ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২২
মারিয়াম ফুল
আমার পেটে বাচ্চা, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন!আমি নির্দোষ! আমি কোনো অন্যায় করিনি….
“মিসেস অ্যারোফোবিয়া… নিজেকে আমার থেকে দূরে রাখো। ভুল করেও কাছে আসতে যেও না। যদি আসো, তবে তাদের মতো তুমিও ছাই হয়ে যাবে। ।”
মেহের কাঁপাকাঁপা গলায় আর্তনাদ করে উঠল, “কা…কাদের মতো? কী করেছেন আপনি তাদের সাথে?”
মেহের অতি কষ্টে রুদ্রকে সোফায় বসিয়ে দিয়ে এক পা পিছিয়ে দাঁড়াল। রুদ্রর সেই বিদ্রূপের হাসিটা এখনো তার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে। মেহের কম্পিত স্বরে বলল, “কাদের মতো শেষ
রুদ্র হুট করে বলে উঠল, “তুমি এত কথা বলো কেন? শুধু প্রশ্ন আর শুধু প্রশ্ন! নিজেকে কি কোনো জজ মনে করো মিস অ্যারোফোবিয়া?”
মেহের মুখ ভেঙচালো। উফ! এই মাতাল অবস্থাতেও লোকটা কী রকম বাঁকা কথা বলছে! একবারও কি একটু মানুষের মতো করে কথা বলতে পারে না? রুদ্র মেহেরের দিকে চোখ দুটো ছোট ছোট করে তাকাল। নেশার ঘোরে তার চোখের মণিগুলো যেন আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে।
“কী ভাবছো সুইটহার্ট? আমি এমন কেন? আমি এমনই… আর সারাজীবন এমনই থাকব। যাও তো, স্বামী সেবা করো। খুব খিদে পেয়েছে, কুইক কিছু একটা রান্না করো। পেটের ভেতর ডাইনোসর দৌড়াচ্ছে!”
মেহেরের রাগ এবার চড়ে গেল। সে কেন স্বামী সেবা করবে? রুদ্রকে কি সে আদৌ স্বামী হিসেবে মানে? কিন্তু কী ভেবে যেন তার মনটা হঠাৎ নরম হয়ে গেল। তার নিজেরও খুব খিদে পেয়েছে, আর সকালে যাওয়ার সময় রুদ্রও তো এক দানাও দানাপানি মুখে তোলেনি। মেহের হাত ঝামটা দিয়ে বলল, “আপনি এখানে বসুন, আমি খাবার নিয়ে আসছি। আর খবরদার, একদম নড়বেন না!”
কিচেনে গিয়ে মেহের দেখল চটজলদি বানানোর মতো পাস্তা ছাড়া আর কিছুই নেই। সে পাস্তার প্যাকেট বের করে পেঁয়াজ কাটতে শুরু করল। হঠাৎ একটা ‘দুম’ করে শব্দ হলো…ভয়ে মেহের লাফিয়ে উঠে পেছনে ফিরে দেখল রুদ্র টলতে টলতে কিচেন কাউন্টারের ওপর উঠে পা ঝুলিয়ে বসেছে। তার মাথার চুলগুলো এলোমেলো, চাউনিটা এখন বাচ্চাদের মতো ইনোসেন্ট লাগছে। মেহের অস্বস্তি বোধ করে নিজের ওড়নাটা একটু টেনে নিয়ে বলল, “আপনি এখানে কেন এসেছেন? ওখানে গিয়ে বসুন।”
রুদ্র এক হাত দিয়ে নিজের কপাল টিপে ধরে বলল, “একদম না! তুমি ওখানে বসে বসে কী সব বিষ মেশাচ্ছ কে জানে! এখান থেকে আমি সব অবজারভ করছি।”
মেহের বিরক্তি নিয়ে বলল, “বিষ মেশাব কেন? মারতে চাইলে তো অনেক আগেই মারতে পারতাম।”
রুদ্র হঠাৎ মেহেরের একদম কাছে মুখটা এগিয়ে এনে ফিসফিস করে বলল, “পারতে না। তোমার এই দুধে-আলতা চেহারার পেছনে একটা বিড়াল লুকিয়ে আছে, যে বাঘ হওয়ার চেষ্টা করে। বাই দ্য ওয়ে, তোমার চোখের নিচে তিল আবার ঠোঁটের নিচেও একটা তিল উঁকি দিচ্ছে। খেয়াল করেছো?”
মেহের হকচকিয়ে গিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। লোকটা নেশার ঘোরে কী সব আবোল-তাবোল বলছে….সে পাস্তা রান্না নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রুদ্র হঠাৎ হাত দিয়ে ইশারা করে বলল,
“তুমি তো লম্বায় একদম চড়ুই পাখির মতো… এই টুকু!”
মেহের খুন্তি উঁচিয়ে তেড়ে এল,
“চড়ুই পাখি মানে? আমি যথেষ্ট লম্বা, ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি! আপনি কি আমাকে খাটো বলছেন?”
রুদ্র বাঁকা হেসে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে বলল, “লম্বা? আরে জবে তোমায় প্রথম দেখেছি, মনে হয়েছিল হাত দিয়ে পকেটে পুরে রাখা যাবে। জানো আমি কত লম্বা? তোমার থেকে এতটুকু না, আরও অনেকখানি বড় পিওর ৬ ফুট ২ ইঞ্চি। আমাদের পাশে দাড়ালে তো তোমাকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
মেহের রাগে রি রি করে বলল, “হ্যাঁ, নিজের ঢাক নিজে পেটান! তালপাতার সেপাই একটা…”
রুদ্র শব্দ করে হেসে উঠল, “তালপাতার সেপাই? আর তুমি তো ড্রেনের চুনোপুঁটি! তোমার ওই ডাগর ডাগর চোখগুলো যখন রাগে বড় করো, মনে হয় যেন কাঁচের মার্বেল গড়িয়ে পড়ছে।”
মেহেরের রাগ এবার সপ্তমে চড়ল…
“চুনোপুঁটি মানে? আপনার সমস্যা কী শুনি? আপনি যখন ওই বিচ্ছিরি বাঁকা হাসি দেন, আপনার গালে মেয়েদের মতো টোল পড়ে, সেটা নিয়ে আমি কিছু বলেছি? মানুষ হাসলে গাল গর্ত হয়, আপনার তো কুয়ো হয়ে যায়!”
রুদ্র টলতে টলতে কাউন্টার থেকে নামতে গিয়ে মেহেরের কাঁধে হাত দিয়ে নিজেকে সামলে নিল। তার গলার স্বরটা হঠাৎ ভারী হয়ে এল,
“তুমি কেন বলবে? তোমার চোখ যে হানি ব্রাউন! রোদে গেলে সোনালি দেখায়, আবার ঘরে আসলে গিরগিটির মতো রঙ বদলে কালচে হয়ে যায়। আমি কি সেটা নিয়ে কমপ্লেন করেছি?”
মেহের এবার আর উত্তর খুঁজে পেল না। রুদ্রর সাথে এভাবে কথার পিঠে কথা বলতে তার অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করছে। মনের ওপর জমে থাকা পাথরটা যেন একটু হালকা হলো। পাস্তা প্লেটে বেড়ে সে রুদ্রর দিকে এগিয়ে দিল। রুদ্র এক চামচ মুখে দিয়েই মুখ কুঁচকে বলল, “উফ! তুমি কি রাগের চোটে লবণের প্যাকেট উপুড় করে দিয়েছো?”
মেহের ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “কই দেখি!” বলেই সে রুদ্রর হাত থেকে চামচটা নিয়ে একটু মুখে দিল। “ঠিকই তো আছে….আপনি মিছেমিছি আমাকে জ্বালানোর জন্য বলছেন।”
রুদ্র এবার শব্দ করে হেসে উঠল,
“ধরা খেয়ে গেলে তো…আসলে পাস্তাটা হেভি হয়েছে ওয়াইফি। আচ্ছা, তুমি আমাকে ওইদিন প্লেনে ওরকম খামচি দিলে কেন? ”
মেহের অবাক হয়ে বলল, “কোন দিন? ”
রুদ্র তুরি মেরে বলল, “ভুলে গেছো সিলি গার্ল? ড্রিঙ্ক করেছি আমি, আর মেমোরি লস হয়েছে তোমার? চট্টগ্রামে আসার সময় ওই প্লেনে তুমি আমার শার্টের হাতা খামচে ধরেছিলে, আর এক সময় হাত খামছি দিয়েছিলে! উফ, এখনো মনে পড়লে ব্যথা করে।”
মেহের এবার লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে তো জানতই না রুদ্র- ই সেই লোকটাই ছিল….সে মিনমিন করে বলল, “সেদিন আমি ভয়ে ওসব করেছি। এবার বুঝলাম কেন আপনি আমাকে এরকম অ্যারোফোবিয়া গাল বলেন। আর আপনার মতো আপনি কেন ওভাবে মাস্ক পরে বসেছিলেন?”
রুদ্র মুখ বাঁকা করে বলল বাধ্য নই বলতে । কিন্তু বুঝতে পারিনি যে আমার বউ একটা অ্যারোফোবিয়া রোগী! যদিও তোমাকে আমি ওয়াইফ মানি না, কিন্তু লোকে তো জানে তুমি আমার স্ত্রী। তারা যদি জানতে পারে ক্যাপ্টেন সাহেবের বউ প্লেনে চড়তে ভয় পায়, তবে আমার প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যাবে না?”
মেহের গাল ফুলিয়ে বলল, “আপনার প্রেস্টিজের আমার বয়েই গেছে… মাত্র দুই মাস, তারপর আপনি আপনার পথে আমি আমার পথে।”
রুদ্র তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হ্যাঁ, দুই মাস পর আমার মুক্তি। উফ, সারা বাড়ি তখন শুধু আমার একার রাজত্ব হবে…কী শান্তি!”
মেহেরও পাল্লা দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমারও! অন্তত আপনার এই প্রতিদিনের খোঁটা আর তাচ্ছিল্য শুনতে হবে না।”
কথার পিঠে কথা আসতেই মেহেরের মনে একটা প্রশ্ন খচখচ করতে শুরু করল। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, নিদিতা কে? আপনার গার্লফ্রেন্ড ছিল?”
রুদ্র পাস্তা খাওয়া থামিয়ে এক পলক মেহেরের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সেই বিদ্রূপের হাসিটা আবার ফিরে এল। সে ভ্রু কুঁচকে বলল, “কেন? জলে? ডাল মে কুছ কালা হ্যায়?”
মেহের ঝেঁঝে উঠে বলল, “আপনি আমার কেউ না, জলবে কেন? আমি জাস্ট এমনিতে কিউরিসিটি থেকে জিজ্ঞেস করছি।”
রুদ্র হাসল। “তা নিদিতা কী আষাঢ়ে গল্প শুনিয়েছে তোমাকে?”
মেহের একটু মাথা নিচু করে বলল, “বলেছে আপনার নাকি অগণিত গার্লফ্রেন্ড আছে। আপনি নাকি ইউএসএ-তে থাকাকালীন অনেক মেয়ের সাথে…” মেহেরের লজ্জা লাগল কথাটা শেষ করতে।
রুদ্র চোখ ছোট ছোট করে বলল, “হুম…. নিদিতা তো কোনো মিথ্যে বলেনি। আমার গার্লফ্রেন্ডের তালিকা করলে তো পুরো একটা ডায়েরি লেগে যাবে। এই তো সেদিন নিদিতার সাথেই তো…”
রুদ্রর কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহেরের মুখটা কালো হয়ে গেল। রুদ্র সেটা খেয়াল করে হঠাৎ তার কপালে তর্জনি দিয়ে একটা টোকা মারল। “এত ভাবার কিছু নেই। নিদিতা একটু বাড়িয়ে বলে। তবে হ্যাঁ, আমার জীবনে মেয়ের অভাব ছিল না। কিন্তু তারা কেউ তোমার মতো চুনোপুঁটি ছিল না।”
বলতে বলতে রুদ্রর মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেল। সে ঢলে পড়তে নিলে মেহের দ্রুত তাকে সামলে নিল। মেহেরের ঘাড়ের ওপর রুদ্রর তপ্ত নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে। কোনোমতে তাকে টেনে রুমে নিয়ে একপাশে শুইয়ে দিল মেহের। গায়ে কাঁথা টেনে দিয়ে সে রুদ্রর শিয়রে চুপচাপ বসে রইল। বাইরের আকাশে তখন চাঁদটা মেঘের আড়ালে লুকোচুরি খেলছে।
কখন যে মেহেরের নিজেরও চোখে ঘুম নেমে এল সে বুঝতে পারল না। কিন্তু ভোরের দিকে সে এক অদ্ভুত আর ভয়াবহ স্বপ্ন দেখল। একদল পুলিশ তাকে লোহার হাতকড়া পরাচ্ছে। মেহের চিৎকার করছে, “আমি নির্দোষ! আমি কোনো অন্যায় করিনি….আমার পেটে বাচ্চা, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন!”
ধড়ফড় করে ঘুম ভেঙে গেল মেহেরের। ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। সারা ঘরে রোদ খেলা করছে, কিন্তু রুদ্র পাশে নেই। ওয়াশরুমেও পানির শব্দ নেই। মেহের ফ্রেশ হয়ে নিচে গিয়ে দেখল রেহানা চৌধুরী নাস্তার টেবিলে বসে আছেন। রেহানা চৌধুরী কালকের নিদিতা আর রিনা বেগমের আচরণের জন্য বারবার ক্ষমা চাইলেন।
গল্পে গল্পে হামজা চৌধুরী ডাইনিংয়ে এসে বসলেন। তিনি হাসিমুখে বললেন, “জানো মেহের, তোমার মা..মানে তোমার শ্বশুর আমার কিন্তু আমার আপন চাচাতো বোন ছিলেন। ছোটবেলায় আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। কিন্তু আমার শ্বশুর, অর্থাৎ রেহানার বাবা, এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না।রেহানার বাবার থেকে ওকে ছিনিয়ে নিয়ে আসতে আমাকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছে।” তিনি হো হো করে হেসে উঠলেন।
হামজা চৌধুরী গভীর মমতায় মেহেরের মাথায় হাত রেখে বললেন, “ভালোবাসার জন্য যদি মাঝে মাঝে নিয়ম ভাঙতে হয়, তবে সেটা অপরাধ নয় মা। যখন যা চাইবে, একদম মন থেকে চাইবে। দেখবে বিধাতা ঠিকই মিলিয়ে দেবেন।”
খাওয়া শেষ হলে রেহানা চৌধুরী জানালেন তারা আজকেই ফিরে যাচ্ছেন। মেহেরকে সাথে যাওয়ার অনুরোধ করলেও মেহের মাথা নিচু করে জানাল সে আপাতত এখানেই থাকতে চায়। তার মনটা কু গাইতে শুরু করেছে, যেন কোনো বড় বিপদ তার দরজায় কড়া নাড়ছে।
বিকেল ৫টা। মেহের নিজের রুমে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ তার চোখ গেল ফোনের ওয়ালপেপারের দিকে। ২২শে জুলাই। তারিখটা দেখা মাত্রই মেহেরের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। আজ অন্তুর জন্মদিন!
অন্তু—যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল। মেহের দ্রুত ওজু করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করল। মোনাজাত শেষ করার শক্তিটুকুও যেন তার নেই। সে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু ঝরতে শুরু করল।
“অন্তু… জানো আজ তোমার জন্মদিন। অথচ দেখো তুমি নেই। আজ চারদিকে কেমন শূন্যতা। আমি আজ আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারি না অন্তু…তোমার সেই তাজা রক্ত যখন আমার হাতে লেগেছিল, সেই অনুভূতিটা আজও আমি অনুভব করি। যদি জানতাম আমাকে ভালোবাসার খেসারত তোমাকে জীবন দিয়ে দিতে হবে, তবে কোনোদিন তোমাকে ভালোবাসার কথা বলতাম না।”
মেহেরের কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। সে দুই হাতে মুখ ঢেকে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। কান্নার প্রতিটি শব্দ যেন এক একটা আর্তনাদ হয়ে ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে। তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে সেই কালরাত্রির দৃশ্য, যা সে হাজার চেষ্টা করেও মন থেকে মুছতে পারে না।
মেহের বিড়বিড় করে বলতে লাগল,
“অন্তু, মনে আছে সেই রাতের কথা? তার চোখে তখন রক্তের নেশা। আমি তো ভেবেছিলাম ভাইয়া বড়জোর আমাকে বকবে,মারবে।কিন্তু সে যে পিশাচ হয়ে উঠবে তা স্বপ্নেও ভাবিনি। সে…. সে তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার চোখের সামনে সে তোমাকে পশুর মতো মারল অন্তু! আমার ভাইয়া… যাকে আমি আদর্শ মানতাম, সেই হাত দিয়েই সে তোমার বুকটা ঝাঁঝরা করে দিল।”
মেহেরের শরীর কাঁপছে। সে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
“পাপী, খুনি কিংবা দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিরও মৃত্যুর পর শেষ আশ্রয় হয় মাটির নিচে। তাকে দাফন করা হয়, জানাজা হয়। কিন্তু তোমার ভাগ্যে কি তা জুটেছিল অন্তু? ভাইয়া তো তোমাকে মানুষই মনে করেনি। ওই জনমানবহীন, পরিত্যক্ত জীর্ণ অন্ধকার কোণায় তোমাকে ফেলে রাখা হয়েছিল। যেখানে দিনের আলো পৌঁছাত না, যেখানে নোনা ধরা দেয়ালের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসত…সেখানেই কেন তোমাক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছিল ?”
ভাইয়া কি ওই পরিত্যক্ত নোংরা জায়গাটা থেকে তোমাকে কি তুলে নিয়ে কোনো গোরস্তানে দাফন করা হয়েছিল? না কি আজও তুমি ওই অন্ধকার কুঠুরিতে একা পড়ে আছো? আমি জানতেও পারলাম না তোমার কবরের মাটিটা কোথায়!
তোমার কি জানাজা হয়েছিল অন্তু? কেউ কি তোমার জন্য এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছিল? না কি আমার মতো তোমাকেও সবাই সমাজ আর সম্মানের দোহাই দিয়ে ভুলে গেছে?”
মেহের নিজের পেটের ওপর হাত রাখল। এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় তার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে চাইল—
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২১
“অন্তু, আজ তোমার জন্মদিনে আমি তোমাকে একটা ফুলও দিতে পারছি না। কারণ আমি জানি না তুমি কোথায় শুয়ে আছো। ভাইয়া তোমাকে মেরেছে ঠিকই, কিন্তু সে আসলে আমাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে গেছে। আমি বেঁচে আছি ঠিকই, কিন্তু আমার আত্মাটা সেই রাতেই তোমার সাথে ওই পরিত্যক্ত ঘরে মরে পড়ে আছে। তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো অন্তু? আমাকে ভালোবাসার মাসুল কেন তোমাকে এভাবে দিতে হলো? কেন তুমি কবরের একটু জমিও পেলে না?”
মেহেরের কান্নার শব্দ আস্তে আস্তে ক্লান্তিতে ঝিমিয়ে এল, কিন্তু তার হৃদয়ের হাহাকার যেন আরও ঘনীভূত হলো।
