Home মির্জা সায়ান মুগ্ধ মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৭

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৭
jannatul firdaus mithila

“ওহহো! জ্বলে জ্বলে? তোর ভোগ করার আগেই আমি ভোগ করে নিলাম, তাই জ্বলছে তাই-না?”
চলন্ত পাদু’টো থামল মুগ্ধের। তড়াক জ্বলে উঠল তিরিক্ষি মেজাজটা। শরীরের র’ক্ত বুঝি টগবগ করছে এবার। সে আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে কাত করল সামান্য। টেস্টটিউবে বাঁকা হাসছে সিড! তার ওমন বাঁকা হাসিতে সাপের ন্যায় ফণা তুলল মনস্টার। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বেপরোয়া পুরুষ আদেশ ছুড়ঁল এডউইনকে,
“ ওকে বাইরে বের কর!”

হুকুম তামিল করতে অগ্রসর হলেন বাধ্য এডউইন। কিয়তক্ষনের মধ্যেই কিসব সুইচ-ফুইচ চেপে, সিডের অবশ দেহটা শিকল দিয়ে টেনেটুনে বাইরে নিয়ে এলো। সিডের শরীর না চললেও বেয়াদব ছেলের মুখে ঠিকই লেপ্টে আছে তাচ্ছিল্যের হাসি! বারবার শ্লেষাত্মক ইঙ্গিত দিচ্ছে মনস্টারকে। মনস্টার কী আর ওতো ধৈর্য্য-সহ্য বোঝে? সিডের দেহটা বাইরে বেরুতেই সম্মুখ থেকে ছুটে এসে হিংস্র বাঘের ন্যায় শিকারকে ছো মেরে টেনে ন্যায় মনস্টার। এডউইন বোধহয় হকচকালেন খানিকটা। ত্বরিত পা পিছিয়ে সরে গেলেন কয়েক-কদম। এদিকে মনস্টারের শরীরে যেমন এক অদৃশ্য তেজী আগুন জ্বলছে, তারচেয়ে বেশি আগুন জ্বলছে মাথায়! হি*ংস্র যুবক সিডকে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে, তার বুকের ওপর গিয়ে বসেছে। তার ডানহাতের পাঁচ আঙুলের শোভা পাচ্ছে উঁচু উঁচু ধারালো দাঁতওয়ালা আংটিগুলো! মুগ্ধ হাত মুষ্টিবদ্ধ করতেই আংটিগুলোর আগা কেমন তীক্ষ্ণ হয়ে গেল। সে আর কোনরূপ কালবিলম্ব না করেই ডানহাত দিয়ে একের পর এক রেপিড পাঞ্চ বসাতে লাগল সিডের নাকমুখ বরাবর। একেকটা পাঞ্চের সে-কি ক্ষিপ্র গতি! নাকমুখ থেঁতলে গিয়ে যাচ্ছে তা-ই অবস্থা সিডের। বেচারার হুঁশ আছে কি-না কে জানে! অথচ সেদিকে থোড়াই পাত্তা দিয়েছে মনস্টার? সে-তো জ্বলছে রাগে। গজগজ করছে হিংস্র কন্ঠে! হাতের গতি বিরতিহীন রেখে বারবার আওড়াচ্ছে,

“ জেলাস? হু জেলাস? জেলাস হবে তোর বাপ, ইউ সন অফ আ বিচ! তুই ওকে ছুঁয়েছিস তাতে আমার কী? তাতে আমার কোন বা*ল ছেঁড়া গেল? কোন দুঃখে আমার বা*ল ছেঁড়া যাবে জা*নো*য়ারের বাচ্চা? এক চুটকী বাজালে ওর চেয়ে কয়েকগুণ সুন্দরী এসে বে’ড কাঁপাবে আমার। সেক্ষেত্রে ওর জন্য আমি জেলাস হবো কেন? আমি! দা রুশদী কিং — শ্যাডো মনস্টার, কেনো জেলাস ফিল হবো? তোকে কে বলছে আমি জেলাস বাস্টার্ড!”
থামল মুগ্ধের হাত! সিড আর নড়চড় করছেনা। নিথর ছেলেটার ঠোঁট দুটো একদম ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে! সম্মুখের কয়েকটা দাঁত ভেঙে গিয়ে গুড়গুড় অবস্থা। ওদিকে মনস্টার এখনো শান্ত হয়নি। দাতঁ চিবোতে চিবোতে ঘাড় বাকিয়ে আগুন চোখে তাকালো এডউইনের পানে। বেচারা এডউইন ভড়কাল কেমন! তক্ষুনি শুকনো ফাঁকা ঢোক গিলে মাথা নোয়াতেই, মুগ্ধ নামক মনস্টার চোখের পলকে উঠে এসে ফের থাবা বসালো এডউইনের কন্ঠায়। এডউইন শক্ত হয়ে গেল ভয়ে, চোখ নামিয়ে রাখল ঠায়। কর্ণকুন্তীতে কেবল পৌঁছাল মনস্টারের হুংকার!

“ এই তুই বল! এম আই জেলাস? ও-ই বাস্টার্ড বলল আমি না-কি জেলাস! আমাকে কোন দিক থেকে দেখে মনে হচ্ছে আমি জেলাস? কথা বল এডউইন!আদারওয়াইজ তোকেও মে’রে ফেলব আমি।”
এহেন হিংস্র হুংকারে তটস্থ এডউইন। যেখানে শরীর কাঁপছে ভয়ে, সেখানে কন্ঠ ফুঁড়ে থোড়াই আওয়াজ বেরুবে? বেচারার অবোধ মন ভেতরে ভেতরে বারংবার চেঁচিয়ে যাচ্ছে —
❝ হ্যাঁ মনস্তার! আপনি জেলাস। তাও আবার কোনো সাধারণ নিয়মে নয়, বরং এক্সেসিভ মাত্রায় জেলাস।❞
মনের মধ্যে চেঁচাতে থাকা এহেন ভয়ংকর বাক্যগুলো মুখে এনে থোড়াই গর্দান হারাবে এডউইন? বেচারা বুদ্ধিমান মানুষ। তৎক্ষনাৎ মুখে কপট ভাবভঙ্গি ফুটিয়ে তোতলাতে তোলতালে বলল,

“ একদম না মনস্তার! আপনি আবার জেলাস? ইম্পসিবল!”
নিজের পাল্লায় উত্তর পড়ায় রাগটা বোধহয় খানিকটা প্রশমিত হয়েছে মনস্টারের। সে আলগোছে ছেড়েঁ দিল এডউইনের কন্ঠা! রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে কদম বাড়াল সম্মুখে। দাতঁ খিচেঁ বলল,
“ ব্লাডি বা*স্টার্ড! আমায় বলে আমি নাকি জেলাস!”
গজগজ করতে করতে এগুচ্ছে মুগ্ধ। দরজার একদম সন্নিকটে এসে দাঁড়াতেই আচমকা পদযুগল ফের থমকাল তার। মস্তিষ্কে তড়াক বেজে উঠল আরেক কথা! সিড তখন কী বলল? সে মনস্টারের ভোগে হাত দিয়েছে বলল? সত্যি তার শিকারে সিড হাত দিয়েছে? কথাখানা মনে পরতেই ফের জ্বলে উঠল মনস্টারের মাথার তালু। দৃঢ় চোয়ালটা থরথর করছে এখন। শক্ত হাতে নিজের ঘাড়ে হাত বুলিয়ে কটমটিয়ে বিড়বিড়ালো,

“ কতবড় সাহস জানোয়ারের বাচ্চার! আবার মুখ নাড়িয়ে বলে গেল।”
একমুহূর্ত থেমে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক নাড়ায় মুগ্ধ। কটমট করছে ঘাড়ের রগ! শব্দ যাচ্ছে কানে। বেপরোয়া পুরুষ ফের উম্মাদ হলো। এবার মন-মস্তিষ্কে বাজছে কেবল একটাই কথা — তার শিকারকে অন্য কেউ কেন ছোঁবে? কেনো? কেনো? কেনো? বেপরোয়া পুরুষ দাঁতে দাঁত চেপে ছুট লাগালো কক্ষের বা-দিকের কাউন্টারের পানে। কক্ষটা মূলত টর্চার সেল নামে পরিচিত! একটা মানুষকে ঠিক যত রকমের কষ্ট দিয়ে মা*রা যায় তার সকল আইটেম বুঝি এখানে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সাজানো রয়েছে। যুবক ছুটে এসে তৎক্ষনাৎ হাতে তুলল ঝা তকতকে ধারালো কুড়ালটা। অতঃপর তা নিয়েই এগুলো সিডের পানে। এডউইন কিংকর্তব্যবিৃূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। মনস্টার চলে গিয়েও ফের ফিরে এলো কেনো? আবার কি করবে কে জানে! এডউইনের ভাবনার মাঝেই মুগ্ধ গিয়ে বসল সিডের পেটের ওপর। তারপর আর কোনদিক না তাকিয়েই বেপরোয়া উম্মাদ ছেলে একের পর এক আঘাত বসালো সিডের বুকে। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হচ্ছে সিডের র*ক্তা*ক্ত দেহ! সে-ই লহুর ছিটেফোঁটায় ভরে যাচ্ছে মুগ্ধের মুখমন্ডল। মনস্টারের সুদর্শন মুখখানার সে-কি ভয়ংকর রূপ বেরিয়েছে! সে বোধহয় নিজের মধ্যে নেই। সিডের বুকে একের পর এক আঘাত করতে করতে সে কেমন অদ্ভুত কঠিন গলায় হুংকার ছুঁড়ে আওড়াল,

“ শি ইজ মাইন! অনলি মাইন। দ্যা অনলি কনসিকোয়েন্স অফ টাচিং হার ইজ ডেথ।”
হতবাক এডউইন! ছেলেটার চোখেমুখে একরাশ অবাকের ছাপ। বিচক্ষণ মস্তিষ্ক তার জানান দিচ্ছে আগত কোনকিছুর পূর্বাভাস। নির্দয় রুশদী কিং ধীরে ধীরে এডিক্ট হচ্ছে একটা সাধারণ মেয়ের প্রতি! অথচ তার মন তা মানতেই চাইছে না। এডউইন চিন্তিত হলো এসব ভাবতে ভাবতেই। দি শ্যাডো মনস্টারের মতো একজন নির্দয় মাফিয়াও কি-না শেষমেশ প্রেমে পড়তে যাচ্ছে? কিন্তু এর পরিণাম?

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমশীতল কক্ষ! গোলাকার মখমলের বিছানায় অচেতন হয়ে পড়ে আছে মাহি। মাথায় বাঁধা মোটা ব্যান্ডেজ, নাকের ওপর ওয়ান স্ট্রিপ ব্যান্ড। মেয়েটার নিশ্বাসের গতি বড্ড ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে কেন যেন। বিছানার চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্যালেসের কয়েকজন মহিলা ডাক্তার এবং মেইডস। তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ! মেয়েটার জ্ঞান নেই গত ৭ঘন্টা যাবত। নিঃশ্বাসের গতিও কেমন কমে কমে যাচ্ছে। কোনরূপ ইন্টার্নাল ইনজুরি হলো কি-না তাও তো বুঝবার জো নেই! সে-তো ভাগ্য ভালো সময়মত মিলা গিয়ে খুঁজে পেয়েছে মেয়েটাকে। তাও যাচ্ছে তা-ই অবস্থায়! সারা শরীর তার ডুবে ছিল ময়লায়। মাথাটা পড়েছিল বাথটবের ওপর। মিলা ওতো আহত থাকা স্বত্বেও সবাইকে ডেকে এনে মেয়েটাকে উদ্ধার করেছে। তবে মেয়েটার কেন যে জ্ঞান ফিরছেনা!
মিলা বসে আছে মাহির একদম গা ঘেঁষে। মেয়েটা কাঁদছে ফুপিয়ে ফুপিয়ে। মনে মনে নিজেকে কতো যে দোষারোপ করে যাচ্ছে… বারবার আনমনে আওড়াচ্ছে,

“ সব আমার দোষ! সেদিন আমি কেনো তোমায় একা ছেড়ে গেলাম। কেনো থাকলাম না তোমার সাথে!”
মিলার বুক ভার হয়ে গেছে মাহির কষ্টে। নাক টানতে টানতে আলগোছে নিজের দু’হাতের মুঠোয় চেপে ধরে মাহির ডানহাত। একদৃষ্টিতে মাহির মলিন মুখপানে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ টের পেল কক্ষে আগমন ঘটেছে একজোড়া দাম্ভিক কদমের। তৎক্ষনাৎ জড়সড় হয়ে গেল সবাই। মাথাটা নুইয়ে দৃষ্টি ফেলল মেঝেতে। মিলাও উঠে দাঁড়ায় কালবিলম্ব ছাড়া। শরীর ঘুরিয়ে মাথা নুইয়ে সরে যায় দু-কদম। ওদিকে কক্ষের একদম মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে মনস্টার। এখনো ফুঁকছে সিগার! এ লোক যে দিনে কতো সিগার টানে কে জানে। মনস্টারের চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। সে ফের সিগারের শেষভাগে লম্বা এক টান বসিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে শুধালো,
“ এ-ই বান্দীর মেয়ে এখনো শুয়ে আছে কেনো?”
মিলা তটস্থ ভয়ে! মুখ দিয়ে কথা বেরুনোর যোগাড় নেই তার। ডাক্তারদের মধ্য থেকে এক মধ্যবয়সী পারস্যের সুন্দরী খানিকক্ষণ দোনোমোনো করে হঠাৎ জানালো,
“ বিগত ৭ঘন্টা ধরে ওর জ্ঞান নেই মনস্তার! নিশ্বাস নেওয়ার গতিটাও কেমন কমে যাচ্ছে। আই থিংক, ওর ভালো ট্রিটমেন্ট প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ওকে হসপিটালাইজড করলে বোধহয় ভালো হয়।”
কথাটা বলতে না বলতেই পাশ থেকে একজন ফট করে চিমটি কেটে বসল মধ্যবয়সীর পেটের ধারে। মধ্যবয়সী বিচক্ষণা হয়তো আচঁ করল নিজের বোকামি! নিজের বলা কথাগুলো মস্তিষ্কে ফের আওড়াতেই জিভে দাঁত চলে গেল আপনাআপনি। এমা! রোগীর কথা চিন্তা করে সে কি কথাটাই না বলে বসল! সে কিভাবে ভুলে গেল? এই মনস্টার প্যারাডাইস নামক জেলখানায় একবার ঢোকা মানে দ্বিতীয়বার বের হওয়া অসম্ভব! ইশশ্! নিজের বলা বোকা কথাগুলোতে বড্ড আফসোস হচ্ছে পারস্য সুন্দরীর। তিনি কন্ঠে খানিক কোমলতা ঢেলে যেইনা কিছু বলবেন ওমনি শুনতে পেলেন মনস্টারের কঠিন হুংকার!

“ এডউইন!”
কয়েক কদম দুরত্বেই দাঁড়িয়ে আছেন এডউইন। ডাক পাওয়া মাত্রই এগিয়ে এসে বাধ্য কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ জ্বি মনস্টার?”
মুখাবয়ব শক্ত মুগ্ধের। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহির মুখপানে। আশ্চর্য হলেও সত্যি! মনস্টারের চোখেমুখে আজ অবাধ ঘৃণা। কপালে পড়েছে গোটাকতক বিরক্তির ভাঁজ। মিনিট খানেক যেতে না যেতেই সে কেমন কঠিন গলায় আদেশ ছুড়ঁল,
“ রাশিয়ার যত বড় বড় ডাক্তার আছে সবাইকে তুলে আন! ট্রিটমেন্টের জন্য যা যা যন্ত্র লাগবে সব নিয়ে আয়। আগামী দু’ঘন্টার মধ্যে এই বান্দীর মেয়ের চিকিৎসা শুরু হওয়া চাই। ডু ইউ গেট দ্যাট?”
“ ইয়ে-ইয়েস মনস্তার!”
ভড়কানো কন্ঠে ক্ষুদ্র উত্তরে সীমাবদ্ধ এডউইন। এটুকু জীবনে আর কত ঝটকা খাবে বেচারা কে জানে? সে তৎক্ষনাৎ তৎপর হলো মনস্টারের হুকুম তামিল করতে। এদিকে ঘরভর্তি ডাক্তার, মেইডরা কেমন হা হয়ে গিয়েছে মনস্টারের ওমন কথায়। প্রত্যেকের মনের মাঝে লুকায়িত সন্দেহের দানাগুলো যেন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। তাহলে তারা যা শুনেছে তাই কী সত্যি? মেয়েটা কী তবে মনস্টারের স্পেশাল কেউ?
এদিকে মুগ্ধ এবার কন্ঠ উঁচিয়ে বলে ওঠে,

“ লিভ!”
ব্যস! একটা শব্দ। আর তাতেই সবাই কেমন সুড়সুড় করে বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে। মুগ্ধ তখন ধীরে ধীরে পায়ের গতি এগিয়ে আনে মাহির দিকে। ঠোঁটের সিগারে দিচ্ছে লম্বা লম্বা টান। ধীরেসুস্থে মাহির পাশে বসে মুখভর্তি ধোঁয়া গুলো এক ঝটকায় ফুঁ দিয়ে বসে অচেতন মেয়েটার মুখপানে। এতে মুগ্ধের পৈশাচিক আনন্দ মিললো কি-না কে জানে! তবে মাহির পানে কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেই তার ঘৃণাগুলো বাড়তে লাগল কয়েকগুণ। ছেলেটা কেমন চোয়াল নাড়াচ্ছে এদিকওদিক। দাঁত দাঁতে চাপায় কটমট শব্দ বেরুচ্ছে বাইরে। সে এবার কোনরূপ ভনিতা ছাড়াই বলে উঠল,
“ এতো সহজে তোকে ম’রতে দিচ্ছিনা বান্দীর মেয়ে। এখনো তো অনেক বাকি! সবটা সহ্য করার জন্য হলেও তোর উঠতে হবে! এন্ড আ’ল মেক শওর অফ ইট।”

ট্রিং ট্রিং ট্রিং…..
মাঝরাতে কলিং বেলের কর্কশ শব্দে ঘুম ছুটে গেল দামিয়ান দোব্রাস্কা’র। রাশিয়ার অন্যতম বিখ্যাত ফিজিওলজিস্ট হিসেবে পরিচিত এ ব্যক্তি বেশিরভাগ সময় হোটেলেই রাত কাটান। তার ভাষ্যমতে — ইনজেকশনের সিরিঞ্জ এবং নারী, দু’টোকেই একবারের অধিক ব্যাবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য অনুপযোগী। তাইতো রাত কাটান হোটেলে! নিত্যনতুন পার্টনার নিয়ে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়।
ঘুমঘুম চোখে দরজার কাছে এগিয়ে এসেছেন দামিয়ান। ওতো সাধের ঘুমটা তার! মাত্রই ধরা দিয়েছিল চোখের পাতায়, আর ওমনি সুখের পোকা হিসেবে ওতো রাতে তার ঘরের দরজায় আগমন ঘটল কার কে জানে! দামিয়ান বিরক্ত মুখে দরজার কাছে এসে দাঁড়াতেই কলিং বেলে ফের চাপ পড়ল। এপর্যায়ে বিরক্তিটা বোধহয় মাত্রা ছাড়িয়ে গেল তার। তিনি কেমন বিরক্তিতে মুখে চ-কারান্ত শব্দ তুলে তৎক্ষনাৎ দরজার নব ঘোরালো। দরজাটা হা করে খুলতেই চোখে পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখোশধারী একলোককে! দামিয়ান ভ্রু গোটায়। তিরিক্ষি মেজাজে আওড়ায়,

“ হু দা হেল ইউ আর ব্লা*ডি এসহোল?”
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। ফলে স্পষ্ট নয় তার মুখো অভিব্যাক্তি। দামিয়ানের এহেন অপমানিত কথায় রাগ করলেন কি-না কে জানে! মুখোশধারী তৎক্ষনাৎ কোমরের পিঠে লুকিয়ে রাখা নিজের হাতদুটো সামনে এনে, কি যেন একটা স্প্রে করলেন দামিয়ানের মুখ বরাবর। দামিয়ান হকচকায়! তিক্ততায় বুলি আওড়াতে গেলেই টের পেলেন তার মাথা ঘোরাচ্ছে। চোখদুটোর সামনে সবটা কেমন ঝাপ্সা হচ্ছে ক্রমশঃ! শরীরের বল বুঝি হারিয়ে যাচ্ছে কোথাও। তিনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না নিজের পাদু’টোয়। টলমল শরীরে ঘুরে পড়তে গেলেই সম্মুখের মুখোশধারী দু’হাতে আগলে ধরল তাকে। ঘাড়টা সামান্য নুইয়ে এনে দামিয়ানের কান বরাবর মুখ রেখে চিড়বিড়িয়ে বলল,
“ তোর বাপের ডানহাত আমি এসহোলের বড় ছিদ্র! লুইচ্চা শালা!”
কন্ঠতে বোঝা গেল এ আর কেউ নয় বরং এডউইন। চিড়বিড়িয়ে দামিয়ানের মতো ওমন মোটাসোটা লোকটাকেও কি সুন্দর ঘাড়ের ওপর তুলে নিলো ছেলেটা! সম্মুখে পা বাড়াতে বাড়াতে দাঁত খিঁচে আওড়াল,
“ নেহাৎ মনস্টারের আদেশ বলে তোর মতো আলুর বস্তাকে ঘাড়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছি, নাহলে এতক্ষণে আমায় গালি দেবার কারণে তোকে ঠিক গোরস্থানে ফেলে আসতাম! ব্লা*ডি এসহোল!”

নামী-দামী মানুষজনদের প্রাইভেট জেট এবং বিমানের জন্য নির্মিত রানওয়ের একপাশে দাঁড় করিয়ে রাখা “মনস্টার — এম ” নামক প্রাইভেট বিমানটি। আলিশান বিমানের প্রশস্ত সিটে বসে আছে দামিয়ান। ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে তার। চোখদুটো পিটপিট করে খুলে নিয়ে সামনে তাকাতেই বড়সড় একখানা ঝটকা খেল গায়ে! একি! সে কোথায়? এটা কার বিমান? দামিয়ান তৎক্ষনাৎ শুকনো ঢোক গিলল। ভীষণ শক্তি অপচয় করে নড়তে গিয়েই দেখল — আটকা পড়েছে কোথায় যেন। সে কেমন বিরক্তি নিয়ে নিজের দিকে তাকাতেই আরেকবার হোঁচট খেলো মনে হচ্ছে! তার গা বাঁধা রশি দিয়ে। হাতদুটো সিটের হাতলের সঙ্গে হ্যান্ডকাফস দিয়ে বাঁধা। পাদু’টোরও তাই অবস্থা! দামিয়ান আশ্চর্য বনে গেল নিজের এহেন পরিস্থিতিতে। হতবুদ্ধির ন্যায় ঘাড় বাকিয়ে পাশে তাকাতেই দেখে — পাশের সিটে তারই মতো বাঁধা অবস্থায় বসে আছে অতি পরিচিত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ — মিয়ান। দামিয়ানের চোখ উঠল কপালে। সে কেমন সন্দিহান গলায় ফিসফিসিয়ে ডাকল পাশের জনকে,

“ মিয়ান! হেই? আর ইউ লিসেনিং মি?”
মিয়ান চোখবুঁজে রেখেছিল। এরইমধ্যে পাশ থেকে ভেসে আসা ফিসফিসানো কন্ঠে আলগোছে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় সে। লোকটার নিষ্প্রাণ চাহনি!মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে দেখো! দামিয়ান সন্দিগ্ধ ভাঁজ ফেলল কপালে। আগের ন্যায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ এখানে কী করছো?”
মিয়ান বোধহয় বিরক্ত হলো এহেন প্রশ্নে। তার ললাটের হুটহাট ভাঁজ তো তাই বলছে। ওদিকে দামিয়ান এখনো উত্তরের অপেক্ষায়। মিয়ান খানিক সময় নিয়ে দাঁত খিঁচে বলল,

“ তুমি যা করছ, তাই করছি!”
দামিয়ান থতমত খেল এহেন উত্তরে। জবাবে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য না করে ভ্রু গুটিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ আমাকে তো জোর করে তুলে এনেছে। আমি থোড়াই নিজে থেকে এসেছি!”
মিয়ান দাঁত খিঁচল ফের। কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ঝাঁঝাল কন্ঠে শুধালো,
“ ওহ আচ্ছা! আমি তো তাহলে নাচতে নাচতে এসেছি তাই-না?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৬

দামিয়ান ফের অসন্তুষ্ট এহেন উত্তরে। কপালের ভাঁজগুলো আরও খানিকটা গভীর করে বলে ওঠে,
“ এতো চটে যাচ্ছো কেনো? আচ্ছা এসব বাদ দাও। আগে বলো তো, এখানে আমাদের কেনো আনলো?”
“ বিয়ে খেতে এনেছে। খাবে, দাবে তারপর জম্পেশ একটা ঘুম দেবে তাই এনেছে! আরকিছু?”

মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ১৮

2 COMMENTS

Comments are closed.