Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৫

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৫

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৫
জান্নাত নুসরাত

হসপিটালের করিডোরে মাথায় হাত রেখে নিশ্চুপ বসে আছে নুসরাত। ঘুমহীন রাত্রীযাপন করার ফল হিসেবে চোখের নিজের দাগ পড়েছে। ক্লান্ত শরীরটা বিছানার আরাম খোঁজছে। এর আগে এত ধকল শয়নি তার শরীর। মাথায় বিভিন্ন চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সেই চিন্তার কোথাও নিজেকে নিয়ে ভাবনার ফুরসত নেই তার।
ভাবনার সুতো কাটল ডাক্তারের পদচারণের শব্দে। নুসরাত হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াতেই মাথা ঘুরে উঠল। চোখের সামনের পৃথিবী ঘোলাটে হয়ে আসলো। কিছু ধরে নিজেকে সামলাবে সেই সময়টুকু পেল না, সেকেন্ড দুয়েকের ভেতর মাথা ঘুরিয়ে ধড়াম করে মেঝেতে পড়ে গেল। চোখের সামনে তখন শুধু ভাসল মেয়েলি চিৎকার!
স্যালাইন লাগিয়ে একটা রুমে শিফট করা হয়েছে নুসরাতকে। শরীর দু-দিনের এত ধকল কুলিয়ে উঠতে পারেনি সাথে গতকাল রাত থেকে না খাওয়া থাকায় এই অবস্থা তার। হাতে ক্যানেল লাগানো। স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। কিছু একটা বিড়বিড় করছে শুয়ে থেকে।

ইসরাত দিক বিদিক খুঁজে পেল না। কী করবে এই মুহুর্তে? আহান এসেছে তার সাথে। শোহেব সাহেব সোহেদ সাহেব রাস্তায়। দু-জনেই অসুস্থ! উনারা বা এই অবস্থায় কী করতে পারবেন৷ ইরহামটার প্রয়োজন বোধ করল ইসরাত খুব করে! বেচারা নিজেই ইমার্জেন্সি ওয়ার্ড এ ভর্তি। মুখের ভেতরে নল ঢুকিয়ে ভেতরের বিষ ওয়াশ করা হচ্ছে তার। হসপিটালের এ প্রান্ত হতে ও প্রান্ত দৌড়াতে হলো একা একা। ভীষণ করে তার অনুভব হলো আজ যদি একজন বড় ভাই থাকত তাহলে এত স্ট্রেস নিতে হতো না।
নাজমিন বেগম এর মধ্যে কেঁদে কেটে নিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ইসরাত ঠেলে ধাক্কিয়ে তাকে সৌরভির সাথে বাড়িতে পাঠিয়েছে। বলে দিয়েছে মেয়েটাকে বুঝিয়ে খেয়াল রাখার জন্য।

শোহেব সাহেব আর ঝর্ণা বেগম আসলেন দুপুর বারোটার দিকে হসপিটালে। ভদ্রমহিলা দেখেই মনে হলো সৌরভিকে সামনে পেলে কেটে কুটে টুকরো টুকরো করে দিতেন। হাউমাউ করে কেঁদে নীরব হসপিটাল আওয়াজে আওয়াজে ভরিয়ে দিলেন। ইসরাত বিরক্ত হলো ভীষণ। এমনিতেই তিনজনের ডাক্তারের সাথে কথা বলে সে কুলিয়ে উঠতে পারছে না, তার ভেতর এই ভদ্রমহিলার এমন নাকে কান্না। শোহেব সাহেবকে ইশারায় কাছে ডাকল সে। তখন ঝর্ণা বেগম দরজার বাহিরে দাঁড়িয়ে ছেলের কীভাবে বিষ ওয়াশ হচ্ছে তা দেখছেন ছলছল চোখে, চোখ মুছছেন কাপড় দিয়ে, আবার কাঁদছেন। ইসরাত শান্ত থাকল। এই মুহুর্তে তাকে শান্ত থাকতে হবে। বলল,”চাচ্চু…
কন্ঠস্বর রুদ্ধ হয়ে আসলো। শোহেব সাহেব একহাতে বুকে টেনে নিলেন তাকে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন,”সব ঠিক হয়ে যাবে, চিন্তা করিস না..!

ইসরাতের কান্না আসলো ভীষণ করে, তবুও সে নিজেকে ধরে রাখল। বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল,”আমরা নিজেদের প্রতি এতো ব্যস্ত ছিলাম যে সৌরভি মেয়েটার দিকে ধ্যান দেওয়ার সময়ই পাইনি। ওর বর্তমান অবস্থা ভীষণ খারাপ। ওকে যত তাড়াতাড়ি পারো সাইকোলজিস্ট এর কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করো। তুমি ওর জন্য ডাক্তার ঠিক করে নিয়মিত ওকে ওখানে কাউসিলিং এর জন্য পাঠাও। এই মুহুর্তে বৌমাকে ওর দিকে মোটেও ভিরতে দিবে না। কখন আক্রমনাত্মক হয়ে বৌমা হামলা করে বসেন কে জানে? এদিক আমি সামলে নিব। ছোট আম্মুকে বলো আমাদের বাড়িতে যেতে আর…
থেমে গেল ইসরাত। টেনে শ্বাস নিল। বলল,”ছোট চাচ্চুকে এখানে পাঠিয়ে দিও। উনাকে আমার এই মুহুর্তে ভীষণ প্রয়োজন।
শোহেব সাহেব ইসরাতের মাথা হাত বুলিয়ে দিলেন। ইসরাতের কথামতো ঝর্ণা বেগমকে অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে গেলেন বাড়িতে। অতঃপর সোহেদ সাহেব আসলেন তারা এখান থেকে যাওয়ার দশ মিনিট পর। জানা গেল, অফিস থেকে এসেছেন, যখনই শুনেছে বড় ভাইয়ের অসুস্থতার কথা। কিন্তু এসে দেখলেন একজন রোগীর সাথে আরো দু-জন রোগী এসে জুটেছে।

১২-০৯-২০২৫
শুক্রবার…
গতকাল ইরহামকে আইসিইউ তে নেওয়া হয়েছে। শ্বাস প্রঃশ্বাসে চলাচলের গতি ধীর হওয়ায় মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো তার৷ সজ্ঞানে এসেছে একটু আগেই। চোখ খোলার পর যখন ঝর্ণা বেগমকে দেখল,তখন বির্বণ হয়ে যাওয়া ফ্যাকাশে মুখ নিয়েও হাসল সামান্য। তা দেখে ঝর্ণা বেগমের মাতৃ হৃদয় কেঁপে উঠল হাহাকার করে৷ দু-হাতের মধ্যে ছেলেকে ধরে নিতে চাইলেন, পারলেন না। ইরহাম হাসল আবারো। কাঁদো কাঁদো স্বরে ঝর্ণা বেগম জিজ্ঞেস করলেন,”কী অবস্থা করেছিস নিজের? কেউ এমন করে?
ইরহাম উত্তর দিল না সে কথার। ডাকল তার স্বরে,”আম্মু…
ঝর্ণা বেগম চোখের পানি মুছলেন আলগোছে,”হ্যাঁ বল, কী হয়েছে?
“সৌরভিকে তুমি কিছু বলেছ?

ঝর্ণা বেগম ছেলের দিকে তাকালেন অবিশ্বাস্য চোখে। যে মেয়েটা বিষ দিয়েছে সেই মেয়ের কথা জিজ্ঞেস করছে তার ছেলে। রাগ, ক্ষোভ দুটোই চোখ মুখে ফুটে উঠল। বলে ওঠলেন,’”এখনো কিছু বলিনি, তবে বলব।
ইরহাম নিজের স্যালাইন লাগানো হাত দিয়ে চেপে ধরল মায়ের দুটো শীর্ণ শুভ্র বর্ণের হাত। টান পড়ল ক্যানেলে, তবুও টু শব্দটি করল না সে। নির্মিশেষ অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে, আস্তে ধীরে বলল,”সৌরভিকে তুমি কিছু বলবে না, আম্মু..!
ঝর্ণা বেগম চোখ দুটো ছলছল করল। ইরহামের কথা কর্ণপাত করলেন না। অশ্রুসিক্ত কন্ঠে বললেন,”বলব, একশোবার বলব।
“আম্মু ওকে কিছু বলার অধিকার তোমাদের নেই?
ঝর্ণা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইরহাম কথা বলার জন্য অনেক আগে অক্সিজেন মাস্ক খুলে রেখেছে। বললেন,” কেন বলব না? ও তোমায় বিষ দিয়েছে? তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কী হতো? তুমি আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই এই পৃথিবীতে।
“আমার তো কিছু হয়নি, আম্মু! তুমি কিছু বলবে না ওকে, শুনবে আমার কথা।
অভিমান নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ঝর্ণা বেগম ছেলের দিকে৷ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,” বলব না কিছু তোর প্রিয় সৌরভিকে।

চলে যেতে নিলে হাতে টান পড়ল সামান্য। রুগ্ন হাতে চেপে ধরেছে ইরহাম মায়ের হাতটা৷ চাইলেই ছাড়ানো যাবে, তবুও দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই ইরহাম ইশারায় কাছে ডাকল তাকে। বলল,”কাছে আসো, আম্মু। একটা সিক্রেট বলি।
ঝর্ণা বেগম ফিরে আসলেন আবারো,ছেলে কী বলে শোনার আশায়। কান পাতিয়ে ঝুঁকে আসতেই ইরহাম ফিসফিস করে বলল,’”আমি তোমাকে সৌরভির থেকেও বেশি ভালোবাসি আম্মু , শুনেছ তুমি? আমি তোমাকে পৃথিবীর সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভালোবাসি। তুমি আমাকে যতটা ভালোবাসো, তার থেকে কিছুটা কম ভালোবাসি।
ঝর্ণা বেগম চট করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন,“আর সৌরভিকে?
ইরহাম মায়ের গালে সামান্য উঁচু হয়ে চুমু খেল। হাসল আবারো। বিগলিত কন্ঠে বলল,” তুমি বাবাকে যতটুকু ভালোবাসো, আমি ও সৌরভিকে ততটা ভালোবাসি।
ঝর্ণা বেগম নাক ফুলিয়ে তাকালেন৷ চোখের পাপড়িগুলো নড়ল হয়তো সামান্য। অবলিলায় স্বীকার আসলেন,”আমি তোমার বাবাকে তোমার মতোই ভালোবাসি ইরহাম।
ইরহাম আরাম করে শুয়ে পড়ল বেডে। বলল,”সেটাই তো বললাম, তুমি আব্বুকে যতটা ভালোবাসো, আমিও তোমাকে ততটাই ভালোবাসি।

নুসরাত এসে প্রবেশ করল। হাতে স্যালাইন লাগানো। একহাতে টানছে নিজের সাথে সে তা। দূর হতে শুয়ে দেখল ইরহাম। ঠান্ডা রুমটায় ভিপ ভিপ করে আওয়াজ হচ্ছে। মনিটরে দেখা যাচ্ছে শ্বাস চলাচলের স্থিরতা। দাঁড়িয়ে থেকে দেখল ইরহামের চেহারাটা। কেমন করে চেয়ে আছে ছেলেটা দূর থেকেই তার দিকে। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল ইরহাম,”কিছু বলেছিস, সৌরভিকে?
নুসরাত কথা বলল না, চুপচাপ চেয়ে রইল ঘাড় বাঁকিয়ে ইরহামের দিকে। ইরহাম জায়গা করে দিয়ে সামান্য সরল ওপাশে। ব্যথা পেল হাতে, মুখ কুঁচকে ব্যথাতুর শব্দ বের করল। নুসরাতকে তখনো অশরীরীর মতো তার দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে, নিজের পাশের জায়গা দেখিয়ে বলল,”বস..!
বসল না। দাঁড়িয়ে রইল। ইরহাম টেনে শ্বাস ফেলল। বুকের ভেতর দলা পাঁকানো কথা গুলো গিলে নিল কোনোরকমে। বলল,”স্ট্যাচু অব লিভার্টি হয়ে গেলি দেখি? সমস্যা কী? এমন ঘুরছিস কেন আমায়?
নুসরাত বসল ইরহামের কাছ ঘেঁষে শব্দ করে। ইরহাম কালো মুখটা দেখে ঠাট্টা করল,”কেঁদেছিস আমার জন্য?
নুসরাতের রুঢ় উত্তর,” না.!.

“রাগ করেছিস আমার উপর?
“ না..!
“হাতে কী লাগিয়েছিস ওইটা?
“স্যালাইন।
“ শরীর খারাপ তোর?
“হ্যাঁ..!
“ তাহলে রেস্ট নিতি, এত কষ্ট করে আসলি কেন?
“আমার ইচ্ছা..!
ইরহাম মাথা দোলাল। আবার জিজ্ঞেস করল,“সৌরভির সাথে কথা বলা বাদ দিয়ে দিয়েছিস?
“হ্যাঁ..!
“ কেন?
“আমার ব্যক্তিগত বিষয়..!
ইরহাম উঠে বসার চেষ্টা করল, পারল না। ব্যর্থ হলো! নুসরাত দেখল, তবুও ভাবশূন্য চেহারা নিয়ে তাকিয়ে রইল। হাসল ছেলেটা। বলল,”কী রাগ রে তোর নুসরাত? এত রাগ কেন তোর?

“আমি রাগ করিনা।
“ আসলেই?
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে তাকিয়ে রইল নুসরাতের দিকে সে। নুসরাত উত্তর দিল না, প্রয়োজন বোধ মনে করল না। ইরহাম আবার বলল,”আমি জানতাম বিষ ছিল খাবারে।
“তবুও খেয়েছিস?
“ হ্যাঁ..!
“কেন?
“ওর ক্ষোভটা আমার উপর থেকে মিটাতে চেয়েছিলাম।
নুসরাত কিছুক্ষণ ইরহামের দিকে তাকিয়ে থেকে উঠে দাঁড়াল। যেতে গিয়ে থামল। জিজ্ঞেস করল,”সৌরভির প্রতি তোর অনেক পিরিত, তাই না?

ইরহাম মাথা দোলাল উপর নিচে। নুসরাত দু-পা এগিয়ে আসলো তার দিকে। কিছু বুঝে উঠার সুযোগ না দিয়েই ক্যানেল ধরে টান মেরে বসল মেয়েটা। ইরহাম গলা ফেটিয়ে চিৎকার করে উঠল। কানে ভেসে এলো,”ভালোবাসা দেখে আমি শিহরিত। তুই মরে গেলি না কেন, কুত্তা? বেঁচে আছিস কেন? মর শালা মর, মরে কবরে যা।
ইরহাম হাসল। হাতে চিনচিন ব্যথা করছে। তবুও ঠোঁট থেকে হাসি সরছে না। মৃদু মন্দ রক্ত বের হচ্ছে। বিগলিত কন্ঠে বলল,”আমি তোর থেকে তেরো দিনে বড়। সম্মান দে শালি..!
“তোর ওই বালের তেরো দিন আমি গুণাই ধরি না। যা সর..!
যেতে যেতে খামচি একটা বসিয়ে গেল ইরহামের পেটে।এরপর ইসরাত আর আহান দু-জনেই ভেতরে প্রবেশ করে ফ্যা ফ্যা করে কান্না জুড়ে দিল। আহান নাক মুছল টিস্যু দিয়ে। কথা বলতে গিয়ে নাক দিয়ে সর্দি বের হয়ে গেল। তা দেখে ইরহাম বলল,”আগে নাক পরিস্কার করে আয়, পরে কথা বলিস। খবিসের মতো, গেৎ গেৎ করিস না।
আহান তা শোনে ও কাঁদল। ইরহাম অবাক হয়ে জানতে চাইল,”কীরে কাঁদছিস কেন? আমি তো মরিনি, বেঁচে আছি।
আহান নাক টানতে টানতে বলল,”আমি তার জন্য কদছি না।
ইসরাত তড়াক করে জিজ্ঞেস করল,“তাহলে কেন কাঁদছিস?
আহানের নিরুদ্বেগ কন্ঠস্বর পুরো রুমে ভাসল। কাঁদো কাঁদো আওয়াজ, সাথে নাক টানার ও শব্দ ভাসল“ ভাইয়াকে সুস্থ দেখে খুশিতে আমার কান্না পাচ্ছে।

কথাটা শেষ করে নাক মোছা টিস্যু দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে কেঁদে ফেলল। ইরহাম আর ইসরাত দু-জনে দু-জনে মুখ চাওয়া চাওয়ি করল। অতঃপর তাদের হাসির দমকে কেঁপে উঠল পুরো আইসিইউ রুম।
আহান আর ইসরাত যাওয়ার পর আর কাউকে ঢুকতে দেওয়া হলো না ভেতরে। রোগী রেস্ট নিবে বলে ইনজেকশন পুশ করা হলো তাকে। সৌরভি তখনো বাহিরে দাঁড়িয়ে আছে অধীর আগ্রহে। কখন সন্ধ্যা ছয়টা বাজবে, কখন সে ভেতরে যাবে সেই আশা নিয়ে। সারাদিন কাটল তার উদ্বেগ নিয়ে। সন্ধ্যা ছয়টা বাজতেই তৎপর হলো তার সমগ্র হৃদয়।
ইরহাম তখনো ঘুমিয়ে তাই নার্সরা ভেতরে প্রবেশ করতে দিল না। রোগীকে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাতটা পর্যন্ত দেখার সময় এর ভেতরে সবাই দেখবে। নুসরাত চুপচাপ দূরে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে। সৌরভি একবার এসে বলতে চাইল তাকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না, কিন্তু নুসরাত রক্তিম চোখ দুটো দেখে কিছুই বলতে পারল না, চুপচাপ ফিরে গেল আবার দরজার সামনে।

ঘড়ির কাটায় তখন ছয়টা চল্লিশ বাজছে। একজন নার্স এসে বললেন,”আপনাকে ভেতরে যেতে বলেছেন রোগী।
দ্রুত পদক্ষেপে ট্রান্সপারেন্ট দরজা ঠেলে দিয়ে ভেতরে ঢুকতে গিয়ে নিজেকে থামিয়ে নিল সৌরভি। দাঁড়িয়ে টেনে শ্বাস ফেলল। আস্তে ধীরে পা ফেলল সম্মুখে। দরজা খুলল ধীর স্থির ভঙ্গিতে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে ইরহাম। সৌরভি এগিয়ে যেতে যেতে ডাকল,”ইরহাম, জেগে আছো?
চোখ খুলে তাকাল না ছেলেটা। নীরব শুয়ে রইল। সৌরভি মাথা উচিয়ে তাকাতেই দেখল নিভু নিভু চোখ গুলো মেলে, তাকিয়ে ওকেই দেখছে। সবুজ বাদামির মিশ্রণের গভীর চোখ দুটো নিষ্প্রাণ হয়ে আছে। কেমন করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সৌরভি বুক কাঁপে, অন্তরঃআত্মা লাফিয়ে উঠে। বিছানায় শোয়ারত মানবটার ভেতরে যেন প্রাণ নেই, আগের চঞ্চলতা নেই, কেমন নিস্ক্রিয় হয়ে গেছে৷ ইরহাম সামান্য হাসে, ডাকে,”ফক্সগ্লোভ আমার…
সৌরভি মাথা উচিয়ে তাকায় না চাইতেও, ডাকে সাড়া দেয়। ইরহাম হাসে আবারো, নিষ্প্রাণ তার সেই হাসি৷ সৌরভিকে নিজের আরো কাছে ডাকে ইশারায়৷ সে ঝুঁকে আসতেই আবেদনময়ী গলায় অবুঝের মতো করে বলল,”মে আই কিস ইউ ওয়ান্স? প্লিজ না করবে না..!
সৌরভি ঝুঁকে থাকল ওভাবেই ইরহামের দিকে। কিছু বলার জন্য পুরু ঠোঁট জোড়া ফাঁক করতেই, ইরহাম নিজের পুরন্ত ঠোঁটের ভাঁজে পুরে নিল রমনীর সূক্ষ ঠোঁটজোড়া। অনুমতি চাইলেও, অনুমতি পাওয়ার তোয়াক্কা করল না। তৃষ্ণাত চাতকের ন্যায় আকড়ে ধরল রমনীর ওষ্ঠপুট। কোনো এক ঘোরের মধ্যে ডুবে রইল সে। অধরের ভাঁজে সময় নিয়ে বিরাজ চলল তার৷ ফক্সগ্লোভ তখনো চুপচাপ তাকিয়ে। ইরহামের করা কান্ডে নিষ্প্রাণ তার বদন। যতক্ষণ মানবের বিরাজ চলল তার ওষ্ঠপুট জোড়ে, ততক্ষণ নির্জীব, নিস্তব্ধ, উদ্বেগহীন বসে রইল একইজায়গায়, একইভাবে।

১৩-০৯-২০২৫
শনিবার….
ইসরাতের কথামতোই সৌরভিকে দেখানোর জন্য একজন সাইকোলজিস্ট এর অ্যাপোয়েমেন্ট নিয়েছেন শোহেব সাহেব। আজ সকাল দশটা থেকে তাদের সেশন শুরু। সৌরভিকে তার শ্বশুর মশাই নয়টা পঁঞ্চাশ মিনিটে এনে দিয়ে গেছেন সাইকোলজিস্ট এর বাসভবনে একদম দো-তলার ঘরটায় পৌঁছে দিয়ে হসপিটালে গেলেন শোহেব সাহেব। বড় চার কোণ আকৃতির একটা রুম।৷ বাতাস বইছে খুব হালকা। ঘরটা তেমন আলোময় নয়, সামান্য অন্ধকার। ঘরের চার কোণে চারটা মাঝারি আকৃতির প্ল্যান্ট। সেগুলোর পাতা বাতাসে উড়ছে। ঘরে একদম মধ্যিখানে ডিভান, কাউচ আর দুটো সোফা। মাঝখানে মিনি সেন্টার টেবিল। বড় জানালায় বাদামি আর সাদা মিশ্রণের পর্দা। যা প্রাকৃতিক বাতাসে দুলছে উড়ছে। সৌরভি চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো ঘরটা অবলোকন করল। মুখের ভাবগতি স্বাভাবিক।
চারদিন পূর্বে করা ঘটনায় মুখে কোনো অপরাধবোধের ছাপ নেই। কেমন আগের মতোই নির্জীব আছে।
মোহাম্মদ রায়হান কবীর সাইকোলজি স্পেসালিস্ট। তার কাছেই আজ সৌরভি এসেছে। ভদ্রলোক শুভ্র চেহারার মেয়েটাকে একবার দেখে নিয়ে সামনের সোফায় বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন আদুরে ভাব নিয়ে,”নাম কী তোমার?
সৌরভি সময় নিল না, এক সেকেন্ডেই উত্তর দিল,”সৌরভি শিকদার।

“তা আজ এখানে তুমি কেন এসেছে, তার কারণ জানো?
সৌরভি আগের মতো গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
“জ্বি জানি..!
“ বলো তো কী কারণ?
এবার একটু সময়ের জন্য তার ভাবনাদ্বয়ে খেলে গেল চিন্তা। সময় নিল সে। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে বলে ওঠল,”আমি ডিপ্রেশনে ভুগছি।
রায়হান কবীর নিজের গম্ভীর মুখে হাত ঠেকালেন। বললেন,”তুমি মানো তুমি ডিপ্রেশনে ভুগছো?
সৌরভির নির্লিপ্ত স্বর,“জ্বি..!
“তার কারণ কী?
পরপর প্রশ্নের উত্তর দু-পাশে মাথা দুলিয়ে নির্বিকার চিত্তে আসলো,“জানি না।
“আচ্চা না জানলে আর কী করার..!
ভদ্রলোক থামলেন। সরাসরি তাকালেন সৌরভির দিকে। নিজের বুদ্ধিদীপ্ত চোখগুলো দিয়ে দেখলেন মায়াবী মেয়েটাকে। বললেন,”তুমি এই মুহুর্তে কী কী অনুভব করছো? সবচেয়ে বেশি কোনটা, রাগ, দুঃখ, ভয় নাকি হতাশা?
সৌরভি সময় নিয়ে বলল,”দুঃখ..!
“কেন?
চেহারার ভাবগতি স্বাভাবিক রেখে উত্তর দিল,“ ইরহামকে আমি মারতে চাইনি, বিষ দিতে চাইনি, তারপরও কীভাবে কীভাবে যেন ব্যাপারটা হয়ে গিয়েছে আমার দ্বারা।
রায়হান কবীর অবাক হওয়ার নাটক করলেন। অত্যাশ্চার্য কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,”তুমি কাকে বিষ দিয়েছ?

“আমার স্বামীকে..!
রায়হান কবীর হাসলেন মৃদু। ধীরে ধীরে আগালেন এবার ঘটনাপ্রবাহ এর দিকে,”কোন কারণে বিষ দিয়েছ তাকে? সে কী তোমাকে শারিরীক নির্যাতন করত?
“না, শারীরিক নির্যাতন করেনি কখনো।
“তাহলে পিজিকাল ভাবে কোনো হয়রানি করত?
সৌরভি দু-পাশে মাথা দোলাল। বলল,”সেটা ও না!
ভদ্রলোক শ্বাস ফেললেন। বিড়বিড় করলেন নিজ মনে,” ভেরি কমপ্লিকেটেড..!
তারপর জিজ্ঞেস করলেন,“তাহলে এটা বলো, তোমাদের ভেতর পিজিকাল রিলেশন ছিল?
সৌরভি মাথা দোলাল। রায়হান কবীর বুঝেছেন যেন সেভাবে মাথাটা আবারো দুলিয়ে নিলেন। বললেন,”তাহলে তোমার স্বামীর প্রতি কোন বিষয় নিয়ে তোমার ক্ষোভ? আমাকে ধীরে ধীরে বিস্তারিত কাহিনীটা বলো, এবং কোন বিষয়টা তোমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়েছে তা ও জানাও?

সৌরভি হাতের দিকে চোখ স্থির করল। মুখের রঙ বিবর্ণ। অনেকদিন ঠিকঠাক মুখ সে নিজেই দেখেনি আয়নায়। মেয়েলি মোমের মতো নরম চেহারাটায় সামান্য আক্ষেপের ছায়া খেলে গেল। পাখির কলকলানি মতো রিনঝিনে সেই কন্ঠস্বরটা বারি খেল চারিদিকে “আমাদের বিয়ে হয়েছিল বাইশ আগস্ট। বিয়েটা আমার জন্য সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল। আমি কখনো চাইনি ইরহামের মতো ব্যক্তি আমার স্বামী হোক। যে প্রতিদিন একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে সে আবার কখনো ভালো স্বামী হতে পারবে?
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে থামল সে। রায়হান কবীর বললেন,”হ্যাঁ তুমি তোমার দিক দিয়ে ঠিক সেটা আমি বুঝতে পারছি, এরপর কী হলো, বলো?
“আমার দাদা নিজাম শিকদার ভদ্রলোক অনেকবার নুসরাতের সাথে মিশতে না করেছেন…
“স্যরি মাঝখানে ঢোকে পড়ছি, নুসরাতটা কে?

সৌরভি পানি এক ঢোক খেয়ে নিল। বলল,” নুসরাত আমার ননদ। বলতে পারেন আবার খুব কাছের বন্ধু। ওর জন্যই ও বাড়িতে চলাচল আমার বেশি ছিল। আমার দাদার না মানতাম না কখনো আমি। বলতাম কিছু হবে না। কিন্তু উনার কথা একদিন সত্যি হয়ে গেল, আমি আর ইরহাম একরুমে আটকা পড়লাম। আমি সাপের ভয়ে হুঁশ হারালাম। এরপর কী হলো জানি না! হুঁশ যখন ফিরল মানুষের সমাগম। একদিক থেকে এ টানছে একদিক থেকে সে টানা হিঁচড়া করছে আমায়। আমি হতবিহ্বল, নির্বাক। অবাক হয়ে দেখি সব। হচ্ছে কী আমার সাথে? যখন জানতে পারলাম আমার আর ইরহামের বিয়ে৷ আমি মেনে নিতে পারলাম না। যাকে কখনো ওই চোখে আমি দেখিনি তার সাথে আমি বিয়েটা মেনে নিব কীভাবে? কোনোদিন কোনো ছেলের সঙ্গে কমিটমেন্টে যাইনি সেই আমি জড়িয়ে পড়লাম এক চরিত্রহীন লোকের সাথে। আমি কখনো ভাবিনি আমার ভাই আমার দাদা সবাই আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। একজন ভিক্ষুক এমন আহাজারি করলে সবার মন গলে যায় আমি সবার কাছে ভিক্ষা চাইলাম কিন্তু কেউ শুনল না। বললামও আমাদের ভেতর কিছু হয়নি তবুও কেউ শুনল না। জোর জবরদস্তি করে আমাদের বিয়েটা শেষ পর্যন্ত পড়িয়ে দিল। আমি হতবাক হওয়ার সময়টুকু পেলাম না। অতঃপর আমাদের ঢুকিয়ে দেওয়া হলো রুমের ভেতর। সেদিন রাতে আমি ভেবেছিলাম ইরহাম আমার সাথে জোর জবরদস্তি করবে কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ও কোনো রিয়েক্ট করল না।

আমার এক মন তার এসব কাজ দেখে অবাক হচ্ছিল, একমন বিরক্ত। আমার পরিবার যেখানে আমার হাত ছেড়ে দিয়েছিল সেখানে অপরিচিত ছেলেটা আমার হাত ধরে নিয়েছে। কেন ইরহাম খারাপ ব্যবহার করছে না আমার সাথে? রাত জেগে প্রেম করা ছেলেটা আমার জন্য ওসব বাদ দিয়েছে। সারাদিন বাঁদরামি করে বেড়াত যে সে আমি আসার পর থেকে, আমার খেয়াল রাখত, বাঁদরামি করা ছেড়ে দিয়েছিল। এমনকি আমাকে একা রেখে কখনো কোথাও যেত না! আমি বজ্রপাত ভয় পাই বলে, বৃষ্টির দিন রাতে চুপচাপ চেয়ার টেনে বসে থাকত যাতে আমি ভয় না পাই, দুশ্চিন্তা মুক্ত হয়ে ঘুমাই, কিন্তু এসব আমি কোনোভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না তার ভালোমানুষি। তাই ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করতে শুরু করলাম আরো বেশি। কিন্তু ও? সবসময় সবটা মানিয়ে নিত। এই যে আমার এই এখনকার চেহারা, যে কেউ ভালো করে তাকালে ভয় পাবে। সেদিন আমার ননাস প্লাস জা নিজেও আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল সেটা আমি নিজেও উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমাকে তারা ভয় পাচ্ছে। আমার পরিবার যখন আমার সাথে থাকার কথা ছিল তখন আমার হাত তারা ছেড়ে দিয়েছিল, সেই কারণে আমি আক্রমণাত্মক ইরহামের দিকে হয়ে গেছি। ইরহামের জন্য সবকিছু হয়েছে আমার মন বলত। ওর উপরেই সবকিছুর রাগ গিয়ে পড়ত। তাই শেষ কদিন ধরে আমি ভাবছিলাম কী করা যায়! একবআর মন বলছিল ইরহামের কোনো ভুল নেই, সে চমৎকার একজন মানুষ তার সাথে অনায়াসে আরো দু-যুগ সাংসারিক জীবন কাটিয়ে দেওয়া যাবে। একবার অন্যকিছু মন বলছিল। যেদিন এই ভাবনা আসে এরপরের দিন আমাদের রোজকার ঝগড়াঝাটি দেখে ওর পরিবার আমাদের সেপারেশন এর কথা বলল, কিন্তু ও মানল না। সোজা গলায় বলল সেপারেশনে যাবে না। এই নিয়ে আমাদের ঝামেলা হলো রাতে। সেই ঝামেলার ভেতর অনাকাঙ্ক্ষিত একটা ঘটনা ঘটে গেল।

রায়হান কবীর মনোযোগ দিয়ে কথা শুনছিলেন। সৌরভিকে থেমে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,”কোন ঘটনা?
“সেদিন রাতে ইরহাম আমার কাছাকাছি এসেছিল।
রায়হান কবীর জানতে চাইলে,”তোমার সাথে কোনো প্রকার জোর জবরদস্তি করেছিল?
“নাহ..! আমি মানা করতে চেয়েছিলাম কিন্তু সম্ভব হয়ে উঠেনি।
“এটা তোমাকে সবথেকে বেশি কষ্ট দিয়েছে?
সৌরভি বাক্য ব্যয় করল না, মাথা দোলাল শুধু। রায়হান কবীর জিজ্ঞেস করলেন,”নিজেকে নিয়ে কী ধরনের চিন্তা আসে তোমার ভেতরে?

“কোনো চিন্তাই আসে না এখন আর।
“রাগ হলে কী করো তুমি?
“ইরহামকে থাপ্পড় মেরে দেই।
“ এর বিপরীতে সে কখনো ঘুরিয়ে থাপ্পড় মেরেছে?
“না, ও আমাকে মারেনি এখনো পর্যন্ত।
বিয়ের রাতে দুটো থাপ্পড় খেয়েছিল তা চেপে গেল অনায়াসে সৌরভি। রায়হান কবীর জিজ্ঞেস করলেন,”আগে এমন ট্রমার সম্মুখীন হয়েছিলে কখনো?
“কখনো হইনি..!
“ তোমার পরিবারের সাথে সম্পর্ক এখন কেমন?
“প্রায় ভঙ্গুর দশা। যা বলেছিলাম তখন।
“বিয়ের পর আর কখনো দেখা হয়নি তাদের সাথে?
“না..!
“ তুমি দেখা করার চেষ্টা করোনি?
“না। যারা আমাকে বিশ্বাস করে না, তাদের সাথে দেখা করার প্রয়োজন বোধ আমি মনে করিনা।
“ তুমি ইরহামকে বিষ দিয়েছিলে কেন তাহলে? আমি তো ভেবেছি ওদের কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য।
সৌরভি চুপ করে বসে রইল। উত্তর খুঁজে পেল না সে। রায়হান কবীর বললেন,’”নিজের পাশে এখন ভরসাযোগ্য কে আছে?
তার উত্তর ভেসে এলো

“ইরহাম..!।
“ওকে তো বিষ দিয়েছ তাহলে ও কেন তোমাকে নিজের পাশে রাখবে?
নিজের কথায় অটুট থাকল সে। বলল তেজ নিয়ে,”“ও আমাকে রাখবে।
হাসলেন রায়হান কবীর। হাতের ফোনটা টেবিলের উপর রাখলেন। ফোনের ওপাশের ব্যক্তি হাসছে নৈঃশব্দে। জিজ্ঞেস করলেন,”এখন তুমি কী চাও, সৌরভি? ইরহামের কাছে থাকতে চাও নাকি সেপারেশনে যেতে চাও?
ঘড়ির কাটায় টিকটিক করে এগারোটা বাজছে। বাতাস বইছে রুমটায়। সোনালি সূর্যটা আলো ছড়াচ্ছে দীপ্তির সাথে। সৌরভি এখনো সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। হাওয়া এসে উড়িয়ে দিল পর্দা। বাহিরে গাছগুলো নড়ে উঠল৷ তার সাথে ভেসে এলো ভেতরে বসারত রমনী কলকলে স্বর,”আমি এখন ইরহামের সাথে থাকতে চাই।
“কেন?
“ ও আমাকে সবার থেকে বেশি বিশ্বাস করে।
“শুধু বিশ্বাস করে বলে?
প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন রায়হান কবীর। সৌরভি হাতের উপর থেকে চোখ সরাল৷ সরাসরি তাকাল ডাক্তারের দিকে। মুখ ফসকে মনের কথা বাহিরে বেরিয়ে আসলো ,”ভালো ও বাসে।

আকাশে হলদেটে আলো খেলা করছে। কখনো তা হলুদ হচ্ছে তো কখনো কমলা। মাগরিবের আজান পড়বে একটু পর। পর্দাগুলো আঁকাবাঁকা হয়ে উড়ছে বাতাসের ঝাপটায়। নির্বিচ্ছিন্ন পরিবেশে এক ফালি মিয়ানো রোদ এসে খেলা করছে সাদা সিঙ্গেল বেডটার উপর। নুসরাত শুয়ে শুয়ে চুপচাপ দেখছে বাহিরের পরিবেশ। নিজের উপর রাগ উঠছে তার ভীষণ। কেন সেদিন ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে গিয়ে এমন বেগ পোহাতে হয়েছিল। কোনো কারণ নেই! কারণহীন একটা কাজ করায় এখন নিজেই নিজের কাছে ছোট হচ্ছে। আত্মগ্লানি এসে চেপে ধরছে তাকে। আপেলে কামড় বসাল একটা৷ চিন্তারা একসাথে এসেছে দলবদ্ধভাবে। নুসরাত সেসব ভাবতে চাইল না। যা হয়ে গিয়েছে তা হোক! এখন দেখার পালা সামনে কী হয়! আকস্মিক তার শরীর বেয়ে খেলা করে গেল একটা ঝাঁকুনি। সেই ঝাঁকুনির সাথে তার মনে পড়ল কী বিচ্ছিরিভাবে সে কেঁদেছিল নাকে কান্না। ইরহাম, ইসরাত ছাড়া আর কেউ দেখেনি তো সেই কান্না? মনে প্রশ্নের উদয় হলো! আবারো বিরক্তিতে তেতো হয়ে আসলো জিভের ডগা। চ্যাহ.. এই কাজ করেছে সে। ভুলে যেতে চাইল ব্যাপারটা কিন্তু মন বারংবার ভুলে যেতে চাওয়া কথাটাই এনে সামনে রাখল। মনে করিয়ে দিল সে কী কী কান্ড করেছে এ দু-দিনে। নিজেকে নিজেই ভৎসনা করল সে,”ছিহ্… নিব্বি একটা..!
গালে হাত ঠেকিয়ে তাকিয়ে রইল বাহিরের দিকে। থাইগ্লাসের সামনে পর্দা উড়ছে। নুসরাত আরেক কামড় বসাল আপেলে। চোখের দৃষ্টি সংকীর্ণ হয়ে আসলো। বাহিরের দিকে তাকিয়ে রইল অনেক সময় নিয়ে। বিড়বিড় করল কিছু একটা।

মাত্র আজান দিয়েছে মাগরিবের। নাছির সাহেব সুস্থ এখন। আরো দু-দিন ডাক্তার বলেছে অবজারভেশনে রাখবে তাকে। এখান থেকে ষোলো তারিখ ছাড়বে। এই চারদিনে নুসরাতের সাথে তার দেখা হয়নি বললেই চলে। আজ সন্ধ্যা বেলা তাকে ছাড়া হয়েছে। এই তিনদিনে তার শরীরে তিনটা স্যালাইন পুশ করা হয়েছে। আগের তুলনায় শরীর এখন ভালো। নাছির সাহেব জায়নামাজ বিছিয়ে নিয়ে দাঁড়ালেন একপাশে। ইসরাত ওযু পড়ে বের হয়েছিল। বাবাকে নামাজে দাঁড়াতে দেখে বাঁ-পাশে এসে দাঁড়াল। অতঃপর দু-জনে মনোযোগী হলো নামাজে।
নুসরাত দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই এই অবস্থা দেখল৷ ওযু পড়েই এসেছিল সে। বগলদাবা ছিল জায়নামাজ, আলগোছে বাবার ডানপাশে তা বিছিয়ে দিল সে।

নাছির সাহেব নামাজ শেষে দু-পাশে যখন সালাম ফিরালেন তখন দু-মেয়েকে দেখে হাসলেন সামান্য। দু-হাত তুলে দোয়া করলেন রবের নিকট। তারপর উঠে গেলেন। জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে নিজের বরাদ্দকৃত জায়গা শুয়ে পড়লেন। ইসরাত নামাজ শেষে উঠে কিছুক্ষণ পায়চারি করল এদিক সেদিক। চোখ উল্টে নুসরাতের কান্ড ও দেখছিল সাথে। মেয়েটা উঠে বাবার কাছে যাচ্ছে। হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নিচের দিকে রেখে কথা সাজাচ্ছে। হ্যাঁ কথা সাজাচ্ছে সে! অতঃপর শান্ত অথচ গম্ভীর কন্ঠ বারি খেল ইসরাতের কানে। তড়াক করে বোনের পানে তাকাল। এটা নুসরাতের কথা বলার ধরণ না, কথা বলার ধরণ বদলেছে। যে কথা বলতে গেলেই হেসে গড়াগড়ি খেত আজ হাসছে না একটুও। কথার এক একটা শব্দ বের হচ্ছে মেপে মেপে। কানের কাছে প্রতিধ্বনি হলো কিছু শব্দ,”বদলে গেছে ও, পুরোপুরি বদলে গেছে! গত দুদিনে তোমার বোনের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে।
ইসরাতের বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। চোখের পাতা পড়তে ভুলে গেল। হা করে অদিকে তাকিয়ে থাকল সে। নুসরাত কথা তখনো গমগম করে ভাসছে পুরো রুমে।
“আব্বা, আমি কতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আপনি জানেন? আপনি আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করলেন কেন? আমি ঠিক আছি! এত চিন্তার কোনো বিষয় নেই। আর কখনো এত চিন্তা করবেন না, হু? ওকে?
নাছির সাহেব মেয়ের হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরলেন। বললেন,”কথা দাও আর কখনো কাঁদবে না। কথা দাও, কখনো কাঁদবে না।

“কথা দিচ্ছি আর কাঁদব না।
নাছির সাহেব মায়া নিয়ে তাকিয়ে রইলেন মেয়ের শ্যাম মুখের দিকে। হাত মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বললেন,”তোমাদের দু-বোনের চোখে পানি দেখলে আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনা। তোমাদের কিছু হলে আমি নিজেকে দোষী মানব, আমার জন্য আজ তোমার এ অবস্থা। বলো আর কখনো, কোনো পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়বে না, কাঁদবে না। কথা দাও আমায়।
নুসরাত চুমু খেল বাবার হাতের মুঠোয়। নির্বিকার মুখে তাকিয়ে থেকে বলল,”আর কখনো কাঁদব না। ওইদিনের কান্না-ই আমার শেষ কান্না, আব্বা। কথা দিচ্ছি, আপনাকে আর কাঁদব না কখনো, ভেঙে পড়ব না।
“কথা দিচ্ছো?
“ জ্বি কথা দিচ্ছি!

নাছির সাহেব ইসরাতকে কাছে ডাকলেন। ইসরাত হাঁটু গেড়ে বসল নুসরাতের পাশে। নুসরাত একবার তার দিকে তাকাল। কেমন চোখের দৃষ্টি নিষ্পৃহ! মেয়েদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন নাছির সাহেব। শরীর কাঁপছে ভদ্রলোকের। নুসরাত খেয়াল করল তা। আবারো চিন্তা করছেন হয়তো তাদের নিয়ে। এই বৃষ্টিমুখর দিনে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে আছেন।। নুসরাত গলা খাঁকারি দিল৷ বলল,”আব্বা, আপনি আপনার জীবনে সবথেকে বড় ভুল কী করেছেন জানেন?
নাছির সাহেব ভ্রু উচুতে তোলে জানতে চাইলেন,”কী?
নুসরাত হে হে করে হাসল। দাঁত উপরের দুটো বের করে নির্লজ্জের মতো বলল,“”দু-মেয়ে জন্ম দিয়েছেন একটা ছেলে জন্ম দিলেন না কেন? এই বয়সে তাহলে একটা কাঁধ থাকত আপনার ভার বহনের জন্য।
ইসরাত শব্দ করে হাসল। নাছির সাহেব চোখ পাকালেন। নুসরাত আবারো বলল,”এখনো সময় আছে একটা ভাই আনতেই পারেন।
“চুপ বদ… চুপ!

নুসরাত চুপ করল না। আগের মতো করেই বলল,”আমি কী বলছি আম্মাকে ভাই গিফট করার জন্য, আমি তো বলেছি একটা ভাই কোথাও থেকে এডপ্ট করতে, আশ্চর্য, এত রাগছেন কেন আপনি?
নাছির সাহেব রাগী কন্ঠে বলে ওঠলেন,”যাও বের হও আমার রুম থেকে, তুমি আস্তো একটা বদমাইশ হচ্ছো দিনে দিনে, তা কী তুমি বুঝতে পারছ? বাবার সাথে কেউ এসব নিয়ে মজা করে?
নুসরাত গেল না উল্টো চেপে বসল। বলল,”কেউ না করলে কী হয়েছে, আমি করতে পারব না, এমন কোনো বিধান বা নীতি আছে, যে ছোট ভাইয়ের আবদার বড় বোন করতে পারবে না?
“চুপ বদ..! চুপ..আর একটা কথা বলবে না তুমি..!
নুসরাত কথা বন্ধ করলই না উল্টো নাছির সাহেবের ঘাড়ে চড়ে বসল একটা ভাই তাকে দেওয়ার জন্য। নাছির সাহেব চোপ্, চোপ্ বললেন সে শুনল না তা। ভদ্রলোকে মেয়েদের জীবন নিয়ে চিন্তা বাদ দিলেন, তা দিতে হলো নুসরাতের কথায়। অতঃপর শক্ত আওয়াজে দু-মেয়েকে ধমকাতে ব্যস্ত হলেন যাতে মুখ বন্ধ করে দু-জনে।
ইরহামের শরীরে ক্যানেল লাগানো ছিল, হাতে স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে। বিষ প্রয়োগ করার জন্য শরীরের শক্তি কমেছে অনেক। জ্ঞান ফিরার পর যখন সে বলল সৌরভিকে কিছু না বলতে, তারপর কেউই কিছু বলেনি মেয়েটাকে। একজন সিস্টারকে সাথে করে নিয়ে সে এসে দাঁড়িয়েছিল নাছির সাহেবের রুমে সম্মুখে। সবাইকে কথা বলতে দেখে আবারো ফিরে যেতে চাইল ধীর পায়ে তখন নাছির সাহেব তাকে খেয়াল করে হাঁক ছুঁড়লেন,’”ইরহাম..!
গলা উচিয়ে ডাক দিতেই নুসরাত ধমকে উঠল তাকে,”গলার আওয়াজ ধীমি রাখুন আব্বা, এত জোরে চ্যাঁচাচ্ছেন কেন আপনি?

নাছির সাহেবকে ধমকে ধামকে ফিরে তাকাল ইরহামের দিকে। চেহারা উজ্জ্বলতা বেড়েছে মনে হলো ইরহামের তার কাছে। ভেতরে এসে বসতেই নাছির সাহেব বললেন,”নাও তোমার জন্য বড় ভাই এনে দিলাম।
“বড় ভাই লাগবে না, ছোট ভাই দরকার?
নাছির সাহেব আগের মতোই বললেন,”বড় ভাই হিসেবে ইরহামকে দিয়ে চালিয়ে নাও, আর ছোট ভাই হিসেবে আহনকে দিয়ে চালাও৷
আহানের নাম নিতেই আহান কোথা থেকে বাঁদরের মতো টপকে গেল হসপিটালে। হুলস্থুল বাঁধিয়ে দিয়ে দরজা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। সবাইকে বসে থাকতে দেখে আশাহুত কন্ঠে বলল,”সবাই আমাকে ছেড়ে আলোচনায় বসে গেছ.. ইস’স আরেকটু দেরী হলেই তো সব মিস করে ফেলতাম।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৪

আহানের কথায় বিশেষ ভাবাবেগ হলো না কারোর। আগের মতোই কথা বলায় ব্যস্ত হলো সবাই। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত নামা পর্যন্ত সবার ভেতর চলল নানাধরণের আলোচনা সভা৷ চোগলখোরি ও করল তারা সবাই মিলে। ইরহাম নিজের অসুস্থতা ভুলে লাফাল, নাচল। নুসরাতকে টেনে নিয়ে গেল নিজের সাথে কোমর দোলানোর জন্য। সময় বাড়ল যত, তত সকলে তাদের ভেতরের সকল দুঃখ হতাশা চাপা দিল ভেতরে। সুনশান কবরের মতো ঠান্ডা হসপিটালের তৃতীয় তলার একশত বারো নাম্বার রুম বানিয়ে দিল আড্ডাখানা। খোশগল্প চলল সারারাত সবার ভেতর।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৫৫ (২)

11 COMMENTS

  1. বোন পায়ে পড়ি তারাতরি সব গুলা পর্ব দেন 🙏

  2. আপু পরের পর্ব দেন 😞 তাড়াতাড়ি পরের পর্বে কি হবে জানার জন্য আগ্ৰহী👌🥰🥰🥰💖💐🍁💗🌹🌈🤭

  3. আপু পরের পর্ব দেন 😫💗👌🥰 তাড়াতাড়ি পরের পর্ব দেন 😞🫩🥹

Comments are closed.