Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৩৩

মহামায়া পর্ব ৩৩

মহামায়া পর্ব ৩৩
তুশকন্যা

আনায়ার কথা শুনে সাবা আর দুরে আইজেল যেন হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল। আইজেল নিজের হাসির বেগ সামলে নিয়ে আনায়ার বিছানায় ধপ করে বসল। তার সিল্কি চুলগুলো কাঁধের একপাশে সরিয়ে নিয়ে চমৎকার বাংলা উচ্চারণে বলল,
“আরে কিউট গার্ল! ভিকে কোনো কাল্পনিক চরিত্র নয়। ওটা তার ব্যক্তিত্বের জন্য দেওয়া একটা নাম; আসলও হতে পারে,যেহেতু আর তো কোনো নাম আমরা জানিনা। ঘটনা হয়েছে ভিকে মানুষটা বড্ড বেশি রহস্যময়,একটু অদ্ভুতও বটে। তার পছন্দের সবটুকুই জুড়ে আছে ডার্ক রেড কিংবা রক্তের মতো গাঢ় রঙ। তার ওই মোহময় লালচে চোখের চাহনি আর অদ্ভুত ওয়াইল্ড ডেসিন্সি দেখলেই মনে হবে সে এই পৃথিবীর বাইরের কেউ। তাই তো ভক্তরা তাকে ভালোবেসে ভ্যাম্পয়ার কেনীথ বা ভিকে বলে ডাকতেই বেশি পছন্দ করে।”
​আনায়া এবার কিছুটা বোঝার চেষ্টা করল। সে মাথা নেড়ে আলতো করে বলল,
“ওহ! এই ব্যাপার। কনসার্টের কথা যে বলছিলে,তোমরা যাবে?”

—“যাবো না মানে, অবশ্যই যাবো, সাথে তোমাকেও নিয়ে যাবো। কিন্তু যদি টিকিট পাই তো তবে…”
আইজেলের কথা শেষ হতে না হতেই, সাবা বলে উঠল,
“ও ব্যাপার না, বাবাকে বলে ম্যানেজ করে নেবো। কিন্তু আরেকটা সমস্যা আছে।”
—“কি?”, আইজেল জিজ্ঞেস করল।
​সাবার হাসিমুখটা এবার খানিকটা মলিন হয়ে এল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “
“এখনো নিশ্চিত নই যে, আসলেই কনসার্টটা হবে কিনা। প্রায় একটা বছর হতে চলল ব্লাডেন কোনো কনসার্ট করেনি। পুরো ইউরোপের মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি যেন থমকে আছে। লোকে বলে, ভিকে-র আপত্তির কারণেই নাকি ওরা আর স্টেজে উঠছে না। সে নাকি ইদানীং প্রচণ্ড অ্যান্টি-সোশ্যাল হয়ে গেছে। তবে এতোদিন পর রিউমার ছড়িয়েছে, ওরা ফিরবে। দেখা যাক!”
​আইজেল হঠাৎ চনমনে হয়ে উঠে দাঁড়াল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
“আরে এসব আলোচনা রাখো তো! আজ বিকেলে আমরা ব্লাডেন আউটলেটে এ শপিং করতে যাব। মিউনিখের সবচেয়ে লাক্সারি কালেকশন ওখানে আছে। হাতে তো ওতো টাকা নেই,তবে দেখতে সমস্যা কোথায়? ঘুরেও আসব, সাধ্যের মধ্যে কিছু পছন্দ হলে নিয়েও আসব।”
আইজেল থামতে না থামতেই,আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“আনায়া, আজ কোনো অজুহাত চলবে না। তোমাকেও যেতে হবে আমাদের সাথে। ওখানকার ইন্টেরিয়র দেখলে তোমার মন এমনিতে ভালো হয়ে যাবে।”
​আনায়ার একটুও ইচ্ছে ছিল না বাইরে বেরোনোর। কিন্তু আইজেলের আন্তরিকতা আর সাবার জোরাজুরির কাছে সে হেরে গেল। অবশেষ রাজি হতে হলো তাকে।

​বিকেলের মিউনিখ বরাবরই অত্যন্ত মায়াবী রূপ ধারণ করে। আকাশেহালকা বেগুনি আভা ছড়িয়েছে; তার বুক চিরে ঝরছে ধীর লয়ের রুপোলি তুষার। আনায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার পরখ করে নিল। তার পরনে আইভরি ও ডার্ক রেড কম্বাইন্ডের একটি নিটেড সোয়েটার, তার ওপর অফ-হোয়াইট রঙের একটি লংকোট। গলায় সযত্নে পেঁচিয়ে নিয়েছে একটি পশমি মাফলার।পায়ে বাদামী রঙের লেদার বুট। চুলে কোনো বাড়তি কারুকাজ নেই, স্রেফ আলগা করে ছেড়ে দিয়েছে পিঠের ওপর; যা তার ডাগর চোখ আর শান্ত মুখাবয়বে স্নিগ্ধ আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে।
​সাবা পরেছে ডার্ক ব্লু পাফার জ্যাকেট আর আইজেল বাদামী রঙের জ্যাকেট-কালো প্যান্ট; চুলগুলো পোনিটেল করে উঁচুতে বেঁধে নিয়েছে।
​তিনজন মিলে মিউনিখের মারিওনপ্লাৎজ এর কাছাকাছি পৌঁছাতেই, আনায়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। মারিওনপ্লাৎজ (Marienplatz) হলো জার্মানির মিউনিখ শহরের প্রধান এবং সবচেয়ে ঐতিহাসিক চত্বর। তবে আনায়ার নজর পড়েছে ভিন্নকিছুতে। তার চোখের ঠিক সামনেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিত, ব্লাডেন গ্যালারি। যা কোনো এ্যাঙ্গেলেই তার কাছে স্বাভাবিক মনে হলো না।
গ্যালারির বাইরের বিশাল ডিজিটাল স্ক্রিনে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে রক্তলাল রঙে জ্বলজ্বল করছে ‘Bloøden’ লেখাটি।
​ভেতরে প্রবেশ করতেই এক আভিজাত্যপূর্ণ সুগন্ধ নাকে আছড়ে পড়ল। চারদিকের ইন্টেরিয়র গাঢ় ধূসর,কালো কিংবা অফ হোয়াট আর কালচে লালের এক অনন্য সংমিশ্রণ। যেদিকেই চোখ পড়বে, সেদিকেই র”ক্ত লাল রঙের আভা।
সাবা আর আইজেল নিজেদের মতো কালেকশনগুলো দেখতে এদিক-সেদিক ছরিয়ে যায়। আনায়া তাদের নজরহারা না করেই, আশেপাশে কিছু কালেকশনে পায়চারি করতে করতে নজর বুলাতে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে, বেশ বড়সড় কারবার। চারপাশে মানুষজনেরও কমতি নেই।

এরিমধ্যে হঠাৎ আনায়ার নজর পড়ে,একটা সাদা রঙের টুইড ব্লেজারের দিকে। দেখতে সাধারণ মনে হলেও, চোখে ধরার মতো। আনায়ার কিছুটা পছন্দও হলো। সে তা দেখতে গিয়ে, হঠাৎ প্রাইজকার্ডে নজর পড়তেই কিছুটা হকচকিয়ে গেল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“তিন হাজার? বাহ, বেশ ভালোই তো। ওরা তো বলছিলো এখানকার জিনিস খুব এক্সপেন্সিভ। জিনিস অনুযায়ী দাম তো সস্তাই, আজ বেশি করে টাকা আনলে একসাথে ছয়-সাত টা নিয়ে যেতাম।”
আনায়া খুশিতে গদগদ হয়ে আবারও ভাবল,
“পরেরবার এসে ভস্তা ভরে দেশে নিয়ে যাবো।”
আনায়া বেশ খুশি মনেই অন্যদিকটায় এগিয়ে গেল। হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েকটা কালেকশন দেখে নিয়েছে। অনেকগুলো পছন্দ হলেও, সাহস করে আর দাম দেখতে যায়নি। এমনিতেও পড়াশোনার ভুত নেমে গিয়ে, বড়আব্বুর ফুতের ভুত মাথায় চেপেছে। এই মূহুর্তে বাবার কাছ থেকে কারিকরি টাকা চেয়ে,তা ধ্বংস করাটা মোটেও উচিত হবে না।

এসব ভাবতে না ভাবতেই,গ্লাস-ওয়ালের অপরপ্রান্তে আবারও একটা চমৎকার আউটফিটে নজর পড়ে গেল। একদম ডার্ক রেড ও ব্ল্যাক কম্বাইন্ডের সিম্পল ডিজাইনের একটি ভেলভেট গাউন, সাথে ডার্ক রেড ভেরসাচে হিল; ড্রেসটা হান্স টেক্সটাইলের হলেও, ব্যাগ ও হ্যান্ডওয়াচ দুটো ইমানি সিগনেচারের এক্সক্লুসিভ এডিশন। আনায়ার এসকল ব্র্যান্ডের বিষয়ে খুব একটা ধারণা না থাকলেও, ম্যাটেরিয়াল,ব্লাডেনের লোগো সহ বাদবাকি নাম-ধাম দেখেই বুঝে নিল এটার দাম হয়তো যথেষ্ট বেশি।
তবে একবার কৌতুহলবশত সত্যি সত্যি প্রাইজট্যাগটা চেক করতে গিয়ে তার চোয়াল যেন খুলে পড়ার উপক্রম হলো।
“এক লাখ বিশ হাজার ইউরো? এ তো রীতিমতো ডাকাতি।”,আনায়া বিড়বিড় করে আওড়াল। তবে পরক্ষণেই একটা বিষয় তার মাথায় আসতেই,সে যেন আরো বেশি বিস্ময়ে হতভম্ব উঠল,
“এক সেকেন্ড, এক সেকেন্ড, আমি তো বিডি নয় জার্মানিতে। তাহলে ইউরো মানে তো…ওহ খোদা! ওই ব্লেজারটার প্রাইজ ৩ হাজার টাকা নয় বরং ৩ হাজার ইউরো ছিল, তার মানে প্রায় সাড়ে চার লাখ… ”
আনায়া একপ্রকার কেশে উঠল। কি পরিমাণে অবোধ হলে ওমন জিনিসকে সস্তা ভেবে বস্তা ভড়ে নিয়ে যাবার চিন্তা করে।

পরক্ষণেই চোখের সামনের আউটফিটটার দাম কষতে গিয়ে,তার দুহাতের দু’আঙ্গুল এক করতে হলো। হিসেব শেষে বিস্ময়ে ছানাবড়া দৃষ্টি বানিয়ে আওড়াল,
“এক লাখ বিশ হাজার ইউরো মানে প্রায় এক কোটি একাত্তর লাখ? এরা কি পাগল না ছাগল, কি খেয়ে দাম রেখেছে। এ জিনিস এতো দাম দিয়ে কোন গরু কিনবে? তওবা তওবা, এটা কিনতে গেলে আমার পুরো গুষ্টিকে আবারও একাত্তরের স্বাধীনতার যু”দ্ধে ম’রে গিয়ে পূর্ণজন্ম নিতে হবে।”
আনায়া তড়িঘড়ি করে উল্টো পায়ে কয়েকপা পিছিয়ে গেল;কোথায় যাচ্ছে সেদিকে তার খেয়াল নেই। আনায়া শুষ্ক ঢোক গিলে মনে মনে বিরক্তির সাথে বিড়বিড় করল,
“এরা কি আমায় এখানে আমার চোদ্দগুষ্টিকে সুদ্ধ মিসকিন বানাতে নিয়ে এসেছে।”
ঠিক তখনই পেছন হতে একজন স্টাফ তার উদ্দেশ্যে অত্যন্ত নমনীয়তার সহিত জার্মান ভাষায় বলে উঠল,
“ম্যাম, কোনো সাহায্যের প্রয়োজন? এখানে প্রবেশ করতে হলে আপনার ভিআইপি কার্ডটা লাগবে।”
আনায়া হকচকিয়ে পেছনে ফিরে মেয়েটিকে দেখল। কিছুক্ষণ মেয়েটির কথা বুঝতে না পেরে স্থির থাকার পর, পরক্ষণেই তার হুঁশ ফিরে এলো। খেয়াল করে দেখল সে এক্সক্লুসিভ লাক্সারিয়াস কালেকশন বা ভিআইপি জোনের সামনে দাঁড়িয়েই, এতক্ষণ বাহির হতে ভেতরের কালেকশন নিয়ে ঘাটাঘাটি করছিল। কিন্তু মেয়েটার কথা শুনে সে আরো কিছুটা অবাকও হলো। মনে মনে ভাবল,

“এর ভেতরে প্রবেশের জন্যও ভিআইপি কার্ড? খোদ নিজেকে বিক্রি করেও তো একটা জিনিস কেনার সাধ্য হবে না। কার্ড দিয়ে আবার কি হবে।”
আনায়া আর সময় নষ্ট না করে, কোনোমতে মেয়েটার কাছ থেকে কথায় ইনিয়েবিনিয়ে কাটিয়ে এসে তার বান্ধবীদের খুঁজতে শুরু করল। না জানে, এরা আবার কোথায় হারিয়েছে।
ঠিক সেই মূহূর্তেই গ্লাসওয়ালের ওপাশে অন্যপ্রান্তে কাউকে দেখে, পেছন হতে আইজেলের কণ্ঠ থেকে চাপা এক উৎকণ্ঠা বেরিয়ে এল। সে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে দূরে হেঁটে চলা এক রমণীর দিকে।
​উঁচু হাইহিলের খটখট শব্দে সেই রমণী এলিট লুকে ব্লাডেনের হেডকোয়ার্টারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার পেছনে একত্রে নীল পোশাক পড়া চারজন গার্ড সমানতালে পা মেলাচ্ছে। আনায়াও সেই রমণীর অদম্য ভাবগাম্ভীর্য দেখে বেশ অবাকই হলো। সে আইজেলের অস্থিরতা দেখে কৌতূহলী হয়ে নিচু স্বরে জানতে চাইল,
​”উনি কে?”
​আইজেল যেন ঘোরের মধ্য থেকে উত্তর দিল,

“ইমানি ম্যাম! জাস্ট লুক অ্যাট হার আনায়া… কী জোস, তাই না?”
​আনায়া আর কিছু বলল না। সে দূর থেকে ইমানির আভিজাত্য অবলোকন করতে করতেই হঠাৎ তার নজর চলে গেল ইমানির থেকে বেশ কিছুটা দূরে, ভিন্ন এক পথে হেঁটে চলা এক পুরুষ অবয়বের দিকে।নিকষ কালো ওভারকোট পরা,গলায় কালচে গাঢ় লাল রঙের মাফলার জড়ানো—বলিষ্ঠ দেহের এক দীর্ঘদেহী পুরুষ।
লোকটির পিঠ আনায়ার দিকে, তাই মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই কাঁধ অব্দি হালকা কোঁকড়ানো ঝাকড়া চুল আর দীর্ঘ অবয়বটি দেখামাত্রই আনায়ার বুকটা অজান্তেই এক মুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল। এক অজানা অনুভূতিতে শরীর যেন শিউরে উঠল তার।
​আনায়া কয়েক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল। পরক্ষণেই মাথা ঝাকিয়ে নিজেকে দ্রুত তটস্থ করে বিড়বিড় করে বলল,
​”ধুর! কী সব ছাইপাশ ভাবছি আমি। উনি… উনি কেন এখানে আসতে যাবেন? অসম্ভব!”
​নিজের মনের বিচিত্র কল্পনাকে চাপা দিয়ে আনায়া অন্যপাশে ঘুরে দাঁড়াল। অথচ তার অবচেতন মন এখনো সেই কালো কোট পরিহিত মানুষটার দিকেই পড়ে রইল। ওদিকে ভিআইপি এলিভেটরের সামনে দাঁড়ানো সেই গম্ভীর পুরুষটিও যেন সামান্য থমকে দাঁড়িয়েছে।কোনো বিশেষ কারণ নাকি কোনো ভাবনায়—তা অনিশ্চিত রইলেও, একটা আশংকা থেকেই যায়; গ্যালারির উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা লংকোট পরা মেয়েটির অস্তিত্ব কি সেও টের পেয়েছিল?

​ব্লাডেন হেডকোয়ার্টারের শীর্ষ তলায় কেনীথের পার্সোনাল লাক্সারি জোন। চারদিকটা কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা; পুরো মিউনিখ শহরটাকে পায়ের নিচে মনে হয়। ঘরের ভেতরটা ধূসর-কালো ও গাঢ় লাল রাঙা মার্বেলের কারুকাজে মোড়া;এককোণে রাখা দামী লেদার সোফা আর মাঝখানে বিশাল এক লালচে বর্ণের কাঠের টেবিল।
কেনীথ বসে বসে তার ম্যাকবুকে গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা পরখ করছে। তার চোখে সেই চেনা ক্লান্তি; অথচ চোয়ালের হাড়-গোড় সব শক্ত হয়ে আছে।
​ঠিক সেই মুহূর্তে ভারী গ্লাস-ডোরটা নিঃশব্দে খুলে গেল। ভেতর প্রবেশ করল ইমানি। সে অত্যন্ত গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে কেনীথের সামনের চেয়ারে বসল। কেনীথ একবারও মাথা তুলল না।
​ইমানি কিছুক্ষণ কেনীথকে পর্যবেক্ষণ করে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল,

“পাভেল আসেনি এখনো?”
​কেনীথ নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, “না।”
​”ফোন করেছিলি?” ইমানির কণ্ঠে সূক্ষ্ম কর্তৃত্ব।
​কেনীথ এবারও ম্যাকবুক হতে নজর সরাল না। শীতল কণ্ঠে বলল,
“প্রয়োজন মনে করিনি। ওর যখন আসার হবে, ও ঠিকই আসবে।”
​ইমানি আরো কিছুক্ষণ কেনীথকে পর্যবেক্ষণ করল। ইচ্ছে করছে বেটাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খেতে। সে ভারী শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। তার মেজাজটা আজ এমনিতেই খিটখিটে হয়ে আছে। সে দরজার দিকে এগোতে গিয়েও,কেনীথের কন্ঠস্বরে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল।
“সুইঠি! তুই কি আজ কোথাও গিয়েছিলি?”
​কেনীথ এবার টাইপিং থামিয়ে এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো। তার সেই রহস্যময় লালচে চোখ জোড়া স্ক্রিন থেকে সরে ইমানির ওপর নিবদ্ধ হলো। ইমানি শুরুতে কোনো জবাব দিল না। পরক্ষণেই পরিস্থিতি বুঝতে পেরে জোর গলায় বলে উঠল,

“কই, না তো! আমি আবার কোথায় যাবো?”
​কথাটা বলেই সে আর দাঁড়াল না, দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল নিজের ব্যক্তিগত ড্রেসিং স্যুটের দিকে। কেনীথ একদৃষ্টিতে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল; ইমানি নিশ্চিত কিছু একটা লুকানোর চেষ্টা করছে। আর সেটা কি, তা বোধহয় সে নিজেই ভালো করে জানে।
কেনীথ সকল অপ্রাসঙ্গিক ভাবনা ছেড়ে নিজের কাজে মনোযোগী হলো। আগে অফিসের প্রতি তার এতো মনোযোগ ছিল না। সবটাই ইমানি আর পাভেলের উপর ছেড়ে দিয়ে রেখেছিল। তখন অবশ্য সবাই নিজেদের কাজগুলো ভাগ-ভাগ করেই সামলাতো। কিন্তু পরবর্তীতে মিউজিক আর রেসিং ইন্ডাস্ট্রি থেকে দীর্ঘসময়ের বিরতি নেওয়ায়, তাদের জীবনযাপনের ধরনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। হয় কেনীথ এখন ব্লাডেন ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে সর্বক্ষণ নিজেকে ব্যস্ত রাখে, নয়তো বাদবাকি সময়টুকু কাটায় ভার্সিটি বিষয়ক কার্যবিধিতে; এছাড়া মাঝেমধ্যে সময় করে দেশে যাওয়াটাও এখন তার গূঢ় দায়িত্বই এক অংশ।

​ইমানি তার ড্রেসিং রুমে ঢুকে ট্রেঞ্চকোটটা ছুড়ে মারল সোফায়। ঠিক তখনই তার পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘ফ্রেয়া লরেন’ ঘরে প্রবেশ করল। ফ্রেয়া দেখতে অত্যন্ত স্লিম; ব্লন্ড চুলগুলো নিখুঁতভাবে বব কাট করা। হাতে আইপ্যাড আর ইমানির জন্য রাখা এক কাপ ব্ল্যাক কফি।
​ফ্রেয়া ইমানির ভাবগাম্ভীর্যে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও, বিনীতভাবে বলল,
“ম্যাম, লাক্সারি গ্যালারির নিউ কালেকশন সেকশনে কিছু নতুন ডিজাইনার পিস এসেছে। আপনি কি একবার চেক করবেন?”

​ইমানি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের লিপস্টিকটা ঠিক করে নিল। তার চোখে-মুখে এক ভয়াবহ আভিজাত্যপূর্ণ বিরক্তি। সে ফ্রেয়ার দিকে না তাকিয়েই গটগট করে লাক্সারি কালেকশন জোনের দিকে এগিয়ে গেল। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় তার হাইহিলের মাত্রাতিরিক্ত শব্দই বুঝিছে দিচ্ছিল, মেজাজটা ঠিক কি পরিমাণে বিগড়ে আছে।
​সেকশনে ঢুকেই ইমানি সোফায় গা এলিয়ে বসল। পা থেকে তার পুরনো YSL-এর হিল জোড়া এক প্রকার অবজ্ঞার সাথে ছুড়ে ফেলে দিল মেঝের ওপর। ফ্রেয়া দ্রুত এগিয়ে এসে এক জোড়া নতুন ব্র্যান্ডের সর্পিল ডিজাইনের জুতো এগিয়ে দিল।
​ইমানি জুতো জোড়া পরতে পরতে ফ্রেয়ার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।
“লরেন, ব্যাগটা কোথায়?”
ফ্রেয়া মেয়েটা খানিক ভীতু। কিন্তু কাজের তাগিদে তার কপালে জুটেছে ইমানির মতো মানুষ। সে কাঁপাকাঁপা হাতে একটি প্রিমিয়াম লেদার ব্যাগ এগিয়ে দিল। ইমানি ব্যাগটা হাতে নিয়ে সেটার ফিনিশিং পরখ করল, তারপর ভ্রু কুঁচকে ব্যাগটা সরিয়ে রেখে বলল,

“এটার ফিনিশিং আমার টেস্ট অনুযায়ী হয়নি। আরও বেটার কিছু দেখাও। আর হ্যাঁ, ইতালিয়ান কিছু ক্লায়েন্টের সাথে আগামীকাল সকালে মিটিং আছে। আমি ব্যস্ত থাকব, তাই সবকিছু আগে থেকেই অ্যারেঞ্জ করে রেখো। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ডিলে। এসব জানার পরও বারবার কেনো তোমাদের এতো ভুল হয়, কে জানে।”
ইমানির কন্ঠস্বরে স্পষ্টত বিরক্তির ছাপ। ফ্রেয়া মাথা নিচু করে বলল,
“সরি ম্যাম। আমি এখনই সবকিছুর ব্যবস্তা করছি।”
​ইমানি কথা বাড়াল না। তার নতুন জুতো জোড়ায় একবার আয়নায় নিজেকে দেখল; সর্বচ্চ একবার ছেড়ে দুবার এটা পড়বে কিনা সন্দেহ। তার অবয়বে ফুটে উঠল সেই পরিচিত উদ্ধত ভঙ্গি। সে জানে এই মিউনিখে তার ইশারায় কত কিছু ওলটপালট হয়ে যেতে পারে। এই দম্ভ, এই ঔদ্ধত্য তার নিজের অর্জনে গড়া। বিশেষ কারো প্রতি এক তীব্র ক্ষুব্ধতা হতেই ইমানির সৃষ্টি। যা সে আগামীতে কোনো পরিস্থিতির সম্মূখেই ধ্বংস হতে দেবে না।

“ম্যাম, একটা কথা বলার ছিল।”
ফ্রেয়ার ইতস্ততে ইমানির ধ্যান ভাঙ্গল। স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“হুম বলো, লরেন।”
মেয়েটি আরো বেশি ইতস্তত হলো। ইমানি তা আয়নায় পরখ করেই, সোজা তার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ভ্রু কুটি করে কিছু বলবে, তার আগেই মেয়েটা হঠাৎ সোফার এককোণে আড়ালে রেখে দেওয়া একটি গিফট পেপারে মোড়ানো বক্সসরূপ কিছু একটা এনে ইমানির হাতে দিল।
“ম্যাম, এটা আপনাকে…”
ফ্রেয়ার কথা সম্পূর্ণ হয়না। অন্যদিকে ইমানির বিস্ময় কাটে না। সে যেন সারপ্রইজিং বক্স সরূপ জিনিসটা দেখেই, অনেককিছু আন্দাজ করে ফেলে। ইমানি ভারিক্কি গলায় ফ্রেয়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“লরেন! এটা এখানে এলো কি করে? তুমি নিয়ে এসেছো? কে দিয়েছে? কোথায় পেয়েছো?”
মেয়েটা তৎক্ষনাৎ ঘাবড়ে যায়। ভীত হয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়ায়,
“সরি ম্যাম, আপনার পারমিশন ছাড়া এটা এখানে আনা উচিত হয়নি। আপনি বলেছিলেন, কোনোভাবেই যেন আপনার অনুমতি ছাড়া এখানে এসব গিফট বক্স প্রবেশ না করানো হয়। কিন্তু আমার হাতে আর কোনো অপশন ছিল না।”

ইমানি ভ্রু কুঁচকে বলে,
“কি বলতে চাচ্ছো?”
ফ্রেয়া যেন তটস্থ হলো। সে নিজেকে সামলাতে চেয়েও আমতা-আমতা করে বলল,
“না…না, কিছু না। আমি বরং এখনই এটাকে ফেলে…”
ইমানির হাত থেকে বক্সটা নিতে চাওয়া মাত্রই, ইমানি তার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। তৎক্ষনাৎ ফ্রেয়া ঘাবড়ে গিয়ে দমে গেল। ইমানি চাপা স্বরে বলল,
“যাও এখান থেকে।”
ফ্রেয়া আর এক মুহূর্তও কালবিলম্ব না করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ইমানি একটা ভারী শ্বাস ফেলে অস্থির ভঙ্গিতে সোফায় গা এলিয়ে দিল। বক্সটা পাশেই অবহেলায় ফেলে রাখল। গত এক বছর ধরে এই আপদটা তাকে ছায়ার মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কোনো এক অদৃশ্য উন্মা’দ, এক সাইকো লাভার—তার জীবনটাকে বিষিয়ে তুলছে। বাড়ি, অফিস, এমনকি তার ব্যক্তিগত ক্লাবগুলোতেও যেন সেই পাগলের অদৃশ্য নজরদারি লেগে আছে।
​ইমানি পাশে পড়ে থাকা বক্সটার দিকে একমনে চেয়ে রইল। সে জানে এর ভেতরে কী আছে। সে আলতো করে লাল র‍্যাপারটা ছিঁড়ে ফেলতেই বেরিয়ে এল একটি চমৎকার গাঢ় লাল রাঙা ভেলভেট বক্স। ইমানি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এত সুন্দর সাজসজ্জার আড়ালে আবারও কোনো এক বিদঘুটে চমক অপেক্ষা করছে তার জন্য।

​বক্সটি খুলতেই এক অদ্ভুত উগ্র সুগন্ধি আর তার সাথে মিশে থাকা পচাটে বিদঘুটে গন্ধের মিশ্রণ তার নাকে ধাক্কা দিল। ভেতরে দেখা গেল একটি রেড ওয়াইনের বোতল, যা কালচে লাল তরলে পূর্ণ। ইমানি জানে এটা কোনো দামী ওয়াইন নয়, বরং কোনো অবলা পশুর র*ক্তে পরিপূর্ণ ওয়াইনের কাঁচের বোতল মাত্র। সে চরম ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে বোতলটি একপাশে সরিয়ে রাখল। কিন্তু বক্সের ভেতরে রাখা ছোট্ট মখমলে লাল রঙের রুমালটি সরাতেই সে আঁতকে উঠল।
​ধরফড়িয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল ইমানি। হাতের ঝটকায় বক্সটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। তার চোখ-মুখ কুঁচকে এল বিতৃষ্ণায়। মখমল রুমালটার নিচে থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি মৃত ইঁদুরের বীভৎস দেহ; লেজে ছোট্ট একটা গোলাপি ফিতে বাঁধা।
মেঝেতে বক্সটা উপুড় হয়ে পড়তেই তার ভেতর থেকে একটি ভাঁজ করা চিঠি বেরিয়ে এল। ইমানি তার উঁচু হিলের অগ্রভাগ দিয়ে বিরক্তির সাথে কাগজটা টেনে নিল এবং তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করল। সেখানে কাঁচা হাতের ইতালীয় ভাষায় লেখা উ’ন্মা’দনার এক উদ্ভট বিবৃতি,
​”ইল মিও ভিনো রোসো স্কুরো (মাই ডার্ক রেড ওয়াইন!)

​সুইটি, মাই স্পাইসি লেডি! আমি জানি তুমি আমাকে ছাড়াই বেশ চমৎকার আছ। বরং আমার অস্তিত্ব তোমার ছায়ার আশেপাশে না থাকলেই তুমি বেশি শান্তি পাও। কিন্তু ডার্লিং, আমার তো এটা মোটেও পছন্দ নয়। তুমি আমাকে ছাড়া হ্যাপি থাকবে—এটা আমি সহ্য করি কী করে বলো তো?
​অনেকদিন তোমাকে সারপ্রাইজ গিফট পাঠানো হয়নি। তুমি আসলে বড্ড সেলেক্টভ; নিজের আশেপাশে আমার ছোঁয়া পর্যন্ত পৌঁছাতে দাও না। কিন্তু বিশ্বাস করো, এতে আমার কোনো ক্ষোভ বা রাগ নেই। আমি জানি আমার স্পাইসি লেডি আর সবার মতো সস্তা নয়। আমার রেড ওয়াইন বাকিদের থেকে একদম ডিফারেন্ট। আর তোমার এই ইউনিকনেস আমাকে পাগলের মতো আকর্ষণ করে।

​তাই তো কিছুদিন হতে ভাবছিলাম তোমার জন্য কী ডিফারেন্ট কিছু দেওয়া যায়। তুমি তো জানোই, এর আগে আমি তোমাকে ইগুয়ানার র*ক্ত ভর্তি ওয়াইনের বোতল থেকে শুরু করে বাদরের পচা লেজ, মৃত কাঁকড়ার পা, এমনকি শুকিয়ে যাওয়া টিকটিকির খুলিও উপহার দিয়েছি। আজ সকালে এস্প্রেসো খেতে খেতে যখন স্টোর রুমের দিকে যাচ্ছিলাম, দেখলাম এই ছোট্ট ইঁদুর ছানাটা মরে মেঝেতে পড়ে আছে। ভাবলাম, এটাই তোমার জন্য সাজিয়ে পাঠিয়ে দিই। আশা করি তুমি বরাবরের মতোই আমার সারপ্রাইজটা ভীষণ পছন্দ করে, সাদরে বর্জন করেছো। সাথে আমার প্রতি তীব্র কৃতজ্ঞতায় তুমি আমায় দিয়েছো তোমার প্রিয় কিছু ঝাঁঝালো গালি-গালাজ সমূহ।
​সে পোটাসি ভেরেরতি সলো উনা ভোল্টা, টি ইনসেন্ডেইরেই ইল কোর,আমোরে মিও।(যদি তোমাকে একবার সামনে পেতাম, তোমার হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিতাম,আমার প্রিয়তমা)

​মাই সুইটি! আই নো, আমি তোমার জীবনের সবচেয়ে ইরিটেটিং এবং অদেখা এক অস্তিত্ব। কিন্তু ডার্লিং, কিছুই করার নেই। তোমাকে সারাজীবন এই সা’ইকো আমিটাকেই সহ্য করতে হবে। এন্ড ইউ উইল ফল ইন লাভ উইথ মি, সুনার অর লেটার।
মিয়া ফা”কিং ডার্ক রেড ওয়াইন, ফা”ক ইউ ভেরি সুন! জাস্ট ওয়েট ফর ইয়োর ফা*কিং ক্রেজি লাভার!’
​চিঠিটা শেষ করে ইমানি সেটাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল। তার সারা শরীর রাগে রি রি করছে। এই সাইকোটার স্প”র্ধা দিন দিন বেড়েই চলেছে।ইমানি চোখমুখ খিঁচে, চাপা স্বরে জার্মান ভাষায় হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“হু-রেন-জোন!”
(অন্যতম নি*কৃষ্ট গা*লি)

​মিউনিখের এক অন্ধকার গলির শেষ প্রান্তে অবস্থিত জনপ্রিয় বক্সিং ক্লাব ‘দ্য আয়রন ফিস্ট’। বাইরে তুষারপাতের নিস্তব্ধতা থাকলেও ভেতরে তখন নরক গুলজার। চারদিকে ডার্ক রেড নিয়ন লাইটের খেলা; ঘর্মাক্ত দেহগুলোর ওপর পড়ে এক বীভৎস সুন্দর আভার সৃষ্টি করেছে। সিগারেটের ধোঁয়া আর মদের গন্ধে বাতাস ভারী। রিংয়ের চারধারে উন্মত্ত দর্শকের চিৎকার—কারো মুখে ‘হান্স হান্স’ ধ্বনি, কেউবা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীর জয়ের নেশায় মত্ত।
​রিংয়ের মাঝখানে তখন রণমূর্তি ধারণ করেছে ঝাঁকড়া কোঁকড়ানো চুলের সেই পুরুষ— পাভেল হ্যান্স। তার সুগঠিত বলিষ্ঠ শরীরের প্রতিটি পেশি যেন উত্তে”জনায় ফেটে পড়ছে। গায়ের ঘাম আর রক্ত মিশে একাকার হয়ে চকচক করছে ডার্ক রেড লাইটিংয়ে। প্রতিপক্ষের একের পর এক পাঞ্চ সে অবলীলায় সইছে, আর তার পাল্টা আঘাতে অন্যজন দিশেহারা। পাভেলের চোখমুখ লাল হয়ে উঠেছে, এক অদ্ভুত উন্মাদনা তার দৃষ্টিতে। পরনে শুধু কালো বক্সিং শর্টস আর হাতে শক্ত করে বাঁধা কালো গ্লাভস। পেশীবহুল শরীরে অসংখ্য নীলচে দাগ আর নতুন ক্ষতের চিহ্ন, তবুও তার ক্লান্তি নেই।

​শেষ মুহূর্তের এক বিধ্বংসী আপারকাটে প্রতিদ্বন্দ্বীকে নক-আউট করে দিয়ে আজকেও চ্যাম্পিয়নের তকমাটা নিজের করে নিল পাভেল। রিংয়ের চারপাশে তখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। টাকা উড়ছে বাতাসে, দর্শকদের চিৎকারে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। পাভেল বুক ভরে শ্বাস নিল;তার পেশীগুলো এখনো থরথর করে কাঁপছে। বক্সিং রিংয়ে এস.পি.হান্স এক অপ্রতিরোধ্য নাম;পরাজয় শব্দটা তার অভিধানে নেই বললেই চলে।
​ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসার পর পাভেলের সেই চ্যাম্পিয়ন ভাবমূর্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। জনশূন্য নিস্তব্ধ রাস্তায় সে এখন এক বিধ্বস্ত মানুষ। পেটে আর কোমরে হাত দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে সে। আর মুখ দিয়ে বের হচ্ছে যন্ত্রণাকাতর সব শব্দ,
“আহ্,উহ্, খোদা গো খোদা, হালার ফুতেরা আঁর মাঞ্জা মারি ভাইঙ্গা দিসে।”
নিজের মনেই এমন সব বিড়বিড় করতে করতে সে তার গাড়ির দিকে এগোতে লাগল।
​সন্ধ্যা নেমে এসেছে মিউনিখের বুকে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় বরফ কণাগুলো হিরের কুচির মতো ঝকঝক করছে। পাভেল গাড়ির লক খুলতে যাবে, ঠিক তখনই এক নারী কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিল।
​”মিস্টার হ্যান্স!”

​পাভেল চমকে পেছনে ফিরল। দেখল কিছুটা দূরে এক রমণী দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে দামী ফার কোট, হাতে ডিজাইনার ক্লাচ আর চোখেমুখে গভীর উৎকণ্ঠা। বাদামী চুল আর মায়াবী চোখ জোড়া দেখেই পাভেল এক লহমায় চিনে ফেলল তাকে। বিস্ময়ের সাথে নিজের মনেই আওড়াল,
“সেরেছে! জ্যাকের বোন স্টেলা এখানে কেন?”
​স্টেলা ধীরপায়ে পাভেলের দিকে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে আভিজাত্যের ছাপ থাকলেও, চোখের কোণে জমাটবদ্ধ বিষণ্ণতা ঢাকা পড়ল না। পাভেল অস্বস্তিতে মাথা চুলকে এক গাল হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আ… স্টেলা? তুমি এখানে এই অসময়ে?”
​স্টেলা কোনো ভণিতা না করে সরাসরি কাজের কথায় এল। তার স্বরে ফুটে উঠল আকুতির রেশ,
“আমার আপনাকে প্রয়োজন,মিস্টার হান্স। একটা হেল্প করতে পারবেন?”
​পাভেল ইতস্তত হয়ে বলল,

“হ্যাঁ বলো, সাধ্যের মধ্যে থাকলে অবশ্যই চেষ্টা করব।”
​ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটল স্টেলার ঠোঁটে, কিন্তু চোখের মলিনতা ঘুচল না। সে তড়িঘড়ি করে নিজের কোটের পকেট থেকে একটি সুগন্ধি মাখানো নীল খাম বের করে পাভেলের দিকে বাড়িয়ে দিল।
“এটা… এটা প্লিজ ভিকে-কে দিতে পারবেন? প্লিজ, না করবেন না।”
​পাভেল যেন আকাশ থেকে পড়ল। ভড়কে গিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“মানে, স্টেলা… তুমি তো জানো ভাই এসব পছন্দ করে না…”
​“আমি জানি!” স্টেলার কণ্ঠে কান্না চেপে রাখার আর্তি।
“আমি জানি সে কখনোই আমার সাথে সরাসরি কথা বলবে না। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি, প্রতিবার ব্যর্থ হয়ে ফিরেছি। কিন্তু এই একটা বার… শেষবারের মতো এটা ওর কাছে পৌঁছে দিন। ও পড়ুক বা ছিঁড়ে ফেলুক… আমি চাই ও শুধু জানুক আমার কথাগুলো।”
​পাভেল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভারী গলায় বলল,
“স্টেলা, তোমার ভাই কি জানে তুমি এখনো ভাইয়ের জন্য এই পাগলামি করে যাচ্ছো? জ্যাক জানলে কিন্তু ঝামেলা হয়ে যাবে।”
​স্টেলা মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তারপর মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল,

“না, ও জানে না। জানলে হয়তো অনেক বকবে, কিংবা ঘরবন্দী করে রাখবে। কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমি ওকে ভালোবাসি মিস্টার হান্স, অনেক ভালোবাসি। সবাই বলে ভুলে যেতে, আমি হাজারবার চেষ্টাও করেছি, কিন্তু পারিনি। ও আমার ভাগ্যে আছে কি নেই তা ঈশ্বর জানেন, কিন্তু আমি অন্তত এইটুকু চেষ্টা তো করতেই পারি!”
​কথাগুলো শেষ করতে করতে স্টেলার চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা লোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে দ্রুত হাত দিয়ে তা মুছে ফেলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। পাভেল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। কেনীথের শীতলতা আর স্টেলার এই তপ্ত ভালোবাসা—দুটোর মাঝখানে পড়ে সে নিজেকে বড় অসহায় বোধ করল। যেখানে পাভেল ভালো করেই জানে, কেনীথ এইসকল বিষয়ে একদমই এগোবে না।
তবুও একটা ভারী শ্বাস ফেলে পাভেল খামটা হাতে নিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, আমি দেখি কী করা যায়।”
​স্টেলা কৃতজ্ঞতাভরা চোখে তাকে ধন্যবাদ জানাল। পাভেল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

“সন্ধ্যা অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি ফিরে যাও। তোমার ভাই এসব টের পেয়ে নতুন ঝামেলা করুক, তা আমরা কেউই চাই না।”
​স্টেলা মাথা নেড়ে ধীরপায়ে তার গাড়ির দিকে চলে যেতে পা বাড়াল।পাভেল হাতের নীল খামটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল,
“নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনলাম কি না কে জানে!”
এই ভাবনায় পাভেল নিজেও গাড়িতে চড়ে বসবে, ঠিক সেই মূহুর্তে স্টেলা আবারও ফিরে এলো। এবার চোখেমুখে কিঞ্চিৎ উৎফুল্লতা। পাভেল ভ্রুকুটি করে শুধালো,
“আবার কি হলো?”

—“আ…না মানে, একটা বিষয়ে সিওর হতে চাচ্ছিলাম। শুনলাম ব্লাডেন নাকি আবার কনসার্ট করছে? তার মানে ভিকে আবারও মিউজিক আর রেসিং ইন্ডাস্ট্রিতে ফিরছে? ও কি রেসিং ক্লাবেও আসবে?”
স্টেলার এহেন সব কথাবার্তা শুনে পাভেলের কপালে বেশ কয়েকটা ভাজ পড়ল। সে কিছু বুঝতে না পেরে বলল,
“এসব তোমায় কে বললো? আর ব্লাডেন কনসার্ট করবে…কই আমি তো এসবের কিছুই জানিনা।”
স্টেলার চোখেমুখের প্রফুল্লতা হারিয়ে গিয়ে, সেখানে হতাশার ছাপ পড়ল।
—“তার মানে এগুলো রিউমারস? কিন্তু আমি তো শুনলাম, আপনাদের এজেন্সি থেকেই নাকি কনসার্টের ব্যাপারে বলা হয়েছে। তাহলে?”

​মিউনিখ শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে,বেশ খানিকটা দূরে, নির্জন পাহাড়ের কোলে দৃশ্যমান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘ব্লাডেন হেল’। সাধারণ বাসস্থানের চেয়ে বহুগুণে ভিন্ন এটি ;বাগানের চারপাশে অসংখ্য গাছপালা ও উল্লেখিত বেশকিছু চেরি গাছ আছে। পাভেল তড়িঘড়ি করে নিজের গাড়িটা পোর্টিকোতে থামিয়ে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে ভেতরে প্রবেশ করল। ড্রয়িংরুমের বিশাল ঝাড়বাতির আলোয় চারপাশটা ঝলমল করছে। চারপাশে ছড়িয়ে আছে চেরি ফলে অদ্ভুত এক সুগন্ধি।
​পাভেল ভেতরে পা দিয়েই চিৎকার করে উঠল,
“এ্যাই,এ্যাই! তোরা কি জানিস কী হয়েছে?ওরা এসব কি বলছে?”
​সোফায় অত্যন্ত ক্লান্ত ভঙ্গিতে আধশোয়া হয়ে বসে ছিল ইমানি। হাতে দামী ওয়াইনের গ্লাস, চোখেমুখে দিনের ধকলের ছাপ। তার কোলের কাছে লেপ্টে ঘেঁসে গুটিয়ে সোফায় বসে আছে তার বিড়াল ছানা নুযা। পাভেলের চিল চিৎকার শুনে শান্ত নুযা ধরফরিয়ে নড়েচড়ে উঠল; ইমানি ভ্রু কুঁচকে তাকাল। বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ইডিয়ট! ছাগলের মতো ওভাবে চিল্লাচ্ছিস কেন? কী হয়েছেটা কী?”
​পাভেল ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাপাচ্ছে।

“কী হয়েছে মানে? ইমুর বাচ্চা, বিলাইয়ের আম্মা, তুই বলবি কী হয়েছে! আগে বল, ভাই কোথায়?”
​ইমানি এবার গ্লাসটা টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসল। পাভেলের উ”ত্তেজিত চেহারা দেখে সে কিছুটা সিরিয়াস হয়ে বলল,
“পাভেল! কোনো ভনিতা না করে ক্লিয়ারলি বল, হয়েছেটা কী? আর ভি হয়তো উপরে।”
​পাভেল নিজের শ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বলল,
“তুই কি এজেন্সিকে বলেছিস যে ব্লাডেন কনসার্ট করবে? ভাই কি রাজি হয়েছে? কবে হলো এসব? আর আমাকে একবারও বলার প্রয়োজন বোধ করলি না?”
​ইমানি এবার আকাশ থেকে পড়ল। তার চেহারায় বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট।
“মানে? আমি আবার কবে কোন এজেন্সিকে বললাম আমরা কনসার্ট করছি! কই, আমার তো কারো সাথে কোনো কথাই হয়নি। আর সবচেয়ে বড় কথা— এই মুহূর্তে ভি তো ওসবের মধ্যে যাবেই না। ওকে ছাড়া ব্লাডেন এর কনসার্ট করার কোনো মানেই হয় না।”

​পাভেল এবার আরও বেশি কনফিউজড হয়ে গেল।
“হোয়াট? তারমানে তুইও কিছু জানিস না? তাহলে সবাই কী বলছে? সোশ্যাল মিডিয়ায় অলরেডি হাইপ ক্রিয়েট হয়ে গেছে! ফ্যানবেজ তো পুরো নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে। এমনকি নিউজ ছড়াচ্ছে যে এজেন্সিই নাকি অফিশিয়ালি এই খবরটা দিয়েছে। সবাই এখন কনফিউশনে আছে যে এটা কি স্রেফ রিউমার নাকি সত্যি!”
​ইমানি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দোতলার সিঁড়ি বেয়ে নামতে থাকা এক গম্ভীর কণ্ঠস্বরে পুরো হলরুম নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
​”কনসার্ট হবে; এজেন্সির সাথে আমি নিজেই কথা বলেছি।”
​সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আছে কেনীথ। পরনে কালো টাউজারের সাথে কালো রঙের টিশার্ট; টিশার্টের মাঝবরাবর ভ্যাম্পায়ার উইংস এর সাথে র’ক্তের ছিটেফোঁটা মিশ্রিত অদ্ভুত এক ডিজাইন।যদিও তার মতো মানুষের সাথে এটাই সামঞ্জস্য।
তার হাতের আঙুলে গিট পাকানো, লালচে চোখে সেই চিরচেনা রহস্যময় কাঠিন্য। কেনীথের কথা শুনে পাভেল আর ইমানি,দুজনেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
​ইমানি অবাক হয়ে বলল,

“ভি! তুই নিজে কথা বলেছিস? বাট হোয়াই? তুই তো মিউজিক থেকে লংব্রেক নিতে চেয়েছিলি। এখন হঠাৎ করে কেন?”
​কেনীথ ধীরপায়ে হেঁটে ওদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর নেই। সে নিচু স্বরে বলল,
“ইটস আ বিজনেস ডিসিশন, সুইঠি। ব্লাডেন ইন্ডাস্ট্রির জন্য এখন মার্কেটে বড় ধরনের একটা মুভমেন্ট প্রয়োজন। তাছাড়া…”
কেনীথ একটু থামল। সে কিছু একটা ভেবে নিয়ে আবারও বলল,
“তাছাড়া, আমার মনে হচ্ছে এবার স্টেজে ফেরা উচিত। অনেকদিন হলো অন্ধকারে থাকা হয়েছে, এবার একটু লাইমলাইটে আসা যাক।”

​পাভেল এখনো ঘোর থেকে বের হতে পারছে না। সে আমতা আমতা করে বলল,
“কিন্তু ভাই, তুমি কি সিওর? তোমার শরীর… মানে ডাক্তার তো বলেছে রেস্ট নিতে। আর গত একবছর ধরে যা হচ্ছে…”
​কেনীথ পাভেলের দিকে এক পলক তাকাল। সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পাভেল হঠাৎ সম্পূর্ণরূপে দমে গেল। কেনীথ শান্ত গলায় বলল,
“ডক্টর কি করতে বলেছে না বলেছে, তা কেবল আমার আর ডক্টরের মাঝে থাক। তোরা কালকের মধ্যে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট চেক করে দেখ; আই ওয়ান্ট এভরিথিং পারফেক্ট।”
​এই বলেই কেনীথ কিচেনের দিকে চলে গেল কফির জন্য। পাভেল আর ইমানি একে অপরের দিকে তাকাল। কেনীথের এই হঠাৎ পরিবর্তন কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে দুজনের মনেই বড় এক সংশয় দেখা দিল। পাভেলের পকেটে থাকা স্টেলার নীল খামটা তখনো তাকে খোঁচা দিচ্ছে; কিন্তু এই মূহুর্তে ইমানির সামনে আর কেনীথের এই মেজাজের মাঝে ওটা আর বের করার সাহস তার হলো না।

​কেনীথ কফির মগ হাতে ধীরপায়ে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। করিডোরের মাঝপথে আসতেই পেছন থেকে পাভেলের চাপা ডাক তাকে থামিয়ে দিল। ড্রয়িংরুমে ইমানি তখনো ফোনে ব্যস্ত, সম্ভবত এজেন্সির সাথেই কনসার্টের ডিটেইলস নিয়ে তর্কে মেতেছে। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল পাভেল।
​”ভাই!”
​কেনীথ থামল। ঘাড় ঘুরিয়ে পাভেলের দিকে একপলক নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল। পাভেল বেশ ইতস্তত করছে, তার ডান হাতটা পকেটের ভেতর অস্থির। শেষমেশ সে নীল রঙের সেই সুগন্ধিমাখা খামটা কেনীথের দিকে বাড়িয়ে দিল। কেনীথের দৃষ্টি মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। পাভেল পরিস্থিতি সামলাতে দ্রুত বলে উঠল,

​”ভাই, এখন কিছু বলো না প্লিজ। জাস্ট একবার সময় করে দেখে নিও।”
​কেনীথ কোনো কথা বাড়াল না। এক হাতে কফির মগ আর অন্য হাতে খামটা নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরের এক কোণে কার্পেটের ওপর বসে ছিল তার প্রিয় দুই সঙ্গী— কেনেল আর ক্লারা। কেনীথ টেবিলের কোণায় খামটা অযত্নে রেখে দিয়ে কফির মগে একটা দীর্ঘ চুমুক দিল। নিচু হয়ে কেনেল আর ক্লারার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তার আঙুলের স্পর্শে কুকুর দুটো যেন প্রফুল্ল হয়ে উঠল। কেনীথ ক্ষীণ স্বরে শুধালো,
“এভরিথিং ইজ ওকে, বাডিস্?”
​ওদের লেজ নাড়ানো আর উৎফুল্ল ভাব দেখে কেনীথের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে কফি হাতে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মিউনিখের রাতের আকাশ আজ একদম পরিষ্কার। তুষারপাত থেমেছে, চারপাশ এক মায়াবী নিস্তব্ধতায় মোড়া।
আকাশে রূপোলি চাঁদ উঠেছে, আর তার ঠিক পাশেই একটা উজ্জ্বল তারা একা জ্বলজ্বল করছে। কেনীথ একহাতে কফি আর অন্য হাত টাউজারের পকেটে গুঁজে একমনে সেই তারার দিকে তাকিয়ে রইল। হিমশীতল বাতাস তার অবিন্যস্ত চুলগুলোকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। অচিরেই তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস।
​ভেতরে ফিরে এসে সে টেবিলের ওপর রাখা সেই নীল খামটা হাতে নিল। খামটা খুলতেই নাকে এল কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ। ভেতরে জার্মান ভাষায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা,স্টেলার আবেগঘন এক দীর্ঘ চিঠি,
‘ভিকে, মাই ব্যাটম্যান।

জানি,হয়তো এই কাগজটা তোমার দামী কার্পেটে তীব্র অবহেলায় লুটোপুটি খাবে কিংবা হয়তো তোমার ওই কোল্ড এক্সপ্রেশনে কোনো রিপল তৈরি না করেই ট্র্যাশবিন-এ জায়গা করে নেবে। বাট স্টিল, আই কুডন্ট স্টপ মাইসেলফ। তোমাকে পাওয়ার অবসেশন আমার সর্বত্রে বিষের মতো ছড়িয়ে গেছে।
​ভ্যাম্পায়ার? মনস্টার? রেড ফ্ল্যাগ? লোকে তোমায় কত কি না বলেই ভয় পায়; বাট টু মি, ইউ আর অ্যা ডার্ক ফ্যান্টাসি। তোমার ওই রুক্ষ, অগোছালো চুলে আঙুল ডুবিয়ে দেওয়ার যে ক্রেভিং আমার ভেতর কাজ করে, তা হয়তো তুমি কোনোদিনও বুঝবে না। তোমার ওই আইসি কোল্ড লুক আর ডিভাইন অরা আমাকে প্রতি মুহূর্তে ডেস্ট্রয় করছে, তবুও আমি এই ধ্বংস হওয়াটা ইনজয় করি,করছি,করব।

​আই নো, আই অ্যাম বিয়িং ইমপ্র্যাক্টিক্যাল। আমার এই ওয়ান-সাইডেড লাভ হয়তো তোমার কাছে স্রেফ একটা চাইল্ডিশ জোক। কিন্তু ভিকে, আমার হার্টবিট যখন উন্মাদ হয়ে তোমার নাম জপে, তখন আমার কাছে লজিক বা রিয়ালিটির কোনো দাম থাকে না। আই অ্যাম ম্যাডলি, ডিপলি এন্ড ডে”ঞ্জারাসলি ইন লাভ উইথ ইউ।
​তুমিও কি কখনো এগুলো অনুভব করো? কখনো কি একটুও বোঝার চেষ্টা করো না আমায়? তুমি তো একটু হলেও জানো,আমি ঠিক কি ধরণের পরিবেশে বেড়ে উঠেছি; হয়তো অনেক কিছুই তোমার পছন্দ নয়, মানানসই নয়। তবে তুমি আমায় বলো সেসব, বলো এগুলো-ওগুলো ঠিক করতে হবে, তোমার জন্য আরো পার্টিকুলার হতে হবে; তুমি যাস্ট সেসব বলো আমায়, আমি চেষ্টা করবো। তোমাকে পাওয়ার জন্য আমি সবকিছু করব। আই প্রমিজ, আমি তোমার যোগ্য হয়ে উঠব।তবুও তুমি আমায় একটু বোঝার চেষ্টা করো!

আমি তোমায় ভালোবাসি ভিকে! গত কয়েক বছর ধরে লাগাতার তোমাকে পাওয়ার চেষ্টায়, আকাঙ্খায় আমি আজ পুরোপুরি পাগলে পরিণত হয়েছি। আমি জানি, তোমার জীবনে তেমন কেউ নেই যার জন্য তুমি বারবার আমায় দূরে ঠেলে দিয়েছো; তেমনটা হলে আমি নিজেই দূরে সরে যেতাম। আর তুমি দূরে ঠেলে দিয়েছো বললে বোধহয় ভুল হয়ে যায়,তুমি তো আমায় কখনো তোমার আশেপাশে ঘেঁষতে দেবারও সুযোগ দাওনি। ইট’স ওকে, আমি তাতে কখনো কিচ্ছু মনে করিনি। তোমাকে পাওয়ার নেশায় বহুআগেই শেইমলেস হয়ে গিয়েছি আমি। অথচ তুমি তবুও আমায় কখনো বোঝার চেষ্টা করোনা।
আচ্ছা তুমি কি সত্যিই এতোটাই হার্টলেস? আমার ভাগ্যে তুমি নেই—এটা মেনে নেওয়া আমার জন্য পসিবল নয়,ভিকে।প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। আই উইল ওয়েট ফর ইউ টিল মাই লাস্ট ব্রেথ, ইভেন ইফ ইউ হেট মি।
​ম্যাডলি ইন লাভ উইথ ইউ
স্টেলা।’

​চিঠির মাঝপথে আসতেই কেনীথের চোখের মণি জোড়া শক্ত হয়ে এল। “ভালোবাসা, আকাঙ্খা”—এই শব্দগুলো যেন তার মস্তিষ্কে সুক্ষ্মশলার মতো বিঁধল। সে এক মূহুর্ত স্থির রইল। কোনো প্রকার দ্বিধা বা আবেগ ছাড়াই চিঠির কাগজটা হাতের মুঠোয় পিষে দুমড়েমুচড়ে ফেলল। তারপর সোজা গিয়ে ওটা ডাস্টবিনে শান্ত ভঙ্গিতে ফেলে দিল।
​সে পুনরায় শান্ত ভঙ্গিতে কফির মগে চুমুক দিতে দিতেই তার রুমের বাম পাশের দেয়ালের দিকে তাকাল। সেখানে বিশাল এক ক্যানভাসে উন্মুক্ত হয়ে আছে,তার হাতে আঁকা রমণীর একজোড়া চোখের চিত্র। অদ্ভুত মায়াবী সেই চোখ জোড়া যেন অবলীলায় কেনীথের দিকে চেয়ে আছে। কেনীথ নজর ফিরিয়ে ক্লোজেটের দিকে এগিয়ে গেল। বাম দিকের পাল্লাটা খুলে একদম আড়াল থেকে বের করে আনল একটি পুরনো চামড়ার ডায়েরি।
​সে একমনে চেয়ে রইল সেই ডায়েরিটার দিকে। বাংলাদেশ থেকে ফেরার সময় সে এটা অবজ্ঞায় ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিল; তবুও শেষ মুহূর্তে কী এক অমোঘ আকর্ষণে ওটা তুলে নিয়ে এসেছিল নিজের সাথে। এই বিদেশ বিভুঁইয়েও কেনীথ ডায়েরিটা হাতছাড়া করেনি।

মহামায়া পর্ব ৩২

​কেনীথ পুনরায় ক্যানভাসের সেই মায়াবী চোখ জোড়ার দিকে তাকাল। তার একবার ইচ্ছে হলো ডায়েরির সব কটা পাতা উল্টে রমণীর কল্পনায় সাজানো নিজের অস্তিত্বকে পড়ে নিতে। কিন্তু পরক্ষণেই এক অদ্ভুত কাঠিন্য তাকে গ্রাস করল। সে ডায়েরিটা না খুলেই পুনরায় ক্লোজেটের গভীরে আড়াল করে রাখল।
অথচ তখনও তার নজর ছিল ডায়েরিটার সম্মূখের কভারে; সোনালী অক্ষরে জ্বলজ্বল করছে কেবল একটি নাম
‘তারা—নক্ষত্রমণ্ডলীর সম্রাজ্ঞী’।

মহামায়া পর্ব ৩৪