Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১২

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১২

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১২
jannatul firdaus mithila

“ যার উপস্থিতি তোর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, শেষে কি-না তার বুকেই নিজেকে আড়াল করলি? ছ্যাহ! ছ্যাহ! নির্লজ্জ বান্দীর মেয়ে!”
সপ্তদশীর কর্ণকুহরে পৌঁছাল অপ্রিয় মানুষটার দারাজ কন্ঠ! নিজে থেকে শূন্যে তুলে এখন কেমন ঠেস মেরে মেরে কথা বলে যাচ্ছে দেখো! হুহ্! লোকটার ভাবখানা দেখে মনে হচ্ছে মাহি বুঝি নিজে থেকে তার কোলে উঠতে চেয়েছে। অথচ ঘটনা সম্পূর্ণ উল্টো! মাহি তৎক্ষনাৎ যুবকের চওড়া বুক থেকে মাথা উঠিয়ে ঘাড় তুলে তাকায়। সরু চোখে মাস্ক পরিহিত মানুষটার আড়ালে থাকা মুখাবয়বে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হতবিহ্বলের ন্যায় প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“ আপনিই রাক্ষস?”
ভ্রু গোটায় মুগ্ধ। কপালে ফেলল গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ। বাদামী চোখদুটো বোধহয় বিরক্তিতে তীক্ষ্ণ হলো পরক্ষণে। অতঃপর কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়াই মুখাবয়বে একরাশ বিরক্তির তিক্ততা নিয়ে বেয়াদব ছেলে ঘটায় আরেক কান্ড! বুকের কাছে ঝুলতে থাকা মাহির কোমর বরাবর চেপে রাখা শক্তপোক্ত হাতটা তার আচমকাই ঢিলে হলো। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল মাহি! তাল সামলাতে না পেরে হুট করেই ছিটকে পড়ল পাপড়িময় জমিনে। তৎক্ষনাৎ পুরনো কোমরের ব্যথা মাথা চড়া দিয়ে উঠতেই বেচারির ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে এক চিলতে ব্যথাতুর শব্দ!

“ আউচ!”
চোখমুখ কুঁচকে একহাতে কোমর ডলছে মাহি। সম্মুখে পাহাড়ের ন্যায় সটানভাবে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। তার মধ্যে তেমন কোনো হেলদোল নেই, নেই মেয়েটার প্রতি বিন্দুমাত্র উদ্বেগ। সে উল্টো নিজের হাতে থাকা রিভলবারটা এগিয়ে নিয়ে আসে নিজ ঠোঁটের কাছে। কুচকুচে কালো রঙা বন্দুকটার নল দিয়ে বেরুচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। মুখের পাতলা আবরণী মাস্কের আড়াল থেকেই বন্দুকের নল বরাবর জোরালো ফুঁক বসায় মুগ্ধ। হাত ঘুরিয়ে ফের বন্দুকটা নিজের কোমরের পিঠে গুঁজতে গুঁজতে কঠিন গলায় বলল,
“ প্যালেসে এতো জায়গা থাকা স্বত্বেও এখানে মরতে এলি কেনো?”
মুখ কুঁচকায় মাহি! একে-তো কোমরের ব্যথাটা বেড়েছে, তারওপর লোকটার ওমন ঠেস মারা কথাবার্তা। মেয়েটা ভারী বিরক্ত হলো এপর্যায়ে। চোখেমুখে একরাশ বিরক্তিকর ঝাঁঝ টেনে তেঁতো মুখে শুধালো,

“ আপনাকে কে বলেছে আমি এখানে মরতে এসেছি? আমি ঘুরতে এসেছি! তবে আপনার তো আবার আমার সুখশান্তি সহ্য হয়না! যেখানে যাব সেখানেই হাজির হবেন কাল হয়ে। এই যেমন এখন হলেন।”
দাঁত খিঁচল মুগ্ধ! মেয়েটা এতো মার খায় তার হাতে তারপরও ওর কথাবার্তায় বিন্দুমাত্র ঝাঁঝ কমেনা। এর জায়গায় অন্য কেউ হলে দ্বিতীয়বার মনস্টারের সামনে মুখ খুলে কথা বলার সাহস করত না অথচ মেয়েটাকে দেখো! দিব্যি মুখে খই ফুটছে তার। মুগ্ধ দাঁত কিড়মিড় করতে করতে হালকা ঝুঁকে দাঁড়াল মাহির দিকে। ভীষণ রাগ নিয়ে তৎক্ষনাৎ একহাতে টান মেরে নিজের মুখ থেকে মাস্কখানা উম্মুক্ত করে হিসহিসিয়ে বলতে লাগল,
“ বিড়ালের হাড্ডি খেয়ে দুনিয়ায় এসেছিস না-কি নির্লজ্জ বান্দীর মেয়ে? এতো মারি তারপরও শিক্ষা হয়না তাই-না?”
ভয় পেল না মাহি। মনের মধ্যে আজ কোথা থেকে এক আকাশসম সাহস পেল কে জানে! সে উল্টো মুখ ঝামটি মেরে বলে ওঠে,

“ না শিক্ষা হয়না! আর হবেও না।”
মেজাজ এখন বিপদসীমার বাইরে যাচ্ছে ক্রমশ। মুগ্ধ নামক ভয়াল যুবকের বাদামী চোখজোড়া লাল হচ্ছে ধীরে ধীরে। সে একমুহূর্ত চোখদুটো বুঁজে নিয়ে হিসহিসিয়ে ফের বলল,
“ কথাবার্তা লিমিটে রেখে বল জানোয়ারের বাচ্চা!”
মাহি শুনলো না। মুগ্ধ যদি হয় ১০ আনা, সে হয়েছে আজ ১২ আনা। গলায় একরাশ ভয়হীন ঝাঁঝ ঢেলে পরক্ষণেই বলল,
“ বলব না বলব না বলব না! কি করবেন?”
❝ ঠাসস ❞

কথাটা শেষ হলো কী মাহির? না-কি তার আগেই নরম-সরম গাল বরাবর সপাটে বসল এক চড়? চড়ের তীব্রতা আজ বেশি ছিল মনে হচ্ছে! মাথাটা কেমন ঝিম ধরে গেল মেয়েটার। চোখের সামনে সবটা এখনো ঝাপ্সা। গরম হয়ে যাওয়া বাম গালটায় আলগোছে হাত চলে গেল মাহির। ইশশ্! গালটা বুঝি ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে তার। মাহি কিয়তক্ষন চুপ থাকল, সম্মুখের রূঢ় মানব রাগে গজগজ করতে করতে সটান হয়ে দাঁড়াতেই মাহি ঘটায় আরেক কান্ড! গালের পাশে হাত রেখে চোখমুখ কুঁচকেই চেঁচিয়ে বলল,
“ হ্যাঁ হ্যাঁ! এটাই তো পারবেন। কথায় না পারলে হাত চালাবেন। যত্ত…”
❝ ঠাসস ❞

দ্বিতীয় চড়টা বসেছে ডান গালে। আগের তুলনায় যার জোর ছিল দ্বিগুণ। বেচারি মাহি এবার গালের ব্যথায় ফুপিয়ে ওঠে কেমন! মুখ থেকে যেন আওয়াজ না বেরোয় সেজন্য ঠোঁট কামড়ে ধরেছে নিজের। এদিকে তার ওমন হাবভাবে তিতিবিরক্ত মুগ্ধ। তক্ষুনি এগিয়ে এসে খামচে ধরল মাহির কন্ঠা। একমুহূর্তের জন্য নিশ্বাস আঁটকায় মাহির তবে কন্ঠফুড়েঁ বেরোয়নি তেমন শব্দ! মুগ্ধের কঠিন মুখটা তার একদম নিকটে। চোখেমুখে আছড়ে পড়ছে মুগ্ধের গরম নিশ্বাসের ঝাপটা। মাহির চোখদুটো নিবুনিবু, কান্নায় ভরে গেছে কার্নিশ। যেন একটু টোকা দিলেই হড়হড়িয়ে বেরুবে অশ্রুকণার দল। আশ্চর্য হলেও সত্যি মুগ্ধ আজ মোটেও তাকায়নি মেয়েটার চোখের দিকে। তাকিয়ে থোড়াই নিজেকে অশান্ত বানাবে পরিপাটি যুবক? তার এমুহূর্তে রাগে মাথার তালু জ্বলছে। পারছেনা এক আছাড়ে মেয়েটাকে মে*রে ফেলতে। সে কেমন ঝাঁঝাল কন্ঠে গর্জন তুলে বলল,

“ বেয়াদবের বাচ্চা! ঠোঁটের আগে জিভ চলে তোর তাই না? ঠিক আছে, দেখি তোর জিভটা কতবড়।”
বলেই মাহির কন্ঠা ছাড়ে মুগ্ধ। পরমুহূর্তেই একহাতে চট করে চেপে ধরে মাহির নরম চোয়াল। আহারে! মুগ্ধের ওমন শক্তপোক্ত হাতের থাবায় মুষড়ে যাচ্ছে বেচারির নরম চোয়াল। এই বুঝি চোয়ালটা ভেঙে গুড়িয়ে পড়ল নিচে! মাহি ককিয়ে যাচ্ছে চোয়ালের ব্যথায়। হাতদুটো সামনে এনে অহেতুক ঠেলে যাচ্ছে মুগ্ধকে। তবে মুগ্ধ কী আর সরে? সে-তো ঠায় নিজ জায়গায়। মেয়েটার ওপর হালকা ঝুঁকে দাঁড়িয়ে, তক্ষুনি নিজের বা-পায়ের লম্বা জুতোর পেছনের ভাঁজ থেকে বের করে আনে পুরাতন ব্রিটিশ শৌর্যের কারুকাজ খচিত একখানা চাকু। মাহি থমকায়! চোখদুটো বড়সড় করে তাকিয়ে রয় একপলক। কলিজাটা তার তখনি ছলাৎ করে উঠল যখন দেখল — মুগ্ধ নিজের ধারালো দাঁতের সাহায্যে একটানে চাকুর গা থেকে খোলসটা টান দিয়ে সরিয়েছে। মাহি হকচকায়! মুগ্ধ তার মুখের দিকে চাকুটা এগিয়ে আনছে ক্রমশ। হিংস্র কন্ঠে বারবার বলে যাচ্ছে,

“ দেখি তোর জিভটা বের কর! খুব চলে তাই না? আজকেই ওর বাড়াবাড়ির ইতি টানব। নে মুখ খোল জানোয়ারের বাচ্চা।”
মাহির আত্মাটা বুঝি এক্ষুনি শরীর থেকে ফুঁস করে বেরিয়ে যাবে। এ লোক কী মানুষ না আর কিছু? সে-তো ভেবেছিল লোকটা বোধহয় তাকে ভয় দেখাবে, তবে সে যে এভাবে সত্যি সত্যি জিভ কেটে ফেলতে উদ্যোত হবে তা থোড়াই জানতো মেয়েটা? মাহি ক্রমাগত হাতজোড় করছে। মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না বেচারি। বারবার মুগ্ধকে ইশারায় বোঝাচ্ছে,

“ আর মুখে মুখে তর্ক করব না। দরকার পড়লে কথাই বলব না! প্লিজ আমার জিভ কাটবেন না।”
কিন্তু উঁহুম! মেয়েটার ওমন একাধিক অনুনয় – বিনয়ে একটুও টললেন না জনাব। উল্টো হাতের জোর বাড়ালেন বেশ। মাহির চোয়ালটা শক্ত করে চেপে ধরে বাধ্য করতে লাগল মুখ খুলতে। একপর্যায়ে চোয়ালের তীব্র ব্যথা সইতে না পেরে ঠিকই মুখ খুলল মাহি। এই ফাঁকে চট করে মেয়েটার মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে জিভ টেনে ধরে মুগ্ধ। মাহির চোখদুটো এবার বোধহয় ফেটে বেরুবে বাইরে। শরীরে বইতে থাকা তীব্র ঝংকারে দূর্বল মেয়েটা! এদিকে মুগ্ধের ঠোঁটের কোণে এক টুকরো পৈশাচিক হাসি স্পষ্ট। চোখদুটো বাজপাখির ন্যায় তীক্ষ্ণ! তার দৃষ্টি আপাতত মাহির লালচে-গোলাপি জিভের দিকে নিবদ্ধ। ধরে রাখা ধারালো চাকুটা কেমন ঝিলিক দিচ্ছে চোখ বরাবর। ধীরে ধীরে চাকুটা মাহির জিভের দিকে এগুতেই ভয়ে তটস্থ মাহি চোখ উল্টে জ্ঞান হারায় তৎক্ষনাৎ। মুগ্ধ মুখ বাঁকায় বিরক্তিতে। অচেতন মাহির চোয়াল ছেড়ে দিতেই মেয়েটা কেমন লুটিয়ে পড়ল গোলাপি আভায় ছেয়ে থাকা ফুলেল জমিনে। মুগ্ধ বিরক্তি নিয়েই তাকায় মেয়েটার পানে। পাপড়িময় জমিনে লুটিয়ে আছে মাহি, পরনের কালো রঙা ফ্রকটায় খুব খারাপ না দেখালেও তাকে এমুহূর্তে কেন যেন খুব একটা চোখে ধরেনি মুগ্ধের। ছেলেটা কেমন দাঁত খিঁচে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,

“ ভংগিমা ভালোই জানে বান্দীর মেয়ে! পান থেকে চুন খসলেই যখন-তখন জ্ঞান হারাবে! যত্তসব নাটক!”
কত-শত গালমন্দ করে যাচ্ছে বেচারিকে। অথচ বেচারির কি দোষ? সে যে তাকে এতো ভয় দেখালো তা কী একবারও চোখে পড়েনি যুবকের? তাছাড়া পড়বেই বা কিভাবে? প্রদীপ কী কখনো নিজের তলানিতে থাকা অন্ধকার দেখে? ঠিক তেমনি মুগ্ধও দেখল না নিজের দোষ। সে উল্টো শক্ত চোয়ালে নিজের হাতে থাকা চাকুটা ফের হাতের ভাঁজে নাড়াতে থাকল। ঠিক তখনি সেথায় হন্তদন্ত পায়ে আগমন ঘটল সিডের। বেচারা দু-কদম পিছে এসে দাঁড়াল মুগ্ধের। মাথাটা নুইয়ে রেখে ভয়ার্ত কন্ঠে কুর্নিশ জানিয়ে বলল,

“ দোব্রি ভেচের মনস্তার!”
(গুড ইভিনিং মনস্টার)
শুনল মুগ্ধ! তৎক্ষনাৎ পেছনে ফেরার অভ্যেস নেই তার। হাতের চাকুটা নাড়িয়ে চাড়িয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ শান্ত অথচ নিরেট কন্ঠে বলল,
“ উ মুরাভইয়া ভিরাস্তায়ুত ক্রিলইয়া পেরেদ স্মের্তিউ?”
[পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। রাইট?]
ভড়কায় সিড। মাথাটা নুইয়ে রেখেই বোধগম্যহীনের ন্যায় কেবল ছোট স্বরে জবাব দিলো,
“ দা, পাঝালুস্তা মনস্তার।”
(জ্বি অবশ্যই মনস্টার।)

কথাটা বলতে দেরি ওমনি সিডের ডানপাশের বুক বরাবর সজোরে বসল ধারালো চাকুর তীক্ষ্ণ ডগা। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবাক সিড। তক্ষুনি বুকের ব্যথায় মুষড়ে গিয়ে দু- হাত দিয়ে চেপে ধরে বুক। এদিকে তার বুক বরাবর ধীরে ধীরে চাকুটা আরেকটু ঠেলে দিচ্ছে মুগ্ধ। ছেলেটার বুকের নরম মাংস ছেদ করে ক্রমান্বয়ে পাজঁর ছিঁড়ে ভেতরে ঢুকছে মনস্টারের পছন্দের অস্ত্রটা। ব্যথার মাত্রাতিরিক্ততায় আর দাঁড়িয়ে থাকার জোর পায়নি সিডের পাদু’টো। তারা হুট করেই হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল জমিনে। সিড আর্তনাদ করছে! ওর মুখ দিয়ে কাশির সাথে সাথে বেরুচ্ছে লহু। অথচ নির্দয় নিষ্ঠুর মানব মুগ্ধের, তা দেখে একটুও মায়া হলোনা। সে নিজেও হালকা ঝুঁকে দাঁড়াল সিডের সামনে। মুখাবয়বে কঠিন ভাব ছেয়ে গেছে মনস্টারের, বাদামী চোখদুটো রঙ পাল্টেছে র*ক্ত লালে। ফর্সা মুখখানার সে-কি ভয়ংকর অবস্থা! দৃঢ় চোয়ালের কটমট ধ্বনি স্পষ্ট কানে যাচ্ছে সিডের। মুগ্ধ হাতের জোর বাড়াল। অতঃপর খপ করে এক শব্দ তুলে চাকুর অর্ধেকটা ঢুকে গেল সিডের বুকের ডানপাশে। বেচারা সিডের র*ক্তে হাত মেখে গেছে মুগ্ধের অথচ সে থামছেনা তবুও। উল্টো ভীষণ রাগে হিসহিসিয়ে বলল,

“ আমার শিকারের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য এবং অধিকার কেবল আমার! হোক সেই শিকার আমার পছন্দের কিংবা অপছন্দের, তার দিকে যেহেতু একবার আমার চোখ পড়েছে — তারমানে তার দেহের শেষ র*ক্তবি*ন্দু থাকাকালীন সে আমার!”
নিরব হুমকিতে গাকাঁটা দিয়ে উঠছে সিডের। বুকের ওপর জেঁকে বসেছে অসহ্য ব্যথা। তবু্ও চোখদুটো নামিয়ে রাখা তার। কেননা দৃষ্টি তুললেই স্বয়ং মৃত্যুকে নিজ চোখে দেখবে সে। এরচেয়ে এমনেই মরুক,তাই ভালো। এদিকে মুগ্ধ এবার নিজের হিং*স্র*তা বাড়াল। সিডের বুকে অর্ধেক ঢুকে থাকা চাকুটা একটানে বের করে এনে ফের বসালো আরেক ঘাঁ। এহেন কান্ডে চিৎকার দিয়ে ওঠে সিড। আর্তনাদ করতেই হুট করে তার গলা চেপে ধরে মুগ্ধ। কন্ঠ খাদে নামিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,

“ হুঁশশশ!”
তৎক্ষনাৎ ঠোঁট কামড়ে নিজের আর্তনাদ আঁটকায় সিড। চোখদুটো ফেটে কান্না বেরুচ্ছে তার। বুকে বসছে অগণিত ঘাঁ। এহেন ব্যথার তীব্রতায় শরীর দুলে উঠছে তার। ওদিকে মুগ্ধ একের পর এক ঘাঁ বসিয়ে যাচ্ছে সিডের বুক বরাবর। বেচারা সিডের বুকটা যখন লাল তরলে মাখামাখি ঠিক তখনি আচমকা সিডের ঘাড় চেপে ধরে মুগ্ধ। দূর্বল সিডের কানের পাশে মুখ নামিয়ে কঠিন গলায় হিসহিসিয়ে বলল,
“ মনস্টার তার ভোগে কারো ভাগ সহ্য করেনা বাস্টার্ড! যেটা আমি একবার চাইব, সারা দুনিয়া উল্টে গেলেও সেটা জাস্ট আমার হতে বাধ্য! আমার মানে আমার! নো ওয়ান ক্যান ডেয়ার টু লুক অন দেম! ইফ দে ডেয়ার, দে উইল ডায়। এন্ড ইট’স লাউড এন্ড ক্লিয়ার।”
সিডের শরীর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। মস্তিষ্কে কড়া নাড়ল অনেককিছু। বুঝে গেল — মনস্টার তাকে ঠিক দেখেছে মাহির সাথে। তাইতো তার ওমন হিংস্রতা চোখে পড়ল সিডের। এদিকে মুগ্ধ ততক্ষণে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতের র*ক্ত মাখা চাকুটা খানিক ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে পা বাড়িয়েছে অচেতন মাহির পানে। কিয়তক্ষন মাহির নিশ্চল মুখপানে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে মনে মনে আওড়াল,

“ জানোয়ারের বাচ্চার একজনে হয়না!”
মনে মনে কথা আওড়ালেও মুখে কোনো রা নেই মুগ্ধের। চোখেমুখে একরাশ রাগ -বিরক্তি লেপ্টে নিয়ে সে হালকা ঝুঁকে এসে, এক ঝটকায় অচেতন মাহিকে তুলে নিলো নিজ কাঁধে। নিশ্চল মাহির হাতদুটো ঝুলছে মুগ্ধের পিঠ বরাবর, আর পাদু’টো সামনে। বলিষ্ঠ পুরুষ মোটেও হাত রাখল না মাহির গায়ে। নিজের চওড়া কাঁধে মেয়েটাকে একপ্রকার ফেলে রেখে আলগোছে হাত বাড়িয়ে পকেট থেকে মোটা সিগারটা বের করে আনল পরক্ষণে। অতঃপর সিগারের শেষ ভাগ ঠোঁটের ভাঁজে গুঁজে নিয়ে লাইটার ধরালো আগায়। বিশাল এক সুখটান বসিয়ে মেয়েটাকে কাঁধে তুলেই হাঁটা ধরল প্যালেসের দিকে। দূর থেকে একপলক দেখলে মনে হবে — এ যেন এক রাক্ষসের ভয়ানক দৃশ্য! সারা গায়ে কালো রঙা ভারী ক্লোক। হাতা দুটো কি বিশাল! কি বিশাল! মাথায় মস্তবড় টুপি, ঠোঁটের কোণে জ্বলছে সিগার। হাত গুঁজে রাখা পকেটে। যুবকের কাঁধে অচেতন রমণী। তার পাদুটো কয়েক কদম এগোতেই গলায় কেমন আজব সুরের টান উঠল যেন। অদ্ভুত শান্তভাবে ভয়ানক কন্ঠে গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল,
“ He is a villain by the devil’s law…
He is a killer just for fun, fun, fun, fun..

কাউন্টারের ওপর টুকটাক শব্দ হচ্ছে কাঁচের বাটিগুলোর নড়চড়ে। চপিং বোর্ডে দ্রুত হাত চালাচ্ছে মিলা। কুঁচি কুঁচি করছে গ্রিন চিলিস। পাশের ওভেনে ২০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বেকড হচ্ছে চিজ পাস্তা। ওপরে গার্নিশ করার জন্য চপড চিলি তৈরী করে রাখছে মিলা। আর মাত্র দু’মিনিট! তারপরেই বের করবে পাস্তাটা। মিলা বড্ড আগ্রহের সাথে কাজ করছে। ঠিক তখনি কিচেনে কারো উপস্থিতি টের পায় মিলা। তবে সেদিকে তেমন ভ্রুক্ষেপ করেনি মেয়েটা, কিচেনে তো কত শেফই আসে যায়! সবদিকে থোড়াই খেয়াল রাখবে সে? এদিকে মিলার পানে একজোড়া ভারী কদম এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে। মেয়েটার একদম পাশ ঘেঁষে দাঁড়াতেই টনক নড়ল মিলার। গাকাঁটা দিয়ে উঠল অজানা ভয়ে। আতঙ্কে হড়বড়াতে গিয়ে ধারালো ছুরির সনে আঙুলের নরম চামড়ার সামান্য ঘর্ষণ লাগতেই, আঙুল কেটে লহু গড়াতে লাগল মিলার। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেনি মিলা, উল্টো ভীষণ ভয়ে তক্ষুনি পেছনে ঘুরে তাকাতেই দেখল — মেইডেনের কুটিল হাসিমাখা মুখ। মিলা ভড়কায়, তৎক্ষনাৎ পেছাতে গেলেই গা বাঁধল কাউন্টারের সঙ্গে। মেইডেনের কুটিল হাসি প্রশস্ত হলো বোধহয়। তিনি কেমন গলা উঁচিয়ে বাদবাকি কিচেন স্টাফদের উদ্দেশ্যে বললেন,

“ সবাই বাইরে যাও। আমার ওর সাথে কিছু কথা আছে।”
প্যালেসের উর্ধতন মেইড হচ্ছেন মেইডেন ইরা। তার কথা অগ্রাহ্য করবার সাধ্যি আছে কার শুনি? সবাই কি সুন্দর মাথা নুইয়ে চলে যেতে লাগলেন কিচেন থেকে। মিলা ভয়ার্ত ঢোক গিলছে। মুখ ফুটে সবাইকে বলতে চাচ্ছে,
“ যেও না! আমায় ছেড়ে যেও না।”
কিন্তু মনের কথাগুলো মুখ অব্ধি ফোটেনি তার। ভয়ে আতঙ্কে তটস্থ তনমন। এদিকে সবাই চলে যেতেই মেইডেন বোধহয় সুযোগ পেলেন। তক্ষুনি এক হিংস্র থাবায় আঁকড়ে ধরলেন মিলার সোনালী রঙা চুলের মুষ্ঠি। মিলা ঠোঁট কামড়ে ব্যথা সইলো ব্যথাটুকু। মেইডেন মিলার মাথাটা খানিক ঝাঁকিয়ে কটমটিয়ে বলতে লাগলেন,
“ কি বলেছিস ওকে? সত্যি করে বল, কী জানিয়েছিস ওকে?”
মিলা মুখ খুললো না। ঠোঁট কামড়ে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছে নিরবে। মেইডেনের বুঝি রাগ বাড়ল তা দেখে। তিনি তৎক্ষনাৎ নিজের অপর রুপখানা দেখাতে উদ্যোত হলেন। নিজের গা থেকে শালটা তক্ষুনি খুলে নিয়ে, শালের একাংশ জোর করে ঠেলে দিলেন মিলার মুখে। মিলা হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলো কেবল। মুখ থেকে শালটা সরাতে চাইলেই মেইডেন সপাটে তার গাল বরাবর দিয়ে বসলেন এক চড়। চড়ের তীব্রতায় হেলে পড়ে মিলার গাল। চোখফেটেঁ বেরুলো অশ্রুকণার দুয়ার। মেইডেন এতটুকুতে থামলেন না। মিলার চুলগুলো মুঠোয় চেপে ফের জিজ্ঞেস করলেন,

“ এখনো সময় আছে , বল ওকে কি বলেছিস?”
মিলা এবারেও নিশ্চুপ। সে-ই নিশ্চুপতাই যেন কাল হয়ে দাঁড়াল তারজন্য। মেইডেন হিংস্র হলেন। নিজের চিরচেনা মুখোশটা তৎক্ষনাৎ সরিয়ে দিয়ে উম্মুক্ত হলেন নিজের ভয়ানক অলক্ষ্য রুপে। একহাতে তক্ষুণি মিলার বামহাতটা চেপে ধরে অন্যহাতে কাউন্টারের ওপর অন করে রাখা ওভেনের দরজাটা একটানে খুলে দিলেন। অতঃপর চোখের পলকে মিলার হাতখানা চেপে ধরে ঢুকিয়ে দিলেন গরম ওভেনে। মুহুর্তেই বুকফাটা আর্তনাদে ফেটে পড়ে মিলা। কিন্তু তার ওমন বুকফাটা আর্তনাদ বাইরের কেউই শুনলোনা। মেইডেন ইরা সেই সুযোগ রাখলেনই না। প্রায় মিনিট খানেক বাদেই ওভেন থেকে মিলার হাতটা বের করে আনেন মেইডেন। আহারে! বেচারির হাতের উপরাংশের চামড়াটা কেমন উঠে গিয়েছে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে বাঁকা হাসলেন মেইডেন। আরেকধাপ পৈ*শা*চি*কতা বজায় রেখে তক্ষুনি চপিং বোর্ডে চপ করে রাখা গ্রিন চিলি গুলো হাতে তুলে মাখিয়ে দিলেন মিলার পো*ড়া হাতটায়। এবার বোধহয় হাতের যন্ত্রনায় ম*রে*ই যাবে মিলা। মেয়েটা রীতিমতো ছটফটাচ্ছে কষ্টে। অথচ মেইডেনের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হিংস্র হাসির রেশ স্পষ্ট দৃশ্যমান। তিনি ছটফটাতে থাকা মিলার চুলগুলো ফের চেপে ধরে হিসহিসিয়ে আলটিমেটাম দিয়ে বললেন,

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১১

“ খবরদার! ভুলেও আমার পথের কাটাঁ হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করিস না। নয়তোবা তোর প্রাণটা কিন্তু অল্প বয়সেই খোয়াতে হবে। ভুলে যাস না, আমরা এ বাড়িতে কেন এসেছি। সেই ছেলের দু’দিনের মোহে পড়ে এতো সহজে সবকিছু ভুলে গেলে কিভাবে হবে? আমাদের তো আরও অনেককিছু করতে হবে। ধ্বংস করতে হবে ওকে।”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৩

1 COMMENT

Comments are closed.