Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৯

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৯

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৯
মারিয়াম ফুল

রুদ্রর চলে যাওয়ার সেই ভারী পায়ের শব্দ করিডোরের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে মেহেরের কানে এসে বিঁধল। মেহের পাথরের মূর্তির মতো বিছানায় বসে রইল। তার হাতে থাকা সাদা খামটা যেন এখন কোনো সামান্য কাগজ নয়, বরং কয়েক টন ওজনের এক অদৃশ্য পাথর। মেহেরের খুব ইচ্ছে করছিল খামটা ছিঁড়ে কুচিকুচি করে বাতাসে উড়িয়ে দিতে, কিন্তু তার অবচেতনের কোনো এক কোণ তাকে বারবার টেনে ধরছিল।
“তোমার বাচ্চার জন্য দিয়েছি… এটা আমার দায়িত্ব।”

রুদ্রর এই কণ্ঠস্বর মেহেরের মস্তিষ্কের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক অজানা কম্পন তুলে যাচ্ছে। মেহের নিজের পেটের ওপর আলতো করে হাত রাখল। বাইরে থেকে কিছুই বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে এক চিলতে প্রাণ এখন তার একমাত্র পৃথিবী। মেহের বিড়বিড় করে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলল, “লিটল চ্যাম্প, চিন্তা করো না… মা তোমাকে হয়তো একটা পরিপূর্ণ পরিবার দিতে পারবে না, কিন্তু মা তোমাকে এত ভালোবাসবে যে তোমার আর কারো অভাব বোধ হবে না। এ দুনিয়ায় তো আমার তুমি ছাড়া আর কেউ নেই মার। মা তোমার জন্য অপেক্ষা করতে আছে বেবি…।”
কিছু সময় পর মেহের রুম থেকে বেরিয়ে এল। ঘরের স্তব্ধতা তাকে গ্রাস করছিল। খাবার টেবিলে সারভেন্ট খাবার সাজিয়ে রেখেছে, কিন্তু মেহেরের কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। সে লিভিং এরিয়ার এক কোণে রাখা ডিভানে এসে বসল। হঠাৎ তার চোখ গেল পাশের রুমটার দিকে, যা সবসময় তালাবদ্ধ থাকে। আজ দরজাটা আধখোলা, ভেতরে আলোর হালকা আভা। শুধু আলো জ্বলছে।এই রুমটার কথা রুদ্র প্রথম দিনই কঠিন গলায় বলে দিয়েছিল।

“এই ঘরে কখনো ঢুকবে না।”
তারপর থেকেই দরজাটা সবসময় তালাবদ্ধ থাকত। মেহেরও কখনো কৌতূহল দেখায়নি।
ঠিক তখনই দরজা খুলে রুদ্র বেরিয়ে এল।
তার গায়ে সাদা ঢিলেঢালা শার্ট, আর লুজ প্যান্ট। এলোমেলো চুল, ক্লান্ত মুখ।রুদ্র বের হতেই আবার দরজায় তালা লাগিয়ে দিল।
মেহের এক ঝলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে ফেলল, আবার চোখ তুলে তাকাল নিজের অজান্তে… মেহেরের সাথে চোখাচোখি হতেই রুদ্রর চাহনি কেমন যেন ভিজে উঠল। মেহেরের মনে হলো রুদ্রর চোখের মণিগুলো সামান্য রক্তাভ।
মেহের সাহস করে বলেই ফেলল, “আপনি… আপনি কি কান্না করেছেন?”
রুদ্রর শান্ত হাবভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। চোখের কোণে জমে থাকা আর্দ্রতা যেন ক্রোধের আগুনে শুকিয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল, “আমি কেন কান্না করব? কান্না করাটা মেয়েদের অভ্যাস, পুরুষদের নয়।”

রুদ্র চলে যেতে গিয়েও কয়েক কদম ফিরে এল। “বিকেল ৫টার সময় তৈরি থেকো। আমরা বাইরে যাব।”
মেহেরের জেদ চাগাড় দিয়ে উঠল। “আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
রুদ্র এক পা মেহেরের দিকে এগিয়ে এল। তার চোয়াল শক্ত।
“আমার কথায় ‘না’ শোনার অভ্যাস নেই। তুমি যাচ্ছো। আর শোনো, বাবা-মা হয়তো সিলেট থেকে আসবে একটা প্রোগ্রামে এর জন্য । অন্তত তখন তোমার এই ব্যক্তিত্বের সংঘাতটা বিসর্জন দিও। আমার মা অত্যন্ত স্পর্শকাতর মানুষ, তিনি তোমার এই অবজ্ঞা সহ্য করতে পারবেন না।”
রুদ্রর কথাগুলো মেহেরের আত্মসম্মানে চাবুকের মতো লাগল। সে এক দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের লোনা জলভরা মুখটা দেখল সে।
“তুমি কি দিন দিন বড্ড বেশি দুর্বল হয়ে যাচ্ছ মেহের? সবাই তোমাকে এভাবে একা ফেলে যায় কেন?”
বিলাপের এক পর্যায়ে তার শেষ রাতের সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়ল। সেই লেকের পাড়, সেই শান্ত বাতাস আর অন্তুর সেই মৃদু হাসি।

“অন্তু… তুমি কত সহজে বলে দিলে তোমাকে ভুলে গেলেই তুমি শান্তি পাবে? অথচ একবারও জানতে চাইলে না, আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে যে বিষবাষ্পের মতো তোমার স্মৃতি মিশে আছে, তার কী হবে?
জানো অন্তু, আমার শরীরের ভেতরে এখন আরেকটা প্রাণ বেড়ে উঠছে….আমি এখন ৪ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তুমিই তো বলতে, আমাদের একটা ছোট লাল-নীল রঙের সংসার হবে? সেই সংসারের স্বপ্ন দেখিয়ে তুমি আজ কোন অচিন দেশে হারিয়ে গেলে?
আমাদের সেই লাল-নীল স্বপ্নের আকাশটা এখন মরা বিকেলের মতো চিরতরে ধূসর হয়ে গেছে। আমি এই অনাগত সন্তানকে নিয়ে তোমার ফেলে যাওয়া শূন্যতার পাহাড় কীভাবে ডিঙাব, অন্তু? তুমি চলে গিয়ে শান্তিতে আছো ঠিকই, কিন্তু আমাকে এক জীবন্ত লাশের মিছিলে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেলে।”
বিকেল ৫টা
মেহেরের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে নিজেকে তৈরি করল। দরজার ওপাশ থেকে রুদ্রর ডাক এল, “তৈরি হলে বের হও।”

কিছুক্ষণ পর মেহের বেরিয়ে এল। পরনে কুচকুচে কালো বোরকা আর বড় কালো হিজাব। পার্কিং লটে রুদ্র দাঁড়িয়ে ছিল। ঝোড়ো বাতাস বইছিল তখন, মেহেরের হিজাবের আঁচল সেই বাতাসে অবাধ্য হয়ে উড়ছিল। রুদ্র মেহেরের পায়ের শব্দ শুনে তার দিকে তাকাল। মেহেরের চোখের নিচে ঠিক দুই আঙুল বরাবর আর ঠোঁটের পাশে ছোট দুটো কালো তিল রুদ্রর নজরে পড়ল। তাকে আজ অদ্ভূত এক মায়াবী দেখাচ্ছে। রুদ্র অপলক তাকিয়ে ছিল। মেহের অস্বস্তিতে পড়ে তড়িঘড়ি করে তুড়ি বাজিয়ে বলল, “চলুন…”
গাড়িতে ওঠার পর মেহের পেছনের সিটে বসতে গেলে রুদ্র শীতল গলায় বলল, “আমি তোমার স্যালারিড ড্রাইভার নই। সামনে এসে বসো।”

মেহের মুখ গোমড়া করলেও কিছু বলল না। এসে সামনে বসল। গাড়িটা যখন হাসপাতালের সামনে থামল, মেহের বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেল।হাসপাতাল কেন?
রুদ্র সিটবেল্ট খুলতে খুলতে বলো। “কারণ তোমার এটা প্রয়োজন। গত ৩ মাসে তুমি একবারও কোনো ফিজিক্যাল চেকআপ করোনি। আমি আমার জিম্মাদারিতে কোনো ত্রুটি রাখি না….।”
মেহেরের পাল্টা প্রশ্ন ছিল, “আপনি জানলেন কী করে?” রুদ্র কোনো উত্তর দিল না। সোজা ডক্টর মৃদুলা’র চেম্বারে নিয়ে গেল।
আল্ট্রাসনোগ্রামের মনিটরে ছোট্ট একটা নড়াচড়া হতেই মেহেরের বুক কেঁপে উঠল। ওটা তার সন্তান… তার শরীরের ভেতরে বেড়ে ওঠা এক টুকরো প্রাণ। এতদিন শুধু অনুভব করেছিল, আজ প্রথমবার নিজের চোখে দেখতে পেল।

পর্দার আড়ালে মেহের শুয়ে আছে। আর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রুদ্রকে ড. মৃদুলা ডাকলেন,
রুদ্র টলমল পায়ে ডাক্তারের চেম্বারের দিকে ঢুকল।
এতক্ষণ সে যেভাবে নিজেকে শক্ত করে রেখেছিল, দরজা পেরোনোর পর যেন সেই শক্ত দেয়ালটা একটু ভেঙে পড়ল। চেম্বারের ভেতরের আলোটা তার চোখে একটু ঝাপসা লাগছিল।
ড. মৃদুলা ফাইল গুছিয়ে রাখছিলেন। রুদ্রকে এভাবে ঢুকতে দেখে তিনি একটু থামলেন।
বসুন, তিনি নরম গলায় বললেন।
রুদ্র ধীরে চেয়ারে বসল। কিছুক্ষণ কোনো কথা বের হলো না তার মুখ থেকে। যেন কীভাবে শুরু করবে, সেটাই খুঁজে পাচ্ছে না।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,

“ডাক্তার… হার্টবিট… ঠিক আছে তো?”
ডঃ মৃদুলা… তারপর তার হাতে আলতো করে হেডফোন দিলেন। রুদ্র হেডফোনটা কানে পড়তে মুহূর্তটা যেন থেমে গেল।
তারপর ভেসে এলো—
ধক… ধক… ধক…
একটা ছোট্ট, দ্রুত, টলমলে হৃদস্পন্দন।রুদ্র এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। যেন পৃথিবীর সব শব্দ থেমে গিয়ে শুধু এই একটিই শব্দ বেঁচে আছে।
তার ভেতরে কেমন অচেনা ঢেউ উঠল।
কাঁপা হাতে সে হেডফোনটা শক্ত করে ধরল। চোখের কোণে পানি জমে উঠলেও দ্রুত পাশ ফিরিয়ে সামলে নিল নিজেকে। যাতে মেহের যেন না দেখে,
পর্দার ওপাশে মেহের চুপচাপ শুয়ে আছে। কিন্তু তার চোখ দিয়ে টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
এ কান্না কষ্টের না, অভিযোগের না।
একটা ছোট্ট প্রাণ… তাকে মা বলে ডাকবেএ ই ভাবনাটাই তাকে নিঃশব্দ করে তুলল।ড. মৃদুলা রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলেন।
কংগ্র্যাচুলেশনস। বাচ্চার হার্টবিট একদম ঠিক আছে।তারপর রুদ্রর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,
“এখন থেকে মেহেরকে আরো বেশি করে রাখতে হবে, ক্যাপ্টেন সাহেব। মা যদি ভালো থাকে, বাচ্চাও ভালো থাকবে।”

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেও দুজনের মাঝে কোনো কথা হলো না।গাড়িটা হাসপাতালের গেট পেরিয়ে আস্তে আস্তে রাস্তায় নামল। কিছুক্ষণ পর শপিং সেন্টারের সামনে গাড়িটা থামতেই মেহের ভ্রু কুঁচকে রুদ্রর দিকে তাকাল। তার দুপুরের সেই কান্নার রেশ এখনো কাটেনি, তার ওপর রুদ্রর এই হুটহাট সিদ্ধান্ত মেহেরের মেজাজটা আরও একটু বিগড়ে দিল।
মেহের সিটে হেলান দিয়ে শক্ত হয়ে বসে রইল। জেদি গলায় বলল, “আমি কোনো শপিংয়ে যাব না। কেন যাব? আমার কোনো কিছুর দরকার নেই।”
রুদ্র স্টিয়ারিং হুইলে আঙুল দিয়ে একটা ছন্দ তুলছিল। মেহেরের কথা শুনে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
“দরকার তোমার না থাকলেও অন্য কারো আছে। সরকার যদি আবার লকডাউন কড়াকড়ি করে, তখন কি এই বাচ্চাটার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো আকাশ থেকে পড়বে? ক্যাপ্টেনরা সব সময় ‘প্ল্যান-বি’ সাথে রাখে। অযথা তর্ক না করে নামো।”
মেহের দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে পাল্টা উত্তর দিল, “বাচ্চাটার আরও পাঁচ মাস বাকি। এখনই কি দোকান তুলে নিয়ে যেতে হবে? আপনার এই ‘ক্যাপ্টেনগিরি’ সব জায়গায় না দেখালে হয় না?”
রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন সে কোনো অবাধ্য শিশুকে বোঝাচ্ছে। “শোনো মিসেস,২০ বছর, তর্কে তুমি আমার সাথে পারবে না। হয় নিজ ইচ্ছায় নামো, নয়তো আমাকে অন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনটা ভালো হবে?”

রুদ্রর চোখের সেই ‘অন্য ব্যবস্থা’র হুমকি শুনে মেহের গাল ফুলিয়ে গজ গজ করতে করতে গাড়ি থেকে নামল। দোকানের ভেতরে ঢুকে মেহেরের রাগ অবশ্য বেশিক্ষণ টিকল না। ছোট ছোট নীল-সাদা মোজা, তুলতুলে জামা আর মিহি কাপড়ের কাঁথাগুলো দেখে মেহেরের মাতৃমনটা নিমেষেই নরম হয়ে গেল। সে ভুলেই গেল পাশে রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে।
মেহের যখন এক মনে একটা ছোট সাদা ফ্রক দেখছিল, রুদ্র তখন একটু দূরে সরে গেল। মেহেরের অগোচরে রুদ্রের হাত চলে গেল ছোট্ট এক জোড়া পশমের মোজার দিকে। মোজাগুলো এতই ছোট যে রুদ্রর এক হাতের তালুর সমানও হবে না। রুদ্র খুব সাবধানে এদিক-ওদিক তাকিয়ে মেহেরের চোখের আড়ালে কয়েক জোড়া মোজা আর দুটো ধবধবে সাদা কাপড়ের সেট তুলে নিল। তার পাথুরে হৃদয়ে তখন এক অজানা কম্পন। এই ছোট ছোট জিনিসগুলো যে একটা মানুষের অস্তিত্বকে এভাবে নাড়িয়ে দিতে পারে, তা রুদ্রর কল্পনার বাইরে ছিল।

মেহের যখন বিল দেওয়ার জন্য কাউন্টারে গিয়ে ব্যাগ থেকে টাকা বের করতে চাইল, রুদ্র ছায়ার মতো পাশে এসে দাঁড়াল। মেহেরকে একপ্রকার সরিয়ে দিয়ে নিজের প্লাটিনাম কার্ডটা বাড়িয়ে দিল সে। তার নিজের পছন্দের সেই ছোট মোজাগুলোও সে মেহেরের কেনা জিনিসের মাঝে গুঁজে দিল।
মেহের বাধা দিয়ে বলল, “আমি দিতে পারব। আপনার টাকা নেওয়ার কোনো মানে হয় না।”
রুদ্র কার্ডটা ক্যাশিয়ারের হাতে দিয়ে মেহেরের দিকে তাকাল। তার চাহনিটা তখন এতটাই প্রখর আর ধমক মিশ্রিত ছিল যে মেহেরের জমানো সব যুক্তি গলার কাছে আটকে গেল। রুদ্র নিচু স্বরে বলল, “টাকাটা আমি তোমাকে দিইনি, আগেই বলেছি।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৮

পেমেন্ট শেষে রুদ্র এক প্রকার তাড়াহুড়ো করেই গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। তার বুকের ভেতরে তখন এক বিচিত্র তোলপাড়। হাসপাতালের সেই ‘টিপ টিপ’ শব্দের হার্টবিটটা যেন রুদ্রর দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা ‘ঘৃণার প্রাচীর’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না সে কি মেহেরকে ঘৃণা করছে, নাকি নিজের অজান্তেই এই বাচ্চার মায়ার জালে জড়িয়ে পড়ছে?

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২০