Home obsession vs love obsession vs love part 11

obsession vs love part 11

obsession vs love part 11
নিরুর কল্পনারাজ্য

—বাবা, আমি এব্রোড চলে যেতে চাই। সেখানেই আমি আমার বাচ্চাকে বড় করতে চাই!
সকাল সকাল বাগানে হাঁটতে এসেছিলেন শাহদাদ মির্জা। ভেতরে অনুষ্ঠানে তাগিদে ব্যস্ত সকলে। তবে ঝিলিকের এমন কথায় তিনি হতভম্ব হলেন। ঝিলিক বাবাকে দেখে-ই এদিকটা এসেছিলো। গতকাল রাতেই সে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷ শাহদাদ মির্জা ব্যস্ত হলেন। মেয়ের এমন কথাতে যেনো তার-ই ঘাম ছুটলো। তিনি বোধহয় কিছুটা ভয়ও পেলেন। বললেন,

—এ..এসব কী বলছো, তুমি মা? কে কী বলেছে তোমায়? ওই লম্পটটার জন্য এমন বলছো?
ঝিলিক বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছে-এখানে থাকলে সে নিজেকে সামলে উঠতে পারবেনা। আইয়ুশকে যতবার-ই দেখবে ততবার-ই ওর হৃদয় ভেঙে আসবে। তার চিন্তা-ভাবনাকে তো আর সে আটকাতে পারবেনা। এখন সে তার বাচ্চাটাকে নিয়ে চিন্তিত। ডক্টর বললেন, বেশি স্ট্রেসে থাকলে মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর সে আইয়ুশকে তারই আপন বড় বোনের সাথে সহ্য করতে পারছে না। তার মস্তিষ্ক মানতে অবাধ্য-আইয়ুশ তার সাথে প্রতারণা করেছে। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার ভেতর থেকে। হাসার চেষ্টা করে। বলে,
—না বাবা! আমি কখনোই অন্যকারও জন্য তোমায় কষ্ট দিবোনা। ব্যস, আমার শুধু এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না।
—তাহলে মামণি তুমি ঘুরে আসতে পারো। চাইলে তুমি সুইজারল্যান্ড যাও, ঘুরে এসো! তবু তুমি বাবার কাছ থেকে আলাদা কেনো হবে মা?
শাহদাদ মির্জার প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থা। হেসে ফেলে ঝিলিক তা দেখে। বাবার কাছে গিয়ে আলতোহাতে জড়িয়ে ধরে। এখনও হাতের ব্যাথা অক্ষত। বাম হাতে জোর নেই। শাহদাদ মির্জাও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। ঝিলিক মলিন কন্ঠে শুধায়,

—এতো ভালোবাসো তুমি আমায়, বাবা! আমার বুঝি কষ্ট হবেনা তোমায় ছাড়া থাকতে?
—বাবার প্রাণ তুমি, মা! বাবার হৃদয়ের অর্ধেকাংশ তোমার মায়ের হলে বাকি অর্ধেকাংশ তোমাদের। আমার মেয়েদের! আমার মেয়েদের আমি একফোঁটাও কষ্টে দেখতে পারিনা। বাবারা এমন-ই হয় মা!
ঝিলিকের মন ভার হয়ে এলো। সব বাবারা-ই কী ‘শাহদাদ মির্জা’ হয়? কিছু কিছু বাবা হয়তো ‘আইয়ুশ মির্জা’ ও হয়। যারা নিজের অনাগত সন্তানকে নিজের হাতেই মেরে ফেলতে চায়। অন্য নারীর জন্য নিজের স্ত্রীকেও ছেড়ে যায়।
কোথা থেকে যেনো তখন সাঁঝ এলো। ঝিলিক আর শাহদাদ মির্জাকে একসাথে দেখে আলতো হেসে এগিয়ে গেলো।
—বাবা-মেয়েতে কী কথা হচ্ছে আমায় ছেড়ে?
শাহদাদ মির্জা হেসে উঠলেন। একহাত বাড়িয়ে বড় মেয়েকেও কাছে ডাকলেন। ঝিলিক ও হাসে। বড় আপু! ছোটবেলা থেকেই যার সাথে বেড়ে উঠেছে। ঝিলিকের কোথাও কিছু একটা বিধলো। এমুহূর্তে ঝিলিক চায়লো না যেনো সাঁঝ কখনোই জানুক তার স্বামী তার ছোট বোনের সাথে কখনো জড়িয়ে ছিলো। সে নাহয় চলে যাবে। সেটা-ই তারা দু’বোনের জন্য ভালো হবে। ওই কাপুরুষের জন্য অন্তত তাদের সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে যাবেনা। সাঁঝও এসে জড়িয়ে ধরে বাবাকে। শাহদাদ মির্জা হাসলেন। দুই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বুক ভরে শ্বাস নিলেন। বললেন,

—এখন আমার নিজেকে পৃথিবীর সবচে সুখী মানুষদের মাঝে একজন মনে হচ্ছে।
ছাদ থেকে চৈতী চৌধুরী ডাকলেন তাদের। বোধহয় কাপড় শুকোতে দিতে এসেছিলেন তখন।
—বাহঃ জন্ম দিলাম আমি আর মেয়েরা হলো বাপভক্ত।
ওরা তিনজন-ই হেসে উঠলো। তিনিও হেসে চলে গেলেন। এসব তার রোজকার দেখা। ঝিলিকের মনে হলো-এইতো! সেসব সুন্দর দিনগুলো হয়তো আবারও ফিরে এসেছে। যখন তারা এমন সুন্দর; আনন্দে প্রতিটি দিন উদযাপন করতো। অথচ বাস্তবতায় কোথাও কিছু একটার পরিবর্তন হয়েছে। সাঁঝ-ই সেই জন যার জন্য আইয়ুশ তাকে ছেড়েছে। অবশ্য ঝিলিক কী আর একেবারের জন্য চলে যাচ্ছে? সে-তো আবারও ফিরবে! আরও শক্তিশালী হয়ে। ততদিন সব এমন-ই চলুক।
শাহদাদ মির্জা বড় মেয়েকে অন্য নামে সম্বোধন করলেন,
—এই যে আমাদের নতুন বউ। যান, আপনি বরং গিয়ে নিজের সাঁজগোঁজের বাহার সাজান।
সাঁঝ লাজুক হাসে। বাবা হঠাৎ এভাবে বলবে ভাবেনি সে। তিয়া সাঁঝকে খুঁজতে খুঁজতে এদিকটা চলে এলো। সাঁঝকে খুঁজে পেতেই গলা উচিয়ে ডাকলো,
—এই আমাদের নতুন ভাবি! এসো এসো, পার্লার থেকে সব এসে বসে আছে। পরে কিন্তু লেইট হয়ে যাবে বলে দিলাম। ঝিলিক তুই ও আয়।
সাঁঝ হতভম্ব। সবার আজ হলো কী? এভাবে সকলে সম্বোধন বদলে ফেলছে কেনো? অন্যরকম এক অনুভূতি হলো ওর। মলিন হলো তার হাসি। যে নাম সে পায়নি সে নামেই সে সকলের কাছে পরিচিত হচ্ছে। অথচ সে নাম পাওয়ার অধিকার সে রাখেনা। সাঁঝ চলে গেলো। সকাল থেকে তিয়া-তোতা, নির্ঝর রিসিপশনে কী কী করবে তা নিয়ে ভাবতে ব্যস্ত। ঐশী অবশ্য সেসবে কম থাকতেই পছন্দ করছে। সে ঝিলিকের সঙ্গ খুঁজছে। অথচ পাচ্ছেইনা ওকে। সাঁঝ চলে যেতেই ঝিলিক বাবাকে বললো,

—আসছি তবে এখন, বাবা!
শাহদাদ মির্জা মলিন স্বরে শুধান,
—একবার ভেবে দেখতে পারো মামণি।
ঝিলিক হাসে।সে তার সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ অটল। দৃঢ় কন্ঠে বলে,
—আমি আবারও আসবো তো, বাবা! কত হিসেব চুকানো বাকি আমার। আপাতত আমি একটু শান্তি চাই। ব্যস, এটুকুই।
ঝিলিক চলে আসে। গতকাল নির্ঝরকে ডক্টরের দেওয়া ওষুধগুলো আনতে দিয়েছিলো। এনেছে কিনা দেখতে হবে। সে উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় তার রুমের দিকে। অথচ সেখানে নির্ঝর নেই। নিশ্চয় কোথাও নিজের সৌন্দর্য চর্চায় ব্যস্ত। তিয়া-তোতার যেহেতু একটাই রুম সেহেতু সেঘরে যেতেই ভাইয়ের দেখা মিললো। মুখে কী যেনো মেখে বসে আছে বোনদের সাথে। চোখে দুটে শসা। ঝিলিক ভ্রু কুঁচকে শুধায়,
—ছোট ভাইয়ু, আমার ওষুধগুলো এনেছিলে?
নির্ঝরের এতক্ষণে মনে পড়ে ওষুধের কথা। মনে পড়তেই সে অপরাধীর ভঙ্গিতে বলে,
—ওহ শিট! ভুলেই গিয়েছিলাম প্রিন্সেস। এক কাজ কর, কোনো সার্ভেন্টকে পাঠিয়ে দে।
হতাশ হয় ঝিলিক। তিয়া-তোতাও বিরক্তিমুখে চেয়ে আছে তার দিকে। তিয়াতো বলেই ফেলে,
—তুমি এতো কেয়ারলেস কেনো ভাইয়ু?
নির্ঝর হাসে কেবল ক্যাবলার মতো। ঝিলিক বেরিয়ে আসে। তোতা ওকে ডাকে। বলে,

—ঝিলিক, তুই ও আয়না!
—না আপু, ওষুধগুলো খুব দরকার।
ঝিলিক খানিক বিরক্ত। এখন আবার ওষুধের জন্য কাওকে খুঁজতে হবে। আপাতত রুমে যাওয়া প্রয়োজন। ভেবেছে কাল সকালেই বেরিয়ে যাবে। অনুষ্ঠান শেষ হোক। আমেরিকার একটা দারুণ ইউনিভার্সিটিতে ওর এডিমশন করিয়ে দিয়েছে সেখানে থাকা তার এক বান্ধবী। ওর সাথেই থাকবে, গার্লস হোস্টেলে!এতোকিছুর চিন্তায় ওর মাথা ধরে গেলো। রুমে না গিয়ে কিচেনে গেলো। মা-চাচিরা সব অন্যান্য কাজে ব্যস্ত। সার্ভেন্টরা ঘর-দোর পরিষ্কার সাথে ডেকোরেশনের দিকটা দেখছে। ফলস্বরূপ রান্নাঘরে কেও নেই। ঝিলিকের করার-ইবা কী আর! গিয়ে কফিমশিন থেকে কফি বানিয়ে নিলো। আইয়ুশ বোধহয় কোনো কাজে এসেছিলো! ঝিলিককে এখানে দেখে কপালে ভাঁজ পড়লো। বিমূঢ় কন্ঠে শুধালো,

—তুমি এখানে কী করছো?
ঝিলিক শোনে অথচ উত্তর দেয়না। আইয়ুশ গিয়ে কফির কাপ হাতে তুলে নেয়। নিয়মে-অনিয়মে কফি খাওয়া তার অভ্যেস। আইয়ুশ আরও একবার উঁকি দিলো। যদি হাতে ফেলে দেয় কফি? ঝিলিক নজর দিলোনা অবশ্য সেসবে। আইয়ুশের অসহ্য লাগলো। ঝিলিক এতোদিন তার সাথে ঝগড়া করেছে হলেও। কিন্তু কথা তো বলেছে। অথচ আজ একদম নীরব। আইয়ুশ ফের বাহানা করে কথা বলার,
—তোমার হলে সরো!
ঝিলিক বিনাবাক্যে সরে আসে। চলে যায়। আইয়ুশ সেদিকপানে তাকায়। ডক্টরের কাছ থেকে আল্ট্রার একটা ছবি ও নিয়েছে। সেটা নিজের ওয়ালেটে রেখেছিলো। একদম ঝিলিকের ছবির পাশাপাশি। আইয়ুশ সেটা বের করে। আইয়ুশ ভেঙে পড়লেই এমন করে। ছেলেটা তার প্রেয়সীর দেওয়া আঘাত; তার প্রেয়সীর কাছে গিয়েই সারাতে চায়। ঝিলিক খারাপ ব্যবহার করবে। তা তো সে জানতোই। তবু ওর খারাপ লাগে। অবশ্য সে এটার-ই যোগ্য। প্র্যাগনেন্সির মতো ক্রিটিকাল এক সময়ে কারও স্বামী যদি দ্বিতীয় বউ নিয়ে হাজির হয় তা কোন নারীইবা সহ্য করবে! কিন্তু ঝিলিকের এই নীরবতা ওকে আরও বেশি আঘাত করছে।

দেখতে দেখতে সন্ধ্যাপ্রায়। অতিথিদের আনাগোনা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তিয়া-তোতা তৈরী। ঐশী সারাদিন পালাই পালাই করলেও অনুষ্ঠান বাড়িতে তো আর বসে থাকতে পারেনা। ওর মন কোথাও একটা বিঁধছে বারংবার। মনে হচ্ছে, ঝিলিক বোধহয় এসব সহ্য করতে পারবেনা। অথচ তবু অপারগতায় ও তৈরী হয়। যাওয়ার সময় ওর দেখা হয় নির্ঝরের সাথে। নির্ঝর খুব সুন্দর কারুকাজের এক পাঞ্জাবি জড়িয়েছে গায়ে সাথে একটি ওড়না। দেখতে অসম্ভব সুন্দরই লাগছে। কারও সাথে কথা বলছে বোধহয় ফোনে। প্রচন্ড বিরক্তি ওই মুখখানাতে। ঐশী এগিয়ে গেলো। ওর মুখোমুখি দাঁড়ালো। নির্ঝর ইশারাতেই শুধালো,
—কী চাই?
ঐশী ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলো। নির্ঝর ফোন রেখে দিলো। ভাবলো-হয়তো জরুরি কোনো আলাপ হবে তার। ফোন রেখেই শুধালো,

—কী হয়েছে?
ঐশী ভ্রু শিথীল করলোনা। বরং বিরক্তি ঝেড়ে বললো,
—এই ওড়নাটা কার?
নির্ঝর মুক কু্চকে বললো,
—ওড়না? কোন ওড়না?
—তোমার মতো বাদরের গলায় যেটা ঝুলিয়ে রেখেছো ওটাই!
নির্ঝর এবার নিজের দিকে তাকায়। ওর গলায় ও ওড়না পেঁচিয়েছে। কার তা জানেনা অবশ্য। তিয়াদের রুমেই ছিলো। দেখলো-ওর পাঞ্জাবির সাথে মানাচ্ছে তো ঝট করে জড়িয়ে নিয়েছে গলায়। নিজেকে পরখ করা শেষে বলে,

—ওহ, এটা? জানিনা এটা কার। তিয়া-তোতার ঘরে পেলাম। ওদেরই হবে হয়তো!
—না ভাই। ওদের না। ওটা আমার। আমি আরও খুঁজে মরছি।
—জানতাম না তোর! নাহলে এই নির্ঝরও আবার তোর জিনিস গায়ে দেয়? ধর নে!
নির্ঝর ওড়নাখানা গলা থেকে খুলতে চায়। তাতে বাধ সাধে ঐশী,
—আচ্ছা লাগবেনা। পড়েছো যখন পড়েই থাকো!
মুখটা কেমন পেঁচার মতো করে চলে এলো সে। নির্ঝর মনে মনে বিড়বিড়ালো,
—এই দুই ভাই-বোন একই ধাঁচের কীভাবে হলো! সারাক্ষণ মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে রাখে।
অথচ নির্ঝর দেখেনা-যেতে যেতে ঐশী নামক রমণীটির হাসির মাত্রা!

আইয়ুশ নিজের রুমে। তার ইচ্ছে করছে না নিচে যেতে। বিরক্ত হয়ে শুয়ে আছে বিছানায়। ওদিকে সাঁঝকে তৈরী করানো শেষ। আপাতত তাকে পাত্র-পাত্রী বসানোর জন্য তেরীকৃত জায়গাটাতে বসানো হয়েছে। একা-ই বসে আছে এমনটা নয়। তার বিভিন্ন বন্ধু-বান্ধব আর গেস্টরা আসছে আর তাকে সংবর্ধনার সাথে সাথে বিয়েতে আমন্ত্রণ না জানানোর জন্যেও কথা শোনাচ্ছে। সাঁঝ আপাতত সেসব হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝেই বরকেও দেখা গেলো। তাকে নির্ঝর আর তিয়া নিয়ে আসছে। আইয়ুশের অনিচ্ছার সত্ত্বেও সে এখানে এসেছে। বাধ্য হয়ে। নাহয় যদি সকলের মনে সন্দেহ জাগে? সে গিয়ে সাঁঝের পাশে বসে। ছোটরা সকলে হৈচৈ ফেলে দেয়। বড়রা অন্যপাশে গেস্ট সামলাতে ব্যস্ত। আইয়ুশের চোখদুটো তখন ঝিলিককে খুঁজছিলো। মেয়েটা এখানে না আসলেই ভালো। চারিদিক তাকিয়ে তোতা বলে,

—এই, আমাদের ঝিলিক কই রে?
তিয়া উত্তর দেয়,
—কে জানে! ওকে তো দেখছিনা অনেকক্ষণ হলো!
মাঝেই নির্ঝর বলে ওঠে,
—এক কাজ করি! আমি গিয়ে ডেকে আনি।
আইয়ুশের মেজাজ খারাপ হয়। ডাক দেয় ও নির্ঝরকে৷ শক্ত কন্ঠে বলে,
—দরকার নেই আইয়ুশ, যে যার মতো থাকুক!
ভ্রু কুঁচকে ফেলে ওরা সকলেই। সাঁঝ বলে,
—কীসব বলছেন? আমার বোনটা থাকবেনা কেনো?
তাদের কথার মাঝেই পুরো মহল হুট করে চুপ হয়ে গেলো। সাথে বাড়লো সকলের কানাঘুষা। সিঁড়ি বরাবর নেমে আসছে ঝিলিক। পরণে তার গাঢ় লাল একখান শাড়ি। ফর্সা শরীরে তা এতো মানিয়েছে। অর্নামেন্টস সব ডায়মন্ডের বোধহয়। চিকচিক করছে। ওকে দেখে এমন মনে হচ্ছে-আসমান থেকে কোনো পরি নেমে আসছে৷ হ্যাজেল রঙের চোখদুটো লাইটের আলোতে তখন আরও বেশি জ্বলে উঠছে। যেনো একজোড়া তারা নেমেছে তার চোখে। ঠোঁটে অবশ্য মিষ্টি হাসি। পরিবারের সকলের চেয়ে তুলনামূলক বেশি ফর্সা এই রমণী। এ দেশের তুলনায় আরও বেশি। তাছাড়া ওর চোখের রঙ এ বংশের কারো নেই। ঝিলিকের উপর তখন অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল পুরুষদের নজর। তাকিয়ে আছে সবাই ওর দিকে্ আইয়ুশ ও ব্যতিক্রম নয়। সেও তাকায়। অন্যরকম সে চাহুনি। ঝিলিককে দেখেই তার চোখে সর্বদা মুগ্ধতা কাজ করে। আজও একই! সেই একই মুগ্ধতায় সে চেয়ে থাকে তার পানে। অথচ ঠিক একই রমণীর পানেই অন্যএকজন পুরুষ তাকিয়ে রয়েছে। তবে সে চোখে কী মুগ্ধতা রয়েছে? উঁহু! একদমই নেই। রয়েছে কেবল অন্যরকম এক চাহুনি যাকে বলা হয় ‘জেদ!’
ঝিলিক নিচে নামতেই তিয়া-তোতা দৌড়ে আসে। বলে,

— তোকে তো একদম ঝাক্কাস লাগছে রে!
—হ্যাঁ। সবাই তাকিয়ে আছে!
ঝিলিক হাসে। আইয়ুশ তা দেখে। চারিপাশ তাকাতেই ওর চোখের মুগ্ধতা হারিয়ে যায়। আদলে ভর করে হিংসা। ঝিলিক হাসছে? এতগুলো ছেলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে আর ও হাসছে। ওর মেজাজ তুঙ্গে তুলতেই বোধহয় সেখানে আগমন ঘটে সায়নের। সায়ন এসেছে ওসমান মির্জার সাথে। ওসমান মির্জা ওদের তিনজনের সাথে ওকে দেখা করিয়ে দেয়। সাথে নির্ঝরকেও ডাকে। ঐশীও আসে। ওদের পাঁচজনকে একত্রে বলে,
—এই যে, উনি কিন্তু তোমাদের ছোট বোনের স্যার হন। বেচারা একা একা এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে? ভাবলাম তোমাদের সাথেই বসিয়ে দিই!
বলেই হাসলেন তিনি। সায়ন ও হাসে অবশ্য। সাথে ঝিলিকও। আইয়ুশের হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসে। কপালের রগ ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। ও চেয়েও নিজেকে শান্ত করতে পারেনা। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে রাগে। ওদিকে সাঁঝ যে তার পাশে বসে তার সেদিকে একবিন্দুও নজর নেই। মনে মনে আওড়ায় ও,

—এমন বাপ থাকলে এইজনমে আর শত্রুর দরকার পড়বে কোন ছেলের?
ঝিলিক একপলক আঁড়চোখে তাকায় ওর দিকে। আইয়ুশ দেখতে না পায় মতো। ওর হাসি পেলো ওকে দেখে। অবশ্য পাশে বসা সাঁঝকে দেখে হাসি মিইয়ে গেলো সাথে সাথে। পরিবর্তে চোয়াল শক্ত হলো। ঝিলিক খুব ভালো করেই জানে-আইয়ুশ তাকে অন্যকারো সাথে দেখতে পারবেনা। ঝিলিক যেহেতু চলেই যাবে আগামীকাল সেহেতু সে কেনো একা কষ্ট পাবে? কেনো-ইবা একা জ্বলে-পুড়ে মরবে? আইয়ুশ ও দেখুক। ওর ও তো দেখা দরকার; জানা দরকার যে ও কী হারিয়েছে! ঝিলিক মির্জা ইজ নট ফর প্লে! এবং এটা ওর বোঝা উচিত। ঝিলিক ওকে দেখানোর জন্য সায়নের সাথে কথা বলতে শুরু করে। বলে,

—স্যার, আপনি এসেছেন আমি খুব খুশি হয়েছি।
সায়ন হাসে ওর কথাতে। পরণে ওর ফর্মাল পোশাক; গাঢ় নীল চোখদুটোতে হাসির ঝিলিক। সায়ন প্রত্যুত্তরে বলে,
—মি অলসো, নাইস টু মিট ইউ ডিয়ার স্টুডেন্ট!
ঝিলিক হাসে কেবল। স্টুডেন্ট তো আজ অব্দি, কাল তো চলেই যাবে ও। বেচারা শুধু শুধু কষ্ট করে এখানে এলো। যেখানে ও থাকবেইনা সেখানে এখানে এসে সময় নষ্ট ছাড়া আর কীই-বা হচ্ছে ওর?

obsession vs love part 10 (2)

আইয়ুশ আর সাঁঝের থেকে বেশ কিছুটা দূরে হলেও ঝিলিক কথাগুলো একটু জোরেই বলছে। ফলস্বরূপ ও সবই শুনেছে প্রায়। না পেরে চোখ ঘুরিয়ে নেয় আইয়ুশ। রাগ সামলাতে না পেরে চোখ বুজে ফেলে। রক্তিম হয়ে উঠেছে চোখদুটো। সাঁঝ তা দেখে ঘাবরায়। ওর কাঁধ ছুঁইয়ে উদ্বীগ্ন বলে,
—শরীর খারাপ করছে নাকি আপনার? এই?
আইয়ুশ তাকায় ওর দিকে, রক্তচক্ষু নিয়ে! সাঁঝ মিইয়ে যায়। পরক্ষণেই সাথে সাথে হাত সরায় কাঁধ থেকে।

obsession vs love part 12