কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৪১
আরিফা তাসনিম তামু
কেটে গেছে এক সপ্তাহ এর মধ্যে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে। এই যেমন শালু আর রৌদ্রের মধ্যে ভাব জমে গেছে। আর জমবে নাই বা কেনো? দুজন তো একি নৌকারই মাঝি।আদ্র আর আহি দুজনের মধুর দিন কাটছে।
আজ শুক্রবার সপ্তাহে ছুটির দিন। বাড়ির বড় ছোট সবাই বাড়িতেই আছে।এখন বাজে বেলা ১০ টা।আদ্র নাস্তা করেই কোনো একটা কাজে বাইরে গিয়েছে।আহি, ইয়ানা,শালু মিলে দাদি রুমে গল্প করছে।বাড়ির মহিলারা রান্না ঘরে কাজ করছে।আর আজিজ নেওয়াজরা তিন ভাই বাগানে বসে কথা বলছে।
এমন সময় আদ্র আর রৌদ্র বাড়িতে ডুকল সাথে একজন বয়স্ক ব্যাক্তি। আদ্র রৌদ্র দুজনেকে অস্বাভাবিক লাগছে। আদ্রের চোখ জোড়া অস্বাভাবিক লাল।হাত পা কাঁপছে হয়তো তীব্র রাগে। রৌদ্রের একি অবস্থা। আদ্র ড্রয়িং রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে ডেকে উঠল।
—ফিহা কাকিয়া কোথায় তোমরা এক্ষুনি নিচে আসো।
আদ্রের ডাক পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে উঠে।কেউ বুঝছে আদ্র এভাবে ডাকছে কেন।তবে যে যেখান থেকে পারছে ছুটে আসছে।ফাইজ নিজের রুমে বসে কিছু কাগজপএ দেখছিলো।সেগুলো পেলে ছুটে এসেছে আহি, ইয়ানা,শালু ও বাদ পড়ে নি ফারদিনা নেওয়াজকে ধরে নিয়ে আসা হলো।রান্না ঘর থেকে আতিয়া নেওয়াজ পারুল নেওয়াজ ছুটে আসলো।ফিহা আজকে অপ ডে দেখে ফেসিয়াল করায় ব্যস্ত মুখে একগাদা আটা ময়দা মেখে বসে ছিল।আদ্র ডাকে বিরক্ত নিয়ে সেভাবেই ছুটে আসে।ফিহাকে এই অবস্থায় দেখে শালু মুখ ভেঙিয়ে বিরবির করে বলে
—উম আইছে পেত্নী কোথাকার লাগতেছে কেমন। মনডা চায় এক বাটি গোবর এনে মুহে লাগাইয়া দি।
তিন ভাইয়া এমন সময় বাগন থেকে বাড়িতে এসে ডুকে।সবাইকে এভাবে দেখে ভ্রু কুচকে আসে তিনজনের। তবে আদ্রের সাথে আসা সেই বয়স্ক লোককে দেখা মাএই ফিহা আর পারুল নেওয়াজের ঘাম ছুটে যায়।কম বেশি সবাই উনাকে চিনতে পারে।
আজিজ নেওয়াজ এগিয়ে এসে বলে
—কী ব্যাপর সবাই একসাথে এভাবে কিছু কী হয়েছে।আর রহিম ভাই তুমি এতো বছর পর কোথায় থেকে আসলে সেদিন হুট করে চলে গেলে কেনো,,, ?
রহিম মিয়া হচ্ছে এই বাড়ির পুরনো দারোয়ান। রহিম মিয়া মাথা নিচু করে বললেন
—ভাইজান আমারে আদ্র দাদুভাই নিয়া আসছে।
আজিজ নেওয়াজ ছেলের দিকে তাকিয়ে কিছু বলবে। তার আগেই আদ্র পারুল নেওয়াজের সামনে গিয়ে বলে
—কী ব্যাপার কাকিয়া তোমরা মা মেয়ে এমন ঘামছো কেনো?১৫ বছর ধরে জা কেউ জানতে পারেনি তা আজকে সবাই জেনে জাবে এজন্য ভয় পাচ্ছো.?
পারুল নেওয়াজ তোতলানো সরে বলে
—কী কী সব বলছিস তুই আদ্র কী বলছিস আ আমি তো কিছুই বুজতে পারছি না।
আদ্র ঠোঁট বেঁকিয়ে হেঁসে বলে
—তাই নাকি আচ্ছা সমস্যা নেই আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি।
আদ্র একবার আহির দিকে তাকাল আহিও তাকিয়ে ছিল দুজনের চোখাচোখি হয়।আদ্র চোখ সরিয়ে সরাসরি তরিকুল নেওয়াজের সামনে এসে দাঁড়াল।তার পর আহিকে দেখিয়ে বলে
—চাচ্চু ওই যে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে দেখছো না?ওর গায়ে কিন্তু তোমারই রক্ত কিন্তু হায় আফসোস জন্মের পর থেকে সে তার বাবার ছায়ার ছোঁয়া পায়নি।তুমিই তো ওকে জন্মদিলে শুধুমাএ তোমার উপর ভরসা করে মেঝে আম্মু ও’কে এই বাড়িতে রেখে যায়। তুমি ওকে পেটে দিয়েই চলে এসেছিলে। ব্যস তোমার দায়িত্ব ওইখানেই শেষ।কিন্তু মেঝো আম্মু ওকে পেটে নিয়ে একা একা কষ্ট করেছে জন্ম দিয়েছে। জন্মের পর মেঝো আম্মু একা একা সব করেছে। সেদিন মেঝো আম্মু চাইলেই আহিকে নিয়ে যেতে পারতো কিন্তু নেয় নি কেনো জানো.? মেঝো আম্মু ভেবেছে এখানে থাকলে ও বাবার আদর পাবে ও পরিবারের সবার আদর পাবে অনেক আদর যত্নে ওকে তোমরা বড় করবে।কিন্তু আফসোস ও আদর যত্নে বড় হয়েছে ঠিকই তবে সেটা এই বাড়ি থেকে না।তুমি যদি সেদিন ওকে বুকে টেনে নিতে তাহলে ও কখনোই হারিয়ে যেতো না।আফসোস তুমি কাকিয়ার ভয়ে ওর মাথায় হাত পর্যন্ত রাখো নি কখনো।
তুমি ফিহাকে যতটা আদর যত্ন করতে তার কোণা পরিমাণও ওকে করো নি।কিন্তু সত্যি কি জানো তুমি যাকে অতি আদর যত্নে বড় করলে সে তো মানুষই হতে পারেনি। ওর ভিতর তো দয়া মায়া কিছুই নেই।আর থাকবে কীভাবে গাছ যেমন হয় ফল ও তো তেমনই হবে তাই না। চাচ্চু তুমি কী জানো ১৫ বছর আগে আহি কীভাবে হারিয়ে গেছে?আরে ওতো কখনো হারায়ই নাই। ওকে তো তোমার মেয়ে পিছন থেকে ফুলদানি দিয়ে মাথায় পাঠিয়ে দেয় ।তার পর সুযোগ বুঝে তোমার বউ বাড়ির বাইরে এনে তার ভাইয়াকে কল দিয়ে গাড়ি করে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসে।শুধু তাই নয় রহিম চাচা তা দেখে আটকাতে গেলে। কাকিয়া আর তার ভাই মিলে টাকা দিয়ে তার মুখ বন্ধ করতে চায়।সেটা যখন পারে না তখন রহিম চাচার মেয়েরও এমন অবস্থা করবে বলে হুমকি দিয়ে রহিম চাচাকে এই বাড়ি থেকেই তাড়িয়ে দাওয়া হয়।আর তোমার আদরের মেয়ে ওইটুকুনে মেয়ের মাথায় একটা আঘাত করেনি ফুলদানি দিয়ে রাগে ক্ষোভে পরপর চার টা আঘাত করে। আঘাত গুলো এতোটাই জোরে ছিল যার কারণে আহি কয়েক বছরের জন্য স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলে।তার পর একে একে রৌদ্র কীভাবে পায় সব জানায় আদ্র।সবশেষে বলে আমার কথা বিশ্বাস না হলে রহিম চাচাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারো।
আদ্রের কথায় পুরো নেওয়াজ বাড়িতে যেন বাজ পড়লো।নির পরিবেশে রহিম চাচা কেঁদে বললেন
—আদ্র দাদু যা বলছে সব সত্য।আমারে টাকা দিয়া মুখ বন্ধ করতে চাইতে কিন্তু আমি রাজি হই নাই।ওইটুকুনে মেয়ের এই অবস্থা দেখে আমি হাত জোর করে বলেছিলাম।ওরে আমারে দিয়া দিতে আমার বড় ছেলেডার বাচ্চা হয়নি ও পালবে। কিন্তু দেয় নি উল্টো আমার মেয়ের ক্ষতি করবে বলে ভয় দেখায়।আমারে এই বাড়ি থেকে তাড়ায় দেয়।
সবাই যেন পাথর বনে যায়।কেউ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে।সকলের চোখে পানি।আহি নিচুর দিকে তাকিয়ে চোখের পানি ফেলছে। পারুল নেওয়াজ মাথা নিচু করে থরথর করে কাঁপছে। সত্য কখনো চাপা থাকে না তিনি আজ উপলব্ধি করতে পারছেন।তরিকুল নেওয়াজ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল স্ত্রীর সামনে শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন.?
—আদ্র যা বলছে সব কী সত্যি.?
পারুল নেওয়াজ চুপ করে দাড়িয়ে আছে। তরিকুল নেওয়াজ চেচিয়ে বললেন
—কি হলো কথা বলছো না কেনো.?
পারুল নেওয়াজ ভয়ে কেপে উঠলেন। এবার ন্যাকাকান্না শুরু করলেন
—হ্যাঁ সব সত্য আমার ওই মেয়েকে সহ্য হতো না। আর আমি তো ভুল কিছু করিনি জা করেছি বেশ করেছি।কারণ পৃথিবীতে এমন কোনো নারী নেই যে সতীন আর সতীনের মেয়েকে দেখতে পারে।বাড়ির সবাই ওই মেয়েকে নিয়ে মাতামাতি করা শুরু করে দিয়েছে।তুমি ও ওই মেয়েকে বুকে টেনে নিতে চাইতে।মাঝখান দিয়ে আমার মেয়েটার আদর কমে যেতো।এমন কী আমার ছেলেটাও পছন্দ ওই মেয়ের জন্য পাগল হয়ে গেছে।সারাক্ষণ আমার বনু আমার বনু করতো।অথচ নিজ মায়ের পেটের বোনটাকে ও এভাবে ডাকে না।বাইরে থেকে আসার সময় সব সময় ওই মেয়ের জন্য এটা ওটা নিয়ে আসে।আমার মেয়েটা এসব দেখে কাঁদত। মা হয়ে আমি তা সহ্য করতে পারিনি। নিজের সুখ আর সংসার নিজের মেয়ের জন্য আমি এটা করেছি।
ঠাসসস”পুরো বাড়ির সবাই চমকে গেলো।পারুল নেওয়াজ গালে হাত দিয়ে স্বামীর দিকে বাক্য হারা হয়ে তাকিয়ে আছে।তরিকুল নেওয়াজ চেচিয়ে বলে উঠলেন
—তুমি মানুষ নাকি জানোয়ার।আমার ভাবতেও ঘৃণা লাগছে তোমার মতো একটাা কিটের সঙ্গে আমি এত বছর সংসার করেছি।তোমাদের কিশের অভাবে দেখেছি বলো।তোমার জন্য আমি আমি মেয়েটাকে আজ পর্যন্ত ছুয়েও দেখিনি বুকে টেনে নাওয়া তো দূর।কীভাবে পারলে এটা করতে। মায়া হলো না ওইটুকুনে নিস্পাপ মেয়ের সাথে এমনটা করতে। তোমার জন্য আমি রিসার সাথে পর্যন্ত সম্পর্ক রাখিনি কখনো ওর খোঁজ ও নাওয়ার চেষ্টা করিনি।আর তুমি কিনা শেষ পর্যন্ত এত নিচে নেমে গেলে।ছি আজ এই মূহুর্তে তুমি আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও।
পারুল নেওয়াজ এবার কেঁদে কেঁদে মাপ চাইল। তরিকুল নেওয়াজ ফিরেও তাকালেন না।মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বাবাকে নিজের সামনে দাঁড়াতে দেখে ফিহা মাথা নিচু করে নিল।
—কম আদর দিয়েছি তোমায়?যখন যেভাবে যা চেয়েছো তাই দিয়েছি।আজ মনে হচ্ছে বাবা হিসেবে সত্যিই আজ আমি ব্যর্থ। কেনো এমন করলে? তোমার জন্য আমি আমার আরেক সন্তানকে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত করেছি।কীভাবে পারলে এমনটা করলে হাত কাঁপলো না?
—আব্বু আ
ঠাসস”
—খবদার তোমার ওই নোংরা মুখ দিয়ে আমাকে বাবা ডাকবে না।তোমার বাবা নেই আজকের পর থেকে।তোমার ভিসা পাসপোর্ট সব রেডি করছি এক সপ্তাহের মধ্যে তোমাকে আমি লন্ডনে পাচ্ছি গোছগাছ করে নাও।
এতক্ষণ দূরে দাড়িয়ে থাকা ফাইজ ধীর পায়ে হেঁটে মায়ের সামনে দাঁড়াল।ধরে আসা কন্ঠে বলল
—তোমরা যে এমন জঘন্য কাজ করতে পারো তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। আজ তোমাদের মা বোন বলতেও কেন জানি লজ্জা লাগছে।আজ যদি তোমার মেয়ের সাথে অন্য কেউ এমন করতো তাহলে কী মেনে নিতে পারতে?কখনোই পারতে না।তোমার যদি ওইটুকুনে মেয়েটার প্রতি এতোই হিংসা তাহলে আমাকে বলতে আমি কখনোই আদর করতাম না।তবুও ও ভালো থাকতো এটাই চাইতাম। তোমার থেকে এটা আশা করিনি আম্মু।
পারুল নেওয়াজ মাথা নিচু করে কাঁদছেন। সত্যি কারের কান্না কিনা সেটা তিনি ছাড়া কেউ জানে না।ফাইজ এবার বোনের সামনে এসে দাঁড়াল। ফিহা ভাইয়ের দিকে চোখ তুলে চাইল।ফাইজ কোনো কথা ছাড়া ঠাসস”করে ফিহার অপর৷ গালে থাপ্পড় মেরে দিল। ফিহা দু কদম পিছিয়ে যায়।ছলছল চোখে চেয়ে চলে
—ভাইয়া তু
—চুপ খবরদার আমাকে ভাইয়া বলে ডাকবি না।আমাকে যদি ভাই ডাকার মতো কেউ থেকে থাকে সেটা হচ্ছে আমার বোন আহিয়া ডাকবে। ও ছাড়া আমার কোনো বোন নেই কখনো ছিল ও না।আব্বু ওরে সারাজীবনের জন্য ওই দেশে সেটেল করে দাও ও যেন কখনো এই দেশে পা না রাখে।
বলেই ফাইজ উপরে চলে যায়।রৌদ্র পারুল নেওয়াজের সামনে এসে হুংকার দিয়ে বলল
কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৪০
—আপনার ভাগ্য ভালো আপনি ১৫ বছর আগে এই রাদিফ খান রৌদ্রের হাতে পড়েন নি।আজ যদি ছেলে হতেন তবে আমি রৌদ্র আপনাকে খুন করে জেলে যেতাম প্রয়োজনে।তবুও আমার বোনকে কষ্ট দাওয়ার প্রতিশোধ নিতাম।তবে আপনার ভাইকে ছাড়ছি না মনে রাখবেন।আর আপনার বেহায়া নোংরা মেয়েটা যদি ছেলে হতো তাহলে ওর রক্ত আমি ঠিক ততটাই জরাতাম যতটা আমার বোনের গিয়েছে।
একে একে সবাই এসে মা মেয়ে দুজনকে অপমান করে যায়।
