এই অবেলায় পর্ব ৩৬
সুমনা সাথী
ঘরটা পুরোপুরি ফাঁকা। জনমানবহীন। চারিপাশ যেন নিকষ কালো অন্ধকারে ডুবে আছে। নিঝুম পরিবেশ। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে গত বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা মোবাইল ফোন ক্রমাগত বেজেই চলেছে। কর্কশ সেই আওয়াজে সামনের চেয়ারে বসা লোকটা বেশ বিরক্ত হলো। তবে তার চেয়েও বড় বিস্ময় নিয়ে সে তাকিয়ে আছে তার ঠিক সামনে চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা সংজ্ঞাহীন দিব্য তালুকদারের দিকে। গত দশটি মিনিট ধরে সে একদৃষ্টিতে এই অচেতন অবয়বটার দিকে চেয়ে আছে। নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। হাতের আঙুলের ডগায় থাকা সিগারেটটা পুড়তে পুড়তে প্রায় শেষপ্রান্তে চলে এসেছে। অথচ সেটার তপ্ত ছোঁয়া ঠোঁটে লাগাতেও সে সম্পূর্ণ ভুলে গেছে। পেছনে কালো পোশাকে আবৃত। অস্ত্র হাতে। সুঠাম দেহের একটা লোক বেশ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে অবশেষে নিচু স্বরে বলল,
“বস! ফোনটা বোধহয় এবার রিসিভ করা উচিত। বারবার আসছে।”
নিজের মগ্নতায় আচমকা এমন বিঘ্ন ঘটায় লোকটা ক্ষুব্ধ হলো। মুখ দিয়ে একটা বিরক্তিকর ‘চ’ সূচক শব্দ করে সে ধীর লয়ে মুখ তুলে তাকাল। কিন্তু পরমুহূর্তেই ঘরের সেই নিস্তব্ধতা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে সে গাল ভরে হেসে উঠল। সে এক অট্টহাসি। ঘর কাঁপানো। হাসির তোড়ে তার পুরো দেহটা দুলছে। তার সাথে থাকা সশস্ত্র লোকগুলো অবশ্য এই অদ্ভুত আচরণে বিন্দুমাত্র অবাক হলো না। তারা বসের এই খামখেয়ালী রূপের সাথে বহু আগে থেকেই অভ্যস্ত। তবে সেই ঘরে উপস্থিত অসীম কিন্তু মোটেও অবাক হলো না। বরং তার চোখে-মুখে ফুঠে উঠল চরম বিরক্তি। নিজের ভেতরের প্রবল ক্ষোভ আর অস্বস্তিটুকুকে সে অনেক কষ্টে সংযত করে রাখল। অসীম কিছু একটা বলতে যাওয়ার উপক্রম করতেই। লোকটার সেই আকস্মিক অট্টহাসি হুট করেই থেমে গেল। সে হাতের আধপোড়া সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে বুট জুতো দিয়ে পিষে দিল। তারপর এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“আরে গুরু… বাহ্ রে বাহ্! সেম সেম… বাট ডিফারেন্ট! হাহ্… আমি তো নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব রে! ছবি দেখে তো আমার বিশ্বাসই হতে চায়নি। কিন্তু এখন। এখন আসলে কী হবে?”
অসীম আর নিজের ভেতরের বিরক্তিটুকু চেপে রাখতে পারল না। সে বেশ চড়া গলায় বলল,
“এখন কী হবে? সেটা আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করছেন? আপনাকে তো গত অনেকগুলো দিন ধরে প্রতিটা বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। খুব ভালো করে বোঝানো হয়েছে!”
লোকটার চোয়াল মুহূর্তেই শক্ত হয়ে এলো। কপালে ফুটে উঠল বিরক্তির ভাঁজ। অসীমের এই চড়া সুর আর ধৃষ্টতা তার বিন্দুমাত্র পছন্দ হয়নি। সে হাতের একটা আঙুল উঁচিয়ে বেশ ধারালো গলায় বলল,
“উশশ! গলার আওয়াজ একদম নিচে রাখ। তোর কী মনে হয় রে? আমার স্মৃতিশক্তি এতই দুর্বল? তা মীরজাফর। একটা কথা ক দেখি। এই মালটা যে এখানে আসার আগে। তোকে বডিগার্ড ভাড়া করার জন্য বলেছিল। সেই টাকাটা তুই কী করেছিস? বডিগার্ড তো তুই ভাড়া করিসনি! মানে করতে হয়নি আরকি।”
অসীম হুট করে এমন প্রশ্নে বেশ থতমত খেয়ে গেল। এই মুহূর্তে লোকটা এমন একটা অবাস্তব আর অদ্ভুত প্রশ্ন কেন তুলছে। তা তার মাথায় ঢুকল না। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“পেমেন্ট তো এখান থেকে ফেরার পর করার কথা ছিল। আমার কাছে কোনো অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়নি। আর আমি ততটুকুই করেছি। যতটুকু আমার করার কথা ছিল। ওকে ভুলভাল বুঝিয়ে। শ্রমিক অসন্তোষের বাহানা দিয়ে এই জায়গায় টেনে নিয়ে এসেছি। কিন্তু একটা বিষয় আমি বুঝলাম না। যদি ওকেই মা*রাই আপনাদের উদ্দেশ্য হয়। তবে এভাবে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখার কী দরকার ছিল? সেদিন গাড়ি এক্সিডেন্টেই তো ও ম*রে যেতে পারত!”
অসীমের কথা শুনে লোকটার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে মাথাটা সামান্য কাত করে বলল,
“ওটা তো কেবল ট্রেইলার ছিল রে মূর্খ! আসল পিকচার তো আভি বাকি হ্যায়। তোর এই গোবর ঠাসা মাথায় এসব চট করে ঢুকবে না। মারারই যদি হতো। তবে কি এই এত ধকল সয়ে ওকে এত দূর তুলে নিয়ে আসতাম? একে স্রেফ মেরে ফেললে আমার কী লাভ শুনি? আমাদের আসল যে জিনিসটা দরকার। সেটা আদায় করার জন্য ওর আপাতত বেঁচে থাকাটা বড্ড জরুরি। আর এটাই তো আমার কাজের ধরন। মানুষকে ভয় দেখানো। ভয়! এমন এক তীব্র ভয়। যা দেখাতে দেখাতে মানুষকে ভেতর থেকে একদম শেষ করে ফেলা যায়। কিন্তু বিশ্বাস কর। এই খেলাটার মতো মজাদার খেলা আমি আমার জীবনেও খেলিনি। কেন যে এত মজা লাগছে! আয় হায় গুরু… আমি তো নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব!”
অসীমের মনে হলো। নতুন করে পাগল হওয়ার আর কিছু বাকি নেই। এই লোকটা আসলেই আস্ত একটা উন্মাদ। অবশ্য এই সাইকোপ্যাথের খুন করার বীভৎস কায়দা আর নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে সে আগেই অনেক গল্প শুনেছে। আজ সামনাসামনি তাকে দেখে ওর গা গুলিয়ে উঠল। লোকটা এবার সোফা ছেড়ে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। মেঝেতে পড়ে থাকা দিব্যর ফোনটা। যা এতক্ষণ ধরে অনবরত বেজে চলছিল। সেটা হাত বাড়িয়ে তুলে নিল। ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে তখন ইংরেজি ফন্টে ‘নবনী’ নামটা জ্বলজ্বল করছে। নামটার দিকে তাকিয়ে লোকটা আবারও এক রহস্যময় ও বাঁকা হাসি হাসল। তারপর কোনো দ্বিধা না করে সজাগ আঙুলের ছোঁয়ায় কলটা কেটে দিল। তা দেখে অসীম কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ফোনটা কেটে দিলেন কেন? ধরলেন না?”
লোকটা অত্যন্ত বিরক্ত আর ক্ষুব্ধ চোখে অসীমের দিকে তাকাল। সে নিজের কাজের ওপর কারও জবাবদিহিতা বা খবরদারি একদম পছন্দ করে না। দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ গলায় বলল,
“মাদারবোর্ড! তোর এত কিসের কৌতুহল রে? আমার বউ ফোন করেছে। সেটা আমি ধরব নাকি কাটব। তা সম্পূর্ণ আমার বিষয়। ও একটু ভয় পাক। ছটফট করুক। আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো কাউকে তীব্র ভয়ের চাদরে আটকে রেখে। ছটফট করতে দেখা!”
লোকটা নিজের কথার রেশ ধরে একটু থামল। পরমুহূর্তেই দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আয় হায়! এই খেলাটা আসলেই বড্ড মজার। এত আনন্দ কেন রে গুরু? আমি তো নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব। হা হা হা!”
অট্টহাসির মাঝেই সে কৌতূহলবশত দিব্যর ফোনের লকস্ক্রিনের ওয়ালপেপারটার দিকে নজর বুলাল। আর ঠিক তখনই এক মুহূর্তে লোকটার মুখের সেই পৈশাচিক হাসি উবে গেল। সেখানে ভর করল ভয়ানক ক্রোধ। তার কপালের শিরা-উপশিরাগুলো রাগে দগদগ করে ফুলে উঠল। চোখের মণি দুটো যেন আগুন ছড়াতে লাগল। ফোনের স্ক্রিনে তখন ঝিলমিল করছে তিনটি চেনা স্নিগ্ধ মুখ। কাত হয়ে মিষ্টি করে শুয়ে আছে ছোট্ট দিয়া। তার গালের ঠিক ওপরে মাথা ঠেকিয়ে হাসছে নবনী। আর সবার ওপরে পরম স্বয়ং দিব্য। সেই যে নিখাদ সুখের মুহূর্তটা ফ্রেমে বন্দি হয়েছিল। দিব্য সবসময় সেটাকে আগলে রেখেছে এভাবে। সুখী পরিবারের দৃশ্যটা সহ্য করার ক্ষমতা লোকটার নেই। এক তীব্র ঈর্ষা আর আক্রোশে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাতের ফোনটা সজোরে আছাড় মারল মেঝেতে। নিকষ কালো ঘরের নিস্তব্ধতা চূর্ণ করে সেটি ভাঙার এক বিকট শব্দ হলো। লোকটার আচমকা এমন রুদ্রমূর্তি দেখে অসীমসহ সেখানে উপস্থিত বাকি তিনজন সশস্ত্র অনুচরও ভয়ে আক্ষরিক অর্থেই কেঁপে উঠল। পায়ের নিচে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া ফোনটার দিকে তাকিয়ে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে লোকটা দাঁত কিড়মিড় করে হিসহিসিয়ে উঠল,
“হ্যাপি ফ্যামিলি! ফাকিং দিস!”
গত রাত থেকেই নবনীর বুকের ভেতরের অস্থিরতাটা সবটুকু মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। দিব্য পৌঁছানোর পর শেষবারের মতো একটা ফোন করেছিল। ব্যস ওইটুকুই। তারপর থেকে নবনী যতবারই কল করেছে। ওপাশের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর প্রতিবারই জানিয়ে দিয়েছে। ফোনটি বন্ধ রয়েছে। বারবার সেই একই উত্তর শুনে নবনীর বুকের ভেতরটা যেন এক অজানা আশঙ্কায় তছনছ হয়ে যাচ্ছে। যতসব অশুভ আর কুৎসিত চিন্তা এসে ভিড় করছে মাথায়। যন্ত্রণায় মনে হচ্ছে মাথাটা যেন এখনই ফেটে যাবে। ডাইনিং টেবিলে বসে দিয়াকে সকালের নাস্তা খাওয়াচ্ছিল নবনী কিন্তু তার মন পড়ে ছিল অন্য কোথাও। সে এতটাই আনমনা হয়ে পড়েছিল যে। দিয়াকে পানি দেওয়ার জন্য গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়েও তার খেয়াল রইল না। গ্লাস উপচে পানি তখন টেবিলের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। দিয়া মায়ের এই অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে হুট করেই তার ছোট ছোট চোখ দুটো তুলে শুধাল,
“মাম্মা, আর ইউ ওকে?”
মেয়ের ডাকে নবনী যেন বাস্তবে ফিরে এলো। চট করে টেবিলে নজর পড়তেই সে অপ্রস্তুত হয়ে পানির জগটা ধপ করে নামিয়ে রাখল। ঠিক তখনই অলেখা রান্নাঘর থেকে হাতে একটা বাটি নিয়ে ডাইনিংয়ে এসে দাঁড়ালেন। নবনীর উদাসীনতা ওঁর নজর এড়ালো না। তিনি বেশ অবাক হয়ে বললেন,
“কী হয়েছে নবনী? কোনো সমস্যা? সকাল থেকে তোমাকে কেমন যেন অন্যমনস্ক লাগছে!”
নবনীর উত্তর দেওয়ার আগেই ওপর তলার সিঁড়ি দিয়ে বেশ হন্তদন্ত হয়ে নিচে নেমে এলেন আরশাদ তালুকদার। ওঁর চোখে-মুখে স্পষ্ট ব্যস্ততা। শ্বশুরকে ওভাবে দ্রুত পায়ে সদর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে দেখে নবনী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে বসা থেকে চট করে উঠে দাঁড়িয়ে অস্ফুট স্বরে ডাকল,
“আব্বু! একটু শুনবেন?”
নবনীর ডাক শুনে আরশাদ তালুকদার দরজার গোড়ায় থমকে দাঁড়ালেন। হাতঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললেন,
“কী হয়েছে মা? কিছু দরকার তোমার?”
নবনী এক মুহূর্তের জন্য ভীষণ ইতস্তত বোধ করল। শ্বশুরকে এভাবে দিব্যর কথা জিজ্ঞেস করাটা কি আদেও ঠিক হচ্ছে? লোকটা তো নিজের কাজেই গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো। যদি সত্যিই কোনো বিপদ হয়ে থাকে? যদি পরে বড্ড দেরি হয়ে যায়? ভেতরের সবটুকু দ্বিধাদ্বন্দ্ব একপাশে সরিয়ে। আকুল গলায় বলল,
“আসলে আব্বু। আমি কাল রাত থেকে আপনার বড় ছেলেকে অনবরত কল করে যাচ্ছি কিন্তু ওনার ফোনটা সম্পূর্ণ সুইচড অফ দেখাচ্ছে। আপনার সাথে কি ওনার আজ সকালের মধ্যে কোনো কথা হয়েছে?”
আরশাদ তালুকদার আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে মৃদু মাথা নেড়ে বললেন,
“হ্যাঁ মা। আমার সাথে এই তো একটু আগেই কথা হলো। কালকে কোনোভাবে হাত থেকে পড়ে দিব্যর ফোনটা নাকি একদম ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ও আমাকে ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট অসীমের ফোন থেকে কল করেছিল।”
এই কথাটুকু শুনে নবনীর বুকের ওপর চেপে থাকা মস্ত বড় পাথরটা যেন এক নিমেষেই নেমে গেল। সে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অস্ফুট স্বরে বলল,
“ওহ, আচ্ছা।”
আরশাদ তালুকদার নবনীর মলিন আর চিন্তিত মুখের অবয়ব দেখে একটু হেসে বললেন,
“তুমি কি আর কিছু বলবে মা? এটা নিয়ে এত চিন্তার কিছু নেই। ও নতুন একটা ফোন ম্যানেজ করেই হয়তো তোমাকে কল করবে। এমনিতে আজ রাত অথবা কাল সকালের মধ্যেই ও ঢাকা ফেরত আসবে। ওখানকার ফ্যাক্টরির সব ঝামেলা মিটে গেছে।”
নবনী আর কিছু বলল না৷ শুধু মৃদু মাথা নেড়ে সায় দিল। মনের কোণে কু ডাকতে থাকা অশুভ চিন্তাগুলো দূর হওয়ায় তার অবশ হয়ে আসা শরীরটায় যেন প্রাণ ফিরে এলো। আরশাদ তালুকদার আর দেরি না করে ধীর পায়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। অলেখা এতক্ষণ ওদের কথোপকথনের মাঝে নিজেকে আড়াল করতে আবারও রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিলেন। স্বামী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই তিনি দ্রুত পায়ে ডাইনিংয়ে ফিরে এলেন। ওনার কণ্ঠ বেশ আহত।
“না খেয়েই এভাবে খামখেয়ালী করে বেরিয়ে গেল লোকটা! নবনী, তুমি তো অন্তত ওকে একটু আটকাতে পারতে। একটা বারও খেতে বললে না কেন?”
এমন কথায় নবনী যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়ল। সত্যি তো! সে নিজের চিন্তায় এতটাই বুঁদ হয়ে ছিল যে। আরশাদ তালুকদার সকালের নাস্তা না করেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন অথচ সে একটা বারও ওনাকে বসার অনুরোধটুকু করল না। নিজের এই খামখেয়ালিপনায় সে ভীষণ বিরক্ত। আমতা আমতা করে বলল,
“আমি দুঃখিত আম্মা। আসলে আমার একদম খেয়াল ছিল না। আবারও স্যরি।”
অলেখা আর কথা না বাড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন। রান্নাঘর থেকে মৌনিতা গলা উঁচিয়ে বেশ কৌতুকের সুরে বলে উঠল,
“থাক বাদ দাও তো চাচিআম্মা! আমি আজকেও ড্রাইভার আঙ্কেলকে দিয়ে চাচ্চুর অফিসে খাবার পাঠিয়ে দেবো। একটু পরে। ওদিকে বেচারির বরের শোকে তো এমনিতেই মাথা খারাপ হয়ে গেছে! বর মোটে একদিন একরাত বাড়ির বাইরে আছে। তাতেই এই অবস্থা!”
মৌনিতার কথার শেষে এক চিলতে হাসির শব্দ ভেসে এলো। এমন প্রকাশ্য টিপ্পনীতে নবনী এবার বেশ লজ্জা পেয়ে গেল। তার ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্ত হয়ে উঠল। তবে মনে মনে সে স্বীকার করল। মৌনিতা কিন্তু বিন্দুমাত্র ভুল বলেনি। দিব্যর এই চব্বিশ ঘণ্টার অনুপস্থিতি সে সত্যিই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছে। কাল রাতেও ওই বিশাল বিছানাটায় এপাশ-ওপাশ করে কাটিয়েছে৷ এক ফোঁটা ঘুম নামেনি চোখে। লোকটা নির্ঘাত কোনো জাদু করে গেছে ওর ওপর। দিয়া জিজ্ঞেস করলো,
“মাম্মা! পাপ্পা এখনো আসছে না কেন? পাপ্পা কখন আসবে?”
নবনী মৃদু হেসে বলল, “পাপ্পার কাজ শেষ। খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবে।”
তখনই ড্রয়িংরুমের দিক থেকে কাব্য হন্তদন্ত হয়ে ডাইনিংয়ে প্রবেশ করল। ওঁর কোলে ইহান। কাঁদছে বাচ্চাটা। কেঁদে কেঁদে ওর ফর্সা মুখটার একদম নাজেহাল অবস্থা। চোখ জোড়া অনবরত অশ্রুপাতে লাল টকটকে হয়ে আছে। ইহানকে ওভাবে কাঁদতে দেখে নবনী উৎকণ্ঠিত আর ব্যাকুল হয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল,
“ইহান সোনা! ওভাবে কাঁদছ কেন বাবা? কী হয়েছে তোমার? ভাইয়া, ও কাঁদছে কেন?”
মৌনিতা রান্নাঘর থেকে প্রায় ছুটে এলো। কাব্যর কোল থেকে ছেলেকে নিজের কোলে নিলো। তারপর ইহানের কচি হাত-পা উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে অত্যন্ত ব্যাকুল গলায় বলল,
“কাঁদছিস কেন এভাবে সোনা? কোথাও লেগেছে তোর? ব্যথা পেয়েছিস? কোথায় লেগেছে মাকে বল না সোনা!”
কাব্য একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বেশ বিরক্ত গলায় বলল,
“কোথাও লাগেনি ওর।”
“তাহলে? তুমি সকাল সকাল বকেছ ওকে?”
মৌনিতা কিছুটা সন্দেহী চোখে স্বামীর দিকে চাইল। কাব্য এবার চরম অসহায় আর বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোমার সবসময় কেন সবকিছুতে প্রথমেই আমাকেই সন্দেহ করতে হয় বলো তো? আমি ওর জন্মদাতা বাবা। কোনো শত্রু নই! পুরো কথাটা আগে শুনবে তো? তোমার গুণধর ছেলে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়ে বলছে। তাকে নাকি এই বাড়ি থেকে বের করে দিতে হবে!”
কাব্যর মুখে এমন অদ্ভুত কথা শুনে ডাইনিংয়ে উপস্থিত সবাই এক চমকে উঠল। মৌনিতা ছেলের চোখের পানি মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল,
“কেন রে সোনা? এমন কথা কেন বলছিস? আমার সোনার কী হয়েছে আজ?”
ইহান তখনো নিজের কান্না থামাতে পারছিল না। সে হিক্কা তুলে ফোঁপাতে ফোঁপাতে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল,
“আমি… আমি চাচ্চুর কাছে যাব! চাচ্চুর সাথে খেলা করব। এই বাড়িতে আমার কাউকে ভালো লাগছে না। তোমরা যেমন করে পারো আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দাও। আমি গিয়ে আমার চাচ্চুর সাথেই থাকব!”
কাব্য হতাশ হয়ে একটা চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়ল। সে কপালে হাত দিয়ে বলল,
“এবার বুঝেছ ঠেলা? সামলাও এখন তোমার ছেলেকে! ওদিকে সে নিজে এখন কোথায়? কোথায় পড়ে আছে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আর এদিকে এ। এ তো নামেই শুধু আমার ছেলে তাই না? কিন্তু স্বভাবে ও পুরো তৈরি হচ্ছে ওই বাঁদরটার মতো! সত্যি বলতে। ওকে আমি মিস করছি। দু বেলা পেছনে না লাগতে পারলে আমার ভালো লাগেনা৷ কিন্তু এই পুচকে চাচ্চু-ভক্তকে তো আর সেটা বুঝিয়ে লাভ হচ্ছে না!”
মৌনিতা ছেলেকে ভোলানোর চেষ্টা করে নরম গলায় বলল,
“তুমি এভাবে কেন কাঁদছ ইহান সোনা? চাচ্চু বাড়িতে নেই তো কী হয়েছে? এই যে তোমার ইভান ভাইয়া আছে। দিয়া আছে। আমি আছি। আমরা সবাই মিলে তোমার সাথে খেলব?”
ইহান এবার জোরে জোরে মাথা নেড়ে মায়ের কোলে হাত-পা ছুড়তে লাগল,
“নাহ! চাচ্চু অনেক ভালো। চাচ্চুর মতো করে তোমরা কেউই আমার সাথে খেলতে পারো না। আমি শুধু চাচ্চুর সাথেই খেলব। তোমরা আমাকে এখনই এই বাড়ি থেকে বের করে দাও!”
কাব্যর মেজাজটা এবার সত্যিই চড়চড় করে খারাপ হতে লাগল। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের করিডোর দিয়ে কায়েফকে হেঁটে যেতে দেখে সে গলা উঁচিয়ে ডাকল,
“এই কায়েফ! এদিকে আয় তো একটু।”
কায়েফ ধীর পায়ে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে এলো। ইহানের কান্নায় লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে কিছুটা অবাক হয়ে শুধাল,
“কী হয়েছে? ও এভাবে সকাল সকাল কাঁদছে কেন?”
কাব্য নিজের সবটুকু রাগ কায়েফের ওপর ঝেড়ে দিয়ে বলল,
“তুই সারাদিন ল্যাপটপ গুঁতিয়ে এমন কী উল্টাপাল্টা কাজ করিস শুনি? বাড়ির বাচ্চাদের সাথে একটু আধটু খেলতে পারিস না? আস্ত একটা অপদার্থ!”
কায়েফ বড় ভাইয়ের এমন আকস্মিক আক্রমণে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও শান্ত গলায় বলল,
“ভাইয়া, আমি আমার নিজের নতুন কোম্পানি শুরু করতে চলেছি। অনেক কাজ সামলাতে হচ্ছে একা হাতে…।”
কায়েফের মুখে নিজের কোম্পানির কথা শুনে কাব্য মুহূর্তেই কিছুটা চুপসে গেল। সে চাই তার ভাই সফল হোক। ছোট ভাইয়ের এই সাফল্যে মনে মনে খুশি হলেও বাইরে নিজের বড় ভাই সুলভ কড়া ভাবটা বজায় রেখে বলল,
“তাই বলে কি চব্বিশ ঘণ্টাই কাজ করতে হবে? বাড়ির লোকেদের একটু সময় দেওয়া যাবে না? এই বড় বাড়িতে এতগুলো বাচ্চা। তুই কোনোদিন ভুলেও ওদের সাথে একটু সময় কাটিয়েছিস? কলরব বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে বলে ছেলেটা কেঁদে কেটে একাকার করছে। তুই মরে গেলেও তো কেউ তোর জন্য এক ফোঁটা কাঁদবে না।”
মৌনিতা ধমক দিয়ে থামিয়ে দিল, “আহা! অযথা কেন তুমি কায়েফকে বকছ বলো তো? ওরা দুজন তো সম্পূর্ণ আলাদা স্বভাবের। ভাইয়া সবসময় বাচ্চাদের সাথে নিজে বাচ্চা হয়ে মেতে থাকত। ওদের নিয়ে যখন-তখন বাইরে ঘুরতে চলে যেত। এটা-ওটা করতো। তাই ওর প্রতি বাচ্চাদের টানটাও অন্যরকম। কায়েফ তো এ বাড়িতে নিয়মিত থাকতে শুরু করেছেই বেশিদিন হয়নি।”
কাব্য একটু দমে গিয়ে নরম গলায় বলল, “আচ্ছা, ছাড় ওসব কথা। কলরবের সাথে তোর নতুন করে কোনো যোগাযোগ বা কথা হয়েছে?”
কায়েফ শুধু ডানে-বামে মাথা নেড়ে বোঝাল। কোনো কথা হয়নি। কাব্য আবারও চরম বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকাল,
“মেয়েমানুষের মতো ওভাবে মাথা নাড়ছিস কেন? মুখে কি কোনো ভাষা নেই তোর? একজন তো সারাক্ষণ খই ফোটার মতো বলতেই থাকে। আর একজন এই যে। মুখ ফুটে দুটো কথা পর্যন্ত বলতে পারে না! অথচ এদের দুজনকে ছোটবেলায় সবাই হুবহু এক দেখত। বলতো জমজ নাকি? আসলে একটা আস্ত গাধা আর একটা আদ্যোপান্ত বলদ! যা তুই। তুইও দূর হ এখন আমার চোখের সামনে থেকে।”
কায়েফ বড় ভাইয়ের এসব কড়া কথার জবাবে কিছু না বলে শুধু একরাশ হতাশা নিয়ে তাকাল। বরাবরই সে ভীষণ শান্ত আর মিতভাষী স্বভাবের। তার ওপর কাব্যকে সে বড় ভাই হিসেবে যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। কলরবের সাথে কাব্যর সম্পর্কটা যেমন খুনসুটির। কায়েফের সাথে তেমন নয়। তাই চাইলেই সে কলরবের মতো মুখের ওপর যা তা বলে দিতে পারে না। কায়েফকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নবনী বলল,
“ভাই, তুমি ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকো না। এখানে বসো। সকালের নাস্তাটা অন্তত শেষ করে তারপর নিজের কাজে যাও।”
নবনীর অনুরোধে কায়েফ চুপচাপ ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে বসল। মায়ের কোলে বসে ইহানের কান্নাটা এতক্ষণে কিছুটা থামলেও। সে এখনো অল্প অল্প হিক্কা তুলে ফোঁপাচ্ছে। কাব্য ছেলের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে পরিশ্রান্ত গলায় বলল,
“লক্ষ্মী বাবা আমার। এবার একটু চুপ কর না বাপ!”
বেলা এগারোটা নাগাদ নিযানার ঘুম ভাঙল। বিছানা ছেড়ে উঠে ধীর পায়ে সে ড্রয়িংরুমে এসে উপস্থিত হলো। পরনে তার একটা কুচকুচে কালো রঙের স্কার্ট-প্লাজো আর ম্যাচিং করা কালো টি-শার্ট। পিঠময় অবাধ্য হয়ে ছড়িয়ে আছে খোলা চুলগুলো। আশ্চর্যজনকভাবে, ঘুম ভাঙার পর থেকেই নিযানার মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। এক অকারণ ভালো লাগায় ছেয়ে আছে ভেতরটা। অবশ্য একদম অকারণও বলা চলে না। কলরব নিজের কৃতকর্মের উপযুক্ত শিক্ষা পাচ্ছে।এই সত্যটা অনুধাবন করেই তার অবচেতন মন এতটা হালকা বোধ করছে। যে মানুষটা তাকে প্রতিনিয়ত অবহেলা আর অপমানের আগুনে পুড়িয়েছে। সে নিজে এখন চরম অশান্তি আর পুড়োমুখো হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা ভাবতেই নিযানার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
নিযানাকে ওভাবে ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহমুদা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো। মেয়েটার চোখ-মুখ থেকে গত কয়েকদিনের সেই বিধ্বস্ত আর মলিন ভাবটা কেটে গিয়ে একটা স্নিগ্ধতা ফিরে এসেছে। দেখে মাহমুদারও বেশ ভালো লাগল। সে মৃদু হেসে শুধাল,
“আপা, আপনার ঘুম ভেঙেছে? সকালের নাস্তাটা টেবিলে দিয়ে দেব?”
নিযানা খানিকক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর মাথা নেড়ে চপল গলায় বলল,
“নাহ। আজ নাস্তাটা আমি নিজে হাতে বানাব।”
শুনেই মাহমুদা যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে বেশ আতঙ্কিত ও অবাক গলায় বলে উঠল,
“সেকী আপা! না না, তা কী করে হয়? চাচিআম্মা জানলে আমার ওপর খুব রাগ করবেন। আপনি শুধু মুখে বলুন আপনার কী খেতে ইচ্ছে করছে। আমি এখনই গরম গরম বানিয়ে আপনার সামনে দিচ্ছি।”
“আমি বললাম না আমি নিজেই বানাব! আজ আমার পরোটা খেতে ইচ্ছে করছে। সাথে থাকবে কষা গরুর মাংস। তুমি ফ্রিজ থেকে মাংসটা বের করে দাও আর পরোটাটা আমি নিজেই বানাবো। এর আগে একদিন বানিয়েছিলাম। যদিও পরোটাগুলো খুব একটা নরম হয়নি। তবে খেতে কিন্তু বেশ মজা হয়েছিল। সেদিন একটা রান্নার রেসিপিতে দেখলাম। ময়দা মাখার সময় একটু ইস্ট দিলে নাকি পরোটা বড্ড নরম হয়। আজ আমি ওই ইস্ট দিয়েই ট্রাই করব।”
মাহমুদা আর না করতে পারল না। হেসে শুধু মাথা নাড়ল। নিযানা হালকা সুরে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। তবে রান্নাঘরে ঢুকতেই মনের এক কোণে এক চিলতে একাকীত্ব এসে ভর করল ওর। এই বিশাল নিস্তব্ধ বাড়িতে তার বড্ড একঘেয়ে আর বোরিং লাগছে। অকারণেই আজ ও বাড়ির মানুষগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে নিযানার। ওই বাড়িতে অন্তত আর যা-ই হোক। এভাবে একা একা বসে গুমরে মরতে হয় না। একা একা খাওয়া লাগেনা। সারাদিন কিছু না কিছু নিয়ে একটা হইহই র রই ব্যাপার লেগেই থাকে। ঠিক তখনই সদর দরজার কলিং বেলটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। নিযানা তখন দুই হাত ডুবিয়ে গামলায় ময়দা মাখছিল। সে রান্নাঘর থেকেই গলা উঁচিয়ে ডাকল,
“মাহমুদা আপু, দেখো তো কে এলো? এই সময় আবার কে আসতে পারে!”
অনেক ভাবনা-চিন্তা আর মানসিক টানাপোড়েনের পর অবশেষে নওয়াজ চৌধুরীর বাড়ির দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে কলরব। কলিং বেলের আওয়াজ শুনে মাহমুদা এসে দরজা খুলতেই চট করে ছেলেটাকে চিনতে পারল না। সে এই বাড়িতে কাজে এসেছে মোটে সপ্তাহখানেক হলো। আগে তার মা এই জায়গায় কাজ করত। এখন মা অসুস্থ বলে তার আসা। মায়ের সুবাদে এর আগে দুই-একবার এ বাড়িতে এলেও নিযানাকে সে চেনে। তবে তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনদের ওইভাবে দেখার বা চেনার সুযোগ মাহমুদার কখনো হয়নি। সে কিছুটা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কে ভাই? কাকে খুঁজছেন?”
কলরব একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল, “আমি কলরব। আনতাসা চৌধুরী আমার ফুফু হন। বাসায় কি কেউ নেই?”
‘কলরব’ নামটা শোনা মাত্রই মাহমুদার মনে একটা খটকা লাগল। পরক্ষণেই চট করে মনে পড়ে গেল। সেদিন নিযানার মুখে এই নামটা সে শুনেছিল। আর গত রাতেই সে আকার-ইঙ্গিতে জানতে পেরেছে এই কলরবই আসলে এই বাড়ির জামাই। যার সাথে নিযানার তুমুল ঝামেলা চলছে। আনতাসা যাওয়ার আগে তাকে কড়া ভাষায় বলে গিয়েছিলেন। ও বাড়ির কেউ যেন এই বাড়ির চৌকাঠ মাড়াতে না পারে। আর এলে যেন কোনোভাবেই নিযানার মুখোমুখি হতে না দেওয়া হয়। মাহমুদা ভীষণ আমতা আমতা করে বলল,
“চাচিআম্মা কি জানেন আপনি যে আজকে আসবেন? তারা। তারা তো কেউ এখন বাসায় নেই।”
ঠিক তখনই ভেতরের রান্নাঘর থেকে নিযানার স্পষ্ট গলা ভেসে এলো,
“মাহমুদা আপু, কে এসেছে?”
নিযানার কণ্ঠস্বর কানে আসতেই কলরবের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মলিন হাসি ফুটে উঠল। ওদিকে মাহমুদার মুখটা মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। ঠিক যেন চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছে সে। এমন পরিস্থিতিতে লজ্জিত ও অপ্রস্তুত বোধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কলরব আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা ভেতরে ঢুকতে গেলেই মাহমুদা চট করে পথ আটকে দাঁড়াল। তাতে কলরব বেশ বিরক্ত গলায় বলল,
“সমস্যা কী আপনার বলুন তো? আমি কোনো চোর-ডাকাত নই। এটা আমার ফুফুর বাড়ি। প্লাস আমার শ্বশুরবাড়ি। সরুন সামনে থেকে!”
মাহমুদা কিছু মুখে বলার আগেই কলরব তাকে পাশ কাটিয়ে হনহন করে লম্বা পায়ে ভেতরের দিকে চলে গেল। নিযানার গলার আওয়াজ যেদিক থেকে আসছিল। সে সেই দিকটা অনুসরণ করে সোজা এগোতে লাগল। নিরুপায় মাহমুদা তখন সবার আগে ড্রয়িংরুমের দিকে ছুটল আনতাসাকে ফোনে পুরো বিষয়টা জানানোর জন্য। রান্নাঘরের দরজায় এসে হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়াল কলরব। নিযানা তখনো আপনমনে গুনগুন করে গান গাইছে আর দুই হাত ডুবিয়ে ময়দা মাখছে। মাখামাখি করতে গিয়ে নিজের চুল থেকে শুরু করে গায়ের কালো টি-শার্টটারও কয়েকটা জায়গায় বাজেভাবে সাদা ময়দা লেপ্টে ফেলেছে সে। কলরব দরজায় দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠিক তখনই দরজায় কারও ছায়া আর জোরালো উপস্থিতি টের পেয়ে চট করে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল নিযানা। আর তাকানো মাত্রই তার সারা শরীর যেন জমে পাথর হয়ে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে নিযানার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মাত্র দুটো দিনেই কলরবের পুরো অবয়বটা কেমন যেন বড্ড ওলটপালট আর অস্বাভাবিক লাগছে। উষ্কখুষ্ক চুল। চোখের কোণ দুটো লাল হয়ে আছে। পরনে কালো টি-শার্ট। সে সবসময় এমনই টিশার্ট অবশ্য পরে থাকে। কলরবের এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে আচমকাই নিযানার মনের ভেতর কেমন একটা অজানা ভয় জাপটে ধরল। সে ময়দা মাখা হাত দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে নিয়ে কম্পিত গলায় বলল,
“তুমি… তুমি এখানে কী করছ হ্যাঁ? তোমার সাহস হয় কী করে এই বাড়িতে আসার?”
কলরব আরো এক কদম এগিয়ে এলো রান্নাঘরের ভেতরে। নিযানা আতঙ্কে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে সেঁটে গেল। সে দরজার দিকে মুখ উঁচিয়ে সর্বোচ্চ জোর গলায় ডাকল,
“মাহমুদা আপু! কোথায় তুমি? এ বাড়িতে যাকে তাকে কেন এভাবে ঢুকতে দিয়েছ?”
কলরব দাঁতে দাঁত চেপে। নিজের ভেতরের ক্ষোভটাকে কোনোমতে নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“আমি তোর কাছে যে সে হয়ে গেলাম?”
“কেন? তুমি কোথাকার কোন দেশের প্রধানমন্ত্রী?”
“আমি এখানে কোনো তামাশা করতে আসিনি। আমি জাস্ট কয়েকটা জরুরি কথা বলতে এসেছি। কথাগুলো বলেই আমি নিজে থেকে চলে যাব।”
“কিন্তু আমি তোমার মুখ থেকে কোনো কথা শুনতে বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই!”
“কিন্তু তোকে শুনতে হবে! তুই আমাকে এমন জঘন্য একটা অপবাদ দিয়ে পার পেয়ে যেতে পারিস না!”
কলরবের কণ্ঠে রাগের আঁচ স্পষ্ট। নিযানা উপহাস করে বলল,
“বাহ্! নিজে যখন দিনের পর দিন তলে তলে এত কিছু করলে। তখন ওটা দোষের হলো না? আর আমি জাস্ট সত্যটা মুখ ফুটে বলতেই আমার অপরাধ হয়ে গেল?”
কলরব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তীব্র বিরক্তি নিয়ে নিযানার দিকে আরেকটু এগোতে নিলেই নিযানা হাত উঁচিয়ে তীব্র গলায় গর্জে উঠল,
“খবরদার কলরব! একদম নিজের লিমিট ক্রস করার চেষ্টা করবে না। আমার কাছে আসার দুঃসাহসও দেখাবে না তুমি। এক্ষুণি, এই মুহূর্তে বেরিয়ে যাও আমার চোখের সামনে থেকে। আমার বাড়ি থেকে!”
ফোন কানে মাহমুদা হনহন করে এসে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়াল। সে কলরবের দিকে তাকিয়ে বেশ কড়া এবং রুক্ষ গলায় বলল,
“ভাই, দেখুন আমি মাত্রই চাচিআম্মাকে ফোনে সব জানিয়েছি। উনি সাফ বলে দিয়েছেন আপনাকে এই বাড়ি থেকে বের করে দিতে। আপনি দয়া করে কোনো ঝামেলা না বাড়িয়ে নিজে থেকেই চলে যান। চাচিআম্মা আর চাচা যখন বাসায় ফিরবেন। তখন নাহয় এসে কথা বলবেন।”
কলরব মাহমুদার দিকে ঘুরে অত্যন্ত কর্কশ গলায় বলল,
“আপনাকে যা বলা হচ্ছে শুনুন। আপনি দয়া করে আগামী পাঁচ-দশ মিনিটের জন্য এই ঘর থেকে। এমনকি পারলে বাড়ি থেকেও একটু বাইরে যান। আমার যা কথা আছে শেষ হলেই আমি ঠিক বেরিয়ে যাব।”
মাহমুদা চরম বিরক্ত বোধ করল। এই ছেলেটা তো আস্ত একটা নাছোড়বান্দা! মাঝখান থেকে সে সবকিছুর চাপে পড়ে বাজেভাবে ফেঁসে গেছে। কোমরে হাত দিয়ে বলল,
“আপনার যা কাজ। যা কথা। সব এই আমার সামনেই এখনি শেষ করুন। আমি আপনাকে নিজ দায়িত্বে বাইরে বের করে দিয়ে। তবেই দরজা বন্ধ করব!”
কলরব এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে কী যেন ভাবল। পরমুহূর্তেই। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে দ্রুত বেগে এগিয়ে গিয়ে নিযানাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। অত্যন্ত সজোরে নিজের ওষ্ঠ নিযানার ওষ্ঠে মিলিয়ে দিল! আকস্মিক এই ঝড়ে নিযানা আক্ষরিক অর্থেই হতভম্ব হয়ে এক পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। নিযানার চেয়েও তিন গুণ বেশি অবাক আর স্তম্ভিত হলো দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মাহমুদা। লজ্জায় ও বিস্ময়ে তার চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সে দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরল। ঠিক পরক্ষণেই নিযানা তীব্র আক্রোশে ছটফট করে উঠল। নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে কলরবের বুকে ধাক্কা মেরে নিজেকে এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কলরব আলতো করে নিযানার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট দুটো সরিয়ে নিল। তবে ওর অবয়বটাকে নিজের বাহুবন্ধন থেকে এক চুলও নড়তে দিল না। সে নিস্পৃহ চোখে দরজার দিকে ঘুরে মাহমুদার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে হাসি। মাহমুদার দিকে চেয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় শুধাল,
“বাকি কাজগুলোও কি আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে চান। নাকি এবার একটু বাইরে যাবেন?”
মাহমুদা যেন নিজের সংবিত ফিরে পেল। লজ্জায় আর চরম অস্বস্তিতে সে আর মুখ ফুটে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। এক প্রকার দৌড়েই রান্নাঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে পালিয়ে গেল। মাহমুদাকে ওভাবে চলে যেতে দেখে কলরবের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। নিযানা তীব্র আক্রোশে কলরবের শক্ত বুকের ওপর পরপর দুহাতের মুঠো দিয়ে সজোরে কিল মারতে লাগল। ওর তেজী ও কাঁপতে থাকা কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে এলো,
“সরো! বলছি। একদম সরে দাঁড়াও আমার কাছ থেকে! আস্ত একটা অসভ্য, নির্লজ্জ, বেয়াদব কোথাকার! মিনিমাম লজ্জাবোধ বলতেও কি তোমার ভেতরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই, হ্যাঁ?”
কলরব ধীর পায়ে দু-কদম পিছিয়ে গেল। নিজের বুকের কাছে তাকাতেই দেখল। নিযানার হাতের ময়দা লেগে তার কালো শার্টটার একদম যা তা অবস্থা হয়ে গেছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ওপর রাগটা সামলাতে না পেরে আচমকাই চেঁচিয়ে উঠল,
“এটা কী করেছিস হ্যাঁ? একটা মেয়ের সামান্য কমনসেন্সটুকুও কি থাকতে নেই? যাই হোক, নিজের এই পাগলামি বন্ধ কর। আমি এখানে যে কথাটা বলতে এসেছি। চুপচাপ আমার সাথে বাড়ি ফেরত চল!”
কলরবের এই হুকুমে নিযানার ভেতরের রাগের আগুন যেন এক নিমেষে দ্বিগুণ হয়ে গেল। অপমানে ও ক্ষোভে ওর নাকের পাটা ফুলে উঠেছে। চোখের কোণ বেয়ে অবাধ্য জল গড়িয়ে পড়ছে। সে হিক্কা তুলে ফোঁপাতে ফোঁপাতে তীব্র জেদ নিয়ে বলল,
“কখনো না! আমি আর কোনোদিন ওইখানে পা দেব না।”
কলরব বোঝানোর চেষ্টা করল, “দেখ নিযানা। তুই নিজের মনে মনে যা যা ভাবছিস তার সবটাই সম্পূর্ণ ভুল। পুরোটা একটা মস্ত বড় ভুল বোঝাবুঝি!”
নিযানা নিজেই দু-কদম এগিয়ে এসে কলরবের একেবারে মুখোমুখি দাঁড়াল। চোখে নিজের জ্বলন্ত চোখ জোড়া রেখে ধারালো গলায় বলল,
“আমি কী ভুল ভেবেছি শুনি? অস্বীকার করতে পারো তুমি? ওই মেয়েটাকে তুমি এখনো মনে মনে ভালোবাসো না? ওনার সাথে গোপনে দেখা করোনি তুমি? কীভাবে পারলে তুমি আমার সাথে এমনটা করতে কলরব? তুমি না হয় আমাকে ভালোই বাসলে না কিন্তু এই যে আমাদের সামাজিক আর পবিত্র একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। সেটাকে তো ন্যূনতম সম্মান করতে পারতে! তুমি শুধু দিনের পর দিন নিজের প্রয়োজন মেটাতে আমাকে একটা জড়বস্তুর মতো ব্যবহার করে গেছ। এভাবে আমাকে ঠকাতে গিয়ে একটা বারও কি তোমার বিবেকে বাঁধেনি?”
কলরবের কণ্ঠস্বর চড়াও হলো, “আমি তোকে বললাম তো নিযানা। আমি ঠকাইনি! হ্যাঁ, আমি ইরার সাথে দেখা করেছিলাম কিন্তু সেটা জাস্ট একটা বার! তাও আবার ওর বাবার বিশেষ অনুরোধে। একটা মারাত্মক সংকটে পড়ে। আর এই যে তুই বারবার ‘ব্যবহার’ করার নোংরা কথা তুলছিস এর আসল অর্থটা কী রে? আদতে তুই কী বোঝাতে চাইছিস? একটা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মাঝে এগুলো অত্যন্ত নরমাল একটা ব্যাপার! তুই যদি ইরার অতীত সম্পর্কে আগে থেকে না জানতিস কিংবা আমি নিজে তোকে সব না বলতাম।তবে? আজ এই একই বিষয়গুলো তোর কাছে স্বামীর নিখাদ ভালোবাসা বলেই মনে হতো! আমার জায়গায় অন্য কোনো পুরুষকে বিয়ে করলে সে কি তোকে দিনের পর দিন শুধু বিছানায় একা রেখে নিজে সোফায় গিয়ে ঘুমাতো? এ যুগে এমন মহাপুরুষ আর কতজন আছে আমার জানা নেই। তবে আমি অন্তত তোর জন্য তেমনটাই হতে চেয়েছিলাম। তুই মানিসনি। আজ শুনতে বড্ড তেঁতো লাগতে পারে নিযানা। কিন্তু সত্যি এটাই যে। তুই নিজে আমাকে সুযোগ দিয়েছিস। মন থেকে সায় দিয়েছিস বলেই আমি তোর এতটা কাছে আসতে পেরেছি। আর আজ তুই সেই মুহূর্তগুলোকে এমন নোংরাভাবে আমার ওপর চাপিয়ে দিয়ে আমাকে এমনভাবে দোষারোপ করছিস; যেন আমি তোর ওপর কোনো জোরজবরদস্তি করেছি!”
নিযানার চোখ জোড়া ছলছল করে উঠল। বুকের ভেতরটা এক তীব্র ও অস্বাভাবিক যন্ত্রণায় মুচড়ে মুচড়ে উঠছে ওর। ভগ্ন কণ্ঠে বলল,
“আমি সুযোগ দিয়ে ভুল করেছি কলরব? আমি তো তোমার কষ্টটায় একটু কমাতে চেয়েছিলাম। নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে তোমার ক্ষতের মলম হতে চেয়েছিলাম। তোমার প্রতিটি যন্ত্রণার উপশম হতে চেয়েছিলাম। চেয়েছিলাম তোমার ওই ভয়ানক একাকীত্বের ভাগীদার হতে। এটাই কি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল? হ্যাঁ, আমি তোমাকে আমার কাছে আসার সুযোগ দিয়েছি। কারণ আমি একজন স্ত্রীর কর্তব্য পালন করতে চেয়েছিলাম। আমি কি কখনো এ নিয়ে তোমার কাছে কোনো অভিযোগ করেছি? কিন্তু তুমি? তুমি নিজের দিক থেকে এই সম্পর্কে বিন্দুমাত্র এফোর্ট দাওনি! উল্টো প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে অপমান করেছ। এমনকি! অমন একটা সময়েও তুমি মুখ ফুটে ডিভোর্সের কথা উচ্চারণ করেছ! এই নিষ্ঠুরতাকে তুমি কী নামে ডাকবে কলরব?”
কলরব পলকহীন চোখে মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ফর্সা গাল বেয়ে অনবরত অশ্রুধারা গড়িয়ে পড়ছে। ক্ষোভে আর অপমানে ওর রক্তিম ঠোঁট জোড়া কাঁপছে থরথর করে পুরো মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। চোখে চশমাটা নেই। ওটা ওই ময়দা গোলা গামলাটার পাশে টেবিলের ওপর পড়ে আছে। চশমা ছাড়া নিযানার এই কান্নাসিক্ত মুখটাকে কেমন যেন ভীষণ মায়াবী আর আদুরে লাগছে এই মুহূর্তে। কান্না করা অবস্থায়ও একটা মানুষকে এতটা সুন্দর লাগতে পারে? এক অদ্ভুত ও আজব অনুভূতি খেলা করে গেল কলরবের মনে। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“তুই তো প্রথম থেকেই জানতিস নিযানা। আমি কতটা বিধ্বস্ত ছিলাম। আমি উগ্র, বেপরোয়া, ছন্নছাড়া একটা মানুষ। আমি বরাবরই এমনই! সবটা জেনেশুনেও আজ তুই আমার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ করছিস? এইসব কিছু তো তাও ঠুনকো। তুই কত সহজে কত নিখুঁতভাবে আমাকে একটা ‘চরিত্রহীন’ তকমা দিয়ে দিলি! তাও অবশ্য খুব ভালোই বলেছিস। আমি আসলেই খুব খারাপ। এখন আমার কথা ভাবলেই তোর মনে তীব্র ঘৃণা উথলে ওঠে তাই না? বড্ড নোংরা লাগে আমাকে তোর কাছে? তুই আমাকে ডিভোর্স দিতে চাস। অবশ্যই দিবি। কিন্তু এভাবে কোনো নোংরা অপবাদ দিয়ে নয়। আমি নিজে তোকে এই দমবন্ধ করা সম্পর্ক থেকে মুক্তি দেব। তুই তোর ক্যারিয়ারে ফোকাস করিস। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাস। যা ইচ্ছা তা-ই করিস। আমি কিচ্ছু বলব না। শুধু অনুরোধ। আমার ঘাড়ে এতটা বড় একটা মিথ্যে অপবাদ চাপিয়ে দিস না। আমাকে মন থেকে বোঝার চেষ্টা এ জীবনে কেউ কোনোদিন করেনি। শালা, আমার বাপ ও না। আর আমি এখন কাউকে সেটা বুঝতে বলছিও না। শুধু কিছু মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল। পৃথিবীতে অন্তত তুই আমাকে একটু হলেও বুঝিস! বিশ্বাস কর। আজকের আগে নিজের কাছে এতটা সস্তা। এতটা বাজে আমার কোনোদিন লাগেনি।”
কলরব একটু থামল। একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও অত্যন্ত গভীর গলায় বলল,
“আমার কথা বিশ্বাস করা বা না করা সম্পূর্ণ তোর ব্যক্তিগত বিষয়। তবে কসম খেয়ে বলছি। বিয়ের পর ইরার সাথে আমার আর কোনো জাগতিক বা মানসিক সম্পর্ক ছিল না। আর না তো ভবিষ্যতে কোনোদিন থাকবে। তোকে আজ এই সাফাই দিতে আমি কেন ছুটে এসেছি। তা আমি নিজেও জানি না। তবে এই নোংরা, কুৎসিত অপবাদটা মাথায় নিয়ে আমি সমাজ আর পরিবারের সামনে ঘুরে বেড়াতে পারছি না। আমার বড্ড অসহ্য লাগছে! বাড়ির সবাই এখন আমাকে চরম ঘৃণার নজরে দেখছে। তোর মা এই অপবাদ দিয়েই ডিভোর্সের ফাইল তৈরি করবেন। আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন! যে অন্যায় আমি কোনোদিন করিইনি। আমাকে সেই অন্যায়ের দায়ভার নিতে হবে? এতটা নিচে অন্তত নামিস না নিযানা। তোর যে ডিভোর্স চাই। সেটা আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি। মাত্র এই কটা দিনেই তুই হাপিয়ে উঠেছিস। রান্না, সংসার, একগাদা মানুষের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তোর দম আটকে আসছিল। তার ওপর নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তা তো আছেই। আমি তোর সব পরিস্থিতি বুঝতে পারছি। তবে মুক্তি পাওয়ার জন্য এমন নোংরা আর মিথ্যা পন্থা অবলম্বন করিস না। আমি তোকে কথা দিচ্ছি। আজ থেকে ঠিক মাসখানেক পর আমি নিজে তোকে সসম্মানে ডিভোর্স দিয়ে দেব। তারপর তোর রাস্তা আলাদা হবে। আমার রাস্তা আলাদা। আর নয়তো… এসব মিথ্যা গ্লানি বয়ে বেড়ানোর চেয়ে আমার মরে যাওয়া অনেক ভালো। যদি আমার কোনো কথাই বিশ্বাস করতে না পারিস। তবে শেষবারের মতো একটু দোয়া করিস। যেন এই কলরবের কলঙ্কিত মুখ তোকে আর কোনোদিন এ জীবনে দেখতে না হয়!”
নিযানা আক্ষরিক অর্থেই স্তব্ধ ও স্তম্ভিত হয়ে চেয়ে রইল। কলরবের কণ্ঠস্বরে এতক্ষণের সেই চেনা উগ্রতা বা জেদ উধাও। কথাটা শেষ করেই কলরব আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। টেবিলের পাশ থেকে নিযানার চশমাটা তুলে নিয়ে ওর চোখে পরিয়ে দিল। তারপর নিজের এক হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নিজের চোখের কোণটা আলতো করে মুছে নিয়ে। হনহন করে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। নিযানার চশমার কাচে জমে থাকা ঝাপসা দৃষ্টি সীমানার ওপারে পলকের মধ্যেই মিলিয়ে গেল কলরবের অবয়ব।
দিব্য অবশেষে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরে এসেছে শুনে নবনীর বুকের ভেতরটা এক অনাবিল স্বস্তিতে জুড়িয়ে গেল। ঘড়িতে তখন রাত নটা। দিব্য যখন সদর দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে পা রাখল। নবনী তখন রান্নাঘরের কাজ সামলাচ্ছিল। সেখান থেকেই ও এক ঝলক দেখে নিয়েছিলো মানুষটিকে। চব্বিশ ঘণ্টার তীব্র ব্যাকুলতা শেষে লোকটাকে দেখামাত্রই নবনীর ইচ্ছে করছিল। সব কাজ ফেলে ছুটে গিয়ে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। নিজের এই অবাধ্য ভাবনায় নিজেই পরক্ষণে ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল সে। জড়িয়ে না ধরা যাক। অন্ত দুটো কথা তো বলাই যায়! কিন্তু এদিকের হাতের কাজগুলো যেন কিছুতেই শেষ হতে চাইছে না। অথচ মনটা পড়ে রইল ওই শোবার ঘরের দিকে। ড্রয়িংরুমে ইহান আর ইভানের সাথে খেলছিল দিয়া। পাপ্পাকে ঘরের দিকে এগিয়ে যেতে দেখেই সে খেলা ফেলে এক ছুটে চলে এলো। ঘরে ঢুকেই পিছন থেকে দিব্যর পা দুটো জড়িয়ে ধরে তার সেই চেনা মিষ্টি কণ্ঠে ডেকে উঠল,
“পাপ্পা!”
পেছন থেকে একটা ছোট্ট নরম শরীর জড়িয়ে ধরতেই দিব্য থমকে দাঁড়াল। থমথমে ও গম্ভীর মুখটার দিকে তাকিয়েও দিয়া খিলখিল করে হেসে উঠল। আদুরে গলায় বলল,
“সারপ্রাইজ! কিন্তু পাপ্পা, তুমি আসতে বড্ড দেরি করে ফেলেছ। দিয়া কিন্তু তোমার ওপর ভীষণ এংরি হয়ে আছে। তুমি একটা বারও কল করোনি আমাকে! আমি মাম্মাকে কত বললাম। মাম্মা বলে, পাপ্পা তো ফোন ধরেনা দিয়া। আমার ডলটা এনেছ তো?”
দিব্যর গলার স্বর ভীষণ গম্ভীর শোনাল। সেখানে চেনা স্নেহের কোনো ছোঁয়া ছিল না। প্রতিবার বাড়ি ফিরলে সে যেভাবে মেয়েকে বুকে টেনে নেয়। আজ তেমন কিছুই করল না। উল্টো নিজের হাত দিয়ে আলতো করে দিয়াকে নিজের কাছ থেকে কিছুটা সরিয়ে দিয়ে উদাসীন গলায় বলল,
“পাপ্পা এখন বড্ড টায়ার্ড মা। আমরা এসব নিয়ে পরে কথা বলি, ওকে?”
দিয়া ফ্যালফ্যাল চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। সে দেখতে পেল দিব্য তার দিকে আর না তাকিয়েই নিজের গায়ের ফরমাল কোটটা খুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বাবার এই অচেনা ও উদাসীন আচরণ ছোট্ট মেয়েটার মনে বড্ড আঘাত করল। সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেই ঠোঁট উল্টে বুক কান্নায় ভেঙে পড়ল। নবনী দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকতেই দিব্যর চরম বিরক্ত ও খিটখিটে মুখের অবয়বটা দেখতে পেল। সে দ্রুত দিয়ার কাছে ছুটে এসে ব্যাকুল গলায় বলল,
“কী হয়েছে আমার সোনা মাম্মাটার? কাঁদছ কেন সোনা? কী হয়েছে তোমার?”
নবনী দিয়াকে নিজের কোলে তুলে নিলো। আঁচল দিয়ে ওর চোখের পানি মুছে দিল। দিয়া মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে নালিশের সুরে বলল,
“পাপ্পা আমার জন্য ডল আনেনি মাম্মা! আর দিয়াকে একটা ‘স্যরি’ পর্যন্ত বলেনি!”
মেয়ের অবুঝ নালিশ শুনে নবনীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। তবে সেই সাথে সে মনে মনে বেশ অবাকও হলো। দিব্য তালুকদারের মতো মানুষ এতটা ভুলো মনের হলো কবে থেকে? তাও আবার নিজের কলিজার টুকরো মেয়ের পছন্দের জিনিসে ভুল! অবশ্য বিগত কয়েকদিন ধরে লোকটার ওপর দিয়ে যে মানসিক ধকল যাচ্ছে। তাতে এমন ছোটখাটো ভুল হওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। নবনী নিজেও তো এই কদিনে দুশ্চিন্তায় কত ভুলভাল কাজ করে ফেলেছে। পরিস্থিতি হালকা করার জন্য দিয়াকে বোঝানোর ভঙ্গিতে দিব্যর দিকে তাকিয়ে কৌতুকের সুরে বলল,
“আসলেই তো। আপনি বড্ড অন্যায় করেছেন! মেয়ের ডল ভুলে যাওয়ার অপরাধে আপনার তো বিরাট শাস্তি হওয়া উচিত। এখন সত্যি করে বলুন তো। আমার সোনার ডলটা কেন আসেনি?”
নবনী দিয়াকে দিব্যর দিকে একটু এগিয়ে দিয়ে চোখের ইশারায় ওকে কোলে তুলে নিতে বলল। দিব্য এবার আর অমত করল না। বেশ যান্ত্রিকভাবেই দিয়াকে নিজের বাহুবন্ধনে টেনে নিল। তারপর গলার স্বর যতটা সম্ভব নরম করে বলল,
“স্যরি দিয়া মা। পাপ্পা আগামীকালই তোমাকে একটা বিরাট ডল এনে দেবে কেমন? পাপ্পা ওখানে একটু বেশি ব্যস্ত ছিল তো। তাই একদম ভুলে গেছে।”
কিন্তু বাবার এই মুখের কথায় দিয়া এত সহজে গলে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে বুক থেকে হাত দুটো গুটিয়ে গাল ফুলিয়ে উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল। তা দেখে নবনী এবার কিছুটা কৃত্রিম গাম্ভীর্য নিয়ে দিব্যর দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির সুরে শুধাল,
“মেয়ের তো না হয় বিরাট ডল আসবে। আর দিয়ার মাম্মার?”
দিব্য কিছুটা কৌতূহলী ও নির্লিপ্ত চোখে নবনীর দিকে চাইল। সোজা সাপটা গলায় বলল,
“তোমাকেও যা যা চাও। সব শপিং করিয়ে দেব।”
কথাটা শুনে নবনী বেশ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। সে কি আদৌ শপিংয়ের কথা বুঝিয়েছে নাকি? লোকটার আজ হলোটা কী? সে কি তার মনের ভাষা বুঝতে পারছে না? নবনী ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ফিকে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আমি শপিংয়ের কথা কখন বললাম? আমার পেছনে এত টাকা খরচ করে সদকার সওয়াব আপাতত আপনাকে নিতে হবে না! ওখান থেকে জাস্ট একটা কল দিতেন। তাতেই আমি খুশি হতাম। শুনলাম আপনার নাকি ফোনটা ভেঙে গেছে? কীভাবে ভাঙলেন ওটা?”
দিয়া এবার বাবার কোল থেকে নামার জন্য ছটফট করে দুই হাত নবনীর দিকে বাড়িয়ে দিল। নবনী আলতো করে মেয়েকে আবারও নিজের কোলে টেনে নিল। দিয়া আবারও কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“দিয়া খুব এংরি পাপ্পার ওপর! দিয়া আর থাকবে না পাপ্পার কাছে। পাপ্পা বড্ড পচা হয়ে গেছে। খুব পচা! ঠিক যেমন মাম্মা নানুবাড়ি গিয়ে পচা হয়ে গিয়েছিল!”
মেয়ের মুখে পুরনো খোঁটা শুনে নবনী দিব্যর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। দিব্যও সেই হাসির জবাবে কোনোমতে ঠোঁট দুটো টেনে একটা জোরপূর্বক বিবর্ণ হাসি হাসল। নবনীর মনে মনে অবশ্য বেশ মজাই লাগছে। লোকটা এতদিন পর ফিরে এসে কেমন গাম্ভীর্য দেখাচ্ছে। এখন মেয়ের অভিমানের ঠেলা সামলাক। দেখুক কেমন লাগে! দিয়ার এই মুখ ফুলানো অবয়ব দেখে মনে হচ্ছে না সে এত সহজে বাপের ওপর থেকে রাগ কমাবে। নবনী মেয়ের ফোলা গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,
এই অবেলায় পর্ব ৩৫
“ঠিক আছে সোনা। আমরা পাপ্পার শাস্তি পরে ঠিক বুঝে নেব। আপাতত চলো তো আমরা ডিনারটা ফিনিশ করি? মাম্মা আজ দিয়ার ফেভারিট ডিশ রান্না করেছে। আপনিও ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে আসুন। একসাথে খাব।”
দিব্য নিস্পৃহ গলায় বলল, “আমি আপাতত খাব না নবনী। আমার কিছু জরুরি কাজ আছে। তোমরা যাও।”
দিব্যর এই অতিমাত্রায় দূরত্ব বজায় রাখা আর গম্ভীর আচরণে নবনী আর কথা বাড়াতে পারল না। মনের কোণে একটা সূক্ষ্ম খটকা লাগলেও সে দিয়াকে কোলে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
