মহামায়া পর্ব ৩৬
তুশকন্যা
—‘আ…আনায়া! আনায়া এহসান!’
প্রফেসর ভিকে তথা কেনীথের চোখের পলক পড়ল না; আনায়ারও একই দশা,শ্বাস-প্রশ্বাস থমকে আছে। প্রফেসরের দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য অভূতপূর্ব তীক্ষ্ণতায় স্থির হলো। কলম ধরা তার বলিষ্ঠ হাতটি শ্বেতশুভ্র ফাইলের ওপর নিশ্চল হয়ে রইল। বাইরে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। কাঁচের বিশাল জানলাগুলোর ওপাশে বৃষ্টির ঝাপটা এক বিষণ্ন সুর তুলছে। বলিষ্ঠ মানের তীক্ষ্ণ, লক্ষ্যভেদী দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে। ধীর-ধীরে তাঁর কপালে সূক্ষ্ম এক ভাঁজ পড়ল; যা কেবল অত্যন্ত নিকটবর্তী কারও পক্ষেই লক্ষ করা সম্ভব।
আনায়ার পুরো জগৎ থমকে গিয়েছে। মন-প্রাণ কেবল একটা কথাই বলছে, এই সেই মানুষ যার সান্নিধ্য তাকে বছরখানেক আগে দহন করেছিল; আর আজ এই ক্লাসে দাঁড়িয়ে সে আবার সেই একই আগুনের শিখার মুখোমুখি। কেনীথের দৃষ্টিতেও এক লহমায় কয়েক হাজার স্মৃতির স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল।
পুরো ক্লাসরুম তখন এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে। আইজেল আনায়ার কনুইয়ে একটা মৃদু ধাক্কা দিল, যেন তাকে বাস্তব জগতে ফিরিয়ে আনতে চাইল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই কেনীথ নিজের ভেতরের অবাধ্য আলোড়ন দমন করে নিল। তাঁর চেহারায় মুহূর্তের মধ্যেই এক হিমশীতল পেশাদারিত্বের প্রলেপ পড়ল। সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে ডায়েরিতে নামটা টুকে নিল। তাঁর দৃষ্টিতে এখন আর কোনো স্মৃতির লেশমাত্র রেশ নেই; সে ঢাকা পড়েছে প্রফেসর ভিকে নামক গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বের আড়ালে।
যেন আনায়া এহসান নামটি তার কাছে অন্য দশটি ভিনদেশি স্টুডেন্টের নামের মতোই স্রেফ একটা অ্যাকাডেমিক ডেটা। সে ঘাড় বাঁকিয়ে ফাইলের পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করল; অত্যন্ত ক্লিয়ার আর অথরিটেটিভ কন্ঠে প্রফেশনাল জার্মান অ্যাকসেন্ট মেশানো ইংরেজিতে বলল,
“টেক ইউর সিট!”
আনায়ার পায়ের নিচ থেকে যেন ভিত্তি সরে যাচ্ছে। এই মানুষটা কি তাকে চেনে না? সত্যিই চেনে না? এ কেমন তার আচরণ? তবে কি সবই তার মস্তিষ্কের কোনো জটিল বিভ্রান্তি? সে যান্ত্রিকভাবে ধপ করে সিটে বসে পড়ল। মেলাতে লাগল নানান হিসেব-নিকেশ। রকস্টার ভিকে-ই যে প্রফেসর ভিকে, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। আর যদি তাই হয়, তবে ভিকে-ই হলো ভিভিয়ান এহসান। যাকে সে তার বড় আব্বুর গুনধর ছেলে হিসেবেই চেনে। আর আইজেল তো এটাও বলেছিল, এই ভিকের মা নাকি একজন রাশিয়ান। অন্যদিকে তার মা বলেছিল, তার বড় আম্মুও একজন ভিনদেশী—রাশিয়ান। অতএব তার হিসেব মিলে গিয়েছে। যদিও লোকটা এখন আর তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না, কিন্তু আনায়া কাছে এই অবজ্ঞাটাও বড্ড চেনা। এইতো মাস দেড়েক আগের কথা—চট্টগ্রামে দুটো দিন-রাত একসাথে কাটিয়ে দেওয়ার পরও, যেভাবে অবহেলা-অবজ্ঞা করেছিল তা আনায়া এতদ্রুত কিভাবে ভুলবে?
আজকেও তার এমন অচেনা রূপ দেখে, আনায়া খুব বেশি অসন্তুষ্ট হলো না। বরং মনে মনে দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা প্রফেসর রূপের বর’টাকে দেখে মনে মনে আওড়াল,
“উমমম, বড় আব্বুর ফুতের ভালো রাগ আছে বটে। অবশ্য হবেই বা না কেনো, বংশের নাম রাখতে হবে যে! বংশের নাম রক্ষার্থে এমন একটা-দুটো ঘাড়ত্যাড়া না থাকলেও হয়না।”
আনায়া থামল; তার দিকে কুক্ষণেও ফিরে না তাকানো কেনীথকে আপাদমস্তক পরখ করে নিল। ঠোঁটের কোণটা সামান্য কামড়ে ধরে মনে মনে আওড়াল,
“ব্যাপার না, যতই রাগ-ক্ষোভ থাকুক না কেনো। দেখা তো পেয়েই গেছি, এখন শুধু একবার আপনাকে সুযোগমতো হাতের নাগালে পাই—বিশ্বাস করুন, দুজনে মিলে বংশের নাম উজ্জ্বল করে ফেলব; নো টেনশন!”
এরিমধ্য আনায়ার উদ্ভট ভাবনা কাটল আইজেলের কন্ঠে; সে তার কানে ফিসফিস করে বলল,
“ওহ গড! ওনার চাউনি দেখেছো? মনে হচ্ছিল জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলবেন আমাদের। হিউম্যান আইসবার্গের একদম পারফেক্ট এক্সাম্পল!”
আনায়া কোনো উত্তর দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেল না।ওদিকে প্রফেসর ভিকে তার স্লাইড প্রজেক্টরটা অন করে লেকচার শুরু করে দিয়েছে। তাঁর প্রতিটি মুভমেন্টে এক ধরণের গুরুগম্ভীর অভিজাত্য। বাইরে বৃষ্টির গতি বাড়ছে, মাঝে মাঝে মেঘের গুরুগুরু ডাক ক্লাসরুমের নিস্তব্ধতাকে আরও রহস্যময় করে তুলছে।প্রফেসর ভিকে বোর্ডে মার্কার দিয়ে থার্মোডাইনামিক্সের জটিল ইকুয়েশন লিখতে শুরু করেছে। একইসাথে লেকচার দিচ্ছে একদম নিখুঁত জার্মান একসেন্টে। তাঁর পশ অ্যাকসেন্ট আর প্রফেশনাল কমান্ড দেখে বোঝার উপায় নেই যে গত রাতে এই মানুষটিই স্টেজে উন্মত্ত হয়ে রকস্টারের বেশে উন্মাদ হয়ে গাইছিল।
সবাই গভীর মনযোগ দিয়ে তার ক্লাস করছে। আনায়াও তার ব্যতীক্রম নয়; তবে সে ক্লাসের পড়ার চেয়ে ভিকে’কে দেখতেই ব্যস্ত। অজান্তেই অদ্ভুত এক অনুভূতি হচ্ছে। কিছুটা ভালোলাগা আবার কিছুটা অনিশ্চিতা কাজ করছে তার মাঝে। কখনো কখনো ভিকের একাডেমিক কথাবার্তাও তীরের মতো তার সত্তায় বিঁধছে।
লেকচারের এক পর্যায়ে ভিকে হঠাৎ সকলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,
”এনিওয়ান ক্যান টেল মি, কেন এই সিস্টেমে লস অফ এনার্জি পুরোপুরি মিনিমাইজ করা সম্ভব নয়?”
পুরো ক্লাস নীরব।এতক্ষণ আনায়া তার খেয়ালে হারিয়ে থাকলেও, এখন অপ্রস্তুত হয়ে উঠল। এতক্ষণ কি পড়িয়েছে কিছুই তো কানে নেয়নি। এখন পড়া জিজ্ঞেস করে বেইজ্জতি না করে দেয়! আনায়া এই ভাবনাতে শুষ্ক ঢোক গিলল। আইজেলেরও একই দশা। অতিরিক্ত প্রেশারে পড়া সব মাথায় গুলিয়ে ফেলেছে।
এরিমধ্যে একজন ভিনদেশী ছেলে উঠে দাঁড়াল। চোখে গোল-গোল কালো ফ্রেমের একখান চশমা, সোনালী চুল।বেশভূষা ও ভাবগম্ভীর্যে বেশ নম্র-ভদ্র ও মেধাবী দেখাচ্ছে। তবুও সে কাঁপা গলায় টেকনিক্যাল ল্যাঙ্গুয়েজে বলল,
“স্যার… ডিউ টু ইন্টারনাল ফ্রিকশন অ্যান্ড সারাউন্ডিং ইন্টারফেয়ারেন্স…”
ভিকে তার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ডেস্কে দুই হাত রেখে কিছুটা সামনে ঝুঁকে দাঁড়াল।
“এক্সাক্টলি, সারাউন্ডিংস সবসময়ই আউটপুটকে ডিস্টার্ব করবে। পারফেক্ট মেশিন যেমন ইম্পসিবল, পারফেক্ট সাইলেন্সও তেমন মাঝে মাঝে ডিস্টার্বড হয়। ওয়েল সেইড বাট নেক্সট টাইম বি প্রিপেয়ারড উইথ বেটার লজিক। সিট ডাউন।”
আনায়া আর আইজেল একত্রে নিজেদের মাথা চুলকালো। আইজেলের মাথায় সব ঢুকেও প্যাচ লেগে যাচ্ছে, আর আনায়া তো কেনীথকে ছাড়া অন্য কিছুতে মনযোগই দিতে পারছে না। ওদিকে ভিকে তার প্রফেসর রূপে আবারও বোর্ডে একের পর এক হিবিজিবি লিখতে শুরু করেছে।
আইজেল তার ডেস্কে একদম আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। সে মুখ খুলতে চেয়েও সাহস সঞ্চয় করতে পারছে না, এমনকি নড়াচড়াও ভুলে গিয়েছে। সে মনে মনে আতঙ্কিত হয়ে ভাবছে—সবে তো শুরু, এভাবে যদি ক্লাস চলে তবে সে বাকি সেশনগুলোতে বাঁচবে কীভাবে? দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে তার। ক্লাসের প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে এক ধরণের অসহ্য চাপের মতো মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে আনায়া প্রথম থেকেই রুদ্ধশ্বাস এক ঘোরের মধ্যে নিমজ্জিত। তার অস্তিত্বের সমস্ত চেতনা যেন একটিমাত্র বিন্দুতে গিয়ে নিবদ্ধ হয়েছে—প্রফেসর ভিকে। সে অপলক চেয়ে আছে কেনীথের দিকে, কিন্তু কেনীথ কুক্ষণেও তাঁর নজর আনায়ার দিকে ফেরানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন না। তাঁর সম্পূর্ণ মনোযোগ নিহিত রয়েছে লেকচার আর ডেস্কে রাখা রেফারেন্স বইয়ের পাতার ওপর। সে যখন ডায়াগ্রাম আঁকতে আঁকতে আবারও লেকচার শুরু করল, আনায়ার মনটা হঠাৎ বিষন্ন হয়ে উঠল। সত্যিই কি এতোটা অবজ্ঞা তার প্রাপ্য?মানুষটা কি সত্যিই সত্যিই তাকে চেনে না? নাকি চেনার সমস্ত পথ অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে? এটাই হয়েছে; অভিনয়েও লোকটা কতটা নিখুঁত!
ঠিক এই গুমগুমে পরিবেশের মাঝে আইজেল আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে আনায়ার কানের কাছে মুখ নিয়ে মাত্র দুটো কথা ফিসফিস করে বলতে চাইল। কিন্তু তার ওষ্ঠদ্বয় স্পন্দিত হওয়ার আগেই, প্রফেসর ভিকে তার রেফারেন্স বইয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ অবস্থাতেই হিমশীতল গুরু-গম্ভীর কণ্ঠস্বরে বলে উঠল,
”কিপ সাইলেন্ট! ফোকাস অন ইয়োর লেকচার অর গেট লস্ট ফ্রম দ্য ক্লাস।”
মুহূর্তেই আইজেলের বুক ধক করে উঠল, আনায়াও চরম বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেল। পুরো ক্লাসের স্টুডেন্টগুলো স্তম্ভিত হয়ে ভাবছে—প্রফেসর হঠাৎ নিজের লেকচার থামিয়ে, এই কঠোর সতর্কবাণী কাকে উদ্দেশ্য করে দিলেন?
ভিকে তো একবারও বই হতে নজর তুলে তাকায়নি; তাঁর নজর তখনো বইয়ের জটিল ডায়াগ্রামের ওপর স্থির। অথচ সে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করেছে শ্রেণিকক্ষের কোন প্রান্ত থেকে শব্দের বিচ্যুতি ঘটেছে। আইজেল আর আনায়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রইল। ভিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে পুনরায় তাঁর লেকচারের মূল স্রোতে ফিরে গেল; যেন কিছুই ঘটেনি।
আইজেল নিজের চারপাশটা একবার দেখে নিল। সবার চেহারায় জ্যন্ত মূর্তির মতো ভাবগাম্ভীর্য দেখে যে মনে হচ্ছে, এখানে সে ছাড়া আর কেউ একটি অক্ষরও উচ্চারণ করেনি। তার মানে, প্রফেসর তাদেরকে সশরীরে না দেখেই কেবল শব্দের কম্পন শুনে বুঝে ফেলেছেন কারা কথা বলছে!
আইজেল বিস্ময় আর এক ধরণের অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠে মনে মনে ভাবল—
”খোদা! এ কোন গজবের মধ্যে পড়ে গেলাম। আগে জানলে এদেশেই আসতাম না আমি।”
আইজেল আর আনায়া বাড়ি ফিরে এসেছে। একটু দেরিই হয়েছে দুজনের ফিরতে। সঙ্গে করে ছাতা না নিয়ে যাওয়ায় অধিকাংশই শিক্ষার্থী তুলনামূলক ভাবে ভিজতে ভিজতেই বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আনায়া আর আইজেল বাসায় এসে দেখল, সাবা তাদের আগেই ফিরেছে। লিভিং রুমে সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছিল সে। দুজনকে এমন বি’ধ্বস্ত অবস্থায় ঢুকতে দেখে সাবা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“তোমাদের এই অবস্থা কেনো? আজকের দিনটা কেমন কাটল?”,সাবার কণ্ঠে প্রচ্ছন্ন কৌতূহল।
আনায়া কোনো উত্তর দিল না। সে কেবল এক পলক সাবার দিকে তাকিয়ে নিজের ভেজা চুলে হাত বুলাতে লাগল। পাশ থেকে আইজেল পরিস্থিতি সামাল দিতে মলিন হেসে বলল,
“এই তো ভালো,তোমার?”
সাবা ল্যাপটপ বন্ধ করে প্রফুল্লতার সাথে বলল,
“আমার তো সবসময়ই ভালো।হোয়াট এভার, তোমাদের আসতে দেরি হয়েছে দেখে আমি খাবার অর্ডার করে দিয়েছি।”
সাবা মেয়েটাকে সচরাচর কিছুটা রূঢ় মনে হলেও, হঠাৎ তার এই আন্তরিকতায় আইজেল একটু অবাক হলো। সে মুচকি হেসে বলল,
“থ্যাঙ্ক ইউ ডিয়ার!…আমি বরং ঝটপট ফ্রেশ হয়ে আসছি, একসাথে খাবার খাবো।”
এই বলেই আইজেল দোতালায় চলে গেল।তার সাথে সাথে আনায়াও গেল। তবে আনায়াকে একটু বেশিই মনমরা ও ভাবনাগ্রস্ত দেখে সাবা বিষয়টা খেয়াল করল; ভ্রু কুঁচকে মনে মনে ভাবল,
“এই মেয়েটাও না! দু সপ্তাহ হয়ে যাচ্ছে তবুও ওর ঠিক হওয়ার নাম নেই। এতো সুন্দর দেশেও কেউ সারাক্ষণ বাড়ির কথা মনে করে, মন খারাপ করে থাকতে পারে?”
আনায়া, আইজেল আর সাবা একত্রে খেতে বসেছে। আনায়া চুপচাপ খেয়ে চলেছে। কোনো কথাবার্তা নেই। সাবা সারাদিনের নানা গল্প ফেঁদেছে; আইজেলও চুপচাপ শুনছে, মাঝেমধ্যে হু-হা করছে। একবার ক্লাসে ভিকের প্রফেসর হিসেবে উপস্থিতির কথা বলতে চেয়েও সে থেমে গেল। ভাবল, এমনিতেই একটু বেশি ক্লান্তি অনুভব হচ্ছে; সাবাকে এই মূহুর্তে ভিকের কথা বললে ও যদি পাগলামি শুরু করে,সেক্ষেত্রে আপাতত এই বিষয় চেপে যাওয়াই ভালো। পরে এই নিয়ে গসিপ করা যাবে।
তবে সাবার দৃষ্টি হতে আনায়া রেহাই পেল না।আনায়ার এমন চুপসে যাওয়া ভাবমূর্তি দেখে সাবা ভ্রু উঁচিয়েই বলে উঠল,
“আনায়া! সত্যি করে বলতো, তোর কি হয়েছে?”
আনায়া নিজের খেয়াল থেকে বেরিয়ে এলো। খাবার প্লেট থেকে মুখ উচিয়ে সাবার দিকে তাকাল। শুকনো মুখে বলল,
“আমার? কই কিছু না তো!”
—“কিছু না বললেই হলো? আমি খেয়াল করছি, তুই বেশ চেঞ্জ হয়ে গিয়েছিস। পরিবর্তনটা আগে থেকেই ছিল, কিন্তু ইদানীং একটু বেশিই…আর যদি তাই না হয়, একটু আগে তুই বাথরুমে কী করছিলি?”
আনায়া মূহুর্তেই হকচকিয়ে গেল। আইজেল দুজনের দিকে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাল; কিসের কথা বলছে সাবা?
সাবা নির্বিকারে বলতে লাগল,
“কিছুক্ষণ আগে আমি তোর রুমে গিয়েছিলাম,গিয়ে দেখি তুই হয়তো বাথরুমে ফ্রেশ হচ্ছিলি,কিন্তু কথা হচ্ছে… আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছি তুই বাথরুমেও কারো সাথে কথা বলছিলি। যদিও কি বলছিলি ওসব শুনতে পাইনি, কিন্তু তোর বেড-টপ চেক করে দেখলাম,ফোন রুমেই পড়ে আছে। তাহলে বাথরুমে কার সাথে কথা বললি? আবার শেষে মনে হলো তুই হয়তো পড়ে-টরেও গিয়েছিলি।”
আনায়া অপ্রস্তুত হয়ে বেশম খেয়ে উঠল। দ্রুততর নিজেকে সামলানোর আগেই, পাশ থেকে আইজেল বলে উঠল,
“এ্যাই আনায়া! ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড,আমার কিছু বলার ছিল। আ…তোমার উপর কি জ্বীন-ভূতের কোনো ছায়া-টায়া আছে? না মানে, আমাদের দেশেও এইসব হয় শুনেছি; আবার আশিক জ্বিন বলেও নাকি কিসব আছে।”
আইজেলের কথা শুনে বেচারী সাবা রীতিমতো ভড়কে গেল। সে এসবে কখনো বিশ্বাস করে না, কিন্তু যুক্তিবাদী মেয়ে আইজেলের মুখেও এইসব কথা শুনে এবার তার আনায়ার প্রতি সত্যি সত্যি সন্দেহ হচ্ছে। ওদিকে আনায়া বেচারী হতভম্ব হয়ে বসে আছে। বুঝে উঠতে পারছে না কি বলবে। চোখমুখ খিঁচে ভাবতে লাগল খানিকক্ষণ আগের ঘটনা—
আনায়া বাথরুমে আনমনা হয়ে,টাওয়াল পেঁচিয়ে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করছিল। হুট করেই পাশ থেকে গুরুগম্ভীর পুরুষালি কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে, বেচারী রীতিমতো ভড়কে যায়। পাশে ফিরতেই দেখে বাথটাবে ভিভিয়ান আরামছে বসে বসে তাকে দেখছে। আনায়া নিজেকে সামলে না রাখতে পেরে, দুহাতে নিজেকে ঢেকে নেয়; চাপা স্বরে ভারিক্কি গলায় বলে,
“আস্তাগগগফিরুল্লাহ্! হোয়াট দ্য হেল! আপনি এখানে কেনো? আপনার সাহস তো কম না, আমার বাথরুমে অব্দি ঢুকে পড়েছেন। বেরিয়ে যান অসভ্য লোক কোথাকার!”
তৎক্ষনাৎ ভিজে গা ও সিক্ত চুলে মোহনীয় হয়ে ওঠা বলিষ্ঠ পুরুষ,তার হাস্কি কন্ঠেস্বরে গম্ভীর্যের সাথে বলল,
“ঐয়েই! মুখ সামলে কথা বল বেয়াদব! আমি শুধুই তোর কল্পনা। তোর অসভ্য মস্তিষ্ক থেকেই আমার সৃষ্টি; তাই দোষটা আমাকে না দিয়ে নিজেকে দে।”
আনায়া রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। পরক্ষণেই আঙুল উঁচিয়ে চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
“কক্ষোনো না। আমি মোটেও আপনার মতো এতোটাও অসভ্য নই যে—শেষ পর্যন্ত আপনাকে আমার বাথরুমে টেনে নিয়ে আসব। এতো কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে যান,বেহায়া লোক!”
ভিভিয়ান রেগে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল; কিন্তু কিছু না বলে সে চুপচাপ বাথটাবের কিনারায় দু’হাত রেখে, আয়েশি ভঙ্গিতে আনায়াকে দেখতে শুরু করল। আনায়া তার এই অদ্ভুত ভাবগম্ভীর্য পরখ করে বলল,
“কি হলো, যাচ্ছেন না কেনো?”
—“যাবো না! কি করবি কর।”
—“বেহায়া লোক,বেরিয়ে যান বলছি। একটা মেয়ের বাথরুমে ঢুকে বসে আছেন, লজ্জা করছে না?”
ভিভিয়ান নির্বিকারে মাথা নেড়ে বলে,
“না, একদমই না। বউ’কে দেখছি তো!”
আনায়া মুখ ভেংচি দিয়ে বলে,
“ইশ! আসছে আমার নবাবজাদা—বউকে দেখতে।
এতোই যখন বউকে দেখতে মন চায়, তা ক্লাসে তো এমন ভাব করলেন যেন ইহকালেও আপনি আমায় চোখে দেখেননি।”
ভিভিয়ান হাসল। কথা না বলে হঠাৎ বাথটাব হতে উঠে দাঁড়াল। হুট করে তাকে নিজের দিকে আসতে দেখে আনায়া ভড়কে গেল,
“কি হলো, এদিকে আসছেন কেনো?”
—“চল এক সাথে গোসল করি।”
—“আস্তাগফিরুল্লাহ, ইন্না-লিল্লাহ, আউজুবিল্লাহ্ মিনাশ শায়তনি রাজিম! ইবলিশের নানা, চলে যান আমার বাথরুম থেকে!”
আনায়া পুরোপুরি হকচকিয়ে গিয়েছে। ভিভিয়ান ফিঁচকে হাসল। সে যেমনি আরো দু’পা আনায়ার দিকে এগিয়ে আসতে নিয়েছে, ওমনি আনায়া পেছাতে গিয়ে পা পিছলে চোখ-মুখ খিঁচে সোজা ফ্লোরে পড়ে গেল। কেননা বাস্তবিক অর্থে তাকে পড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচানোর মতো তখন বাথরুমে সে ব্যতীত আর কেউই নেই। আনায়া চোখ খুলতেই দেখে,আশেপাশে কারো অস্থিত্ব নেই।অথচ তার কোমড়ের হাড়গোড় যেন প্রায় ভেঙে গিয়েছে।
আনায়া ব্যাথার চোটে কাঁদো কাঁদো হয়ে আওড়ায়,
“এই লোক আমার জান নিয়ে খেলা শুরু করেছে। বাথরুমটা অব্দি ছাড় দিচ্ছে না। অথচ বাস্তবে মাছি ভেবেও ফিরে তাকায় না।”
—“ঐ আনায়া! কোথায় হারিয়ে গেলি?’
সাবার কথা শুনে আনায়া কিছুক্ষণ আগের ধ্যান হতে ছিঁটকে বেরিয়ে এলো। মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আওড়াল,
“উনি কোনো জ্বীনের চেয়ে কম নাকি!
অথচ মুখে সবাইকে আশ্বস্ত করে বলল,
“আরে তোমরা যা ভাবছো তেমন কিছুই না। এখানে আসার পর থেকে আমার বেখেয়ালিপনা বেড়ে গিয়েছে। এইজন্য এই সমস্যাটা বারবার হচ্ছে। তাছাড়া চিন্তার কোনো কারণ নেই।”
খাবার টেবিলের থমথমে পরিস্থিতিটা হালকা হতেই, সাবা হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে নতুন এক উত্তে’জনার খবর দিল। সে আনায়ার দিকে একপলক তাকিয়ে আইজেলের উদ্দেশ্যে বলল,
”আচ্ছা, তোমাদের ডিপার্টমেন্টে কি আগামীকালের কোনো ইভেন্ট নিয়ে কোনো আলাপ হয়নি? শুনেছি কাল টাম-এর সব ডিপার্টমেন্টেই ফ্রেশার্স রিসেপশন বা ওই টাইপের কিছু একটা হবে। বলা যায়, নতুন স্টুডেন্টদের নিয়ে বেশ বড়সড় আয়োজন…!”
সাবার কথা শুনে আনায়া আর আইজেল দুজনেই বেশ অবাক হলো। আইজেল হাতের গ্লাসটা টেবিলে নামিয়ে রেখে ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
”ফ্রেশার্স রিসেপশন? আমাদের তো কেউ কিছু বলেনি! আমরা তো এমন কিছুই জানি না।”
সাবা ভ্রু কুঁচকে, অবাক হয়ে বলল,
“রিয়েলি? ভার্সিটির প্রায় সব ডিপার্টমেন্টেই তো এটা হওয়ার কথা। তাহলে তোমাদেরটা বাদ যাবে কেন? তোমাদের কি নোটিশ দেয়নি?”
আইজেল কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করতেই চমকে গেল। মনে পড়ে গেল, আজ ক্লাস শেষ হওয়ার পর করিডোরে প্রচুর ভিড় দেখেছিল এবং অনেকেই নোটিশ বোর্ডের সামনে জটলা করছিল। কিন্তু ভিকের পর আরো কয়েকটা টানা ক্লাস শেষে তারা দুজনেই এতোটাই বিধ্বস্ত ছিল যে, অন্য কোনোদিকে গুরুত্ব না দিয়েই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে এসেছে। আইজেল কপালে হাত দিয়ে আফসোসের সুরে বলল,
”ওহ হ্যাঁ! মনে পড়েছে। বের হওয়ার সময় সবাই নোটিশ বোর্ডে কিছু একটা চেক করছিল, কিন্তু আমরা ওটাকে পাত্তাই দিইনি।”
দুজনের এমন খামখেয়ালি দেখে সাবার আশ্চর্য হয়ে তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ হাসল, সে মাথা নেড়ে বলল,
“তোমরা দুজনেই আস্ত এক একটা উইয়ার্ড ক্যারেক্টার! ভার্সিটি যাও অথচ দুনিয়ার কোনো খবর রাখো না। ব্যাপার না, হয়তো তোমাদের ইমেইলে নোটিশ পাঠিয়েছে, একবার চেক করে নিও।”
আইজেল সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ল। তবে সাবার উৎসাহ তখনও অন্য তুঙ্গে। সে খাবারের প্লেট সরিয়ে রেখে একটু নড়েচড়ে বসল।
”তা কাল তো সুন্দর একটা ইভেন্ট হবে, তোমরা কে কী পরে যাবি শুনি? মিউনিখের এই ওয়েদারে তো আবার যা তা পরে বের হওয়া যাবে না। ড্রেসআপ নিয়ে কিছু ভেবেছো?”
হঠাৎ ড্রেসআপ বা সাজগোজ নিয়ে কথা ওঠায় আনায়া আর আইজেল দুজনেই গভীর ভাবনায় পড়ে গেল। তবে আনায়ার মাথায় ভিন্নকিছু ঘুরপাক খেতে লাগল।কালকের ওই ইভেন্টে কি ভিভিয়ানও উপস্থিত থাকবে? যদি থাকে, তবে তাঁর সামনে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করবে সে? একটু ডিফরেন্ট কিছু?
আনায়া এসব ভাবতে ভাবতেই, মনে মনে ভেংচিয়ে আওড়াল,
“ইশশ! আমার বয়েই গেসে গেছে ডিফরেন্ট হতে। কিচ্ছু পড়ে যাবো না।”
—”আমিও ঠিক ওটাই বলতে চাচ্ছিলাম। তোকে এমনিতেই সুন্দর লাগে। কিছু না পড়লে আরো সুন্দর লাগবে।”
আনায়া হতভম্ব হলো। সম্মূখে তাকাতেই দেখল, সাবার পাশের চেয়ারে ভিভিয়ান গা এলিয়ে বসে আছে। ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক শয়তানি হাসি।
আনায়ার চোখ-মুখ শুকিয়ে গেল। দৃষ্টি শান্ত রইলেও, তাতে আপ্রাণ চেষ্টায় বলতে চাচ্ছে,
“আপনি এখানে কি করছেন? একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না?”
ভিভিয়ান তার কথায় পাত্তা না দিয়ে, আরো আয়েশি ভঙ্গিতে নড়েচড়ে বসল। আনায়ার মেজাজ তিরতির করে বিগড়ে গেল। দাঁতে দাঁত পিষে মনে মনে হিসহিসিয়ে বলছে,
“এ্যাই,এ্যাই, সাবার পাশে আপনি কি করছেন? সরুন বলছি, সরুন ওর থেকে।”
ভিভিয়ান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“তারা মাই ব্লা’ড! আর ইউ জেলাস?”
—“জেলাসের গুষ্টি উদ্ধার করব; আপনাকে সরতে বলেছি। নয়তো খু’ন করব আপনাকে!”
—“ওহ্ রিয়েলি?”
ভিভিয়ান মুচকি তির্যক হাসল। একবার মুখ ফিরিয়ে পাশে বসে থাকা সাবা’কে দেখল। পরক্ষণেই তার পিঠে হাত এলিয়ে দিবে, ওমনি আনায়া হকচকিয়ে মুখ ফস্কে সজোরে বলে উঠল,
“এ্যাই নাহ্!”
সাবা আর আইজেল কথা বলছিল। হুট করে আনায়া’র চিৎকারে দুজনে হতবিহ্বল হয়ে তারদিকে ফিরে তাকাল। আনায়া একদম থতমত খেয়ে গিয়েছে। সে শুষ্ক ঢোক গিলে বাস্তবতায় ফিরতেই দেখে, আশেপাশে আবারও কোনো ভিভিয়ানের অস্তিত্ব নেই। আনায়া হতাশ; তীব্র হতাশায় তার চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে।
আনায়া তৎক্ষনাৎ মাথা নিচু করে বলল,
“সরি, তোমাদের বিরক্ত করার জন্য।”
আইজেল আর সাবা তখনও বুঝে উঠতে পারেনি, হলোটা কি। সাবা হতভম্বের সুরে বলল,
“আনায়া তোর ডক্টর দেখানো উচিত।একদম অসুস্থ রোগী হয়ে গেছিস। না জানে কি রোগ ধরেছে।”
আনায়া মাথা নুইয়েই মনে মনে আওড়ায়,
“এ বড় জটিল রোগ; নাম তার বড় আব্বুর ফুত, কখনো বা ভিকে। নামের সাথে এহসান থাকলেও আমার প্রতি তার কোনো দয়ামায়া নেই। নির্দয়া এক জটিল-বজ্জাত রোগ। তাই এই রোগ তো সহজে সাড়বে না।”
এদিকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে, আইজেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাবার প্রসঙ্গে ক্লান্ত গলায় এক্সহস্টেড ভঙ্গিতে বলল,
“সাবা, আজকে আর এসব নিয়ে ভাববার মতো এক ফোঁটা এনার্জিও নেই। সারাদিন যা ধকল গিয়েছে! রাতে ঘুমানোর আগে না হয় আলমারি ঘেঁটে কিছু একটা সিলেক্ট করে রেখে দেবো। তারপর কাল সকালে সবাই একসাথে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়ব।”
পরদিন সকাল বেলা। জানালার পর্দা ভেদ করে আসা ফ্যাকাশে আলো আর সাবার উচ্চকিত চিৎকারে আইজেলের কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। সে ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলতেই দেখল, সাবা ইতিমধ্যে পূর্ণ সাজসজ্জায় সজ্জিত হয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে। আইজেল তখনও ঘুমের ঘোরে আচ্ছন্ন, সাবার এমন অতর্কিত উপস্থিতি সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। ওদিকে আইজেলের এলোমেলো অবস্থা দেখে সাবা বিস্ময়মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠল,
”হোয়াট দ্য হেল! তুমি এখনো তৈরি হওনি? বের হবে কখন?”
আইজেল অবাক সুরে বিড়বিড় করল,
“যাব মানে? সবে তো ভোর…”
সে পেছন ফিরে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাতেই মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে, ভার্সিটির ইভেন্টে পৌঁছানোর সময় প্রায় দোরগোড়ায়। গত সারারাত অবিরাম বৃষ্টি হওয়ায় আবহাওয়া ছিল বেশ শীতল ও মেঘলা; আর সেই আরামদায়ক ঠান্ডায় আইজেলের ঘুমটা একটু বেশিই গভীর হয়ে গিয়েছিল। সে ভেবেছিল সকাল হতে বোধহয় এখনো অনেকটা দেরি।
আইজেল আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে দ্রুত ওয়ার্ডরোব থেকে পোশাক বের করতে শুরু করল। সময়ের অভাবে খুব বেশি বাছবিচার না করে হাতের কাছে পাওয়া একটি চমৎকার ওয়েস্টার্ন আউটফিট পরে নিল সে। অবিন্যস্ত চুলগুলো পিঠের ওপর ছেড়ে দিয়ে ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের ছোঁয়ায় নিজেকে দ্রুত গুছিয়ে নিল। আয়নায় নিজেকে একবার পরখ করে দেখল—সব মিলিয়ে তাকে বেশ এলিগ্যান্ট আর আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে।
সাবা আর আইজেল তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এল। সাবা প্রায় প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে যাবে, ঠিক তখনই আইজেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“এক সেকেন্ড, আনায়া কোথায়? ও কি বাইরে আমাদের জন্য ওয়েট করছে?”
সাবা থতমত খেয়ে গেল। কিছুটা আমতা-আমতা করে বলল,
“আ… আমি তো ঠিক জানি না।”
আইজেল ভ্রু কুঁচকে সন্দিহান গলায় বলল,
“জানো না মানে? ও কি এখনো ঘুমে?… ওহ নো!”
আইজেল আর বিলম্ব না করে পুনরায় দোতলায় ছুটে গেল। ‘ধারাম’,’ধারাম’ শব্দে আনায়ার বন্ধ দরজায় সজোরে করাঘাত করতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে গভীর ঘুমের অতলে তলিয়ে থাকা আনায়া ধড়ফড় করে উঠে বসল। দরজা খুলতেই আইজেলের সামনে দৃশ্যমান হলো এক সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও এলোমেলো অবয়বের আনায়া। সে তখনও ঘুমের ঘোরে হাই তুলতে তুলতে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইল,
“কী হয়েছে? তোমরা হঠাৎ…”
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই আইজেল চিৎকার করে উঠল,
“আনায়ায়য়য়য়! আর কত ঘুমাবে মেয়ে? ভুলে গিয়েছো আজ ভার্সিটিতে ইভেন্ট আছে!”
মুহূর্তেই আনায়ার সমস্ত তন্দ্রা উবে গেল। গত রাতে তার তথাকথিত ‘বড় আব্বুর ফুত’-এর সাথে আলাপ-আলোচনায় কখন যে সারারাত পেরিয়ে গিয়েছে, সে টেরই পায়নি। শেষমেশ ঠিকমতো ঘুমটাও হয়নি। আনায়া আর এক মুহূর্ত কালবিলম্ব না করে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ছুটল। দ্রুত প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ঘরে ফিরে দেখল, হাতে সময় বড্ড কম। এখন কিছু একটা পড়েই দৌড়াতে হবে।
আনায়া নিজের ক্লোজেট খুলে বিশেষ কিছু পেল না। তখন সে মরিয়া হয়ে নিজের লাগেজটা খুলে বসল; যেখানে এখনো কিছু নতুন পোশাক ঠাঁই হয়ে আছে। এদিকে ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে সাবা আর আইজেল রীতিমতো ঘড়ি ধরে তার জন্য অপেক্ষা করছে। হঠাৎ লাগেজের ভেতর আনায়ার হাত দুটো থমকে গেল। সে আইজেলের দিকে মুখ তুলে ডাকল,
“আইজেল!”
আইজেল উৎসুক ভঙ্গিতে চেয়ে বলল,
“কী হয়েছে?”
”আমি কি শাড়ি পরব?”
আনায়া কিছুটা কাঁচুমাচু হয়ে জিজ্ঞেস করল।
আইজেল কিছু বলার আগেই পাশ থেকে সাবা বিরক্তিতে চেঁচিয়ে উঠল,
“এ্যাই না! তুই কি পাগল হয়ে গেছিস? হাতে একদম সময় নেই, আমাদের ঠিক সময়ে অ্যাটেন্ড করতে হবে। এখন শাড়ি সামলাতে বসলে ঘণ্টা পেরিয়ে যাবে। আর তুই তো শাড়ি পরতেও পারিস না! এমন হলে আমি কিন্তু এখনই চলে যাচ্ছি।”
আনায়া দমে গেল, আর কিছু বলার সাহস পেল না। সাবার এমন রূঢ় আচরণে আইজেল কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“আ… সাবা, তোমার বেশি দেরি হয়ে গেলে তুমি চলে যেতে পারো। আমরা না হয় একটু পরেই পৌঁছাব।”
সাবা গমগমে স্বরে জবাব দিল,
“অ্যাজ ইউর উইশ! তবে আমার পক্ষে আর বেশিক্ষণ ওয়েট করা সম্ভব না।”
এই বলেই সে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আনায়া শুকনো মুখে আইজেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি আমার জন্য শুধু শুধু অপেক্ষা করছ, তুমিও চলে যেতে ওর সাথে।”
আইজেল মুচকি হেসে আশ্বস্ত করে বলল,
“বেশি বুঝো না তো মেয়ে! এমনিতেও ওর ডিপার্টমেন্ট আলাদা আর ওর তাড়াও বেশি। আমাদের দুজনকে সময়মত জাগিয়ে দিয়েছে, এটাই ওর প্রতি অনেক বড় কৃতজ্ঞতা। এখন তুমি দ্রুত রেডি হয়ে নাও।”
আনায়া অসহায় ভঙ্গিতে আইজেলের দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল,
“আমি তো আসলে ঠিকমতো শাড়ি পরতে পারি না। তুমি কি হেল্প করতে পারবে?”
আইজেল একটু থমকে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে হাসল।
“হ্যাঁ, অবশ্যই!”
আনায়ার মুখে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটে উঠল। আইজেলের আশ্বস্ত করা হাসি যেন সকালের গুমোট আবহাওয়াটাকে এক নিমিষেই উজ্জ্বল করে দিল।
শাড়ি পরতে গিয়ে আনায়া এক নতুন বিপত্তিতে পড়ল। পছন্দমতো শাড়ি বের করতে পারলেও, তার সাথে মানানসই ব্লাউজটি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ওগুলো কি তবে সে দেশেই ফেলে এসেছে? নাকি শুধু শাড়িই এনেছে, ব্লাউজ আনতে ভুলে গিয়েছে? অস্থিরতা আর সময়ের অভাবে আনায়ার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। সে হতাশ হয়ে আইজেলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
”অনেক হয়েছে আইজেল, আজ আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই। আমি বরং অন্য কিছু পরে আসি।”
তৎক্ষণাৎ আইজেল তাকে থামিয়ে দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আরে, এতো হাইপার হচ্ছো কেন বলতো? আমি সলিউশন বের করছি!”
এই বলেই সে নিজের রুমের দিকে ছুটে গেল এবং মুহূর্তের মাঝেই ফিরে এল। একটি মেরুন কালারের ব্লাউজ আনায়ার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“এই নাও, এটা একদম নতুন। সাইজে হয়তো একটু উনিশ-বিশ হবে, বুঝতেই পারছো আমি একটু রোগাসোগা মানুষ।”
আইজেল ক্ষীণ সংকোচের সাথে হাসল। আনায়া ব্লাউজটি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল, কিন্তু হাতা খুঁজে না পেয়ে বিস্ময়ের সাথে বলল,
“আইজেল, সবই তো ঠিক আছে। কিন্তু এটার হাতা কোথায়? আর এটা তো…?”
আইজেল এবার কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে বলল,
“ওহ শিট! এটা তো একবারে নতুন, আমি এখনো হাতাটাই লাগাইনি। এখন তো আর সময়ও নেই।… আচ্ছা, এটা পড়লে কি খুব বেশি প্রবলেম হবে?”
”আ মানে..? আমি আর স্লিভলেস ব্লাউজ?”,আনায়া রীতিমতো ভড়কে গেল।
আইজেল তাকে আশ্বস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল,
“দেখো আনায়া,বাইরে এখন বেশ ঠান্ডা। তোমাকে ডেফিনিটলি উপরে একটা ওভারকোট বা কিছু একটা পরতেই হবে। সো, ভেতরে স্লিভলেস না ব্যাকলেস তা কেউ দেখতে যাচ্ছে না। জাস্ট গো ফর ইট!”
আনায়া থমকে গিয়ে কিছুক্ষণ ইতস্তত করল। আইজেল দ্রুত তাকে তাড়া দিতে লাগল। নিরুপায় হয়ে আনায়া ব্লাউজ আর পেটিকোট পরে রুমে ফিরে এল। তার ভীষণ সংকোচ বোধ হচ্ছে; ব্লাউজটির হাতা নেই, তার ওপর সেটি কিছুটা ব্যাকলেস এবং সামনের গলাটাও বেশ বড়। ফর্সা ত্বকে মেরুন রঙের এই সামান্য অস্তিত্বটুকুও বেশ আঁটসাঁট হয়ে বসেছে। আবার এরূপ তাকে বেশ আবেদনময়ী হিসেবেও গড়ে তুলেছে।
আনায়া নিজেকে দুহাতে ঢেকেই ঘরে প্রবেশ করল। আইজেল তাকে দেখে বিস্ময় নিয়ে বলে উঠল,
“আনায়া, ইউ ওন্ট বিলিভ! আমি মেয়ে হয়েও তোমার ওপর ফিদা হয়ে যাচ্ছি। জাস্ট লুক অ্যাট ইউ!”
আইজেলের কথায় তীব্র সংকোচে আনায়া প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল।—”আইজেল! প্লিজ থামো।”
আইজেল তার এহেন অবস্থা দেখে হো হো করে হেসে উঠল। এরপর শুরু হলো শাড়ি পরানোর পালা। আনায়া মায়ের আলমারি থেকে কিছু নতুন জামদানি শাড়ি নিয়ে এসেছিল। আজ যেটা পরার নিয়ত করেছে, তা ওফ-হোয়াইট কালারের সিম্পল ডিজাইনের একটি জামদানি শাড়ি; যার ওপর মেরুন ও গাঢ় বেগুনি রঙের ছোট ছোট ফুলের কারুকাজ করা। আইজেল শাড়িটা পরাতে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল,
“বাহ, বেশ সুন্দর তো শাড়িটা! এটাই কি জামদানি? তোমাদের দেশে এটার অনেক নামডাক শুনেছি।”
আনায়া তার কথা শুনে আনমনা হয়ে মাথা নাড়ল। সে আইজেলের উদ্দেশ্যে বলল,
“আইজেল, শাড়িটা কি বেশি পাতলা হয়ে গেল?”
—“ধুর মেয়ে, শুধু শুধু এতো চিন্তা করো না তো! চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো।”
আইজেল তাকে সুন্দর করে শাড়িটি পরিয়ে দিল। তবে সে আঁচলটা বেশ আঁটসাঁট করে কাঁধে পিন করল; যার ফলে আনায়ার উদর হতে লতানো কোমরের অনেকটা অংশই দৃশ্যমান হয়ে গেল।
আনায়া আয়নায় নিজেকে দেখে আঁতকে উঠে বলল,
“আরে, এটা কী করলে? আমার পেট-কোমর সবই তো বেরিয়ে আছে!”
আইজেল ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“আনায়া! একটু শান্ত হবে প্লিজ? দেখো তোমায় কত সুন্দর লাগছে। আর পেট-পিঠ ঢাকার জন্য তো উপরে কোট পরবেই, তাহলে সমস্যা কোথায়? উল্টো আঁচল বড় রাখলে উপরে কোট পরতে সমস্যা হতো।”
আনায়া আর কথা বাড়াল না। নিজেকে আয়নায় দেখে সে নিজেই প্রচণ্ড সংকোচে পড়ে গেল। পরক্ষণেই স্বাভাবিক হয়ে সিল্কি চুলগুলো দিয়ে একটি আলগা বিনুনি করে নিল; সামনের দিকে কিছু চুল আলগা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রইল। সিম্পল শাড়ির সাথে এই সাধারণ বিনুনিটি যেন তার সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। সব শেষে আনায়া তার ক্লোজেট থেকে একটি কালো রঙের ওভারসাইজড লেদার জ্যাকেট বের করল। জ্যাকেটটি পরতেই আইজেল অবাক হয়ে বলল,
“জ্যাকেট পরবে?”
আনায়া মাথা নাড়ল। সব সাজগোজ আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের প্রলেপ শেষে সে আইজেলের দিকে ফিরে বলল,
“কেমন লাগছে আমায়?”
আইজেল যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলল। সে উৎফুল্ল স্বরে বলল,
“আরে ইয়ার! তুমি কী চিজ বলো তো? তুমি এতো সুন্দর যে আমি আবারও তোমার ওপর ফিদা। দেখবে, আজ তোমাকে দেখে ভার্সিটির সব ছেলেরা পাগল হয়ে যাবে!”
আনায়া একটু লজ্জাই পেল। মনে মনে আওড়াল,
“সব ছেলের পাগল হয়ে কাজ নেই। একজন একটু ঠিকমতো ফিরে তাকালেই আমার এতো সাজগোছ করা সার্থক।”
দুজনে ঘর থেকে বেরোনোর প্রস্তুতি নিল। যদিও ততক্ষণে পেছনে ফেলে যাওয়া, পুরো ঘরটি ঘূর্ণিঝড়ে লন্ডভন্ড কোনো আস্তানা মনে হচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হঠাৎ কী যেন মনে পড়তেই আইজেল আবারও নিজের ঘরে ছুটল। কিছুদিন আগেই সে ব্লাডেন গ্যালারি হতে টম ফোর্ডের একটা চেরি ব্লাস্ট পারফিউম কিনে এসেছিল-সেটাই আজ আনায়ার গায়ে লাগিয়ে দিল। আনায়া তার কাণ্ডে অজান্তেই হেসে ফেলল। অচিরেই দুগালে দৃশ্যমান হলো ছোট-বড় দুখান টোল।
যেতে যেতে হঠাৎ আইজেল বলে উঠল,
”আনায়া, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা বলি… শাড়ির সাথে জ্যাকেটটা তোমায় মানিয়েছে বেশ, কিন্তু… একটু ওভারসাইজড মনে হচ্ছে না?”
আনায়া কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল,
“ভালো দেখাচ্ছে না?”
—“আরে পাগলি মেয়ে, বললাম তো চমৎকার মানিয়েছে। আমি শুধু… যাক বাদ দাও এসব।”
আনায়া স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মুচকি হাসল,
“বেশ অনেকদিন আগের কথা—একজন আমায় অজান্তেই এটা গিফট করেছিল!”
আনায়ার এরূপ রহস্যময় হাসি দেখে আইজেল ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ওয়েই হোয়েই, আমাদের আনায়া আপুরও বুঝি ওমন কেউ আছে?”
আনায়া কেবল মুচকি হাসল। আইজেল তো রীতিমতো ভড়কে গেল। সে এবার তার পেছনে পড়ল,
“আরে সত্যি আছে? বলো না কে? প্লিজ আমি কাউকে বলব না! সে কি তোমার দেশেরই কেউ? কেমন দেখতে? নাম কী?”
আনায়া তাকে সামাল দিতে গিয়েই হকচকিয়ে গেল। আইজেল যদি কখনো জানতে পারে এই জ্যাকেটটা আসলে তাদের চিরচেনা ভিকে’র এবং সে যার কথা জানতে চাইছে, সে-ও আর কেউ নয় বরং তাদের তথাকথিত ক্রাশ ভিকে’— তখন তো এরা না জানি কি করে বসবে।
বছরখানেক আগে, রাতের অন্ধকারে মানুষটা স্বযত্নে তাকে এই জ্যাকেটটা পরিয়ে দিয়েছিল। ঘটনার আকস্মিকতায় জ্যাকেটটা আর ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। বাড়িতে গিয়ে আনায়া যখন জ্যাকেটটা খেয়াল করে, তখন থেকেই যত্নসহকারে সবার আড়ালে রেখে দিয়েছিল। মধ্যরাতে মাঝে মাঝে পাগলামি চেপে বসলে, এটা পড়ে সে বদ্ধঘরে নানান পাগলামি করত। আজ এতোগুলো দিন পর এটা আবারও পরতে পেরে সে খুশিতে মনে মনে গদগদ হয়ে রইল।
ভার্সিটির মূল ফটক দিয়ে ডিপার্টমেন্টাল এরিয়ায় পা রাখতেই আনায়া আর আইজেল রীতিমতো বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। চারদিকের আলোকসজ্জা আর সাজসজ্জা দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক রাজকীয় উৎসবের আঙিনায় এসে উপস্থিত হয়েছে তারা। যদিও তাদের পৌঁছাতে বেশ খানিকটা বিলম্ব হয়েছে, তবুও অগণিত দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের এই প্রাণবন্ত সমাগম দেখে তারা নিজেদের উত্তেজনা আর চেপে রাখতে পারল না।
আইজেল ভিড়ের মাঝে আনায়ার দিকে তাকিয়ে একটু কাঁচুমাচু মুখে বলল,
“আনায়া, তুমি এখানে একটু ওয়েট করো, আমি জাস্ট ক্যান্টিন থেকে আসছি। তাড়াহুড়োয় সকালে কিছু পেটে দেওয়ারও সময় পাইনি, পেটে রীতিমতো ইঁদুর দৌড়াচ্ছে।”
বলেই সে উত্তাল জনস্রোতের মাঝে ক্যান্টিনের দিকে মিলিয়ে গেল। আনায়া একা দাঁড়িয়ে দোটানায় পড়ে গেল। তার কেন যেন মনে হচ্ছে চারপাশের মানুষগুলো তাকে অত্যন্ত অদ্ভুত চোখে পরখ করছে। হয়তো এই কনকনে শীত আর ঝিরঝিরে বৃষ্টির মৌসুমে ইউরোপীয় কোনো নামী ইউনিভার্সিটির আঙিনায় শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে থাকাটা বড্ড বেমানান! নাকি তাকে আজ সত্যিই বড্ড বেশি অদ্ভুত দেখাচ্ছে? এক অজানা অস্বস্তি তার বুকের ভেতর দলা পাকিয়ে উঠল। আইজেলটা যে আবার কোথায় গেল!
সে এক জায়গায় স্থির থাকতে না পেরে শাড়ির আঁচলটা দুই হাতের মুঠোয় চেপে, কিছুটা জড়সড় ভঙ্গিতে এদিক-সেদিক পায়চারি করতে লাগল।
ওদিকে টিচার্স লাউঞ্জের এক প্রান্তে সিনিয়র প্রফেসরের সাথে গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলেন প্রফেসর ভিকে। তাঁর সেই চিরচেনা গুরুগম্ভীর আভিজাত্য আর ব্যক্তিত্বের ভারে চারপাশটা যেন এমনিতেই কিছুটা থমথমে। প্রফেসরেরা জার্মান ভাষায় কিছু একটা বলছিলেন, আর কেনীথ তাঁর সহজাত গম্ভীর্য বজায় রেখে সংক্ষেপে দু-একটি উত্তর দিচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই, কথা বলতে বলতে কেনীথের তীক্ষ্ণ নজর প্রফেসরের কাঁধ ছাপিয়ে দূরের এক প্রান্তরে গিয়ে স্থির হলো। আধুনিক ইউরোপীয় পোশাকের ভিড়ে, ধূসর মিউনিখের প্রেক্ষাপটে এক তন্বী রমণী শাড়ি পড়ে ঘুরঘুর করতে করতে ছটফট করছে।
মুহূর্তের জন্য কেনীথের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। তাঁর সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান, দৃষ্টি-চেতনা গিয়ে নিবদ্ধ হলো একটিমাত্র বিন্দুতে— আনায়া এহসান তারা।
জ্বলজ্বলে এক নক্ষত্রের মতোই ভিকে’র দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছে তাঁর ছোট্ট তারা। সে যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য শ্বাস নিতেও ভুলে গেল । আপাদমস্তক আনায়াকে পরখ করতে গিয়ে, গুরুগম্ভীর প্রফেসর ভিকে’র কণ্ঠস্বর হতে হঠাৎ অস্ফুটে নির্গত হলো—
”মাশাল্লাহ্!”
পরক্ষণেই সম্বিৎ ফিরল তার।কিন্তু নিজের অবাধ্য আবেগকে দমন করতে গিয়ে, তার নজর হঠাৎ আনায়ার লতানো কোমড়ের সামান্য উন্মুক্ত অংশে পড়ে গেল। মূহুর্তেই বিষম খেয়ে জোরে কেশে উঠল সে। তাঁর এই আকস্মিক অবস্থা দেখে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জার্মান প্রফেসর বিচলিত হয়ে বলে উঠলেন,
”প্রফেসর ভিকে, ইস্ট অ্যালিস ইন অর্ডনাঙ?(আপনি ঠিক আছেন)”
কেনীথ কোনোমতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। তাঁর পরিস্থিতির অবনতি দেখে অন্য এক প্রফেসর পাশের টেবিল থেকে একটি পানির বোতল এনে তাঁর হাতে ধরিয়ে দিল। কেনীথ দ্রুত আনায়ার দিক থেকে নজর সরিয়ে নিল। কাঁপা হাতে বোতলের মুখ খুলে এক নিঃশ্বাসে পুরো পানিটুকু সাবার করে ফেলল।
ওদিকে জনসমুদ্রের মাঝে হঠাৎ কিছু দীর্ঘকায় কৃষ্ণবর্ণ অবয়বে নজর আঁটকে গেল আনায়ার। তারই মুখোমুখি দৃশ্যমান হয়ে দাঁড়িয়ে, সেই চিরকাঙ্ক্ষিত পুরুষের প্রতিচ্ছবি। যাকে এক পলক দেখামাত্রই আনায়ার হৃৎস্পন্দন যেন থমকে গেল।
কাল্পনিক পুরুষের বাস্তবিক রূপ;পরনে আজ নিখুঁত ফর্মাল ব্ল্যাক স্যুট-বুট, ওপরে জড়ানো কালো ওভারকোট। তাঁর কাঁধ ছোঁয়া অবিন্যস্ত চুলগুলো আজ বড্ড বেশি পরিপাটি দেখাচ্ছে। কেনীথের এই অতিমাত্রায় ডিসেন্ট লুক দেখে আনায়া যেন মুহূর্তেই গলে জল হয়ে গেল।
মহামায়া পর্ব ৩৫
যদিও দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সে পানি খেতে খেতে বাদবাকি প্রফেসরদের সাথে আলাপে মেতে আছে, কিন্তু তাতে আনায়ার কী? তার তো কেবল একটাই ইচ্ছে করছে—এখনই ভিড় ঠেলে গিয়ে, ওই বজ্জাত বর’টার গালে টুপটাপ বেশ কয়েকটা চুমু খেয়ে আসতে! পরক্ষণেই নিজের এই অবাধ্য ভাবনাকে দমিয়ে, আবারও কেনীথকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করতে মাতোয়ারা হলো উৎকন্ঠা রমণী। শেষমেশ উত্তেজনায় দু’হাতে শাড়ির আঁচল চেপে চোখ-মুখ খিঁচে, বাচ্চাদের মতো ছটফট করে অস্ফুটে আওড়াল,
”হায়য়য়য়য়য় সুবহানাল্লাহ! কী সুন্দর, কী সুন্দর! কারো নজর না লাগুক… থু থু থু!”
