কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৪০
আরিফা তাসনিম তামু
গত দুদিন ধরে আহি খান বাড়িতে আছে। না তো সে নেওয়াজ বাড়িতে যাচ্ছে না তো আদ্রের সাথে যোগাযোগ করছে।এই বেচারা আদ্র কল দিতে দিতে শেষ প্রতিদিন মাঝরাতে শশুর বাড়িতে এসেও বেচারা বউয়ের ছায়ার কাছেও যেতে পারছে না।হুট করে তার সহজ সরল বউটার কী হলো বুজতে পারছেনা।এই দিকে বুকটা বউয়ের বিরহে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কাজের চাপে দিনে কান বাড়িতে আসতেও পারে না।রাতে আসলেও বউয়ের দেখা পায় না। বউটা তার কলেজেও যাচ্ছে না হুট করে কী এমন হলো তার পুতুলের মতো বউ কেন এমন করছে আদ্রের মাথা ধরছে না।নিজের রুমে পায়চারি করতে করতে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
—কপাল করে একটা সমন্দি পেয়েছি বালটাই অর্ধেক আমার বউয়ের ব্রেণওয়াশ করিয়ছে।নাহ এভাবে বসে থাকলে নির্ঘাত বউয়ের অভাবে আমার মরণ নিশ্চিত।
আদ্র দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে আধাঘন্টার মধ্যে শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে।একদম পরিপাটি হয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো।
সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন ইয়ানা।তার মাথায় এখন একটাই নাম ঘুরছে সেটা হচ্ছে রৌদ্র। লোকটাকে আজকে দুদিন ধরে দেখতে পারছে না।সেই যে তার অবস্থা বেহাল করে গেলো আর তো আসলো না।আচ্ছা ওর উপর রাগ করেই কী আসছে না নাকি অন্য কোনো কারণ.?এই দিকে রৌদ্রের উপর রাগ করে রৌদ্রকে ব্লক করেও যখন রাগ কমাতে পারেনি তখন মোবাইল টাই আছড়ে ভেঙ্গে দিয়েছে।আহিটার সাথেও যোগাযোগ হচ্ছে না। একবার কী ও বাড়ি যাবে.?গেলে আবার লোকটার সামনাসামনি হলে তখন কী হবে.? আবার যদি রেখে যায়.?আহিটাকেও মিস করছে।নাহ একবার ঘুরে আসা যাক।
এই ভেবে উপরের দিকে হাঁটা দিল এমন সময় ভাইকে তাড়াহুড়ো করে নামতে দেখে জিজ্ঞেস করল
—ভাইয়া এত তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছো.?
আদ্র নামতে নামতেই উওর দিল
— important একটা কাজে যাচ্ছি দেরি হয়ে গেছে তাই তাড়াহুড়ো করছি।
—খেয়ে জাও।
—না সময় নেই বাইরে খেয়ে নিব আম্মুকে বলিস আমি গেলাম।
আদ্র চলে গেলো।ইয়ানা উপরের দিকে হাঁটা দিল কিছু দূর জেতেই দেখে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে শালু। ইয়ানা গিয়ে জিজ্ঞেস করল
—কিরে শালু এখানে এভাবে মন খারাপ দাঁড়িয়ে আছিস কেনো.? কেউ কিছু বলেছে?ফিহা আবার কিছু বলেছে নাকি.?
—না আপা পরীআপার কথা খুব মনে পড়ছে।আজগা তিন দইরা দেহি না।
—জাবি আমার সাথে..?
—কোনহানে..?
—তোর পরীআফার কাছে.?
শালু খুশিতে গদগদ হয়ে বলে
—সত্যি নিয়া যাইবেন.?
ইয়ানা হেঁসে বলে
—১০ মিনিটে রেডি হয়ে আসতে পারলে তবেই নিব। এক সেকেন্ড ও দেরি হয়ে রেখে চলে জাব,,।
ইয়ানার বলতে দেরি শালুর দৌড়াতে দেরি হল না যেতে যেতে চেচিয়ে বল
—মুই দুইডা মিনিটের ভিতর আইয়া পড়তেছি।
—আস্তে যা পড়ে যাবি।
কে শুনে কার কথা শালুর ছায়াও আর দেখা যাচ্ছে না সেকেন্ডের মধ্যে হাওয়া হয়ে গেলো।ইয়ানা না হেঁসে পারল না নিজের রেডি হতে চলে গেলো।
রৌদ্র নিজের কেবিনে কিছু ফাইল দেখছে একটু পর মিটিং আছে।ইয়াশ সাহায্য করছে।এমন সময় কেউ একজন অনুমতি ছাড়াই কেবিনে ডুকে সশব্দে দরজা লাগালো।রৌদ্র ইয়াশ দুজনেই সেই শব্দে ধরপরিয়ে উঠল।আদ্র দাড়িয়ে খেয়ে পেলার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রৌদ্রের দিকে।রৌদ্র তো আদ্রকে দেখে ইয়া বড় একটা হা করে তাকিয়ে আছে।আদ্র কখনো তার অফিসে আসে না।আজ হঠাৎ সূর্য কোন দিকে উঠল বেচারা বুঝতে পারছে না।টাশকি খেয়ে হা করে চেয়ে আছে।
—ইয়ে মানে স্যার মুখ বন্ধ করেন মাছি ডুকে যাবে।
ইয়াশের কথায় রৌদ্র থতমত খেয়ে মুখ বন্ধ করে নেয়। আজকে আর ইয়াশের কথায় তেমন গুরুত্ব দিল না রৌদ্র। না হলে আজকেও ইয়াশের চারকী নট হয়ে যেতো।রৌদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে কাহিনী বুঝার চেষ্টা করলো।এমনি এমনি তো এই ব্যাটা তার অফিসে আসা লোক না।তার পর মনে পড়লো ঘটনা।
—আরে আরে আমার একমাএ বোনের জামাই দুলাভাই এলো যে।দেখো ইয়াশ দেখো আমার কী সৌভাগ্য মিস্টার ফাইজান নেওয়াজ আদ্র আমার অফিসে।আসেন তো দুলাভাই বসেন তো সোফায় বউ ছাড়া থাকতে কেমন জ্বালা বলেন তো আমারে।
রৌদ্রের হেয়ালি মার্কা কথায় আদ্রের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।রৌদ্রের সামনে এসে টেবিলে সজোরে দিল এক ঘুসি রেগে চেঁচিয়ে বলে।
—এই তোরা ভাই বোন দুটা আমাকে পেয়েছিসটা কী বল.?তোর বোনের সমস্যা কী বলা নেই কয়া নেই হুট করে বাপের বাড়ি চলে গেলো কল দরছে না আমি ও বাড়ি গেলেও সামনে আসছে না।ব্রেনওয়াশ করিয়েছিস তাই না?আমার সহজ সরল বউটার মাথা তুই খেয়েছিস তাই না?ছ্যাহ্ তোর লজ্জা করে না বোন আর বোনের জামাইয়ের মাঝখানে বেগড়া দিতে শালা মীরজাফর।
রৌদ্র এমন ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যেন কিছু হচ্ছে না এখানে যেন সে ছাড়া আর কেউই নেই।এইদিকে ইয়াশ বেচারা ভয়ে বুকে থু থু দিচ্ছে আর দোয়া দুরুদ পড়ছে।
—নট শালা অনলি সমন্দি ওকেহ.? স ম ন্দী বুঝেছিস।
—তোর মতো সমন্দি কে দেক্কার জানায়।
রৌদ্র— আমার মতো সমন্দি পাওয়া সাত কপালের ভাগ্য। তোর তো গর্ব করা উচিত আমাকে নিয়ে..!
আদ্র—সেই সাত কপালকে সালাম।তোর মতো সমন্দি পেয়ে গর্ব করতে করতে তোর বোনের জায়গায় আমিই গর্ববতী হয়ে গেলাম।
এতক্ষণ পাশে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধুর ঝগড়া দেখতে থাকা ইয়াশ।আদ্রের কথা শুনে বিড়বিড় করে বলে উঠল
—বাপরে ভাই বোন দুটারি হেব্বি পাওয়ার ভাই মানুষের কোমড় ভেঙ্গে দিয়ে আবার নিজেকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভালো মানুষ বলে দাবি করছে।আর বোন তো নাকি জামাইকেই প্রেগ্যান্ট করে দিলো।আফসোস আমার বউয়ের তো পাওয়ারই নাই যদি থাকতো তাহলে ওর জায়গায় আজ আমি প্রেগ্যান্ট হতাম বেচারির আর এতো কষ্ট করতে হতো না।নিজের দোষে নিজে কষ্ট করছে তাতে আমার কী যাক বাবা আমি তো বেঁচে গেছি কষ্ট থেকে।আদ্র ভাইটার জন্য খুবই দুঃখবোধ করছি।আল্লাহ পাক ভাইটার সন্তানকে সুস্থ ভাবে দুনিয়াতে আনুক আমিন,,।
ভাগ্যিস রৌদ্র শুনে নাই না হলে আজ ইয়াশের যে কী হতো। সত্যি চারকী টা নট হয়ে যেতো হয়তো।এই দিকে আদ্র গর্ভবতী শুনে রৌদ্র দৌড়ে এসে আদ্রের পেটে হাত দিল আদ্র দু কদম সরে গেলো।
— সত্যি বলছিস সোনা আমি মামা হবো.?আচ্ছা তুই বাপ হবি না মা হবি.?না মানে তোর পেট থেকে হবে তো এজন্য জিজ্ঞেস করলাম।
আদ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। রাগে মাথায় কী বলতে কী বলে পেলেছে এখন তো এই তার ছিঁড়া ওরে ছাড়বে না।এই দিকে ইয়াশের পেট পেটে হাসি বের হতে চাচ্ছে কিন্তু ভয়ে পারছে না।আদ্র আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়াল না হনহনিয়ে হাঁটা দিল।রৌদ্র হাসতে হাসতে শেষ।
—আদ্র শুন কিছু তো অনন্ত খেয়ে যায়।
না আদ্র চলে গেলো।রৌদ্র চেয়ারে বসতে নিয়েও বসলো না কী মনে করে আদ্রের পিছে দৌড় দিল যেতে যেতে বলল
—ইয়াশ মিটিং টা বিকাল ৪টায় রাখো আমি এখন যাচ্ছি তুমি এইদিকেটা দেখো।
—কিন্তু স্যার আ
রৌদ্র নেই হওয়া হয়ে গেছে।
আদ্রের গাড়ি এসে সজোরে ব্রেক কষলো খান বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নেমে হনহনিয়ে ভিতরে হাঁটা দিল। বাড়ির ভিতরে ডুকে আদ্র কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা উপরে আহির রুমে চলে গেলো। দরজা খোলাই ছিল আহি একবার উঠে খেয়ে আবার শুয়েছে।আদ্র রুমে ডুকে দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে দেয়। পিছন ফিরে দেখে তার পাগলা বউ তারই টি-শার্ট পড়ে পুরো খাট জুড়ে এলোমেলো হয়ে ঘুমাচ্ছে।বউ তার টি-শার্ট বাপের বাড়ি নিয়ে এসেছে এজন্যই তো সে এটা খুঁজে পাচ্ছে না।আদ্র আস্তে আস্তে করে খাটের দিকে এগিয়ে যায়।দেখে তার বউটা একবারে শান্ত বাচ্চার মতে ঘুমিয়ে আছে তার ঘুম কেঁড়ে নিয়ে। একটু পর আদ্র খেয়াল করে আহি ঘুমের মধ্যে হাতুড়ে কিছু খুঁজছে। আদ্র বুঝলার চেষ্টা করে বেশি সময় লাগেনি বুঝতে। আদ্র খাটে উপর উঠে আহির পাশে শুয়ে পড়ে।আহি কোল বালিশ ভেবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে বলে
—কোথায় ছিলিস জান কতক্ষণ ধরে খুঁজছি।
তারপর ঘুমের মধ্যে আদ্র গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে বল
—কীরে আজ তোকে এতো মোটা মোটা লাগছে কেন বড়ও লাগছে এতো শক্ত হলি কবে?
এই দিকে আহির এসব শুনে আদ্র খুব হাসি পাচ্ছে বেশ মজা নিচ্ছে। নিজেও বউকে জড়িয়ে ধরে বুকে নিল।
— কোল বালিশ আবার পারফিউম দেয় নাকি।স্মেইল টা খুব চেনা চেনা লাগছে.?
ঘুমের মধ্যেই আহি ভাবতে লাগল মনে পড়তে ঠাস করে আদ্রের বাহুতে দিল এক থাপ্পড়।
—শালা এটা তো আমার জামাই দেয় তুই আমার জামাই হতে চাচ্ছিস কেনো রে.?
বেচারা আদ্র বউয়ের পাগলামি দেখে হাসবে নাকি মার কাওয়ার দুঃখে কাঁদবে বুঝতে পারছে না।আহির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে
কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৯
—আমার ঘুম নষ্ট করে নিজে আরামে ঘুমাচ্ছেন তা তো মানতে পারছি না বউ জান।শুধু শুধু আমাকে কষ্ট দিচ্ছেন আমার দোষটা বলুন রাগ করে থাকলে বলেন আমি মাফ চাইবো ভুল হলে বলুন।আচ্ছা ধরে নিলাম রাগ করেছেন
না আহি শুনছে কিনা কে জানে আদ্র আহির কানের ললিতে আলতো কামড় দিয়ে বলে
—এই যে বউজান শুনছেন..?
আর কতো রাগ করে বাপের বাড়ি থাকবেন?আপনার বিরহে আপনার স্বামীর বুক জ্বলে ছারখার। প্রয়োজনে আমার উপর হামলে পড়েন তবুও বুকে এসে বুকটা শান্ত করুন প্লিজ।
