Home অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৬

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৬

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৬
শ্রাবণী ইয়াসমিন

আনায়া ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে। এই লোকটার মতিগতি একেবারেই তার কাছে সুবিধার ঠেকছে না।
জেভিয়ার আবারও বলল, “চলো না, বেইবি।”
আনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“তুমি আসলে এতটাই অসভ্য প্রকৃতির মানুষ, যা ভাষায় প্রকাশ করে বলা যাবে না।”
জেভিয়ার হঠাৎ আনায়ার হাত ধরে হ্যাচকা টান দেয়। আনায়া সোজা গিয়ে আটকে গেল তার বুকে। জেভিয়ার আনায়ার কানের পাশে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

“তোমার এই চোখ-ঝলসানো রূপ দেখে ঝলসে যাওয়ার অধিকার শুধু আমার। অন্য কারও না। এত সেজেছো কেন? নিষেধ করেছিলাম না আমি?”
আনায়া মোচড় দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“কোথায় এত সেজেছি? ভালো করে দেখো শুধু লিপস্টিক আর লিপগ্লস ব্যবহার করেছি।”
জেভিয়ার আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। মুখ এগিয়ে এনে আনায়ার ঠোঁট নিজের ঠোঁটে চেপে নিল। কয়েক মুহূর্তে পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারপাশ।
আনায়া একেবারে স্থির। যেন নির্জীব প্রাণী। কেবল বুকের ভেতরটা ধুকপুক করছে।
মিনিট খানেক পর জেভিয়ার ঠোঁট ছেড়ে দিল।
আনায়া বিরক্ত স্বরে বলল,
“যাবো না আমি। তুমি একাই যাও। আমার সাজগোজ নষ্ট করে দিয়েছো তুমি । সব লিপস্টিক খেয়ে নিয়েছো।”
জেভিয়ার কোনো কথা শুনল না। কেবল এক চিলতে হাসি দিল। হঠাৎ আনায়াকে কোলে তুলে নিল।
বাইরে বের হতে বের হতে বলল,
“লিপস্টিকই তো খেয়েছি, অন্য কিছু তো আর খাইনি।”

জেভিয়ারের Rolls-Royce Boat Tail গাড়িটি শহরের আলো ও বাতাসকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে, শো-শো করে ছুটছিল আইকন ক্লাবের দিকে। গাড়ির ভিতরে পাশেই বসে আছে আনায়া। জানালার দিকে মুখ বাড়িয়ে বাতাসের উচ্ছ্বাস নিচ্ছে সে, আর বাতাস এসে আছড়ে পড়ছে তার মুখে। খয়েরী চুলগুলো উড়ে জেভিয়ারের দিকে ছুটে আসছে। কিন্তু জেভিয়ার কোনোভাবে এগুলো সরানোর প্রয়োজন মনে করছে না। বরং এই অদ্ভুত নেশার মতো স্পর্শ, এই ঘ্রাণ সবই তার কাছে এক ধরনের আসক্তি।
গাড়িটি থমকে দাঁড়ালো নির্দিষ্ট গন্তব্যে। পেছনের দিকে দু’জন গার্ড এগিয়ে এসে দরজা খুলতে গেল কিন্তু জেভিয়ার এক হাতে হেলান দিয়ে ইশারা করল,
“ডোন্ট।”

গার্ডরা থেমে গেল, আর জেভিয়ার নিজের মতো করে গাড়ি থেকে নামল।
থামতেই অসংখ্য ঝলমলে লাইটের আলো তার চেহারায় আছড়ে পড়লো। সাদা শার্টের ফরমাল গেটাপের সাথে এক হাতে ঝুলিয়ে রাখা স্যুট। চোখে সানগ্লাস, আর ধূসর রঙা মণি অর্ধেক আড়ালে। ঘাড় ছুঁইছুই সিল্কি চুলগুলো নিখুঁতভাবে জেল দিয়ে সেট করা। মুখে শার্প জ লাইন, গালে হালকা দাড়ির ছোঁয়া।
ক্লাবের প্রবেশদ্বারেই হইচই কমে গেল। প্রতিটি নারীর প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি সব নজর তার দিকে। কেউই চোখ সরাতে পারছে না।
জেভিয়ার ঠোঁটের কোণে অল্প হাসি ফুটলো।
আনায়া ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো। চোখের কোণ থেকে হালকা চাঁদমাখা আলো পড়ছে তার মুখে। কিছুক্ষণ ধরেই সে চুপচাপ, শুধু জেভিয়ার দিকে মনোযোগ দিয়ে আছে। বাতাসে উড়ছে চুলগুলো, আর জেভিয়ার কাছে এগুলো যেন আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
জেভিয়ার আনায়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দরজার হ্যান্ডেল ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলতে খুলতেই ক্লাবের মধ্যে উপস্থিত সবাই উদগ্রীব হয়ে তাকাল।
প্রতিটি চোখে একটা প্রশ্ন স্পষ্ট,
“কে এই ব্যক্তি যার জন্য রাশিয়ার এত বড়, সুনামধন্য কোম্পানি, ড্রেভেন কর্পোরেশন-এর হেড চেয়ারম্যান নিজে গাড়ির দরজা খুলছে?”

দরজা খোলার সাথে সাথে আনায়া নিজেকে ঝলমলে আলো এবং চমকপ্রদ ভিড়ের মাঝে আবিষ্কার করল। তার হৃদস্পন্দন দ্রুত বেড়ে গেল। এই গ্ল্যামারাস, বিশাল আড্ডা এবং আলোয় ঝলমলানো পরিবেশে সে আগে কখনো ছিল না। ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল। প্রতিটি ধাপেই সকলের নজর তার উপর। সেই দৃষ্টির চাপ তাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে।
জেভিয়ার হাত বাড়িয়ে দিলো। আনায়া কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই হাতটি জড়িয়ে ধরল।
ক্লাবের ভিতরে অসংখ্য আলো, ঝলমলে ক্রিস্টাল চ্যান্ডেলিয়ার, এবং মানুষের চোখ সবকিছু তাদের চারপাশে ঘিরে ফেলল।
জেভিয়ার একটি গার্ডকে একটি কার্ড দেখাল এবং মুহূর্তের মধ্যে তারা ক্লাবের ভিতরে প্রবেশ করল।
প্রতিটি পদক্ষেপে ক্লাবের ভিড়ের মানুষদের চোখ তাদের দিকে। আনায়া নিজের আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছে, কিন্তু জেভিয়ার কেবল শান্ত।
আজ পার্টিতে উপস্থিত সকলেই হাজির, তবে দু’জনকে ছাড়া ইলোরা হেনরিক্স এবং তার বাবা লিও হেনরিক্স। প্রতিবছরের এই জমকালো আয়োজনের আকর্ষণ হয়ে থাকে ইলোরা। তবে এবার সে নেই।
এতে অবশ্য এখানে কেউই আফসোস করছে না। বরং উপস্থিত নারী মুখাবয়বগুলোতে স্পষ্ট প্রশান্তির ছাপ। অনেকের চোখে একধরনের লুকানো আনন্দ; কারণ এবার তাদের স্বপ্নপুরুষদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কিছুটা হলেও বেড়ে গেছে।

উপস্থিত অধিকাংশ রমণীর স্বপ্নপুরুষ হলো ড্রেভেন পরিবারের দুই পুরুষ জেভিয়ার ড্রেভেন এবং এরিক্স ড্রেভেন। যদিও কিছুটা কাছাকাছি গিয়ে এরিক্স ড্রেভেনকে দেখা সম্ভব, তবু জেভিয়ার ড্রেভেনকে কাছে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। প্রতি বছর ইলোরার জন্য জেভিয়ার কাছে কোনো নারী যাওয়ার অনুমতি পাওয়া সম্ভব হতো না। তাই অনেকেই দীর্ঘ প্রতীক্ষায় ছিলো, কবে জেভিয়ারকে পাওয়া সম্ভব হবে?
কিন্তু সেই আশা আর বাস্তব হলো কোথায়! এবার জেভিয়ার নিজেই উপস্থিত তাঁর সঙ্গে এক অপরূপ রমণীকে নিয়ে।
মোমের কোমলতা দিয়ে তুলনা করলেও যথাযথ হবে না সেই মেয়েকে। গাঢ় নীল গাউন যেন তার ফরসা ত্বকে ঝিলমিল করছে, প্রতিটি আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠছে।
জেভিয়ার আনায়াকে নিয়ে ক্লাবের ভিতরে প্রবেশ করতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ঝলমলে আলো, ধোঁয়াশা, মানুষের চমকিত দৃষ্টি সবকিছু হঠাৎ থেমে গেল, যেন সময় নিজেই স্তব্ধ।
সেই মুহূর্তে জন ড্রেভেন ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

“গুড ইভনিং, মাই সান।”
জেভিয়ারও একটি মৃদু হাসি দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল, “গুড ইভনিং, ড্যাড। তুমি কখন এসেছো?”
জন ড্রেভেন নীরবভাবে একটু হাঁসলো, “এসেছি আজই, কিছুক্ষণ আগে। তাই সরাসরি এখানে এলাম। বাড়িতে আর যাই নি।”
জেভিয়ার মাথা নাড়িয়ে প্রশ্ন করল, “এরিক্স কোথায়? ওকে আমি বিজনেস ট্রিপ থেকে আসার পর দেখিনি আর।”
জন ড্রেভেন হালকা জোরপূর্বক হেসে বলল, “আছে, আশেপাশে কোথাও হয়তো চলে আসবে। তুমি পার্টি উপভোগ করো। আর লিটল ফেইরী, তোমাকে আজ খুবই সুন্দর লাগছে। এঞ্জয় দ্যা পার্টি।”
এই বলে সে ধীরে পিছু হটে, ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
জেভিয়ার ক্ষুদ্র কিন্তু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখেই হালকা বাকা হাসি দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“বাস্টার্ড।”

“চোখ নামাও, ডেভিড। আর কত দেখবে? ওরা এসেছে প্রায় এক ঘণ্টা, আর তুমি তখন থেকেই তাকে দেখছো।”
এরিক্স ধীরে ধীরে বলল, কণ্ঠে সামান্য হতাশা মিশে।
ডেভিড হাতের ড্রিংকটি ঘুরিয়ে ধরে বলল,
“এইটা কোনো সাধারণ নারী নয়, এরিক্স। এর জন্য আমি সমস্ত নারী দেহ উপেক্ষা করে সারাজীবন নিরামিষ হয়ে থাকতেও রাজি।”
এরিক্স চোখ মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধীরে ধীরে আনায়াকে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছিল। প্রতিটি অঙ্গ-প্রতঙ্গ, প্রতিটি ভঙ্গি তার নজরে বন্দী।
জেভিয়ার তার শক্তপোক্ত হাত দিয়ে আনায়ার কোমর ধরে নিজ দিকে টেনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে সে বড় বড় বিজনেসম্যানদের সঙ্গে আলাপ চালাচ্ছে, হাসি বিনিময় করছে।
এতক্ষণে ক্লাবের সকলেই বুঝে গেছে জেভিয়ার এর সঙ্গে থাকা মেয়েটি তার স্ত্রী। এমন প্রভাবশালী উপস্থিতি আর ভিড়ের মাঝে এমন দৃশ্য বেশিরভাগ নারী হিংসাত্মক এবং ঈর্ষাপূর্ণ চোখে আনায়াকে দেখছে।
এরিক্স নিজেও অব্যাহতভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সামলাচ্ছে, কিন্তু ভেতরে সে ফিসফিস করে বলল,
“ড্যাম… সে”ক্সি।”
কিছুক্ষণের মধ্যে অ্যালেক্স এবং ভিক্টর দুজনেই একসাথে পার্টিতে প্রবেশ করল।
জেভিয়ার ভিড় কেটে অ্যালেক্সের দিকে এগিয়ে গেল। আর ঠিক তখনই আনায়া একা দাঁড়িয়ে ছিল ঝলমলে আলোর মাঝে।
হঠাৎ কোথা থেকে এক সুদর্শন যুবক এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। হাতে থাকা ড্রিংকসের গ্লাসটা আনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,

“উইল ইউ বি মাই পার্টনার ফর টুনাইট?”
আনায়ার গলা শুকিয়ে এলো। সে কেঁপে উঠে একটা ঢোক গিলল, দৃষ্টি ছুটল আশেপাশে জেভিয়ার কোথায়?
কোনো উত্তর না পেয়ে ছেলেটি আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। আনায়ার হাত ধরে তা ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“ইউ আর রিয়েলি লুকিং সো গরজিয়াস…”
আনায়া ভয়ে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। আর সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ভেসে এলো এক পুরুষালি কণ্ঠ,
“ইয়েস আই নো শী ইজ!”
ছেলেটা স্তব্ধ হয়ে ঘুরে তাকাল। পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে জেভিয়ার ড্রেভেন চোখে শীতল দৃষ্টি।
ছেলেটার চোখে মুখে আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠলো,
“হেয়,বস!হোয়াটস আপ? আ’ম ইওর বিগ ফ্যান বস। ইউ আর মাই ইন্সপিরেশন।”
জেভিয়ার ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আনায়ার সামনে দাঁড়াল। তার প্রশস্ত বুকের আড়ালে আনায়া প্রায় আড়াল হয়ে গেল। চোখের কোনায় শীতল হাসি নিয়ে জেভিয়ার জিজ্ঞেস করল,
“গুড। বাট ইউ নো হু ইজ শী?”
ছেলেটা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতেই, জেভিয়ার এক মুহূর্ত সময় নিল। তারপর আনায়াকে নিজের কাছে টেনে এনে তার কপালে গভীরভাবে একটি চুমু একে দিয়ে সবার সামনে ঘোষণা করল,

“শী ইজ মাই ওয়াইফ…মিসেস আনায়া ড্রেভেন। গট ইট?”
ছেলেটি লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিয়ে দ্রুত সরে গেল। মুহূর্তেই চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে এলো।
জেভিয়ার এক চিলতে তীক্ষ্ণ হাসি দিয়ে সামনে থাকা কাচের গ্লাসটা তুলে নিল।
সজোরে আঘাত করে গ্লাসটাকে ভেঙে ফেলল সে। ধারালো কাচের টুকরো হাতের তালুতে গেঁথে গেল। তৎক্ষণাৎ লাল র’ক্ত গড়িয়ে নামতে লাগল তার আঙুল বেয়ে।
আনায়া আঁতকে উঠে জেভিয়ার এর হাত ধরতে গেল।
“জেভিয়ার! তোমার হাত….”
কিন্তু সে হাত সরিয়ে ঝাড়ি মেরে দিল। ঠাণ্ডা, অথচ উত্তপ্ত কণ্ঠে বলল—
“ডোন্ট টাচ বেইবি… চলো।”
একটুও সময় নষ্ট না করে আনায়ার হাত শক্ত করে ধরে সে হনহন করে বেরিয়ে যেতে লাগল।
পেছন থেকে জন ড্রেভেনের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
“কি হচ্ছে জেভিয়ার? কোথায় যাচ্ছো? আর এইভাবে নিজের হাত কাটলে কেন?”
কোনো উত্তর দিল না জেভিয়ার। তার পদক্ষেপ থামল না এক মুহূর্তের জন্যও।
সবাই স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। তখনই ভিক্টর হালকা হেসে গ্লাস ঘুরাতে ঘুরাতে বলল,

“ওরা এখন ওদের পার্সোনাল টাইম স্পেন্ড করবে। আমরা বরং আমাদের পার্টি এঞ্জয় করি।”
হঠাৎ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল ডেভিড।
এরিক্স ভ্রু কুঁচকে তাকাল, “কোথায় যাচ্ছো?”
ডেভিড মুচকি হেসে গ্লাস নামিয়ে রাখল,
“ওদের পার্সোনাল টাইম এঞ্জয় করা দেখতে যাচ্ছি।”
এই বলে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল সে।
ভিক্টর ঠোঁটের কোণে বাকা হাসি টেনে বলল,
“পিলীপকার পাখা গজায় মরিবার তরে।”
ফুল স্পিডে গাড়ি ছুটে চলেছে। স্টিয়ারিং ধরে আছে জেভিয়ার, র*ক্ত ঝরা হাত দিয়েই। গাড়ির গতি এতটাই তীব্র যে আনায়া সিটে একদম চাপা পড়ে বসে আছে, বুকের ভেতর কলিজাটা যেন কাঁপতে কাঁপতে গলায় এসে আটকে গেছে।
তার দৃষ্টি একবারও সরছে না জেভিয়ার এর মুখ থেকে চেহারাটা একেবারে স্বাভাবিক। এত স্বাভাবিক যে আনায়া বোঝতেই পারছে না সে রেগে আছে নাকি নিস্তব্ধ তেজে জ্বলছে।
হঠাৎ করেই গাড়ি জোরে ব্রেক কষে থেমে গেল। চারপাশটা অচেনা, নির্জন, অদ্ভুত জায়গা। গাড়ির ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

জেভিয়ার শান্তভাবে নিজের হাতে গেঁথে থাকা কাচের টুকরোগুলো একে একে টেনে বের করতে লাগল। প্রতিটি টুকরো বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাল র’ক্ত ধারা হয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
কোনো সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ আনায়াকে এক ঝটকায় নিজের কোলে টেনে নিল সে। পরক্ষণেই পানির বোতল খুলে আনায়ার হাত ভিজিয়ে দিল র’ক্তাক্ত হাত দিয়েই জোরে ঘষতে লাগল তার ত্বক।
আনায়া হতভম্ব। গলা শুকিয়ে আসছে। আর জেভিয়ার বিরবির করে বলল,
“বা’স্টার্ডটা… এখানেই চুমু দিয়েছে তোমাকে, তাই না? ওর মাথাই আমি রাখব না।”
জেভিয়ার এর চোখে পাগলামির ছাপ। তার শক্তপোক্ত আঙুলে আনায়ার ফরসা হাত লালচে হতে লাগল অতিরিক্ত ঘষায়। তবুও সে থামছে না। পানি ফুরিয়ে গেলে এবার সে হেক্সিসলের বোতল খুলে আনায়ার হাতে ঢেলে দিল।
রাসায়নিকের তীব্র জ্বালা সাথে সাথেই ছড়িয়ে পড়ল। আনায়া ব্যথায় ছটফট করে উঠল, ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এলো এক তীক্ষ্ণ আহ শব্দ,
“আ…আহ্!”
এই শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই থেমে গেল জেভিয়ার এর হাত।
জেভিয়ার হঠাৎ আনায়ার গাল শক্ত করে চেপে ধরল। চাপা কন্ঠে হিসহিস করে বলল,

“এই তোর হাতে একটা ছেলে চুমু খেলো, আর তুই কিছুই বললি না! খুব ভালো লাগছিলো ওই ছেলের ছোয়া, তাই না? খুব মজা পাচ্ছিলি! চল… আজ তোকে আমি আসল মজা শেখাচ্ছি।”
কোনো কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই জেভিয়ার আনায়াকে এক ঝটকায় গাড়ি থেকে নামিয়ে নিল। তারপর কাঁধে তুলে নিয়ে হন্তদন্ত ভঙ্গিতে এগোতে লাগল ভেতরের দিকে।
আনায়া জানে না কোথায় এসেছে সে। চারপাশে এক অদ্ভুত নীরবতা, কোনো কোলাহলের শব্দ নেই, কোনো আলো নেই এ যেন নির্জনতার অতল গহ্বর।
আনায়া ছটফট করতে লাগল, কিন্তু জেভিয়ার এর বাহুর শক্তির কাছে সে অসহায়। অবশেষে দোতলার সিঁড়ির সামনে এসে তাকে নামাতে বাধ্য হলো জেভিয়ার।
কাঁধ থেকে নামানোর সাথে সাথেই এক ঝটকায় শক্তপোক্ত চড় বসিয়ে দিল তার গালে।
আনায়া দিশেহারা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু এখানেই থামল না জেভিয়ার পরপর আরও দুটি থাপ্পড় ঝড়ল তার মুখে।
চড়ের জোরে আনায়ার ঠোঁটের কোণ কেটে গিয়ে র’ক্ত গড়িয়ে পড়ল। তার গাল নিমিষেই লাল হয়ে উঠল, হাতের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠল ত্বকের ওপর।

জেভিয়ার দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল, বুক ওঠানামা করছে দ্রুত শ্বাসে। আর আনায়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ভয়, অপমান আর অসহায়তার মিশ্র অনুভূতিতে।
এত কিছু সহ্য করার পরও আচমকাই আনায়া এমন কিছু করে বসলো, যা জেভিয়ার এর কল্পনাতেও কোনোদিন আসেনি।
আনায়া পায়ের গোড়ালি উঁচু করে দাঁড়িয়ে তার বাহু জড়িয়ে নিল জেভিয়ার এর গলায়। পরক্ষণেই ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল তার ঠোঁটে।
জেভিয়ার থমকে গেল। সঙ্গে সঙ্গে মুখ সরিয়ে নিল একপাশে।
কিন্তু আনায়া থামল না। আবারও…
ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল তার ঠোঁটে।
দ্বিতীয়বারও জেভিয়ার জোরে মুখ ঘুরিয়ে নিল, কিন্তু আনায়া যেন উন্মাদ সাহসে ভর করেছে।
তৃতীয়বারও সে একই কাজ করল। এবার আর সরাতে পারলো না জেভিয়ার।
ঠোঁট ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেভিয়ার এক ঝটকায় আনায়াকে কোলে তুলে নিল। তাকে নিজের বুকে আরও কাছে চেপে ধরল।

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৫

কিন্তু তার ঠোঁটের স্পর্শ ছিল না কোমল, ছিল ক্ষোভে ভরা, উগ্র আগুনে দগ্ধ। জেভিয়ার আনায়ার ঠোঁট জোরে জোরে কামড়াতে লাগল, যেন শাস্তি দিচ্ছে, অথচ ভেতরে ভেতরে আরও ডুবে যাচ্ছে।
আনায়া চোখ বন্ধ করে সব সহ্য করল। তার চোখের কোণে অশ্রু জমে উঠল, কিন্তু তবুও প্রতিক্রিয়াহীন রইল কারণ জেভিয়ার এর এই উগ্র ভালোবাসায় সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে থেমে এল জেভিয়ার। তার শ্বাস তখনও দ্রুত। ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে কপাল ঠেকিয়ে দিল আনায়ার কপালে। চোখে চোখ রেখে ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
“জেভিয়ার কে কাবু করা শিখে গিয়েছো তাহলে! ” ইট’স ভেরি ব্যাড বেইবি……”

অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ২৭