মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১১
jannatul firdaus mithila
“ আমি যাবো না মেয়ে। তোমার ইচ্ছে হলে তুমি একা যাও।”
ভ্রু গোটায় মাহি। কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটা ওমন হাসিহাসি মুখ করে কথাবার্তা বলছিল, সে কি-না মেইডেন আসতেই চুপসে গেল? কিন্তু কেনো? মাহি গম্ভীর মুখে চোখ তুলে তাকালো মিলার পানে। মিলা মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার একহাত এখনো চেপে রেখেছে মেইডেন। মিলার পাদু’টো কেমন অস্থির! ধরে রাখা হাতটা মোচড়াচ্ছে অনবরত। মাহির সন্দেহ জাগলো এবার। সন্দেহাতীত কন্ঠে তৎক্ষনাৎ মেইডেনকে শুধায়,
“ ওকে এভাবে ধরে রেখেছেন কেনো মেইডেন? হাতটা ছেড়ে দিন ওর।”
কথাখানা কর্নপাত হতেই চোখ সরু করে তাকায় মেইডেন। চোখেমুখে তার স্পষ্ট নাখোশের ছাপ, কপালে জমেছে বিশাল বিরক্তির ভাঁজ! মাহির কথাটা যে খুব একটা পছন্দ হয়নি উনার, তা ইতোমধ্যেই বোঝা যাচ্ছে তার পরিবর্তিত মুখাবয়বে। মস্তিষ্ক তার ঝাঁঝিয়ে বলতে লাগল,
“ শেষে কি-না দুদিন আগে প্যালেসে আসা পুঁচকে মেয়েটাও আমায় হুকুম ছুড়ঁছে? এ-ও কী সম্ভব?”
মস্তিষ্কের ঝাঁঝানো বাক্যটা ঠোঁট অব্ধি এগোয়নি মেইডেনের। তিনি কেমন নিপুণতার সাথে মুহূর্তেই নিজের মুখাবয়বে পরিবর্তন আনলেন। ঠোঁটের কোণে জোরপূর্বক হাসি টেনে পরক্ষনে আওড়ালেন,
“ না ডিয়ার! ওকে এমুহূর্তে ছেড়ে দিলে বিপদ হতে পারে। কেননা তোমাকে মিলার সম্বন্ধে একটা কথা এখনো বলাই হয়নি।”
থামলেন মেইডেন। রয়েসয়ে ঘাড় বাকিয়ে শক্ত চাহনি নিক্ষেপ করলেন নতমুখী মিলার পানে। গম্ভীর অথচ ঝাঁঝাল কন্ঠে হুকুম ছুঁড়লেন,
“ এক্ষুণি নিজের কক্ষে যাও মিলা। আমি আসছি!”
মিলা হাসফাস করতে করতে ঘাড় কাত করল আলগোছে। মেইডেনের শক্তপোক্ত হাতের বাঁধন থেকে মুক্তি পেতেই ভীষণ অস্থিরতায় পায়ের গতি বাড়ায় মেয়েটা। একছুটে কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল লম্বা করিডরে। কক্ষের দু’ধারে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ড দু’জন কেমন স্থির হয়ে আছেন। হাতে থাকা রাইফেলগুলো দু’ধারে মুখ করে রাখা। মিলা ভয়ার্ত ঢোক গিলে কয়েক-কদম পিছিয়ে গেল। বুক ফুলিয়ে বড় বড় নিশ্বাস ফেলে ঘাড় বাকিয়ে একপলক ফের তাকাল মাহির কক্ষের পানে। কিছু একটা ভেবে ভেবে মেয়েটা কেমন উদাস কন্ঠে আনমনে বিড়বিড় করে বলল,
“ নিজের হাতে নিজের ক্ষতি করোনা মুনলাইট।”
সন্দেহাতীত মাহি এখনো নিজের কাঙ্ক্ষিত উত্তরের অপেক্ষায়। মেইডেন সময় নিচ্ছেন বেশ! মাহির নরম তুলতুলে ডানহাতটা আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় পুরে, তাকে নিয়ে বসলেন মখমলের বিছানার ওপর। কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে মাহির তুলতুলে হাতের পানে তাকিয়ে রইলেন মধ্যবয়সী। তার মাঝে তেমন কোনো তাড়া নেই জবাব দেবার। ওদিকে মাহি চিন্তিত! মিলার ব্যাপারে কি এমন বলবেন মেইডেন তা নিয়েই যেম হাজারটা চিন্তায় জর্জরিত সপ্তদশী। সে এবার বিরক্ত হয়ে চট করে মেইডেনের হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে আনলো। মেইডেন ভড়কালেন মেয়েটার এরূপ কান্ডে। হকচকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কি হলো ডিয়ার?”
মাহি বিরক্ত! এমনিতে চুপচাপ থাকলেও মেয়েটার আবার তুখোড় তেজ! তারওপর মিলার বলে যাওয়া ওমন কথা ভাবনায় ফেলেছে তাকে। মিলা তখন কাকে উদ্দেশ্য করে বলল কথাগুলো? সে-কি কোনভাবে মেইডেনকে উদ্দেশ্য করে বলল? বুদ্ধিমতী সপ্তদশী কথা নেবার উদ্দেশ্যে কপালে গোটাকতক ভাঁজ টেনে কাঠকাঠ কন্ঠে বলতে লাগল,
“ মিলার ব্যাপারে কি বলতে চেয়েছিলেন মেইডেন?”
সদা মিনমিনিয়ে কথাবলা মেয়েটা কি-না আজ ওমন কাঠকাঠ কন্ঠে তেজ দেখিয়ে কথা বলছে! এ নিয়ে মাথাব্যথার শেষ নেই মেইডেনের। মনে মনে তিনি তেঁতে উঠলেও বাইরে থেকে একদম পানির মতো স্থির! চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমান লেপ্টে আওড়ালেন,
“ শোনো মেয়ে! আমি জানিনা মিলা তোমায় কি বলেছে, তবে আমি এটুকু বলতে পারি — মিলা যা বলেছে তা বিশ্বাস করোনা। কেননা ও মানসিকভাবে অসুস্থ!”
থমকায় মাহি। মানসিক ভাবে অসুস্থ মানে? কই মিলাকে দেখে তার তো একবারও এমনটা মনে হয়নি! তবে যে মেইডেন এসব বলছেন! মাহি খানিক গম্ভীর হলো এপর্যায়ে। মন দিয়ে শুনতে লাগল মেইডেনের বাকি কথাগুলো। এদিকে মেইডেনের চোখেমুখে স্পষ্ট বিষাদের ছাপ! মধ্যবয়সীর ছলছল চোখ অদূরের দেয়ালের দিকে নিবদ্ধ। মানুষটা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে আওড়াচ্ছেন,
“ গতকাল রাতে ডিনার টাইমে মনস্টার যাকে শার্কের পেটে চালান করেছিল, সে আর কেউ নয় — মিলার কাজিন ছিল। এই পুরো বাড়িতে একমাত্র ইলিয়াড-ই এমন ব্যাক্তি ছিল যার সাথে মন খুলে কথা বলতো মিলা। কিন্তু গতকালকের ঘটনার পর থেকে মেয়েটা বড্ড ডিস্টার্বড। আজ সকালেও কিচেনে দু’জনের গায়ে গরম তেল ছুঁড়ে এসেছে, বলতে পারো ইলিয়াডের অনুপস্থিতিতে মেয়েটা আগের চাইতেও বেশি উম্মাদ হয়েছে। তাই এখন ওর আশেপাশে থাকাটা রিস্ক!”
হতভম্ব মাহি! কি থেকে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছেনা মেয়েটা। এখানকার মানুষগুলো এতো রহস্যময় কেনো? কার কথা বিশ্বাস করবে সে? এদিকে মাহির ওমন হতভম্বতা দেখে আলতো হাসলেন মেইডেন। তক্ষুনি একটুখানি পিছিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় গা থেকে উলের শালটা নামিয়ে দিলেন। মুহুর্তেই উম্মুক্ত হলো মধ্যবয়সীর পুড়ে যাওয়া হাতদুটো। মাহি কেমন আঁতকে উঠল তা দেখে। মেইডেনের হাতের ক্ষতগুলো একদম তাজা। সফেদ রঙা অয়েন্টমেন্টের মৃদু প্রলেপ দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। মাহি ঢোক গিললো সামান্য। চোখেমুখে ব্যথাতুর ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ এসব কী করে হলো মেইডেন?”
ইরা স্মিত হাসলেন। হাত বাড়িয়ে নামিয়ে রাখা শালটা ফের গায়ে জড়িয়ে নিলেন, কিয়তক্ষন চুপ থেকে আনমনে বললেন,
“ এ আর নতুন কি? পাগলিটা রোজ রোজ পাগলামি করে, আর আমার ওসব নিরবে সয়ে যেতে হয়। কি আর করব বলো? শত হলেও, ও আমার মারিয়ার বয়সী! জানো কী? মিলার আর তোমার মুখের দিকে তাকালেই আমার মেয়েটার চেহারা ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মনটা কিছুটা হলেও স্বস্তি পায় তোমাদের দেখে। ”
নরম দিলের মাহি!মেইডেনের এহেন মায়াবী কথায় তার মন গলেছে বেশ। কিছুক্ষণ আগে নিজের করা ওমন রূঢ় ব্যাবহারে নিজেরই খারাপ লাগছে এখন। মাহি চোখ নামিয়ে বসে রইল চুপচাপ। মেইডেন সরু চোখে পরোখ করলেন মাহির নতমুখ খানা। আলতো হেসে একটুখানি গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে লাগলেন,
“ মন খারাপ করলে কেনো মেয়ে? আমার কোনো কথায় কষ্ট পেলে না-কি?”
তৎক্ষনাৎ চোখ তুলে মাহি। মেইডেনকে শুধরে দিয়ে আওড়ায়,
“ না না! তেমন কিছু না। আমি আসলে…নিজের বিহেভিয়ারে লজ্জিত! আমি আপনার সাথে.. ”
মেইডেন মুচকি হাসলেন মেয়েটার এহেন সরল স্বীকারোক্তিতে। এগিয়ে এসে আদুরে ভঙ্গিতে হাত রাখলেন মাহির মাথায়। চমৎকার কন্ঠে বললেন,
“ বোকা মেয়ে! এসব নিয়ে ভেবোনা তো! আমি চাই তুমি সবসময় হাসিখুশি থাকো। নিজেকে নিয়ে ভাবো, যা করতে ভালো লাগবে তাই করো। কারণ জীবন তো একটাই তাই-না? যেহেতু জন্মেছি, মরতে তো একদিন হবেই। সেক্ষেত্রে ভয়ে ভয়ে বেঁচে কী লাভ? যতদিন বাঁচবে শক্ত হয়ে বাঁচবে, নিজ মনমতো চলবে! ঠিক আছে?”
মেইডেনের কথাগুলোতে বুঝি এক অনন্য স্বস্তি খুঁজে পেলো মাহি। এ যেন ঠিক তার মায়ের কথা। মাহি যতবার ভেঙে পড়তো, তার মা’তো ঠিক এভাবেই বোঝাতো! সর্বদা তাকে শক্ত হতে বলতো। তবে আজ? আজ কেন তার মা কোত্থাও নেই? মায়ের কথা মনে পরতেই মুখটায় আঁধার নেমে এলো মাহির। বুকটা ধরে গেল এক অদ্ভুত হাহাকারে। সম্মুখে বসে থাকা মেইডেন বোধহয় আচঁ করতে পারলেন মেয়েটার মনের অবস্থা। তিনি তক্ষুনি প্রসঙ্গ এড়াতে উদ্যোত হলেন। মাহির ডানহাতে টান বসিয়ে তাড়া দেখিয়ে বললেন,
“ এ্যাই মেয়ে? তুমি না তখন বললে, তুমি গার্ডেনে যেতে চাও? তাহলে উঠো। আমি নিয়ে যাচ্ছি তোমায় গার্ডেনে। কী? যাবে তো আমার সাথে?”
ভরে আসা চোখদুটো কোনমতে লুকায় মাহি। মাথাটা নুইয়ে রেখে ঝাঁকাল কয়েকবার। মেইডেন স্মিত হেসে উঠে দাঁড়ালেন। মেয়েটাকেও নিজের সাথে করে নিয়ে বেরুলেন কক্ষের বাইরে।
ধীর পায়ে হাটঁছে মাহি। টুকটাক কথা বলছে মেইডেনের সাথে। দু’জন হাঁটতে হাঁটতে প্যালেসের সদর দরজার কাছে আসতেই হঠাৎ থেমে গেলেন মেইডেন ইরা। মাহিও থামল তৎক্ষনাৎ। ঘাড় বাকিয়ে মেইডেনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
“ কি হয়েছে মেইডেন?”
মেইডেন তৎক্ষনাৎ কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ায় জিভে দাঁত কাটলেন। বাহুর মাঝ থেকে মাহির হাতখানা সরিয়ে দিয়ে আফসোসের সুরে বলতে লাগলেন,
“ আ’ম সো সরি ডিয়ার! আমার ঔষধ খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। আমার আবার উচ্চমাত্রার ডায়েবিটিস আছে, যার জন্য ঔষধ টাইম টু টাইম খেতেই হবে! সো আই কান্ট গো উইথ ইউ।”
হতাশ হলো মাহি। এতক্ষণের উপচে পড়া খুশিটা কেমন নিভে গেল ধপ করে। মেইডেনের নিজের কাছেই বড্ড খারাপ লাগল যেন! তিনি মন খারাপ করে শুধালেন,
“ আমি খুব দুঃখীত ডিয়ার! আসলে আমি…!”
বাকিটা বলার মত সুযোগ পেলেন না মেইডেন। তার আগেই মাহি কেমন সৌজন্যতা রক্ষা করে আওড়াল,
“ ইট’স ওকে মেইডেন। আপনি ঘরে গিয়ে ঔষধ খান। আমিও ঘরে চলে যাচ্ছি, অন্য কোনোদিন ঘুরবো নাহয়।”
মেয়েটার কন্ঠে স্পষ্ট মন খারাপের সুর টের পেলেন মেইডেন। আফসোসে ডুব দিয়ে উল্টো পথে ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎ দেখলেন সামনে থেকে হেঁটে আসছে সিড। কানের দু’পাশে হেডফোন গুঁজে রাখা, হাতদুটো গুঁজে রাখা প্যান্টের পকেটে। ছেলেটা চোখবুঁজে কিসব গুনগুন করতে করতে এগিয়ে আসছে। মেইডেন সিডের দিকে তাকিয়ে থেকে একমুহূর্তের জন্য কিছু একটা ভেবেই লাফিয়ে উঠলেন পরক্ষণে। চটজলদি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাহির ডানহাতের কব্জি চেপে ধরে এগোলেন সিডের পানে। এদিকে মাহি কেমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে দেখছে মেইডেনের কান্ড। এক-আধবার মুখ খুলেছে যদিও, তবে মেইডেন তার কোনো কথাকেই পাত্তা দেয়নি তেমন। সে তৎক্ষনাৎ একহাত ছড়িয়ে পথ আটকে দাঁড়াল সিডের। সিড বেচারা চোখবুঁজে হাঁটতে থাকায় দেখতে পায়নি এহেন অবরোধ। ফলাফল স্বরুপ বুকের কাছে হুট করে কারো হাত লেগে যাওয়া আঁতকে ওঠে চোখ খুলল সিড। পরক্ষণে চোখের সামনে নিরীহ, নতমুখী মাহিকে দেখতে পেয়ে থমকায় একমুহূর্তের জন্য। কালো রঙা ফ্লোরাল ফ্রকে মেয়েটাকে একদম আদুরে পিচ্চি পিচ্চি লাগছে। মাথার চুলগুলো কি সুন্দর করে ব-ক্লিপ দিয়ে আঁটকে রেখেছে! মেয়েটার ফর্সা মুখখানায় নেই কোনো প্রসাধনীর ছাপ। তারপরও তাকে এতোটা মোহনীয় লাগছে কেন কে জানে! সিড নিজের গতি হারাচ্ছে মনে হচ্ছে। তার বেহায়া চোখদুটো আজ ফের আঁটকেছে এক বাঙালিনীর মোহনীয় সৌন্দর্যের জালে। জীবনে কত বিদেশি রূপবতী দেখল সে! দেখেছে নানান সৌন্দর্যের অধিকারী সুন্দরীকে তবুও এই সাধারণ বাঙালি মায়াবতীর মাঝে কি এমন পেলো সে? যার দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ে তার জন্য! এদিকে মেইডেন আড়দৃষ্টিতে দেখছেন সব। নতমুখী মাহিরা ইতস্তত করছে সিডের সামনে। হাত মোচড়াচ্ছে বারবার! মেইডেন খানিক গলা খাঁকারি দিতেই বেচারা সিডের সম্বিৎ ফিরল বোধহয়। সে কেমন হকচকিয়ে দৃষ্টি সরালো অন্যত্র। কিয়তক্ষন আমতাআমতা করে জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় যাচ্ছেন?”
মেইডেনের আফসোস শুরু হলো এপর্যায়ে। মাহির পানে একবার দৃষ্টি ফেলে আফসোসের সাথে আওড়ালেন,
“ দেখো না সিড! মেয়েটা কত শখ করে গার্ডেনে ঘুরতে চেয়েছিল। তাই ভাবলাম ওকে নাহয় নিয়ে যাই গার্ডেনে কিন্তু কান্ড দেখো আমার ভুলোমনের! আমার যে ঔষধ খেতে হবে সেটা ভুলেই বসেছিলাম। তাই আমি চাচ্ছি তুমি নাহয় মেয়েটাকে একটু ঘুরিয়ে নিয়ে আসো। কি বলো? নিয়ে যাবে তো?”
বুক কাঁপল সিডের। মাথায় জেঁকে বসল মনস্টারের ভয়। বেচারা ভয়ে ভয়ে তক্ষুনি দু’ধারে মাথা নেড়ে জানায়,
“ না না! আমি পারব না।”
মেইডেন ঠোঁট উল্টালেন। মাহির মাথায় ক্রমশঃ হাত বুলিয়ে ন্যাকা স্বরে শুধালেন,
“ তুমিও না বলে দিলে? ধূর! মেয়েটার ভাগ্যটাই খারাপ। ছোটখাটো একটা শখ করল তাও কি-না পূরন করতে পারলাম না। থাক, চলো মেয়ে! অন্য কোনোদিন নাহয় ঘুরবো আমরা।”
বলেই মেইডেন একরাশ মন খারাপ নিয়ে সামনে এগুলেন মাহির হাত চেপে। এরইমধ্যে পেছন থেকে ভেসে আসে সিডের গম্ভীর কন্ঠ!
“ ওয়েট!”
থামলেন মেইডেন। ঘাড় বাকিয়ে পেছনে তাকালেন আলগোছে। সিড তাকে একপ্রকার উপেক্ষা করে, পা ঘুরিয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল মাহির মুখোমুখি। অতপর ঘাড়টা সামান্য নুইয়ে নিচু কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ তুমি গার্ডেনে যাবে?”
মাহি তৎক্ষনাৎ জবাব দিলো না। মাথাটা নুইয়ে রেখে হাত কচলাচ্ছে অনবরত। ছেলেদের সাথে ঘুরবে সে? কিন্তু কিভাবে? তার তো এসবে মোটেও অভ্যেস নেই। এদিকে সিড এখনো দাঁড়িয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। মেইডেন তখন আগ বাড়িয়ে বলতে লাগলেন,
“ হ্যা হ্যা! ও যাবে। তুমি ওকে নিয়ে যাও। মনস্টার এখন প্যালেসে নেই। ও নাহয় এই ফাঁকে একটু ঘুরে আসুক।”
‘ মনস্টার নেই ’ এটুকু শুনতেই মনের ভেতর থেকে ভয়ডর খানিক কমে গেল মাহির। মেয়েটা ঠায় মাথা নুইয়ে রেখে ছোট করে বলল,
“ যাব।”
সিড ঠোঁট কামড়ে হাসলো। কি চমৎকার সে হাসি! মেয়েটার এটুকু সাহসেই যেন বিশ্ব জয়ের আনন্দ মিললো যুবকের। সে আলতো করে পকেট থেকে একহাত বের করে এনে বাড়িয়ে দিলো মাহির পানে। চাপা স্বরে বলল,
“ চলো!”
সিডের এহেন বাড়ন্ত হাত ধরা তো দূর উল্টো নিজের হাতদুটো কেমন গুটিয়ে নিলো মাহি। শুকনো ঢোক গিলে গম্ভীর কন্ঠে আওড়াল,
“ দুঃখীত! এটুকু পথ হাঁটতে কারো হাত ধরার প্রয়োজনবোধ করছিনা।”
সিড মুগ্ধ এহেন বাক্যে। মেয়েটার প্রতি ভালোলাগাটুকু যেন আরেকধাপ বেড়ে গেল তরতর করে। সে নিজের বাড়িয়ে রাখা হাতটা রয়েসয়ে গুটিয়ে নেয়। কিয়তক্ষন ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখে পরক্ষণে বলে,
“ ফাইন! চলো।”
দু’টো মানুষ মাঝে অল্প কিছু দুরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে কেমন। মাহি আশেপাশে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে হাঁটলেও সিডের মুগ্ধ দৃষ্টি সম্পূর্ণ মেয়েটার ওপর নিবদ্ধ। মেয়েটাকে কাছ থেকে জানার বড্ড লোভ হচ্ছে তার। জানতে ইচ্ছে করছে ওর সম্বন্ধে! সিড খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে হঠাৎ কথা বাড়ালো,
“ তোমার পুরো নাম কি?”
মাহি হাঁটছে। আর কয়েক কদম এগুলেই চেরি ব্লসম গার্ডেন। এখান থেকেই তাদের অপরুপ মোহনীয় দৃশ্য পাগল করছে মাহিকে। যার দরুন পাশ থেকে ভেসে আসা সিডের কথাটা তেমন একটা শুনেনি মাহি। সিড কি বুঝল কে জানে! সে নিজে থেকে ফের বলল,
“ আমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না?”
এবার শুনলো মাহি। থমকে দাঁড়ায় পথে। ঘাড় বাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকায় সিডের মুখপানে। সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে,
“ হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেনো?”
সিডের মুখে রা নেই। মেয়েটার চোখে চোখ পরতেই থমকেছে সে। হারিয়েছে নিজের বোধবুদ্ধি। তার ওমন হা করে তাকিয়ে থাকা দেখে মুখ কুঁচকায় মাহি। কপাল ঝাঁঝিয়ে উঠল বিরক্তিতে। চেনা নেই, জানা নেই হুট করে একজন অপরিচিত মেয়ের দিকে ওমন হা করে তাকিয়ে থাকার কি আছে শুনি? যত্তসব ম্যানারলেস পারসন্স। মাহি গাল বাকিয়ে নিজে নিজেই হাঁটা ধরল গার্ডেনের দিকে। লম্বা লম্বা চারটে কদমে অবশেষে গার্ডেনে প্রবেশ করল সপ্তদশী। গার্ডেনের গোলাপি আভায় ছেয়ে যাওয়া জমিনে পা রাখতেই হৃদয়টা কেমন শিথিল হয়ে গেল তার। মুখটা সামান্য উঁচু করে তাকাল ওপরের দিকে। বাতাসের মৃদু ঝাপটায় গাছের ফুলগুলো ঝরে পরছে ক্রমশ। এ যেন গোলাপি রঙের স্নোফল! মাহি ভীষণ উৎফুল্ল হলো। অন্তর্মুখী সপ্তদশীর অন্তরের কোণে লুকায়িত বাচ্চামো গুলো বুঝি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে আজ। সে নিজের দুহাত দুদিকে ছড়িয়ল এক ছুটে দৌড়ে গেল সামনে। ওপর থেকে ঝরতে থাকা ফুলের পাপড়িগুলো আলতো করে ছুঁইয়ে দিয়ে খিলখিলিয়ে হাসছে মেয়েটা। এক-আধবার নিচু হয়ে জমিনে পড়ে থাকা পাপড়িগুলো দু’হাতে তুলে ফের ছুঁড়ে দিচ্ছে ওপরের দিকে। মেয়েটার দিলখোলা পাগলামি চলছে। এরইমধ্যে মাহি স্পষ্ট টের পেলো তার পেছনে কারো উপস্থিতি। মাহি ভাবল হয়তো সিড এসেছে। তাই সে ঘুরে না তাকিয়েই বলতে লাগল,
“ এতো সুন্দর বাগানে দোলনা লাগাননি কেনো আপনারা? একটা দোলনা থাকলে তো দুলতে পারতাম অন্তত!”
কথার প্রতিত্তোরে জবাব আসেনি পেছন থেকে। তবে মাহির মনে হচ্ছে তার খুব কাছে এগিয়ে এসেছে কেউ। আরেকটু হলেই বোধহয় স্পর্শ লাগবে গায়ে! মাহি ভীষণ রাগান্বিত হলো এহেন কান্ডে। সে তৎক্ষনাৎ পেছনে ঘুরতে ঘুরতে তিরিক্ষি মেজাজে আওড়াল,
“ কি সমস্যা আপনার? এতো কাছে…”
কথাটা মাঝপথেই থামল তার। যখন চোখ পড়ল সম্মুখে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক অজ্ঞাত বলিষ্ঠ দেহী পুরুষের দিকে। লোকটার গায়ে জড়ানো লম্বা কালো হুডেড ক্লোক, দু’হাত ছড়ালে বোধহয় প্রজাপতির ন্যায় ভারী দেখাবে হাতাগুলো। মাথার ওপর টানা বড় গোলাকার টুপি, যার দৈর্ঘ্যে মুখের অর্ধেকটা ঢাকা। যুবকের নাকমুখ ঢেকে আছে কালো রঙা রাউন্ড কাপড়ের মাস্কে। পায়ে পড়েছে দামী ব্যুট! মাহি ভড়কায় এহেন রুপি মানুষকে দেখে। সে হকচকিয়ে পেছাতে গেলেই সম্মুখের বলিষ্ঠদেহী যুবক এক হেঁচকা টানে তাকে নিজের একদম কাছে টেনে আনে। মাহি ভড়কায়, ভয়ে নিশ্বাস আঁটকে যাচ্ছে তার। নতুন করে এ আবার কার পাল্লায় পড়ল সে? ভয়াল মেয়েটা দুহাতে বুক বরাবর ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে যুবকের। কিন্তু উঁহুম! যুবকের ওতোবড় শরীরটা একটু নড়লও না। মাহি এবার ভয়ার্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“ ছাড়ুন আমায়! কে আপনি? এক্ষুনি ছাড়ুন আমায় নইলে কিন্তু আমি চিৎকার করব। তখন এ বাড়িতে থাকা মনস্টারটা বেরিয়ে এলে আপনাকে তার প্রাডার পেটে চালান করে ছাড়বে। প্রাণের মায়া থাকলে ছাড়ুন আমায়।”
মাস্কের আড়ালে পিয়ার্সিং করা ঠোঁটটা পিষে হাসল না-কি যুবক? হাবভাবে তো তাই মনে হচ্ছে। সে এবার কোনরূপ কথাবার্তা ছাড়াই চট করে মাহিকে একহাতে তুলে নেয় বেশ খানিকটা উঁচুতে। মাহির পাদু’টো ঝুলছে শূন্যতে। সে ক্রমাগত মোচড়াচ্ছে ছাড়া পেতে। এরইমধ্যে যুবক নিজের কোমরের পিঠ থেকে বন্দুকটা বের করে আনতেই হকচকিয়ে ওঠে মাহি। ভয়ার্ত ঢোক গিলে মেয়েটা কেমন চিৎকার দিয়ে ওঠে,
“ ওরে আল্লাহ রে! ঐ রাক্ষসটা আমার প্রয়োজনে কেনো আসেনা খোদা? ও রাক্ষস!! কই আপনি? আমায় মেরে ফেললো কে যেন।”
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১০
মাহি চেঁচাচ্ছে! তার চেঁচানোর মাঝেই যুবক বন্দুকের ট্রিগার চাপলো দু’বার। মাহি তক্ষুনি ভয়ে গুটিয়ে গেল যুবকের বুকে। যুবল শ্যুট করেছে বাগানের জমিনে যেথায় পাপড়ির নিচে লুকিয়ে ছিল বিষধর সাপ। একটু হলেই কামড়ে দিতো মাহিকে। ভাগ্যিস যুবক সময়মত এসেছে! এদিকে মাহি থরথরিয়ে কাপছে যুবকের বুকে। তার কানের কাছে আচমকা মুখ নামিয়ে কেউ একজন বলে ওঠে,
“ যার উপস্থিতি তোর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, শেষে কি-না তার বুকেই নিজেকে আড়াল করলি? ছ্যাহ! ছ্যাহ! নির্লজ্জ বান্দীর মেয়ে!”
