ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯১
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
দু-দণ্ড শান্তিতে দুঃখ-বিলাস করার জো নেই প্রিয়তার।
বাড়িতে যেন কান্নার হিড়িক পড়ে গেল।
এত জনের উচ্চ ক্রন্দনরত একত্র কণ্ঠ ভেসে আসাতে খানিক হকচকিয়ে গেল প্রিয়তা। আড়াআড়ি চার পাঁচটা ভাঁজ পড়ল কপালে। সে নিজের খেয়ালে এতটাই ডুবে ছিল যে, এতক্ষণ ধরে বাড়ির এতো শরগুল তার কানেই আসেনি। এতো লোকসমাগম, চিৎকার-চেঁচামেচি, কান্নাকাটি—কিছুই টের পায়নি।
কান খাঁড়া হয়ে গেলো প্রিয়তার। একটু ধ্যান দিতেই শুনতে পেল মেজো আম্মুর কণ্ঠ। তাঁর আর্তচিৎকারের ধ্বনি ঘরে বসেই স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে প্রিয়তা। তিনি বিলাপ করতে করতে কিছু বলছেন, সেটা স্পষ্ট নয়—
তবে কথাগুলোর তীব্রতা এতো বেশি ছিল যে, অজানা আশঙ্কায় ছ্যাঁৎ করে উঠল প্রিয়তার বুক। মনের কোনে সবার প্রথম যে প্রশ্নটি উদয় হলো—মেজো আম্মু কাঁদছে কেন? বাড়িতে কী হয়েছে?
এতো কান্নাকাটি শুনে প্রিয়তা আর এক সেকেন্ডও বসে থাকতে পারল না। লাফিয়ে নেমে পড়ল বিছানা থেকে।
ফ্লোরে পা দিতেই প্রিয়তার পায়ের ব্যালেন্স টলে গেল। মাথাটা ঘুরে উঠল মৃদু ছন্দে। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এলো, জোনাকি পোকা উড়তে লাগল।
ফলস্বরূপ, আবারও বিছানায় ধুপ করে বসে পড়ল প্রিয়তা।
দুই হাঁটুর জোড়ায় এখনো অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাব কিছুটা রয়ে গেছে।
দুই মিনিট সব স্থির। অতঃপর আবারও সেই একই কান্নার উচ্চধ্বনি, এবার আরো জোরালো শোনা যাচ্ছে কণ্ঠ—
“আব্বুউউউ, তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পারো? আমাকে তুমি ছাড়া আর কেউ ভালোবাসে না, আব্বুউউ!”
প্রহেলিকার চিৎকার করে বলা কথাগুলোতে প্রিয়তার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল। চোখের আকৃতি বৃহৎ হয়ে এলো আপনাআপনি। মুখ ফস্কে বেরিয়ে এলো—
“মেজো আব্বু!”
প্রিয়তা আর বসল না। শারীরিক সকল দুর্বলতাকে উপেক্ষা করে একপ্রকার ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
দৌড়ে সিঁড়ির কাছে পৌঁছাতেই থমকে গেল প্রিয়তা। পা দুটো জমে বরফ হয়ে গেল আপনাআপনি। দৃষ্টি আটকে রইল ড্রয়িংরুমের ঠিক মাঝখানটাতে, যেখানে খাটিয়ার ওপর সাদা কাফনে মোড়ানো কাউকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার মাথার দুই পাশে বসে বিলাপ করতে করতে জ্ঞান হারাচ্ছে প্রহেলিকা ও প্রীথা।
তনুশ্রী বেগম পা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছেন। অরণ্য সমুদ্রও বাবার পাশে দাঁড়িয়ে চোখের পানি বিসর্জন দিচ্ছে। তাদের চোখে এখন আর কোনো ঘৃণা নেই। যেমনি হোক, মাথার ওপর বাবা নামের ছায়াটা তো ছিল। তাই বাবার শেষ বেলায় চাইলেও ঘৃণা আসছে না।
সারা বাড়ির বাতাসে সুগন্ধি ধূপ আর আতরের ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছে।
সাদমান শিকদার, সাজিদ শিকদার, সোহেব শিকদার নিষ্প্রাণ হয়ে বসে আছেন এক পাশে। তাঁদের দৃষ্টি ঘোলাটে। কেমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ভাইয়ের নিথর দেহটার পানে।
প্রীতম, প্রেম, রাজ, প্রিয়স্মিতা—তাদের এসবে যেন কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। তন্ময়, থিরা, তরীও কাঁদছে।
অনুশ্রী বেগম, অনন্যা বেগম, অর্থি বেগম, পরিণীতা, ঊষা, ইনায়া, পূর্ণতারা এক পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তাদেরও চোখে ও পানি চিকচিক করছে।
শোকাহত পরিবেশ। গ্রামের মানুষ আসছে আর মুখ দেখে দেখে যাচ্ছে। সাদা কাফনের কাপড়টা তুলতেই যখন ওই বীভৎস কাটা-ছেঁড়া মুখটা তাদের চোখে ভাসছে, তখনই ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে অনেকে। শিকদার বাড়ির মেজো কর্তা খালিদ শিকদারের মৃত্যু কীভাবে হয়েছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ সবকিছুই জানে রায়পুরবাসী। কিন্তু টু শব্দ করার মতো সাহস কারো কলিজায় নেই।
বাইরে গ্রামের মেম্বার, মাতবর চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ—পুরুষদের অভাব নেই। সকলে নিজেদের মতো ফিসফাস করতে বেস্ত। বড়ই ডাল দিয়ে বড় ডেগে মুর্দা গোসলের জন্য পানি গরম হচ্ছে।
চোখের সামনে ঘটা দৃশ্যগুলো যেন বিশ্বাস হলো না প্রিয়তার। নীল চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে গেল নোনা পানিতে। শুয়ে থাকা ওটা যে খালিদ শিকদার, সেটা তো আর মুখে বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রিয়তা রেলিং ধরে দৌড়ে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো। কাছে যেতে যেতে বুক ভেঙে কান্না এলো প্রিয়তার।
“মেজো আব্বুউ!”
প্রিয়তাকে দেখতেই ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন উপস্থিত প্রত্যেকে। এই মেয়েটা যেন একটা চলমান বিপদ। মেয়েটার দিকে তাকাতেও যেন ভয় পাচ্ছে সবাই।
প্রিয়তা ছুটে খালিদ শিকদারকে ধরতে গেলে রাগে জ্বলে গেলো প্রহেলিকা। ভয়ঙ্কর গর্জন দিয়ে উঠল—
“একদম তুই আমার আব্বুকে স্পর্শ করবি না। এখন খুশি হয়েছিস তো? আমার বাপটা মরে গেছে। তুই একটা ডাইনী জন্মেছিলি আমার সর্বনাশ করতে, আমার জীবনটাকে জাহান্নাম বানাতে। ওহ্ আল্লাহ্, তুই কেনো জন্মের সময় মরে গেলি নাহ্?
তুই প্রথমে কাড়লি আমার সুখ-শান্তি, তারপর কাড়লি আমার ভালোবাসা, আর এখন কাড়লি আমার আব্বুকে। এখন তো তুই শান্তি পেয়েছিস নিশ্চই? নাকি আমাকে মারা এখনো বাকি আছে?
ইচ্ছে থাকলে মেরে ফেল, এমনিও আমি আর বেঁচে কী করব? আমার বাঁচার কোনো কারণ তো তুই অবশিষ্ট রাখিসনি।”
বাক্যের মাধ্যমে কণ্ঠের ক্ষোভ উগরে দিল প্রহেলিকা। রাগে কাঁপছে প্রহেলিকা, চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে। কথাগুলো দিয়ে যেনো জীবন্ত পিষে ফেলতে চাইল প্রিয়তাকে। তার লালচে দুই চোখে নিজের জন্য অসীম ঘৃণা দেখতে পেল প্রিয়তা।
প্রহেলিকা যেন নিজের কর্মে সফল হলো। সত্যি সত্যি মনে মনে ভীষণ কষ্ট পেলো প্রিয়তার। দুই চোখের কোটর উপচে গড়িয়ে পড়ল নোনা পানি। বড়ো আপু তাকে এতো ঘৃণা করে! সত্যি কি প্রহেলিকার জীবনটা আজ তার জন্য এমন খাপছাড়া হয়ে গেছে?
ওর চোখের পানি দেখে আবার তেতে উঠলো প্রহেলিকা—
“একদম নেকামি করবি না। তোকে আমার সহ্যই হচ্ছে না। আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যা। তোকে আমি সহ্য করতে পারছি না। তবে মনে রাখিস, কাউকে কষ্ট দিয়ে, কারো সুখ ছিনিয়ে নিয়ে কেউ বেশি দিন সুখে থাকতে পারে না। বিশ্বাস কর, তোর এত সুখ, এত খুশি—এইসব ক্ষণিকের। এগুলোর একটাও তুই সারাজীবন ভোগ করতে পারবি না। আমার রুহের হায় তোর নিশ্চয় লাগবে। তুই ভালো থাকতে পারবি না। আমি যে শোকে জ্বলে মরছি, তার হাজার গুণ নির্মম আগুনে তুই জ্বলে মরবি। তোর জীবনও ছারখার হয়ে যাবে।”
প্রহেলিকার একটা একটা তীক্ষ্ণ শব্দ প্রিয়তার অন্তর অবধি গেল। নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলল প্রিয়তা। কেবল বলতে পারল—
“এত ঘৃণা করো?”
“উহু, পৃথিবীর তুই একমাত্র যাকে আমি ঘৃণা করি।”
বাড়ির অন্য কেউ কোনো উচ্চবাচ্য বাক্যলাপ করলেন না। কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেন।
প্রিয়তা হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছল। প্রহেলিকার সাথে বিবাদে না জড়িয়ে খালিদ শিকদারকে ধরতে হাত বাড়াতেই—
খপ করে হাতের কবজি চেপে ধরল প্রহেলিকা। হাত মুচড়ে ধরে মুখের ওপর ঝুঁকে এলো। দাঁতে দাঁত চেপে হিশহিশ করে বলল—
“বললাম না, ছুবি না। আমার আব্বুর মৃত্যুর হিসাব আমি ঠিক নেবো।”
প্রিয়তা অবাক হলো।
“আমি কী করলাম?”
প্রহেলিকা ফের আরও কিছু বিষবাক্য ছুড়ে দিতে উদ্যত হতেই লাগাম টেনে দিলেন সাদমান শিকদার। বেশ বিরক্তি নিয়ে ঝাঁঝিয়ে বললেন—
“আহ্, অযথা ওর ওপর চোটপাট করছো। ও কি তোমার বাপকে বলেছিল তাকে কিডন্যাপ করাতে সাহায্য করতে? নাকি বলেছিল জোর করে গর্ভপাত করানোর চেষ্টা করতে? তোমার বাবা কোনো কচি খোকা ছিল না যে সে বুঝবে না। সে সব জানত, এর পরিণাম ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে। তারপরও এই কাজটা করেছে। যার ফলস্বরূপ আজ শুয়ে আছে ওখানে। এখানে কারো কোনো হাত নেই।”
প্রহেলিকা যেন ফের আরেকটা ধাক্কা খেল। সবগুলো কথা তার মাথায় ঢুকলোই না। সে থমকে রইলো ওই একটা কথায়—
“গর্ভপাত!”
এর মানে প্রিয়তা প্রেগনেন্ট!
তৎক্ষণাৎ চকিতে প্রিয়তার দিকে ফিরে চাইলো প্রহেলিকা। তার দু চোখের কোটরে উপচে পড়া অবিশ্বাস। নিজেকে কেমন প্রাণহীন জড়বস্তু মনে হচ্ছে এখন।
প্রহেলিকা একদম চুপ মেরে গেলো। কোনো কথা বললো নাহ্, কেবল চোখ নামিয়ে থম মেরে তাকিয়ে রইল প্রিয়তার ছোট্ট পেটটার দিকে। একদম স্লিম পেট। বাচ্চা আছে কিনা, নেই—এখনো বোঝা যায় না। তবুও প্রহেলিকার মনে হচ্ছে প্রণয়ের অস্তিত্বের একাংশ ওখানে ধুপপুক করছে। অন্য কারো গর্ভে তার ভালোবাসার অংশ ডালপালা মেলছে ধীরে ধীরে। এটা কী সহ্য হয়?
প্রহেলিকা সবাইকে অবাক করে দিয়ে হটাৎ প্রচণ্ড শব্দ করে কেঁদে উঠল। কেঁপে উঠলো সেখানকার উপস্থিত প্রত্যেকে। সে যেন এক মুহূর্তে ভুলেই গেল তার বাবার মৃত্যুর কথা। বাবার মৃত্যুর থেকে এই শোকটা যেন বড় হল। পাগলের মতো বলতে থাকল—
“নাহ্, নাহ্, নাহ্! এটা হতে পারে না। আমার প্রণয়ের সন্তান আমি ব্যতীত অন্য কারো গর্ভে বেড়ে উঠতে পারে না। আআআআআ! আমি সহ্য করতে পারছি না।”
নিজের চুল নিজেই টেনে ছিঁড়তে লাগল প্রহেলিকা। তার এক একটা হৃদয় বিধায়ক আর্তনাদে কেঁপে উঠতে লাগলো বাড়ির পাথুরে দেওয়ালগুলো।
ওর এই অবস্থা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলে প্রিয়তা সহ সবাই। প্রহেলিকা কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ মেঝেতে পড়ে কেমন করতে লাগল। সকলে ভয় পেয়ে ছুটে এলেন। তবে ধরার আগেই জ্ঞান হারাল প্রহেলিকা। তার নাক মুখ দিয়ে গলগলিয়ে তরল রক্ত উঠে এলো।
ভালোবাসাকে চোখের সামনে অন্য কারো হতে দেখার যন্ত্রণা যে কতটা বিষাক্ত, তা প্রহেলিকা দেহের প্রতিটি অণুতে অণুতে টের পাচ্ছে। প্রণয়ের প্রেমে উন্মাদ প্রহেলিকার জন্য এর থেকে বড় শাস্তি হয়তো আর কিছু হতেই পারে না।
প্রিয়তা এসব দেখে আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সেখানে। প্রণয় কে সে অন্য কাউকে এক কনার ভাগ ও দিতে পারবে না, তাই এসব দেখে মন কে কষ্ট দেওয়ার মানেই হয় নাহ্। তাই ওখানে আর এক মুহুর্ত ও দাড়ালো নাহ্, প্রিয়তা দৌড়ে চলে গেলো।
খালিদ সিকদারের দাফন-কাফনের পর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, কেটে গেছে অনেকগুলো ঘণ্টা, কিন্তু এখনো বাড়ি ফেরেনি প্রণয়। কোথায় আছে, কী করছে, খেয়েছে কিনা—কিচ্ছু জানে না প্রিয়তা।
ফোনটাও সুইচ অফ বলছে।
এই না-জানাটা প্রিয়তাকে শান্তি দিচ্ছে নাহ্।
দুশ্চিন্তায় হাঁসফাঁস করতে করতে দম বন্ধ হয়ে আসছে মেয়েটার। প্রাণটা ছটফট করছে তৃষ্ণায়।
মানুষটা এত জেদি কেন হলো, সেটাই ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে যায়, কূলকিনারা পায় না রমণী।
প্রিয়তার শরীর আর চলে নাহ্।
সবটুকু শক্তি নিংড়ে নিয়ে যখন বিছানায় আছড়ে পড়ে, তখন পাশে পড়ে থাকা যান্ত্রিক ফোনটা থেকে ৬৬ বারের মতো ভেসে আসে—
“দ্য নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়ালড ইজ কারেন্টলি সুইচড অফ।”
অতঃপর আবার চুপ হয়ে যায় যন্ত্রটা। চারপাশে নামে ভারী নীরবতা।
প্রিয়তার মনে হয়, এই নিস্তব্ধতা তাকে গিলে নিচ্ছে।
নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার অগ্নিতে দগ্ধ হতে থাকে।
সময় বাড়ার সাথে সাথে শরীরের উত্তাপ বাড়তে থাকে হু হু করে।
এই গুমোট গরমেও শীতে কুঁকড়ে যায় মেয়েটা।
তীব্র জ্বরের তোপে মরিচের ন্যায় লালচে বর্ণ ধারণ করে চোখ-মুখ।
রুক্ষ শুষ্ক ঠোঁটে যেন চৈত্রের খরা নামে।
প্রচণ্ড পানি-পিপাসায় কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।
এত জ্বর গায়ে নিয়েও প্রিয়তমের চিন্তায় ব্যাকুল হয় প্রিয়তমার মন।
দু’চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া তপ্ত নোনা জলগুলো মনে করিয়ে দেয়, সে তার প্রণয় ভাইকে কতটা নিষ্ঠুরভাবে আঘাত করেছে।
অথচ সে তো জানতো, ওই মানুষটা তার কাছে কতটা অসহায়।
প্রিয়তার নিকট প্রণয় কতটা অসহায়, সেটা বুঝতে গেলে আগে অনুভব করতে হবে বাবা-মা ব্যতীত এক অন্ধ পথশিশু যতটা অসহায়।
নিজের বলা তিক্ত বাক্যগুলো যতবার মনে আসে, ততবার প্রিয়তার বুকটা অসহ্য বেদনায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়।
বারংবার মনে হয়, সে কীভাবে পারল নিজের ভালোবাসাকে এভাবে আঘাত করতে? কিভাবে পারলো ওরকম শক্ত শক্ত নিষ্ঠুর কথাগুলো নিজের মুখ দিয়ে বের করতে? ওই কথাগুলো বলার সময় কী কণ্ঠটা একবারও কেঁপে উঠেনি?
সে কি এতটাই পাষাণ হয়ে গেছিলো যে একবারও ভাবল না, এই কথাগুলো প্রণয় ভাইকে কতটা কষ্ট দেবে? তার মনে কতটা আঘাত আনবে? মানুষটা যে তাকে কতটা ভালোবাসে, তা তো অজানা নয়, তারপরও কীভাবে পারল?
কিসের এত জেদ?
এসব ভাবতে ভাবতে জ্বরের ঘোরে ছটফট করে কাঁদতে থাকে প্রিয়তা। বুকের সব থেকে গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়।
আবার যখন মনে পড়ে প্রণয় কী কী করেছে, তখন বড় অসহায় লাগে। এ যেন ধর্মসংকট।
ভালোবাসার মানুষটাকে মন কিছুতেই পাপী মানতে চায় না।
ভালোবাসার আদালতে আবার কীসের পাপ-পুণ্য? নীতি-নৈতিকতার ঊর্ধ্বে এক অন্য জগত, যেখানে প্রণয়ই একমাত্র ধ্রুবতারা।
সমাজ যাকে অপরাধী বলে, প্রিয়তার মন তাকে আরাধ্য মানে। যদি প্রণয়ের হাতটা চিরতরে আঁকড়ে ধরার অপরাধে নরকের আগুনে পুড়তে হয়, তবে প্রিয়তা সেই অগ্নিদহনকে স্বর্গীয় সুখ বলে মেনে নেবে। নীতি দিয়ে সে কি করবে, যদি তার ভালোবাসার পৃথিবীই ধ্বংস হয়ে যায়।
আর প্রিয়তা মোটেও তেমন মেয়েদের কাতারে পড়ে না, যারা ন্যায়-নীতির দোহাই দিয়ে ভালোবাসার মানুষটাকে ক্ষতবিক্ষত করবে, আঘাত করবে।
ভালোবাসা চরমতম অন্যায় করে ফেলেছে বলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেবে।
এতো বড়ো কলিজা নেই প্রিয়তার।
তার স্বীকারোক্তি—
“আমি সেই মহান মহীয়সী নারীদের কাতারে পড়ি নাহ্, যারা কিনা ন্যায়-নীতি-আদর্শের জন্য ভালোবাসাকে বিসর্জন দেবে।
বরং আমি তো সেই পাপিষ্ঠতম নারী, যেকিনা ভালোবাসার জন্য ন্যায়-নীতি-আদর্শকে বিসর্জন দেবে।”
প্রয়োজনে ভালোবাসার মানুষের হাত ধরে সে নরকবাস করবে, নরকের পথে হাঁটবে দুজন একসাথে। দুনিয়ার পর নরকই হবে তাদের পুনর্মিলন ভূমি।
তবুও ওই হাতটা ছাড়বে না প্রিয়তা। জীবনেও না, মরণেও না। ওই লোকটা ব্যতীত নিশ্বাস ফেলাই যেখানে দুঃসাধ্য, সেখানে তার দোষ-গুণের বিচার করার যোগ্যতা কী প্রিয়তার আছে?
সে মানুষ হিসেবে নিজের সবটুকু পবিত্রতা বিসর্জন দিতে রাজি আছে। খুব খুব খুব খারাপ, খুব নিকৃষ্ট হতেও রাজি আছে, তবুও চায় না তার প্রিয় অপরাধীর ন্যূনতম কোনো শাস্তি হোক।
ওই লোকটার গায়ে সামান্যতম ফুলের টোকা লাগলেও প্রিয়তা সইতে পারবে না, মরণ হবে নিশ্চিত।
থাকুক নাহ্ কিছু অপরাধী, তাদের বিচার না হয় আখেরাতেই হলো।
কিন্তু মনের শান্তির জন্য হলেও সত্যিটা জানা প্রয়োজন। কিন্তু কিভাবে? শরীরটা তার ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছে।
জল ছাড়া মাছের মতো তড়পাচ্ছে তার আসক্ত মন, পাগল হয়ে যাচ্ছে ভালোবাসাকে ফিরে পাওয়ার তৃষ্ণায়।
জ্বরটাও তার অতি প্রেমের বহিঃপ্রকাশ, গভীর প্রেমের উন্মাদনার প্রতিফলন। প্রিয়তমের মনে আঘাত দিয়ে সহ্য করতে পারেনি নিজেও।
যার ফলশ্রুতিতে এখন ১০৩ জ্বর।
অশান্তিতে এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় চোখ লেগে আসে প্রিয়তার। নেতিয়ে পড়া দুর্বল শরীরটা অবশ হয়ে আসে ক্লান্তিতে। তন্দ্রা জেঁকে বসে চোখের পাতায়। কার্নিশের দুই পাশে নোনা জলের রেখা শুকিয়ে যায়।
নিদ্রা গভীর হতেই ঘুমের মধ্যেই ঈষৎ কেঁপে ওঠে প্রিয়তা। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ দুটি নরম ভেজা স্পর্শে পুলকিত হয়।
ভেজা চোখের পাপড়িতে বারবার সেই নরম আদর অনুভূত হয়।
ঘুমের মধ্যেই নড়েচড়ে ওঠে প্রিয়তা। শক্তপোক্ত ভারী বস্তুটা খামচে ধরে আরেকটু গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
কিন্তু ভাবনা অনুযায়ী কিছুই হয় না। কিছুটা সময় যেতেই নিশ্বাসের অভাবে হাঁসফাঁস করে ওঠে রমণী।
নরম দুর্বল শরীর পাহাড়ের তলে চাপা পড়ে থাকার মতো অনুভূতি হয়।
নিশ্বাস নিতে পারে নাহ্। অস্থিরতায় ঘুম হালকা হয়ে আসে মুহূর্তেই।
শরীরে অমানবিক চাপ লাগলেও প্রিয়তার অবচেতন মনে সুখের তোরে ভেসে যায়।
তবে বেশিক্ষণ চোখ বুজে সুখ অনুভব করতে পারে নাহ্। নিশ্বাস নেওয়ার তাড়নায় জেগে ওঠে।
হঠাৎ করেই সেই অতি পরিচিত পুরুষালি গন্ধের সাথে ঘামের মিশ্র গন্ধ নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করতেই থমকে যায় প্রিয়তা।
অতি আকাঙ্ক্ষিত ঘ্রাণের নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রিয়তার অবশ দেহটা বুঝতে পারল এক বিশাল দেহের অস্তিত্ব।
প্রণয়ের দানবীয় আলিঙ্গনে নরম প্রিয়তা গলে যেতে চাইলো। তার ছোট্ট বুকের গভীরে জমা হতে থাকলো জাদুকরী সেই পুরুষের ভারী ভারী দীর্ঘশ্বাস। রক্তের অণুতে অণুতে মিশে যায় নির্দয় পুরুষটা।
নিশ্বাস বন্ধ করে ঠায় মরার মতো পড়ে থাকে কিছুক্ষণ।
অনেক কিছু বলতে চায়, কিন্তু গলা দিয়ে আর টু শব্দ বের হয় না।
ধীরে চোখ মেলে নিজের দিকে চেয়ে দেখে, পরনের গোলাপি টি-শার্টটা দুজনের চাপে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম।
টি-শার্টের ভেতর ঢুকে ঘুমানো একেমন অভ্যাস।
কাঙ্ক্ষিত মাথাটা দেখতে পায় নাহ্ প্রিয়তা।
ঢোক গিলে কাঁপা হাতটা টি-শার্টের ভেতর গলিয়ে দেয়। সাথে সাথেই আঙুলগুলো পৌঁছে যায় নরম সিল্কি চুলের গভীরে। তার দুর্বল হাতটা চুল ধরে নাড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পুরুষালী শক্তির নিকট পরাস্ত হয়।
তার পাখির ন্যায় ছোট্ট বুকে বাচ্চাদের মতো মুখ লুকিয়েছে প্রণয়।
যেমন কোনো অবুঝ শিশু তার সবথেকে নিরাপদ স্থানে মাথা গুঁজে দিয়েছে।
টি-শার্টের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছে, যেন ছেড়ে দিলেই চিরতরে হারিয়ে যাবে প্রিয়তা। আর তাকে কখনো পাবে নাহ্ প্রণয়।
আকড়ে ধরার ভঙ্গিমা বলে দিচ্ছে হারানোর ভয়টা কতটা তীব্র।
প্রিয়তার বুক ভার হয়ে আসে। আবারও তপ্ত অশ্রু জমতে থাকে আঁখি কোণে।
অভিমানী কণ্ঠ ধ্বনিত হয়—
“সারাদিন যেখানে ছিলেন, ওখানে যান… এখন কেনো এসছেন আমার কাছে? হু?
আপনাকে না ছুঁতে বারণ করেছি? তাহলে আবার কেন স্পর্শ করছেন?”
বলতে বলতে কণ্ঠ ছিঁড়ে কান্না বেরিয়ে আসে প্রিয়তার। তার বাক্য ফুরায় না, হাতের অমানবিক চাপ বেড়ে যায়। পুরুষটা যেনো নিজের সর্বস্বটা দিয়ে আঁকড়ে ধরতে চায়, যতটা নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরা যায়।
“আহ্…”
চেপে ধরার কৌশলে সামান্য ব্যথা পায় রমণী। ঠোঁট ফুটে ব্যথাতুর আর্তনাদ বেরিয়ে আসে।
বিপরীতে কিছু বলতে নিলেই শুনতে পায় এক সর্বস্ব হারানো পুরুষের অসহায় আকুতিমাখা কণ্ঠস্বর—
“তোমাকে বুকে জায়গা না দিলে আমি কোথায় ঘুমাব জান? আমি কি তোমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারি? বলো, তুমিও তো ছটফট করছিলে আমার জন্য।”
“মিথ্যে কথা!”
রমণীর প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
“তুমি বললেই কী আমি মেনে নেবো? আমার জান কে, কী আমি চিনি নাহ্? আমার জান আমার কাছে মিথ্যে বলে কি পার পাবে?”
“সত্যি বলছি, আমি নিষ্ঠুর পুরুষদেরকে দেখতে পারি নাহ্।”
“দেখতে না পারলে চোখ বন্ধ করে থাকো, কিন্তু আমি এখন ছাড়তে পারব না। মাই ব্যাটার ইজ লো! আই নিড চার্জিং রাইট নাও।”
“আমি কী ইলেকট্রিক বোর্ড?”
“আমার জন্য তো তাই? দেখছিস নাহ্, ভেঙে চুরে গুঁড়িয়ে এসেছি তোর কাছে। তোর বুকে জায়গা দে। ওই জায়গায় মাথা রাখলে আমি জাগতিক সকল চিন্তা থেকে মুক্তি পাই।”
“আমার পাপ মোচনের মন্দিরে আমাকে ঠাঁই দে।”
“এতো ভালোবাসেন যেহেতু, ওগুলো করার সময় কী আমার কথা একবারও মনে পড়লো নাহ্?”
এই কথার জবাবে কোনো প্রত্যুত্তর করে না প্রণয়। ওষ্ঠপুটে কেবল এক চিলতে মলিন হাসি ফুটে উঠে। কেবল এক পলক মাথা তুলে প্রিয় নারীর পানে চায়। অতঃপর আবারও মাথা নামিয়ে বুকে রাখে।
জবাব না পেয়ে অধৈর্য হয়ে ওঠে রমণী। নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে—
“বলুন।”
“শান্তি দে আমায়।”
“আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দিন।”
“কী প্রশ্ন?”
“আমার কথা কেনো ভাবলেন নাহ্?”
প্রণয় সোজা সাপ্টা জবাব দিলো—
“আমি অন্য কারো কথা ভাবি নাহ্, আমি শুধু নিজের কথা ভাবি।”
“এটা আমাকে বলা কতোতম মিথ্যে কথা?”
“সব থেকে বড়।”
“প্রণয় ভাই!”
“ঘ্যান ঘ্যান করিস নাহ্, শান্তি পেতে দে।”
“আমাকে অশান্তির নরকে ছুঁড়ে ফেলে শান্তি কামনা করছেন? পুড়ছি তো আমি, আপনি আর কী বুঝবেন?”
উদ্রেগ না দেখিয়ে কেবল হাসলো প্রণয়। আরামের তোরে চোখ বুঝে বললো—
“আমার পৃথিবীর কারো সাথে কোনো লেনাদেনা নেই। আমি আমার জান, আমরা অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা। তো তুই অশান্তিতে থাকলে আমার কী?”
“স্বার্থপর লোক একটা!”
“খুউউব।”
“একটা গল্প শুনবি?”
“কী?”
“মোমবাতির ভেতরে থাকা সুতাটা বলে উঠলো, জ্বলছি তো আমি, তাহলে তুমি কেনো গলে যাচ্ছ? তখন উত্তরে মোমবাতি বলে, হৃদয়ের ভেতরে যাকে জায়গা দিলাম, সেই যদি জ্বালিয়ে দেয়, চোখের পানি তো পড়বেই।”
মানেটা একটুকুও বুঝলো নাহ্ প্রিয়তা, তবে অজান্তেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
আমাদের চোখের সামনে নিগূঢ় ভালোবাসার কত শত বাস্তব উদাহরণ থাকে, অথচ আমরা সেগুলো দেখতেই পাই নাহ্।
“আপনি কিন্তু আমাকে গুলিয়ে দিচ্ছেন।”
“তাহলে গুলিয়ে যা, কেনো পোড়াচ্ছিস আমায়?”
“আপনি কী জানেন আপনি কতো বড় অপরাধী?”
“তুই ছাড়া পৃথিবীর সবার কাছে।”
“আমি নয় কেনো?”
“কারণ তুই আমার পৃথিবী, আর আমার পৃথিবীতে আমি সুখে আছি। মানুষের পৃথিবী আমাকে কী বললো, আই ফাকিং কেয়ার।”
“এতো স্বার্থপর মানুষ আছে!”
“খুব শীঘ্রই তুমি আমার থেকেও বড়ো স্বার্থপর হয়ে যাবে, রক্তজবা। শুধু অপেক্ষা করো সঠিক সময়ের।”
“মানে?”
“আচ্ছা, তুই পৃথিবীতে কাকে সব থেকে বেশি ভালোবাসিস?”
“নো অফেন্স, আপনাকে?”
“আমি ব্যথিত। পুরো পৃথিবী বিলীন হয়ে গেলে চলবে?”
“খুউউব!”
“পুরো পৃথিবীর বিনিময়ে আমি বিলীন হয়ে গেলে চলবে?”
“পৃথিবীর হয়তো চলবে, কিন্তু আমি তৎক্ষণাৎ ধ্বংস হয়ে যাব!”
জবাব শুনে ঠোঁট কামড়ে হাসলো প্রণয়।
“আমাকে বাঁচাতে পুরো সিভিলাইজেশন ধ্বংস করতে পারবি!”
“নিজের রক্তের শেষ বিন্দু দিয়ে চেষ্টা করবো! সিভিলাইজেশন ধ্বংস করতে না পারলে নিজের ধ্বংস হয়ে যাবো, তবুও হার মানবো নাহ্।”
“আমি কিন্তু সিভিলাইজেশন ধ্বংস করিনি। দিব্যি দুনিয়া ভরে মানুষ বেঁচে আছে।”
“কিহ্?”
“তুই একটা গাধা।”
গাধা বলাতে রেগে গেলো প্রিয়তা।
“এখন যদি আপনার গলাটা টিপে দেই?”
“দে।”
প্রিয়তা এবার আরো রেগে গেলো। প্রণয়কে ঠেলতে চাইলে মৃদু কণ্ঠে চিৎকার করে বললো—
“ওই মিয়া, উঠুন বলছি! আপনার মতো ফাজিল ব্যাটার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনার মতো বদ লোকের সাথে আমি সংসার করবো নাহ্।”
প্রিয়তার ঠেলাঠেলি দেখে রাম ধমক দিলো প্রণয়—
“আরেকবার হাত-পা ছোড়াছুড়ি করলে একদম মেরে ঠ্যাং-ঠুং ভেঙে বিছানায় বসিয়ে রাখব। কী পেয়েছিস আমায়?
আমার ভালোবাসার থেকে দূরে থাকতে আমার বুঝি কষ্ট হয় নাহ্? আমি তোকে প্রথমেই বলেছিলাম নাহ্, আমি ভালো নাহ্, আমার থেকে দূরে থাক। তখন থাকিসনি কেন?
কেন ছলনা করে আমার এত কাছে এলি? কেন আমার পাপিষ্ঠ হৃদয়টাকে ছুঁয়ে দিলি? কেন আমার পাপে ঝলসে যাওয়া শরীরটাকে বুকে জায়গা দিলি, ভালোবাসলি? আমি তো কষ্ট হলেও নিজের মনকে বুঝিয়ে নিয়েছিলাম।
কিন্তু তুই আমার দেহ মনকে তোর নেশা ধরিয়েছিস। বুঝ, তোর নেশা কতটা ভয়ঙ্কর ছিলো— আমি ড্রাগের নেশা ভুলে গেছি। এখন শুধু তুই আছিস, যার নেশায়, যার আসক্তিতে পাগল আমি।
এখন তো দুনিয়া উল্টে গেলেও আমি তোকে ছাড়ব না। ছেড়ে থাকতে পারব না, এক মুহূর্তও বাঁচতে পারব না। নিশ্বাসে নিশ্বাসে আমার তোকে চাই।
আর এখন তুই আমায় ভালোবাসা না দিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার পায়তারা করছিস? জানে মেরে ফেলবো তোকে, কিন্তু তবুও তোকে আমার চাই!”
এবার আর সইতে পারলো নাহ্ প্রিয়তা। দুই হাতে প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। অভিমানীর জ্বরের তোপে লাল হয়ে যাওয়া গাল দুটো অভিমানে ফুলে উঁচু হলো। নাক টেনে বলল—
“শুধু নিজের কষ্টটা দেখলেন? আমাকে যে এত কষ্ট দিলেন, তার বেলায়? তার বেলায় কিছু না, তাই না? আমি তো সরকারি মাল, যতখুশি কষ্ট দেওয়া যায়!”
হাসলো প্রণয়। মাথা উঠিয়ে প্রিয়তমার ফুলকো গালে উঁচু খাঁড়া নাকটা ঘষতে ঘষতে নরম আদুরে গলায় বললো—
“হ্যাঁ, আমি কষ্ট দিয়েছি, আমিই আদর করব। আমি ব্যথা দেবো, আবার আমিই মলম লাগাবো। অভিযোগ, অভিমান সব আমার বুকেই করবি। দূরে যেতে চাও কেন? বুঝো না, তুমি ব্যতীত আমার আর কোনো অস্তিত্ব নেই? তোমাকে না পেলে পাগল হয়ে যাই আমি।”
প্রিয়তার কান্নার তীব্রতা বাড়ল। ছোট ছোট দুই হাতে পুরুষালী পৃষ্ঠদেশ আকড়ে ধরলো। বাচ্চাদের মতো হাত-পা ছড়িয়ে কেঁদে উঠল মেয়েটা। গায়ে এতই জ্বর যে কী বলছে আর কী করছে, তার কোনো হুঁশ নেই।
প্রিয় পুরুষের ভারী মস্তক পুনরায় বুকে চেপে ধরে, খোঁচা খোঁচা দাড়িযুক্ত অমসৃণ গালে হাত রাখল রমণী। ধীরে ধীরে নরম হাতে বুলিয়ে দিল গালটা। মাথা নুইয়ে চওড়া কপালে অধর ঠেকিয়ে ফুঁপাতে ফুঁপাতে বলল—
“আপনি আমার কথায় অনেক কষ্ট পেয়েছেন, তাই না প্রণয় ভাই? অনেক হার্ট হয়েছেন। প্রিয়তা জেনে বুঝে আপনাকে কতটা কষ্ট দিয়েছি। প্রিয়তা খুব খারাপ। আপনার জান অনেক খারাপ, সে আপনাকে কষ্ট দিয়েছে। জানেন, ইচ্ছে করেই দিয়েছে। জানতো তো আপনি কষ্ট পাবেন, তার পরেও কিভাবে পারলো!”
কথার মাঝে লম্বা শ্বাস টানল প্রিয়তা। অতঃপর পুরুষের সিগারেটে পোড়া রুক্ষ ঠোঁটে ঠোঁট চেপে আলতো চুমু খেয়ে অপরাধীর ন্যায় মাথা নত করল।
“আমাকে আপনি আবার ভালোবাসুন, প্রণয় ভাই। একদম আগের মত। মারুন, বকুন, তবুও আবার আপনার করে নিন। আমি আপনার হতে চাই।”
“বিশ্বাস করুন, আপনাকে ওই কথাগুলো শুনিয়ে সারাটাদিন আমি একটু ও শান্তি পাই নি। আমার ভেতরটা পুড়ছিল। বিশ্বাস করুন, আমি ওভাবে বলতে চাই নি।”
চুপচাপ সবটা ভদ্র বাচ্চার ন্যায় মুখ বন্ধ করে শুনছিল প্রণয়। সে তখনই জানত, তার প্রিয়তা একটা কথাও মন থেকে বলছে না। বলতেই পারে নাহ্, কারণ সবাই তাকে ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে দিলেও তার জান কোনোদিনও ছেড়ে যাবে নাহ্।
এই অটুট বিশ্বাসই হয়তো তাকে ধ্বংস করেছে।
তবে ও যতই বিশ্বাস থাকুক, অবুঝ মন তো আর বুঝে নাহ্, কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে না। তাই প্রিয়তমার বলা বিষাক্ত বাক্যগুলো মনকে ভীষণভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। ব্যথায় ব্যথায় জর্জরিত করে তুলেছে অন্তর। বাড়ির অন্য কেউ হলে হয়তো এসব কথা প্রণয়ের কান অব্দি পৌঁছাতই না, কিন্তু এই বাবুই পাখির ছোট্ট থেকে ছোট্ট আঘাতগুলো প্রচণ্ড ব্যথা দেয় প্রণয়কে, প্রচণ্ড কাঁদায়।
“ও প্রণয় ভাই, বলুন নাহ্, রাগ করেছেন?”
ঝাঁকিয়ে ডাকলো প্রিয়তা। তার কণ্ঠে ঘোর মাদকতা, হয়তো শরীরের জ্বর বাড়ছে।
নারী দেহের কোমলতায় মুখ গুঁজে লম্বা শ্বাস টানলো প্রণয়। প্রিয়তমার নেশায় ডুবে গেলো।
“উম্মম, রাগ তো করেছি। খুব করেছি। শরীরে যত খুশি আঘাত দিতি, আমি চুপ করে সইতাম। কিন্তু তুই তো আঘাত দিয়েছিস আমার মনে। আমার কষ্ট হয় নাহ্ বুঝি? যেখানে আমি তোর দেওয়া এতোটুকু দুঃখও সইতে পারি না সেখানে…”
প্রণয়ের কণ্ঠে অভিমান টের পেল প্রিয়তা। রাগ ভাঙেনি বুঝতে পেরে ঠোঁট উল্টালো, নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল—
“এই যে কান ধরছি, বললাম তো সরি! আপনি আমাকে মারবেন, মারুন, একেবারে মেরে ফেলুন, তবুও হাসুন। আপনার কষ্ট হলে আমারও খুব কষ্ট হয়।”
“ও প্রণয় ভাই…”
প্রিয়শীর আহ্লাদী কণ্ঠ আর উপেক্ষা করতে পারল না প্রণয়। এতো এতো আদর কী অবজ্ঞা করা যায়! যেখানে এটুকু লোভেই বেঁচে আছে প্রণয়।
বুক থেকে মাথা সামান্য উঠিয়ে প্রিয়শীর জ্বরে পুড়া তপ্ত অধরে অধর মিলাল নিষ্ঠুর মানবটা। শিমুল তুলনার ন্যায় মখমলে শরীরে বিচরণ বাড়িয়ে দিল মুহূর্তেই।
তপ্ত নিশ্বাসের মিলন ঘটতেই ধনুকের ন্যায় বেঁকে গেল রমণীর শীর্ণ কায়া। ভালোবাসার মোড়ানো অষ্ঠখানি রক্তাভ হয়ে উঠল মুহূর্তেই। পুরুষালী উন্মাদনা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠলো।
বিশালতায় চাপা পড়ে অক্সিজেনের অভাব বোধ করলো রমণী। সুখের তাড়নায় চোখ দুখানি বন্ধ হয়ে এল তার। হাত দুটো আপনাআপনি চলে গেল উন্মাদ প্রেমিকের মাথার পিছনে।
বার কয়েক শিউরে উঠল মেয়েটা। জ্বরের সাথে প্রেমের ঝাল মিলেমিশে তাণ্ডব চালিয়ে দিচ্ছে অস্তিত্বে।
কয়েক মিনিট অতিবাহিত হতেই প্রিয়তা শুনতে পেল একখানা অত্যন্ত আবেগী বেসামাল কণ্ঠ—
“তোমার জ্বরের ওষুধ আমি, আমার ব্যথার ওষুধ তুমি। আমার আসক্তি তুমি, তোমার অস্তিত্ব আমি। আমাদের পৃথিবীটা খুব ছোট, শুধু তুমি আর আমি। আর—”
“আর?”
“আমার কলুষিত জীবনে একমাত্র পবিত্রতা তুমি। আমার পাপের মন্দিরের একমাত্র সত্যের দেবী।”
প্রণয়ের গলা জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তা—
“আমি ও পাপী হতে চাই! যে পবিত্রতা আমাকে আপনার থেকে দূর করে, সেই পবিত্রতা আমার চাই নাহ্।”
“নাহ্, লক্ষ্মীটি। তুমি সেই গঙ্গা, যেখানে ডুব দিয়ে আমি আমার অস্পৃশ্যতা দূর করবো। আমার সব পাপ বিলীন করবো তোমার মধ্যে। তুমি চিরকাল এমনি থাকো।”
“কিন্তু তুই এতো বোকা কেনো? আমাকে কষ্ট দিতে গেলে যখন নিজেকেই ভুগতে হয়, তাহলে আমাকে কষ্ট দিতে যাও কেন? সর্বক্ষণ ভালোবেসে বুকে ভরে রাখলেই পারো। আমি ও প্রাণ জুড়িয়ে বাঁচতে পারি।”
“আমি… আমি…”
মায়াবী নীলাভ চোখ দুটোকে বারবার পলক ফেলতে দেখে প্রাণপাখি ছটফট করছে প্রণয়ের।
নিভৃত ঘনিষ্ঠতায় লেপটে থাকার দরুন কথা বলার তালে তালে একে ওপারের ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে অনবরত। উষ্ণ নিঃশ্বাসের আদান-প্রদান হচ্ছে বেসামাল।
“হুম, আমি আমি কী?”
নরম ঠোঁটের ভাঁজ থেকে ঠোঁট সরিয়ে রমণীর দুই পাশে হাত রাখল প্রণয়। সরাসরি চোখের গভীরে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল—
“এই জ্বরটা বুঝি আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য এসেছে?”
মায়াবতীর চোখ দুটো ফের ভরে উঠল। দুই হাতে পিঠ আঁকড়ে ধরে বুকে মাথা রাখল প্রিয়তা। টেনে ধরার তীব্রতায় হাতের ব্যালেন্স হারালো প্রণয়। বিশাল শরীর নিয়ে ফের আছড়ে পড়ল রমণীর লতানো কোমল অঙ্গে।
সাথে সাথেই নরম গলায় ধমকে উঠল—
“আস্তে, ব্যথা পাবি তো।”
প্রিয়তা জবাব দিল নাহ্, একটু ও। পিঠ জড়িয়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠল।
বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল প্রণয়ের। পাশের বালিশে মাথা রেখে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। নাজুক কোমল তনুখানা টেনে হিঁচড়ে বুকে তুলল। সুগন্ধিত দীঘল কেশরাশিতে মুখ ডুবিয়ে সম্মোহিত কণ্ঠে বলে উঠল—
“যদি আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে তোমার সহ্য হতো, তাহলে আমি সেই বিষটুকুও হাসিমুখে পান করতাম। কিন্তু তুমি হয়তো ভুলে গেছো, তুমি আমার দেহেরই অংশ। আমার অস্তিত্বের এক টুকরো। আমি আর তুমি কি আলাদা? আমাদের আত্মা কি দুটো? আমি কষ্ট পেলে তুমি কি পাবে নাহ্? বোকা মেয়ে, সব কিছুতেই তালগোল পাকায়।”
একদম শান্ত হয়ে গেল প্রিয়তা। আদুরে বিড়ালছানার ন্যায় মুখ গুঁজে পড়ে রইল উষ্ণ ঠিকানায়, দু হাতের প্রশস্ত বাহুবন্ধনীতে। সুখের আবেশে শরীরটা এবার অবশ হয়ে আসে।
শুরু থেকে কালো শার্টের দুটো বোতাম কাঁপা হস্তে খুলে দেয় প্রিয়তা। পেটানো চওড়া বুকে নরম ঠোঁট চাপে বারবার। এটা করতে ভালো লাগছে প্রিয়তার।
ঠোঁট কামড়ে ধরে নিঃশব্দে হাসে প্রণয়। দু চোখ বুজে আসে সুখের আবেশে। হৃদপিণ্ডের রক্ত চলাচল বাড়ে।
অবাধ্য হাত দুটো অভ্যাসবশত গলিয়ে দেয় প্রেয়সীর টি-শার্টের ভেতর। শক্তপোক্ত রুক্ষ হাত দুটো চোখের পলকে ছুঁয়ে যায় মাখনের ন্যায় নরম মসৃণ পিঠ। বেসামাল অনুভূতিরা তার পুরুষ সত্তাকে কাবু করে ফেলে মুহূর্তেই।
শিউরে উঠা অনুভূতিতে লাফিয়ে উঠে প্রিয়তা। স্পর্শকাতর নাজুক দেহখানা পুরুষের কর্তৃত্বপূর্ণ স্পর্শ নিতে পারে না। মন-মস্তিষ্ক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কাঁপতে থাকে।
প্রণয় খুব করে অনুভব করে, তার ধরে থাকা ছোট্ট মোমের দেহখানা বড্ড গরম। এভাবে শুয়ে থাকলে হবে না। আদর খেয়ে তো আর অসুখ কমবে নাহ্।
প্রণয় হাত বাড়িয়ে রমণীর ঘাড়, গলা, কপাল পরখ করল। কী ভীষণ গরম! শরীরের তাপে বুঝি চামড়ায় ফুসকা পড়ে যাবে।
প্রণয় দ্রুত শোয়া থেকে উঠে বসতে চাইল, কিন্তু তা বুঝি আর হওয়ার জো আছে! একটু খানি উঠতেই বুকের দু পাশে হাত রেখে সজোরে ধাক্কা দিল প্রিয়তা। সাথে সাথে আবারো একই বালিশে আছড়ে পড়ল প্রণয়।
প্রিয়শীর পানে দৃষ্টি রেখে দুর্বল কণ্ঠে আওড়ালো—
“কী করছিস জান? সর, উঠতে দে আমায়।”
“উহু।”
প্রণয়ের পেটের দুই পাশে পা মেলে বসলো প্রিয়তা। লম্বা চুলগুলো অভিন্যস্ত ভাবে পিঠ ছাড়িয়ে বিছানায় ছড়িয়ে পড়লো। বন্ধ ঘরে কেবল চাঁদের আলোয় মেয়েটাকে বড্ড রূপবতী লেগেছে।
প্রিয়তা জেদ ধরলো—
“কোথাও যাবেন না।”
“কেন?”
“আমি আদর খাবো, আপনাকে ও খাবো।”
“ও আচ্ছা, কিহ—”
কথাটা বুঝে আসতেই চোখ বড় বড় করে ফেলল প্রণয়। চোয়াল ঝুলে গেলো।
“হুম হুম, খাবো খাবো।”
প্রণয় আতঙ্কিত হলো। প্রিয়তাকে বুঝানোর ভঙ্গিতে আদর করে বললো—
“জান, লক্ষ্মীটি, তুই ঠিক নেই। দেখ, তোর হুশ ও নেই। পাগলের মতো করিস—”
কথা শেষ করতে পারল না প্রণয়। তার কালচে লাল ওষ্ঠে তর্জনী চেপে ধরল প্রিয়তা। উগ্র কণ্ঠে চরম জেদ মিশিয়ে বলল—
“আমি একদম ঠিক আছি। আর আমার আপনাকে চাই, শেষ কথা। আদর করবেন কিনা বলুন। আমি এখন আপনার ওই ইয়াম্মি ইয়াম্মি স্ট্রবেরি ঠোঁটে মুখ লাগিয়ে চুমু খাবো।”
“খাই?”
মেয়ের হাবভাব সুবিধের নয় বুঝতে পেরে ঢোক গিলল প্রণয়। তড়াক করে মাথা পেছন দিকে সরিয়ে নিল। নিজেকে সংযমের কুঠুর শিকল পরিয়ে বলল—
“একদম নাহ্। There is a baby inside you.”
“বেবি কী আকাশ থেকে টপকেছে? আদর করেছেন বলেই এসেছে! ফাক ইয়্যু প্রণয় ভাই!”
“আস্তাগফিরুল্লাহ—”
আবারো কথা সমাপ্ত করতে পারল না প্রণয়। খপ করে তার দুই চোয়াল চেপে ধরল প্রিয়তা। কেমন করে জানি লভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। চেপে ধরার দরুন আকর্ষণীয় ঠোঁট দুটো গোল হয়ে আছে।
প্রিয়তা বার কয়েক চোখ পিটপিট করে দেখে আচমকাই বাঘিনীর ন্যায় হামলে পড়ল ঠোঁট দুখানার ওপর। একঢাল ঘন চুলে ঢেকে গেলো প্রণয়ের মুখ। একের পর এক বেসামাল চুমুতে পাগল করে দিতে থাকল তার একান্ত পুরুষকে। কামড়ের তীব্রতায় ঠোঁট ছিঁড়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে, জিভে তামাটে স্বাদ অনুভব হচ্ছে, তবুও থামছে নাহ্ প্রিয়তা।
প্রণয় নিজের নিয়ন্ত্রণের ওপর লাগাম হারাচ্ছে ক্রমশ। তার অবাধ্য হাতদুটো ও থেমে নেই, তাদের স্বতন্ত্র বিচরণ সর্বত্র। সে খুব ভালো মতো জানে, মেয়ে জ্বরের ঘোরে এসব উল্টাপাল্টা করছে। এর ওপর মেয়েটার শরীর ভালো নাহ্। কী যে বিপাকে পড়েছে, সে না পারছে নিজেকে থামাতে, আর না পারছে নিজের বিড়ালকে থামাতে।
প্রিয়তা পাক্কা সাত মিনিট পর ঠোঁট ছেড়ে লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। তাদের দুজনের ঠোঁট জখম, রক্তাক্ত।
উন্মত্ত হয়ে গলায় মুখ গুঁজতেই শক্ত করে বুকে চেপে ধরল প্রণয়। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে দিশেহারা হয়ে পড়ল নিজের পুরুষালী অনুভূতিগুলোকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে বলল—
“উফফ, আর পাগল বানিয়ে মারিস নাহ্ আমায়। একটু শান্ত হ। প্লিজ, একটু।”
কিন্তু প্রিয়তা তো নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। সে বুকে কিল ঘুষি মারতে মারতে নেশায় বুঁদ হয়ে বলল—
“ছাড়ুন আমায়। ছাড়ুন বলছি। আমি চুমু খাবো। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চুমু খাবো। প্রাণ ভরে চুমু খাবো আপনাকে। খুব খুব চুমু খাবো। আপনাকে চুমু খেতে আমার খুব ভাল্লাগে।”
গালে, ঠোঁটে, কপালে আঙুল দিয়ে ধরে ধরে দেখাচ্ছিল প্রিয়তা।
মেয়েটা লাগাম ছড়াতে নিলেই খপ করে হাত চেপে ধরল প্রণয়। চোখ বুজে হাঁসফাঁস করে বলল—
“তুমি সজ্ঞানে আমার কাছে আসতে চাইলে তোমাকে বারণ করার স্পর্ধা কি আমার আছে? কিন্তু তুমি এখন নিজের মধ্যে নেই। পরে যদি আমায় ভুল বুঝো…”
“একদম চুপ। ভুল বুঝবো কেন? হুম, আপনি আমার… আমি আমার জিনিস কে আদর করবো, যা ইচ্ছা করবো আপনার কী?”
“জ্বরের ঘোরে এতো আদর দেখাচ্ছো আমায়… আমার এতো কাছে আসবে নাহ্ রক্তজবা? আমার গায়ে ঘৃণিত পশুর রক্ত?”
“আপনি যদি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পাপী ও হন, আমার মন কী মানবে? আমার মন আপনাকে যে স্থানে বসিয়েছে সেখানে পাপ পূর্ণ এর কোনো ঠাই নাই। ওই জায়গাটা অধীশ্বর কেবল আপনি।”
কথা বলতে বলতে প্রণয় এর মুখের খুব কাছে চলে এল প্রিয়তা। প্রিয় পুরুষের আদলে ভালোবাসার ছাপ এঁকে দিতে দিতে মাদকীয় কণ্ঠে বলল—
“আমার আপনাকে চাই, প্রণয় ভাই! আপনার ভালোবাসা চাই। আমাকে নিন আপনার মাঝে, ভালোবাসুন। আদরে আদরে ভরিয়ে দিন যেমন আগে দিতেন।”
“সত্যি ভালোবাসবো?”
“হুম।”
“হুশে ফেরার পর আমাকে আবার দূরে সরিয়ে দিবি নাহ্ তো?”
“নাহ্।”
“সত্যি বলছিস?”
“তিন সত্যি”
ঠোঁট টিপে হাসলো প্রণয়, রমণীর নরম গাল টেনে দিয়ে কানের লতিতে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিসিয়ে বলল—
“আমাকে চাওয়া সোজা, কিন্তু সামলানো কেমন দুঃসাধ্য, সেটা তো তোমার জানা আছে, না জান? যা করবে খুব ভেবেচিন্তে, ফিরে আসার কিন্তু কোন পথ নেই।”
প্রিয়তা বোধ করি মোটেও লজ্জা পেলো না। প্রণয়ের দুই বাহুতে হাত চেপে ধরে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো একান্ত পুরুষের কণ্ঠদেশে।
প্রণয় নিজেকে সঁপে দিলো প্রিয় নারীর হাতে।
প্রিয়তা নিজের লোভ সংবরণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হল। আস্তে করে গলার উপর বৃদ্ধাঙ্গুলি রেখে বুলিয়ে দিল গলার উঁচু হাড়টা। হাড়টাতে ছুঁতেই কেমন শরীর জুড়ে তড়িৎ খেলে গেল প্রিয়তার, প্রাণ আনচান করে উঠলো তৃষ্ণায়। কণ্ঠে ঘোর মাদকতা মিশিয়ে প্রিয়তমের নিকট আর্জি জানালো—
“এই অ্যাপেল টা খুব লোভনীয়, এখানে দুটো চুমু খাই?”
“উমমম…”
অনুমতি পেতেই গলা জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তা। পুরুষালী অ্যাডাম’স অ্যাপেলে ঠোঁট দ্বারা তার নিজস্ব অধিকার প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠলো। তার এক একটা চুমুর শব্দ বদ্ধ নিরব ঘরে অশালীন ঝড় তুললো।
ছুঁয়ে দিতে থাকলো অবাধে। একটা দুটো করে পরপর অসংখ্য ভেজা চুমু আঁকলো। ললাতে ভিজিয়ে দিলো।
দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো প্রণয়ের। রগের ভেতর হরমোনের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেলো। ঝড় উঠে গেল পুরুষালি শরীরের আনাচে-কানাচে।
প্রিয়তার উন্মত্ততা বাড়ে। কালো শার্টের সবকটি বোতাম খুলে ফেলে মেয়েটা, শার্টটা অনাদরে ছুড়ে মারে অন্ধকারে।
ঘরে কোনো কৃত্রিম আলো নেই। দক্ষিণের উন্মুক্ত জানালা গলিয়ে চাঁদের রুপালি আলো এসে লুটোপুটি খাচ্ছে বিছানার ওপর। বাতাসের মৃদু ছন্দে উড়ছে সফেদ রঙা পাতলা পর্দাগুলো।
চাঁদের মায়াবী আলোয় প্রিয়তার চোখের সামনে উন্মুক্ত হয় ভাস্কর্যের মতো একখানা নিখুঁত পুরুষালী অবয়ব। সুঠাম দেহের গঠন, চওড়া কাঁধ, পেশীবহুল হাত প্রাকৃতিকভাবেই শক্ত ও ইস্পাতের ন্যায় দৃঢ়। চওড়া প্রশস্ত বুক। উদরের দুপাশে তিন তিন করে ছয়খানা অ্যাবস।
এতক্ষণ লজ্জা সরম না লাগলেও এবার লজ্জা লাগে প্রিয়তা। দুই গাল রক্তবর্ণ ধারণ করে। দুই হাতে মুখ ঢাকে প্রিয়তা। প্রণয় কিছু বলে না, কেবল চুপটি করে দেখতে থাকে তার আদরিনির সকল লীলাখেলা।
কিয়ৎক্ষণ পার হতেই প্রিয়তার বোধ করলো সে লজ্জা পাচ্ছে! কি আশ্চর্য, লজ্জা পেলে খাবে কিভাবে? লজ্জা শরম বস্তায় ভরে ছুঁড়ে মারলো প্রিয়তা, চোখ বড়ো বড়ো করে গিলে খেলো কতক্ষণ।
হঠাৎ চোখ আটকায় এক জায়গায়। সাথে সাথেই মুখটা চকচক করে উঠে প্রিয়তার। চোখ দুটো রসগোল্লা করে করে তাকিয়ে থাকে সেদিকে।
এমন চাহনিতে ভ্রু কুঁচকে ফেলে প্রণয়। রমণীর দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের দিকে তাকাতেই চোখ বড়ো করে ফেলে সেও। ব্যাপারটা বুঝে আসতেই নিজেকে সামলে ঠোঁট কামড়ে হাসে প্রণয়।
প্রিয়তা তৎক্ষণাৎ হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে কণ্ঠের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে—
“এটা কত্ত সুন্দর! ইশ, আগে কেন খেয়াল না! এটাতে একটা চুমু খাই?”
“উমমম…”
“খাবো?”
“হুমম, হ্যাঁ… এ-এই, ক-কী করছো?”
ততক্ষণে জিনিসটা নিজের ঠোঁটের আওতায় নিয়ে নিয়েছে প্রিয়তা। নিজের মতো মেতে উঠেছে আনন্দে।
প্রণয়ের এবার পাগল পাগল লাগে। এতদিন প্রণয় যে জিনিসগুলোকে ইউজলেস ভাবতো, আজ সেগুলোরও পূর্ণমাত্রার ব্যবহার শিখে গেছে তার বউ। তার মানে তার কোনো কিছুই ইউজলেস না।
প্রিয়তা প্রায় মিনিট দশেক ইচ্ছেমতো জিনিসটার স্বাদ আস্বাদন করেছে। যদিও হার্ড তবুও ভীষণ ভালো লেগেছে প্রিয়তার।
“মন ভরেছে?” বাঁকা হেসে প্রশ্ন ছুড়ে প্রণয়।
“উহুঁ, টার্ন টু লেফট সাইড।”
“হোয়াট!”
“টেস্ট লাইক মিল্ক চকলেট! কেন? আপনার ভালো লাগছে না?”
“উমমম… খুউউব, একটু বেশিই।”
“তাহলে অন্যটা খাই।”
“হ্যাঁ… এ এই…”
আর নিজের ওপর কন্ট্রোল রাখতে পারলো না প্রণয়। এতক্ষণ নিজের পৌরুষ দমিয়ে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে প্রিয়তাকে ইচ্ছেমতো চুমু খেতে দিয়েছে, যা ইচ্ছা করতে দিয়েছে, কিন্তু এখন…
হেঁচকা টানে প্রিয়তার কোমর চেপে ধরে ঘুরিয়ে বিছানায় আঁচড়ে ফেললো প্রণয়। কোমরের দুপাশে হাত রেখে চোখ টিপ দিয়ে বললো—
“Now it’s my turn, baby girl. I’m craving your protein…”
“চুপপপপ!”
দীর্ঘ অভিমান শেষে ভালোবাসার মিলনে আবারও দুটো আত্মা তৃপ্ত হলো। নিবিড় আলিঙ্গনে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল একে অপরের চিত্তে, যেন তারা কখনো আলাদা ছিলই না।
ভালোবাসার খেলা সমাপ্তির অন্তে ঘোর লেগে আসে চোখে। ক্লান্ত শরীর এলিয়ে বুকে মাথা রাখে প্রণয়। বুক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস। প্রেয়সীর কোমলতায় দু’চোখের পাপড়িতে নিগূঢ় তন্দ্রা নামে। হৃৎপিণ্ডের খুব নিকটে মাথা রেখে হৃদয়ের ধুকপুক শব্দটা শুনতে থাকে চুপচাপ।
এই ভুবনের কেউ ততটা সুখী নয় যতটা সুখী প্রণয়।
“সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী তুমি আমার। তুমি ফুল নও, তবে ফুলের চেয়েও বেশি সুবাস ছড়ায় তোমার স্নিগ্ধ চুল। মায়াবতী, তুমি আমার সর্বশ্রেষ্ঠ রূপবতী।”
দেওয়ালে টাঙানো ৪৮ বাই ৭২ আর্ট ফ্রেমটার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় কথাগুলো বলে ফেললো শুদ্ধ। তার ধূসর চোখের মনিতে বিদ্যমান প্রগাঢ় মুগ্ধতার রেশ।
ছবিটা বড় নিখুঁতভাবে এঁকেছে সে। তার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম, কোনো প্রফেশনাল আর্টিস্টের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং অনেক আংশে অধিক। মনের সবটুকু অনুভূতি উজাড় করে ঢেলে দেওয়াতে ছবিটা যেন কোনো জীবন্ত নারীর অনুরূপ।
ছবিতে বন্দি রমণীর নীল চোখ দুটো যেন সামনে দাঁড়ানো পুরুষকে কোনো অদৃশ্য মোটা শিকল দ্বারা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে, আরও বেশি করে টানছে নিজের দিকে।
দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি ভাঁজ করে গত কয়েক ঘণ্টা যাবত তৃষ্ণার্ত চাতকের ন্যায় তাকিয়ে আছে যেনো হাজার বছরের তৃষ্ণা জমিয়ে নিজেকে দমিয়ে রেখেছে।
অবুঝ মনের অশান্তিতে বার বার ছুঁয়ে দিচ্ছে ছবিটা, অনুভব করার চেষ্টা করছে নিজের মাঝে, কিন্তু দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে!
যাকে পাওয়া বারণ তার নেশাতেই কাটে প্রহর, শহরময় নিঝুম রাত, স্মৃতিরা মাখে বিষের লহর।
না পাওয়ার ভালোবাসার তীব্রতা কেন এত বেশি, জানা নেই শুদ্ধর। হয়তো নিষিদ্ধ জিনিসের টানটাই এমন।
এত কিছু বুঝে না শুদ্ধ, সে কেবল জানে তার ভালোবাসা একটা রোগ, একটা মরণব্যাধি, একটা পাগলাটে অনুভূতি—যা হার্টের ডাক্তার আবদ্ধ চৌধুরী শুদ্ধকেও সংক্রমিত করছে। এ কেমন অদ্ভুত অশান্তি।
যতই দেখে, ততই তৃষ্ণা বাড়ে—পিপাসা কেন মেটে নাহ্? এত সুন্দর কেউ হয়! ভাবতে ভাবতে একেক সময় উন্মাদ মনে হয় নিজেকে।
পকেট হাতড়ে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে দুই আঙুলের ফাঁকে নেয় শুদ্ধ। গোলাপি ঠোঁটের ভাঁজে চেপে এক বিষাক্ত নিঃশ্বাস টানে।
চোখ বুজে লম্বা টানের সাথে সাথে নিকোটিনের বিষাক্ত ধোঁয়ায় ফুসফুস ভর্তি হয়ে যায়। অন্তরে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে তুষের অনল।
ছবির দুপাশে হাত রেখে মুখের উপর ঝুঁকে আসে শুদ্ধ। রক্তিম নেশাক্ত চোখে তাকিয়ে ধরে আসা গলায় বিড়বিড় করে—
“জানো পাখি, কল্পনায় তুমি যখন আমার চুলে হাত বুলিয়ে দাও আমি স্পষ্ট সেই শিহরণ অনুভব করতে পারি! তুমি যখন ভীষণ মায়া করে আমাকে বুকে টেনে নাও, হারানোর ভয় আমি চোখ বন্ধ করে জাপটে ধরি তোমায়। তবুও চোখ খুলে দেখি তুমি আমায় ছেড়ে গেছো। এই যাতনা কী সহ্য হয় বলো পাখি? কষ্ট হয়তো, লোভী মনটাকে আমি কিছুতেই মানাতে পারি নাহ্। তোমার জন্য এমন কেনো করে পাখি।”
“মেঘের ওপারে কল্পনা রাজ্যে তোমার সনে আমি ঘর বাঁধবো পাখি, ওখানে তুমি শুধু আমার গৃহিণী হইও। আমি তোমারে মেলা ভালোবাসি।”
চোখের কোণে পানি জমে উঠলো শুদ্ধর। দুচোখের মনি চিকচিক করে অথচ ঠোঁট জুড়ে লেগে থাকে বিস্তর হাসি। হাত বাড়িয়ে রমণীর রক্তিম ঠোঁট দুখানা ছুঁয়ে দেয়। ছবিটার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে—
“আমি জানি এই মুহূর্তে তুমি সুখের নিদ্রায় মগ্ন, আমার অভিশাপ লাগুক তোমার। আমি অভিশাপ দিলাম তুমি সুখী হও, আরো সুখী হও আরো ভাগ্যবতী হও। আমার ভাগের সবটুকু সুখ তোমার হোক। ভাত-মাছের সাথে তিনবেলা সুখও মিশিয়ে খাও, তবে আমার টেবিলে নয়, অন্য কারো টেবিলে।”
“তবে তুমি ভুলও ভাবতে যেয়ো না যেন আমি দুঃখে আছি। আমি কিন্তু মোটেও দুঃখী না, তবে একটু ক্ষতি তো আমার হয়েছেই—এই ক্ষতির ভরাট কী আর এজীবনে হবে?”
“শুধু তোমাকে পাইনি বলে সাগর পেয়েছি চোখে, হিমালয় পেয়েছি বাঁ পাশের বুকে। তোমাকে পেলে হতোই বা আর কী? কী এমন নিশ্চয়তা ছিলো, দিন যেতো মোর সুখে?”
“তুমি সুখে আছো তো তাহলেই হবে। এই হাসি, আবার এই কাঁদি— আমি মনে হয় পাগল হয়ে গেলাম রে পাখি!”
দু’গাল বেয়ে টপ টপ করে অশ্রু ফোঁটা ঝরে। পাওয়া না পাওয়ার জীবন তরী একই ঘাটে নুমুর করে। চাওয়ার খোঁজে হন্যে জীবন পাওয়া টাকে ব্যর্থ করে।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯০
ছবিটার কপালে কপাল ঠেকিয়ে কন্ঠে বিষাদময় সুর তুলে শুদ্ধ বলে—
“আমি মনে হয় বামুন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াই। জ্বলসে যাবো জানি, মানছে না মনখানি। পাবো না জেনেও মিছিমিছি কেন তোমাকেই ছুঁতে চাই? আমি কেন বারবার প্রেমে পড়ে যাই? এই জনমে পাই বা না পাই, পরজনমে চাই।”

apu plz happy ending diyen
Apu next part ta Tara tari din please 🥺
Ar please please please happy ending diben please 🥺🥰