Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৩৭

মহামায়া পর্ব ৩৭

মহামায়া পর্ব ৩৭
তুশকন্যা

কেনীথ জলপানের সেই আকস্মিক বিরতিটুকু সেরে আবারও নিজের স্বকীয় গাম্ভীর্যে ফিরে গিয়েছে। প্রবীণ প্রফসরদের সাথে তাঁর আলোচনার সুর এখন বেশ পেশাদার, যেন কয়েক মুহূর্ত আগের সেই ‘মাশাআল্লাহ’ বলা মানুষটা সম্পূর্ণ ভিন্ন কেউ ছিল। ওদিকে আনায়া নিজের অনুভূতির সাথে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত। কেনীথকে দূর থেকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে তার হাত-পা ক্রমশ বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আসছে।
লোকটার প্রতিটা ভঙ্গি, তাঁর কথা বলার স্টাইল কিংবা গুরুগম্ভীর আভিজাত্য দেখে আনায়ার ইচ্ছে করছিল এখনই সমস্ত লোকলজ্জা বিসর্জন দিয়ে কেনীথকে জাপ্টে জড়িয়ে ধরতে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উন্মাদনা; মনে হচ্ছে কেনীথের ওই ব্ল্যাক ওভারকোটের ভাঁজে নিজের অস্তিত্বটা মিশিয়ে দিতে পারলে বোধহয় তার এই রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনার অবসান হতো।

কেনীথের নেশায় সে এতটাই বুঁদ হয়ে আছে যে, তার প্রায় জ্ঞান হারানোর দশা।
​ঠিক সেই মুহূর্তে আনায়ার ঘোর কাটল খুব কাছাকাছি কারো উপস্থিতি টের পেয়ে। সে সচকিত হয়ে ফিরে তাকাতেই দেখল—একটি সোনালী চুলের দীর্ঘকায় তরুণ তার সামনে দাঁড়িয়ে। চেনা চেনা মনে হতে আনায়ার মনে পড়ল, এ তো সেই ছেলে যে ক্লাসে সবার মাঝে একাই জটিলসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।
ছেলেটির নাম জেইন হফম্যান; নিখুঁত জার্মান আভিজাত্য ফুটে আছে তার অবয়বে। চোখে তার কালো ফ্রেমের গোল চশমা, পরনে একটি হালকা নীল রঙের ফিটেড ব্লেজার আর ধবধবে সাদা শার্ট। জেইনের হাবভাব অত্যন্ত নমনীয় ও মার্জিত। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“হাই! আই হোপ আই অ্যাম নট ডিস্টার্বিং ইউ। আই’ম জেইন, হোয়াট’স ইউর নেইম?”
আনায়া স্বাভাবিক ভাবেই কথোপকথন এগোলো। পরে বুঝল সে ডিপার্টমেন্ট নিয়ে তার কাছে কিছু ইনফরমেশন চাইতে এসেছে।ঘুরেফিরে সবই পড়াশোনায় মাঝে আঁটকে যাওয়ায়, আনায়ার উত্তরগুলো খুঁজে দিতে কিছুটা বেগ পেতে হলো। তবুও সে তাকে সর্বচ্চ চেষ্টায় সাহায্য করল।
দুজনের আলাপের এক পর্যায়ে জেইন বলল,
“তোমার এই ইউনিক আউটফিট দেখে জাস্ট অ্যাপ্রিশিয়েট না করে পারলাম না। শাড়ি, রাইট? ইটস ট্রুলি বিউটিফুল!”

​আনায়া কিছুটা অবাক হলো। জার্মান হয়েও নারীর শাড়ি নিয়েও যথেষ্ট ধ্যান-ধারণা আছে। নয়তো ভাবভঙ্গি এমন যেন, এ বান্দা বই ছাড়া দুনিয়ার আর কোনোকিছুতেই নজর রাখে না।
জেইনের কথা বলার ভঙ্গি এতটাই নমনীয় এবং বন্ধুসুলভ যে আনায়া মুহূর্তের মধ্যেই কেনীথের ঘোর থেকে বেরিয়ে এল। সে একগাল হেসে জবাব দিল,
“থ্যাঙ্ক ইউ! ইটস আ ট্র্যাডিশনাল বেঙ্গলি ওয়ের। তুমি ঠিকই চিনেছ।”
​জেইন বেশ কৌতূহল নিয়ে শাড়ির ড্রেপিং আর রঙের প্রশংসা করতে লাগল। তাদের আলাপচারিতা খুব দ্রুতই সাবলীল হয়ে উঠল। জেইন তাকে মিউনিখের আবহাওয়া আর এই ইভেন্টের খুঁটিনাটি নিয়ে এমনভাবে গল্প বলতে লাগল যে, আনায়া বেশ শব্দ করেই হেসে উঠল কয়েকবার। একটি ভিনদেশী ছেলে এত সুন্দরভাবে তার সংস্কৃতির প্রশংসা করছে দেখে সে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল।

​ওদিকে প্রফেসরদের সাথে আলাপরত কেনীথের নজর পুনরায় সেই প্রান্তের দিকে গিয়ে থমকে গেল। এক নিমিষেই তাঁর চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কপালে ফুটে উঠল বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ। সে স্পষ্টত দেখতে পেল, কয়েক মুহূর্ত আগেও যে মেয়েটা একা একা ঘুরঘুর করছিল, এখন সে এক ভিনদেশী ছোকরার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে!
কেনীথের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি যেন অজান্তেই জেইনকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।তাঁর অবচেতন মনে প্রশ্ন জাগল— ‘হু ইজ হি? এই ছেলের সাথে আনায়ার এতো কীসের আলাপ? এতো হাসির উৎসই বা কী?’ কেনীথের ভেতরের সেই দাহ্য পুরুষটি যেন ফুঁসে উঠতে চাইছে, অথচ তাঁর সামাজিক আবরণ তাঁকে স্থির থাকতে বাধ্য করছে।
​ঠিক তখনই দৃশ্যে আগমন ঘটল আইজেলের। সে দুই হাতে ক্যান্টিন থেকে আনা কিছু স্ন্যাকস আর কফি নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে হাজির হলো। আনায়ার পাশে জেইনকে দেখে সে-ও বেশ অবাক ও উৎসাহিত হলো। এই ছেলেটাকে তো সে ক্লাসেও দেখেছে। আইজেল এসেই বলল—

​”তুমি আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই তাই না?”
​জেইন মৃদু হেসে আইজেলের সাথেও পরিচিত হলো। এরপর তিনজন মিলে বেশ মিষ্টি কিছু আলাপে মেতে উঠল। আইজেল জেইনকে ক্যান্টিনের কফি টেস্ট করার অফার দিল। আনায়া সহ তিনজনের বেশ জমিয়ে নানান কথাবার্তা হলো।অথচ কেনীথের দৃষ্টির অগ্নিশিখা তখনো তাদের ওপর নিবদ্ধ, কিন্তু তারা সেটা টেরই পেল না। জেইন সৌজন্য দেখিয়ে বলল,
​”চলো, আমরা বরং অডিটোরিয়ামের সামনের ওই ওপেন স্পেসটায় গিয়ে বসি। এখানে বড্ড ভিড়।”
​আনায়া আর আইজেল জেইনের প্রস্তাবে সানন্দে রাজি হয়ে গেল। এক নিমিষেই তারা তিনজন মিলে হাসাহাসি করতে করতে সেই জায়গাটি ত্যাগ করল। কেনীথ অপলক চোখে তাদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তাঁর হাতের প্লাস্টিকের বোতলটা সে এতটাই জোরে চেপে ধরল যে, বোতল বেঁকে আঙুলের গাঁটগুলো একনিমিষেই সাদা হয়ে গেল।

অডিটোরিয়ামের ভেতর তখন পিনপতন নীরবতা। হাজারখানেক মানুষের নিস্পৃহ উপস্থিতিতে স্টেজজুড়ে চলছে বর্ণিল আয়োজন। কিন্তু সেই আলোকচ্ছটা বা সুরের মূর্ছনা—কোনোটিই আনায়াকে স্পর্শ করতে পারছে না। সে নিজের সিটে বসে অনবরত উশপিশ করছে। তার পাশের আসনটি শূন্য, যা কিছুক্ষণ আগেও আইজেলের দখলে ছিল। সাবার একটি জরুরি কলে আইজেল তাকে একা রেখে চলে যাওয়ায় আনায়ার অস্থিরতা এখন চরমে। যদিও আনায়া নিজেও সাথে যেতে চেয়েছিল, তবে আইজেল তাকে এক বাক্যে থামিয়ে দেয়—
“চিন্তা করো না, যদি খুব প্রয়োজন পড়ে আমি তোমায় ফোন করে নেবো। আর বেশি দেরি করব না আমি, খানিক্ষণ বাদেই চলে আসব।তুমি প্রেশার নিও না।”
​আনায়া বারবার সামনের টিচার্স সেশনের দিকে তাকাচ্ছে। এতো এতো কালো কোট পরিহিত প্রফেসরদের ভিড়ের মাঝে কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে কি দেখা যাচ্ছে? সবার অবয়ব পেছন থেকে অস্পষ্ট, যেন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। দমবন্ধ করা এক অনুভূতি নিয়ে আনায়া শেষমেশ উঠে দাঁড়াল। এই গুমোট অডিটোরিয়ামে এক মুহূর্ত থাকাও যেন তার কাছে এখন পাহাড়সম বোঝা।

​অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে আনায়া বেলকনি দিয়ে হাঁটছিল। বড় বড় গ্লাসের জানালা দিয়ে বারবার ভেতরে নজর দিচ্ছিল—যদি কোনোভাবে সেই বড় আব্বুর ফুতের এর দেখা মেলে। ওদিকে আকাশে মেঘের ঘনঘটা, গুরুগুরু গর্জন জানান দিচ্ছে বৃষ্টির পূর্বাভাস। কিন্তু আনায়ার সেসবের ভ্রুক্ষেপ নেই, সে নিজের চিন্তার জগতে বিভোর।
​হঠাৎ করেই শক্তপোক্ত কোনো এক মানব অবয়বের সাথে তার জোরে ধাক্কা লাগল। ধাক্কার চোটে আনায়া টালমাটাল হয়ে পড়ল। নিচু দৃষ্টিতে শুরুতে কেবল কালো কোট আর স্যুটের আভিজাত্যই চোখে পড়ল। কোনো সম্মানিত প্রফেসর ভেবে সে অপরাধবোধে কুঁকড়ে গিয়ে মাথা নিচু করে বারবার বলতে লাগল,
​”সরি! সরি, আই অ্যাম রিয়েলি সো সরি! (এন্টশুলডিগুং! বিটে ফারজাইহেন জি মির!)
​কিন্তু চোখের পলকে নজর তুলতেই তার হৃদপিণ্ড যেন এক মূহুর্তের জন্য থেমে গেল। সামনে আর কেউ নয়, স্বয়ং প্রফেসর ভিকে দাঁড়িয়ে! অথচ এই মুহূর্তে আনায়ার কাছে কিসের প্রফেসর আর কিসের রকস্টার! এ তো কেবল তার স্বয়ং বড় আব্বুর ফুত! তার জানা-অজানার ভিড়ে জীবনের একমাত্র আরাধ্য পুরুষ।

কেনীথের হাতে একটি নতুন জলের বোতল, চোখে-মুখে সেই চিরচেনা শীতল গাম্ভীর্য। শান্ত অথচ তীক্ষ্ণ সেই দৃষ্টির গোলকধাঁধায় আনায়া মুহূর্তেই দিশেহারা হয়ে পড়ল। একই অবয়ব, অদ্ভুত সৌন্দর্যে ঢাকা নিকষিত চোখের মণিতে লালচে আবরণ, কাঁধ ছোঁয়া সেই ঝাকড়া চুল, বলিষ্ঠ দেহ কিংবা ফর্সা গায়ের বরণ—সবটাই তো তার চেনা। তবে কেন আজ সবকিছু এমন তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে? কেনীথের পুরু ঠোঁটজোড়ার দিকে তাকাতেই আনায়া তালগোল হারিয়ে শুষ্ক ঢোক গিলল। তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, এখন কেবল জ্ঞান হারানোই বাকি।
​কেনীথ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা বা কথা বলার কোনো প্রয়োজনীয়তাই বোধ করল না। সেই সহজাত অবজ্ঞা আর গুরুগম্ভীর ভাবমূর্তি বজায় রেখে সে সামনের দিকে পা বাড়াল। আনায়া যেন আকাশ থেকে পড়ল। লোকটা কি তাকে পাত্তাই দিল না? সত্যিই না? আজ যদি কথা না হয়, তবে হয়তো প্রতীক্ষার প্রহর আর শেষ হবে না। এই ধরা-ছোয়ার আড়ালে থাকা অদ্ভুত মানুষটার দহনে আজ-বাদে কাল ঠিকই জানে ম রবে সে।
​আনায়া সব জড়তা কাটিয়ে পেছন থেকে প্রায় আর্তনাদ করে অস্ফুটে ডাকল,

“এই যে শুনছেন! দুটো মিনিট কি আমাকে দেওয়া যায় না?”
​কিন্তু কেনীথ নির্বিকার। তাঁর হাঁটার গতিতে বিন্দুমাত্র শিথিলতা নেই। আনায়া বিস্ময়ে থমকে গেল। এতোটা অবজ্ঞা! নাকি লোকটা তার ভাষাই বুঝতে পারল না? এভাবে চলে গেলে তো অডিটোরিয়ামের জনসমুদ্রে সে আবারও হারিয়ে যাবে।
আনায়া অস্বস্তি ও চাপা উত্তেজনায় বাচ্চাদের মতো অদ্ভুত ভঙ্গিতে আঙুল কামড়াতে কামড়াতে ছটফট করতে লাগল। শেষমেশ সব সাহস সঞ্চয় করে পেশাদারত্বের দোহাই দিয়ে সে ডাকল,
​”প্রফেসর ভিকে! অ্যাজ এ স্টুডেন্ট, আই নিড টু টক টু ইউ। প্লিজ স্টপ!”
​মুহূর্তেই প্রফেসর রূপের গুরুগম্ভীর ভিকের বলিষ্ঠ পাজোড়া থেমে গেল। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা আনায়ার ঠোঁটের কোণে তখন জয়ের হাসি; দুগালে ফুটে উঠেছে ছোট-বড় দুখান মায়াবী টোল। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে গিয়ে কেনীথের সামনে দাঁড়াল। গ্রীক গডের জ্যান্তমূর্তি ন্যায় বলিষ্ঠ পুরুষের মুখপানে চেয়ে চাপা উত্তেজনায় অস্ফুটে আওড়াল,
​”প্লিজ, জাস্ট ফর অ্যা ফিউ মিনিটস?”

রাস্তার একপার্শ্বে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিকষ কালো চকচকে একখান মার্সিডিজ। বাইরের ঝিরঝিরে বৃষ্টির অস্পষ্ট শব্দ ছাপিয়ে গাড়ির অভ্যন্তরের নিস্তব্ধতা তখন এক প্রকার প্রগাঢ় গাম্ভীর্যে রূপ নিয়েছে। রক্তিম গাঢ় লাল রাঙা ভেতরের লেদার ইন্টেরিয়রের আভিজাত্যে ঘেরা সেই প্রকোষ্ঠে আনায়া তখন এক পঞ্জীভূত সংকোচ আর চাপা উত্তেজনার আবর্তে নিমজ্জিত। তার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় যেন বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে; ক্ষুদ্র হাত-পা অবশ ও আড়ষ্ট হয়ে আসছে। মনের অতল গহীনে জমানো অগাধ কথাগুলো কণ্ঠে এসে বারবার থমকে যাচ্ছে, সঠিক শব্দ আর সাহসের অভাবে পথ হারাচ্ছে। তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ নিজের কানেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেন এক অবাধ্য ঝড়ের পূর্বাভাস।
​পার্শ্বে হিমশীতল প্রস্তরখণ্ডের ন্যায় উপবিষ্ট কেনীথ। তার পুরুষালী ঘ্রাণ ও আনায়ার গায়ে মেখে থাকা চেরি ব্লাস্ট পারফিউমের সুগন্ধ—দুটো মিলে পুরো মার্সিডিজ জুড়ে একাকার।

কেনীথের সুতীক্ষ্ণ ও নিস্পৃহ দৃষ্টি সামনের প্রসারিত পথের ওপর নিবদ্ধ; যেন এই নিভৃত পরিসরে তার পার্শ্বে বসা রক্ত-মাংসের মানবীটির কোনো অস্তিত্বই নেই। আনায়া অনবরত উশপিশ করছে; চোরা চোখে বারবার কেনীথের অবয়বটি পরখ করছে, আবার পরক্ষণেই ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ত্রস্ত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিচ্ছে।
একজন ভার্সিটির সুপ্রতিষ্ঠিত গুরুগম্ভীর প্রফেসর তার স্টুডেন্টকে এভাবে নিজের গাড়িতে পাশে বসিয়ে রেখেছে কেবল স্টুডেন্টের দুটো কথা শুনতে—এটি আনায়ার কাছে নিতান্তই অকল্পনীয়। এরপরও কি বলা যায়, তাদের সম্পর্ক কেবল এক অপরিচিতা কিংবা স্টুডেন্ট-প্রফসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ!
নাকি কেনীথের এই গাম্ভীর্য পুরোটাই লোকদেখানো ভান? লোকটির এই নিশ্ছিদ্র অভিনয়ের দক্ষতা দেখে আনায়া মনে মনে যুগপৎ বিস্ময় ও সংশয় অনুভব করল।
​অবশেষে সমস্ত জড়তা ছিন্ন করে আনায়া সচকিতে কেনীথের দিকে মুখ ফেরালো।কিছু না ভেবেই, এক অজানা আবেগের বশবর্তী হয়ে মুখ ফস্কে প্রশ্ন করে বসল—
“আপনি বাংলা বলতে পারেন তো?”
​বলার পর মুহূর্তেই আনায়ার মনে হলো, এ কী হাস্যকর এক প্রশ্ন!কি বলার ছিল আর সে কি বলে ফেলল। কেনীথ একবার নিস্পৃহ দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে তাকালো, পরক্ষণেই নজর সরিয়ে নিল। এক প্রগাঢ় দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাদে নামানো গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিল,

“হুমম।”
​আনায়া অস্বস্তিতে চোখের পল্লব ঝাপটে মুখ ফিরিয়ে নিল। পুনরায় স্তব্ধতা। এবার কী বলবে সে? মনের অস্থিরতায় সে দ্বিতীয়বার বলে ফেলল,
“এসব কেথী…সরি, কেনীথ, ভিকে…এসব কেমন নাম? এগুলো আপনার সত্যি সত্যি নাম নাকি নিজে বানিয়েছেন?”
​আবারও ভুল প্রশ্ন করে ফেলেছে।নিজের নির্বুদ্ধিতায় আনায়া মনে মনে নিজেকেই ধিক্কার দিল। সজোরে চিৎকার দিয়ে মাথাটা ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করল। মনে মনে তীব্র বিরক্তি নিয়ে চাপা ভঙ্গিতে আওড়াল,
“ধুর বা*, এসব কি বকছি।”
কেনীথ অবশ্য তার সহজাত স্থৈর্য হারালো না। সম্মুখের পথে দৃষ্টি স্থির রেখেই শান্ত গলায় জবাব দিল,
“রিয়েল…”
​”কেনীথ মানে কী?” আনায়ার কৌতূহল তখনও অদম্য।
কেনীথ সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞায় ব্যাখ্যা করল,
“‘কেনীথ’ ইজ আ ম্যাসকুলিন নেম অব স্কটিশ অ্যান্ড আইরিশ অরিজিন, হুইচ জেনারেলি মিনস ‘হ্যান্ডসাম’, ‘বিউটিফুল’ অর ‘ফায়ার-বর্ন’—দ্যাটস্ মিন, অগ্নিলোক হতে জন্ম নেওয়া সুপুরুষ।”
|আগুন পাখি নামটা অনেকের কাছে ক্রিঞ্জ লাগে। লাগতেই পারে,তবে ঐ বয়সে এই নামের উৎপত্তি মূলত কেনীথ নামের অর্থ থেকেই তৈরি করেছিলাম। যদিও সেবার ফলাফল ডিম ছিল,এবার আশাকরি ভালো কিছু পাবেন|

​—“এ নাম কে রেখেছে?” আনায়ার জিজ্ঞাসু নেত্র।
—“বাবুশকা।”
—“সেটা আবার কি জিনিস?”
কেনীথের দৃষ্টি আনায়ার দিকে নয়। সে একবারেরও জন্যও আনায়ার দিকে মুখ ফেরায়নি। বরং ধীরকণ্ঠে উত্তর দিতে থাকল,
“নানী-মা; রুশ ফর্মেট!”
​আনায়া এবার সম্বিৎ ফিরে পেল। তার বড় আম্মু রাশিয়ান;সেই সূত্রে এই নামকরণের কারিগর কেনীথের নানী ওরফে বাবুশকা। নামের তাৎপর্য শুনে আনায়ার মনে হলো, লোকটির ব্যক্তিত্বের সাথে এর চেয়ে সার্থক ও জুতসই নাম আর হতে পারে না। অগ্নিজাত সুদর্শন সুপুরুষ—একদম যথার্থ বিশেষণ, যা তার সমগ্র সত্ত্বাকে সংজ্ঞায়িত করে। আনায়া অবচেতন মনেই এক ধরণের গূঢ় গর্ব এবং তীব্র মুগ্ধতা অনুভব করল।
যদিও এসব কোনো প্রফেসর-স্টুডেন্টের কথোপকথন হতে পারে কিনা কে জানে। তবে আনায়া একের পর এক উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করলেও, কেনীথ দৃষ্টি স্থির রেখে সংক্ষেপে প্রতিটা উত্তর দিচ্ছে।
​কিন্তু নাম-পরিচয়ের ঊর্ধ্বে গিয়ে যে কথাটি বলার জন্য আনায়ার হৃদয় ছটফট করছিল, সেটি যেন কিছুতেই বলা হয়ে উঠছে না।তার সমগ্র সত্ত্বা যেন এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য বলবেই বা কি?
‘আপনাকে আমার ভালো লাগে। আপনার জন্য আমি দিনে দিনে পাগল হয়ে যাচ্ছি”—এই সোজাসাপ্টা কথাটি কি বলা যায়?

নাকি বলা যায়—‘বিগত এক বছর যাবত আপনার বিরহে আমি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি। আপনাকে কল্পনা করতে করতে বেডরুম হতে বাথরুম অব্দি টেনে নিয়ে গিয়েছি। ছিঃ ছিঃ! তওবা! তওবা! এসবও কি বলা যায়?”
আনায়া মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করে শুষ্ক ঢোক গিলল। জানালার কাঁচে বৃষ্টির ছাঁটে বিরহী ছন্দপতন সৃষ্ট হয়েছে। আনায়া পুনরায় নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে অস্ফুটে বলে ফেলল,
​”মা আপনার সম্পর্কে আমায় সব বলেছে। আমরা দুজনে কাজিন। ছোটবেলায় আমাদের বিয়েও হয়েছিল; আপনি আমার বড় ভাই হোন!”
​বলার সাথে সাথে আনায়ার মুখমণ্ডল লোহিত বর্ণ ধারণ করল। মনে মনে জিভ কেটে সে কুঁকড়ে গেল,
‘আস্তাগফিরুল্লাহ! বিয়ে হলে উনি আমার ভাই হয় কীভাবে? এটা কি বলে ফেললাম আমি?’
​কেনীথ এবার পূর্ণ দৃষ্টিতে আনায়ার দিকে তাকালো। আনায়ার ওষ্ঠাধর তখন ভয়ে আর লজ্জায় কাঁপছে। সে তড়িঘড়ি করে নিজেকে সংশোধন করতে গিয়ে আরও বিভ্রম সৃষ্টি করল—

“না না, ভাই না। আই মিন… আপনি আমার বউ, আর আমি আপনার স্বামী… আ না না! আমি বউ, আপনি স্বামী… না, না,ওসবের কিছু না…আমি এসব বলতে চাইনি।”, আনায়ার কন্ঠরোধ হয়ে এল।
​কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে আবারও নজর সরিয়ে নিল। আনায়া আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। তার বুক দুরুদুরু কাঁপছে, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত ও ভারী হয়ে উঠছে।অতিরিক্ত অস্বস্তিতে সবকিছু গুলিয়ে ফেলে সে যখন নিজের গায়ের সেই লেদার জ্যাকেটটার দিকে দৃষ্টি দিল, তখন হঠাৎ এক নতুন ভাবনা তার মাথায় চেপে বসল। এই জ্যাকেটটা কেনীথকে ফিরিয়ে দেবার তার কোনো ইচ্ছে নেই, কিন্তু এই মূহুর্তে প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা উচিত।
সে দ্রুত জ্যাকেটটি গা হতে খুলে ফেলল। মুহূর্তেই উন্মোচিত হলো তার লতানো শরীরের প্রতিটি প্রলুব্ধ ভাঁজ। ফিনফিনে জামদানী শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে উন্মুক্ত হয়ে পড়ল তার হাতা বিহীন ফর্সা বাহু আর ব্যাকলেস ব্লাউজের সেই অনাবৃত কান্তি। তার শরীরের প্রতিটি সূক্ষ্ম কম্পনও নিষিদ্ধ আগুনত্তাপ ছড়াচ্ছে।
​আনায়ার অবশ্য সেদিকে কোনো হুঁশ নেই। তার লক্ষ্য অর্জনের তাড়নায় জ্যাকেটটি পরিপাটি করে ভাঁজ করে দুই হাতে কেনীথের দিকে বাড়িয়ে দিল,

“এটা আপনার। গতবার ঐ ঘটনার সময় আপনি আমাকে এটি দিয়েছিলেন। এতদিন এটা আমার কাছেই ছিল।”
আনায়া নতনেত্রে, থরথর করে কাঁপা হৃদয়ে প্রতীক্ষায় রইল। কেনীথ প্রথমে তার প্রসারিত, কামনার্ত হাতের দিকে তাকাল; তবে জ্যাকেটটি গ্রহণ করতে গিয়ে তার বলিষ্ঠ হাতখানি সামান্য প্রকম্পিত হলো, যা তার ভেতরের ঝড়কেও ইঙ্গিত দিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে এল, নাসারন্ধ্র স্ফীত হলো।
পার্শ্বে উপবিষ্টা রমণী তখন নববধূর ন্যায় নতমস্তকে শাড়ির আঁচল দিয়ে নিজেকে আবৃত করার এক ব্যর্থ-মরিয়া প্রয়াস চালাচ্ছে। অথচ তাতে তার লাবণ্যের, তার উর্বর যৌবনের প্রতিটি অংশ যেন আরও বেশি করে ভাস্বর, আরও বেশি করে আমন্ত্রণমূলক হয়ে উঠছে। জামদানির সূক্ষ্ম আড়ালে তার উন্মুক্ত লতানো-সরু কটিদেশ(কোমড়) কিংবা তার বুকের উত্থান-পতন ঢেউ কেনীথের পৌরুষে এক প্রচণ্ড বিড়ম্বনার সৃষ্টি করল। রক্তে যেন তার তপ্ত আগুন ধরে গেল।

​কেনীথের শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল,সবকিছু দমবন্ধকর মতে হতে লাগল। এক অসহ্য ও তীব্র দহন তার সমগ্র সত্ত্বাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। এমন এক দুর্ধর্ষ-রুদ্ধশ্বাস অনুভূতির উত্থান-পতন তার জীবনে আর কখনো আসেনি হয়তো; যা তার সমস্ত নীতি ও গাম্ভীর্যকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার উপক্রম করছে।
নিজেকে নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত ও প্রায় অসম্ভব চেষ্টা হিসেবে সে তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। জ্যাকেট ধরা হাতের মুঠোটি আরো দৃঢ়, প্রায় সাদা হয়ে এল। সে দ্রুত জলের বোতল বের করে অত্যন্ত অস্থির, তৃষ্ণার্ত ভঙ্গিতে পান করতে লাগল; যেন ভেতরের আগুন নেভানোর এক নিষ্ফল চেষ্টা। গলার টাইটা এক হ্যাঁচকায় টেনে কিঞ্চিৎ আলগা করে নিল।

এদিকে আনায়া সবেমাত্র নিজেকে সামলে নিয়েছে, ওমনি তার অবাধ্য নজর আঁড়চোখে কেনীথের উপর পড়ল। কালো শার্ট-টাইয়ের ফাঁক গলিয়ে দৃশ্যমান হয়েছে পৌরুষদীপ্তের সবচেয়ে আকর্ষণী বলে বিবেচিত অংশ।
পানি খাওয়ার তালে প্রতিটি ঢোকের সাথে সাথে কেনীথের অ্যাডামস অ্যাপেল দ্রুততর ওঠা-নামা করছে। আনায়া আড়চোখে কেনীথের এই অপ্রস্তুত অবস্থা দেখছিল; অচিরেই তার নিজের ভেতরের কা মনার আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। নিজেকে সামলাতে না পেরে বেচারীর ইচ্ছে করছে এক্ষুনি কেঁদে ফেলতে।
জল পান করার তালে কেনীথের সুদৃঢ় অ্যাডামস অ্যাপেল যখন ছন্দোবদ্ধভাবে ওঠানামা করছিল, আনায়ার সমস্ত চেতনা তখন বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম। তার সমগ্র সত্ত্বা এক অব্যক্ত যন্ত্রণায় ও তীব্র কা মনায় ছটফট করতে লাগল।
শ্বাসপ্রশ্বাস পুরোপুরি থমকে গেল, তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে চৌচির হলো। এক আদিম ও নিষিদ্ধ বাসনা তার সমগ্র অস্তিত্বকে গ্রাস করে নিল। অজান্তেই সে নিজের ঠোঁটজোড়া চেপে শুষ্ক ঢোক গিলল। কিঞ্চিৎ অশোভন ভাবনা-কায়দায় নিজের অধরের এককোণ কামড়ে ধরল।

তার মস্তিস্কে তখন এক অদ্ভুত, চূড়ান্ত কাম্য বাসনা ঘুরপাক খাচ্ছে—
‘ওই জলের বোতলের মুখপ্রান্তের পরিবর্তে, তার ওষ্ঠদ্বয় থাকলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো? লোকটা কি তার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা কখনোই বুঝতে পারবে না?’, তীব্র দহনে ঝলসে যাচ্ছে যে। সামান্য একটা পানির বোতলকেও এই মূহুর্তে তার ঈর্ষা হচ্ছে।আনায়ার মনে হলো লোকটাকে এখনই জাপটে ধরে তার সমস্ত গাম্ভীর্য চুরমার করে দেয়। একের পর দীর্ঘ চুম্বন একে দিতে মানুষটার ওষ্ঠধরে।
​এমন অযাচিত, তীব্র ও নি ষিদ্ধ কা ম্য ভাবনায় আনায়া নিজেই প্রচণ্ড কুণ্ঠিত ও ভীত বোধ করল। অথচ তার বেহায়া সত্ত্বা এই বাসনা ত্যাগ করতে পারছে না। তবুও নিজেকে সংবরণ করার সর্বোচ্চ ও প্রায় অসম্ভব শক্তি সঞ্চয় করে সে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

মহামায়া পর্ব ৩৬

মাথাটা পুরোপুরি নুইয়ে ফেলল। দুই হাতে শাড়ির আঁচল দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল। পেটের ভেতর কিসব যেন উড়ুউড়ু ছটফট করছে। অথচ সে নিজেকে পুরোপুরি সামলাতে পারছে না। নিথর, স্পন্দনহীন এক প্রাণ হয়ে বসে রইল; যেন এক ঝড় আছড়ে পড়ার পর প্রকৃতি শান্ত হয়ে গিয়েছে। তীব্র সংকোচ, লজ্জা এবং পঞ্জীভূত, অবর্ণনীয় কা ম্য চাপা উত্তেজনার মাঝে নিজেকে নিজে আশ্বস্ত করে মনে মনে আওড়াল,
​”কন্ট্রোল! আনায়া কি বাচ্চি, কন্ট্রোল ইউর সেলফ। এই আইটেম বো-ম শুধু তোর—শুধুই তোর!”

মহামায়া পর্ব ৩৮

1 COMMENT

Comments are closed.