ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯৩
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই
”কীহহহ! কী বলছেন স্যার, এটা তো অসম্ভব!”
”আবরার শিকদার প্রণয়ের ডিকশনারিতে ‘অসম্ভব’ বলে কোনো শব্দ নেই। আমার প্রাণ বলেছে—মানে সবকিছুই সম্ভব।”
”কিন্তু স্যার, আপনি তো জানেন এটার ফলাফল কী হবে! এমন সর্বনাশের খেলাতে নামবেন না স্যার।”
চোখ তুলে জাভেদের অস্থির মুখাবয়বে একবার দৃষ্টি বুলালো প্রণয়। অতঃপর দৃঢ় বাক্যে বলল, “আমি যা বলেছি, তাই হবে।”
”কিন্তু…”
”জাভেদ! আজ থেকে সবাই মুক্ত, তুমিও মুক্ত। অবশিষ্ট মেয়েগুলোকে ফিরিয়ে দাও, বাচ্চাগুলোকে ফিরিয়ে দাও। সবকিছু বন্ধ করে দাও আজ থেকে। আবরার শিকদার প্রণয়ের জীবনে কোনো ‘ASR’-এর ছায়া থাকবে না।”
”কিন্তু…”
”জাভেদ!” —ইস্পাত-দৃঢ় কণ্ঠে ধমকে উঠল প্রণয়। চোখ গরম করে তাকাল জাভেদের অসহায় মুখখানার পানে।
চোখ দেখে ভড়কে যায় জাভেদ, মুখটা শুকিয়ে যায়। অনেক কথা বলতে চায়, কিন্তু সাহসে কুলোয় না। কণ্ঠনালী ভেদ করে সম্পূর্ণ কথাটুকু আর উঠে আসে না। অপারগতায় এবার কান্না চলে আসে জাভেদের। কোনোদিন এভাবে বলা হয়নি, কিন্তু এই বড় ভাইয়ের মতো মানুষটিকে সে হারাতে পারবে না। এই মানুষটা খারাপ হয়ে থাকুক, পাপের অতলে তলিয়ে যাক, তবুও তো মাথার ওপর বড় ভাইয়ের আশ্রয় আছে, বিশাল বড় বৃক্ষের ছায়া আছে; সেটুকু কোনো মূল্যেই হারাতে চায় না জাভেদ।
হুট করে এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত ধ্বংস ব্যতীত কিছু আনবে না, নিঃশেষ করে দেবে মানুষটাকে, তছনছ করে দেবে তার শেষ আশ্রয়স্থল—সহ্য করতে পারবে না জাভেদ। সহজেই অপরাধ করা যায়, কিন্তু সেটাকে ছেড়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া সহজ নয় তেমন। অন্ধকার জগতের সূচনা করা যায়, সমাপ্ত করা সহজ নয়।
জাভেদের নিরীহ মুখখানার পানে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রণয় কাঁধে হাত রাখে। জীবনে প্রথমবারের মতো অত্যন্ত কোমল কণ্ঠে বলে, “আমাকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করো না, আমি ভালোই থাকব। আর তুমি তো আছ আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, আমার ভালো-মন্দের সঙ্গী। কথা দিচ্ছি তোমাকে কোনো বিপদে পড়তে দেব না। তুমি পরিবারের সাথে একটা নিশ্চিন্ত জীবন পাবে।”
”
স্যার!” —প্রণয়কে আচমকা জাপটে ধরল জাভেদ। কাঁধ জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। কণ্ঠে কাকুতি মিশিয়ে ভীষণ অনুনয় করে বলল, “আরেকবার ভেবে দেখলে হয় না স্যার? আপনি তো জানেন…”
”জানি, tableware আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড়। সব খারাপের একদিন অন্ত হয় জাভেদ, সব পাপের একদিন শেষ হয়, সব পাপীর উপযুক্ত শাস্তি হয়। আমার ভাগ্যলিপিতে কী আছে জানি না, তবে এই মৃত্যুর খেলার অবসান ঘটানো প্রয়োজন। যদি ও বা তা আসে আমার অন্তের মাধ্যমে, তবে তাই সই। আজ থেকে সবকিছুর ‘দ্য এন্ড’।”
জাভেদের চোখ দুটো অসহায়ভাবে বেরিয়ে গেল। প্রণয়—প্রতিটা কদমে তার পাহাড়ের ন্যায় বিশাল শরীরটা ধসে পড়ছিল।
প্রণয় বেরিয়ে যেতেই দরজার আড়াল থেকে সরে গেল কেউ। প্রণয়ের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণী চোখ দুটোও যেন আজ তা দেখল না।
পিএস কর্পোরেশনের ৪০ তলা ভবন ছাড়িয়ে বাইরের পার্কিং এরিয়াতে পৌঁছে গেল প্রণয়। মাথাভর্তি দুশ্চিন্তা থাকলেও বুকের ভেতরটা আজ ভীষণ হালকা লাগছে প্রণয়ের; যেন এতদিনের চেপে থাকা হিমালয় গলে পড়ছে। বুক চিরে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো প্রণয়ের। গাড়ির দরজা খুলতেই হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে জ্বলতে থাকা নামটা দেখে রক্তিম ওষ্ঠকোণে প্রস্ফুটিত এক চিলতে হাসির দেখা মিলল। ফোন রিসিভ করে গাড়িতে উঠে বসল প্রণয়। সিট বেল্ট বেঁধে এক হাতে স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে ডাকল, “জান।”
অপর প্রান্ত থেকে তৎক্ষণাৎ মধুর এক চটপটে কণ্ঠ ভেসে এলো, “এত সময় লাগে আপনার প্রণয় ভাই? আমি তো কখন থেকে রেডি হয়ে অপেক্ষা করছি!”
”আসছি তো পাখি, এত অধৈর্য হলে হয়?”
”হুম হুম, তাড়াতাড়ি আসুন।”
”পাগলী!”
কালো রঙের অডি গাড়িটা হাওয়ায় ঝড় তুলে দুশো কিলোমিটার পার আওয়ার গতিতে ছুটে চলেছে রায়পুরের সীমান্তবর্তী ঘন জঙ্গল দিয়ে। দুই ধারে বিস্তৃত সবুজে ঢাকা অরণ্যের মধ্যে চওড়া পিচঢালা রাস্তা। প্রণয় দ্রুত ড্রাইভ করে রায়পুরের দিকে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের শেষ সীমান্তে আর রায়পুরের শুরুতে প্রায় ২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ অরণ্য।
হাই স্পিডে থাকা গাড়িটা অরণ্যের মাঝামাঝি পৌঁছাতেই আচমকা বেশামাল হয়ে গেল। উচ্চ গতি থাকায় সাপের মতো এঁকেবেঁকে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারলো বর্ষীয়ান প্রাচীন বটবৃক্ষে। সেকেন্ডের ব্যবধানে এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটল যে, গাড়ি কন্ট্রোল করার শেষ চেষ্টাটুকুও করতে পারল না প্রণয়। প্রচণ্ড এক ধাক্কায় মাথায় সজোরে বাড়ি খেল স্টিয়ারিংয়ের সাথে।
আঘাতের তীব্রতা এতটাই জোরালো ছিল যে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে প্রণয়। চোখের সামনের উজ্জ্বল পৃথিবীটা মুহূর্তেই তলিয়ে যায় ঘন অন্ধকারে। চেয়ে চোখ মেলে রাখতে পারে না প্রণয়। এত বছর ধরে প্রতিটি মিনিট, সেকেন্ডের ওপর খুব সূক্ষ্মভাবে নজরদারি করলেও, আজকের এই শেষ বিকেলের নির্জন সড়কে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা সম্পর্কে প্রণয় শিকদারের পূর্ব থেকে কোনো প্রস্তুতি ছিল না; যেন একেবারেই আচমকা এসে আছড়ে পড়েছে।
গাড়িটা স্থির হয়ে যেতেই ‘শূউউ’ করে একটা মাইক্রো এসে থামল অডি গাড়িটার ঠিক পাশে। দরজা খুলে দ্রুত অস্থির চরণে নেমে এলো প্রহেলিকা; সাথে বেশ কয়েকটা শক্ত-পোক্ত গড়নের ছেলে।
ছুটে এসে উন্মাদের মতো অডি গাড়ির দরজা আনলক করার চেষ্টা করতে লাগল প্রহেলিকা। সে ব্ল্যাক গ্লাস উইন্ডো দিয়ে ভেতরের পরিস্থিতি কিছুই আন্দাজ করতে পারছে না। দরজা খুলতে না পেরে আকস্মিক চেঁচিয়ে উঠল প্রহেলিকা। চিল্লাইয়া ছেলেগুলোর উদ্দেশে বলল, “হাঁ করে দেখছিস কী? তাড়াতাড়ি বের কর আমার প্রণয়কে! কী জানি কতটা আহত হয়েছে!”
ছেলেগুলোর একটা কিছু বলতে নিলেই তাদের ওপর চড়াও হয়ে গেল প্রহেলিকা। অকথ্য গালিগালাজ করতে করতে বলল, “খানকির ছেলেরা, তোদের বলেছিলাম না চারটা টায়ারেই গুলি করতে—যাতে গাড়িটা তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে? কুত্তার বাচ্চারা, তোরা কী করলি? মাত্র একটা টায়ারে গুলি করে গাড়ির ব্রেক ফেইল করিয়ে দিলি!”
”ম্যাডাম…”
”শাট আপ! তাড়াতাড়ি লক খোলার ব্যবস্থা কর। আমার প্রণয়ের যদি কিছু হয়েছে না, তোদের মাংস আমি শিয়াল-কুকুরকে দিয়ে খাওয়াবো!”
ছেলেগুলো কিছু অ্যাডভান্সড টুলসের সাহায্যে দ্রুত গাড়ি আনলক করতে লাগল। দুশ্চিন্তায় দরদর করে ঘামছে প্রহেলিকা। শ্বেত জলবিন্দুগুলো ফর্সা কপাল বেয়ে চিকন ধারায় গড়িয়ে নামছে। প্রহেলিকা তীব্র অস্থিরতায় নিশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।
”হারি আপ!”
”ফিনিশ ম্যাডাম।”
মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই অডি গাড়ির দরজা খুলে ফেলল ছেলেগুলো। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল প্রহেলিকার। ছেলেগুলো ঠেলে সরিয়ে গাড়ির ভেতরে উঁকি দিতেই যা দেখল, তাতে ধমনিতে রক্ত চলাচল থেমে গেল প্রহেলিকার। স্টিয়ারিংয়ের সাথে কপাল ঠেকে আছে প্রণয়ের। মাথা ফেটে দুই ধারে ঝরনার মতো তরতর করে উষ্ণ রক্তের স্রোত নেমে আসছে।
এই দৃশ্য দেখা মাত্রই গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল প্রহেলিকা, “প্রণয়য়য়!”
দ্রুত প্রণয়ের ভারী শরীরটা টেনে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল। প্রহেলিকা অনুভব করল প্রণয়ের নিশ্বাস এখনো পড়ছে, কেবল জ্ঞান নেই। সাথে করে আনা মাইক্রোতে তুলে সাথে সাথেই সেখান থেকে গায়েব হয়ে গেল প্রহেলিকা।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো, সন্ধ্যা পেরিয়ে মধ্যরাত। তখনও প্রণয়ের কোনো হদিস নেই, বাড়ি ফেরার কোনো নাম-নিশানা নেই। অপরপক্ষে এখন ফোনটাও বন্ধ।
প্রিয়তার অপেক্ষার প্রহর গড়াতে গড়াতে মধ্যরাতে এসে ঠেকেছে। প্রতি সেকেন্ডে অস্থিরতায় দিশেহারা হয়ে পড়ছে প্রিয়তা। প্রণয় ভাই বিকেলেই বলেছিল সে ২০ মিনিটের মধ্যে আসছে, অথচ এখন ৯ ঘণ্টা হতে চলল কোনো হদিস নাই।
প্রিয়তা সহস্রাধিক বার ফোন করেছে এবং অনবরত করেই যাচ্ছে। প্রতিবার অপর প্রান্ত থেকে একটি নারী কণ্ঠ যান্ত্রিক কণ্ঠে বলে উঠছে:
“The number you are calling is currently switched off. Please try again later.”
এই অবস্থায় অত্যাধিক মেন্টাল প্রেসার, প্যানিক করা কিংবা দুশ্চিন্তা করা—কোনোটাই প্রিয়তার স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত নয়। অথচ প্রিয়তা কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না। ক্রমাগত দুশ্চিন্তা বেড়েই চলেছে। মনে কেবল একটাই ভয়—তার মানুষটার কোনো বিপদ হলো না তো? প্রিয়তা বাড়ির কাউকে কিংবা পুলিশকেও কিছু বলতে ভয় পায়। যদি কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসে? যদি তার প্রণয় ভাই সম্বন্ধে কেউ জেনে যায়, তখন কী হবে?
”না না না না…” —আর ভাবতে পারে না প্রিয়তা। নিজেকেই নিজের কাছে এত অসহায় লাগে। কাউকে কিছু বলতেও পারে না, সইতেও পারে না।
তীব্র অস্থিরতায় পায়চারি করতে করতে হঠাৎ একটা কথা মাথায় এলো প্রিয়তার। দ্রুত নিজের ফোনটা তুলে ডায়াল করল জাভেদের নাম্বারে।
প্রথমবার রিং হওয়া মাত্রই ধরে ফেলল জাভেদ। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে অত্যন্ত নমনীয় কণ্ঠে সালাম দিল, “আসসালামু আলাইকুম ভাবি।”
প্রিয়তা চঞ্চল কণ্ঠে তৎক্ষণাৎ জবাব দিল, “ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
প্রিয়তার কণ্ঠস্বরে ঝড়ের মতো উৎকণ্ঠা দেখে তৎক্ষণাৎ ভ্রু বেঁকে গেল জাভেদের। প্রিয়তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে নিজেই বলল, “কিছু কি হয়েছে ভাবি? অ্যানি প্রবলেম?”
প্রিয়তা ফের একই ভাবে তীব্র অস্থিরতায় ছটফট করে শুধাল, “আমার প্রণয় ভাই কোথায়?”
প্রিয়তার কণ্ঠের স্পষ্ট কাঁপুনি টের পেল জাভেদ। তবে প্রশ্ন শুনে সে যেন আকাশ থেকে পড়ল। খুব স্বাভাবিক সুরে প্রত্যুত্তর করল, “স্যার তো বিকেলেই চলে গেছেন। আমি যতদূর জানি ওনার তো বাড়ি ফেরার কথা ছিল। উনি ফেরেননি?”
জাভেদের কথায় বুকের ভেতর ছ্যাঁত করে উঠল প্রিয়তার। মাথার ভেতর ঝিমঝিম করে উঠল, প্রেশার বাড়তে শুরু করল চড়চড় করে।
জাভেদ ফোনের অপর প্রান্ত থেকে একনাগাড়ে ক্রমাগত প্রিয়তাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, “ভাবি, ভাবি আপনি প্যানিক করবেন না। শান্ত হোন, আমি আছি। আমি এক্ষুনি স্যারকে খুঁজে বের করছি। ভাবি, শুনতে পাচ্ছেন?”
কিন্তু জাভেদের কথাগুলো যেন প্রিয়তার কানের পর্দা ভেদ করে মস্তিষ্ক অবধি পৌঁছাতেই পারল না।
ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯২
নিশ্বাস ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছে প্রিয়তার। বুকের ভেতরটা এক অজানা ভয় আর আশঙ্কায় শিউরে উঠছে প্রতি মুহূর্তে। মনটা কু গাইছে খুব করে। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না প্রিয়তা। ধপ করে বসে পড়ল ড্রয়িং রুমের টু-সিটের সোফায়।
রমণীর প্রেমাশক্ত অন্তরকোণে একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে উঁকি দিতে লাগল, “আমার প্রণয় ভাই ঠিক আছেন তো?”
দেয়াল ঘড়ির ঘণ্টার কাঁটাটা তখন ধং ধং করে জানান দিচ্ছে—রাত প্রায় ৩টা বাজতে চলল।
