Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২০

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২০

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২০
মারিয়াম ফুল

এই বাচ্চার বাবা তো আমি নই। এই বাচ্চা অন্য কারো, আমার না! তবে রুদ্র, তুই কেন তার জন্য এত কিছু অনুভব করছিস ? মেহেরের জন্য?
না..না মেহেরের জন্য কোনো….
রুদ্র কার্ডটা ক্যাশিয়ারের হাতে দিয়ে মেহেরের দিকে তাকাল। তার চাহনিটা তখন এতটাই প্রখর আর ধমক মিশ্রিত ছিল যে মেহেরের জমানো সব যুক্তি গলার কাছে আটকে গেল। রুদ্র নিচু স্বরে বলল, “টাকাটা আমি তোমাকে দিইনি, আগেই বলেছি।”
পেমেন্ট শেষে রুদ্র এক প্রকার তাড়াহুড়ো করেই গাড়ির দিকে হাঁটা দিল। তার বুকের ভেতরে তখন এক বিচিত্র তোলপাড়। হাসপাতালের সেই ‘টিপ টিপ’ শব্দের হার্টবিটটা যেন রুদ্রর দীর্ঘদিনের গড়ে তোলা ‘ঘৃণার প্রাচীর’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারছে না সে কি মেহেরকে ঘৃণা করছে, নাকি নিজের অজান্তেই এই বাচ্চার মায়ার জালে জড়িয়ে পড়ছে?
রুদ্র স্ট্রিয়ারিং হুইলের ওপর দুহাতে মাথা চেপে ধরে পাথরের মতো বসে আছে। গাড়ির ভেতরে এসি চললেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কানের ভেতর এখনো সেই শব্দটা বাজছে ধক… ধক… ধক…। একটা জীবনের স্পন্দন। রুদ্র নিজেকে নিজে বারবার প্রশ্ন করছে, “কেন? কেন আমার সাথে এমন হচ্ছে? এই বাচ্চার বাবা তো আমি নই। এই বাচ্চা অন্য কারো, আমার না! তবে রুদ্র, তুই কেন তার জন্য এত কিছু অনুভব করছিস ? মেহেরের জন্য?

না..না মেহেরের জন্য কোনো….
হয়তো.. হয়তো মানুষ হিসেবে করেছি… স্রেফ দায়িত্ব হিসেবে।” রুদ্রর ভেতর এখন এক প্রবল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চলছে, অথচ কোনো উত্তরই তার জানা নেই।
গাড়ির জানালার কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে দেখল মেহের পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছে। অনেকগুলো ব্যাগ হাতে সে রীতিমতো যুদ্ধ করছে। রুদ্র একপলক তার দিকে তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল। মেহের যখন গাড়িতে বসল, রুদ্রর মুখটা আবার গম্ভীর হয়ে গেল। দুজনের মাঝে এক নিচ্ছিদ্র নীরবতা। তবে মেহেরের মনে আজ এক অদ্ভুত প্রশান্তি। এই প্রথম সে নিজের আর অন্তুর অস্তিত্বকে এক সুতোয় অনুভব করতে পেরেছে বাচ্চার হার্টবিটের মাঝে।

অ্যপার্টমেন্টের দরজায় পৌঁছে মেহের ব্যাগগুলো নিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। একটা ব্যাগ ধরতে গেলে অন্যটা পড়ে যাচ্ছে। রুদ্রর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সে কিছু না বলে মেহেরের হাত থেকে ঝটকায় সব ব্যাগ কেড়ে নিল। রুদ্রর চিবুক শক্ত, চোখে তীক্ষ্ণ বিরক্তি। রুদ্র ভুরু কুঁচকে ইশারা করল চাবি দিয়ে দরজা খুলতে। মেহের বিড়বিড় করে প্রতিবাদ করল, “আমি পারতাম…।”
রুদ্র ঝাড়ি দিয়ে উঠল, “হ্যাঁ, কতটুকু পারো তা তো দেখাই যাচ্ছে। ওপেন দ্য ডোর ”
লিভিং এরিয়ায় সোফার পাশে ব্যাগগুলো নামিয়ে রাখল রুদ্র। মেহের বড্ড ক্লান্ত ছিল, সোফায় ধপ করে বসে পড়ে টেবিলের পাশে থাকা গ্লাস নিয়ে পানি খাচ্ছিল। ঠিক তখনই কলিং বেল বেজে উঠল। মেহের রুদ্রকে দেখে তার দিকে তাকাল। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। শরীরটা এতটাই অবসন্ন যে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিও যেন নেই।
তারপর সে ধীরে দরজার দিকে তাকিয়ে আবার রুদ্রের দিকে চাইল। কিছু বলল না, শুধু চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল দরজাটা খুলে দিতে।
রুদ্র দাঁত-মুখ শক্ত করে চোয়াল চেপে ধরল।
রুদ্র লিভিং এরিয়ার দিকে এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। দরজার ওপাশে থাকা মানুষ দুজনকে দেখে সে একদম আকাশ থেকে পড়ল।

“মা! বাবা! তোমরা… এখানে? এই সময়ে?”
হামজা চৌধুরী আর রেহানা চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। রুদ্রর মনে হয়েছিল তারা আগামীকাল আসবেন। হামজা চৌধুরী রুদ্রর অবাক হওয়া মুখ দেখে হেসে উঠলেন। রেহানা চৌধুরী নিজের ছেলেকে এতদিন পর দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
হামজা চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন, “কি ক্যাপ্টেন! মা-বাবার আসার খবর শুনে এমন ভুত দেখার মতো চমকে গেলে কেন?”
রুদ্র অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “না মানে, তোমরা তো কাল আসবে বললে।”
হামজা চৌধুরী পকেটে হাত দিয়ে আয়েশ করে দাঁড়ালেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে এক চোখ টিপে দিয়ে বললেন, “সারপ্রাইজ শব্দটা কি তোমার ডিকশনারিতে নেই? নাকি মেহেরের সাথে ঝগড়া করে মুখটা এমন হাঁড়ি করে দেখেছো ?
মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে ইন্টারপোল তোমাকে খুঁজছে!” রুদ্র তার বাবার এই রসিকতায় একটু দমে গেলেও নিজের গাম্ভীর্য বজায় রাখার চেষ্টা করল।
রুমে ঢুকেই রেহানা চৌধুরীর চোখ গেল সোফায় বসা মেহেরের দিকে। মেহের ঘাবড়ে গিয়ে সালাম দিয়ে এগিয়ে এল। হামজা চৌধুরী পরম মমতায় মেহেরের মাথায় হাত রাখলেন।

“মা রে, দেখতে চলে এলাম। রুদ্র তো কোনো খবরই দেয় না আমাদের।” রেহানা চৌধুরী মেহেরের দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করলেন মেয়েটার মাঝে একটা স্নিগ্ধ পরিবর্তন এসেছে। ঠিক তখনই উনার চোখ গেল সোফায় রাখা অসংখ্য শপিং ব্যাগের ওপর।
“এত ব্যাগ কিসের রে রুদ্র?”
মায়ের প্রশ্নে রুদ্র আর মেহের দুজনেই থতমত খেয়ে একসাথে বলে উঠল, “কিছু না… মানে এমনিই একটু শপিং…।”
রুদ্র দরজার পাশ থেকে তাড়াহুড়ো করে সোফায় রাখা কাপড়ের বেগ গুলো সরাতে লাগল। তার হাতের ভঙ্গিতে অস্থিরতা স্পষ্ট, যেন যত দ্রুত সম্ভব জায়গাটা ফাঁকা করতে চায়।
মেহেরের চোখ তখন হঠাৎই সোফার পাশের দিকে গিয়ে আটকাল। নিজের মেডিকেল রিপোর্টগুলো চোখে পড়তেই সে থমকে গেল। মুহূর্তেই তার মুখের রং বদলে গেল। পরক্ষণেই তাড়াহুড়ো করে সেও এগিয়ে গেল রিপোর্টগুলো সরিয়ে নিতে।

ব্যাগগুলো সরাতে গিয়েই চরম বিপত্তি ঘটল। রুদ্রর হাত ফসকে একটা ব্যাগ থেকে সেই ছোট্ট সাদা পশমি মোজা আর বাচ্চার জামাগুলো ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ল। ঠিক একই সময়ে মেহের নিজের মেডিক্যাল ফাইলটা সরাতে গিয়ে রুদ্রর সাথে সজোরে ধাক্কা খেল। ফাইল আর কাপড় সব একসাথে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
এক মুহূর্তে ঘরজুড়ে পিনপতন নীরবতা। রুদ্র দাঁত কিড়মিড় করে মেহেরের দিকে তাকাল। রেহানা চৌধুরী গাইনোকোলজিস্টের ফাইল আর ফ্লোরে পড়ে থাকা সেই পুতুলের মতো ছোট মোজাগুলো দেখে যা বুঝার বুঝে ফেললেন। তিনি খুশিতে ডুকরে উঠে মেহেরকে জড়িয়ে ধরলেন। হামজা চৌধুরী তখনও কিছুটা বিভ্রান্ত, উনি কিছু বুঝতে পারছে না । রেহানা চৌধুরী বলে উঠলেন, “নতুন অতিথি আসছে আর আমাদের জানালে না মেহের? আমরা দাদা-দাদি হচ্ছি…হামজা, শুনছো? আমরা দাদা-দাদি হচ্ছি!”
হামজা চৌধুরীর আনন্দ তখন আকাশচুম্বী। তিনি রুদ্রর কাঁধে শক্ত করে হাত রেখে আবেগী গলায় বললেন,

“রুদ্র, আমি জানতাম না তুমি এত বড় খবরটা এভাবে লুকিয়ে রাখবে । ”
রুদ্রর অবস্থা তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’।
সে এক হাত কপালে দিয়ে আঙুল দিয়ে স্লাইড করতে লাগল, চোখ-মুখের অস্বস্তি চরমে। হামজা চৌধুরী ছেলের এই অবস্থা দেখে রুদ্রর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে হাসলেন।
তারপর এক চিমটি নুন ছিটিয়ে দেওয়ার মতো করে বললেন, “খবরটা কি তুমি জানতে নাকি না ? নাকি শপিং ব্যাগগুলো আকাশ থেকে সরাসরি সোফায় ল্যান্ড করেছে?”
রুদ্র কোনোমতে আমতা আমতা করে বলল, “বাবা, আসলে আমি…”
হামজা চৌধুরী তাকে কথা শেষ করতে দিলেন না। অট্টহাসি দিয়ে বলে উঠলেন, “থাক বাবা, আর বাহানা দিস না।
যে ছেলে বিয়ের নাম শুনলে সাত মাইল দূরে পালাত, যে তার বাপকে জ্বালিয়ে খাক করে দিয়েছিল সেই ছেলে আজ নিজে বাবা হচ্ছে, তা বাবা হওয়ার অনুভূতি কেমন, মিস্টার ক্যাপ্টেন?”
রুদ্রর মনে হলো, যে কাজ সে সম্পাদনই করেনি, তার ফলই যেন এখন তাকে ভোগ করতে হচ্ছে। ভেতরে বিরক্তি আর অস্বস্তি একসাথে কিলবিল করে উঠল।
সে দাঁত চেপে, কটমট চোখে তাকিয়ে উঠে বলল

——” বাবা”
হামজা চৌধুরী তেতে উঠে বললেন, “কি বাবা বাবা শুরু করছো?”“আমি এখন ইয়ংগেস্ট, হ্যান্ডসাম দাদা, বুঝলে?”
হামজা চৌধুরী এবার মেহেরের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বললেন, “মা , দোয়া করো এই বাচ্চা যেন একদম তোমার মতো শান্তশিষ্ট হয়। কারণ তোমার স্বামীর মতো এক পিস নমুনা সামলাতে গিয়ে তোমার তোমার শাশুড়ির সব চুল পেকে গেছে। রেহানা চৌধুরী মুখ বিকৃত করে বললেন,
“হ্যা, তুমি তো মোস্ট হ্যান্ডসাম অফ দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছো।”
হামজা চৌধুরি হেসে আবার বলতে লাগলেন…..
মনে আছে রেহানা? ওকে যখন প্রথমবার স্কুলে ভর্তি করালাম, ও জেদ ধরল ও স্কুলে যাবে না যদি না ওকে নিজের ড্রাইভ করতে না দেওয়া হয়। শেষে কী করল জানো? আমাদের বাড়ির সব দামী ডিনার সেট একে একে ব্যালকনি থেকে নিচে ছুড়ে ফেলে দিল যতক্ষণ না আমরা হার মানলাম। শেষে ওর সাত বছর বয়সে ওকে একটা ব্যাটারিচালিত মিনি জিপ কিনে দিতে হলো,তার আগে কারো সাধ্য ছিল না তাকে ঘর থেকে বের করার!”

রুদ্র এবার সটান হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে প্রতিবাদী গলায় বলল,
“কী বলছো বাবা! ওসব তো অনেক আগের কথা। আর ছোটবেলায় একটু-আধটু জেদ সবাই করে।”
হামজা চৌধুরী এবার আরও এক কাঠি উপরে গিয়ে বললেন, “একটু-আধটু? তুমি একবার রাগের চোটে তোমার ঘরের সব দামী ফার্নিচারে রঙ মেখে ভূত বানিয়ে দিয়েছিলি কারণ তোমাকে তোমার পছন্দের কার্টুন দেখতে দেওয়া হয়নি!
এখন বুঝবা… ক্যাপ্টেন সাহেব, কত ধানে কত চাল! যদি তোমার ঘরের এই নতুন অতিথি তোমার ঐ জেদ নিয়ে জন্মায়, তখন তোমার এই ‘ক্যাপ্টেনগিরি’ আর চওড়া বুক ঐ বাচ্চার একটা কান্নার সামনে কীভাবে নতি স্বীকার করে—সেটা দেখার জন্য আমি অধীর অপেক্ষায় আছি। তখন বুঝবে কারে কয় জ্বালা,হাহা !
রুদ্র বিরক্তি নিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বিড়বিড় করল, “অসম্ভব! আমার বাচ্চা কক্ষনো আমার মতো ত্যাড়াঁ হবে না। আর আমি মোটেও ওরকম ছিলাম না।”

হামজা চৌধুরী ছেলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, “হবে না মানে? একশবার হবে! বাপের বেটা তো হবেই। এখন থেকে প্র্যাকটিস শুরু কর ক্যাপ্টেন, কমান্ড দেওয়া সহজ, কিন্তু নিজের কার্বন কপি সামলানো দুনিয়ার সবথেকে কঠিন কাজ। তখন দেখবে তোমার এই ‘ইগো’ বাচ্চার সামনে কীভাবে হার মেনে যায়…”
রুদ্রর অবস্থা তখন ত্রাহি মধুসূদন। রুদ্র রাগে দুপদাপ পায়ে নিজের রুমে চলে যায়।
তখন রেহানা চৌধুরী হালকা হাসি দিয়ে মেহের কে বললেন,
“যাও, রেস্ট নাও মা। নিজের রুমে গিয়ে একটু ।”
মেহের অস্বস্তিতে পড়ে নিজের রুমের দিকে পা বাড়াতে গেলেই রেহানা চৌধুরী অবাক হয়ে বললেন,
“মেহের, রুদ্রর রুম তো এই পাশে, তুমি গেস্ট রুমের দিকে যাচ্ছো কেন?”
মেহেরের মুখে যেন তালা পড়ে গেল। রুদ্রর মা-বাবার সামনে কি করে বলবে তারা আলাদা থাকে? মেহের জিহ্বায় কামড় দিয়ে আমতা আমতা করে বলে ফেলল, “মা… আসলে আপনার ছেলের সাথে একটু ঝগড়া হয়েছিল তো, তাই রাগ করে আমি ওঘরে গেছি।”
রেহানা চৌধুরী একটু জোরে জোরে বলতে লাগলেন, যাতে রুদ্র নিজের রুম থেকে শুনতে পায়———
“ঝগড়া হয়েছে বলে প্রেগন্যান্ট বউকে আলাদা রুমে রেখেছ?
হামজা চৌধুরী পাশ থেকে ফড়ন কাটলেন, “একদম ঠিক….রুদ্র, তোমার কপালে নির্ঘাত শনির দশা আছে। বউকে এখনই নিজের রুমে নিয়ে যাও, নাহলে আমি তোমার ক্যাপ্টেন লাইসেন্স ক্যান্সেল করার ব্যবস্থা করছি” মেহের মাথা নুইয়ে দ্রুত সরে পড়ল।

রাত প্রায় ১২টা…
মেহের বালিশ আর কোলবালিশ হাতে নিয়ে রুদ্রর রুমে ঢুকল। রুদ্র তখন ল্যাপটপ নিয়ে বেডে হেলান দিয়ে কাজ করছিল। সমস্যা হলো, এই রুমে কোনো সোফা নেই। মেহের অসহায়ের মতো কতক্ষণ রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু রুদ্র তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। মেহের শেষমেশ গলা খাঁকারি দিলে রুদ্র বিরক্ত হয়ে তাকাল।
রুদ্র শীতল গলায় বলল, “নিচে ঘুমিয়ে পড়ো।”
মেহেরের রাগ মাথায় চড়ে গেল। সে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি নিচে ঘুমাব কেন? যা হয়েছে সব আপনার জন্য হয়েছে…আপনি কেন শপিং ব্যাগ ওভাবে ফেললেন? আপনার জন্য ধাক্কা খেয়ে রিপোর্ট ফ্লোরে পড়েছে, এখন আমি দোষী? আপনি নিচে ঘুমান, আমি বিছানায় ঘুমাব।”
রুদ্র রাগে বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল।
“মাই রুম! তুমি আমার সাথে ধাক্কা খেয়েছ, সো দায় তোমার। তুমিই নিচে ঘুমাও।”
দুজনের মাঝে এক চোট তুমুল তর্কাতর্কি চলল। শেষে রুদ্র বিছানার এক কোণ দেখিয়ে বলল, “ঘুমালে এখানে ঘুমাও, নাহলে দাঁড়িয়ে থাকো।”

মেহের কোনো উপায় না দেখে মাঝখানে কোলবালিশের এক বিশাল দেয়াল তুলে শুয়ে পড়ল। রুদ্র টিপ্পনী কাটল, “সেদিন তো ঘুমালে না, আজ কেন? তা আমার প্রেমে টেমে পড়লে নাকি?”
মেহের বালিশে মুখ গুঁজে কড়া বলে উঠল , “খবরদার… ভুল করেও কোলবালিশের এপারে আসার চেষ্টা করবেন না ক্যাপ্টেন সাহেব”
রুদ্র গম্ভীর গলায় বলল,
“আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড।”
সারাদিনের ক্লান্তিতে মেহের কিছুক্ষণের মধ্যেই অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে মেহেরের ঘুম ভাঙতেই সে দেখল রুদ্র বিছানায় নেই। সে অবাক হয়ে দেখল, রুদ্র সামনের স্টাডি টেবিলের চেয়ারে মাথা রেখে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। মেহেরের বুকটা হঠাৎ কেমন করে উঠল। রুদ্র কি তবে সারারাত মেহেরের অস্বস্তি হবে বলে বিছানায় ঘুমায় নি ?
মেহেরের মনে মনে প্রথমবার ভালো লাগার রেশ খেলে গেল— “যতটা খারাপ ভাবতাম, আপনি কি আসলেই ততটা খারাপ নন?”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৯

ঠিক সেই মুহূর্তে রুদ্রর ঘুম ভেঙে গেল। দুজনের চোখাচোখি হতেই মেহের অপ্রস্তুত হয়ে প্রশ্ন করল, “আপনি… আপনি এখানে ঘুমিয়েছেন?”
রুদ্র আড়মোড়া ভেঙে তার সেই চিরচেনা রুক্ষ গলায় ঝাড়ি দিয়ে উঠল, “মিসেস অ্যারোফোবিয়া, চোখে যখন দেখতেই পাচ্ছো তখন প্রশ্ন করে সময় নষ্ট করছো কেন? আর আমি একবার বলেছি, আমি তোমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নই।”
মেহের বিরক্তি নিয়ে বিছানা ছাড়ল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২১