ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২১
মারিয়াম ফুল
“তুমি আর তোমার বাচ্চা আমার ফ্যামিলির থেকে একদম দূরে থাকবে,একদম । আমি চাই না তাদের সাথে তোমার কোনো অ্যাটাচমেন্ট ইস্যু হোক বা তোমার বাচ্চার।”
মেহের বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই রুদ্রর গম্ভীর স্বর তার কানে এল। রুদ্রর গলার আওয়াজটা আজ অন্যদিনের চেয়েও ভারী শোনাল। সে মেহেরের দিকে না তাকিয়েই বলতে শুরু করল,
“মা-বাবা যদি সত্যটা জানতে পারে… তারা এই বাচ্চাটাকে নিয়ে কতটা এক্সাইটেড দেখেছ? যদি জানে এই বাচ্চা আমার না! তুমি – তো আর মাত্র দুই মাস পর এখান থেকে চলে যাবে। তুমি কি জানো তারা কতটা কষ্ট পাবে?”
মেহের ঘুরে রুদ্রর দিকে তাকাল। রুদ্রর চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত কাঠিন্য প্রকাশ পাচ্ছে ।
“তুমি আর তোমার বাচ্চা আমার ফ্যামিলির থেকে একদম দূরে থাকবে,একদম । আমি চাই না তাদের সাথে তোমার কোনো অ্যাটাচমেন্ট ইস্যু হোক বা তোমার বাচ্চার।”
রুদ্রর প্রতিটা কথা মেহেরের বুকের ভেতর তীরের মতো বিঁধল। মেহেরের চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। কোথাও যেন খুব গভীরে কেউ তাকে বড় কোনো আঘাত করেছে। মেহের নিজের ছলছল করা চোখ আড়াল করল না, বরং রুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“আমি… আমি আপনার মা-বাবাকে সব বলে-ই যাব। মাত্র তো আর দুই মাস। আমি আজই ভাইয়ার সাথে কথা বলব। আমার ভাইয়া বাইরে থাকেন, আমি বললে উনি শুনবেন। আমি তাঁর কাছেই চলে যাব। আপনাকে আমার জন্য আর কোনো কষ্ট করতে হবে না… আর মাত্র দুই মাস।”
মেহের একটু থামল, নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলল,
“আর কয়েক মাস পর আমার ২১ বছর হয়ে যাবে। তখন আমি আমার সম্পত্তি পেয়ে যাব। আপনি আপনার ভাগের ৬৫ পারসেন্ট পেয়ে যাবেন।”
মেহেরের এই ধরা গলা আর কান্নাভেজা চেহারা দেখে রুদ্রর মায়া হলো না, বরং সে প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। সে মেজাজ হারিয়ে বলে উঠল,
“কথায় কথায় কান্নার কী আছে? তোমাদের মতো মেয়েদের সাথে সংসার করে কীভাবে মানুষ! এন্ড লিসেন… আমি বলেছি আমার ফ্যামিলি থেকে দূরে থাকতে, মানে একদম দূরে থাকবে। অ্যান্ড আই হেট দোজ উইমেন যারা কথায় কথায় কান্না করে।”
রুদ্র রাগে রি রি করতে করতে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। মেহের ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। নিজেকেই প্রশ্ন করল, “আমি তো কখনো এত উইক ছিলাম না! তাহলে আজ কেন এমন হচ্ছে?”
মেহের স্বভাবগতভাবেই খুব চঞ্চল ছিল। দুই ভাই আর এক বোনের আদুরে পরিবারে সব আদর তার ঝুলিতেই থাকত। অথচ জীবন আজ তাকে এক কঠিন পরীক্ষায় দাঁড় করিয়েছে।
প্রেগন্যান্সিতে অনেকেরই মুড সুইংস হয়, হয়তো মেহেরেরও তাই হচ্ছে। যেখানে রাগ করা বা কাঁদা উচিত নয়, সেখানেই সে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে।
হঠাৎ দরজায় করাঘাত হতেই মেহেরের ভাবনার জগৎ ভেঙে গেল। চোখের জল শুকিয়ে গেছে ততক্ষণে, তবু সে তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে নিল। দরজা খুলতেই দেখল হাসি মুখে রেহানা চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি আদুরে গলায় বললেন,
“ডিস্টার্ব করলাম বুঝি মা?”
মেহের মাথা নেড়ে আলতো হাসল, “না মা, একদম না।”
রেহানা চৌধুরী মেহেরের হাত ধরলেন। রেহানা চৌধুরী একবার আড়চোখে ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকালেন। ভেতর থেকে পানির শব্দ আসছে, তার মানে রুদ্র ভেতরেই আছে। তিনি আর সময় নষ্ট না করে মেহেরের হাত ধরে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। ডাইনিং এরিয়ায় পা রাখতেই মেহেরের চোখ ছানাবড়া! টেবিল জুড়ে যেন রাজকীয় ভোজের আয়োজন। গরম লুচি, আলুর দম, পায়েস থেকে শুরু করে হরেক পদের খাবারে পুরো টেবিল উপচে পড়ছে। রেহানা চৌধুরী মেহেরের জন্য ভোর থেকে উঠে এসব রান্না করেছেন।
হামজা চৌধুরী সোফায় বসে আয়েশ করে নিউজ পেপার পড়ছিলেন। মেহেরকে দেখেই তিনি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালেন। পরম মমতায় মেহেরের মাথায় হাত রেখে বললেন, “আসো মা, বসো খেয়ে দেখো তো সব ঠিক আছে কি না।”
মেহের কী বলবে ভাষা হারিয়ে ফেলল। যদিও সে মনে মনে এখনো নিজেকে রুদ্রর স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি, কিন্তু এই মানুষগুলোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাকে বারবার অপরাধী করে দেয়।
নিজের বাপের বাড়িতে যে আদর পাওয়ার কথা ছিল, আজ এক প্রকার অনিশ্চিত সম্পর্কে দাঁড়িয়েও সেই মায়া সে এই বাড়িতে পাচ্ছে। রেহানা চৌধুরী তাকে চেয়ারে বসিয়ে প্লেট ভরে খাবার তুলে দিতে লাগলেন।
খাওয়ার মাঝখানে রেহানা চৌধুরী হঠাৎ বললেন, “আজ আমাদের তোমার বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে যেতে হবে। আমি চাই তুমিও আমাদের সাথে চলো। লকডাউন এখন শিথিল, ভিড়ও কম হবে। একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসলে তোমার শরীর আর মন দুটোই ভালো লাগবে। যাবে তো মা?”
মেহের উত্তর দেওয়ার আগেই দেখল রুদ্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ক্যাজুয়াল পোশাকে তৈরি হয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে। হামজা চৌধুরী ওকে দেখে বললেন, “কোথায় যাচ্ছো? ব্রেকফাস্ট রেডি। তোমার মায়ের হাতের রান্নাটা খেয়ে যাও।” রুদ্র মেহেরের দিকে একবার ঘৃণাভরে তাকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল,
“তোমাদের আদরের বউমার জন্য করেছো, তোমরাই খাও। আমার বাইরে কাজ আছে।”
বলেই কারো কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে সে হনহন করে বেরিয়ে গেল। হামজা চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিরক্তি নিয়ে বললেন, “যাক গে বাবা! সকাল সকাল কার মুখ দেখে উঠেছে কে জানে, কিসের এত তাড়া ওর।”
মেহেরের একদম ইচ্ছা ছিল না অনুষ্ঠানে যাওয়ার, বিশেষ করে রুদ্রর দেওয়া সেই নির্দেশ—’পরিবার থেকে দূরে থাকা’—
তার মাথায় বারবার বাজছিল। কিন্তু রেহানা চৌধুরীর এমন করুণ মিনতি সে এড়াতে পারল না। বিকেলের দিকে রেহানা চৌধুরী মেহেরের জন্য একটা কালো রঙের গাউন আর ডার্ক ব্রাউন রঙের একটা হিজাব নিয়ে এলেন। মেহের কোনোদিন এসব ভারী পোশাক পরেনি,কারণ তার পছন্দ না, সাজগোজের অভ্যাসও তার নেই বললেই চলে। কিন্তু রেহানা চৌধুরী আজ যেন নাছোড়বান্দা। তিনি নিজের হাতে মেহেরকে দুটো সোনার বালা পরিয়ে দিলেন এবং একটা দামি হীরা বসানো নাকফুল পরিয়ে দিলেন। সাজ শেষে আয়নায় মেহের নিজেকে দেখে থমকে গেল।
কালো পোশাকে তাকে এতটাই মায়াবী আর স্নিগ্ধ লাগছিল। হামজা চৌধুরী দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
“এখন একদম চৌধুরী বাড়ির বউ লাগছে। ” মেহেরের মনে তখন এক অব্যক্ত অপরাধবোধ কাজ করছিল ।এত সম্মান আর ভালোবাসার যোগ্য কি সে আসলেই?
সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ তারা এক আলিশান
অ্যাপার্টমেন্টের সামনে পৌঁছাল। আলো ঝলমলে রাজকীয় বিয়ে। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে কেউ প্রভাবশালী পলিটিশিয়ান তো কেউ নামকরা বিজনেসম্যান। মেহেরের অস্বস্তি ক্রমেই বাড়ছিল। ঠিক তখন ‘নিদিতা’ নামের এক তরুণী রেহানা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরল।
নিদিতা রুদ্রর কো-পাইলট, গত ৬ বছর ধরে সে রুদ্রর সাথে কাজ করছে। রেহানা চৌধুরীর মুখে কৃত্রিম হাসির রেখা ফুটে উঠল। নিদিতা চারদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “রুদ্র কোথায় আন্টি? ও কি আসেনি?”
রুদ্রর একটু জরুরি কাজ আছে, তাই ও আসেনি। তবে ওর স্ত্রী এসেছে।
নিদিতা যেন আকাশ থেকে পড়ল। তার চোখের চাহনি বদলে গেল নিমিষেই।
“স্ত্রী মানে? রুদ্র ম্যারিড? আই মিন, ও তো আমাকে কিছুই বলেনি আন্টি!”
রেহানা চৌধুরী একটু শক্ত গলায় বললেন, “বলাটা জরুরি মনে করেনি হয়তো। ৩ মাস আগেই ওদের বিয়ে হয়েছে।” নিদিতা নিজেকে সামলে নিয়ে একপাশে বসে থাকা মেহেরের দিকে তাকাল। রেহানা চৌধুরী ইশারায় মেহেরকে দেখিয়ে দিলেন।
কিছুক্ষণ পর মেহেরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল নিদিতা। মেহেরের দিকে এক গ্লাস সফট ড্রিঙ্কস এগিয়ে দিয়ে বলল, “হাই, আই অ্যাম নিদিতা। রুদ্রর কলিগ।” মেহের সামান্য হেসে মাথা নোয়াল।
নিদিতা বাঁকা হাসি হেসে বলতে লাগল,
“রুদ্র তো ইউএসএ-তে পড়াশোনা করেছে, জানোই তো ওখানকার কালচার। আমরা একসাথে ফ্লাইট করেছি, থেকেছি, খেয়েছি এমনকি কত রাত যে একসাথে কাটিয়েছি তার হিসেব নেই। রুদ্রর কাছে এসব খুব কমন। কত মেয়ের সাথে ওর কত কিছু হয়েছে তার লিস্ট করলে শেষ হবে না। ও আসলে ধরাছোঁয়ার বাইরের মানুষ। তা তোমার সাথে ওর ঘরসংসার কেমন কাটছে?”
নিদিতার মুখে ‘একসাথে ঘুমানো’ আর ‘রাত কাটানোর’ কথাগুলো মেহেরের মাথায় হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল। তার মনে রুদ্রর প্রতি এক পাহাড় সমান ঘৃণা জন্মাতে শুরু করল। সকালে যে লোকটার প্রতি সামান্য মায়া জেগেছিল, নিদিতার কথায় তা ধুলোয় মিশে গেল।
ঠিক সেই সময় কিছুটা দূরে
সেখানে উপস্থিত রিনা নামক এক প্রভাবশালী মহিলা টিপ্পনী কেটে বলে উঠলেন, “দেখুন রেহানা আপা, যুগটা তো ভালো না। আজকালকার মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েরা বড় ঘরের ছেলেদের ফাঁদে ফেলতে ওস্তাদ। টাকা-পয়সার লোভ আর সম্পত্তির মোহে তারা কত কিছুই না করে। সাবধান থাকবেন কিন্তু!”
মেহের কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল এবং লজ্জায় তার মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু হামজা চৌধুরী মেহেরের মাথায় হাত রেখে কড়া স্বরে রিনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “রিনা বেগম, আমার ঘরের বউ আমাদের পরিবারের সম্মান। আর ও কোন মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েও নয়
আর চৌধুরী বাড়ির ছেলের রুচি সম্পর্কে তো আপনার ভালোই জানা আছে। আমার বউ তার যোগ্যতায় এ বাড়িতে এসেছে, কোনো লোভে নয়।
তখন রিনা বেগমের মুখটা ছোট হয়ে এল। গাড়িতে বারবার হামজা চৌধুরী মেহেরের কাছে ক্ষমা চাইছিলেন। তাদের আসলে মেহেরকে নিয়ে এমন জায়গায় আসা ঠিক হয়নি।
মেহের হামজা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলল,
“আপনি বাদ দিন না, বাবা… আমি কিছু মনে করিনি।”
রাত প্রায় ১২টার দিকে তারা অ্যাপার্টমেন্টে ফিরল। রুদ্র তখনও ফেরেনি। রেহানা চৌধুরী ছেলের চিন্তায় অস্থির হয়ে বারবার কল দিচ্ছিলেন, কিন্তু রুদ্র ফোন ধরছিল না। মেহের নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লেও ক্ষুধার চোটে তার চোখে ঘুম আসছিল না। কিছু একটা খাওয়ার জন্য সে রান্নাঘরের দিকে যেতেই দেখল
বাসার মেইন ডোর দিয়ে রুদ্র ভেতরে ঢুকছে। তার মাথায় হেলমেট, গায়ে কালো চামড়ার বাইকার জ্যাকেট।জ্যাকেটের কাঁধ আর কনুইয়ে মোটা প্যাডিং, সাথে লাল-সাদা স্ট্রাইপস।হাতে শক্ত গ্রিপের গ্লাভস, নিচে গাঢ় রঙের রাইডিং প্যান্ট।
পায়ে ভারী বুট….দেখে মনে হচ্ছে, কোথাও থেকে এখনই বাইক রাইড করে এসেছে।
রুদ্রর হাঁটার ধরন মোটেও স্বাভাবিক নয়। সে সোফার দিকে এগোতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে মেহের দৌঁড়ে গিয়ে তাকে ধরতে চাইল। কিন্তু রুদ্র বিকট স্বরে চিৎকার করে উঠল,
“ডোন্ট টাচ মি! খবরদার আমার গায়ে হাত দেবে না”
মেহেরের নাকে এক উগ্র মদের গন্ধ ভেসে এল। সে ঘৃণায় কুঁকড়ে গিয়ে ধরা গলায় প্রশ্ন করল, “আপনি… আপনি ড্রিঙ্ক করেছেন?”
রুদ্র টলটলে রক্তবর্ণ চোখে মেহেরের দিকে তাকাল। একটা অদ্ভুত বিদ্রূপের হাসি দিয়ে বলল, “হ্যাঁ করেছি। আমি অনেক কিছুই করি।”
মেহেরের চোখে তখন নিদিতার বলা সেই কথাগুলো মনে হলো । রুদ্র মেহেরের পরনের কালো পোশাক আর তার নাকের হীরাটার চমক দেখে শব্দ করে হাসল। তারপর মেহেরের ঠোঁটে তর্জনী ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল,
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২০
“মিসেস অ্যারোফোবিয়া… নিজেকে আমার থেকে দূরে রাখো। ভুল করেও কাছে আসতে যেও না। যদি আসো, তবে তাদের মতো তুমিও ছাই হয়ে যাবে। ।”
মেহের কাঁপাকাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, “কা…কাদের মতো? কী করেছেন আপনি তাদের সাথে?”
মেহের অতি কষ্টে রুদ্রকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। রুদ্রর সেই বিদ্রূপের হাসিটা এখনো তার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে। মেহের কম্পিত স্বরে বলল, “কাদের মতো শেষ হয়ে যাব আমি? কাদের কথা বলছেন আপনি…
