Home obsession vs love obsession vs love part 22

obsession vs love part 22

obsession vs love part 22
নিরুর কল্পনারাজ্য

—তার মানে বস জানতেন যে ঝিলিক প্র্যাগনেন্ট?
‘কাজলনন্দিনী’ মেনশনে নিকোলাস উপস্থিত হয়েছে আজ, এখনও ভোর হয়নি৷ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তাকে জরুরি ভিত্তিতে ডাকা হয়েছে। সে দাঁড়িয়ে সায়নের স্টাডিরুমে আর রকিং চেয়ারে আবর্তমান পুরুষটি গম্ভীর মুখে একটি রিপোর্ট সাথে আল্ট্রার ছবি হাতে নিয়ে অতি সূক্ষতায় পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। নিকোলাসের মাধ্যমে এই সকল কিছু আজ-ই আয়োজন করেছে সে। বহুকষ্টে ঝিলিকের প্র্যাগনেন্সি রিপোর্টখানা সংগ্রহ করে সায়নের কাছে তা জমা দিয়েছে। আপাতদৃষ্টে কোনো উন্মাদ প্রেমিকার দেহে অন্যকারো স্পর্শ প্রেমিক সহ্য করতে পারেনা। তবে নিকোলাসের কাছে রুশ ক্রিমিনাল এমকে কে ব্যতিক্রম ধর্মী কোনো পুরুষ মনে হলো। এতোটা গুরুগম্ভীর ভঙ্গিমায় সে রিপোর্টটি দেখছে যেনো তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ডিলের কাগজ অথচ তা তার প্রিয় নারীর দেহে অন্য পুরুষের গাঢ় চিহ্নর প্রলেপন। নিকোলাস কঠিন মুখে সায়নকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। সায়নের তরফ হতে কোনোরকম আজ্ঞা না আসায় সে-ই মুখ খুললো। বড্ড গম্ভীর স্বরে কাঠিন্যতা বজায় রেখে বসকে শুধালো,

— বস, আপনি জানতেন যে সে গর্ভবতী?
সায়ন রিপোর্ট হতে চোখ সরায়। তেত্রিশ বছরের এক পরিপূর্ণ পুরুষ হয়েও সৌন্দর্য্য তার চাঁদবদনখানি। প্রতিটি ঝলকেই যেনো শুভ্রতার ঝিলিক ঝড়ে পরে। সায়ন সূক্ষ হাসে। গম্ভীর-পৌরুষসিক্ত স্বরে জবাব দেয়,
— ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল এমকে প্রেমে পড়েছে নিকো। সে প্রেমে পড়েছে, কথাটির ভয়াবহতা সম্পর্কে তোমার ধারণা আছে?
সেই একই ভঙ্গিতে নিকোলাস উত্তর দিলো বাধ্য এক সৈনিকের ন্যায়,
— ইয়েস বস!
— দ্যান হাউ ক্যান ইয়্যু থিংক দ্যাট আই ডোন্ট নৌ এবাউট ইট। আমি জানি, এমন কিছু তথ্য জানি ওর সম্পর্কে যা সে রমণী নিজেও জানেনা।
নিকোলাস গম্ভীর হয়। বুকে টান টান পেশিযুক্ত বাহু গুঁজে প্রশ্ন করে,
— বস, আপনার প্রেয়সীর যা পাওয়ার তাতে হয়তো আপনি নিজেও ধ্বংস হতে পারেন….
রাশিয়ার কুখ্যাত ক্রিমিনাল ক্রমাগত হাসে। কৌতুক শোনানো হয়েছে নাকি তাকে? এভাবে হাসছে কেনো? নিকোলাসের তো মোটেই হাসি পাচ্ছেনা। তাহলে? সায়ন প্রত্যুত্তরে বলে,

— প্রেয়সীর শরীরে অন্য পুরুষের চিহ্নকেও যে ভালোবাসতে পারে; তার হেতুতে ধ্বংস অনিবার্য জেনেও কী তাকে ছাড়া যায়?
নিকোলাস এবার গম্ভীর হয়। ভীষণ গম্ভীর। বসের মতিগতি তার কাছে সঠিক ঠেকছেনা। এই পুরুষটিকে সে খুব ভালো করে চেনে। বহু আগের পরিচয় কিনা। নিকোলাস কিছু বলার জন্য মুখ খোলে। বলে,
— বস, সামনেই আমাদের একটা ড্রাগ ডিল হ্যান্ডেল করতে হবে। ম্যাভিয়াস কেইভার হওয়ার দরুণ তারা আমার সম্পর্কে কোনো ক্লু না পেলেও তারা ম্যাভিয়াস কেইভারের অতীত সম্পর্কে এখনও খোঁজ করে যাচ্ছে এমন তথ্য পাওয়া গিয়েছে। আর এই সুযোগে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল ড্রাগডিলার মেহউইশ রিকার্ডোর সাথে শেষ মিটআপে বসা উচিত।
সায়ন প্র্যাগনেন্সি রিপোর্টখানা রাখে। টেবিলে থাকা একটি বল আকারের ধাতব কাঁচের বস্তু হাতে উঠিয়ে তাতে তীক্ষ্ণ নজর নিবিষ্ট করে। বলটি নিয়ে খেলতে খেলতে সে হঠাৎ গম্ভীর এবং বেশ পড়ফেশনাল হয়ে ওঠে। বলে,

— এরেঞ্জ এভ্রিথিং ইন চিটাগং। ঢাকায় কড়া সিকিউরিটি থাকতে পারে। চিটাগাং এর পার্বত্য অঞ্চগুলোতে অথবা লোকচক্ষুর আড়ালে কয়েকটি স্থান খুঁজে বের করো। কালকের মধ্যেই তাকে ফ্লাইট বুক করে বিডিতে আসতে বলো। সাথে স্বর্ণের বারগুলোও। উনি আমাদের গোল্ডবার ট্রান্সফার করার পর আমাদের ড্রাগের কিছু স্যাম্পল দেখাবে এবং বাকি ড্রাগ কার্গোশিপে করে ব্রাজিলে যাবে।
নিকোলাস প্রচন্ড মনোযোগ সহকারে এসকল কথা শুনলো। একরত্তি বাড়তি কথা না বলে কেবল বললো,
— ওকে বস!
সায়ন সূক্ষ্ম হাসে। নিকোলাস বেরিয়ে যাওয়ার তাগিদে বলে,
— আসি বস!
সায়ন মাথা নাড়ে। নিকোলাস বেরিয়ে যায়। ম্যানশন থেকে বেরিয়ে পেন্থ হাউজে গিয়ে সকল ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক কাজ! এতোসবের মাঝেও একটা ঘটনা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এই প্রথমবারের মতো সে সায়নের কাছ থেকে কিছু লুকিয়েছে, এমন কিছু যা তাদের ধ্বংসের কারণও হতে পারতো। তিয়া কথাটা সম্পূর্ণরূপে এড়িয়ে গিয়েছে সে। তিয়ার কথা মস্তিষ্কে হানা দিতেই সে বিরক্ত হলো। কপাল স্লাইড করতে করতে ড্রাইভারকে বললো,
— ড্রাইভ ফাস্ট!

গতকাল আইয়ুশ বাড়ি থেকে বেরোয়নি। ছাদের চিলেকোঠায় তার অবস্থান হয়েছিলো। এই চিলেকোঠা তার একান্ত পছন্দের। ভীষণ সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত জড়িয়ে রয়েছে তার সাথে ঝিলিকের। কতগুলো সময় এই চিলেকোঠায় কাটিয়েছে তারা। বই পড়েছে একসাথে, বই পড়ার ফাঁকে ফাঁকে প্রেম। আইয়ুশের হাসি পায় সেসব চিন্তাভাবনা করে। ঝিলিক যেদিন তাকে জানিয়েছিলো সে প্র্যাগনেন্ট তার প্রায় কিছুদিন আগেই আইয়ুশ ব্যাপারখানা বুঝে নিয়েছিলো। হতে পারে তা তার পিরিয়ড সার্কেলের মাধ্যমে অথবা তা হতে পারে ঝিলিকের প্রায় হঠাৎ হঠাৎ তার দূর্বলতার নালিশ জানানোতে। আইয়ুশের মনে পড়ে সেসময়গুলো। প্রথম যেবার তারা ঘনিষ্ঠ হয়েছিলো। প্রথম যেবার আইয়ুশ ঝিলিকের ওপর সর্বোচ্চ অধিকারবোধ পেয়েছিলো। তারিখ, সময়, সেকেন্ড সবই তার মস্তিষ্কে অকপটে ভেসে উঠলো ধীরে ধীরে। মস্তিষ্কের প্রতিটি অংশ ঝিলিকের সর্ব রন্ধ্র সম্পর্কে ধারণা রাখে। আইয়ুশ ঝিলিককে ভালোবাসে! ভীষণ ভালোবাসে। ভালোবাসার পরিধি যদি মাপা হয় তবে কত হবে? এক সমুদ্র গভীর? নাকি এক আকাশসম স্নিগ্ধ? হয়তোবা প্রতিটি মোনাজাতে তাকে চাওয়ার ন্যায় তা স্বচ্ছ হবে অথবা প্রতিটি দোয়ায় সবার আগে ঝিলিকের সুস্থতা কামনা করার ন্যায় তা নিখাদ! তাকে কষ্ট দেওয়ার পূর্বে সে নিজে কতটা কষ্টে ছিলো তা তো কেবল সে-ই জানে। শারীরিক-মানসিক! উভয়দিকেই তার ওপর চাপের সৃষ্টি হয়েছিলো। ধুরন্দর মস্তিষ্ক তার মুহূর্তেই সজাগ হলো। এই শেষ সময়টায় মোটেই তাকে আবেগে গা ভাসালে চলবেনা। এখনই তো তার প্ল্যানগুলো এক্সিকিউট করার সময়। কেবল শুরু হলো এই খেলা। শেষ কোথায় গিয়ে আটকাবে সে জানেনা। জানে কেবল, এই খেলায় হতে পারে সে বেঁচেই না থাকলো। অকপটে হাসি পেলো তার। ফোন বের করে ঝিলিকের ছবি বের করলো। ফোনের ওয়ালপেপারে ভাসছে ঝিলিক আর তার হাস্যোজ্জ্বল ছবি। সেসময়গুলো কতো সুখকর ছিলো। সে যেনো নিজমনেই আওড়ায়। বলে,

— প্রাণ আমার! আমি যদি এই খেলায় বেঁচে না থাকি তবে কী তুমি আমায় ভুলে যাবে? কখনো কী জানতে পারবেনা কতোটা ভালোবেসেছিলো এই অধম তোমায়? তুমি কী কখনোই জানতে পারবেনা এগারো বছর ধরে আমার সকল মোনাজাতের ফলস্বরূপ আল্লাহপাক তোমায় আমার করেছিলো?
থামে সে। পরপরই আনমনে ভাবে,
— আল্লাহতায়ালা পরীক্ষা নেন। তার বান্দাদের তার প্রতি আস্থার পরীক্ষা নেন। ধৈর্য্য দেখেন। আমি এভাবে হার মানবোনা, ঈমানী শক্তির কাছে কখনো পাপ টিকতে পারেনি। আমি সর্বোচ্চটা দিয়ে আগলে রাখবো আমার প্রাণকে!
তখনই ফজরের আজানের শুভ্র ধ্বনি কর্ণকুহর হয় তার। আইয়ুশ চোখ বুজে মসজিদের মাইকে ধ্বনিত হওয়া প্রতিটি শব্দ শোনে সে।

ভোরের দিকে বৃষ্টি হচ্ছে। আইয়ুশ নিচে নামার পরিবর্তে নামাজটা চিলেকোঠায় সেরেছিলো। বর্তমানে তুমুলবেগে বৃষ্টির অবরোহণ ঘটছে। আইয়ুশ নামাজ সেরেছে অনেকক্ষণ। এখন বাজে ছ’টা। এই প্রভাতে সে বৃষ্টির সুস্নিগ্ধ প্রাকৃতিক দৃশ্যে মাতোয়ারা হয়ে সেদিকপানে চেয়ে থাকে। হঠাৎ করেই সেখানে লাল-কমলা মিশ্রণ কেশের এক রমণীর আগমন ঘটে। ঘটনার প্রবাহ সম্পূর্ণ আকস্মিক হওয়াতে আইয়ুশ চোখের পলক ফেলার মতো সময় পায়না। সে স্তব্ধ হয়ে থাকে। ঝিরিঝিরি ধারায় পড়তে থাকা বৃষ্টির মাঝে একরত্তি সুখ হিসেবে গোছানো চুলের সম্ভার সাথে অতিফর্সা আদলের এক রমণী। আইয়ুশের মস্তিষ্ক কাজ করেনা; বুঝে উঠতে পারেনা এটা কী ভ্রম নাকি সত্য!
ঝিলিক আপনমনে বৃষ্টিবিলাসে মত্ত, আশপাশ খবর নেই একদমই। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা তার শরীরে বহমান; তাকে এই বৃষ্টি যেনো আরও অধিক মোহময়ী করে তুলছে। সারা শরীর বৃষ্টির জলে ভেজা; এমনকি কাপড়ের ভাঁজ পেরিয়ে শরীরের পড়তিটি খাঁজ স্পষ্ট। তবু আইয়ুশের দৃষ্টি আটকে রইলো—বৃষ্টির জলে ভিজে ওঠা স্নিগ্ধ উজ্জ্বল-ফর্সা মুখখানার পানে!

যেনো ওই মুখখানাতেই তার পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড লুকিয়ে আছে। সে খানিকটা সময় চেয়ে রয় তার পানে। ঘোরের মাঝে আটকে যায়। টনক নড়ে তখনই যখন জোরে একটি বজ্রপাতের শব্দ হয়। ঝিলিক বজ্রপাতে ভয় পায়। কুঁকড়ে ওঠে খানিক। বেশ বড়সড় ছিলো কিনা। ফের ঠিক হয়। অথচ ততক্ষণে আইয়ুশ দৌড়ে আসে। বৃষ্টিতে ভিজে যবুথবু হলো তার পরনের সাদা টি-শার্ট সাথে সুন্দর ফ্লো তে থালা চুলগুলো। এসেই এক অবাক করা কান্ড করে বসলো। হঠাৎ করে জড়িয়ে ধরলো সে ঝিলিককে। আষ্টেপৃষ্টে। ঝিলি যারপরনাই অবাক হলো। ওর মাথা গিয়ে ঠেকলো আইয়ুশের শক্তপোক্ত বুকে। ঝিলিক হতভম্বতায় কথা বলতে পারলোনা। সে ইতোমধ্যে বুঝে গিয়েছে এই লোকটি কেবল একজনই হতে পারে–সে হলো আইয়ুশ! আইয়ুশের বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের পারফিউম-ই তার প্রমাণ দিচ্ছে। ঝিলিকের হৃদস্পন্দন বেড়ে গেলো। আইয়ুশেরও কী একই অবস্থা? ধুকপুক করছে কেনো তার বুক?দুজনের তপ্ত শ্বাস একে অপরের ঘাড়ে উন্মুক্ত। বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটায় ও ঝিলিক আইয়ুশের তপ্ত শ্বাস অনুভব করতে পারছে। ঝিলিক ভ্রু কুঁচকে সরতে চায়। আইয়ুশ খানিকটা শক্তি বাড়িয়ে মাথা এবং পিঠ তার দু’হাত দ্বারা আরও ভালো করে পেঁচিয়ে ধরে। যেনো ছাড়লেই সে হারিয়ে যাবে। ভেতরের উন্মাদনা সে ঝিলিকের পরশে গায়েব করতে চাইছে কী? হয়তোবা তাই-ই!

ঝিলিক আবারও হতবাক হয়। এ’পুরুষের হলো কী? পরমুহূর্তেই সে নিজেই সরে আসে। বৃষ্টির পরশের কারণেই হয়তোবা ঝিলিকের অনুভব হলোনা আইয়ুশের অশ্রুধারা যা তার সুকোমল চুলে এতক্ষণ ঝরছিলো অঝোর ধারায়। ঝিলিক যখন তাকে দেখে তখন সে অবাক হয়। চোখদুটো টকটকে লাল। গোলাপি অধরযুগল তিরতির করে কাঁপছে। চোখেমুখে গম্ভীর দেখানোর অযথা প্রয়াস। আইয়ুশ শুষ্ক ঢোক গিললো। গম্ভীর করা চেষ্টা করে নিজেকে ঝিলিকের উদ্দেশ্যে বললো,
— সাত সকালে বৃষ্টিতে ভিজছো কেনো? জ্বর আসবে না? এটা নিজের জন্য সাথে যে আসছে তার জন্যও খারাপ। নিচে গিয়ে তাড়াতাড়ি চেইঞ্জ করে নাও।
ঝিলিক ভ্রু কুঁচকালো। বললো,
— আপনাকে কতবার বলেছি আমার থেকে দূরে থাকতে? আমাকে স্প….
আইয়ুশ ঝিলিকের কথা অসম্পূর্ণ রেখে বলে,
— নিচে যাও দ্রুত। বৃষ্টিতে ভিজিও না এভাবে নিজেকে।
দুজনের মাঝে খনিকের নীরবতা বয়ে যায়। তুমুল বৃষ্টির মাঝে একে অপরের বক্ষপিঞ্জরের অবাধ ওঠানামা প্রমাণ করে তাদের ভেতরের অস্থিরতা। আইয়ুশের ইচ্ছে করে ঝিলিককে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। অথচ তা অসম্ভব। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ঝরে যাচ্ছে অঝোরে। অতি জোরে। তুমুল বর্ষণে তাদের ভিজিয়ে দিচ্ছে। কেবল চারিপাশে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। এই শব্দকে পিছু মারিয়ে ঝিলিক নীরবতা ভঙে, বলে,

— এতো চিন্তা কিসের আপনার এই বাচ্চাটার জন্য? কে হয় এই বাচ্চাটা আপনার?
আইয়ুশ উত্তর দিতে পারেনা। কন্ঠনালি ভেঙে আসে। দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে পা বাড়ায় নিচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। ঝিলিককে কেবল বলে যায়,
— নিচে যাও!
অথচ মনে মনে ফিরতি পথে বলে,
— সে অযত্নে বেড়ে ওঠা এক প্রিয় জিনিস আমার!
এসবকিছু অনতিদূর থেকে পর্যবেক্ষণ করে সাঁঝ। আইয়ুশ দেখতে পায়না তাকে। সে আসার আগেই সরে পড়েছিলো কিনা। সে তাকিয়ে থাকিয়ে থাকে সেদিকপানে। রাগে নাকি কষ্টে বলা মুশকিল! তবে তার ভেতর হতে কান্নারা উগরে আসে।
অপরপার্শ্বে ঝিলিক তাকিয়ে রয় আইয়ুশের যাওয়ার পানে। সে বুঝে উঠতে পারেনা আইয়ুশ এতো সকাল সকাল কোত্থেকে উদয় হলো। এ মুহূর্তে যদি কিছু মাথায় ঘোরে তা কেবল সেই ধাঁধাটুকু! যা গতরাত মিলিয়েও সে সমাধান মেলাতে পারেনি। খটকা যেখান থেকে তার শুরু হয়েছিলো।
— মরুভূমির বালুচরে হারিয়ে গিয়ে এক ফোঁটা জল ভেবে ছুটছো যার পেছনে তা কী আসলেই তৃষ্ণা নিবারণকারী জল নাকি কোনো মরিচিকা?

— আমি এই বিয়ে করতে পারবোনা মা!
মালিহা বেগম বিরক্ত হলেন। বললেন,
— কেনো পারবেনা তুমি? বলো? কী সমস্যা? এই এক কথা কেনো বারবার বলছো?
ঐশি গম্ভীর মুখে বললো,
— পারবোনা! তুমি এইসব জেদ বন্ধ করো।
— দেখো ঐশী, ছেলেটা ভালো। ডিফেন্সে জব করে। তাহলে এতোটা ডেস্পারেট কেনো হচ্ছো তুমি?
ঐশী এ’কথার উত্তর দিতে পারেনা। আসলেই তো! সে এই বিয়ে কেনো-ইবা করবেনা? কারণ হলো সে ভালোবাসে কাওকে! নির্ঝরকে ভালোবাসে সে। খুবই হয়তো তার মাত্রা। সেকারণেই তো সে বিয়ে করতে পারবেনা। মালিহা বেগম বলেন,
— ঐশী! ও আমার বান্ধবীর ছেলে আর আমি কথা দিয়ে ফেলেছি। সুতরাং এসব কিছুই হবেনা। শুনে রাখো, ওরা তোমায় আগামীকাল দেখতে আসছে। আর তাছাড়া দেখাদেখি হলেই কী বিয়ে হয়? আগে দেখো তারপর সিদ্ধান্ত নাও।

ঐশী আর কোনো কথা বলেনা। সে বেরিয়ে আসে রুম থেকে। এ’নিয়ে হাজারবার মাকে সে একই কথ বলে বেড়াচ্ছে। অথচ কাজের কাজ কিচ্ছুটি হচ্ছেনা। সে-তো কোনো উত্তরই দিতে পারছেনা। আজ হয়তো বাড়ির সবাইকে তার বিয়ের ব্যাপারে বলেও দেয়া হবে। সে রুমে প্রবেশ করার আগেই করিডোরের শেষ প্রান্তে দেখলো নির্ঝরকে। সেদিকপানে এগিয়ে গেলো ঐশী। একটাবার ভাবলো সাহস সঞ্চার করে মনের কথা বলে দিবে। আবার ভাবলো বলবেনা। দোনামনায় ভুগতে রইলো তার মনখানি। নির্ঝর কারো সাথে কথা বলছে ফোনে। কার সাথে কে জানে! ঐশী সাহস করে এগিয়ে যায় তার দিকে। মিহি স্বরে ডাকে,
— কী করছো?
নির্ঝর ফোনে কথা বলছিলো এক বন্ধুর সাথে। ঐশীর গলা শুনে ফোন রাখলো। বললো,
— কিরে, এই সাতসকালে তুই? কী হয়েছে?
— কিছুনা।
ঐশীর স্বর তার কাছে ঠিক মনে হয়না। কপাল কুঁচকে বলে,
— কিছু হয়েছে?
ঐশী হাসে, বলে,
— কিছু হলেও কী করবে?
— এভাবে বলছিস কেনো?
— যদি বলি প্রেমে পড়েছি?
থমকায় নির্ঝর। ছোটো বোনের মুখ থেকে এসব অবশ্যই সে শুনবে বলে আশা করেনি। গম্ভীর হয়ে হঠাৎ শুধালো,
— কার?
পরক্ষণেই ঐশীর উত্তর শুনে সে জমে গেলো। আনমনে তার উত্তর ছিলো,
— যদি বলি, তোমার?

সকাল সকাল বাড়িতে ঢুকছে সায়ন। মালিহা বেগম ঐশীর সাথে কথা শেষ করে ড্রইল রুমে আসছিলো। তখনও তেমন কেও উঠেনি ঘুম থেকে। সে কিচেনের দিকে যাচ্ছিলো। বৃষ্টিতে ইষৎ ভিজে যাওয়া সায়নকে দেখে তিনি তড়িঘড়ি করে দৌড়ে গেলো। সার্ভেন্টকে দিয়ে টাওয়াল আনিয়ে শার্টের হাতা ঝাড়তে থাকা পুরুষটির মাথা মুছতে এলো। আচমকা এমন কান্ডে সায়ন ভড়কে গিয়ে পিছু হটে গেলো। মাথা পিছিয়ে কপাল কুঁচকালো। অথচ মালিহা বেগম সানকে টেনে আনলেন। মাথায় টাওয়াল দুয়ে চুলগুলো মুছতে মুছতে বললেন,
— এভাবে ভিজেছো কেনো তুমি হ্যাঁ? এখন যদি জ্বর আসে?
অবাক হয় সায়ন। কেও কখনো তাকে এভাবে বলেনি। মায়ের অধিকার নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়নি। হতবাক হলো সে। নির্বাক হয়ে বাকহারা হয়ে পড়লো। মায়েদের আদর বুঝি এমন হয়? ইন্টারন্যাশনাল রুশ ক্রিমিনালের ক্ষেত্র ব্যাপারখানা এমন হয়ে গেলো যে–সে কিছুসময় পূর্বে জন্মগ্রহণ করা কোনো বাচ্চা এবং সে কোনো দুগ্ধজাত শিশু। মালিহা বেগম ধমকে ধমকে উঠছেন বারংবার,

obsession vs love part 21

— রুমে গিয়ে ভালো করে ফ্রেশ হয়ে নিবে। একদম চুল ভেজা রাখবেনা। জ্বর এসে যাবে। আমার আইয়ুশেরও এমন হয়। বেচারা বাচ্চাটা আমার একফোঁটা বৃষ্টির পানি সহ্যকরতে পারেনা।
আইয়ুশ নামক শব্দ কর্ণকুহর হতেই আচমকা সে সরে গেলো। তার মনে পড়ে গেলো এই মহিলার অবস্থানের কারণেই সায়ন নাম পুরুষটি আজ হয়ে উঠেছে এক খুনী; মাদকব্যবসায়ী এবং অস্ত্রপাচারকারী। সে সরে গিয়ে গটগট পায়ে কোট হাতে হাঁটা আরম্ভ করলো। ততক্ষণে ওসমান মির্জা রুম থেকে বেরিয়েছিলেন কেবল। দুজনের চোখাচোখি হতেই রহস্যময় তীর্যক হাসি হাসলো সায়ন। সায়নের এমন ইশারার অর্থ তিনি ধরে ফেললেন মুহূর্তেই। অর্থটা ছিলো এমন—’আগামীর ঝড় শীঘ্রই আগতমান!’
তিনি কেঁপে উঠলেন সায়নের চাহুনিতে। হঠাৎ সায়নের হলো টা-কী? কী করবে ও?

obsession vs love part 23