লেগে গেছে। এত চিন্তা করলেন যে, নুসরাতের ডিভোর্সের চারদিনের দিন গা কাঁপিয়ে জ্বর আসলো উনার। খিঁচুনি উঠল। শরীর খারাপ করল ভীষণ। রাতের অন্ধকারে এম্বুলেন্স ডাকা হলো বাড়িতে। নাজমিন বেগম, ইরহাম আর নুসরাত মিলে নিয়ে গেলো হসপিটালে। ভর্তি দেওয়া হলো নাছির সাহেবকে। সারারাত নাজমিন বেগমের কেঁদেকেটএ কাটল, আর নুসরাত? তার সারারাত কাটল ডাক্তারের সাথে আলাপ আলোচনা করতে করতে।

১০-০৯-২০২৫
বুধবার….
সকাল আটটা ঊনিশ মিনিট। জায়িন নিজের লাগেজ গোছাচ্ছিল। ইসরাত তা চুপচাপ দেখছে। কথা বলছে না। গতকাল রাতে তাদের ঝগড়া হয়েছে। ফ্রান্স ফিরে যাওয়ার ডেট ছিল অক্টোবরের বিশ তারিখ তা হেলাল সাহেব পিছিয়ে এনেছে এই সেপ্টেম্বর পনেরো তারিখে। এখন থেকেই সবাই গোছগাছ করছেন। ফিরে যাবেন ফ্রান্স। এখানে থাকলে আরশ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে না বলে ধারণা করছেন হেলাল সাহেব। আরশ রুমে ভেতর দরজা লাগিয়ে বসে আছে। পাগলের মতো ব্যবহার করছে সেদিন থেকেই। আকস্মিক এমন ঘটনা ঘটে যাবে বলে ভাবেনি। ভাবনার ঊর্ধ্বে ঘটায় মন মস্তিষ্ক মেনে নিতে পারেনি বলে কেমন চুপ মেরে আছে। ইসরাত বলেছিল দেশের কোনো সাইকোলজিস্ট দেখানোর জন্য, জায়িন এ বিষয়ে ঘোর প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের মতো এ দেশের চিকিৎসকরা আলতু ফালতু এসব বলেছে সে। বিদেশ গিয়েই ভাইকে উচ্চমানের সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবে। এ নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়েছে অনেক। ইসরাত প্রতিজ্ঞা করেছে নিজের কাছে জায়িন যতক্ষণ ক্ষমা চাইবে না, ততক্ষণ কথা বলবে না।

সকাল এগারোটা নাগাদ সৈয়দ বাড়িতে এসে ইরহাম তাড়াহুড়ো করে খবর দিল নাছির সাহেব হার্ট অ্যাটাক করেছেন গতকাল রাতে। এখন হসপিটালে ভর্তি দিয়েছে। শরীর ভালো হওয়ার থেকে অবনতি হচ্ছে বেশি। খবরটা জানিয়ে হন্তদন্ত পায়ে ও বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল সে। ইসরাতের কানে সেই খবর আসলো ঝড়ের গতিতে। নিজের কিছুক্ষণ পূর্বে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করা ভেঙে দিয়ে নিজেই উদগ্রীব কন্ঠে বলল,”জায়িন প্লিজ কোনোভাবে দেশে থাকা যায় না, দেখুন বাড়ির কী অবস্থা? এই মুহুর্তে আপনাদের চলে যাওয়া কী ঠিক হবে?
জায়িনের কাপড় গুছিয়ে রাখা হাত থামল। চোখ তুলে তাকিয়ে নিজস্ব ভঙ্গিতে ভীষণ স্বার্থপরের ন্যায় উত্তর দিল,”না থাকা যায় না, ইসরাত। আমার ভাইয়ের অবস্থা দেখেছ তুমি, ও নিজের মধ্যে নিজে নেই। এর মধ্যে তুমি বলছ আমাকে দেশে থাকার কথা, তোমার বিবেক কোথায়? বিবেক নেই? আর আমরা থাকলেই কী মেঝ বাবা সুস্থ হয়ে যাবেন? সুস্থ হয়ে গেলে তো ভালো, আরো সপ্তাহখানেক আছি। আর যদি না হোন আমরা ফিরে যাব ইসরাত, কোনোভাবে থাকতে পারব না, থাকা সম্ভব না।

ইসরাত স্বার্থপরের মতো কথা লোকটার দিকে তাকাল বিস্ময় নিয়ে। বিয়ের বিশ দিন আজ তাদের। বিশ দিনের দিন টের পেল সে জায়িন ভীষণ স্বার্থপর। অবিশ্বাস্য চোখে নেত্র পল্লব ঝাপটাল। যা শোনেছে তা ভুল প্রমাণ হয়ে যাক চাইল, হলো না। ঠোঁট টিপে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। বিশ্বাস ভেঙে, অবিশ্বাস চোখে খেলা করল তার। পৃথিবীর এক একটা মানুষকে মনে হলো তার নিকট মিথ্যাবাদী। বিড়বিড় করল আনমনেই,”মিথ্যাবাদী.. এত দিন করা এক একটা কথা তাহলে মিথ্যা ছিল আপনার। আপনি একটা স্বার্থপর জায়িন.! আমি কীভাবে ভুলে গেলাম.. একজন স্বার্থপর লোকের সন্তান, স্বার্থপর কীভাবে হবে না?
শ্বাস আটকে আসলো। বুক ধড়ফড় করল তার। বিশ্বাস হারানোর যন্ত্রনায় বুক ফাটল করুন থেকে করুন ভাবে।
“আপনি জানেন কী, জায়িন আপনার ভাই আরশ আপনার থেকে হাজার গুণ ভালো। মুখে যা তার, মনে ও তা কিন্তু আপনি বিষধর সাপ। মুখে একটা অন্তরে অন্যটা। আমি স্বার্থপর একটাকে বিয়ে করেছি। বিশদিন সংসার করেছি তার সাথে চিহ্..! আল্লাহর লানত পড়ুক আমার উপর।

তার কথা বলার মধ্যে জায়িন এসে হাত ধরতে চাইল ইসরাত ধরতে দিল না। সতর্কতা অবলম্বন করে দূরে সরে গেল। তারপরও জায়িন চাইল তার হাত ধরতে, ইসরাত সায় দিল না তাতে। জোর জবরদস্তি করতে নিলেই ঠাস করে একটা চড় বসাল জায়িনের গালে । ক্রোধে অন্ধ হয়ে গেলে সে। মুখ চোখ কেমন লাল হয়ে আসলো তার। কাঁদতে মন চাইল তার৷ কিন্তু এই মুহুর্তে মনকে কাঁদার জন্য সায় দিতে পারল না সে।
জায়িন বুঝতে পারেনি হাত ধরে বোঝানোর চেষ্টা করলে থাপ্পড় মেরে বসবে মেয়েটা তাকে। যতক্ষণে সম্ভিৎ ফিরে পেল ততক্ষণে দেরি। ইসরাত হিসহিস করতে করতে নিজের লাগেজ গোছাচ্ছে। শব্দ করে লাগেজ আটকে দিয়ে দরজা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে চাইল, জায়িন হাত চেপে ধরল আবার তার। জেদ নিয়ে বলল,”আমি তোমাকে যেতে দিব না।

ইসরাত হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল না। চোখ-মুখ লাল করে তাকাল ঘাড় ঘুরিয়ে। হিংস্র জন্তুর ন্যায় রাগে শ্বাস ফেলল ঘোৎ ঘোৎ করে,”হাত ছাড়ুন, নাহলে যতটা সম্মান দেখিয়ে আপনাকে আমি শুধু একটা থাপ্পড় মেরেছি ততটা সম্মান কিন্তু আমি দেখাব না এবার। এরপর আর কোনো কথা বলব না আমার হাত চলবে। পায়ের জুতো পায়ে থাকবে না, আমার হাতে থাকবে, আর আপনার গাল হবে আমার হিট করার জায়গা। জুতোর বারি না খেতে চাইলে ভদ্রভাবে হাত ছেড়ে দিন।
এই কথা বলার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়া থেকে ইসরাতকে আটকানোর চেষ্টা করল না জায়িন, হাতের শক্ততা ঢিলে হলো তার সেকেন্ডের ভেতরই। ইসরাত দেখল না ফিরে জায়িনের চেহারার বদলটুকু। শব্দ করে লাগেজ টেনে চলে গেল সিঁড়ির দিকে। জায়িন নিজের খালি হাতের দিকে তাকিয়ে রইল, নির্মিশেষ। তখনো কানে ভেসে আসছে জুতোর গটগট আওয়াজ, আর লাগেজ টেনে হিঁচড়ে নেওয়ার শব্দ। ইসরাত যেতে যেতে অবেহেলা নিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছে জায়িনের দেওয়া বিয়ের রাতে বুঁশর ব্রান্ডের নেকলেসটা। কানের কাছে এখনো বাজছে একটা কথা,”আমার বাপ যে হসপিটালে আছে ওই হসপিটালে ভুল করে পা রাখবেন না, নাহলে আমার জুতো আপনার গালে পড়বে নির্দ্বিধায়, আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না, এমনকি আপনার নরম নরম কথা।

সৈয়দ বাড়ি থেকে বের হয়ে নাছির মঞ্জিলে প্রবেশ করল ইরহাম। সৌরভি দাঁড়িয়েই ছিল। ইরহাম গা থেকে শার্ট ছাড়িয়ে নিতে নিতে বলল,”খাবার বাড়ো, ফক্সগ্লোভ! আর টিফিনে করে কিছু খাবার নিয়ে যাওয়ার জন্য বক্স করে দাও।
সৌরভি টু শব্দ করল না। রোবটের ন্যায় খাবার বাড়তে চলে গেল কিচেনে। পাঁচমিনিটে গোসল সেড়ে বের হলো ইরহাম। ততক্ষণে খাবার বাড়া হয়েছে টেবিলে। ইরহাম হাতে খাবার নিয়ে প্রথম লোকমা তুলতেই কিছু একটা অদ্ভুত টের পেল। চোখ তুলে গম্ভীর মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা একবার সৌরভিকে দেখল। অতঃপর আরেক লোকমা খাবার মুখে ঢুকিয়ে নিয়ে জানতে চাইল,”বিষ মিশিয়েছ খাবারে?
সৌরভি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল,”হ্যাঁ!
ইরহাম খাবারের লোকমা মুখে তুলল নির্বিকার ভঙ্গিতে। বলল,”তাহলে এতদিনে আমার শাস্তি নির্ধারণ করেছ তুমি?
সৌরভি শীতল চোখে তাকিয়ে মাথা দোলাল। ইরহাম বলল,”ওদের খাবারটা পাঠিয়ে দিও, আর যদি আমার উপর থেকে ক্ষোভ কমে যায় তাহলে হসপিটালে নিয়ে যেও।
পুরো প্লেট খাবার খাওয়া শেষে পানি খেল। হসপিটালে যাওয়ার তাড়া দেখা গেল না৷ চোখ বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

সৌরভির চেহার রক্তশূণ্য হয়ে আছে। হঠাৎ যেকেউ দেখলে বলবে রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে তার। ইরহামকে নড়তে না দেখে ভেতরে মানুষত্ব্যের খাতিরে একটু উদ্বেগের সৃষ্টি হলো, তারপর তা আবার মিলিয়ে গেল। পাশে চেয়ার টেনে বসে জিজ্ঞেস করল নরম কন্ঠে,”হসপিটালে যাবে না, ইরহাম?
ইরহাম উত্তর দিল,”না থাক ভালো লাগছে না।
ইসরাত এসে যখন নাছির মঞ্জিলে প্রবেশ করল তখন বাড়িটা খা খা করল মানুষের অভাবে। হাতের লাগেজ টেনে ধীর পায়ে এগোল ভেতরে। নিচে কাউকে খুঁজে না পেয়ে সৌরভির রুমের দিকে গেল। ভেজিয়ে রাখা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখল ইরহামের মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছে। সৌরভি তার পাশেই মাথা এলিয়ে বসে আছে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে ইরহামের অবস্থা। ইসরাত আঁতকে উঠল। গগণ বিদারী চিৎকার দিয়ে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে। অতঃপর হাঁটু গেড়ে বসে ইরহামের গালে থাপ্পড় বসাল। ছেলেটা চোখ উল্টে তাকাল। ইসরাতকে কাছে দেখে হাসল। ভাঙা স্বরে বলল,”এ এসে চ ছ তুমি..!

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৩ (২)

ইসরাত কী করবে ভেবে পেল না। একবার সৌরভিকে দেখল একবার ইরহামকে। সৌরভিকে দেখে মনে হলো মেয়েটা ঠিক নেই। চোখ দুটো গর্তের ভেতর ঢোকে, গালের হাড় ফুলেছে। মুখ সাদা হতে হতে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। গা ছমছম করে উঠল ইসরাতের। সৌরভিকে ওই মুহুর্তে পৈশাচিক কোনো জন্তু মনে হলো তার নিকট। এর থেকে বেশি ভালো আর কোনো সংজ্ঞা ওই মুহুর্তে ইসরাতের কাছে ছিল না তাকে দেওয়ার জন্য। সৌরভির চেহারার পানে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,”তুমি ঠিক নেই সৌরভি, তুমি ঠিক নেই..! ও আল্লাহ.. আমি এখন কী করব..!
মানুষ বলে বিপদ যখন আসে তখন চারিদিক থেকে ধেয়ে আসে,ইসরাতের আজ তা খুব ভালো করে উপলব্ধি করল। কী করবে, কী করবে না, ভেবে পেল না কিছুই..! মস্তিষ্ক শূণ্য হয়ে গেল তার, ইচ্ছে হলো মরে যেতে! দেয়ালে মাথা ঠুকে মরে যেতে!

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৫

15 COMMENTS

  1. ভালো লিখেছেন তবে জলদি দেবেন আর পরের পার্ট যেন ভালো হয় কোনো বালের লেখা যেন না থাকে ওক ধন্য বাদ আপনাকে দেবো না কোনো মতেই

  2. প্লিজ আপু পরের পর্ব দেন 😞😞😞😞🫩🥹

  3. আপনি কি বাল লিখছেন যদি হ্যাপি এন্ডিং না হয় ভালো হবে না কিন্তু পাঠিকা দের অভিশাপ লাগবে পরের পর্ব জলদি দিন

  4. Apu plzzzzz happy ending deuplzzxxzz.eto gula lhekiker mon vainggo na.plzzzzzz happy ending cai.plzz.sad ending hoile mante parbo na.plz.ar next part ta taratari deuer cesta koro ektu.plzzzz apu plz. Ektu taratari deu na.ami ar mante parteci na.dorjer porikka nio na.onek dojjo dorci.ar somvob na.plz plz plz taratari deu nah plz apu plzzzzzzz😭😭😭🥺🥺

Comments are closed.