Home কী ভয়ংকর মায়া তোর কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৭

কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৭

কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৭
আরিফা তাসনিম তামু

এই তো আস্তে আস্তে আগের ইয়ানার মত স্বাভাবিক হচ্ছে। রৌদ্র ইচ্ছে করেই এসব বলে রাগাতে চাচ্ছে। রৌদ্র এবার গম্ভীর কন্ঠে বলে
—শুনো তোমার প্রতি আমার কোনো কালেই
ইন্টারেস্ট ছিলো না। এখন যেহেতু বিয়েটা হয়ে গেছে
কী আর করার, চলো বাসর টা সেরে ফেলি।
হাঁসের বাচ্চা মুরগীর বাচ্চা গুলো ডাউনলোড
দিয়ে দিই। ওদের পড়াশোনার দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাবা
হয়ে সন্তানের এত বড় ক্ষতি কীভাবে হতে দিই বলো?
—কী বললেন বুঝি নি, আবার বলুন…!

ইয়ানা কিছু মূহুর্তের জন্য ভুলে বসেছে যে তার আর রৌদ্রের বিয়ে হয়েছে। আর কেনই বা রৌদ্র এসব অদ্ভুত কথা বলছে ইয়ানা বুঝতে পারছে না। অতিরিক্ত চিন্তায় সে বিয়ের বিষয়টাই মাথা থেকে বের করে ফেলেছে। ইয়ানার কথার রৌদ্র মুখটা আরেকটু ইয়ানার দিকে এগিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে গানের সাথে মিলিয়ে সুর তুলে বলে
—আয় সজোনি বাসর করি দুজন মিলিয়া”~
বাসরের তালে কাইন্দা যাবি গলা ছাড়িয়া”
কী, বিয়ে করার সময় ঠিকই তো কবুল বললে। আর এখন একদিন হওয়ার আগেই ভুলে গেলে? তুমি কী সত্যি ভুলে গেলে নাকি বাসরের ভয়ে ভুলে যাওয়ার নাটক করছো..?
ইয়ানার এবার স্মরণে আসলো বিয়ের বিষয়টা। মুহূর্তে চোখ মুখ লাল হয়ে গেলো। মাথা নিচু করে ফেললো। ড্রিম লাইটের হালকা আলোতেও তা বেশ বুঝতে পারলো রৌদ্র। তবে আর মেয়েটাকে লজ্জায় ফেলল না। গম্ভীর কন্ঠে বলল

—বিয়ে হয়েছে এর মানে এই না যে তুমি তোমার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছো। আমাদের বিয়েটা আর পাঁচ বিয়ের মতো হয় নাই, তুমি জানো। এসব বিষয় নিয়ে পড়ে থেকে সময় নষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। যা যা হয়েছে এক্সিডেন্ট ভেবে ভুলে যাও। তুমি তোমার মতো করে চলো। নিজের মতো করে জীবন সাজাও। পড়ালেখায় ফোকাস করো। আর এভাবে না খেয়ে নিজের শরীর খারাপ করার কোনো মানে হয় না। উল্টো নিজে কষ্ট পাবে। কাল থেকে যেন এসব আর না শুনি। ঘুমাও, আসি।
এই বলে রৌদ্র উল্টো ঘুরে দরজা চাপিয়ে চলে গেলো। আর এইদিকে ইয়ানা রৌদ্রের যাওয়ার দিকে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। সে মানছে তাদের বিয়েটা আর পাঁচটা বিয়ের মতো হয় নাই। তাই বলে লোকটা এভাবে বিয়েটা ভুলে যেতে বলবে? এতো নিষ্ঠুর মানব ইয়ানা আর দুটো দেখেনি। ইয়ানা এবার ভেংছি কেটে মুখ ভেঙ্গিয়ে বিড়বিড় করে বলল

—উম, আসছে এক্সিডেন্ট ভেবে ভুলে যাও। বাঁদর মুখো লোক, আপনার কী মনে হয় আমি এই বিয়ে মনে রাখবো? আপনার মতো অসভ্য লোকটা স্বামী হিসেবে মানবো? উঁহু, কখনো না। এই ইয়ানা কখনো রৌদ্র নামক বাঁদর মুখো, অসভ্য, হারে বজ্জাত লোককে স্বামী হিসেবে মানবে না। আমার মতো বউ পেয়ে যে বেডা রিজেক্ট করে দিয়েছে তার কপালে জীবনেও বউ জুটবে না, অভিশাপ দিলাম। শালা হিটলারের বাচ্চা।
বলেই উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়লো। আবার সেকেন্ড মধ্যে লাফিয়ে উঠে বসে বলে।
—এসব আমি কী বলছি। বউ জুটবে না মানে? আমিই তো ওই বজ্জাতের বউ, আবার কোন বউয়ের কথা বলছি? আর হিটলারের বাচ্চা কাকে বললাম? আমার শশুর তো এই লোকের মতো না।তওবা তওবা, আল্লাহ মাফ করুক। আমার শশুর অনেক ভালো। কালকে সকালেই গিয়ে বড়সড় একটা সালাম দিব। হুম, তাহলেই হয়ে যাবে।
ইয়ানা আবারও শুয়ে পড়ল। কথায় আছে না, অতিরিক্ত চিন্তায় মানুষের মাথা উল্টে যায়। কি বলে নিজেও জানে না। ইয়ানার ক্ষেএেও তাই হয়েছে। কি সব বলছে নিজেও জানে না।

সকাল বেলা রৌদ্র, আদ্র সহ বাড়ির পুরুষরা সোফায় বসে আছে। আর বাড়ির মহিলারা রান্না ঘরে নাস্তা বানাতে ব্যস্ত। বাড়ির ছোট সদস্যরা এখনো ঘুম থেকে উঠেনি। এমন সময় বাড়ির মেইন দরজা থেকে কারো হাঁটার আওয়াজ ভেসে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ খুবই সাবধানে পা টিপে টিপে হেঁটে আসছে। মনে হল রৌদ্রের কাছে। রৌদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকাল।
লাল টকটকে সেলোয়ার-কামিজ পড়া, মাথায় দুই বেনি করা, চোখে গাঢ় কাজল দাওয়া, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক দাওয়া, গলায় একটা কালা সুতোর মতো কি দাওয়া, চাপা গায়ের রং। হাতে একটা বড় ব্যাগ নিয়ে একটা মেয়ে এদিক সেদিক তাকাতে তাকাতে চোরের মতো এগিয়ে আসছে। মেয়েটাকে দেখে রৌদ্রের ভ্রু কুঁচকে আসে। দেখে মনে হচ্ছে গ্রামের মেয়ে। রৌদ্র মেয়েটার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল

—এটা আবার কে? কোন ক্ষেতের আলু?
— আসসালামু আলাইকুম, মুইর নাম শালু।
এক তুরিতে আপনাগো হগ্গলরে রাইন্দা খাওয়াতে
পারমু আলু।
শালুর কথা সবাই ওর দিকে তাকায়। রৌদ্র তো ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে। কী সুন্দর মিলায় কথা বলল। কথাটা রৌদ্রের কাছে অনেক ফানি লেগেছে। মেয়েটার বয়স কতই বা হবে। এই ১৪-১৫।
আজিজ নেওয়াজ নাকের ডগায় নামিয়ে শালু কে ভালো করে দেখে বললেন
, — তুমি কে মা? কার কাছে এসেছো?
শালু ব্যাগটা মাটিতে নামিয়ে কোমরে হাত দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
— খালাম্মায় পাঠাইছে। কইছে এই বাড়িত, রানবার মানুষ লাগবো। মুই সব পারি খালুজান। ভাত, ডাইল, মাছের ঝোল, এমনকি তালের পিঠাও। আপনে খালি হুকুম করেন।
ততক্ষণে রান্নাঘরে থাকা আতিয়া নেওয়াজ শালুর কথা শুনে ছুটে এলেন। শালুকে দেখেই গলা জড়িয়ে ধরলেন।

— আরে শালু! তুই এত সকালে? তোর খালা তো বলল দুপুরে পাঠাবে।
— রাইতে ট্রেনে আইয়া পড়ছি খালাম্মা।ভাবলাম সক্কালে আইসাই কাজে লাইগা পরমু।
—এখন কাজ করতে হবে না। চল আগে ভিতরে গিয়ে একটু রেস্ট নিবি।
আতিয়া নেওয়াজ শালুকে ভিতরে আনল। শালু সোফায় বসে থাকা সবাইকে একে একে ভালো করে দেখছে।আতিয়া নেওয়াজ সবাইকে আগে থেকেই শালু কথা বলে রেখেছে।এবার সবাই চিনল শালুকে।আতিয়া নেওয়াজের বাপের বাড়ির পাশের ঘরটাই শালুদের ছিল।বাপ মা হারানো এতিম মেয়ে খালার কাছে মানুষ হয়েছে। এখন খালাও তাকে আর রাখতে চায় না। শালু মেয়ে হিসেবে দারুন এক কথায়।রান্না বান্না সব পারে।সে বার বাপের বাড়ি গিয়ে আতিয়া নেওয়াজের মায়া হলো শালুর প্রতি।বাচ্চা মেয়েটা সারাদিন শুধু খেটে যায় খাওয়া দাওয়া ও ঠিক মতো পায় না।এজন্য আতিয়া নেওয়াজ শালু নিয়ে আশার কথা বলে। কিন্তু শালুর খালা রাজি হয়নি তখন।কিছুদিন আগেই জানিয়েছে শালু কে শহরে পাঠাতে চায়।তাই আতিয়া নেওয়াজ আগে জানিয়ে রেখেছে সবাইকে গ্রাম থেকে একটা মেয়ে আসবে এই বাড়িতে থাকবে।

—ও হচ্ছে শালু ওর কথাই বলেছিলাম।ও এখন থেকে এ বাড়িতেই থাকবে।
আজিজ নেওয়াজ নিজের স্ত্রীর কথা শুনে বলল
—ওকে ভিতরে নিয়ে যাও অনেক দূর জার্নি করে আসছে।
—আয় শালু আমার সাথে আয়।
শালু আতিয়া নেওয়াজ এর পিছনে হাঁটা দেয়।কিন্তু একটু হেঁটেই আবার পিছনে তাকায়।দেখে রৌদ্র এখনো কেমন করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
—বেডাডা অমনে ক্যান মুইর দিকে তাকাইয়া আছে। মুই কী বহুত ছুন্দর?
শালু নিজেকে নিজেই জিজ্ঞেস করে।তার পর আবার রৌদ্রের দিকে তাকায় নাহ এখনো কেমন করে চেয়ে আছে।শালুর মাথায় একটা দুষ্ট বুদ্ধি আসলো এবার। শালু রৌদ্রকে জিব বের করে ভেঙ্গিয়ে আতিয়া নেওয়াজ এর পিছের দৌড় দিল।
এই দিকে বেচারা রৌদ্র হতবাক হয়ে গেলো।এই মেয়ে তো আস্ত এক বিচ্ছু।এই মেয়েকে দেখেই সে বুঝেছে।এই মেয়ে কোন ধরণের।কথায় আছে না চোরের চোরে চিনে।ঠিক তাই রৌদ্র শালু একি নৌকার মাঝি এজন্য দুজন দুজনকে চিনে নিল।

সকাল ৯ বাজে ফিহা মর্নিং স্কিন কেয়ার করছে।মুখে ফেসপ্যাক দিয়ে নিজের রুমে বসে বসে হিন্দি গান শুনছে।এই দিকে শালু পুরো বাড়ি ঘুরে ঘুরে ঘুরে দেখছে।ফিহার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় গানের আওয়াজ শুনে শালু দরজার পাক দিয়ে উঁকি দিল। দেখল একটা মেয়ে মুখে সাদা সাদা কী যেন দিয়ে চোখে দুটা শসা দিয়ে আয়নার সামনে চেয়ারে বসে আছে।
—খালাম্মা গো বাইতে পোর্লারিং আছে। মুইরে তো কয় নাই গা।যাক ভালাই হয়ছে মুই গিয়ে একটু সার্ভিং নি।
শালু দরজার ঠেলে ভিতরে ডুকে।পা টিপে টিপে একদম ফিহার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। উঁকি দিয়ে ফিহার মুখ দেখল।মুখের উপর হাত নাড়িয়েও দেখল ঘুমিয়ে আছে কিনা বুজার চেষ্টা করলো।নাহ বুঝতে পারছে না।
—এই আপা আমারে একটু হাতে পায়ে ইন্ডিকিউর পিন্ডিকিউর কইরা দেন।
ফিহা ঘুমায় নাই চোখ বন্ধ করে ছিলো।হঠাৎ এমন ধরনের কথা শুনে।চোখ থেকে শসা সরিয়ে তাকাল।শালুকে দেখে ভ্রু কুঁচকে আসল প্রথমে।পরক্ষনে মেজাজর গরম হয়ে গেলো।

—এই মেয়ে কে তুমি? এখানে কী করছো.?
শালু হেঁসে বলল
—মুইর নাম শালু..! গ্রাম থেইক্কা আইছি।আইচ্ছা আপা আপনে মুহে এডি কী লাগাইছেন.?
—এটা ফেসপ্যাক গ্রামের খেতরা এসব চিনে না।
—আপা আমারেও একটু ওই প্যাকপ্যাক লাগায় দেন।লগে ইন্ডিকিউর পিন্ডিকিউর কইরা দেন।
ফিহার মেজাজ সপ্তম পর্যায়।চেঁচিয়ে বলল
—বের হ আমার রুম থেকে।খেত কোথা কার।
এই বলেই শালুকে রুম থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দরজা আঁটকে দিল।শালু ছলছল চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।আহি কলেজ ড্রেস পড়ে রুম থেকে বের হল। মাঝ পথে এসে ফিহা শালুকে ধাক্কা দিয়ে পেলে দাওয়াটা আহির চোখে পড়ে।আহি এগিয়ে এসে শালুকে তুলে নিচ থেকে।

—কে তুমি?আর ওই ঘরে কেন ডুকলে.?
আহির কথায় শালু আহির দিকে তাকায়। আহিকে দেখে শালু বিড়বিড় করে বলে উঠল।
—হায় আল্লাহ এই মুই কী দেখছি এডাতো সাক্ষাত পরী।
—কী হলো কী এতো বিড়বিড় করছো?
— হুম ওই কিছু না মুই শালু। খালাম্মায় আনছে। গ্রাম থেইক্কা আইছি। এই বাড়িতে কাম করবার লাইগা।
আহি শালুর কথা শুনে হেসে ফেলল। মেয়েটা প্রতি কথায় হাঁসে গোলগাল মায়াবী চেহারা।আহি শালুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
—শালু অনেক সুন্দর নাম তো।আচ্ছা তুমি ওই ঘরে কেন ডুকলে?
—ওই আপা মুখে প্যাকপ্যাক দিছে।মুই খালি কোইছি মুইরে একটু লাগায় দিতে আর ইন্ডিকিউর পিন্ডিকিউর করে দিতে।আমাগো গ্রামে এক মাইয়া শহরে আইসা ইন্ডিকিউর পিন্ডিকিউর করছে আর।হাত পা চকচকা হয়ে গেছে।ওই আপারে দেখলাম মুখে প্যাকপ্যাক লাগায়ছে মুই ভাবছি খালাম্মাগো বাইতে পোর্লারিং দিছে।হের লাইগা মুই কোইছি।কিন্তু আপা রাইগা ধাক্কা দিয়া বের করে দিছে।
আহি সব মন দিয়ে শুনল।শালু গ্রামের মেয়ে তাই ভালো করে এসবে নাম জানে না।দেখে মনে হচ্ছে পড়াশোনাও করে নি।ফিহার ব্যবহারে তার খারাপ লাগল।বুঝায় বললেই তো হতো।আহি শালু গাল টেনে বলে।

— আরে ফিহা আপু একটু রাগী। কিছু মনে করো না।সবার সাথে এমন করে আর ও ঘরে যেও না। আর
ওটা প্যাকপ্যাক না, ফেসপ্যাক। আর ইন্ডিকিউর পিন্ডিকিউর না, ম্যানিকিউর পেডিকিউর বলে। আমি কলেজ থেকে এসে তোমাকে পার্লারে নিয়ে জাব মন খারাপ করিও না। চলো আমার সাথে।
শালুর চোখ টলমল করে উঠল। নাক টেনে বলল,
— আপনে অনেক ভালা আপা।আপনে দেখতে যেমন ছুন্দর আপনের ব্যবহারও তেমন ছুন্দর।জানেন মুই বাপ মা নেই।মুইরে কেউ দেখতে পারে না কালো বলে হগ্গলে অবহেলা করে।কেউ মিশতে চায় না।
শালুর কথা শুনে আহির অনেক খারাপ লাগল।এই টুকু মেয়ের ভিতর এতো কষ্ট জমে আছে।আহি শালুর চোখ মুছে দিয়ে বলে। মলিন কন্ঠে বলে

কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৬

— কষ্ট পেও না। পৃথিবীতে এমনও মানুষ আছে যাদের মা বাবা বেঁচে থেকেও সন্তানের প্রতি তাদের কোনো মায়া দয়া নেই।তাঁরা নিজের সুখের জন্য সন্তানের জীবন নষ্ট করতেও দু বার ভাবে না।এসব বাদ৷ দাও চল নিচে জাবে।আমার কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে আবার।

কী ভয়ংকর মায়া তোর পর্ব ৩৮

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here