Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯০

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯০

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯০
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

“Stop! I said stop!”
প্রিয়তা নিভু নিভু, ঝাপসা চোখে তাকালো সেই শব্দের উৎসে। চিরচেনা পুরুষালী অবয়ব দৃষ্টিগোচর হতেই ঝড় ওঠে প্রিয়তার সমগ্র কায়া জুড়ে। ফ্যাকাসে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে ম্লান হাসি।
প্রিয়তার সুদীঘ্য নেত্রের কৃষ্ণকায় পল্লব ঝাপটাতেই, সজোরে কারো প্রশস্ত বুকের সাথে মাথায় বাড়ি খায় প্রিয়তা। প্রচন্ড এক ঝাঁকুনির তীব্রতায় দুলে ওঠে ভঙ্গুর দেহখানা। আবারও মাথায় সেই নিরাপদ আশ্রয়স্থল অনুভব হতেই চোখ বুজে ফেলে প্রিয়তা।

এতক্ষণে লড়তে থাকা যুদ্ধে মুহূর্তেই হার মেনে নেয় রমণী। গলে পড়ে স্বামীর প্রশস্ত বুকে। শিকলবদ্য দুর্বল হাত দুটো দিয়ে আকড়ে ধরে চায় বিশাল বহু। তার মস্তিষ্ক সারভাইভাল মোড থেকে রিল্যাক্স মোডে চলে যায়।
তৎক্ষণাৎ শুনতে পায় করুণ এক এলোমেলো বিধ্বস্ত কণ্ঠস্বর— “জান, আমার রক্তজবা…”
কণ্ঠস্বরটা মস্তিষ্ক ভেদ করে শরীরের প্রতিটি কোষে কোষে পৌঁছে যায় প্রিয়তার। এই কণ্ঠধ্বনি মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংগীত। এতগুলো ঘণ্টা সে কেবল এই একটা কণ্ঠস্বর শোনার জন্য চাতকের ন্যায় অপেক্ষা করছিল। ছটফটিয়ে মরছিল প্রতিক্ষণ। সে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, বুকের আরও গভীরে সেঁধিয়ে যেতে, একদম লুকিয়ে ফেলতে চায় নিজেকে।
কিন্তু লোহার শিকল তাকে তার একান্ত পুরুষকে জড়িয়ে ধরতে দিচ্ছে না। তার একদম মিশে যেতে দিচ্ছে নাহ্ মানুষটার সাথে।
প্রিয়তা চোখের সামনে এই মুহূর্তে কোনো অপরাধীকে দেখছে না; সে দেখছে সেই বটবৃক্ষ, সেই আশ্রয়স্থল, যা তাকে ছায়া দেয়, নিরাপত্তা দেয়, শীতলতা দেয়, ভালোবাসা দেয়, স্বস্তি দেয়। তার মাথায় নেই এই লোকটা কে কী কী করেছে।

প্রিয়তাকে টেনে-টুনে বুকের ভেতর, একদম কলিজার সাথে মিশিয়ে ফেলতে চাচ্ছে প্রণয়। ভয়ে হাত-পা কাঁপছে অনবরত। বুকের ভেতরটা কেমন হারিয়ে ফেলার অনুভূতিতে অসাড় হয়ে আসছে।
প্রশস্ত দুই বাহুর সন্ধিস্থলে ছোট্ট দেহখানা এমনভাবে চেপে ধরে রেখেছে, যেন পিষেই মেরে ফেলবে। বুকের ভেতর কিছুতেই শান্তি পাচ্ছে না প্রণয়। প্রাণে এক ফোঁটা স্বস্তি মিলছে না।
এক হাত প্রিয়তার মাথার পেছনে রেখে, অন্য হাতে আঁকড়ে ধরেছে পিঠ। প্রিয়তমাকে নিজ অস্তিত্বে বিলীন করে, পাগলের মতো প্রলাপ জপছে প্রণয়—
“জান, জান, তাকা আমার দিকে! চেয়ে দেখ, আমি এসে গেছি! তোর প্রণয় ভাই এসে গেছে! অনেক ভয় পেয়ে গেছিলিস, না লক্ষ্মীটি? আর ভয় নেই… এই তো দেখ, আমি আছি… এই কথা বল আমার সাথে”
প্রণয়ের উন্মাদনার রেশটুকু সম্ভবত প্রিয়তার কান অবধি পৌঁছায় না। তার আগেই অসহ্য যন্ত্রণায় নীল হয়ে চেতনা হারায় রমণী। প্রিয়তার মাথাটা হেলে পড়ে প্রণয়ের কাঁধে।
ব্যাপারটা বুঝতে যতটুকু সময় লাগে প্রণয়ের, অতঃপর—

“জানননন!!!”
সবটুকু দিয়ে এত জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠে প্রণয়, যে তার পুরুষালি কণ্ঠের ধ্বনিতে ধাতব দেয়ালগুলো ভেঙে পড়তে চায়। কেঁপে ওঠে চারপাশ।
প্রিয়তার অসাড় দেহখানা বুকে চেপে, ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় প্রণয়। বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ, সুচালো চোখের হিংস্র চাহনি। তলোয়ারের ন্যায় ধারালো সেই চোখে চোখ পড়তেই শরীর শিউরে ওঠেন ডিকে বসের। হাড়ের খুব গভীরে সন্তর্পণে দাগ কেটে যায়।
বাদামী চোখের সাদা অংশটুকুর রক্তিম আভা নিঃশব্দে বুঝিয়ে দেয়, এবার সব শেষ।
ডিকে বস নিজেকে সামলে উঠতে পারেন না, তার আগেই অতর্কিতে আছড়ে পড়া তিনটে আঘাতে দু পা পিছিয়ে যান। হাত থেকে কন্ট্রোল প্যানেলটা পড়ে যায় অটোমেটিকলি। দ্রুত সেটা কুড়িয়ে “ক্যানসেল” লিখে ইন্সট্রাকশন দেয় শুদ্ধ। সেই একই রক্তলাল চোখে তাকায় ডিকে বসের দিকে।
ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে, নাক চেপে ধরে রেখেছেন ডিকে বস। উনার নাক-মুখ দিয়ে গলগলিয়ে তরল রক্তের ঝরনা নামছে। শুদ্ধর ফর্সা চামড়া ভেদ করে ফুলে ওঠা সবুজ শিরাগুলো তার পুরুষালি সৌন্দর্যে এক ভিন্ন মাত্রার সৌন্দর্য দিয়েছে।

শরীরের রক্ত ফুটছে টগবগ করে। আগের অবস্থা যেমন-তেমন, কিন্তু প্রিয়তাকে দেখার পর নিজের উপর কোনো কন্ট্রোল নেই শুদ্ধর। সে শার্টের হাতা গুটিয়ে হামলে পড়ে ডিকে বসের উপর। আবারও অতর্কিতে হামলা—কিন্তু মৃত্যু-ভয়ের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না ডিকের চোখে।
ঠোটে ফুটে আছে এক অদ্ভুত শয়তানি হাসি। এটা যেনো শুদ্ধর রাগের আগুনে কেরুশিনের কাজ করে। শার্টের হাতা গুটিয়ে ডিকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে শুদ্ধ।
ইন্সট্রাকশন পাওয়া মাত্রই প্রিয়তার জরায়ুতে অবস্থান করা ক্যানুলা, ভ্রূণ অপসারণ না করেই বেরিয়ে যায়। স্পিকুলার যন্ত্রটা যোনিমুখ ছেড়ে দেয় ধীরে ধীরে। মায়ের জরায়ু দেয়ালে লেগে থাকা ছোট্ট প্রাণটা জীবনের আসন্ন ঝড় সম্বন্ধে কিছুই টের পায় নাহ্।

প্রণয়ের অস্থির বুকটা শান্ত হয় না কিছুতেই। সে মেশিনগুলোকে চলে যেতে দেখে। ওই নিষ্ঠুর যন্ত্রপাতি গুলো দিয়ে তার ছোট্ট জানটাকে কতটা কষ্ট দেওয়া হয়েছে—ভাবতেই প্রণয়ের অন্তর কেঁদে ওঠে।
পুরুষালি রক্তিম দুচোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে নামে দু ফোঁটা লবণাক্ত অশ্রু।
নরম শরীরটা আরও শক্ত করে বুকের খাঁজে জড়িয়ে ধরে প্রণয়। তার মানে, এতদিন সে যা সন্দেহ করছিল, তাই—এই গাধা মেয়েটা এতদিন তার থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে!
প্রণয় খুশি হবে, নাকি রাগ করবে—বুঝতে পারে না। তার অনুভূতিগুলো কেমন ভোঁতা হয়ে যায়। মনগহীনে অদম্য ইচ্ছা জাগে—বুকে থাকা মেয়েটার নরম তুলতুলে গালে কষে কষে দুটো থাপ্পড় মারার। এই পাকনামিটা কেন করল?
দীর্ঘশ্বাস ফেললো প্রণয়।

“যে পোড়া কপাল আমার হলো, সেই একই কপাল, মাবুদ, তুমি অন্য কাউকে কেন দিলে? আমার রক্তের অভিশাপ অন্য কেউ কেনো বইবে? আমার অভিশপ্ত জীবনে কোনো নিষ্পাপকে কেন জড়ালে? এটা তো অন্যায়, মাবুদ। যে যার যোগ্য নয় তাকে তা কেনো দিলে? আমি তো ওকে চাইনি, তবে ও কেন এলো? আমার দুষ্কর্মের ফল আমার সন্তান কেন ভুগবে, মাবুদ? আজ, শুধু আমার সন্তান হওয়ার অপরাধে, পৃথিবীতে আসার আগেই তাকে কতো বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হলো। তাহলে ভবিষ্যতে আমি যখন থাকবো নাহ্, ওকে কে দেখবে? ও কিভাবে ঠিকে থাকবে? আমার শত্রুরা তো ওকে ছাড়বে নাহ্। পথ চলতে মানুষ আঙুল তুলে বলবে— ‘দেখো, ক্রিমিনালের সন্তান!’”
কথাগুলো ভাবতেই প্রণয়ের অন্তর জ্বলে ওঠে। দুই চোখের কার্নিশে জমে তপ্ত অশ্রু, চোখের পলকেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে।
হঠাৎ প্রণয়ের অদ্ভুত লাগে। অস্বাভাবিক কিছু মনে হতেই ভ্রু কুঁচকে যায়। তড়িৎ বেগে প্রিয়তার জামার নিচে হাত ঢুকায় প্রণয়। তরল কিছু অনুভব হতেই বুকের ভেতর ধক করে ওঠে ছেলেটার। দ্রুত হাত বের করে চোখের সামনে মেলতেই দেখে—

টকটকে রক্তে লাল তরলে রঞ্জিত হয়ে গেছে হাতটা।
প্রিয়তমার রক্ত দেখে মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে প্রণয়ের। প্রিয়তার মতো শরীর কাঁপতে থাকে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। সে পৃথিবীর সবার রক্ত বের করে নিতে পারলেও প্রিয়তার রক্তে তার মারাত্মক ফোবিয়া। সে জন্য প্রিয়তার সামান্য আঙুল ও কাটতে দেয় নাহ্ প্রণয়।
প্রণয়কে মূর্তির মতো স্থির হয়ে যেতে দেখে ছুটে আসে জাভেদ—
“স্যার, আপনি ঠিক আছেন? ভাবিকে ইমার্জেন্সি ডাক্তারের কাছে নিতে হবে! না হলে বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে! বেবি মিসক্যারেজ হয়ে যেতে পারে!”
জাভেদের কথা কানে পৌঁছাতেই বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে ওঠে প্রণয়ের। সে দ্রুত প্রিয়তাকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
যাওয়ার পূর্বে চিৎকার দিয়ে ডাকে—
“মিস্টার পিউরিসান!”
আহ্বান শোনা মাত্রই ঝড়ের বেগে চোখের সামনে এসে হাজির হন মিস্টার পিউরিসান—
“Yes, boss!”
প্রণয় মুখে কিছু বলে না, কেবল ডিকের পানে তাকায়।
তৎক্ষণাৎ দ্রুততার সহিত মিস্টার পিউরিসান মাথা নেড়ে বলেন—
“ওকে, বস।”
প্রণয় আর কারোর দিকেই তাকায় না। প্রিয়তাকে কোলে নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে যায়। পেছন পেছন ছুটে জাভেদ ও।

হলরুম পেরোনোর সময়, বসের কোলে সেই মেয়েটাকে দেখে চোখের আকৃতি বাড়িয়ে রসগোল্লা করে ফেলে সবাই। অজানা আশঙ্কায় আতঙ্কে সিঁটিয়ে যায় সকলে। তারা অচিরেই বুঝে যায়— খুবই নিষ্ঠুর মৃত্যু নাচছে তাদের কপালে।
“মিস্টার জাভেদ—”
মিস্টার পিউরিসানের ডাকে দাঁড়িয়ে পড়ে জাভেদ। পেছন ফিরে দ্রুত বলে—
“বলুন।”
“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড… এই মেয়েটার সাথে বসের কী সম্পর্ক? বসকে তো কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে তাকাতেও দেখিনি, তাহলে—?”
জাভেদ খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল—
“She is ASR’s life and wife.”
জাভেদের উচ্চারিত বাক্যে পুরো হলরুমে কয়েক লক্ষ কোটি টিএনটি যুক্ত পারমাণবিক বোম পড়ে। ভয়ে অতিরিক্ত প্যানিক করে তৎক্ষণাৎ সেন্স হারায় পলাশ।
মিস্টার পিউরিসান বিস্মিত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন—
“ওয়াইফ?!”
“মানে… এই মেয়েটি সেই মেয়েটি, যার কথা প্রহেলিকা ম্যাডাম বলছিলেন…”
মিস্টার পিয়ারসন ছুটে গেলেন প্রহেলিকার নিকট—
“ম্যাডাম! ম্যাডাম! শুনছেন? ম্যাডাম, তাড়াতাড়ি উঠুন!”
প্রহেলিকা সামান্য নড়েচড়ে, আধো চোখ মেলে তাকায়। নিভে যাওয়া কণ্ঠে ধমকে বলে—
“ডোন্ট ডিস্টার্ব, মিস্টার পিউরিসান…”
“ম্যাডাম—

শিকদার বাড়ির তুমুল কালবৈশাখী ঝড় আবার শুরু হয়েছে।
চিৎকারের তীব্রতায় কান দিয়ে রক্ত উঠে আসার উপক্রম।
অশ্রাব্য সব গালাগাল শুনতে পাওয়া যাচ্ছে বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে রাস্তার ওপাশ থেকেও।
গ্রামের মানুষ জন পথ দিয়ে যেতে আসতে বাড়ির পাঁচিলে কান পেতে শুনছে, আর নিজেদের মতো মুখরোচক আলোচনা করছে।
তবে এসব দেখার বা ভাবার সময় নেই শিকদার বাড়ির কারো—
উত্তেজনায় তাদের দম ফেলার ফুরসত নেই, এই বুঝি কী না কী হলো।
শিকদার বাড়ির অন্ধরের পরিবেশ আজ রণক্ষেত্র।
প্রীতম, প্রেম, রাজ, অরণ্য, সমুদ্র—সব ভাই মিলেও এক প্রণয়ের শক্তির সাথে পেরে উঠছে না।
তার হুংকারে কাঁপছে ইট-কংক্রিটের দেয়ালগুলো। তার এমন ভয়াবহ রাগ দেখে সিটিয়ে যাচ্ছে বাড়ির মালি থেকে কাজের লোক সবাই।
মশা-মাছি ঝাড়ার মতো ভাইদের গা থেকে ঝেড়ে ফেলল প্রণয়। রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো তাদের দিকে, দাঁতে দাঁত পিষে বলল,

“আমি বলেছি আজ এই বান্দির বাচ্চা আমার হাতে মরবে, মানে আমার হাতেই মরবে। আমার আর ওর মাঝখানে আজকে যে বান্দির বাচ্চা আসার চেষ্টা করবি, তাকেও আল্লাহর নামে জবাই করে দেবো।”
সতর্কবাণী শুনে কেঁপে উঠল পাঁচ ভাই।
প্রণয় এদিক ওদিক দেখে ছুটে গেলো রান্নাঘরের দিকে। তার মাথায় আজ খুন চেপেছে। এযাবৎ কলে বহুবার প্রণয় রেগে গেছে—আর বরাবরই তার রাগ, উগ্রতা সবার থেকে অধিক বিধ্বংসী, ভয়াবহ সে সম্পর্কে ধারণা আছে; কিন্তু এতটা… আজকের পরিস্থিতি অন্যরকম।
খালিদ শিকদার বারবার দৌড়ে গিয়ে লুকাচ্ছেন ছেলেদের পিছে। বারবার পা জড়িয়ে কাকুতি-মিনতি করছেন, কান্না করে বলছেন,
“আমাকে তোরা বাঁচা, বাপ। আমার ভুল হয়েছে, আমি অন্যায় করে ফেলেছি। আমি তো তোদের বাপের মতো তোদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি।
এমন ভুল আমার দ্বারা আর কোনোদিনও হবে না। ওকে একটু বুঝা বাপ—আমাকে যেন না মারে।”
রাজ, প্রেম, অরণ্য, সমুদ্র ঘৃণিত দৃষ্টিতে নিক্ষেপ করলো খালিদ শিকদারের দিকে।
লোকটার স্পর্শে গা গুলিয়ে আসছে তাদের। সত্যি বলতে, তারাও চায়—এই নরপিশাচকে যেন তাদের ভাই শেষ করে দেয়।

এই বাড়ির সব গুলোর থেকে এটা বেশি খারাপ।
খালিদ শিকদার হাতের মুঠো থেকে ঝাড়া মেরে পা সরিয়ে নিল প্রেম। তাচ্ছিল্য করে বলল,
“আপনার মরাই উচিত। আপনি আর আপনার মেয়ে মিলে আমার ভাইয়ের জীবনটা জাহান্নাম বানিয়ে দিয়েছেন, আমার বোনের জীবনটা শেষ করে দিয়েছেন। এখন একটা নিষ্পাপ বাচ্চাকে শেষ করে দিতে যাচ্ছিলেন—ছি!”
থিরা, থোরি আর তন্ময় অনুশ্রী বেগমকে জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপছে। ভয়ে কান্না করে দিয়েছে বাচ্চাগুলো। তাদের ঠান্ডা মাথার, খুব শান্ত, অল্পভাষী বড় দাদানকে এত রাগ করতে দেখেনি কোনোদিন।
তারা ভাবতো, তাদের বড়ো ভাই হয়তো রাগ করতেই পারে নাহ্; কিন্তু আজ হঠাৎ এমন রূপ দেখে সহ্য করতে পারছে নাহ্ তারা।

অনুসরি বেগম ব্যতীত বাড়ির বড়ো কেউ নেই।
তনুশ্রী বেগম, অর্থী বেগম, অনন্য বেগমকে নিয়ে হাসপাতাল—বাড়ির বড়রা সেখানেই।
এতদিন খালিদ শিকদার কেবল প্রণয়ের প্রেমিক সত্তায় আঘাত এনেছে; তবে আজ তিনি আর কোনো সীমা রাখেনি—প্রণয়ের পিতৃ সত্তায় আঘাত এনেছেন।
প্রীতম হুংকার দিয়ে বলল,
“ইনায়া, পূর্ণতা, ঊষা—তোমরা বাচ্চাদেরকে নিয়ে প্রিয়র কাছে যাও। কুইক!”
রাগে থরথর করে কাঁপছে প্রীতম, আর তার শরীরের রক্ত ফুটছে টগবক করে। তার কলিজার টুকরো বোনের সাথে এমনটা করার শাস্তি প্রীতম চেয়েছিল নিজের হাতে দিতে, কিন্তু সেই সুযোগ বোধহয় প্রণয় দেবে না।
ঊষা, ইনায়া আর পূর্ণতা প্রীতমের কথা মতো বাচ্চাদের নিয়ে উপরে চলে গেল।
প্রিয়স্মিতা এক কোণায় দাঁড়িয়ে সম্পূর্ণ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। কারণ প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে তার মনেও। প্রীতমের মতো সেও চায়—এই নরকের কীটটাকে যেন প্রণয় মেরে ফেলুক। তাই একদম চুপ থেকে শুধু দেখছে।

প্রণয় রান্নাঘর থেকে মাংস কাটার বড় একটা রামদা নিয়ে ছুটে এল। ক্রোধে ফেটে পড়ছে তার সমগ্র কায়া।
ফর্সা কপালের মাঝ বরাবর ভেসে উঠা লম্বা সবুজ শিরাটা ভয়ংকর দেখাচ্ছে।
প্রণয়ের ভাবমূর্তি দেখে আতকে উঠেন খালিদ শিকদার।
হাতের রামদাটা নজরে আসতেই চোখ দুটো কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়।
আত্মা মনে হচ্ছে জীবিত অবস্থায় দেহ ত্যাগ করে। এই একই দা দিয়ে কত বড় বড় গরু জবাই দেওয়া হয়েছে—সেখানে তিনি কোন ছার!
প্রণয় কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিল না। তেড়ে এসে গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে কোপ বসিয়ে দিল খালিদ শিকদারের কাঁধে।

খালিদ শিকদার ব্যথা অনুভব করার সুযোগটুকুও বোধহয় পেলেন না—তার পূর্বেই ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা হয়ে ছুটে পড়লো মার্বেল বসানো মেঝেতে।
একটা উষ্ণ পিচকারি এসে নষ্ট করে দিলো প্রণয়ের সাদা শার্ট।
এবং এতেই থামল না প্রণয়—একের পর এক আড়াআড়ি কোপ দিতেই থাকল।
সর্বসম্মুখে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলল খালিদ শিকদারকে।
সকলে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কিছু বলার বা করার সময়টুকুও যেন পেল না, কিংবা বলা চলে সাহস জুটিয়ে উঠতে পারলেন না।
এখনো চোয়াল শক্ত করে খালিদ শিকদারের দেহের কাটা টুকরোগুলোর দিকে কটমট চোখে তাকিয়ে আছে প্রণয়।
ক্রোধে কাঁপছে থরথর করে।

হাতের মুঠোয় থাকা রামদার আগা বেয়ে টপটপ করে উষ্ণ রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
“আমার জানের দিকে, আমার বাচ্চার দিকে যে শুয়রের বাচ্চা হাত বাড়ানোর সাহস দেখাবে, তার হাতটাই আর গায়ের সাথে লেগে থাকতে দেবে নাহ্—আবরার শিকদার প্রণয়।”
শিকদার বাড়ির টাইলসের মেঝে পুরোটা এক ইঞ্চি সমান রক্তের নদীতে ডুবে গেছে।
কাটা টুকরোগুলো এখনো বোধহয় ককিয়ে নড়ছে।
এই দৃশ্য সহ্য করতে পারলেন না অনুশ্রী বেগম। সহসা জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন তিনি।
প্রেম, রাজ, অরণ্য, সমুদ্র নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখে ভালো লাগা-মন্দ লাগার কোনো অনুভূতি নেই। তবে প্রীতম আর প্রিয়স্মিতার চোখে এক পৈশাচিক আত্মতৃপ্তি।
পরিবেশের গভীরতায় নীরব হয়ে গেছে শিকদার বাড়ি।
হাতে থাকা দাটার দিকে একবার তাকিয়ে, তারপর খালিদ শিকদারের দেহাংশের দিকে তাকাল প্রণয়।
হাঁটু মুড়ে বসল কাটা মাথাটার পাশে।
চমৎকার বাঁকা হেসে বলল,

“আমার সন্তানকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলি, না? এখন দেখ—তুই নিজেই শেষ হয়ে গেছিস।
ও আমার সন্তান, আবরার শিকদার প্রণয়ের সন্তান। সিংহের বাচ্চা সিংহই হবে—অত সহজ নয় ওকে মারা।
ও বাঁচবে আমার মতো, রাজার মতো; মৃত্যুর পরোয়া করবে নাহ্।
কিন্তু তুই চামচিকার বাচ্চা—তাই পা দিয়ে পিষেই মেরে ফেললাম।”
“আর বাকি রইল ডিকে…”
ডিকের কথা কল্পনায় আসতেই পুনরায় চোয়াল শক্ত হয়ে গেল প্রণয়ের।
“আব্বুউউউউউউউউউউ!”
ছুটে বাড়িতে প্রবেশ করতেই নিজের প্রাণপ্রিয় বাবার এমন অবস্থা দেখে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারালো প্রহেলিকা।
প্রণয় একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো প্রহেলিকার জ্ঞানশূন্য মুখের পানে।
ওষ্ঠ কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটলো প্রণয়ের।
বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো প্রণয়, ধুপধাপ পা ফেলে সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল উপরে।

আমার বাচ্চায়া—
এক চিৎকার দিয়ে শুয়া থেকে উঠে পড়লো প্রিয়তা।
গাল, গলা, কাঁধ বেয়ে দরদর করে ঘামের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে মেয়েটার।
তার চোখ দুটো আতঙ্কিত, হাত-পায়ের কম্পন জোরালো।
নীলচে চোখের মনিতে উঠছে-পড়া ভীতি।
তড়িৎ বেগে পেটে হাত রাখলো প্রিয়তা।
হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠলো আচমকাই।
শিয়রে আগলে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল প্রণয়। এত এত ধকল সয়ার পর প্রাণে একটুখানি স্বস্তি পাওয়ায় শরীরটা তার ক্লান্তিতে ভেঙে চুরে আসছিল, বিধায় প্রিয়তমার সান্নিধ্যে আসতেই চোখ লেগে গেছিল।
প্রিয়তার চিৎকার শুনে ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠলো প্রণয়। দ্রুত প্রিয়তার সম্মুখে গিয়ে কাছে টেনে নিল, পরম মমতায় আগলে নিল বক্ষপিঞ্জরে।
প্রণয়কে কাছে পেয়ে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো প্রিয়তা। কাঁধের শার্ট খামচে ধরে বুকের আরও গভীরে সেঁধিয়ে গেলো।

তলিয়ে গেল পুরনো সেই আসক্তির অতলে।
খুব নিবিড়ভাবে লেপ্টে রইলো পুরুষটার পাঁজরের হাড়ে।
হেঁচকি তুলে কাঁদতে কাঁদতে বললো—
“আমার বাচ্চা, প্রণয় ভাই, আহহহহহহ!
আমার বাচ্চা কোথায়? আমার সন্তান কোথায়? ওরা কী আমার সন্তানকে মেরে ফেলেছে, প্রণয় ভাই?
নাহহহহহ! এটা হতে পারে নাহ্! আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না! আমাকে আমার বাচ্চা এনে দিন, প্রণয় ভাই!”
সন্তান, সন্তান করে পাগলামি করতে শুরু করলো প্রিয়তা। তার অশ্রুজল বাঁধ মানছে না।
প্রণয় উন্মত্ত রমণীকে বুকে আগলে ধীরে ধীরে শান্ত করতে লাগলো। লম্বা চুলের গুচ্ছায় আঙুল চালিয়ে হাত বুলাতে বুলাতে নরম গলায় বললো—
“শ… শ… কিচ্ছু হয়নি! শান্ত হয়ে যা, জান, আমার লক্ষ্মী। আমার পাখি এমন পাগলামি করে না। তোর সন্তানের কিচ্ছু হয়নি। তোর বাবুটা তোর মধ্যেই আছে। এই দেখ, এখানেই আছে। এত উত্তেজিত হলে তো তোর শরীর আরও খারাপ করবে, বল।”

প্রণয়ের বাক্য ইন্দ্রিয়তে পৌঁছাতেই তৎক্ষণাৎ শান্ত নদীর ন্যায় স্থির হয়ে গেলো প্রিয়তা। বুক থেকে মাথা তুলে টলটলে আঁখিতে এক বুক আশা নিয়ে তাকালো—
“সত্যি বলছেন?”
প্রিয়তার হাতটা তুলে নিজের গালে রাখলো প্রণয়।
তার চোখের মণিও পানিতে চিকচিক করছে। ধীরে মাথা উপর-নিচ ঝাঁকালো পুরুষটা—
“হুমম, তিন সত্যি।”
মেঘ ঘনিয়ে আসা আকাশে এক ফালি রোদ্দুরের ন্যায় ঝলমলে হাসি ফুটলো রমণীর ওষ্ঠপুটে।
ঠোঁটে হাসি ফুটলেও মায়াবী অক্ষিযুগল এখনো অশ্রু-টলটলে সরোবর।
মুহূর্ত ব্যয় হলো না, প্রবল সুনামির ন্যায় আবারও আঁচড়ে পড়লো স্বামীর প্রশস্ত বুকে।
পিঠ আঁকড়ে ধরে শব্দ করে কেঁদে উঠলো।
অশ্রু ঝরাতে ঝরাতে বললো—
“আমি অনেক ভয় পেয়ে গেছিলাম, প্রণয় ভাই। আপনি আরেকটু দেরি করে আসলে কী হতো? ওরা আমাদের সন্তানকে—”

বলে ডুকরে উঠলো প্রিয়তা।
“চুপ! একদম এসব কথা মুখে আনিস নাহ্। আমি আছি তো! এই দেহে প্রাণ থাকতে আমি কি তোর কিছু হতে দেবো নাকি?
আমাকে ক্ষমা করে দে, জান। আমার একটু অসাবধানতার জন্য তোকে কত কষ্ট সইতে হলো!”
প্রিয়তার মুখটা উজ্জ্বল হলো প্রিয় পুরুষকে জড়িয়ে ধরে তার শরীরের তাপে লেগে থেকে।
অনুভব করতে চাইলো তার আসক্তিময় সম্মোহনী উপস্থিতি।
অন্তর জুড়িয়ে গেলো প্রিয়তার।
প্রণয়ের হাতটা ধরে নিজের পেটের ওপর রাখলো। ভীষণ খুশিতে আপ্লুত হয়ে বললো—
“আপনি বাবা হতে চলেছেন, প্রণয় ভাই। আপনার অংশ এখানে আছে।
এই কথাটাই আমি আপনাকে জানাতে গিয়েছিলাম।”
পেটের ওপর তালুর স্পর্শ লাগতেই প্রণয়ের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে কেঁপে উঠলো।
বুকের খুব গভীরে চিনচিনে একটা সূক্ষ্ম অনুভূতির খোঁচা লাগলো। পাপিষ্ঠ অন্তরে ভীষণ দুর্বলতা অনুভব করলো।
প্রণয় বুঝলো না এ কেমন অনুভূতি, কিন্তু তার সেই প্রখরতা প্রণয়ের কর্তৃত্বপরায়ণ দৃঢ় পুরুষচিত্তকে মুহূর্তেই আন্দোলিত করলো।

এটাকেই বুঝি রক্তের সম্পর্ক বলে? কী জানি! বুঝলো না প্রণয়। কেবল অনুভব করলো—অদেখা এই নতুন প্রাণটার প্রতি তার এক অসহ্য রকমের অসীম টান আছে।
এতটা মায়া সে এ জীবনে প্রিয়তা ব্যতীত কারো জন্য অনুভব করেনি।
কিন্তু আজ অচেনা কারো জন্য এই একই রকম অনুভূতি হচ্ছে।
চোখের পাতা ভিজে উঠলো প্রণয়ের। এমন অনুভূতি কোনোদিন অনুভব করার সৌভাগ্য হবে—এই ভাবনা কল্পনাতীত ছিল তার।
প্রণয় নিজেকে রুখতে পারলো নাহ্। অন্যরকম এক আসক্তিতে মাথা নামিয়ে প্রিয়তার তলপেটে ঠোঁট চেপে ধরলো প্রণয়। সময় নিয়ে গভীর দুটো চুমু আঁকল।
ফিসফিসিয়ে নিজের অনাগত সন্তানের কানে কানে বললো—
“Papa loves you, my heartbeat, and will always protect you!!
But not more than your mamma.”
বলে পেটে মাথা রাখলো প্রণয়।

এই মুহূর্তে নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষটা মনে হচ্ছে তার।
এই তো জীবন—এমন একটা জীবনের স্বপ্নই তো সে সব সময় কল্পনায় বুনে এসেছে।
প্রণয় জীবনে প্রথমবারের মতো অনুভব করলো পিতৃত্বের সুখ—সন্তানের টান, রক্তের টান।
সন্তানের মমতা কতটুকু, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে প্রণয়। আজ প্রিয়তাকে ওই অবস্থায় দেখে কলিজায় যে চাপ অনুভব করেছে, তা হয়তো পূর্বের সকল চাপের থেকে অন্যরকম ভারী ছিল।
আজ যদি সত্যি সত্যি তার অনাগত সন্তানকে মেরে ফেলতো DK boss, তাহলে হয়তো সত্যি সত্যি সন্তানের সাথে সাথে প্রণয় আর প্রিয়তাও মরে যেত।
প্রণয়ের বুঝে আসলো না—যাকে কোনোদিন দেখেনি, জানে না, কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তার প্রতি কেন এত টান।
প্রিয়তা হেসে আলতো করে হাত রাখলো প্রণয়ের চুলে।
প্রণয় উঠে ফের প্রিয়তাকে টেনে বুকে জড়ালো। মাথা নিচু করে গালে, কপালে অসংখ্য ভালোবাসার পরশ এঁকে অসহায় কণ্ঠে আওড়ালো—

“My happiness, my world.”
নিজেকে এই মুহূর্তে সব থেকে নিরাপদ মানুষটা মনে হচ্ছে প্রিয়তার।
এই বুকের উষ্ণতা, এই গায়ের গন্ধ তাকে প্রতিটা মিনিটে, সেকেন্ডে অনুভব করাচ্ছে—সে কতটা নিরাপদ।
এই নোংরা পৃথিবীকে সচক্ষে আর কখনো দেখতে চায় না প্রিয়তা। এই সুরক্ষা বলয়ের বাইরে আর এক কদমও রাখতে চায় না। এই বুকটাই হোক শেষ ঠিকানা।
প্রিয়তমার নিবিড় আলিঙ্গনে প্রণয়ের বুকের ভেতরের জ্বলন্ত অগ্নুৎপাত যেন নরম হয়ে এলো ধীরে ধীরে।
কয়েকটা ঘণ্টা যাবত জ্বলতে থাকা বুকটায় শীতলতা ছেয়ে গেল। গনগনে কলিজায় তুষার বৃষ্টি হলো।
তার অস্তিত্ব নিবিড়ভাবে অনুভব করলো—এই তো তার জানটা, তার প্রাণভোমরাটা অক্ষত অবস্থায় তার বুকেই আছে। কিচ্ছু হয়নি এই ময়না পাখির। এই পাখিটাকে হারিয়ে এক সেকেন্ডও বাঁচবে না প্রণয়।
পরম সুখে আর চরম তৃপ্তিতে দু’চোখের পাতা বুজে এলো প্রণয়ের। শিমুল তুলোর ন্যায় নরম মখমলে শরীরটা আরও খানিক আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিলো বক্ষপিঞ্জরে।
পাগলাঘোড়া অনুভূতিগুলো শান্ত হয়ে এলো ধীরে ধীরে। বুক চিরে বেরিয়ে এলো তপ্ত এক প্রশান্তির নিঃশ্বাস।
মনটা সামান্য রিল্যাক্স হতেই শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো প্রিয়তার। একের পর এক মনে পড়তে লাগলো DK boss-এর বলা তখনকার প্রতিটা বিষাক্ত বাক্য।
কথাগুলো মনে পড়তেই ফুরফুরে মনটা বিষিয়ে উঠলো প্রিয়তার।
কানে বাজতে লাগলো নিষ্ঠুর একটা লাইন—

“ASR আর কেউ নয়, তুমি যাকে এত ভালোবাসো—তোমার ভালোবাসার প্রণয় ভাই।”
রাগে, দুঃখে, অপারগতায় আবারও কান্না এলো প্রিয়তার। কথা গুলো মনে আসতেই প্রণয়ের বুকের দুই পাশে হাত রেখে সজোরে ধাক্কা দিলো প্রিয়তা।
হঠাৎ এমন আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না প্রণয়। দুর্বল মুহূর্ত, তাই সামলে নিতে ব্যর্থ হলো। হাতের বাঁধন খুলে গিয়ে পিছিয়ে গেলো কিছুটা। অবিশ্বাসী দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো প্রিয়তার পানে।
প্রিয়তার এমন আচরণে যারপরনাই অবাক হয়েছে প্রণয়।
সে পুনরায় প্রিয়তার কাছে আসতে চাইলো—

“জান—”
সাথেসাথেই হাত উঁচিয়ে দ্রুততার সহিত বাধা প্রদান করলো প্রিয়তা।
একপ্রকার চিৎকার করে বললো—
“ছোঁবেন না! আপনার ওই নোংরা হাতে ছোঁবেন না আমায়!
আপনার ওই হাত দুটো অপবিত্র! ওই হাতে একদম স্পর্শ করবেন না আমাদের!”
কাছে আসতে গিয়েও আচমকা থেমে গেলো প্রণয়। প্রিয়তমার কণ্ঠ নির্গত তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ মনে হলো নরম হৃদপিণ্ডটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে। কথাগুলো বুঝে ওঠার আগেই পাপিষ্ঠ পুরুষের দু’চোখ পানি ভর্তি হয়ে গেলো।
বুকের নরম মাংসপিণ্ডে এতটা ব্যথা লাগলো, যা কোনোদিন অক্ষরে বা শব্দে বর্ণনা করতে পারবে না পুরুষটা।
চোখ তুলে প্রিয়তার অশ্রুসিক্ত চোখের গভীরে তাকালো প্রণয়। যেখানে কিছুক্ষণ আগেও নিজের জন্য অসীম ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছিল, সেখানে এখন কেবল একরাশ ঘৃণা।
ভেতরে ধক করে আগুন লেগে গেলো প্রণয়ের। সে কম্পিত কালচে রক্তিম ঠোঁট দুটো আওড়ালো—
“আমার হাত দুটো নোংরা, জান?”
তেতে উঠল প্রিয়তা—

“আপনি আমাকে প্রশ্ন করছেন আপনার হাত দুটো নোংরা কিনা? আপনি বরং প্রশ্নটা নিজেকে করুন!
আপনি অস্বীকার করতে পারবেন—যে হাতে একটু আগেই আপনি আপনার সন্তানকে স্পর্শ করলেন, ওই হাতে আপনি কখনো কোনো মায়ের সন্তানের ক্ষতি করেন নি?”
“বলুন! আপনি নিজের সন্তানের উপর হাত রেখে বলুন, আপনি নির্দোষ!”
বলে প্রণয়ের বাম হাতটা টেনে নিজের পেটে রাখলো প্রিয়তা। তার চোখের পানি টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে প্রণয়ের হাতে।
সে ভীষণ কাতর কণ্ঠে বললো—
“একবার বলুন—ওই DK যা বলেছে সব মিথ্যে, যা দেখিয়েছে সব মিথ্যে!
আপনি আমার সেই প্রণয় ভাই, যাকে আমি চিনি। আপনি অমন কিছুই করেননি। আপনি কখনো কারো ক্ষতি করেন নি। আপনি কোনো অসাধু ব্যবসার সাথে জড়িত না। ওই জায়গাটা আপনার না। ওই কুখ্যাত অপরাধী ASR-এর সাথে আপনার কোনো যোগসূত্র নেই!”
“বলুন না, আপনি শুধু একবার নিজের মুখে বলুন—সব মিথ্যে! সব ছলনা। দেখবেন, আমি ও তাই মেনে নেবো। আর কোন প্রশ্ন করব না!
আমি আপনাকে অসহ্য রকমের ভালোবাসি, ঠিক তেমন অন্ধবিশ্বাস করি। আমার বিশ্বাস ভাঙবেন না। বলুন—সব মিথ্যে!”

“আপনি আমার কাছে পৃথিবীর সবথেকে বড় সত্য।
আপনি যদি বলেন সব মিথ্যা, তাহলে দেখবেন—এই পৃথিবীর যে যাই বলুক, আমি আর কারো কথাই বিশ্বাস করবো না। শুধু আপনি নিজের মুখে বলুন!”
প্রিয়তা অশ্রুসিক্ত আঁখিতে প্রচণ্ড আশা নিয়ে চেয়ে আছে প্রণয়ের পানে। তার মনের কোথাও একটা এখনো বিশ্বাস আছে যে প্রণয় অসম্মতি জানবে, খুব রেগে বলবে—
“হ্যাঁ, সব মিথ্যে, আমি এসব কিছুই করিনি। তোর খুব সাহস হয়েছে তাই না? তুই আমাকে আবল-তাবল প্রশ্ন করছিস?”
প্রণয় কেবল নির্বাক চোখে তাকিয়ে আছে নিজের হাতের দিকে।
মেয়েটা মিথ্যে সান্তনা চায়, কিন্তু কোনো বাবা কী তার সন্তানকে ছুঁয়ে মিথ্যে বলতে পারে?
ঠিক তেমন নিজের অস্তিত্বের অংশকে ছুঁয়ে মিথ্যে বলার মতো কলিজা নেই আবরার শিকদার প্রণয়ের। আর সত্যকে মিথ্যে বলা তো তার ধাঁচেই নেই। প্রণয় আহত দৃষ্টি তুলে তাকালো নীলচে চোখের কালো মণির গভীরে।

“বলুন, সব মিথ্যে!”
অপরাধীর ন্যায় দৃষ্টি নিচু করে নিল প্রণয়। দুই পাশে মাথা ঝাঁকিয়ে নিঃশেষিত কণ্ঠে সম্মতি জানালো—
“এক বাক্যও মিথ্যে নয়, রক্তজবা—সব সত্যি।”
প্রণয়ের একটা স্বীকারোক্তিতে নয়নের সবটুকু আশা ধপ করে নিভে গেল রমণীর। মনে হলো, ঘূর্ণায়মান বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটা আছড়ে পড়েছে তার মাথার ওপর।
ছিটকে আরেকটু দূরে সরে গেল প্রিয়তা। তার মনটা এখনো মানতে চাচ্ছে না—যেই মানুষটাকে সে ভালবেসেছে, সে এমন? প্রিয়তার মন বারবার সত্য স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায়। পূর্বের সাথে তুলনা টেনে বলে—ওই মানুষটা কখনোই খারাপ হতে পারে না, কখনোই ওই কাজগুলো কিছুতেই তার হতে পারে না।
কিন্তু নিষ্ঠুর মানবের স্বীকারোক্তিগুলো তার মস্তিষ্কের অন্তে রক্তক্ষরণ ঘটায়। অতিরিক্ত রাগের ফলে এবার কান্না পাচ্ছে প্রিয়তার।
মন বলছে—

“যাকে পাওয়ার জন্য এত লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করলি, যাকে এত ভালোবাসলি, যার বুকটা ছাড়া দু’দণ্ড শান্তি পাস না, রাতে যার বুকে মাথা না রাখলে ঘুমাতে পারিস না—তাকে ঘৃণা করতে পারবি তো?”
প্রশ্নটা মস্তিষ্কের নিউরনে উকি দিতেই চিৎকার দিয়ে উঠল প্রিয়তার অস্তিত্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু—
“না! না! না! না!”
কোমল হৃদয়ের প্রিয়তার মনের অবস্থা আন্দাজ করে অন্তর পুড়ছে প্রণয়ের। প্রিয়তাকে কাছে টেনে সান্ত্বনা দিতে চাইলে বারবার দূরে ঠেলে দিচ্ছে প্রিয়তা। তার নীলচে মায়াবী চোখে কেমন অদ্ভুত ঘৃণা।
প্রিয়তাকে দূরে যেতে দেখে বুকের ভেতর ঝড় ওঠে প্রণয়ের। অন্তর পুড়ে ছারখার হয়ে যায় এক অসহ্য দহনে। মায়াবিনীর নীল চোখে নিজের জন্য অসামান্য ঘৃণা সহ্য হয় না। মৃত্যুতুল্য যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকে পাপিষ্ঠ হৃদয়টা। নিশ্বাসটাও যেন বিষ মনে হতে থাকে এখন।

এই দিনটা দেখার আগে সে কতবার যে নিজের জন্য মৃত্যু কামনা করেছে খোদার নিকট—কেবল এই দিনটাকে এড়িয়ে চলার জন্য। ওই চোখে ঘৃণা দেখার বা সহ্য করে বেঁচে থাকার মতো সামর্থ্য তার বুকের হয়নি এখনো।
প্রিয়তার অগ্রাহ্যকে মোটেও গণ্য করল না প্রণয়। বলপূর্বক একদম কাছে চলে এলো। প্রিয়তমাকে জোর করে বুকে পুরে নিল।
“আমার কাছে আসার অপশন আছে, বোকা মেয়ে—কিন্তু দূরে যাওয়ার কোনো অপশন নেই!
আমাকে উন্মাদ বানিয়েছো প্রবলভাবে, তবে এখন কেন প্রেম দিতে অস্বীকৃতি জানাও?
ক্ষুধার্তকে ভাতের লোভ দেখিয়ে এভাবে কী দূরে ঠেলে দিতে আছে?”
প্রিয়তমার নরম হাত দুটো মুঠোর পুরে সময় নিয়ে চুমু খেল প্রণয়। অতঃপর বুকের মাঝে চেপে ধরে মাথা নত করলো ধরা গলায় বললো—

“আমি খুব খারাপ—আমি স্বীকার করি। আমি ক্ষমার অযোগ্য—এটাও স্বীকার করি। আমি মানুষ নই, পিশাচ—এটাও স্বীকার করি। আমার অপরাধ অপরিসীম—সব সত্যি। কিন্তু এটাও তো সত্যি, জান—
বিশ্বাস কর, আমি তোর কাছে থাকলে একদম শান্ত হয়ে যাই, কোনো অন্যায় করি না। তোর বুকে থাকলে আমায় পৃথিবীর অন্য কিচ্ছু টানে না, কোনো পাপে লিপ্ত হই না। তুই আমার ক্যানসারের দুর্মূল্য ঔষধি। আমার তৃষ্ণা নিবারণের শীতল তরল।”
প্রিয়তা ভীষণ অবাক হয়। মাথা তুলতে চাইলে একটু ও ছাড় দেয় না প্রণয়, আরো শক্ত করে পিষে ফেলে বক্ষ মাঝে। খুব কাতর কণ্ঠে কাকুতি করে—
“আমি তোর পায়ের কাছে পড়ে থাকি, জান—আমাকে তাড়িয়ে দিস না। আমাকে রেখে দে তোর কাছে।
এই পাগলটাকে ঘৃণা করে ছুঁড়ে ফেলিস না। তোর চোখের ওই বিষাক্ত ঘৃণা আমার হৃদয় সহ্য করতে পারবে না।
আমি তো তোর জন্যই পাগল হয়েছিলাম—বল? ক্ষমা করে রেখে দে না আমায়? তোর চরণে ঠাঁই দে না?
বিশ্বাস কর, কুকুরের মতো পড়ে থাকব। তোর কাছে কিচ্ছুটি চাইব না। শুধু তোর গায়ের সাথে একটু লেগে থাকতে দিস। আমি খুব করে শুধু তোর কাঙাল।”

বলে ঝরঝর করে চোখের পানি ছেড়ে দিল প্রণয়।
প্রিয়তার বুক ভেঙে এলো—কান্নায়, রাগে, ক্ষোভে, অভিমানে। আবারও ঝটকা মেরে দূরে সরিয়ে দিল অসহায় পুরুষটাকে। তার কাতর কণ্ঠধ্বনি বুঝি শুনলো না রমণী। বিশ্বাসঘাতকতার বিষে সে নীল হয়ে যাচ্ছে।
প্রণয়ের পানে ফের ঘৃণাভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তেজি কণ্ঠে বলল—
“বললাম না, ছোঁবেন না আমায়! এই মুহূর্তে আপনাকে দেখতেও আমার ঘৃণা লাগছে। এমনটা কেন করলেন আপনি? কীভাবে করতে পারলেন?

ওইখানে যতগুলো মেয়ে ছিল—ওগুলোকে আপনি আটকে রেখেছিলেন, তাই না?
ওখানে লোকগুলোকে কেটে অর্গান বের করছিল আপনার কথায়! আপনার নির্দেশে নিষ্পাপ মাসুম শিশুদেরও তুলে আনা হয়—তাদের দিয়ে কী করেন আপনি? ড্রাগ বানান? মেডিসিন বানান?”
“ছি! কীভাবে ওগুলো করতে পারেন? হাতটা কী একবারও কাঁপে না? বুকটা কী একবারও কাঁপে না?
একবারও মনে হয় না—তারা কোনো মায়ের সন্তান, কোনো বাবার স্বপ্ন?”
“আল্লাহ কী মাটি দিয়ে গড়েছেন আপনাকে? আপনার ভেতর এতটুকুও কোনো মনুষ্যত্ব নেই? হৃদয় নেই? এতটা কাফির আর জালিম আপনি? ছি! এমন একজন মানুষকে ভালোবাসি—ভাবতে ও তো—”
বাক্য সম্পন্ন করতে পারল না প্রিয়তা। তার পূর্বেই আচমকা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো—তুলতুলে নরম চোয়াল মুহূর্তেই সম্মুখীন হলো পুরুষালী হামলার।

বাঁকানো কোমর পেঁচিয়ে ধরে হেঁচকা টানে একদম নিকটে নিয়ে এলো প্রণয়। বাহ্যিক সকল দূরত্ব ঘুচে গেল নিমেষেই। শরীরের সাথে শরীর লেপ্টে গেল। গালে দানবীয় চাপ অনুভব করল প্রিয়তা। ব্যথায় পুনরায় দু’চোখের কোটর ভরে এলো নোনা পানিতে।
প্রণয় নরম চোয়ালে চেপে ধরে প্রিয়তার মুখের সম্মুখে নিজের মুখ নামিয়ে আনল। প্রিয়তার কোমল ঠোঁট দুটো গোল হয়ে ফাঁক হয়ে আছে। ঠোঁট ছুঁই-ছুঁই দূরত্ব থেকে দাঁতে দাঁত চিপল প্রণয়। চোখ লাল করে কঠিন কণ্ঠে বলল—
“বলার স্বাধীনতা দিয়েছি—যত খুশি বল। আঘাত করার স্বাধীনতা দিয়েছি—যত খুশি আঘাত কর। প্রয়োজনে চিরতরে নিঃশেষ করে দে।
কিন্তু আমার ভালোবাসাকে ঘৃণা করার কথা ওই মুখে উচ্চারণ করার দুঃসাহস দেখাবি না—জানে মেরে ফেলবো!
আমি নোংরা হতে পারি, অস্পৃশ্য হতে পারি—কিন্তু আমার ভালোবাসা তোর মতো পবিত্র।”
“আহ্, লাগছে প্রণয় ভাই!”
“লাগুক—আমারও খুব লাগছে।”
“আমি পাপি-তাপি যাই হই—এই পুরো দুনিয়া আমাকে ঘৃণা করুক, আই ফাকিং কেয়ার! কিন্তু তুই আমাকে ঘৃণা করতে পারিস না।

তোর ওই নীলাভ চোখে ভালোবাসা, ব্যাকুলতা, তাড়না ব্যতীত অন্য কোনো অনুভূতি দেখতে চাই না।”
“এমন পাপিষ্ঠ কলঙ্কিত পুরুষকে আমি ভালোবাসতে পারব না, থাকতে পারব না আপনার সাথে।”
দুটো লাইনে বুকের ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে গেল প্রণয়ের। প্রিয়তার উচ্চারিত বাক্যগুলোতে মনে হয় কেউ তার নরম হৃৎপিণ্ডটাকে বিষের ছুরি দ্বারা ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। চোয়ালের পাশাপাশি এবার আস্তে করে গলাও চেপে ধরলো প্রণয়। তাচ্ছিল্য করে বলে—
“তাহলে মেরে ফেল, ছুরি চালিয়ে দে সেখানে, যেখানে মাথা রেখে আছিস। ভালোবাসা না দিলে বাঁচিয়ে রেখে কি করবি?
তবুও ছুড়ে ফেলিস না।”

প্রিয়তার চোখ ভরে আসে। ছটফট করে ছাড়া পেতে, কণ্ঠে উপচে পড়ে অভিমান।
“ছাড়ুন আমাকে।”
কিন্তু ছাড়ে না প্রণয়।
প্রিয়তা ভীষণ জেদি মেয়ে। সে প্রণয়ের পানে তাকাতে চায় না, কথার জবাবও দেয় না। জোরপূর্বক মুখ ফিরিয়ে নিতে চায়। এতে যেন আরও ক্ষিপ্ত হয় পুরুষটা। রমণীর নরম চোয়াল টেনে ধরে আবারও নিজের দিকে ফেরায়। ফর্সা কোমল গাল দুটো আঙুলের চাপে লাল হয়ে যেতে দেখে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দেয় প্রণয়। কণ্ঠের তেজ নিভে আসে মুহূর্তেই। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলে—
“এই এই, তাকা আমার দিকে। তুই তো আমায় কথা দিয়েছিলি যে যাই হয়ে যাক, তুই আমাকে ছেড়ে যাবি না। নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিবি না। এই পাগলটাকে সবসময় বুকে আগলে রাখবি। তাহলে আজ তোর কথা রাখ, বেইমানি করিস না আমার সাথে।”
প্রিয়তা নিশ্চুপ থাকে।
প্রণয় ফের কাতর কণ্ঠে আন্দোলিত হয়—
“ওদের দেওয়া প্রচণ্ড মরণ কামড়েও আমি ভয় পাইনি, জান। কিন্তু আজ আমি ভয় পাচ্ছি। দেখ, এই জায়গাটা কেমন কাঁপছে! আমি ভয় পাচ্ছি তোকে হারানোর। আমি কি তোকে হারিয়ে ফেললাম, জান? বিশ্বাস কর, ধ্বংস হয়ে যাব আমি। পৃথিবীর কোনো শক্তি আমাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু তোর সামান্য অবহেলা আমাকে ভেঙে দেয়, খুব যন্ত্রণা দেয়—বিশ্বাস কর।”

প্রিয়তা তীব্র অনীহা নিয়ে বলে—
“তাহলে তো পৃথিবীর কোনো শাস্তিই দেখছি আপনার উপযুক্ত নয়, আমাকে হারানো ব্যতীত। তাহলে তাই হোক। এই দুনিয়ায় আপনার একটাই শাস্তি হোক—আমিহীনা বেঁচে থাকুন আপনি অনন্তকাল।”
প্রণয় আঁতকে ওঠে প্রিয়তার কথায়। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ভীষণ শক্ত করে জাপটে ধরে বুক পাঁজরে, আর্তনাদ করে বলে ওঠে—
“না, না, জান! ওমন কথা বলে না, লক্ষ্মী। শাস্তি আছে তো। তুমি আমাকে সরকারের হাতে তুলে দাও। ওরা আমাকে ফাঁসিতে ঝুলাক। নিঃসন্দেহে একটা পাপীকে চিরতরে দুনিয়ার জমিন থেকে মুছে দেওয়ার জন্য এই শাস্তিটা উপযুক্ত। এর থেকে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে, বলো? তুমি বরং ওটাই করো। কিন্তু ওমন অলুক্ষুণে কথা দ্বিতীয়বার আর মুখে আনবে না, কেমন? এমন জীবন আমি দুঃস্বপ্নেও চাই না।”
ফাঁসির কথা শুনে প্রিয়তার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। দ্বিগুণ আতঙ্কে খামচে ধরে প্রণয়ের শার্ট। দু’চোখের মণি পানিতে ঝাপসা হয়ে আসে। কীসব আবল-তাবল বলে লোকটা! এমন কথা কিভাবে বলে? প্রিয়তা তার প্রাণপুরুষকে ফাঁসিতে ঝুলাবে—এই কথাটা ভাবতে পারলো?

পৃথিবীর সকল মানবজাতি, কীটপতঙ্গসহ, প্রিয়তাকে স্বয়ং মেরে ফেললেও হয়তো প্রিয়তা এই কাজটা করতে পারবে না। তখনও হয়তো নিজের আঁচলের তলায় আড়াল করবে পাপিষ্ঠ পুরুষকে।
“আমি দোয়া করি, আপনি আমিহীনা বাঁচুন।”
প্রণয় হাসে। প্রিয়তাকে নিজের বুক থেকে টেনে তুলে, নিজেই রমণীর নরম বুকের গভীরে সেঁধিয়ে যায়। কোমল অস্তিত্বে নিজেকে বিসর্জন দিয়ে, সুখের তরে চোখ বুজে—
“উহু, এটা সম্ভব নয়। তোর এই দোয়া এক সেকেন্ডের জন্যও কবুল হবে না, জান।”
“কেনো?”
“পাগলী মেয়ে, অক্সিজেনের অন্যথায় মানুষ কী বাঁচে? কয়েক ঘণ্টা বুকে ছিলি না—দেখিসনি তো কেমন সুখে বেঁচেছিলাম! আরও কয়েক ঘণ্টা পর আসলে দেখতি, ততক্ষণে দাফন-কাফন হয়ে গেছে।”
“প্রণয় ভাইইইই!”

“হুম, সত্যি বলছি—দেহ ব্যতীত ছায়ার কী মূল্য? পৃথিবীর সব দৈত্য-দানবের একটা না একটা দুর্বলতা থাকে, একটা না একটা নরম জায়গা থাকে। আর আমার দুর্বলতা তুই। রূপকথার গল্পে শুনেছিস—রাক্ষস রাজার প্রাণভোমরা লুকানো থাকে কোনো এক অচিনপুরের রূপোলি মাছের ভেতর। আর আমার প্রাণভোমরা তোর ভেতর। তুই নেই মানে আমি ও নেই।”
“আর আমি যদি মরে যাই?”
“সাথে আমিও থাকবো, নিঃসন্দেহে।”
তৎক্ষণাৎ প্রত্যুত্তর করে প্রণয়। প্রিয়তার নরম সুভাষিত ত্বকে বেড়ালের ন্যায় নাক-মুখ ঘষতে থাকে। প্রচণ্ড আরামে আবার ঘুম আসতে চায় তার।
ক্রমাগত নরম আদরে ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রিয়তা। এবার প্রত্যাখ্যান করতে তার কণ্ঠ কাঁপে—
“আমি আপনাকে ক্ষমা করতে পারবো না।”

“তবুও তুই এই পাগলটারে প্রেমের ভিক্ষা না দিয়ে থাকতে পারবি না, কারণ তুই ও আমার পাগল।”
“দূরে সরুন, প্রণয় ভাই। ছোঁবেন না আমায়।”
“আমি দূরে সরে গেলে, ভালো না বাসলে, না ছুঁলে—তোর সহ্য হবে? তুই থাকতে পারবি আমার ছোঁয়া ছাড়া? পাগল পাগল লাগবে না? কষ্ট হবে না? অঙ্গে জ্বালা ধরবে না?”
প্রশ্ন শুনে এবার থমকায় প্রিয়তা। ছলনাময়ী পুরুষ কথার জালে পেঁচিয়ে আবার ছলনা করেছে বুঝতে পারে, কিন্তু কিছুতেই ওগুলো ভুলতে পারবে না প্রিয়তা—ক্ষমাও করতে পারবে না। এই অন্যায়ের কোনো ক্ষমা হয় না। কিন্তু এমনভাবে বাচ্চাদের মতো বুকে মুখ গুঁজে আছে—তাড়িয়ে দিতে কলিজা কাঁপছে প্রিয়তার।
তবুও বলে—

“পারবো।”
“তুই পারবি না।”
“হুম, আমি খুব পারবো। বলুন, আপনি পারবেন না।”
ঠোঁট ঠেলে হাসে প্রণয়। নরম ত্বকে ছোট্ট ছোট্ট চুমু আঁকতে আঁকতে বলে—
“আমি তো স্বীকার করি, জান—আমি পারবো না। বলো, তুমি কী এমন নিঃস্ব প্রেমিককে দুর-দুর করে তাড়িয়ে দিতে পারবে?”
এমন সরল স্বীকারোক্তিতে কিছুটা হতভম্ব হয় প্রিয়তা।
“কী ভাবছো, জান? তোমার কাছে ভিক্ষা চাইছি। মানুষ মানেই তো ভিক্ষুক। কেউ টাকার, কেউ মানসিক শান্তির, কেউ আবার দুমুঠো ভাতের—বা আমার মতো ভালোবাসার। মানুষ তো ভিক্ষুককেও খালি হাতে ফেরায় না, জান। আর আমি তো তোমার কাঙাল।”

প্রিয়তার নরম মন গলতে চায়, কিন্তু বারবার মনে পড়তে থাকে ওই সকল দৃশ্য। প্রিয়তা আর সহ্য করতে পারে না। প্রণয়কে ঠেলে নিজের থেকে সরিয়ে দেয়। খুব দৃঢ় কণ্ঠে বলার চেষ্টা করে—
“আপনি আমার—”
তৎক্ষণাৎ প্রিয়তার ঠোঁটে তর্জনী চেপে ধরে প্রণয়। আর একটা শব্দও বের করতে পারে না।
প্রণয়ের কণ্ঠ খুব দুর্বল শোনায়—
“চুপ। আর আঘাত করিস না আমায়। এতক্ষণ যা আঘাত করেছিস, তাই সহ্য হচ্ছে না। খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল, বলে তোর বুকে একটু আশ্রয় নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তুই আমার শান্তি-নীড়ে থাকতে দিলি না। ঠিক আছে, আমি তো পশুর থেকেও অধম, নিকৃষ্ট, জঘন্য। আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু তোর বিষাক্ত বাক্যবাণে জর্জরিত করে আমার তৃতীয় হৃদয়টাকেও নষ্ট করিস না। নাহলে পরে আফসোস হলেও আর ফিরে পাবি না।”
“এতটাও অবজ্ঞা করিস না। জীবন বড়ই অনিশ্চিত। শেষ দেখা, শেষ কথা কখন যে হয়ে যায়—বুঝে ওঠার আগেই মানুষ হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়।”

বলেই আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না প্রণয়। ধুপধাপ পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
অর্থবহ, ভীষণ ভারী বাক্যগুলোর ভার সহ্য হয় না প্রিয়তার। হাঁটুর ভাঁজে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে ওঠে। নাক টেনে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে থাকে—
“কেন এমন করলেন, প্রণয় ভাই? আমিও সত্যি আপনাকে ছাড়া থাকতে পারবো না—উহু, বাঁচতে পারবো না।
আমি কী খুব বেশি কষ্ট পেয়েছেন, প্রণয় ভাই? আমি কী আপনাকে বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললাম! আমি কী করবো, মাবুদ? এমন পরীক্ষার সম্মুখীন আমি কেন হলাম?”
আশ্চর্য, না? প্রণয় এত অন্যায় করার পরও প্রিয়তা এখনো ভাবছে—তার মানুষটা কষ্ট পেয়েছে কিনা। প্রিয়তমের অন্যায়গুলো ফিকে হয়ে আসছে প্রিয়তমার নিকট। মন অপরাধীর শাস্তির কথা ভুলে, অপরাধ লুকানোর প্রবণতায় বেশি ঝুঁকছে।
কে যেন বলেছিল—প্রেম অন্ধ হয়। ভালোবাসার মানুষের কোনো অন্যায়ই প্রেমন্ধ মানুষের চোখে পড়ে না। তার প্রবাদ বাক্যটা বুঝি ধ্রুব সত্য ছিল।

কিন্তু প্রিয়তার বিবেক প্রিয়তাকে আটকাচ্ছে মানুষটার কাছে যেতে। মন বলছে—যে এত অন্যায় করেছে, সে এতটুকু শাস্তি তো ডিজার্ভ করে। আবার প্রিয় পুরুষের চোখের অভিমান প্রিয়তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না।
মনের আঙিনায় খুব করে একটা প্রশ্ন উকি দিচ্ছে—
এসব কেন করলো মানুষটা? তার তো এসব করার কোনো প্রয়োজন ছিল না, তাহলে কেন?
টাকার জন্য?
এই কথা মানতে প্রিয়তার মন সাফ সাফ অস্বীকৃতি জানায়। প্রণয়ের মতো মানুষ আর যাই হোক, টাকার কাঙাল নয়—সে তো কেবল আর কেবল প্রিয়তার কাঙাল।
তাহলে কেন এতকিছু?
প্রিয়তা বুঝলো—এভাবে হাত গুটিয়ে থাকলে এই “কেন”-এর উত্তর সে কোনোদিনও পাবে না। এই “কেন”-এর জবাব তাকেই খুঁজে বের করতে হবে। সে প্রণয়কে ভুল চেনে নি, ভুল চিনতে পারে না। সে একদম ঠিকই চিনেছে—তার প্রণয় ভাই কোনোদিন অপরাধী হতে পারে না।
আর যদি হয়েও থাকে—

এই অপরাধীটাকেই ভালোবাসে প্রিয়তা, খুব, খুব ভালোবাসে। অপরাধী হলেও ভালোবাসে, নিষ্পাপ হলেও ভালোবাসে—জীবিত, মৃত—সব অবস্থাতেই ভালোবাসা কবুল।
কিন্তু নিজেকে মানানোর জন্য, সবটা বোঝার জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন প্রিয়তার। সব রহস্যের ওপর থেকে পর্দা না সরানো পর্যন্ত স্বস্তি পাবে না। ওই লোকটাকে দুঃখী দেখতে একটুও চায় না প্রিয়তা। ভালো-মন্দ যাই হোক, যেমনই হোক—মানুষটা তো তারই।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৯

ন্যায়-অন্যায় এত কিছু বোঝে না। ভালোবাসার নাতে যদি গোটা দুনিয়ার সাথে বিরোধিতা করতে হয়, তবে তাই করবে প্রিয়তা। সবার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে দু’হাতে আড়াল করবে ভালোবাসাকে। বুকে আগলে রাখবে—কাউকে এতটুকুও আঘাত করতে দেবে না ভালোবাসার গায়।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯১

9 COMMENTS

Comments are closed.