প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৩ (২)
জান্নাত নুসরাত
সেপ্টেম্বর দুই -দু হাজার পঁচিশ! প্রতুষের নরম আলো হাতছানি দিয়ে এসে নাছির মঞ্জিলের বারান্দায় পড়ছে৷ রোদের পরিমাণটা আজ মিহি। ধারণা করা যাচ্ছে সময় বাড়ার সাথে তীব্রতা আরো বাড়বে। গাছের ঢালে ঢালে পাখিরা ডাকাডাকি করছে।। সবুজ দূর্বা ঘাসগুলোতে কুয়াশার ছিটা পড়ে ভিজে আছে মোটামুটি। সতেজ ঘাসগুলো পায়ে মাড়িয়ে ছুটে চলেছে উড়ন্ত এক কিশোরী। তার হাসির সুর চারিদিকে ঝংকার তুলছে। প্রতুষের আলো ধীরে ধীরে আরো বাড়তে লাগল৷ নিঝুম রাস্তায় কয়েক মিনিট হেঁটে বেড়াল নুসরাত। আশপাশে মানুষ কী একটা কুকুরের ও দেখা নেই। তার হাঁটার সঙ্গী হয়েছে বন্দুকজি। ভারী পেট নিয়ে নড়তে পারছে না। আশা করা যাচ্ছে কয়েকদিনের ভেতর বাচ্চা জন্ম দিবে। সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যাওয়ায় উঠেই নামাজ পড়েছে সে। ছোটবেলা থেকেই তাদের শিখানো হয়েছে যাই ইচ্ছে করো সারাদিন, কিন্তু ওয়াক্তের নামাজ ওয়াক্তে যাতে শেষ করতে পারো সেদিকে ধ্যান রাখবে। নুসরাত মেনে চলে সেসব! রেগে গেলে যত গালিগালাজ করুক, নামাজ পড়া ছাড় দেয় না সে। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে যায়, তবুও চেষ্টা করে আল্লাহর ইবাদতগুলো আদায় করার। সৈয়দ বাড়ির সবাই কম বেশি নামাজ পড়ে। জন্মের পর থেকেই দাদা, বাবা, চাচাকে দেখেছে সবাই-ই নামাজ পড়ে! সেই থেকে এই শিক্ষা তাদের নেওয়া। সে বিশ্বাস করে নামাজ কবুল করার মালিক আল্লাহ, তার নামাজ ও কবুল করবেন আল্লাহ!
নুসরাতের ধারণাটুকু সত্যি! আল্লাহ এই নিয়ে অনেক আশা, ইচ্ছে তার পূরণ করেছেন, হোক সেগুলা দেরীতে। মানুষ যখন হাই হুতাশ করে মরে যায়, দোয়া কবুল হচ্ছে না বলে, আল্লাহর উপর থেকে বিশ্বাস উঠিয়ে নেয়, সেসব দেখলে ভীষণ হাসি পায় তার। একটু ধৈর্য রাখলেই আল্লাহ তায়ালা তাদের দোয়া কবুল করবে কিন্তু নির্বোধ মানবজাতী তা বুঝে না। নুসরাত অস্বীকার করতে পারবে না, এমনকি অস্বীকার করবে না কখনো, আজ পর্যন্ত সে যে কয়টা দোয়া করেছে, আল্লাহ কবুল করেছেন তার দোয়া।
কথাটা ভাবতে নিয়েই খুশিতে গা সামান্য দুলে উঠল তার। হাঁটাহাঁটি করল সময় নিয়ে। আজকের দিনটা আশা করল খুব ভালো কাটবে যেহেতু সকালটা ভালোই কেটেছে! সেই আশা মনে চেপে হেলেদুলে বাড়িতে প্রবেশ করল।
আহান আজ এখানেই আছে। বসে আছে লনে। নুসরাতকে দেখে ঠোঁট উল্টাল। মিনমিনিয়ে বলল,”আমি ফিজিক্স এ ফেইল আপুউউউ..!
নুসরাত বাহ্ বা দিল,”বাহ্ দারুণ ব্যাপার তো!
“তুমি খুশি হচ্ছো?
নুসরাত উৎসাহী কন্ঠে বলে ওঠল“ অবশ্যই খুশি হবো না কেন? পাশ তো সবাই করতে পারে, কিন্তু ফেইল কতজন করতে পারে? তুই সেটা করতে পেরেছিস, সেটা দেখেই তো গর্বে আমার বুক ফুলে উঠছে।
আহান ভীষণ আপ্লুত হলো। ঠোঁট উল্টে ডাকল,”আপুউউ..!
নুসরাত পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বসল চেয়ারের উপর। পা দুটো তুলে রাখা সামনের টেবিলে। আরো উৎসাহ দিয়ে বলল,”শোন, নিউটন পরীক্ষায় ফেইল করে বিজ্ঞানী হয়েছে, এমনকি আইনস্টাইন, রবার্ট, রসায়নের জনক কেডা যেন ওইটা ও ফেল করে করে এ পর্যন্ত এসেছে। আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও নিয়মিত ফেল করতেন। আর বিশ্ব কবী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর কথা বলিস না, উনি তিনবার ম্যাট্রিক ফেল করে বিশ্ব কবি হয়ে গেছেন। এরপর উদাহরণ স্বরুপ তুই দেখ, কাউয়া কাদের, ব্যাটা তো টাল্টু, তবুও মন্ত্রী ছিল একসময়। খালেদা জিয়া ম্যাট্রিক ফেইল, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একসময়। শেষ উদাহরণ হিসেবে আমাকে দেখ, আমি এইচ এস সি ফেল, ভবিষ্যতে সৈয়দ চয়েস আমার হুকুমে চলবে। মানু্ষের জীবন সামান্য পরীক্ষা নির্ধারণ করতে পারে না। এই আমি সামান্য পড়ে একসময় কোথায় থাকব তুই বুঝতে পারছিস, এমনকি তুই নিজেও থাকতে পারিস আমার থেকে উপরের পদে। প্রয়োজন শুধু স্কিল ডেভেলপমেন্ট। তাই বলে পড়াশোনা ছেড়ে দিলে হবে না, পড়াশোনার প্রয়োজন! একজন জ্ঞানী, আদর্শ মানুষ হাওয়ার জন্য পড়াশোনার ভীষণ প্রয়োজন।
সকালে রোদের দেখা পেলে সময় কাটার সাথে সাথে তা মিলিয়ে গেল কোথাও। মিইয়ে গেল প্রকৃতি৷ বাতাস হলো! ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামল। অতঃপর সন্ধ্যার দিকে আকাশে রক্তলাল আভার দেখা মিলল। নুসরাত দেখল প্রকৃতির এমন অদলবদল। বুঝে উঠতে পারল না এমন অদ্ভুত রঙে রঙ্গিন হচ্ছে কেন ধরণী!
নুসরাতের প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা করা আর হলো না। নাছির সাহেবের আদেশে না চাইতেও নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে যেতে হলো৷ তাদের দেখা করানোর জন্য লোকেশন ঠিক করা হলো, ক্লাউড আই রেস্টুরেন্ট।
নাছির সাহেব পৌঁছে দেওয়ার কথা বললে নুসরাত বলল,”আমি নিজে যেতে পারব আব্বা, আপনার যাওয়া লাগবে না।
নুসরাত নিজের কথা মতোই বের হলো সন্ধ্যা ছয়টা আটচল্লিশ মিনিট নাগাদ। কালো রঙের ট্যাংক টপ, তার উপর সাদা রঙের শার্ট, যার সবগুলো বোতাম লাগানো, আর ঢিলেঢালা ব্যগি প্যান্ট। যা ঠাখনুর নিচ স্পর্শ করে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। কানে সবসময়কার পরিহিত একটা পার্লের রিং। নাকে নোজ রিং, যা জ্বল জ্বল করছে স্বাভাবিকভাবে। ঠোঁটে চকলেট কালার লিপ অয়েল দেওয়া। পায়ে একজোড়া লুই ভিটন এর হিল বুট। বাঁ -হাতের অনামিকা আঙুলে আজমল আলীর দেওয়া একটা সোনার রিং, যার উল্টোদিকে খুবই সূক্ষ্মভাবে খোদাই করে লিখা আরশ, উপরে ডায়মন্ড পাথরের কারুকার্য। হাতে ক্যালির একটা ব্যাগ।
হাতের আঙুলে গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়ি থেকে বের হলো সে। হাসি মুখে গলা ছেড়ে দুয়েকটা গানের দু-লাইন গাইল। অতঃপর গাড়িতে উঠে বসে টান মেরে নিজের গন্তব্যে পৌঁছাল।
নাহিয়ান প্রথম থেকেই অপেক্ষায় বসে ছিল। নুসরাতকে আসতে দেখে উঠে দাঁড়াল। চেয়ার টেনে দিল তার বসার জন্য। সৌজন্যতার খাতিরে নুসরাত হাসল সামান্য নাহিয়ানের দিকে তাকিয়ে। হাতের ব্যাগটা টেবিলের একপাশে রেখে বসল নাহিয়ানের মুখোমুখি। রেস্টুরেন্টে ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস হওয়ায় বাহিরে রাস্তা দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। নুসরাত বসতেই পানি এগিয়ে দিয়ে জানতে চাইল,”কেমন আছেন আপনি, নুসরাত?
নুসরাত এক ঢোক পানি খেল। রেখে দিল গ্লাসটা টেবিলে। পায়ের উপর পা তুলে বসতে বসতে বলল,”যেমন দেখছেন। তা আপনি কেমন আছেন নাহিয়ান আবরার পশ্চিম?
“এতক্ষণ মোটামুটি ভালো ছিলাম, এখন আপনাকে দেখে আরো বেশি ভালো হয়ে গেছি।
নুসরাত হাসল। বলল,”মেইন পয়েন্টে আসি পূর্ব, এত ফর্মালিটি করার প্রয়োজন নেই!
কথা শেষে দু-হাত সামনে এনে বসল সে। নিমেষেই হাসি মিটিয়ে নিয়ে, ফর্মাল হয়ে গেল সে। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,”আপনি আমার বাবাকে বিয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন?
“হ্যাঁ..!
নুসরাত সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ল,” আপনাকে না করা সত্ত্বেও কেন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন?
নাহিয়ান নিজস্ব ভঙ্গিমায় বলে ওঠল,”আপনাকে আমার পছন্দ, তাই!
নুসরাত চোখ মুখ কঠিন করে তড়িৎ প্রশ্ন শুধাল,”সত্ত্যিই?
নাহিয়ান ভড়কাল কী একটু? হ্যাঁ ভড়কাল। নুসরাতের দিকে তাকিয়ে সহজ হওয়ার চেষ্টা করল, হলো না। নুসরাত টের পেল তা। হাত বাড়িয়ে পানি ঠেলে দিল নাহিয়ানের দিকে। বলে ওঠল,’”আপনি আমাকে পছন্দ করেন না, আমি জানি পূর্ব!
নাহিয়ানের কানে কি সে কথা গেল! না গেল না! সে শ্যামলা, খাড়া নাক, ওভাল মুখের গম্ভীর চেহারার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকল হা করে। যখন যখন পূর্ব বলে ডাকে, নাহিয়ানের হৃদয়ে ঝংকার উঠে। নিষ্পৃহ হয়ে যায় তার দেহের অঙ্গ প্রতঙ্গ..!
“এইই পূর্ব.. শুনছেন?
নাহিয়ান কেঁপে উঠল। চোখের পাপড়ি নড়ল একটু এদিক সেদিক। নুসরাত আবারো প্রশ্ন ছুঁড়ল,”আপনি নাকি আমার মাকে দেখে অদ্ভুত ব্যবহার করেছেন সেদিন?
নাহিয়ান কিছু বলতে নিবে নুসরাত থামিয়ে দিল। বলল,”এর কারণ আমি জানি পূর্ব, আপনাকে বলতে হবে না। আপনাদের পরিবারে নারীদের সম্মান পুরুষদের পায়ের তলায়। কতৃত্ব, রাজ বিরাজ করে পুরুষেরা। আপনারা মনে করেন নারীরা ঘরের কীটপতঙ্গ, নিচ জাতের, দাসী তাই না? একটা কথা বলি মাইন্ড করতে চাইলে করিয়েন, আপনারা মুসলিম হয়ে গেলেও, আগের হিপোক্রেসি খ্রিষ্টানের এখনো যায়নি। ইসলামে নারীর সম্মান সবার আগে, কিন্তু আপনারা তা করেন না। এবার ভাবছেন আমি এগুলা কী করে জানি! আপনি আমার ব্যাপারে এতকিছু জানেন আর আমি জানব না তা কী করে হয়! আমি ও টুকটাক আপনার ব্যাপারে জানি। ঘরের বউদের সম্মান দিয়ে কথা বলতে শিখুন। তাদের দাসী নয়, রানী বানিয়ে রাখুন। যাই হোক, আপনাদের পরিবারের ম্যাটার আমার না বলাই ব্যাটার হবে। তো যা বলছিলাম, আপনি আমায় পছন্দ করেন না, এটা আপনার জেদ আমাকে নিয়ে।
নাহিয়ান অবাক হলো। চোখ মুখে ফুটে উঠল তা। বেঘোরে আওড়াল,”জেদ?
নুসরাত মাথা দোলাল। বলল,’”হ্যাঁ জেদ..! আমি এই আপনাকে কী বললাম! আপনাদের পরিবার স্বাধীন চেতা নারীদের দেখতে পারে না৷ যেমন আমার মতো নারীদের, যারা একটু উগ্র মেজাজি, বদ হয়। আপনি আমাকে যেদিন দেখেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেদিন আমাদের চোখাচোখি হয়েছিল মাত্র পাঁচ সেকেন্ডের জন্য। এই চোখাচোখিতে প্রেম হয় না পূর্ব। আপনি আমাকে পাওয়ার একটা জেদ নিজের মনে টেনে রেখেছেন। যে মেয়ে আপনাকে পুরো রেস্টুরেন্টের সামনে বালের নেতা বলে গালি দিয়েছে, সেই মেয়ের প্রতি একজন পুরুষের কখনো ভালোবাসা, পছন্দতা আসতে পারে না, আসবেও না কখনো, কিন্তু আপনার তা এসেছে! আমি কী করে বিশ্বাস করি তা ভালোবাসা! আর মোটকথা হলো আমি ভালোবাসায় বিশ্বাসী নই। মূল প্রসঙ্গে আসা যাক, আপনি জেদের বশ্ববর্তী হয়ে এসব করছেন। এবং এখনো বিয়ের করার ইচ্ছেটা সেই জেদের কারণ। আরশ আপনাকে মেরেছে আমার জন্য। আপনাকে হসপিটালে থাকতে হয়েছে, সেটা থেকে একটা জেদের তৈরি হয়েছে যে আপনার আমাকে নিজের বানাতে হবে, ওই আরশকে শিক্ষা দিতে হলেও আমাকে আপনার বানাতে হবে। বিয়ে শেষ হলেই আপনার আমার প্রতি এই আগ্রহটা ফুরিয়ে যাবে। এবং আমি এই যে এতগুলো কথা বললাম, আমার কথায় আপনি কোনো ভুল দেখাতে পারবেন না।
নুসরাত স্যরি বলতে গিয়ে থেমে গেল। নাহিয়ান হা করে তার কথা গিলছে। এখনো পর্যন্ত টু শব্দটি করেনি। নুসরাত বলল,”আবারো আপনার পরিবারের প্রসঙ্গে যাচ্ছি। আমি উগ্র, অভদ্র, শয়তান, বদ, গালিবাজ, এটা আমি নিজেও জানি। আমি নিঃসন্দেহে একজন খারাপ মানুষ। সাধারণ বাঙালির মতো আমার চিন্তাধারণা নেই। আমি কলেজে থাকতে যখন নারী শিক্ষা নিয়ে রাস্তা বের হতাম অনেকে আমায় সে সময় শাহবাগী বলত। কারণ আমি কেন নারী শিক্ষার পক্ষে কথা বলছি? কেন ঘরে বসে নেই? কেন আমার পরিবার আমার উগ্রতা মেনে নিচ্ছে? তাই বলে আমি পুরুষদের নিচু করছি না। আমাদের সমাজে মাথা উঁচু করে চলার জন্য পুরুষের সাপোর্ট ভীষণ প্রয়োজন, কিন্তু আমি ওই সব নারী কখনো হতে চাইনি যাদের ইচ্ছে আকাঙ্ক্ষা গলা টিপে মেরে ফেলা হয়। আমি উড়তে চেয়েছি, এবং আমি উড়তে পেরেছি, আমাকে একটা গন্ডীর ভেতরে আটকে রাখা হয়নি, সব করতে দেওয়া হয়েছে। কখনো বেশি কথা বললে বলা হয়নি তুমি চুপ থাকো, কথা কম বলো, এত সত্য কথা বলতে হয় না, বেয়াদবী করো না।
আমাদের সমাজে একটা সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বেয়াদবি। যদি কেউ জোর গলায় কথা বলে সেটা বেয়াদবি, কেউ কথার প্রতিবাদ করে সে বেয়াদব। আমি কখনো ভালো হয়ে বেঁচে থাকতে চাইনি। মানুষের কাছে ভালো হয়ে বেঁচে থেকে আত্মগ্লানি নিয়ে মরব কেন! আল্লাহ আমায় একটা জীবন দিয়েছে এই জীবন আমি বদমায়িশি, শয়তানি, খবিসি, বেয়াদবি করে কাটাব। প্রয়োজন পড়লে আমার মতো কালো মেয়েদের জন্য আওয়াজ উঠাব। আমি নিজেকে নিয়ে কখনো হতাশায় ভুগিনি। আমার মতো অনেক নারী আছে যারা কথা বলতে পারে না, নিজেদের বেয়াদব তকমা থেকে বাঁচাতে, কিন্তু আমি সাচ্ছন্দ্যে তা গ্রহণ করেছি। যে যাই বলুক, আমি নিজের কাছে নিজে অনেক কিছু। আমি নিজেকে ভালোবাসি ভীষণ। আপনার সাথে ওইদিন আমার দেখা হওয়ার কোনো লক্ষণ ছিল না, কিন্তু তকদীর হয়তো আমাদের দেখা হওয়া লিখে রেখেছিল, ডেসটেনিটি চাইছিল বলেই আমাদের এমন আকস্মিক দেখা। আপনি যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, সে পরিবেশে নারীদের ময়লার কীট মনে হয়, কোনো কীটপতঙ্গ যেমন, তেমন মনে করে, কিন্তু যেদিন আমার সাথে আপনার দেখা হলো সেদিন আপনার ধারণা ভেঙে চূরমার হল। আমার এমন বেহায়াপানা, বেয়াদবি আপনার এক মন মেনে নিতে পারছিল না, অন্য মন আগ্রহী হচ্ছিল আমার প্রতি। অতঃপর আগ্রহের বশেই আপনি আমার পিছু নিয়েছেন, এবং এখন সেই আগ্রহ গড়াতে গড়াতে জেদে চলে গিয়েছে।
নুসরাত দীর্ঘ কথা শেষে বিরতি নিল। জিজ্ঞেস করল,”আমি কী কোনো কিছু ভুল বলেছি, এম আই রাইট অর এম আই রং, পূর্ব?
পূর্ব কথা বলল না। কেমন মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইল নুসরাতের পানে। নিজেকে সামলে ওঠে বলে উঠল,’”খাবার অর্ডার দেই, কী খাবেন, বলুন?
নুসরাত নাহিয়ানের কথা কাটানোর প্রয়াস দেখল নির্জীব চোখ মুখে। ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের ওপাড়ে খোলা আকাশ। রাতের অন্ধকারে তা ঢেকে আছে। সেদিকে তাকিয়েই প্রশ্ন জাগল তার মনে, আজ কী অমাবস্যা! এত অন্ধকার কেন? কিছুক্ষণ পর তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে মেঘ গর্যে উঠল। গুরুম গুরুম শব্দ হলো। বিদুৎ চমকাল আকাশে আঁকাবাকা হয়ে। নাহিয়ান প্রশ্ন করল,”আপনি বজ্রপাত, বিদুৎ চমকানো ভয় পান?
নুসরাত নিজের চশমা ব্যাগ থেকে বের করে টিস্যু দিয়ে মুছে নিল। চোখে এটে নিয়ে বলল,”কখনো সময় হয়নি বিদুতের চমকে ভয় পাওয়ার। যতদিনে বোঝলাম ভয় পাওয়া উচিত, ততদিনে পাড় করে এসেছি সেসব।
নাহিয়ান ঠোঁট ভিজিয়ে নিল জিভ দিয়ে,”কিন্তু আপনার বয়সী মেয়েরা বৃষ্টির শব্দে চমাকায়, ভড়কায়..!
নুসরাত বিগলিত হাসল। বলল,”সেই সুযোগ আমাদের কাউকে দেওয়া হয়নি। ছোটবেলা থেকেই শিখানো হয়েছে কোনো কিছুই ভয় পাওয়া যাবে না, এবং আমরা ও ভয় পাইনি।
“আমি বিমোহিত হয়ে যাচ্ছি আপনার উপর, নুসরাত।
“থ্যাংকস আ লট আমার উপর বিমোহিত হওয়ার জন্য। এবার বলুন, তখনকার প্রশ্নের উত্তর।
নাহিয়ান ভ্রু চুলকাল তর্জনী আঙুলের সাহায্যে। ফর্সা মুখটায় খেলে গেল হাসি। বলল,”আপনি একদম ঠিক বলেছেন, আমি জেদ থেকেই আপনার পিছু নিয়েছিলাম। কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে এসব?
নুসরাত নিজের চেহারার দিকে ইশারা করে জানতে চাইল,”আমার চেহারা দেখে কী আপনার আমাকে বোকাচোদা মনে হয়?
নাহিয়ান হো হো করে হাসল। বলল,”আপনি যা দেখান আপনি আসলে তা না নুসরাত, আপনি বুদ্ধিমতি। উপরে উপরে বোকা, মেন্টাল, পাগল ছাগলের রুপ ধরে ঘুরলে ভেতরে ভেতরে আপনি সব জানেন, সব বুঝেন।
নাহিয়ানের এত কথা নুসরাত নিতে পারল না। অস্বস্তিতে ঘাট হয়ে বলল,”আর প্রশংসা করতে হবে না এইটুকু যতেষ্ট আজকের জন্য। যেহেতু আমাদের কথা শেষ তাহলে আজ আমি উঠি?
নাহিয়ান থামিয়ে দিল। নুসরাতের ব্যাগ চেপে ধরা হাত টেনে ধরল। নুসরাত একবার তা দেখল, একবার নাহিয়ানের মুখ। হাতে অগ্নি স্ফূলিঙ্গ লেগেছে এমনভাবে ছিটকে সরে গেল, ঝাড়া দিয়ে উঠল তারা সারা শরীর। চোখ রাঙিয়ে, শক্ত কন্ঠে নিষেধাজ্ঞা জারী করল,”আমাকে স্পর্শ করবেন না পূর্ব। আমার পছন্দ নয় কেউ আমার অনুমতি ছাড়া আমার একটা চুল স্পর্শ করছে।
নাহিয়ানের মুখ গম্ভীর হলো। দাম্ভিক স্বরে জিজ্ঞেস করে বসল,”আরশ যখন স্পর্শ করে সময়ে অসময়ে তখন তো কিছু হয় না?
নুসরাত নিজের জায়গায় অটল। আগের মতো শক্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল,’”আপনি আরশ নন৷ আরশ হতেও পারবেন না।
নাহিয়ান আহত হলো। বুকে সূক্ষ্ম ব্যথার উপলব্ধি টের পেল, তবুও টেনে নুসরাতকে বসিয়ে দিল, ছাড় দিল না একবিন্দু। ভীষণ বিরক্তি বোধ করল নুসরাত। পাবলিক প্লেস হওয়ায় চুপচাপ দাঁত কামড়ে বসে রইল। নাহিয়ান বলতে শুরু করল,”আপনার প্রতি আমার অনুভুতি কী তা না বলে আমি আপনাকে আজ যেতে দেব না, নুসরাত। হ্যাঁ আমি মানছি প্রথমে আপনার প্রতি আমি জেদ থেকে পিছু নিয়েছিলাম কিন্তু সেই জেদ এখন আর জেদে আটকে নেই, তা পেরিয়ে বহুদূর চলে গেছে। আমি আপনাকে পছন্দ করি নুসরাত। আপনাকে বিয়ে করতে চাই। আমাকে বিয়ে করতে আপনার সমস্যা কি সেটা বলুন?
নাহিয়ানের বলার ধরণ দেখে নুসরাত হেসে ফেলল। এত এত কথার বিপরীতে একটু হেসে উত্তর দিল,”আমি বিবাহিত, নাহিয়ান। সম্ভব না!
“তো কী হয়েছে? আপনাদের এই বিয়ের কথা কেউ জানে না? আর এসব ছোটবেলার বিয়ে ধরে বসে থাকে না কেউ, আপনি কেন বসে থাকবেন কেন? আপনি কী কোনভাবে আপনার হাজবেন্ডকে ভালোবাসেন?
নুসরাত উত্তর দিল না প্রশ্নের। নাহিয়ান উত্তরের আশায় বহুক্ষণ প্রতীক্ষায় বসে রইল। অতঃপর বলে ওঠল,”নীরবতা সম্মতির লক্ষণ বলে সবাই মানে৷ আমি তাহলে ধরে নিচ্ছি আপনি ভালোবাসেন আরশকে।
নুসরাত নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে ওঠল,”যা ইচ্ছে ভাবতে পারেন। আমি কিছু বলব না এ বিষয়ে।
নাহিয়ান হাসল। মুখোমুখি বসা নুসরাত বিরক্ত হবে জেনেও হাত চেপে ধরল নিজের হাতের মুঠোয়। কন্ঠে হতাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,”আমাকে ভালোবাসলেন না কেন, নুসরাত? আমি কী এতটাই- খারাপ যাকে ভালোবাসা যায় না!
তাকিয়ে রইল নুসরাত। চুপচাপ! নির্লিপ্ত দৃষ্টি। হাত ছাড়ানোর প্রয়াস করল না। নাহিয়ান আবারো বলল,”কেন ভালোবাসলেন না আমায়? একটু তো টাই দিতে পারতেন?
শক্ত গলায় নাহিয়ানের নাম ধরে ডাকল,”নাহিয়ান! আপনি নিজের লিমিট ক্রস করছেন।
“লিমিট অনেক আগেই ক্রস করেছি নুসরাত। লিমিটের ভেতর থাকলে আপনার প্রতি আমার অনুভূতি এত প্রখর হতো না।
নুসরাত উঠে দাঁড়াল। হাত ছাড়িয়ে নিল নাহিয়ানের হাত থেকে। ব্যাগ চেপে ধরে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হবে ভাব তার মধ্যে বিরাজমান, এর মধ্যে তার টাখনুর কাছটা চেপে ধরল উঁচু পাহাড় সমান লোকটা। আঁতকে উঠল সে। ছিটকে দূরে সরতে চাইল, হলো না। নির্জীব, নিষ্পৃহ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল পায়ের দিকে। রোবটিক কন্ঠে বলে ওঠল,”ফলিং ইন লাভ ইজ নট লাভ নাহিয়ান, দিজ ইজ জাস্ট এট্রাকশন.!এবং আপনার আমার প্রতি এই অনুভূতি এট্রাকশন।
তার কথা শেষ হতেই নাহিয়ান ভঙুর কন্ঠে বলে ওঠল,”আপনাকে না দেখলে যদি আমার শ্বাস আটকে আসে, দিনে আপনাকে মনে পড়ে হাজার বার, হৃদয়ের চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, আমি যতটা নিঃশ্বাস প্রতিদিন নিই, সেই নিঃশ্বাস নেওয়ার সাথে আপনাকে আমার মনে পড়ে, তাহলে সেটা কী? আপনি এখনো বলবেন শুধু এট্রাকশন নাকি জেদ? আপনার প্রতি আমার কোনো আকর্ষণ বা জেদ নেই, আমি আপনাকে ভালোবাসি নুসরাত, ভীষণ ভালোবাসি। আপনাকে না পেলে আমি বাঁচব না। খোদার কসম করে বলছি আপনাকে আমি ভীষণ করে চাই..!
নুসরাত নাহিয়ানের এত কথার বিপরীতে টু শব্দটি করল। নিজের পা ছাড়ানোর জন্য ঝুঁকে যেতেই নাহিয়ান চোখ তুলে তাকাল। চোখচোখি হলো দু-জনের সেকেন্ড দু-য়েকের জন্য৷ আজ নুসরাত চোখ সরাল না নাহিয়ান সরিয়ে নিল। মনে প্রশ্ন উদয় জাগল কেঁদেছে কী লোকটা? অমন চোখের ভেতর পানির ঢেউ খেলছিল কেন? তাকে না পাওয়ার বিরহে কাঁদছে লোকটা? বুকে সূক্ষ্ম কষ্টের এক দানা এসে উঁকি দিল নুসরাতের। তবুও অবিচল রইল সে। টানটান হয়ে রইল অভাবে উঁচু শিরা উপশিরা নিয়ে৷ ভাবাবেগ দেখা গেল না। নাহিয়ান বিড়বিড় করল,“আপনি ভীষণ পাষাণ নুসরাত! আপনি পাষাণ, আপনার হৃদয় পাথরের থেকে ও বেশি শক্ত!পাথরের মতো নারী আপনি! পাথরের মতো আপনার ব্যবহার, পাথরের মতো চোখ, হৃদয় পাথরের, মুখ দিয়ে যা বলেন তা তা পাথরের। পাষাণ, পাষাণ, পাষাণ..!
নুসরাত শুনলই না সেসব, পা টেনে ছাড়িয়ে নিল। পাষাণের মতো করে। ধুপধাপ পায়ে এগিয়ে যেতেই নাহিয়ান পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল,”যার জন্য আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন আমাকে গ্রহণ করলেন না, সে কী আপনাকে ভালোবাসে?
নুসরাতের চলতে থাকা পা থামল। থমকানো চেহারায় পিছু ফিরে চাইল। কঠোর কন্ঠে বলে ওঠল,”ভালোবাসা! আমি জানি না ভালোবাসার মানে কি! আমার কাছে ভালোবাসা মানে এই নয় যে সারাদিন একজন আরেকজনকে ভালোবাসি, ভালোবাসি বলা, চুমু খাওয়া, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলা, একজন আরেকজনের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকা। আমার কাছে ভালোবাসার মানে হলো, যখন পৃথিবীর মানুষ একদিকে আর আমি একদিকে তখন পৃথিবীর একদিকের মানুষ ছেড়ে শুধু আমাকে সমর্থন করবে সে। খারাপ অবস্থায় আমাকে ছেড়ে যাওয়ার বদলে, সে আমার পাশে দাঁড়াবে। আমাকে রক্ষা করবে। তো হ্যাঁ, আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসে। অনেক বেশি বাসে..! আমার চিন্তাভাবনার থেকে বেশি।
তাচ্ছিল্য নিয়ে জানতে চাইল,“এত বিশ্বাস?
নুসরাত উত্তর করল না। নাহিয়ান বলল,”আপনার এই বিশ্বাস ভাঙবে নুসরাত, খুব খারাপ ভাবে ভাঙবে।
নাহিয়ানের কথা কানে তোলার প্রয়োজন বোধ করল না। রুঢ় মুখ চোখ করে পা চালিয়ে এগোল সম্মুখে। পেছন থেকে আওয়াজ আসছে কারোর কথার। হয়তো তৌফ এটা..! জিজ্ঞেস করছে,”আপনি ওর ভেতর কী এমন দেখেছেন ভাই, যে এতটা ভালোবেসে ফেলেছেন?
নুসরাত থেমে দাঁড়াল। ঘাড় ঘোরাল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে রইল উত্তরের আশায়। নুসরাতের অপেক্ষার অন্তিম ঘটিয়ে নাহিয়ান ভঙ্গুর কন্ঠে উত্তর দিল,”যখন ওর নির্মল চেহারাটা দেখেছি এরপর আর কিছু দেখিনি, দেখার প্রয়োজন পড়েনি।
আকাশের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। বাতাস হচ্ছে চারিদিকে। বৃষ্টি নামবে নামবে ভাব..! আকাশ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বৃষ্টি তখন। গুরুম গুরুম শব্দে মুখরিত আশপাশ। রেস্টুরেন্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে গিয়ে হাতের ঘড়িটা দেখে নিল সে। বাজছে এখন সাতটা আটচল্লিশ! নাহিয়ানের কথা ঘুরে ফিরে কানের কাছে বাজছে। না চাইতেও খারাপ লাগা কাজ করছে। কেমন করে তাকিয়ে ছিল লোকটা, তারদিকে শেষ আশা নিয়ে। নুসরাত শক্ত কন্ঠে বলতে পারে তার আর আরশের আগে বিয়ে না হলে নিশ্চয়ই নাহিয়ানের মায়ায় পড়ে যেত। বুকে কষ্টের দানা আবারো বাঁধল। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পার্কিং করে রাখা গাড়ির দিকে অগ্রসর হতেই বাহু চেপে ধরল কেউ। নুসরাত ভাবল নাহিয়ান। তাই চ্যাঁচিয়ে উঠল,”আপনাকে না করেছি না, আমার অনুমতি ছাড়া স্পর্শ করবেন না আমায়?
বাহুর চাপে শরীর ব্যথায় ঝাঁঝিয়ে উঠল। চশমা পরে থাকায় স্পষ্ট দেখতে পেল আরশের রাগে ক্ষোভে তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট, নাক! নুসরাত অবাক হলো! আরশ এখানে আসল কীভাবে ভেবে? অত্যাশ্চর্য কন্ঠে কিছু বলতে নিবে গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। ব্যথায় গায়ের অন্ধি সন্ধি ছুটে যাওয়ার মতো মনে হলো তার। আরশ তার বাহু দ্বিগুণ চাপে চেপে ধরল। শ্লেষ মিশ্রিত স্বরে মাথা দোলাতে দোলাতে বলে উঠল,”ওহ, হ্যাঁ, ভুলে গিয়েছিলাম, আমি চেপে ধরলেই সমস্যা হয় তোর, নাহিয়ানের সাথে ঘষাঘষি করতে সমস্যা হয় না, তাই না?
নুসরাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বিরক্তিতে খ্যাঁকাল,”ভালো লাগছে না, আরশ ভাই। হাত ছাড়ুন..!
আরশ হাত ছাড়ল না বৈ আরো চেপে ধরল শক্ত করে। রাগ মিশ্রিত স্বরে জানতে চাইল,”এখানে এসেছিস কেন?
নুসরাতের দ্বিধাহীন কন্ঠস্বর ভাসল বাতাসে”নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে।
“তুই কেন নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে আসবি? ভালোবাসা ভাটা হচ্ছে?
“আশ্চর্য, ভালোবাসা ভাটব কেন?
নুসরাত থামল। ক্লান্ত স্বরে বলে উঠল,” আমি ক্লান্ত, আমার রেস্ট প্রয়োজন। বাড়ি যাব, হাত ছাড়ুন.!
আরশ হাত ছাড়ল না। নুসরাতকে টেনে এনে নিজের কাছে দাঁড় করাল। একদম নিকটে। উত্তাল বাতাসে উড়ল নুসরাতের মাথার চুল, ঢিলেঢালা শার্টটা।
“ছাড়ব না হাত, আগে উত্তর দেয় আমার প্রশ্নের, নাহিয়ানের সাথে দেখা করতে এসেছিস কেন?
“আরশ ভাই আপনি এবার অভার রিয়েক্ট করছেন।
আরশ খ্যাক করে উঠল। চ্যাঁচাল,”আমি অভার রিয়েক্ট করেছি, আমি?
গা ঝাড়া দিয়ে নিজের শরীর ছুটিয়ে নিল আরশের কাছ থেকে নুসরাত। দূরে দাঁড়িয়ে বলল,”হ্যাঁ আপনি করছেন অভার রিয়েক্ট। একটা সামান্য বিষয়কে বাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখছেন।
“তাহলে তুই বলছিস বাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখব না? বাড়িয়ে দেখা আমার জন্য পাপ?
নুসরাত বিন্দুমাত্র আগ্রহ পেল না এই বিষয়ে কথা বাড়ানোর। আরশের টানা হিঁচড়ায় মেঝেতে ব্যাগ পড়েছিল তা ঝুঁকে নিতে যাবে এক একটা বাক্য তীরের ফলার ন্যায় এসে বুকে বিদ্ধ হলো তার৷ নির্জীব দাঁড়িয়ে রইল কয়েক মিনিট অইভাবে। ব্যাগটা তুলল না, অবহেলা নিয়ে পড়ে রইল কংক্রিটের লনে। আরশের কথাটুকু শ্রবণ হলো না ঠিকঠাক যেন। কানের ভুল ভেবে আবারো শোনার জন্য মুখিয়ে উঠল তার সমগ্র ইন্দ্রিয়। নুসরাত যে কথাটা নিজের কানের ভুল ভেবে উড়িয়ে দিতে চাইল, সেই কথা আরশ আবারো সেই দাম্ভিক স্বরে বলল,”তুই একটা চরিত্রহীন..!
থমকানো চেহারায় তাকিয়ে রইল আরশের দিকে নুসরাত। চোখ মুখের অবস্থা হতবিহ্বল। নির্বাক অবস্থা যে তার৷ কিছু বলার ভাষা হারিয়েছে। বৃষ্টির ফোটা ততক্ষণে পড়তে শুরু করেছে ধরণীতে। টিপটপ করে ভিজিয়ে দিল তাদের৷ নুসরাত তাকিয়ে রইল, নির্মিশেষ। বিশ্বাস ভাঙার আওয়াজ হলো কোথাও! মটমট করে ভাঙল হৃদয়ের অন্তঃস্থল। নাহিয়ানের কাছে বড় গলায় বলে আসা কথাটা মনে হলো বারবার। চোখের সামনে সমগ্র পৃথিবী দুলল।
আকাশ হয়তো বুঝল চারদিক কাঁপিয়ে এই মুহুর্তে বৃষ্টি নামা প্রয়োজন, তাই ঝমঝম করে নামল। ভিজিয়ে দিল গেল নুসরাতের সমগ্র শরীর। সাদা রঙের শার্টটা গায়ের সাথে লেগে গেল। কথা বলতে গিয়ে বুঝল গলা কাঁপছে। নড়বড়ে হচ্ছে তার দেহ। জিভ কাঁপছে! শরীরটা বেইমানি করে সেটা ও কাঁপল। নিজের দেহের এই অভিসন্ধি নুসরাত টের পেল খুব করে। নিজেকে সামলানোর কোনো চেষ্টাই করল না। চ্যাঁচিয়ে উঠল দ্বিগুণ স্বরে,”কোন সাহসে আমাকে আপনি চরিত্রহীন বলেছেন? এই অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?
আরশ নিজের কথায় অটল রইল। পাগলের মতো একভাবে চ্যাঁচাল,”তুই চরিত্রহীন, তুই চরিত্রহীন!
“আমি চরিত্রহীন? আমি?
নুসরাত থামল। শরীর কাঁপল সাথে দ্বিগুণ তেজে। শরীরের সব শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে এসে দাঁড়াল আরশের মুখোমুখি। হাত ঘুরিয়ে এনে ঠাস ঠাস করে বাজিয়ে দুটো থাপ্পড় বসাল আরশের দু-গালে। ক্ষোভে, রাগে নাকের পাটাতন কাঁপল। জবান চালাল কঠোর থেকে কঠোর স্বরে,”কোন সাহসে আপনি আমাকে চরিত্রহীন বলেছেন? কোন অধিকারে আমাকে আপনি এটা বলেছেন? কোনো অধিকার আছে আপনার আমার উপর? তেরো বছর পূর্বের ওই বিয়ের জের ধরে যদি আপনি আমার উপর কতৃত্ব চালাতে আসেন, তাহলে শুনুন, ওই বিয়েটা আমি মানি না। ওই বিয়েটা নিছক নামমাত্র, অস্তিত্বহীন, মূল্যহীন! কোনো সম্মান নেই আমার কাছে। শুনেছেন, আপনি আমার কথা? কোনো.. মূল্য নেই..!
আরশ কটাক্ষ করে হাসল। নির্বিকার চিত্তে চেয়ে রইল নুসরাতের পানে।অসাড়তা ঝেঁকে ধরল তার সমগ্রতা। ঠোঁট নাড়িয়ে জানতে চাইল,”মূল্য নেই বিয়েটার, তোর কাছে?
গর্জাল সে দাম্ভিক স্বরে । টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে উত্তর করল,“না, একফোটা ও নেই।
কথা শেষে ঢোক গিলল! ঠোঁট কাঁপল থরথরিয়ে। নিজের চোখের চশমা খুলে মুছে নিল ভেজা কাপড় দিয়ে৷ ঝাপসা হলো আরো! চোখের পর্দা ঝাপসা হলো তার থেকে দ্বিগুণ । চোখে কিছু একটা পড়েছে হয়তো। বৃষ্টির পানির ছাটের সাথে তাল মিলিয়ে চোখ বেয়ে জল পড়ল টপটপ করে এক ফোটা,দু ফোটা, তিন ফোটা, এমন করে শতটা। রাতের অন্ধকারে তা বোঝা গেল না৷ বৃষ্টির কারণে ধারণা করা গেল না সে কাঁদছে। নিজের জায়গায় কঠোর থাকল। যে বিশ্বাস করে না তার কাছে আবার কীসের আশ্বাস চাইবে? নুসরাত ঝুঁকবে না। যার যা ভাবার ভাবুক।
প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৩
ভাবতেই থাকুক! সে দায় নেয়নি মানুষের ভাবনা বদলানোর৷ অনেক কষ্টে সিদ্ধান্ত নিল সে একটা। আরশের থেকে দু-হাত দূরে ছিল সে। অনবরত বৃষ্টিতে ভিজে শরীর চিপচিপে হয়ে আছে দু-জনের। আরশ শক্ত অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সম্মুখে।কঠোর চেহারা তার! কোনো নমনীয়তা নেই সেখানে! এক পা দু-পা করে এগিয়ে আসলো আরশের নিকটে নুসরাত। নিজেদের ভেতরের দূরত্ব মিটিয়ে নিল। কন্ঠ নিষ্পৃহতা আবহ বিরাজমান,তবুও নিজস্ব গম্ভীরতা বজায় রাখে সে। মেয়েলি কন্ঠ ঝংকার তুলে ওই বৃষ্টির সাথে ”এই সম্পর্কের ভার বয়ে চলা আমার দ্বারা আর সম্ভব না, আরশ ভাই, লেট’স গেট ডিভোর্স.!

Apu at ki Holo
Amar to voy kortese na Jani oder divorce hoye Jay
Please happy ending dio
Next part taratari dile valo hoto nah?….emon ekta jaygay aisha thma kintu thik nah apu🙂👍🏻
next part plz
Pls api next part taratari diye dayo
Pls api next part
নেক্সট পার্ট প্লিজ
Trtri next prt dao w8 krte prtesi na
next part taratari diyen apu🙂
Happy ending plz apu plz nahole heart attack krbo
Plz happy ending diyo apu nahole heart attack krbo
Amne te alo apa bas kaiya kul pai na akon abr nusrat apu suru korse bas dawa kikorbo bolo bas kaite kaite jibon ses…
Divorce hoile amra pathikara ses plz apu happy ending diyo
আপু পরের পর্ব দেন 😞
Apu porer parba plz din apu