মহামায়া পর্ব ৩৪
তুশকন্যা
মিউনিখের ক্যালেন্ডার হতে সপ্তাহখানেক দিনকাল নিঃশব্দে পেরিয়ে গেছে। তুষারপাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও শহরের হাড়কাঁপানো শীতলতা একবিন্দু কমেনি। শহরের নামী-দামী ইউনিভার্সিটিগুলোতে সেশন শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে।
সাবা নিজের ডিপার্টমেন্টে থিতু হয়ে গেছে; প্রতিদিন নিয়ম করে ক্লাসে যাচ্ছে, পড়াশোনায় মন দিয়েছে। কিন্তু আনায়ার জীবনে কোনো পরিবর্তন নেই। প্রথম দিন ক্লাসে যাওয়ার পর এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করেছে। আইজেলও যেন আনায়ার সংক্রামক বিষাদে গা ভাসিয়েছে; সে-ও একদিনের বেশি ভার্সিটির পথ মাড়ায়নি।
আনায়ার রাতগুলো কাটে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে। যে রাতে তার কাল্পনিক পুরুষ স্বপ্নের গহীনে ধরা দেয়, সে রাতে আনায়া নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। সেই অধরা মানবের কাছে সে তার জমানো হাজারো অভিযোগের ঝুলি খুলে বসে। কিন্তু যে রাতে সে দেখা দেয় না, সেই রাতগুলো আনায়ার জন্য বিভীষিকাময়।
আনায়ার পুরো জীবনের অধিকাংশ সময় একা একা কেটে গেলেও, আগে খরগোশ বানি’র সাথে খুনসুটি করে সময় কাটত। কিন্তু বানিকে তো দেশেই ফেলে আসতে হয়েছে। এখন সে বড্ড একা। পড়াশোনা কিংবা এই যান্ত্রিক দুনিয়ার কোনো কিছুতেই তার মন বসে না।
এদিকে সাবা আর আইজেলের মাঝে নতুন খুশির জোয়ার বইছে। গত দুদিন ধরে তারা যেন মাটিতে পা ফেলতে পারছে না। দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ব্লাডেন কনসার্টের অফিশিয়াল এনাউন্সমেন্ট চলে এসেছে। সর্বত্রে ব্লাডেনের ফ্যানবেজ এখন অগ্নুৎপাত ঘটাচ্ছে। সাবা তার বাবাকে বলে, অনেক সাধ্য-সাধনা করে তিনটি ভিআইপি টিকিটের ব্যবস্থা করেছে। একদম সামনের সারির টিকিট! আইজেল আর সাবা তো আনন্দে আত্মহারা, কিন্তু আনায়া ভাবছে উল্টোটা। এই হাড়কাঁপানো শীতের রাতে পাগলের মতো চিৎকার-চেঁচামেচির মাঝে যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট তার নেই। সে শুধু ভাবছে, কীভাবে এই কনসার্টটা এড়িয়ে যাওয়া যায়।
কিন্তু সময় তো কারো জন্য থেমে থাকে না। দেখতে দেখতে রবিবারের সেই রাতটিও ঘনিয়ে এল। মিউনিখের সবচেয়ে অভিজাত আর বিশাল এলাকা তথা অলিম্পিয়াপার্ক জুড়ে কনসার্টের আয়োজন করা হয়েছে। অলিম্পিয়াপার্ক হলো জার্মানির মিউনিখ শহরে অবস্থিত একটি বিশ্ববিখ্যাত বিশাল পার্ক। যা ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক গেমসের জন্য তৈরি করা হয়েও, পরবর্তীতে গেমসের পর এটিকে একটি পাবলিক পার্ক এবং বিনোদন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হয়। পার্কের ঠিক পাশেই আবার বিখ্যাত BMW-এর সদর দপ্তর এবং মিউজিয়াম অবস্থিত।
এছাড়া অলিম্পিয়াপার্কের প্রধান আকর্ষণ হলো এর স্টেডিয়াম,হল, কিংবা অলিম্পিয়া টাওয়ার;২৯১ মিটার উঁচু একটি টাওয়ার থেকে পুরো শহর এবং আল্পস পর্বতমালা দৃশ্যমান এবং অন্যান্য ভবনের ছাদগুলো তো রয়েছেই। এগুলো দেখতে অনেকটা বিশাল কাঁচ বা প্লাস্টিকের তাঁবুর মতো, যা স্টিলের তার দিয়ে ঝোলানো। এই ডিজাইনটি বিশ্বজুড়ে স্থাপত্যশিল্পের এক বিস্ময় হিসেবেই পরিচিত।
অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামে সাধারণত বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং বিখ্যাত ব্যান্ডগুলোর ওপেন-এয়ার কনসার্টের পাশাপাশি ফুটবল ম্যাচ,ব্যান্ড শো-ও হয়ে থাকে। তাই আজকের ব্লাডেনের কনসার্টের আয়োজনও এই স্টেডিয়ামেই করা হয়েছে। আর এই স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতাও প্রায় ষাট থেকে আশি হাজার অব্দি হওয়ায়,এটি বড়সড় আয়োজনের জন্য যথার্থ একটি স্থান।
যথারীতি নামকরা দেশবিদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর বিশালাকার এবং জাঁকজমকপূর্ণ কনসার্টকেও যেন আজ ব্লাডেনের আয়োজন হার মানিয়েছে।এবারের কনসার্ট ভেন্যুর মূল থিমই হলো ডার্ক লাক্সারি । চারপাশের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে ডার্ক রেড লেজার লাইটের ছড়াছড়ি। বিশাল বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে রক্তলাল অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে ‘VK’, ‘VPN’, ‘MR. HANS’ এবং ‘BLADEN’ সহ ইমানি বা ভ্যাম্পয়ার কেনীথের নানান রূপক চিত্র-বিশেষ। পুরো কনসার্ট এরিয়া সাজানো হয়েছে কৃত্রিম ভ্যাম্পয়ার উইংস আর রক্তের ছোপ লাগানো নানান প্রতিকী দিয়ে। সাধারণ কনসার্টের চেয়ে ব্লাডেনের কনসার্টের বিশেষত্বই এটা—রহস্যময় ভুতুড়ে আভিজাত্যে ঘেরা।
হাজার হাজার মানুষের ভিড়; হাতে হাতে গ্লো-স্টিক, আর সবার মুখে কেবল একটিই নাম—ব্লাডেন; নয়তো ভিকে,হান্স,ইমানি। কনসার্টের প্রবেশপথে বিশালাকার তোরণ তৈরি করা হয়েছে;যেথায় বিশাল আকারের কালো রঙের একজোড়া আগুন পাখি কিংবা ফিনিক্স পাখি ডানা মেলে আছে।কড়া সিকিউরিটি চেকপোস্ট থেকে শুরু করে ভিআইপি লাউঞ্জ—প্রতিটি জায়গায় আভিজাত্যের তীব্রতর বহিঃপ্রকাশ।
সাবা আর আইজেল কনসার্টের থিমের সাথে মিলিয়ে ডার্ক আউটফিট পরে সেজেছে। আনায়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাদের চাপে পড়ে একটা কালো ট্রেঞ্চকোট আর লাল মাফলার জড়িয়ে কনসার্ট ভেন্যুতে এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশের এই তীব্র উন্মাদনা তার মাথায় যন্ত্রণার উদ্রেক করছে। লাউডস্পিকারে বেজে ওঠা ড্রামের বিট তার হৃদস্পন্দনও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আনায়া ভিড়ের এককোণে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল,
‘মানুষ এমনও উন্মাদনা পছন্দ করে? আশ্চর্য!”
অলিম্পিয়া স্টেডিয়ামের সেই সুবিশাল প্রান্তর ততক্ষণে তপ্ত প্রবাহে রূপ নিয়েছে।হাজার হাজার মানুষের নিশ্বাসের উত্তাপে হাড়কাঁপানো শীতলতা যেন মুহূর্তেই উবে গেছে। কান ফাটানো হর্ষধ্বনি আর ড্রামের বিটের অপেক্ষায় থাকা উন্মত্ত জনতা অধীর আগ্রহে স্টেজের দিকে চেয়ে আছে। কারো উন্মাদনা-উত্তেজনার কমতি নেই। অথচ আনায়া শুরুতেই হাঁপিয়ে উঠেছে। একের পর এক যান্ত্রিক ঘোষণা আর লেজার-শোর পর অবশেষে সেই কাঙ্খিত মূহুর্ত ঘনিয়ে এল।
মঞ্চের বিশাল ডিজিটাল পর্দায় রক্তলাল অক্ষরে ধীরগতিতে ফুটে উঠল— ‘ BLOØDEN IS BACK’।
পুরো স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে এক গুরুগম্ভীর ভরাট কণ্ঠে ঘোষণা হলো,
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, প্লিজ ওয়েলকাম দ্য সোল অফ ব্লাডেন—মিস্টার হান্স অ্যান্ড দ্য গ্ল্যামারাস কুইন, ইমানি!”
মুহূর্তেই স্টেজের নিচ থেকে ফায়ারওয়ার্কসের তীব্র আলোকচ্ছটা আর কৃত্রিম ধোঁয়ার কুণ্ডলী চিরে উদয় হলো দুজন। পাভেলের পরনে কুচকুচে কালো লেদার জ্যাকেট, ভেতরে স্লিভলেস ডার্ক টি-শার্ট আর হাতে ধরা তার সিগনেচার নীলচে-কালো ইলেকট্রিক গিটার। তার বলিষ্ঠ শরীরের ঘামগুলো ডার্ক রেড লাইটের নিচে মুক্তোর মতো চকচক করছে। পাশে দাঁড়িয়ে ইমানি—তার সেই বিধ্বংসী আভিজাত্য আজ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। পরনে গাঢ় লাল রঙের বডিকন ড্রেসের সাথে কালো জ্যাকেট জড়ানো। চুলগুলো পোনিটেল আকারে উঁচুতে বাঁধা; ঠোঁটে র”ক্তবর্ণ লিপস্টিকের কড়া প্রলেপ।
এক মূহুর্তেই পুরো দর্শকমহল ফেটে পড়ল গগনবিদারি চিৎকারে— “হান্স! হান্স! ইমানি!”
সাবা আর আইজেল তখন উত্তেজনার চরম শিখরে। সাবা নিজের গলার শেষ শক্তি দিয়ে চিৎকার করছে, আর আইজেলও যেন নিজের হুঁশ হারিয়েছে। কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে আনায়া একদম স্তব্ধ; হতভম্ব। সবার এমন কান্ডকারখানা দেখে তার মাথা ঘুরছে।
কিন্তু এরিমধ্যে তার নজরে বিশেষ কিছু ধরা দিল। তার তীক্ষ্ণ নজর স্টেজের ওপর থাকা সেই গিটার হাতে দাঁড়ানো পুরুষটির দিকে নিবদ্ধ হলো। মানুষটার দাঁড়ানোর ভঙ্গি, তার শারীরিক গঠন কিংবা বিশেষত সেই কোঁকড়ানো চুল—কেন জানি আনায়ার অবচেতন মনে এক প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করছে।
আনায়া ভিড়ের প্রবল ধাক্কা সামলে আইজেলের কানের কাছে মুখ নিয়ে জোড়ালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আইজেল! ঐ লোকটার নাম কী?”
আইজেল তার উন্মাদনার মাঝে কোনোমতে উত্তর দিল,
“আরে উনি? উনি তো মিস্টার হান্স! ওনার পুরো নাম এস.পি. হান্স।”
আনায়া কিছুক্ষণ বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল। হান্স নামটা তার পরিচিত বলয়ের সাথে ঠিক মিলছে না; তবুও মানুষটার অবয়ব তার চোখের কোণে ভাসা কোনো এক আবছা স্মৃতির সাথে অবিরত যুদ্ধ করছে। সে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল,
“না, এটা নিছক মনের ভুল। এই বিশ্বখ্যাত মানুষজন আমার পরিচিত কেউ হতে যাবে কেন?”
ঠিক তখনই পাভেলের গিটারের তারে এক মরণপণ ঝংকার উঠল। সেই সুরের জাদুতে মুহূর্তেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল পুরো প্রান্তর। ইমানি তার গম্ভীর অথচ মায়াবী কণ্ঠে গাইতে লাগল; জার্মান ডার্ক-পপের এক অনন্য সুর-লহরী ছড়িয়ে পড়ল স্কয়ারের প্রতিটি প্রান্তরে….
“ইন ডের ডানকেলিগকেইট ডেস লাইডেন্স, বাই ইশ ডাইন শ্যাটেন…”
ইমানি থামতেই পাভেল যুক্ত করল,
“মাইন হার্জ ইস্ট কেইন স্পিলজুগ, ডাস ডু ব্রেখেন কানস্ট!”
ইমানির গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর পাভেলের গিটারের উন্মত্ততা, পুরো মিউনিখকে একনিমিষেই সম্মোহনী জালে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলল। পাভেল গিটার বাজাতে বাজাতে স্টেজের একদম কিনারায় এসে দাঁড়াল। তার পেশিবহুল হাত নেড়ে দর্শকদের ইশারা করতেই সামনের সারির মানুষগুলো যেন দিকভ্রান্ত হয়ে উঠল। সাবা আর আইজেল তখন ঘোরের মধ্যে হাত নাড়াচ্ছে।পুরো কনসার্ট ভেন্যুর আবহ তখন এক অদ্ভুত রহস্যময় জালে ঢাকা পড়েছে।
একদিকে ডার্ক রেড লাইটের মায়াবী কারসাজি, অন্যদিকে ব্লাডেনের সেই হাড়-কাঁপানো সুর। তবে সবার অবচেতন মনে তখনো একটিই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—রকস্টার ভিকে কোথায়? ভ্যাম্পায়ার কেনীথ কি আজ সত্যিই ধরা দিবে? নাকি অধরা হয়ে আজও সবার প্রত্যাশার আড়ালে রয়ে যাবে।
কনসার্টের উত্তেজনা এখন মধ্যগগনে। সময় যেন মিউনিখের হিমশীতল বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে বয়ে চলছে। পাভেল আর ইমানির একের পর এক বিধ্বংসী পারফরম্যান্সে স্কয়ারের প্রতিটি ধূলিকণা যেন কম্পিত।
ঘড়ির কাঁটা যখন রাত বারোটার কাছাকাছি, ঠিক তখনই হঠাৎ পুরো মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। নিভে গেল চারপাশের বিশালাকার সব লেজার লাইট। এক নিমিষে কয়েক হাজার মানুষের শোরগোল থেমে গিয়ে এক গা-ছমছমে নিস্তব্ধতা নেমে এল।
গান শেষ করে ইমানি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিল। বড় পর্দায় তার সেই উদ্ধত সুন্দর চেহারা ভেসে উঠতেই পুরো প্রান্তরে হর্ষধ্বনি বয়ে গেল। সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল,
“দিস ইজ জাস্ট আ টিজার। গেট রেডি ফর দ্য রিয়েল শো!”
মূহুর্তেই স্টেজের পেছনের বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে হঠাৎ রক্তলাল অক্ষরে ফুটে উঠল—
‘THE REIGN BEGINS IN…’।
ইমানি আর পাভেল তখন স্টেজের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে। পাভেল হাঁপিয়ে ওঠা কণ্ঠে মাইক্রোফোন আঁকড়ে ধরে বলে উঠল,
“আর ইউ রেডি ফর আওয়ার রিয়েল মনস্টার?
পাভেল গিটারের তারে একটি শেষ ঝংকার তুলে আবারও চিৎকার করে উঠল,
“কাউন্টডাউন স্টার্টস নাউ!”
পুরো স্টেডিয়ামের মানুষ তখন একসুরে চিৎকার শুরু করল। বোঝা হয়ে গিয়েছে, তারা দুজনর কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্ক্রিনে বিশালাকার হরফে শুরু হলো সেই কাঙ্খিত মূহুর্ত,
10…9…8…7…6…5…4…3…2…1…0
ঠিক বারোটা বাজার সাথে সাথে এক প্রচণ্ড শব্দে স্টেজ থেকে আগুনের হলকা আকাশপানে ছুটে গেল। কৃত্রিম ধোঁয়ার ঘন কুণ্ডলী চিরে স্টেজের একদম মাঝখানে হাইড্রোলিক লিফটে করে উঠে এল এক দীর্ঘদেহী ছায়া।
রকস্টার ভিকে! তার উপস্থিতি মাত্রই পুরো স্টেডিয়াম যেন এক লহমায় নরক গুলজার হয়ে উঠল। হাজার হাজার মানুষের সমবেত চিৎকার,
“ভিকে! ভিকে! ভিকে!”—শব্দধ্বনি আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে দিচ্ছিল। কেনীথ আজ তার পূর্ণ রাজকীয় সাজে। পরনে কুচকুচে কালো দামী লেদার জ্যাকেট, ভেতরে কালো টিশার্ট; বাম হাতে লাল-কালো কম্বাইন্ডের লেদার গ্লাভস। পরনে ডার্ক ডেনিম আর পায়ে কালো লেদার বুট। বাম হাতের কব্জিতে সেই সিগনেচার ব্রেইডেড ব্রেসলেটটিই কেবল, ডার্ক রেড লাইটে চকচক করছে। অবিন্যস্ত কোঁকড়ানো চুলগুলো কপালের ওপর আছড়ে পড়েছে; চোখের সেই কালচে লাল চাহনি সরাসরি ভক্তদের আত্মা বিদীর্ণ করছে।
কেনীথ মাইক্রোফোন স্ট্যান্ডটা শক্ত করে ধরল। লাল-কালো গিটারের স্ট্র্যাপটা ঘাড় হতে খানিক ঠিক করে নিল। তার দীর্ঘ বলিষ্ঠ দেহটা এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। চারদিকের এই উন্মাদনা তাকে স্পর্শ করছে কি না বোঝা দায়, কারণ তার মুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাবমূর্তি অটুট। সে ধীরে ধীরে গাঢ় লাল রঙের মাইক্রোফোনটা মুখের কাছে আনল।
তীব্র চিৎকারের মাঝে কেনীথের গম্ভীর, হাস্কি কণ্ঠস্বরটি ইথারে ভেসে এল,
“মিউনিখ… লেট দ্য নাইট কনজিউম ইউ।”
কথাটা শেষ করেই সে গিটারের তারে এক মরণপণ টান দিল। সাথে সাথে ড্রামের প্রচণ্ড বিট আর ইলেকট্রিক গিটারের উন্মাদনায় শুরু হলো তার গান। বিখ্যাত রক ব্যালাডের সুরে কেনীথ গেয়ে উঠল,
”I wanna be your slave, I wanna be your master
I wanna make your heartbeat run like rollercoasters
I wanna be a good boy, I wanna be a gangster
‘Cause you could be the beauty and I could be the monster
I love you since this morning, not just for aesthetic
I wanna touch your body, so fucking electric
I know you’re scared of me, you say that I’m too eccentric
I’m crying all my tears and that’s f**king pathetic______’
শুরুতেই এই গান গাওয়ায় পাভেল কিঞ্চিৎ থতমত খেলো। মনে মনে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“ভাই আজ পুরো মুডে আছে দেখছি।”
ওদিকে সবার গগণবিদারী চিৎকার আর কানের কাছে কান ফাটানো মিউজিকের যন্ত্রণায় আনায়া শুরুতেই দুই হাতে কান চেপে চোখ-মুখ শক্ত করে খিঁচে বুঁজে নিয়েছে; শব্দগুলো যেন তার মস্তিষ্ক ছিঁড়ে ফেলছে। কিন্তু ঠিক যখন কেনীথের সেই গভীর, খাদে নামা হাস্কি কণ্ঠস্বর শুনতে পেল—আনায়া এক অদ্ভুত বৈদ্যুতিক শকের ন্যায় কেঁপে উঠল।
তার চোখ জোড়া নিমিষেই খুলে গেল। বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে খালি হয়ে গেল তার। এই কণ্ঠস্বর! এই তীক্ষ্ণতা আর গভীরতা… এ যে তার বড্ড চেনা। প্রতিদিনের নির্ঘুম রাতে যে পুরুষটি তার কল্পনার জগতে শাসক হয়ে শাসন করে, যার সাথে সে তার মান-অভিমানের হাজারো কথা বলে—এ তো সেই মানুষ!
আনায়া পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। হাজার হাজার মানুষের ধাক্কাধাক্কি আর আলোর ঝলকানি যেন তার চারপাশ থেকে মুছে গেল। স্টেজের ওপর থাকা সেই রক্তলাল আলোর বৃত্তে কেনীথকে আজ বড্ড অতিপ্রাকৃত মনে হচ্ছে। আনায়া বিড়বিড় করে আওড়াল,
“অসম্ভব! এই কণ্ঠ… এটা কি করে হতে পারে?”
ঠিক সেই মুহূর্তে কেনীথ গান গাইতে গাইতে হঠাৎ সামনের সারির দিকে দৃষ্টি ফেরাল। আনায়ার দৃষ্টিতে কেনীথের অবয়ব স্পষ্ট হলেও, কেনীথের কাছে সারিবদ্ধ মানুষগুলো কেবলই অস্পষ্ট মানবছায়া। তবুও তার দৃষ্টি সে অন্ধকারেই নিবদ্ধ হয়েছে। এরিমধ্যে ডার্ক রেড লেজার লাইটের একটি ক্ষীণ রেখা কেনীথের চোখের মণি হয়ে সরাসরি গিয়ে পড়ল আনায়ার ফ্যাকাশে মুখমন্ডলের ওপর। এক বছরের ব্যবধানে, হাজার মাইল দূরে—দুই জোড়া চোখ আবারও একে অপরের অস্তিত্ব খুঁজে পেল। আনায়ার নিশ্বাস যেন গলায় আটকে গেল। এ কি সত্যিই তার সেই হারিয়ে যাওয়া কাল্পনিক পুরুষ, নাকি বাস্তবের কোনো ভয়ংকর সুন্দর বিভীষিকা?
কেনীথের দৃষ্টি সম্মুখের সারির দিকে নিবদ্ধ থাকলেও, স্টেজের নিচের গাঢ় অন্ধকারে আনায়ার অবয়ব সুস্পষ্টভাবে তার নজরে ধরা দেয়নি। অথচ, এক অদ্ভুত, দৈবশক্তির ন্যায় আকর্ষণ তাকে বারবার বাধ্য করছিল ওই নির্দিষ্ট দিকটিতেই তাকাতে। যেন কোনো অদৃশ্য সুতো তাকে ওই অন্ধকারের গহীনে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
কেনীথ গান গাইতে শুরু করেছিল একটি হার্ট-থ্রবিং ইংরেজি রক ব্যালাড দিয়ে। গিটারের তারে আঙুল বোলাতে বোলাতে তার সেই হাস্কি কণ্ঠস্বর পুরো অলিম্পিয়াপার্ককে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। কিন্তু হঠাৎ করেই, কোনো এক অজানা আবেগের বশবর্তী হয়ে সে সুর পরিবর্তন করল। ইংরেজি গানের ধারার মাঝেই হুট করে তার কণ্ঠে ফুটে উঠল আরো এক চেনা সুর; হিন্দি-বাংলা মিশ্রিত গানের লিরিক্স,
‘মিলনে হ্যায় মুঝসে আয়ি,
ফির জানে কিউ তানহাই____
কিস মোড় পে হ্যায় লায়ি আশিকি,
ও~ওহো_______’
স্তব্ধ আনায়া শিউরে উঠল। কেনীথের কণ্ঠস্বর হিন্দি থেকে অনায়াসে বাংলা লিরিক্সে প্রবেশ করল; প্রতিটি শব্দ যেন তার আত্মার গভীর থেকে উঠে আসছে,
‘ঘুরেফিরে, ঘুমের ভেতরে… জেগেছে রাত কারচুপি করে____
চিনেছে রোদ সাতরঙা আলো… ভরা বিকেল ইচ্ছে পাঠালো_____!
জানতে কি বাকি আর কারও?
মানতে কি প্রমাণ চাই আরও?
গালে, চোখে, ঠোঁটে তোর আমি… চুমু এঁকেছি সবচেয়ে দামি_____’
আনায়া যেন এক মুহূর্তেই জ্যান্ত পাথরে পরিণত হলো। তার পুরো জগত স্তব্ধ হয়ে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের ন্যায় দাঁড়িয়ে থাকা আনায়ার চোখের সামনে অচিরেই ভেসে উঠল এক বছর আগের সেই দুর্ধর্ষ রাতের জ্বলজ্বলে দৃশ্য। সেই গভীর জঙ্গলে,বৃষ্টিসিক্ত রাতে একাকী রেখে যাওয়ার পথে তার কাল্পনিক পুরুষ—যাকে সে আজও মনে মনে খুঁজে বেড়ায়—সে তার চোখে, গালে এবং-কি ঠোঁটে ঠিক এভাবেই চুমু এঁকেছিল।
‘জানে কিউ ম্যায়,সোচতা হু
খালি সা ম্যায়,এক রাস্তা হু
তুনে মুঝে,কাহি খো দিয়া হ্যায়____
ইয়া ম্যায় কাহি,খুদ লাপাতা হু
আ ঢুড লে তু ফির মুঝে______
কসমেই ভি দু তো ক্যা তুঝে,
আশিকি বাজি হ্যায় তাশ কি……………..’
সেই পুরোনো স্মৃতির বিস্ময়কর দৃশ্য আজও আনায়ার স্মৃতির ঘায়ে জ্যান্ত হয়ে উঠল। কেনীথ হয়তো অজান্তেই গানগুলো মিলিয়ে-সাজিয়ে নিজের মনমর্জি গাইছে; কিন্তু আনায়ার মনে হলো, পুরো গানের প্রত্যেকটি পঙক্তি, প্রতিটি শব্দ এই সহস্রাধিক মানুষের ভিড়ে কেবল তাকেই উৎসর্গ করছে।
আনায়ার শরীর ক্রমশই অবশ হয়ে এল। হাতপায়ে যেন বিন্দুমাত্র বল পাচ্ছে না সে। স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকাও দুষ্কর হয়ে উঠছে। চোখের পলক পড়ছে না, স্তম্ভিত দৃষ্টি কেবল এই অচেনা দেশে, কাল্পনিক পুরুষের বাস্তবিক রূপ অবয়বের ওপর নিবদ্ধ।
এরিমধ্যে রকস্টার ভিকে বা ভ্যাম্পায়ার কেনীথ খ্যাত সেই পুরুষের কণ্ঠস্বর হঠাৎ থেমে গেল। গাইতে গাইতেও অদ্ভুত এক টান অনুভূত হলো তার মাথার পেছনে। এক তীব্র যন্ত্রণার ঝলকানি যেন তার মস্তিষ্ক ভেদ করে গেল এক মূহুর্তে মাঝেই। সে হাতের রক্ত-লাল রাঙা মাইক্রোফোনটা নামিয়ে নাকের কাছে ধরে মাথা নুইয়ে ফেলল। শুরুতে কেউই কিছু বুঝতে পারল না। অবশ্য কেনীথ নিজেই যেন তার এই আকস্মিক অস্থিরতার কারণ কাউকে বুঝতে দিল না।
তবে ইমানি আর পাভেল বিষয়টা ক্ষীণ টের পেয়েই বিচলিত হয়ে উঠল। তারা স্টেজের পেছনে থেকে কিছুটা এগিয়ে আসতে চাইল কেনীথের দিকে। ওমনি সে মূর্তিমান হয়ে পুনরায় জোর গলায় গাইতে শুরু করল; যেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে,
‘There’s parts of me I cannot hide (cannot hide)
I’ve tried and tried a million times (ooh)
La-da-da-di-da, la-da-da-di-da
La-da-da-di-da-da
Cross my heart and hope to die
Welcome to my darkside_______’
গাইতে গাইতেই যখন সে আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠল, ওমনি গা হতে সেই দামী লাল-কালো রক-গিটারটা কোনোমতে খুলে নিচে ছুঁয়ে ফেলল। পুনরায় সে পুরোদমে গাইতে শুরু করল। হুট করেই যেন পুরোনো রকস্টার ভিকের উগ্র-ক্ষিপ্ত সত্তা তার মাঝে ভর করেছে। উম্মাদ হয়ে উঠেছে সে,একইসাথে উম্মাদ হয়েছে তার ভক্তগণ।
আর এতেই ইমানি বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। ভিকে হঠাৎ এমন পাগলামি কেন করছে? এই মূহুর্তে স্টেজে কোনো অঘটন ঘটে গেলে, এক বিতিকিচ্ছিরি কাহিনি বেঁধে যাবে। সে পাভেলের দিকে তাকালে দেখল, পাভেলও চিন্তিত মুখে কেনীথের দিকে চেয়ে আছে। অন্যদিকে আনায়া কিছু বুঝেও বুঝে উঠতে পারছে না। মাথার মধ্যে একরাশ অস্থিরতা ঘুরপাক খাচ্ছে, অন্যদিকে চোখের সামনে রহস্যময় মানুষটার হঠাৎ অদ্ভুত আচরণ—কোনোটাই তার বোধগম্য হচ্ছে না।
স্টেজের ওপর ভিকের উন্মাদনা তখন চরম শিখরে পৌঁছেছে। গিটারটি প্রলয়ংকরী শব্দে ছুঁড়ে ফেলার পর সে মুহূর্তকাল স্থির হয়ে দাঁড়াল। চারপাশের অত্যাধুনিক হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরাগুলো তাকে প্রতিটি কোণ থেকে ঘিরে ধরেছে, আর বিশালকার ডিজিটাল স্ক্রিনগুলোতে ফুটে উঠছে তার সেই ঘর্মাক্ত, রূঢ় আকর্ষণীয় মুখাবয়ব। ইমানি আর পাভেল মঞ্চের একপাশে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে; কেনীথের এই আকস্মিক বন্য আচরণ তাদের তীব্র সংশয়ে ফেলে দিয়েছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই কেনীথ আবারও লাল মাইক্রোফোনটা শক্ত করে চেপে ধরল। সে সুর তুলল তার সেই চিরচেনা সিগনেচার গানের পঙতি ধরে,
‘ও ভ্রমর রেএএএএ_____’
তীব্র সুরে টানা এই প্রথম পঙক্তিটি পুরো স্কয়ারের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আনায়ার কানে আছড়ে পড়ল; অচিরেই সে অজানা শিহরণে শিউরে উঠল। তার মেরুদণ্ড দিয়ে বসে গেল হিমশীতল স্রোত।
অন্যদিকে সুরের দীর্ঘ টানে ভিকের শরীরী ভাষায় এক অদ্ভুত বিবর্তন দেখা গেল। তার পিঠটা পেছনের দিকে ধনুকের ন্যায় ধনুকাকার হয়ে বেঁকে গেল। মাইক্রোফোন ধরা ডান হাতটা সে আকাশপানে উঁচিয়ে ধরল, যেন সে অনন্তের দিকে চেয়ে কোনো এক হারানো আত্মাকে আবাহন করছে; ডেকে চলেছে এক অধরা সত্তাকে।এই তীব্র সুরটি শেষ করে সে যখন পরবর্তী পঙক্তি গাওয়ার জন্য ধীরে ধীরে পুনরায় সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখনই এক অদ্ভুত বিপত্তি ঘটল।
কেনীথ স্পষ্টত অনুভব করল তার দৃষ্টি আকস্মিক ঝাপসা হয়ে আসছে। চারপাশের সহস্রাধিক মানুষের ভিড়, ডার্ক রেড লাইটের ঝলকানি—সবকিছুই যেন এক কুয়াশাচ্ছন্ন গোলকধাঁধায় পরিণত হচ্ছে। সে টাল সামলাতে পাশের মাইক্রোফোন স্ট্যান্ডটা শক্তহাতে আঁকড়ে ধরল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। অবচেতন মনেই সে মাইক্রোফোন ধরা হাতটি নিজের নাকের কাছে ছোঁয়াতেই অনুভব করল এক উষ্ণ তরল পদার্থের স্পর্শ। অন্ধকার আর রক্তলাল আলোর মায়াবী খেলায় সেই তরলকে কালচে মনে হলেও, কেনীথ এক লহমায় বুঝে গেল—এটা রক্ত।
নাসিকা দিয়ে গড়িয়ে আসা এই উষ্ণ ধারা তাকে জানান দিচ্ছে, তার শারিরীক অবনতির কথা। তবুও সে থামল না। অমানুষিক দৃঢ়তায় নিজেকে সামলে নিয়ে সে পুনরায় গানের সুর ধরল। তার কণ্ঠস্বর হতে নির্গত হলো বিচ্ছেদের চিরন্তন আর্তিরূপ,
”শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে রাধা অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে…”
এবার আর আনায়ার মনে কোনো সংশয় রইল না। ঠিক এক বছর আগে, কালরাত্রিতে বদ্ধঘরে অবিকল এই কণ্ঠস্বরে, এই জাদুকরী আর্তনাদেই গানটি গাইতে শুনেছিল সে। হুবহু এক—সেই হাহাকার, সেই দহন।
আনায়া তখন কাঁপাকাঁপা স্বরে আইজেলের হাত খামচে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কান্নায় বুজে আসছে, তবুও অমানুষিক চেষ্টায় সে আওড়াল,
“আইজেল! তুমি তো বলেছিলে ওনার নাম ভি…ভিকে…!”
চারপাশের গগনবিদারী চিৎকারে আইজেল প্রথমবার কথাটি শুনতে পেল না। সে কান পেতে শোনার চেষ্টা করে চিৎকার করে বলল,
“হুম… ভিকে! ভ্যাম্পায়ার কেনীথ! কেন, কী হয়েছে?”
আনায়া কোনোমতে নিজেকে সামলে দ্রুততর স্বরে প্রশ্ন করল,
“উনি কি জার্মান? জার্মান হলে এতোটা শুদ্ধভাবে বাংলা কীভাবে গাইছেন? ওনার সম্পর্কে আর কিছু জানো তুমি? জানলে…প্লিজ বলো!”
আইজেল কিছুটা অবাক হয়ে উত্তর দিল,
“তেমন কিছু তো কেউ জানে না ! ব্লাডেনের প্রত্যেকটা মেম্বার নিজেদের প্রাইভেসি নিয়ে বড্ড সচেতন। তবে হ্যা, ভিকে জার্মান কিংবা কোনো ইউরোপিয়ান নয়। শুনেছি ভিকে একজন এশিয়ান। আর ওনার মা সম্ভবত একজন রাশিয়ান… এইটুকুই জানি। কিন্তু তুমি হঠাৎ এমন করছো কেন? তোমায় বেশ অন্যরকম লাগছে আনায়া, তুমি ঠিক আছো তো?”
অন্ধকার আর লালচে আলোয় সবটা স্পষ্ট নয়, তবুও আইজেলের মনে হলো আনায়ার মুখটা একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে মঞ্চের সেই দীর্ঘদেহী মানুষটার ওপর। আনায়ার কোনো উত্তর না পেয়ে আইজেল চিন্তিত মুখে তার কাঁধে হাত রেখে আবারও বলল,
“আনায়া! কী হয়েছে তোমার? আর ইউ ওকে?”
আনায়া সম্বিত ফিরে পেল। দ্রুত নিজের চোখের কোণ মুছে নিজেকে সামলানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করল। ধরা গলায় বলল,
“না, কিছু না। ঠিক আছি আমি।”
আইজেল আশ্বস্ত হয়ে পুনরায় মঞ্চের দিকে মনোযোগ দিল, কারণ কেনীথ তখন তার শেষ সুরটি ছড়িয়ে দিয়ে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাদবাকি সকলেও জানে, তাদের ভিকে’র এই গান শেষ হওয়া মাত্রই সে এখান থেকে প্রস্থান করবে। হয়তো আগের মতো ভিকে দীর্ঘসময় তাদের সাথে রইল না, তবে যেটুকু সময় থেকেছে এটাই যেন তাদের সৌভাগ্য।
অথচ এদিকে আনায়ার চোখ বেয়ে অনবরত অবাধ্য অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। সে কোনোমতেই এই কান্না থামাতে পারছে না। কেন কাঁদছে সে? কষ্টের তীব্রতায় নাকি প্রাপ্তির বিষাদে? সে জানে না। তবে সে আজ এক বিরাট সত্যের মুখোমুখিতে দাঁড়িয়ে। যে মানুষটা দীর্ঘ একটা বছর তাকে প্রতি রাতে কাঁদিয়েছে, যাকে সে কেবল ধোঁয়াশাচ্ছন্ন স্মৃতিতে খুঁজেছে—আজ সে তাকেই নিজের চোখের সামনে জীবন্ত দেখছে।
মহামায়া পর্ব ৩৩
কিন্তু কী অদ্ভুত নিয়তি! মানুষটা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয়ে, এক অচেনা নামে আর এক অতিপ্রাকৃত আভিজাত্যে তার সামনে দাঁড়িয়ে। ভিকে আর সেই কাল্পনিক পুরুষ—দুটো সমান্তরাল রেখা আজ এক বিন্দুতে এসে মিলে গেছে। অথচ আনায়ার কাছে সবটাই বিস্ময়কর কল্পনা মনে হচ্ছে। আনায়া কান্না চেপে, অস্ফুট স্বরে নিজের মনেই বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“আপনি… আপনিই কি তবে আমার সেই অভিশপ্ত সুন্দর অতীত?”
