ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৮
মারিয়াম ফুল
রুদ্র এক পা মেহেরের দিকে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে এক ধরণের দুষ্টুমি আর রহস্যের খেলা। সে ফিসফিস করে বলল, “কেন? আমাকে খুব মিস করছিলে বুঝি?”
মেহের ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। তার হৃদপিণ্ড তখন দ্রুত তালে স্পন্দিত হচ্ছে রুদ্র ঠিক এক পা সামনে এগোল। মেহের আবার নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, রুদ্রর দীর্ঘ অবয়ব ছায়ার মতো তাকে অনুসরণ করল। এই নিঃশব্দ দ্বৈরথ চলতে চলতে মেহের কখন যে দেয়ালের সাথে মিশে গেছে, সে টেরও পায়নি।
রুদ্রর তপ্ত নিঃশ্বাস এখন মেহেরের গালে আছড়ে পড়ছে। মেহেরের হৃৎপিণ্ডটা বুকের খাঁচায় যেন ড্রাম পেটাচ্ছে। সে যখনই কিছু একটা বলতে যাবে, ঠিক তখনই রুদ্রর দীর্ঘ হাতটা মেহেরের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে পাশের ড্রয়ারটা খুলল। মেহেরের সমস্ত স্নায়ু তখন থরথর করে কাঁপছে। রুদ্র খুব সাবধানে ড্রয়ারে চাবিটা রেখে দিল।
নিজের এই অদ্ভুত ভীরুতা আর কাঁপন মেহেরকে লজ্জিত করল। সে টালমাটাল পায়ে রুদ্রর পাশ কাটিয়ে সরে দাঁড়াল। মেহেরের এই অবস্থা দেখে রুদ্রর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসিটা চওড়া হলো।
হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। এমন প্রাণখোলা হাসি রুদ্রর মুখে মেহের আগে কোনোদিন দেখেনি।
রুদ্র একটা আপেল তুলে নিয়ে তাতে বড় করে এক কামড় বসাল। তারপর হাসির রেশ টেনেই বলল,
“এতই যদি অসহ্য লাগে, তবে আমার সাথে এমন ধৈর্য ধরে টিকে আছো কেন?”
মেহের নিজেকে সামলে নিয়ে একটু দম নিল। তার আসল উদ্দেশ্য ছিল ওই চাবিটা হাতানো, যাতে এই অহেতুক হুটহাট রুদ্রের এপার্টমেন্টে ঢুকে পড়া থামানো যায়। সে বেশ সপ্রতিভ ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“দেখুন ক্যাপ্টেন সাহেব, আপনার যখন-তখন এভাবে আমার রুমে ঢুকে পড়াটা কিন্তু একদমই শোভন নয়। আমারও তো একটা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আছে, তাই না?
রুদ্র চাবিটা আবার ড্রয়ার থেকে বের করে উঁচিয়ে ধরল। প্রাইভেসি? আমার নিজের কেনা অ্যাপার্টমেন্টে আমারই প্রাইভেসির অভাব হচ্ছে! বরং সত্যি করে বলো, চাবিটা হাতানোর জন্য কতক্ষণ ধরে প্ল্যান করেছ?
মেহের থমকে গেল। লোকটা কি মন পড়তে পারে? রুদ্রর ছোট মস্তিষ্ক বা চালবাজি যে মেহেরের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে, সেটা মেহের হাড়েমাহে টের পেল। মেহের কোনো উত্তর না দিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রুদ্র আবারও আপেলে কামড় দিয়ে সামনে এগিয়ে এল।
“কী হলো? বললে না তো, কেন এত ধৈর্য ধরে আমার সাথে আছো ?”
মেহের এবার নিজের আত্মবিশ্বাসে শাণ দিয়ে বলল, “কারণ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের পছন্দ করেন।
মেহেরের এই আধ্যাত্মিক উত্তর রুদ্রর মুখের হাসি ক্ষণিকের জন্য ম্লান করে দিল, যদিও সে তা বুঝতে দিল না। সে আপেলটা নিয়ে আবার মেহেরের একদম কাছে আসতে চাইল। এবার মেহের অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে ড্রয়ার থেকে সেই কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা বের করল….
সে সরাসরি রুদ্রর দিকে বন্দুক তাক করল। তার আঙুল ট্রিগারের ওপর। মেহের ভেবেছিল এবার অন্তত রুদ্র ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাবে। কিন্তু অবাক করে দিয়ে রুদ্র পিছিয়ে যাওয়া তো দূরে থাক, উল্টো বন্দুকের নলের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল।
“৩… ২… ১…!”
মেহেরের হাত কাঁপছে, কিন্তু সে শক্ত করে রুদ্রর হাতের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে চাইল। হঠাৎ এক প্রচণ্ড শব্দে গুলি বের হলো। রুদ্র নিজেই মেহেরের হাতের ওপর হাত রেখে ট্রিগার চেপে দিল।মেহেরের চিৎকার বেরিয়ে এল গলা চিরে। তার কল্পনার বাইরে ছিল যে রুদ্র নিজেকে নিজে গুলি করবে । রুদ্রর দেহটা মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
মেহেরের চোখের সামনে ভেসে উঠল অন্তুর সেই রক্তাক্ত স্মৃতি। সে মাটিতে বসে দুহাতে কান চেপে ধরে পাগলের মতো কাঁদতে লাগল। চারপাশটা যেন অন্ধকার হয়ে আসছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে রুদ্রর অট্টহাসি পুরো ঘর কাঁপিয়ে দিল। “হে হানি, ওয়েট… ওয়েট! আমি মরিনি, জ্যান্ত আছি। ওটাতে গুলি ছিল না, ছিল ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার!”
মেহেরের কান্না থেমে গেল,যখন বুঝতে পারে তার সাথে মজা করছে । তার মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। এই লোকটা কি মানুষ নাকি পাষাণ? মেহেরের সমস্ত ভয় আর আতঙ্ক নিমেষেই প্রচণ্ড রাগে পরিণত হলো। সে পাশের থাকা ফলের ঝুড়ি আপেল, কমলা, আঙুর—সব রুদ্রর দিকে ছুড়ে মারতে লাগল।
রুদ্র হাসির চোটে মেহেরের এই ‘ফলের হামলা’ থেকে বাঁচতে এদিক-সেদিক সরছে। মেহের থামল না, যতক্ষণ না ঝুড়িটা খালি হলো।
শেষমেশ ক্লান্ত হয়ে টেবিলের কোণ ধরে হাঁপাতে লাগল সে। তার কণ্ঠে ক্লান্তি আর ক্ষোভ মেশানো।
“আ… আপনি জানলেন কীভাবে যে ওটাতে গুলি নেই?”
রুদ্র বাঁকা হেসে বলল, “আগে বলো, বন্দুকটা কোত্থেকে চুরি করেছ?”
মেহের থতমত খেয়ে গেল। “চুরি? আমি কেন চুরি করব?”
“হ্যাঁ, তুমি কেন চুরি করবে? তুমি তো ডাকাতি করেছ!” রুদ্রর কণ্ঠস্বরে বিদ্রূপ।
মেহের ভয়ে ঢোক গিলল। রুদ্র আবার টিপ্পনি কাটল, “শশুরের বন্দুক চুরি করে আবার শশুরের ছেলের দিকেই তাক করা হচ্ছে? স্যাটায়ারটা বেশ ভালো ছিল।”
মেহের আমতা আমতা করে বলল,
“এটা… এটা আমাদের ড্রয়ারে পেয়েছিলাম। মানে, নিজেকে বাঁচানোর জন্য ব্যাগে ভরে…ছিলাম। বাবা এটা আমার ঘরেই রেখেছিলেন।
আসার পর বাবা ফোন করে জানিয়েছিলেন ওটা নাকি হারিয়ে গেছে।তখনই আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওটা আমার বাবার। কিন্তু তুমি কীভাবে বলতে পারলে যে ওটা ‘আমাদের’ ড্রয়ারে ছিল? তুমি কি আমাকে তোমার স্বামী মনে করা শুরু করে দিয়েছ?
হানি… লেট মি ক্লিয়ার ওয়ান থিং…
মেহের এবার স্তম্ভিত হয়ে গেল। রুদ্রর প্রতিটি কথা যেন তীরের মতো বিঁধছে।
রুদ্র সোফায় আয়েশ করে বসে বলল, “শোনো, আমার সাথে তোমার ওই ৬৫ শতাংশ সম্পত্তির ডিল। যদি ভেবে থাকো আমাকে ‘হাজব্যান্ড’ ডেকে আর এই সব মায়ার নাটক করে আমায় কবজ করবে, তবে ভুল করছ। ফর ইয়োর কাইন্ড ইনফরমেশন… আই হেট ওমেন..”
মেহেরের সহ্যক্ষমতা এবার শেষ সীমায়। রাগে রিরি করতে করতে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।দরজায় পৌঁছানোর আগে ঘুরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল, “
আপনার মতো স্বামী পাওয়া মানে কপাল পোড়া… ভুলে যাবেন না আমাদের বিয়েটা স্রেফ একটা ডিল, নাথিং এলস। আর আপনাকে স্বামী হিসেবে আমি মরে গেলেও মানব না….”
“তোমার বয়স কত ? আমার সাথে এভাবে তর্কে জেতার সাহস আজ পর্যন্ত কেউ দেখায়নি।”
মেহের ঘরের ভেতরে ঢোকার আগে শেষবারের মতো চিৎকার করে বলল, “২০”
রুদ্র এবার হো হো করে হেসে বলল, “জানো আমার বয়স কত? ২৮।”
মেহের দরজা লাগানোর ঠিক আগমুহূর্তে দাঁত কিড়মিড় করে বলল, “হ্যাঁ, দেখেই বোঝা যায় একটা বুড়ো লোক…. . ”
তড়াস! করে রুদ্রর মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
মেহের…. সে বন্ধ দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে নিজের দ্রুত স্পন্দিত হৃদপিণ্ডটাকে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। এই ইগোিস্টিক লোকটা তার জীবনটাকে একটা রোলার কোস্টার বানিয়ে ছেড়েছে!
রাতভর বৃষ্টির পর ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। ঘড়িতে ছয়টা কি সাতটা হবে। সারা রাত রুদ্রর সাথে তিক্ত লড়াই এর পর মেহের কখন যে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল, সে নিজেও জানে না। অদ্ভুত বিষয় হলো, গত তিন মাসে সে অসংখ্যবার কল্পনায় অন্তুকে খুঁজেছে, তার স্মৃতি হাতড়েছে। কিন্তু একবারের জন্যও অন্তু তার স্বপ্নে ধরা দেয়নি। আজ প্রথম মেহের তাকে দেখল।
সে আর অন্তু একটা নির্জন লেকের পাড়ে বসে আছে। চারপাশে বিকেলের শান্ত বাতাস বইছে, যা মেহেরের চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছে। দুজনই নিঃশব্দ। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে অন্তু মৃদু হাসছে হাসল।
অন্তু খুব শান্ত গলায় বলল, “তুমি কেন সংসারী হচ্ছো না কেন মেয়ে? আমায় কি তোমার খুব মনে পড়ে?”
মেহের কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। অন্তু আবার বলল,
“শোনো আমার মেঘবালিকা…
(অন্তু তাকে এই নামেই ডাকত),
পাওয়ার হিসেবে তুমি ছিলে পূর্ণতা, আর ভাগ্যের পাতায় কেবলই শূন্যতা।
তুমি বরং এবার মন দিয়ে সংসার করো। নতুন জীবনে সুখী হওয়ার চেষ্টা করো। আমাকে ভুলে গেলেই আমি বাচিঁ, মেঘবালিকা।
“না” মেহের ঘুমের ঘোরেই চিৎকার করে উঠল। তার অবচেতন মন কিছুতেই এই ‘ভুলে যাওয়া’র প্রস্তাব মেনে নিতে পারল না।
মেহের ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। তার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে প্রচণ্ড। সে বিছানার হাতলটা খামচে ধরে অস্পষ্ট কিন্তু তীব্র স্বরে ডুকরে উঠল,
“অন্তু! অন্তু! না… এটা সম্ভব না, কিছুতেই সম্ভব না!”
স্বপ্নটা এতটাই জীবন্ত ছিল যে মেহেরের মনে হচ্ছিল এই তো পাশে অন্তু বসে ছিল। তার হাতের স্পর্শ, তার গলার স্বর সবই যেন এখনো এই ঘরে মিশে আছে। মেহেরের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। যে মানুষটাকে সে নিজের অস্তিত্বের অংশ মনে করত, আজ স্বপ্নে সেই মানুষটাই তাকে অন্য কারো সাথে ঘর বাঁধার পরামর্শ দিয়ে গেল? এই বিচ্ছেদ কি তবে কেবল দেহের নয়, আত্মারও?
মেহের ঘরের অন্ধকার কোণটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি গড়িয়ে পড়ছে। গত রাতের সেই জেদি মেয়েটা এখন স্রেফ এক টুকরো ভাঙা কাঁচের মতো পড়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না এটা কি অন্তুর প্রতি তার ভালোবাসা, নাকি নতুন জীবনের প্রতি এক ধরণের অজানা ভয়?
ঠিক তখনই বাইরের ড্রয়িংরুম থেকে রুদ্রর গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। সে হয়তো কারো সাথে ফোনে কথা বলছে অথবা তার দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। রুদ্রর উপস্থিতি মেহেরকে রূঢ় বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলল।
মেহের নিজের চোখের জল মুছে লম্বা একটা শ্বাস নিল।
রুদ্র ফোনে কথা বলতে বলতে মেহেরের রুমের দিকেই আসছিল। তার এক পা দরজার ভেতরে, অন্য পা বাইরে—ঠিক দরজার মাঝবরাবর আসতেই সে থমকে দাঁড়াল। মেহের বিছানায় বসে ছিল, এলোমেলো চুলে তাকে কিছুটা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। রুদ্রর উপস্থিতি টের পেয়ে মেহের ঘুরে তাকাল। রুদ্রও এক মুহূর্তের জন্য মেহেরের লাল হয়ে থাকা চোখের দিকে তাকাল, তারপর ফোনটা পকেটে রেখে ফিরে যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই মেহেরের মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে এল “ক্যাপ্টেন সাহেব!”
কেন ডেকেছে, মেহের নিজেও জানে না। রুদ্র ঘুরে মেহেরের দিকে তাকাল।
“এনি নিডেড?”
মেহের কী বলবে খুঁজে পেল না। সে কিছুটা আমতা আমতা করে নিচু স্বরে বলল, “না না… কোনো দরকার নেই।”
রুদ্র দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হাত দুটো আড়াআড়ি করে বুকের ওপর রেখে বলল, “দেখো মেহের, কোনো প্রয়োজন হলে বলতে পারো। আমি জানি আমরা অন্য সব সাধারণ স্বামী-স্ত্রীর মতো নই। আমরা কেউ কারও কিছু হতে চাই না ঠিকই, কিন্তু তুমি এখন আমার জিম্মাদারিতে আছো। তোমার ভালো-মন্দের দায়িত্ব এখন আমার ওপর।”
মেহের চোখ তুলে বিস্মিত হয়ে রুদ্রর দিকে তাকাল। এই প্রথম লোকটার কথায় কোনো তাচ্ছিল্য নেই, বরং এক ধরণের দায়িত্ববোধ কাজ করছে। রুদ্র পকেট থেকে একটা সাদা খাম বের করে মেহেরের সামনে ধরল।
“এটা কী?” মেহেরের প্রশ্ন।
“এটার ভেতর তোমার মেডিকেল ফি আর কিছু টাকা আছে। আমি জানি তোমার এখন অনেক সমস্যা হতে পারে। এটা রেখে দাও।”
রুদ্রর এই বাড়িয়ে দেওয়া হাত মেহেরের আত্মসম্মানে গিয়ে প্রবলভাবে আঘাত করল। গত কয়েক মাস সে একাকী লড়েছে। মেহের শক্ত গলায় বলল,
“আমি আমার খরচ নিজে চালাতে পারি ক্যাপ্টেন সাহেব। এটার আমার দরকার নেই।”
রুদ্রর ভ্রু কুঁচকে এল। সে কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলল, “ইটস ওকে। আমি টাকাটা তোমাকে দিইনি, তোমার বাচ্চার জন্য দিয়েছি।”
“বললাম তো আমার কাছে টাকা আছে… আমাকে দয়া দেখানোর প্রয়োজন নেই।”
মেহেরের এই তীব্র আত্মসম্মান দেখে রুদ্র অবাক হলো ঠিকই, কিন্তু সাথে সাথে তার জেদি মনটা রাগে জ্বলে উঠল। সে কোনো তর্ক করার সুযোগ না দিয়ে এক প্রকার জোর করেই দাঁত কিড়মিড় করে খামটা মেহেরের হাতে ধরিয়ে দিল।
“তর্ক করা বন্ধ করো… আমি কোনো দান করছি না। তোমার হাত খরচ মেটানোর জন্য নয়, বরং এই পিরিয়ডে তোমার কোনো কিছুর যেন কমতি না থাকে সেটা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব। চুপচাপ এটা রাখো।”
রুদ্র আর এক সেকেন্ড দাঁড়াল না। মেহেরের হাতে খামটা গুঁজে দিয়ে গটগট করে বেরিয়ে গেল। মেহের হাতে থাকা খামটার দিকে অপলক তাকিয়ে রইল।
রুদ্রর গায়ের সেই কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ এখনো ঘরে মিশে আছে। মেহেরের মাথায় শুধু একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল
মানুষটা আসলে কেমন?
“কেমন আপনি রুদ্র? কেন বারবার রূপ বদলে ধরা দিচ্ছেন?” মেহের বিড়বিড় করে নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৭
কখনো সে সাগরের মতো উত্তাল, অবজ্ঞার চাবুক মেরে মেহেরের অস্তিত্বকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। আবার কখনো সে পাহাড়ের মতো স্থির, দায়িত্বের এক অজেয় চাদর দিয়ে মেহেরকে আগলে রাখতে চায়। এই যে কিছুক্ষণ আগে ‘স্বামী’ হিসেবে নয়, বরং ‘জিম্মাদার’ হিসেবে সে জোর করে খামটা দিয়ে গেল—এটা কি দয়া?
মেহেরের খুব জানতে ইচ্ছে করে, যে মানুষটা উচ্চকণ্ঠে বলে ‘আই হেট ওমেন’, সে কেন আবার মাঝরাতে অচেনা শহরে এক গর্ভবতী নারীর নিরাপত্তার কথা ভেবে ব্যাকুল হয়?
