Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৩৫

মহামায়া পর্ব ৩৫

মহামায়া পর্ব ৩৫
তুশকন্যা

​রাত দুটোর কাঁটা ছুঁইছুঁই; শহরটা তখনো ব্লাডেনের জাদুতে আচ্ছন্ন। তবে আনায়ার পক্ষে সেই হাড়কাঁপানো শব্দ আর মানসিক দহন বেশিক্ষণ সহ্য করা সম্ভব হয়নি। ভিকে স্টেজ থেকে বিদায় নেওয়ার পরপরই আনায়ার ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেল। এক অজানা অস্বস্তি আর হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক গতি তাকে এতটাই কাবু করে ফেলেছিল যে, সে একাই বাড়ি ফেরার প্রবল তাড়া দিল।
​আইজেলও তাকে এই অবস্থায় একা ছাড়তে চায়নি। সেও বারবার খেয়াল করেছে, আনায়ার হয়তো কোনো সমস্যা হচ্ছে। হয়তো বা কনসার্টের উগ্র পরিবেশ আর অতিরিক্ত মানুষের ভিড়েই তার এই অবস্থা। স্বাভাবিকভাবে আনায়া এসকল পরিবেশে একদম নতুন।
ভিড়ের চাপে আনায়াকে একপ্রকার আগলে রেখে আইজেল সাবার দিকে তাকিয়ে বলল,

“সাবা, চলো এবার ফিরি। আনায়ার শরীরটা বোধহয় খুব খারাপ করছে।”
​সাবা তখনো ভিকের রেশ কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে কিছুটা বিরক্ত হয়ে জবাব দিল,
“আরে দূর! এমন কনসার্ট কি প্রতিদিন হয়? তোমরা যাও, আমি একদম শেষ না করে এক পা-ও নড়ছি না। তোমরা চলে যাও। আর আমাকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, আমি ঠিকঠাক ফিরতে পারব।”
​অগত্যা সাবাকে সেই জনসমুদ্রে রেখেই আইজেল আর আনায়া রাত একটার দিকে বাসায় ফিরে আসে। বাইরে তখন হাড়কাঁপানো শীত। ড্রইংরুমে ঢুকে আইজেল জ্যাকেটটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে আনায়ার দিকে তাকাল। আনায়া তখনো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। আইজেল আলতো করে ওর কাঁধ ছুঁয়ে বলল,
“আনায়া ফ্রেশ হয়ে নাও। একটু গরম পানি দিয়ে মুখ ধোও, দেখবে ভালো লাগবে।”
​আনায়া যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়ল। ফ্রেশ হয়ে আসার পর, আইজেল ড্রয়িং রুম থেকে আবারও তার ঘরে এসে, উঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“রাতের খাবার তো আগে থেকেই করা আছে। একটু গরম করে দেব? কিছু খেয়ে নিলে শরীরটা হয়তো একটু ভালো লাগতো।”
​আনায়ার শরীর তখন নিস্তেজ, মনে হচ্ছে কেউ যেন তার সবটুকু প্রাণশক্তি শুষে নিয়েছে। সে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“না আইজেল,আমি এখন কিছু খাবো না।”
​আইজেল তার কথায় সম্মতি জানাল। ওর শিয়রের কাছে এসে দাঁড়াল। ঘরের মূল আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে বলল,
“তোমার কি খুব বেশি খারাপ লাগছে? ডাক্তার ডাকব? নতুন জায়গা,নতুন পরিবেশ তো, মানিয়ে নিতে সময় লাগবে।”
​আনায়া ক্লান্তিতে চোখ বুঁজে উত্তর দিল,
“আলোটা নিভিয়ে দাও আইজেল। বড্ড চোখে লাগছে।”
​আইজেল অবাক হয়ে ফিরে তাকাল,
“তুমি না সেদিন বললে, আলো ছাড়া তুমি এক মুহূর্তও ঘুমাতে পারো না? অন্ধকারে নাকি তোমার ভয় লাগে? আজ হঠাৎ… ”
​আনায়া চাদরটা গায়ে টেনে নিয়ে কাঁপা গলায় বলল,

“আজ ঠিক লাগছে না। মাথাটা কেমন ছিঁড়ে যাচ্ছে। প্লিজ, সুইচটা অফ করে দাও।”
​আইজেল আর কথা বাড়িয়ে ওকে বিরক্ত করতে চাইল না। সে ভাবল, হয়তো কনসার্টের তীব্র আলো আর শব্দের কারণেই আনায়ার এমন মেজাজ। সে নিঃশব্দে সুইচটা অফ করে দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়ার আগে বলে গেল,
“ঠিক আছে, ডোর ন্যাপ করে রাখলাম। কোনো দরকার হলে জাস্ট একটা ডাক দিও, কেমন?”
​আইজেল চলে যাওয়ার পর নিস্তব্ধ অন্ধকার ঘরটাতে আনায়া একা হয়ে গেল। কিন্তু বিছানায় বারবার পাশ ফিরলেও তার চোখে এক বিন্দু ঘুম নেই। এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে। তার মনে শুধু এটাই ঘুরপাক খাচ্ছিল, আইজেলকে ডেকে ভিকের ব্যাপারে আরও বিস্তারিত কিছু জেনে নিতে।
পরক্ষণেই সে নিজেকে সংযত করল। আইজেল যদি তার এই মাত্রাতিরিক্ত বিচলিত হওয়া দেখে কোনো কিছু সন্দেহ করে বসে? এমনিতেও আইজেলরও এখন বিশ্রামের প্রয়োজন।
​সময়ের সাথে সাথে আনায়ার অস্বস্তি কমলো না, বরং বাড়তে থাকল। হঠাৎ তার মনে হলো ঘরের দেয়ালগুলো যেন সংকুচিত হয়ে আসছে, বাতাস কমে আসছে ঘর থেকে। বিছানা ছেড়ে উঠে বসতেই শুরু হলো সেই পরিচিত শত্রু—তীব্র শ্বাসকষ্ট। ফুসফুস যেন পর্যাপ্ত অক্সিজেন টানতে পারছে না। সে কাঁপা হাতে সাইড টেবিল থেকে নিজের ইনহেলারটা বের করে কয়েকটা গভীর টান দিয়ে নিজেকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করল।
​দমবন্ধ করা এই গুমোট পরিবেশ থেকে বাঁচতে সে ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দার ভারী কাঁচের দরজাটা খুলতেই মিউনিখের শীতের এক দমকা হাওয়া তীরের মতো এসে তার শরীরে বিঁধল। পরনে কেবল একটা বেবি-পিঙ্ক কালারের লং টিশার্ট আর ঢিলেঢালা সাদা প্লাজো। কোনো সোয়েটার বা চাদর নেওয়ার কথা তার মাথাতেও নেই।

আনায়া বাইরে তাকিয়ে দেখল, এতক্ষণ কেবল হাড়কাঁপানো শীত থাকলেও এবার মিহি তুষারপাত শুরু হয়েছে। ধবধবে সাদা তুষার কণাগুলো স্ট্রিট ল্যাম্পের নিচে এক মায়াবী রূপ ধারণ করেছে।
​ঠান্ডা বাতাস সরাসরি নাকে-মুখে লাগায় তার শ্বাসকষ্ট আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। ইনহেলার টেনে নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে সে বারান্দার রেলিংটা দুহাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল;মাথা কিছুই নুইয়ে গেল। তার ঘরটা দোতলায়; নিচের জনশূন্য ল্যাম্পপোস্ট জ্বালানো রাস্তাটা বড্ড নির্জন আর রহস্যময় দেখাচ্ছে।
​আনায়া একমনে সেই তুষারপাত দেখতে দেখতে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল,
“এ কোন গোলকধাঁধায় ফেলে দিলেন আমায়? আপনি এখানে… কীভাবে সম্ভব? আমি কেন শান্ত হতে পারছি না? ওটা কি সত্যিই আপনি ছিলেন?”
​নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজতে গিয়ে সে চোখ জোড়া বুঁজে ফেলল। বুকের ভেতরটা তখনো অস্বাভাবিক ওঠানামা করছে। ঠিক তখনই, সেই অতি পরিচিত গম্ভীর-শান্ত ভগ্নকণ্ঠস্বরটি তার কানের কাছে ঝংকার দিয়ে উঠল,

​”এত রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে না থেকে, চুপচাপ রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। নতুন জায়গা, ঠান্ডা লেগে গেলে কঠিন মুসিবতে ফেঁসে যাবি।”
​আনায়া তৎক্ষণাৎ চমকে উঠে মুখ উঁচিয়ে পাশে তাকাল। ঠিক তার পাশেই, রেলিংয়ে অত্যন্ত নির্বিকারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভিভিয়ান। তার সেই চিরচেনা রূপ—পরনে কালো টিশার্ট আর প্যান্ট, চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে কপালে এসে পড়েছে।
আনায়া এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে আপাদমস্তক তাকে একবার পরখ করে নিল; তীব্র অভিমানেও রুদ্ধ গলায় বলল,
“আমার সবচেয়ে বড় মুসিবত তো আপনি নিজে, অসভ্য একটা!”
​ভিভিয়ান একটুও বিচলিত হলো না। সে আগের মতোই শান্ত কণ্ঠে বলল,

“সাহস একটু বেশিই বেড়ে গিয়েছে না? আমাকে হুটহাট বকছিস কেন?”
​আনায়া নির্ভীক চোখে সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে জবাব দিল,
“বকবো না তো কী করবো? আমার যে কষ্ট হচ্ছে ওটা কি আপনার চোখে পড়ে না? প্রতিবার কি তামাশা দেখতেই উদয় হন আপনি?”
​আনায়া মুখ ফিরিয়ে নিল। রাগ না অভিমানে, তা বোঝা মুশকিল। সে তুষারপাতের দিকে একমনে চেয়ে রইল। ঠিক তখনই ভিভিয়ানের শান্ত-ভগ্ন কন্ঠস্বর শোনা গেল,
​”কী হয়েছে তোর?”
​আনায়া পুনরায় মুখ ফিরিয়ে ভিভিয়ানের সেই শান্ত মুখপানে চাইল। কিছুক্ষণ অপলক চেয়ে থাকতে থাকতেই তার চোখ দুটো অশ্রুসজল হয়ে উঠল। ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইল,
“এখন আবার কাঁদছিস কেন?”
​আনায়া ঠোঁট উল্টে কান্না চেপে ধরা গলায় বলল,
“দূরেই থাকুন; দূর থেকেই জিজ্ঞেস করুন কাঁদছি কেন। কাছে আসার তো কোনো দরকারই নেই।”
​অস্থির আনায়া নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। তার মাথাটা চরকির মতো ঘুরপাক খাচ্ছে; কি থেকে কি হয়ে যাচ্ছে কে জানে। সে খানিকটা স্থির হয়ে নিজেকে শক্ত করল। পরক্ষণেই পুরোপুরি তটস্থ হয়ে ভিভিয়ানের চোখের দিকে চেয়ে সরাসরি প্রশ্ন করল,

​”কনসার্টে… স্টেজের ওপর ওটা আপনি ছিলেন, তাই না? সত্যি করে বলুন, ওটা আপনিই তো ছিলেন? আমি ভুল শুনিনি, ওটা আপনারই কণ্ঠ ছিল। তাই তো?”
​ভিভিয়ান কোনো উত্তর দিল না। তার সেই রহস্যময় শীতল চাহনি দিয়ে সে কেবল চেয়ে রইল আনায়ার দিকে। তার মৌনতা যেন মিউনিখের এই তুষারপাতের চেয়েও গভীর। আনায়া যখন উত্তরের অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে, ঠিক তখনই পেছন থেকে আইজেলের সজাগ কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
​”আনায়া! তুমি এত রাতে কার সাথে কথা বলছো?”
​আনায়া প্রচণ্ড চমকে উঠে পেছনে ফিরে তাকাল। আইজেল ততক্ষণে অবাক চোখে ঘরের ভেতর থেকে বারান্দার দিকে এগিয়ে আসছে। আনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে দ্রুত ডানে-বামে এবং রেলিংয়ের ওপাশে তাকিয়ে দেখল—কোথাও কেউ নেই!
ভিভিয়ানের সেই অবিন্যস্ত চুল আর কালো টিশার্টের অবয়ব যেন এক লহমায় কুয়াশায় মিশে গেছে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে একটা জলজ্যান্ত মানুষ এভাবে উধাও হয়ে যেতে পারে—এটা কেবল তার উদ্ভট কল্পনাতেই সম্ভব।
​আইজেল বারান্দায় এসে আনায়ার মুখোমুখি দাঁড়াল। আনায়া তখনো ঘোরের মধ্যে, সে আমতা-আমতা করে পাল্টা প্রশ্ন করল,

“তুমি… তুমি ঘুমাওনি এখনো?”
​আইজেল হালকা মাথা নেড়ে বলল,
“এই প্রশ্ন তো আমার করার কথা।…সাবা তো এখনো ফেরেনি, তাই জেগে আছি। কিন্তু তুমি একা একা কার সাথে কথা বলছিলে? এখানে তো কেউ নেই।”
​আইজেল আনায়ার হাতের দিকে তাকাল। দেখল আনায়ার হাতে কোনো ফোনও নেই। আইজেলের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হলো। সে বারান্দার কোণাগুলো একবার দেখে নিয়ে আনায়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল।
​আনায়া ততক্ষণে থতমত খেয়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে একটা কৃত্রিম হাসি মুখে ফুটিয়ে তুলে আওড়াল,
“আ… আসলে হয়েছে কী, আমার মাঝেমাঝে একা একা নিজের সাথে কথা বলার একটা বদঅভ্যেস আছে। ওই যে বলে না সেলফ টক, ওটাই করছিলাম আরকি!”
​এই বলেই আনায়া কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতে হাসল। তার সেই অপ্রস্তুত হাসি দেখে আইজেলও হোহো করে হেসে ফেলল। উত্তেজনার রেশটা কিছুটা কমে এল।
​”আরে, বেশ ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো! যাইহোক, তোমার শরীর এখন কেমন? মাথা ব্যথা বা শ্বাসকষ্টটা কি একটু কমেছে? এখন কেমন ফিল করছো?”
​আনায়া লম্বা একটা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। হিমশীতল হাওয়া তখনও তার গায়ে বিঁধছে। সে মাথা নেড়ে মৃদুস্বরে বলল,

“ভালো। ইনহেলার নেওয়ার পর এখন অনেকটা হালকা লাগছে।”
​আইজেল মুচকি হাসল। তারপর আনায়ার কাঁধে হাত রেখে বন্ধুত্বপূর্ণ স্বরে বলল,
“শোনো, অনেক তো হলো। কালকে কিন্তু আমাদের মাস্ট ভার্সিটিতে যেতে হবে। এমনিতেই অনেকগুলো দিন মিস দিয়ে ফেলেছি। ভার্সিটি থেকে কিন্তু অলরেডি ইমেইল পাঠাতে শুরু করেছে।”
​আনায়া রেলিংয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। সে জানে আইজেল ঠিকই বলছে, পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু তার মনের ভেতর তখন শুধু ভিভিয়ানকে নিয়েই তোলপাড় চলছে। সে আইজেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, জানি। কাল থেকে আর মিস দেব না। কিন্তু সাবা এখনো আসছে না কেনো, রাত তো অনেক হলো।”
​আইজেল বারান্দার নিচে তুষারপাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

“সাবা মেয়েটা বড্ড একগুঁয়ে। ও মিউনিখের রাস্তাঘাট আমাদের চেয়ে ভালো চেনে। তবুও আমি ওকে টেক্সট করেছি। ও ফিরলে আমরা একসাথে কাল সকালে বের হবো। আর এমনিতেও দেখো, দূর থেকে কনসার্ট শোরগোল এখানেও শোনা যাচ্ছে। চিন্তা করো না, চলে আসবে ও।
তুমি এখন অন্তত কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নাও আনায়া। তোমার চোখের নিচে কালি পড়ে যাচ্ছে।”
​আনায়া মাথা নাড়লেও তার মন বলছে, এই রাত তাকে সহজে ঘুমাতে দেবে না। সে বারান্দার বাইরে আবার একবার তাকাল—ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় তুষার কণাগুলো আগের মতোই নিভে যাচ্ছে।
​আইজেল তাকে ভেতরে আসার ইশারা করে বলল,
“চলো, বারান্দার দরজা বন্ধ করি। ঠান্ডাটা হাড়ের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। কাল সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে কিন্তু!”
আনায়া যান্ত্রিকভাবে আইজেলের পিছু পিছু ঘরের ভেতর ঢুকল। আইজেল দরজাটা লক করে দিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। কিন্তু আনায়া বিছানায় শুয়েও বারবার জানলার দিকে তাকাতে লাগল। তার মনে কেবল একটিই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—ঐ ভিকে-ই কি আসল ভিভিয়ান ছিল, নাকি তার অবচেতন মন, আবারও তাকে নিয়ে কোনো মরণখেলায় মেতেছে?

​মিউনিখের আকাশ আজ কিছুটা মেঘলা, তবে টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অফ মিউনিখ (TUM)-এর বিশাল চত্বরে তারুণ্যের উদ্দীপনায় কোনো ঘাটতি নেই। ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বিদ্যাপীঠের স্থাপত্যশৈলী দেখলেই বোঝা যায় কেন একে মেধার তীর্থস্থান বলা হয়। কাঁচ আর ইস্পাতের তৈরি আধুনিক দালানগুলোর ভেতর আনায়া আর আইজেল ধীরগতিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের করিডোর দিয়ে হাঁটছিল; চারপাশের যান্ত্রিক গাম্ভীর্য তাদের বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে, তারা এক কঠিন প্রতিযোগিতার জগতে পা রেখেছে। অথচ সবাই যেখানে শুরুর দিন থেকেই এতো প্রস্তুতি নিয়ে ধুমধাম পড়তে শুরু করে দিয়েছে, সেখানে তারা সপ্তাহের একদিন ছাড়া ভার্সিটিতেই পা রাখেনি।
​বিশাল সেমিনার হলের মতো ক্লাসরুমটিতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল সারিবদ্ধ ডেস্ক, উন্নতমানের প্রজেক্টর আর ডিজিটাল বোর্ড। কক্ষটি ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ। কেউ ল্যাপটপে নোটস গোছাচ্ছে, কেউবা আইপ্যাডে স্কেচ পেন দিয়ে জটিল কোনো মেকানিজমের নকশা আঁকছে। আনায়া আর আইজেল মাঝের সারির দুটি আসনে জায়গা করে নিল।
তাদের ডানে এক জার্মান তরুণ অত্যন্ত মনযোগ দিয়ে কোনো জার্নাল পড়ছে, আর বাঁয়ে বসে থাকা এক ব্রাজিলিয়ান তরুণী তার বান্ধবীর সাথে নিচু স্বরে কথা বলছে।​সবার পোশাক-আশাক এবং চলন-বলনে পেশাদারিত্বের ছাপ স্পষ্টত। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জটিল সব থিওরি আর প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের চাপে সবার মধ্যেই এক ধরণের চাপা উত্তেজনা কাজ করছে।
তবে অদ্ভুত বিষয় হলো, গত রাতের সেই কনসার্ট নিয়েও ক্লাসের প্রতিটি কোণায় গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। আইজেল আনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“দেখেছো আনায়া? এখানেও গতরাতের কনসার্ট নিয়ে কথা হচ্ছে। যাক, দুনিয়াতে আমাদের ভাইব ম্যাচ হবে, এমন অনেকেই এখানে আছে। নয়তো আমি তো ভেবেছিলাম, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি এই এলিয়েনদের ভার্সিটিতে এসে।”
​আনায়া কোনো উত্তর দিল না। সে শান্তভাবে নোটপ্যাড আর কলম বের করে ডেস্কের ওপর রাখল। তার মাথার ভেতরে সেই একই বিষয় ঘুরছে। সারারাত ঠিকমতো ঘুমায়ওনি মেয়েটা। যথারীতি বই-খাতার এই তাত্ত্বিক জগতে তার মন বসার কোনো সুযোগই নেই।
​হঠাৎ করেই পুরো ক্লাসরুমের গুঞ্জন এক নিমিষে স্তব্ধ হয়ে গেল। এক অদ্ভুত পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে এল চারদিকে। সবাই সিট ছেড়ে সোজা হয়ে বসল। আইজেল আর আনায়া কিছুটা অবাক হয়ে একে অপরের দিকে তাকাল। আইজেল উৎসুক হয়ে তার পাশে বসা সেই ব্রাজিলিয়ান মেয়েটির দিকে ফিরে, নিচু স্বরে জার্মান ভাষায় জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, ক্লাস রুটিন কি দিয়ে দিয়েছে?”
​মেয়েটি অবাক হয়ে তাকাল,
“হ্যাঁ, কেন? তুমি কি ডিপার্টমেন্টের অফিশিয়াল গ্রুপে জয়েন হওনি?”
​আইজেল কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল,

“আসলে সরি, আমি গত কয়েকদিন ব্যক্তিগত কারণে আসতে পারিনি। এখন কোন প্রফেসরের ক্লাস, জানো?”
​মেয়েটি উত্তর দেওয়ার জন্য মুখ খুলেছিল মাত্র, কিন্তু পরক্ষণেই সে যেন পাথর হয়ে গেল। কোনো কথা না বলে সে দ্রুত নিজের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখাদেখি ক্লাসের প্রতিটি শিক্ষার্থী একযোগে উঠে দাঁড়াল। আইজেল আর আনায়া শুরুতে কিছু বুঝতে না পেরে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, তারপর পরিস্থিতির চাপে তারাও দাঁড়িয়ে পড়ল।
​ঠিক সেই মুহূর্তে ক্লাসরুমের ভারী দরজাটি ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল এক দীর্ঘদেহী, বলিষ্ঠ আকারের পুরুষ। পরনে তার নিকষ কালো ওভারকোট-কালো প্যান্ট। কালো শার্টের সাথে কালো রঙের টাই-টাও নিখুঁতভাবে বাঁধা। গলায় অত্যন্ত আভিজাত্যের সাথে ঝোলানো একটি গাঢ় লালচে রঙের মাফলার। কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে যাওয়া চুলগুলো কপালের দুপাশে কিছুটা অবিন্যস্ত থাকলেও, তাকে দেখতে অসম্ভব পরিমার্জিত,প্রফেশনাল এবং গুরুগম্ভীর লাগছে। তার বুট জুতোর প্রতিটি পদক্ষেপের শব্দ মেঝের টাইলসে প্রতিধ্বনিত হয়ে ক্লাসের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ছে।
​হাতে কিছু ফাইল শক্ত করে ধরা, দৃষ্টি একদম সামনের দিকে নিবদ্ধ—অত্যন্ত দৃঢ় এবং লক্ষ্যভেদী। সে কারো দিকে না তাকিয়ে সরাসরি টিচার্স ডেস্কের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফাইলগুলো সজোরে টেবিলের ওপর রেখে সে মাইক্রোফোনটা হাতে নিল। পুরো হলের স্পিকারগুলো কাঁপিয়ে তার গুরুগম্ভীর হাস্কি কণ্ঠস্বরটি জার্মান ভাষায় গর্জে উঠল,

​”সিট ডাউন এভরিওয়ান।”
​মুহূর্তেই সবাই যান্ত্রিকভাবে বসতে শুরু করল।কিন্তু আনায়া আর আইজেল যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো দাঁড়িয়ে রইল। আনায়ার মনে হলো তার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় রুদ্ধ হয়ে এসেছে। এ কি দেখছে সে? স্টেজের সেই উন্মাদ রকস্টার ভিকে, কিংবা রাতবিরেতের কাল্পনিক পুরুষ ভিভিয়ান—আজ তাদের সাথে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রফেসরের পার্থক্য কোথায়?
​আইজেলের হুঁশ ফিরতেই দেখল আনায়া স্তব্ধ চোখে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে দ্রুত আনায়ার হাত ধরে একরকম টেনে তাকে সিটে বসিয়ে দিল। কিন্তু আনায়ার স্থির দৃষ্টি তখনো সেই মানুষটির ওপর নিবদ্ধ। তার মাথার ভেতর যেন হাজারো বাদ্যযন্ত্র একত্রে বেজে চলেছে।

​সেমিনার হলের কৃত্রিম আলো আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুমোট পরিবেশে আনায়া আর আইজেল পাথরের মতো নিস্পন্দ হয়ে বসে রইল। সামনের ডেস্কে রাখা ফাইলের ওপর ঝুঁকে থাকা মানুষটির প্রতিটি সূক্ষ্ম নড়াচড়া যেন নতুন কোনো রহস্যের জন্ম দিচ্ছে।
আইজেল আর কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে তার পাশে বসা সেই ব্রাজিলিয়ান তরুণীর দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
“উনিই কি প্রফেসর? উনি আমাদের ক্লাস নেবেন?”
​তরুণীটির নাম লারিসা পেরেইরা গোমেস; সাধারণত ব্রাজিলিয়ানদের মূল নামের শেষে বাবা-মা উভয়রই নাম যুক্ত হওয়ায়, তাদের নামগুলো তুলনামূলক কিছুটা বড় হয়। কোঁকড়ানো খয়েরি চুল আর উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের লারিসার বাহ্যিক আভিজাত্য এক নজরেই নজর কাড়ে। সে আইজেলের বিস্ময়মাখা মুখচ্ছবি দেখে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে, জার্মান ভাষায় নিচু স্বরে উত্তর দিল,

“অবশ্যই। তুমি কি ওনাকে চেনো না? উনি প্রফেসর ভিকে।”
​আইজেলের চক্ষু চড়কগাছ। সে প্রায় তোতলামি করে বলে উঠল,
“না মানে… উনি তো রকস্টার! গত রাতেই তো ওনারই কনসার্ট ছিল, তাই না?”
​লারিসা রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসল,
‘হ্যাঁ, আমিও গিয়েছিলাম কনসার্টে। তবে তোমার মতো সারপ্রাইজড আমরাও ফার্স্ট ক্লাসেই হয়েছিলাম। সেদিন হয়তো তুমি আসোনি। ভার্সিটি অথরিটি নিজে ওনাকে আমাদের সাথে ইন্ট্রোডিউস করিয়ে দিয়ে গিয়েছে।… ওহ্ গড, সত্যিই অনেক স্ট্রিক্ট মানুষ উনি! তবে এটাও আমাদের গুড লাক যে, ভার্সিটিতে এসেই আমরা এতো বড় একটা সারপ্রাইজ পেয়েছি। যদিও স্থানীয় জার্মানরা ওনার টিচিং প্রফেশন নিয়ে আগে থেকেই অবগত, কিন্তু আমরা ফরেনাররা জানতাম না, তাই শক্ড হয়েছি।”
​আইজেল যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে অস্ফুট স্বরে পুনরায় প্রশ্ন করল,
“কিন্তু একজন রকস্টার হয়ে কিভাবে…’
​লারিসা আইজেলের দ্বিধা বুঝতে পেরে জার্মানে বলতে লাগল,
“ভাবছো, রকস্টার হয়ে কীভাবে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারিং ক্লাস নেবেন? তুমি ব্লাডেন সম্পর্কে জানো নিশ্চয়? ব্লাডেন কেবল একটি মিউজিক ব্যান্ড নয়, এটি একটি ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ড। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে পদার্পণের অনেক আগে থেকেই ওনারা ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে কাজ করছেন। প্রফেসর ভিকে এবং মিস ইমানি—তাঁরা দুজনেই এই TUM-এর প্রাক্তন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। প্রফেসর ভিকে তো আমাদের এই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টেরই গোল্ড মেডালিস্ট (স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত) টপার ছিলেন। হি ওয়াজ দ্য টপার অফ আওয়ার মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট।”
​লারিসা একটু থামল, তারপর পুনরায় বলতে শুরু করল,

“ইউ নো হোয়াট, ওনাদের ইঞ্জিনিয়ারিং প্রফেশনালিজম এতো হাই যে, ব্লাডেন আজ মার্সিডিজের মতো ব্র্যান্ডের পার্টনারশিপে আছে। তারা তাদের রেসিং ইভেন্টে মেইন স্পন্সর। যদিও গত এক বছর ধরে ওনারা রেসিং ইন্ডাস্ট্রি থেকে দূরে আছেন, বাট হোপফুলি তারা খুব শীঘ্রই ট্র্যাকে ব্যাক করবেন।”
​আইজেল বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“তার মানে উনি আমাদের নিয়মিত ক্লাস নেবেন? একসাথে এতো কিছু…?’
​লারিসা মাথা নেড়ে বলল,
“প্রফেসর ভিকে মূলত সিজনাল সেশনের জন্য আসেন। বছরে তিন থেকে চার মাস তিনি ভার্সিটিতে সময় দেন;বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উইন্টার সেশনে। আমাদের এই ফাস্ট সেমিস্টার কোর্সে তিনি টানা তিন মাস থাকবেন। এইমাসে সপ্তাহে তিন দিন; সোম,মঙ্গল আর বৃহস্পতিবার। আর নেক্সট মান্থ থেকে সপ্তাহে দুদিন—প্রতি মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার।”

​আইজেলের বিস্ময় তখনো কাটার নাম নেই। ওদিকে আনায়া প্রস্তরবৎ নিথর হয়ে প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তাদের কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ তার কর্ণে তীরের ন্যায় বিঁধছিল।
এরিমধ্যে হঠাৎ ক্লাসরুমের সেই গম্ভীর মানুষটি, ডেস্কে রাখা ফাইলের ওপর ঝুঁকে থাকা অবস্থাতেই, ফাইলের পাতায় ক্ষিপ্র গতিতে কলম চালাতে চালাতে অত্যন্ত ভরাট গম্ভীর স্বরে বলে উঠল,
“গত ক্লাসে যারা অনুপস্থিত ছিলেন,প্লিজ স্ট্যান্ড আপ ইমিডিয়েটলি। আই নিড টু কালেক্ট ইয়োর নেমস। বি কুইক!”
​নির্দেশটি শোনামাত্রই হলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। আইজেলের বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।শুরুতেই এমন একটা বাঁশ খেতে হবে, তা কুক্ষণেও কল্পনা করেনি। সে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে তাকাল। আনায়া তখনো ঘোরের আবর্তে নিমজ্জিত হয়ে সম্মুখের সেই মানুষটির দিকে চেয়ে আছে। আইজেল ওর বাহুতে সজোরে চিমটি কেটে ফিসফিস করে তাগাদা দিল,

“আনায়া, উঠে দাঁড়াও! ক্রাশের থেকে বাঁশ খাওয়ার সৌভাগ্য আমাদেরই হয়েছে।”
​আনায়া সম্বিত ফিরে পেয়ে চমকে আইজেলের দিকে তাকাল। আইজেলের চোখের ইশারা বুঝে সে আর কালক্ষেপণ না করে যন্ত্রের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল।
​প্রফেসর ভিকে একবারও শিরদাঁড়া সোজা করে তাকাল না। তিনি কলম উঁচিয়ে যান্ত্রিক শীতল স্বরে বলতে লাগল,
“নেনেন জি মির ইহরেন নামেন।” (নিজেদের নাম বলুন।)
​একে একে ভিনদেশি শিক্ষার্থীরা তাদের নাম বলতে করতে শুরু করল।
—”মার্কাস মিলার, ফ্রম ডেনমার্ক,” এক দীর্ঘদেহী তরুণ গম্ভীর কণ্ঠে জানালো।
—”আলেক্স বিয়াঞ্চি, ইতালি,” অপর একজন যোগ করল।
প্রফেসর ভিকে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ডায়েরির পাতায় নামগুলো টুকে নিতে লাগল। অবশেষে আইজেলের পালা এল। সে ইতস্তত ভঙ্গিতে কাঁপা গলায় বলল,

“দুর-এ-আইজেল।”
​প্রফেসর নিঃশব্দে সেটি লিখে নিল। এবার আনায়ার পালা। কিন্তু আনায়ার মনে হলো তার কণ্ঠনালিতে কেউ যেন অদৃশ্য পাষাণভার চাপিয়ে রেখেছে। সে মুখ খুলতে চাইল, কিন্তু বাক্যস্ফূর্তি হলো না। আনায়াকে নিরব দেখে আইজেল অত্যন্ত নিচু স্বরে তাগাদা দিল,
“আনায়া! দ্রুত নাম বলো!”
​আনায়া নিজেকে প্রাণপণে সংযত করার চেষ্টা করল, কিন্তু পুনরায় ব্যর্থ হলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রফেসর ভিকে প্রথমবারের মতো মাথা তুলে, তার তীক্ষ্ণ এবং লক্ষ্যভেদী দৃষ্টি উত্তোলন করে হলের মধ্যভাগে স্থির করল। সরাসরি দাঁড়িয়ে থাকা আনায়ার চোখের ওপর তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো। সে তার আনমনা ভাবনাতেই অত্যন্ত নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলছিল,

মহামায়া পর্ব ৩৪

“কাইন্ডলি স্টেট ইওর নেইম…”
​কিন্তু বাক্যটি সমাপ্ত হওয়ার পূর্বেই, প্রফেসর ভিকের গম্ভীর অবয়বে এক মুহূর্তের জন্য স্থবিরতা নেমে এল। হলের কয়েক শত শিক্ষার্থীর নিস্তব্ধ উপস্থিতিতে, দুই জোড়া নেত্রপল্লব একে অপরের অস্তিত্বে থমকে দাঁড়াল। কাঁচের জানালার ওপাড়ে মুশল ধারায় বৃষ্টি ঝড়ছে। তুষার নয় বরং বৃষ্টি; সেই বৃষ্টি যার পরশে কখনো দুটো অস্তিত্বের ভালোলাগা,ভালোবাসা, সাক্ষাৎ কিংবা বিচ্ছেদ—সব কিছুরই কাঙ্খিত মূহুর্তে সাক্ষী থেকেছে।
আনায়ার মনে হতে লাগল, তার চারপাশের দৃশ্যপট ক্রমান্বয়ে আবছা হয়ে আসছে। সে ওষ্ঠাধর কামড়ে ধরে নিজেকে শেষবারের মতো সামলে নিয়ে; অস্ফুটতায় কাঁপা স্বরে আওড়াল,
​”আ… আনায়া। আনায়া এহসান।”

মহামায়া পর্ব ৩৬