Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৯

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৯

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৯
মারিয়াম ফুল

আদালতের গুমোট পরিবেশ থেকে যখন মেহেরকে আবারও প্রিজন ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন ঢাকার আকাশে মেঘের ঘনঘটা। জানালার লোহার খাঁচায় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ে ঠিক সেভাবেই ভেঙে যাচ্ছিল, যেভাবে মেহেরের ভেতরের জমানো প্রশ্নগুলো প্রতিনিয়ত ডুকরে মরছে। আড়াই মাস…. জজের সামনে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার শাকিল হোসেন এত বড় একটা মিথ্যা কথা এমন অবিচল আত্মবিশ্বাসের সাথে কীভাবে বললেন?

আদালতের সেই রুদ্ধদ্বার জবানবন্দির পর কেটে গেছে আরও দীর্ঘ দুটি মাস ২৩ দিন। কারাগারের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে চার দেয়ালের মাঝে মেহেরের জীবনের এই দিনগুলো কেটেছে চরম অনিশ্চয়তায়। ওদিকে তুষার শেখ যুক্তরাজ্য থেকে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হয়নি; মহামারীর তৃতীয় ঢেউয়ের আকস্মিক লকডাউনে সমস্ত আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি মাঝপথেই আটকে যান। এর মাঝেই মেহেরের গর্ভাবস্থা এখন সাড়ে ৬ মাসে পা দিয়েছে। তবে মেহেরের শরীরটা এতটাই শীর্ণ আর রোগা-পাতলা যে, প্রথম নজরে তার অবয়ব দেখে হুট করে বোঝার উপায় নেই সে এক অনাগত সন্তানের জননী। শুধু তার শান্ত চাহনিতে আর হাঁটার মন্থর ভঙ্গিতে সামান্য একটু আলতো পরিবর্তন এসেছে।
সেদিন রাত তখন আনুমানিক তিনটা। বাইরে ঝুম বৃষ্টি, আর সেই সাথে কঠোর সান্ধ্য আইনের কারণে পুরো শহর যেন এক নিস্তব্ধ, ভূতুড়ে নগরী। মাঝেমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ সেই স্তব্ধতাকে আরও ভীতিপ্রদ করে তুলছিল। কারাগারের নির্জন সেলটার ভেতর মেহেরের হঠাৎ করেই কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। বাতাসের ভারী গন্ধটা যেন তার শ্বাসনালীতে আটকে যাচ্ছিল। আচমকা তলপেটের ভেতর একটা তীব্র, মোচড়ানো ব্যথা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করল, কিন্তু অবশ শরীরটা সায় দিল না। পুরো শরীর ঘামে ভিজে সিক্ত, আর চোখের সামনে চারপাশটা বনবন করে ঘুরছে।

সে নিজের উদরটি আলতো করে চেপে ধরে অন্ধকারের মাঝেই ডুকরে কেঁদে উঠল, “আল্লাহ… আমার সন্তান। আমার বাচ্চার যেন কিছু না হয়।”
মেহেরের সেই ক্ষীণ গোঙানি আর কান্নার আওয়াজ পেয়ে ডিউটিতে থাকা নারী কারারক্ষী ছুটে এলেন। মেহেরের ফ্যাকাশে মুখ আর অসাড় অবস্থা দেখে তিনি আর কালক্ষেপণ করলেন না। তক্ষুনি কারাকর্তৃপক্ষকে অবগতি করে মাঝরাতেই বিশেষ সুরক্ষায় মেহেরকে কারাগারের নিজস্ব চিকিৎসালয়ে স্থানান্তর করা হলো। সেখানে জীবাণুনাশকের কড়া গন্ধ আর চিকিৎসকদের সুরক্ষাবস্ত্রের খসখসে শব্দে পরিবেশটা আরও বেশি ভারী ঠেকছিল।
ভোর হওয়ার আগেই খবর পেয়ে হামজা চৌধুরী হাসপাতালের কক্ষের সামনে এসে হাজির হলেন। মহামারীর কড়া বিধি-নিষেধের কারণে ভেতরে ঢোকার অনুমতি না থাকলেও নিজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি দায়িত্বরত চিকিৎসককে বাইরে ডেকে আনলেন।

চিকিৎসক মুখ থেকে মাস্কটা সামান্য নামিয়ে নিচু, গম্ভীর স্বরে বললেন, “মিস্টার চৌধুরী, রোগীর শারীরিক অবস্থা কিন্তু মোটেও সন্তোষজনক নয়। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অনাহার আর জেলের ভেতরের প্রতিকূল পরিবেশের কারণে ওঁর রক্তচাপ একদম নিচে নেমে গেছে। এর ওপর উনি অন্তঃসত্ত্বা। এই মুহূর্তে ওনাকে কারাগারের এই রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে রাখা মানে ওনার এবং অনাগত সন্তান, দুজনের জীবনকেই চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। ওঁর এখন প্রপার রেস্ট আর সার্বক্ষণিক পারিবারিক যত্নের প্রয়োজন।”
হামজা চৌধুরী চিকিৎসকের হাত দুটো শক্ত করে ধরে আকুল গলায় বললেন,
“ডাক্তার সাহেব, যেকোনো মূল্যে আমার ছেলের বউকে আর আমার বংশের প্রদীপকে বাঁচান। আমি আদালতে ওনার এই মেডিকেল রিপোর্ট পেশ করার ব্যবস্থা করছি।”

ওদিকে, ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটাপন্ন রূপ নিচ্ছিল। মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউ সারা দেশে এক তাণ্ডব শুরু করেছে। লাশের মিছিলে ভারী হয়ে উঠছে হাসপাতালের মর্গগুলো। সরকার পুরো দেশে কারফিউ আর কড়া অবরুদ্ধতা জারি করেছে। সুপ্রিম কোর্ট থেকে নোটিশ জারি করা হলো এই চরম ভয়াবহতার কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সশরীরে হাজিরা সম্পূর্ণ স্থগিত থাকবে। শুধুমাত্র অতি জরুরি মামলার শুনানি ভার্চুয়ালি নেওয়া হবে।
এই দুর্যোগই যেন মেহেরের জীবনে এক অন্ধকার মেঘের মাঝে রূপালী রেখা হয়ে এলো।
ব্যারিস্টার শাকিল হোসেন মেহেরের সেই আশঙ্কাজনক চিকিৎসাগত প্রতিবেদন এবং দেশের এই চরম পরিস্থিতিকে হাতিয়ার করে মহামান্য আদালতের কাছে একটি বিশেষ ভার্চুয়াল শুনানির আবেদন করলেন।
কম্পিউটারের পর্দায় বিচারক মহোদয় যুক্ত হলেন। ব্যারিস্টার শাকিল অত্যন্ত জোরালো ও ক্ষুরধার গলায় তাঁর যুক্তি পেশ করলেন,

“মাই লর্ড! আমার মক্কেল মেহের চৌধুরী একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী। বর্তমান এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে যেখানে সাধারণ মানুষেরই জীবন বাঁচানো দায়, সেখানে কারাগারের মতো একটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ এবং জনাকীর্ণ জায়গায় ওনাকে রাখা মানে ওনাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। চিকিৎসকের প্রতিবেদন বলছে, সন্তানকে বাঁচাতে হলে ওনাকে অবিলম্বে একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। মহামান্য আদালত, এই নিষ্পাপ বাচ্চার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে সেই দায় কার? তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে ওনাকে জামিন দেওয়া হোক।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী তীব্র আপত্তি জানিয়ে বললেন, “ইউর অনার, উনি একটি হাই-প্রোফাইল হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন। ওনাকে এভাবে মুক্ত করা যায় না।”
বিচারক দুপক্ষের সওয়াল-জবাব শুনলেন, পর্দার ওপারে মেহেরের মেডিকেল রিপোর্টটি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন এবং দেশের সার্বিক মহামারী পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাঁর কলম তুলে নিলেন।
তিনি গম্ভীর কণ্ঠে রায় দিলেন,

“আদালত সার্বিক পরিস্থিতি এবং আসামির শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে ওনাকে সরাসরি জামিন দিচ্ছে না। তবে, মানবিক কারণে এবং অনাগত সন্তানের সুরক্ষার স্বার্থে মেহের চৌধুরীকে আগামী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত ‘হাউস অ্যারেস্ট’ বা গৃহবন্দীত্বের নির্দেশ দেওয়া হলো। তিনি সায়েদ বাড়ি বা অন্য কোথাও যেতে পারবেন না; ওনাকে ওনার শ্বশুরবাড়ি, অর্থাৎ চৌধুরী নিবাস অথবা ওনাদের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্টে গৃহবন্দী থাকতে হবে। সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারায় তিনি থাকবেন এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া সেই বাড়ির সীমানার বাইরে এক পা-ও রাখতে পারবেন না।”
আজ ঠিক ২ মাস ২৩ দিন পর মেহের সেই পরিচিত অ্যাপার্টমেন্টে পা রাখল। গাড়ি থেকে নেমে লিফটে চড়া, চাবি দিয়ে চেনা দরজাটা খোলা—সবকিছু কেমন যেন অচেনা আর নতুন লাগছিল তার কাছে। কড়া বিধি-নিষেধের কারণে আইন অনুযায়ী এই ফ্ল্যাটে ৩ জনের বেশি লোক থাকার অনুমতি নেই।
লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে হামজা চৌধুরী তাঁর স্ত্রী রেহানা চৌধুরীকে নিচু স্বরে বোঝাচ্ছিলেন যে, চৌধুরী বাড়িতে সুলতানা চৌধুরী একা থাকার কারণে তাঁকে মাঝে মাঝে ওখানে যেতে হবে, তিনি সার্বক্ষণিক এখানে থাকতে পারবেন না।

মেহের অ্যাপার্টমেন্টের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাল। ধুলো জমা আসবাবপত্র, এক অদ্ভুত নীরবতা। জানালার কাচে বাইরের ফাঁকা রাস্তার সোডিয়াম বাতির হলুদ আলো এসে পড়েছে। মনের ভেতর জমে থাকা তীব্র কৌতুহল আর এতদিনের অবরুদ্ধ অস্থিরতা চেপে রাখতে না পেরে মেহের একটু অস্বস্তি নিয়ে রেহানা চৌধুরীকে প্রথমবারের মতো জিজ্ঞেস করল,
“মা… রুদ্র কি এসেছে?”
রেহানা চৌধুরী তক্ষুনি নিজের চোখ দুটো নামিয়ে নিলেন। মেহেরের ওপর দিয়ে এত বড় একটা ঝড় গেল, অথচ রুদ্র দেশে নেই—এই সত্যিটা তাকেও প্রতিনিয়ত দগ্ধ করছিল। মায়ের নীরবতা দেখে মেহের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আর কোনো প্রশ্ন করল না। এই অ্যাপার্টমেন্টে আসার পর থেকে মেহের একটা বারের জন্যও রুদ্রর ঘরের দিকে পা বাড়ায়নি।
রাত যখন গভীর হলো, ঘুমানোর জন্য হামজা চৌধুরী এবং রেহানা চৌধুরী মেহেরকে সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে আগেই নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেলেন।

লিভিং রুমে একা দাঁড়িয়ে মেহের তীব্র এক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে লাগল। সে আজ রাতে কোথায় ঘুমাবে? নিজের পুরনো ঘরে একা শুতে তার কেমন যেন ভয় লাগছিল। তাছাড়া, তার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র আর ওষুধ এই মুহূর্তে রুদ্রর ঘরেই রাখা ছিল। অনেক ভেবেচিন্তে সে সিদ্ধান্ত নিল—রুদ্র যেহেতু অ্যাপার্টমেন্টে নেই, তাই আজ রাতের জন্য সে রুদ্রর বড় ঘরটাতেই ঘুমাবে।
মেহের পা টিপে টিপে অন্ধকার ঘরে ঢুকল। ঘরের ভেতর এসির ঠান্ডা বাতাস আর রুদ্রর চেনা পারফিউমের খুব মৃদু একটা সুবাস মিশে আছে। দেয়াল হাতড়ে লাইটের সুইচটা অন করতেই মেহেরের পুরো শরীর যেন এক নিমেষে জমে পাথর হয়ে গেল….

বিছানার ওপর চাদর মুড়ি দিয়ে আরামে ঘুমিয়ে আছে এক দীর্ঘ অবয়ব। মেহের চোখ বড় বড় করে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই চওড়া কাঁধ, এই সুঠাম শরীর… এটা তো অন্য কেউ নয়, তবে কি এই মানুষটা অবশেষে দেশে ফিরে এসেছে?
মেহের নিজের অজান্তেই পা বাড়িয়ে ঘুমন্ত রুদ্রর দিকে এগিয়ে গেল। সে নিজেই জানে না কতক্ষণ যাবত সে মন্ত্রমুগ্ধের মতো রুদ্রর সেই শান্ত, ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ মেহেরের ঘোর কাটল। সে ভাবল এখান থেকে চলে যাওয়াই শ্রেয়। কিন্তু সে যেমনই পেছন ফিরে এক পা বাড়াল, ঠিক তখনই আচমকা, এক তীব্র হেঁচকা টানে কেউ তার কবজিটা শক্ত করে ধরে ফেলল…
রুদ্রর আঙুলের চাপটা অস্বাভাবিক উষ্ণ ছিল, অথচ মেহেরের হাতটা তখন ভয়ে কাঁপছে। মেহের রুদ্রর দিকে না ফিরেই কাঁপানো গলায় বলল,

“ছাড়ুন!”
রুদ্র এক লাফে বিছানা থেকে উঠে বসল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চেনা বাঁকা হাসি, চোখে এক গভীর রহস্য। সে মেহেরের হাতটা না ছেড়েই স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে উঠল, “ওয়েলকাম ব্যাক হানি… গুট টু সি ইউ। দুই মাস ২৩ দিন পরে বাসায় ফিরেই সোজা স্বামীর রুমে? বাহ, উন্নতি তো খারাপ না ”
তা রাত-বিরাতে চোরের মতো নিজের বরের ঘরে এসে এমন মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে কী দেখা হচ্ছিল, শুনি? রূপের জাদু? ফ্রিতে হ্যান্ডসাম বর দেখার অফার চলছে ?”
মেহেরের কপাল কুঁচকে গেল। এই চরম সংকটের মাঝেও মানুষটার মুখে এমন ফাজলামি মার্কা কথা শুনে তার রাগ উঠে গেল। সে হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
“আপনার কী মনে হয় বলুন তো? আপনার কি মনে হয় এটা কোনো নাটক, যাত্রা কিংবা পালা চলছে? আই অ্যাম প্রেগন্যান্ট, রুদ্র।”

মেহেরের মুখ থেকে এই কথাটি শোনা মাত্রই রুদ্র সে তড়িঘড়ি করে মেহেরকে আলতো করে ধরে বিছানায় বসাল, ওহ সরি আমি তো ভুলে গেছি । কিন্তু নিউজে দেখেছি… ওয়েট ওয়েট মিসেস চৌধুরী একদম স্ট্যাচু! এখন থেকে বেশি নড়াচড়া একদম নিষিদ্ধ।”
বলেই রুদ্র এক ছুটে ডাইনিং রুমের দিকে চলে গেল এবং ফলের ঝুড়ি আর এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে রুমে ঢুকল। মেহেরের সামনে এসে দুধের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে মেহেরকে জোর করে খাওয়াতে লাগল,
“বেবি, হ্যাভ ইট… লক্ষ্মী মেয়ের মতো চটপট গিলে নাও তো।”
মেহের প্রচণ্ড রেগে হাত দিয়ে দুধের গ্লাসটা সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “আপনী… আপনি একটা…”
রুদ্র গ্লাসটা একপাশে রেখে বিছানায় আরাম করে বসল। নিজের চুলে হাত বুলিয়ে স্বভাবসুলভ মজার ভঙ্গিতে, বেশ খুশি খুশি মুখে বলল,

“হুম হুম বলো, আমি কী? বরের প্রশংসা করার জন্য জেলের ভেতর আলাদা কোনো ডিকশনারি মুখস্থ করেছ নাকি? আর তুমি কি জানো তোমার এই বোকামির জন্য আজ টিভির হেডলাইনে কী এসেছে? ‘সংসদ সদস্যের পুত্রবধূ প্রেগন্যান্ট!’
বাহ রে জামানা বাহ ! মানুষ বাজারে নুডলসের সাথে ফ্রি মগ পায়, জগ পায়, আর আমি কোনো খাটনি ছাড়াই, একদম ফ্রিতে আস্ত একটা বাচ্চার বাপ হয়ে যাচ্ছি। তাও আবার অন্যের প্রডাক্ট…
ওয়াও রুদ্র, ওয়াও! অফার তো একেই বলে! এই খুশিতে তো আমার পুরো মহল্লায় মিষ্টি বিলানো উচিত। আমার এই লাইফ ট্র্যাজেডি নিয়ে তো আসলে হলিউডে ক্রিস্টোফার নোলানের আস্ত একটা সাইন্স-ফিকশন সিনেমা বানানো দরকার।”
মেহের রুদ্রর এই ফালতু রসিকতায় কান দিল না। সে রুদ্রর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “ আপনার কি মনে হয়… আমি… আমি ওই খুনটা করেছি?”
রুদ্র এবার আর মেহেরের দিকে তাকাল না, কোনো কথাও বলল না। সে জানালার বাইরের নিস্তব্ধ শহরের দিকে তাকিয়ে স্রেফ নীরব হয়ে রইল।
মেহের জোরাজুরি করে, রুদ্রর বাহু চেপে ধরে বলল,

“বলুন না ক্যাপ্টেন সাহেব ? চুপ করে আছেন কেন? কথা বলুন…”
রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু নিচু স্বরে বলল, “তুমি করলে একটা প্রবলেম। না করলে আরও বড় প্রবলেম। তবে যে-ই করুক, আমার ঘুমানোর টাইমিংটা একদম জঘন্যভাবে নষ্ট করেছে, এটাই আসল প্রবলেম।”
“তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আমিই খুনী?” মেহেরের চোখ দিয়ে ক্ষোভের জল বেরিয়ে এলো,
“তাহলে খুনীর জন্য ব্যাকস্টেজ থেকে এত কিছু করলেন কেন? ওই মেডিকেল রিপোর্ট আপনি চেঞ্জ করেছেন, তাই না? বলুন”
রুদ্র মেহেরের দিকে এক চুলও না নড়ে সোজা তাকিয়ে রইল। তারপর বাম ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

“হ্যাঁ, করেছি। কারণ তুমি জেলের ভেতর পচে মরে গেলে আমি তোমার নামের ওই ৬৫ পার্সেন্ট সম্পত্তির মালিক কীভাবে হবো, শুনি? আমি তো অলরেডি মনে মনে আইফোন আর নতুন গাড়ি কেনার বাজেট করে ফেলেছি। এখন তুমি মরে গেলে আমার আইফোনের কী হবে?”
মেহের কয়েক সেকেন্ড স্তব্ধ হয়ে রইল। এই বিপদের মুখে দাঁড়িয়েও এই মানুষটা সম্পত্তির হিসাব কষছে? সে বিছানা থেকে এক একটা করে বালিশ তুলে প্রচণ্ড রাগে রুদ্রর গায়ের ওপর ছুড়ে মারতে লাগল।
রুদ্র হাসতে হাসতে চিল মোডে বালিশগুলো আটকে বলে উঠল,
“এই যে মহিলা, এই….খবরদার …. যে মহিলা আস্ত একটা ড্যাশিং জামাইকে বালিশ দিয়ে পিটিয়ে আলুর দম বানাতে পারে, সে দুনিয়ায় অনেক কিছুই করতে পারে। ডোন্ট আন্ডারএস্টিমেট ইয়োরসেলফ!
জাস্ট ভাবো, ফেসবুকে আমার লাখ লাখ ফ্যান, আর তুমি আমাকেই কিনা কুশন ছুড়ে মারছ? আমার ফ্যানরা দেখলে তোমার নামে কেস করে দেবে ”

মেহের প্রচণ্ড রেগে বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে চাইল। কিন্তু রুদ্র এক লাফে গিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে তার পথ আটকাল। তার ঠোঁটের কোণের শয়তানি হাসিটা এবার কিছুটা ম্লান হলো, কণ্ঠস্বর কিছুটা নরম, কিন্তু ভীষণ দৃঢ় শোনাল, “যেও না। আজকের রাতটা এখানেই ঘুমাও।”
“কিন্তু আপনি…?” মেহের চোখ রাঙাল।
রুদ্র দুই হাত বুকের ওপর বেঁধে কপাল কুঁচকে অবিকল সিরিয়ালের খলনায়িকা শাশুড়িদের মতো ঘাড় বেঁকিয়ে টোন নকল করে বলল,

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৮

“না, এটা হতে পারে না! এটা হতে পারে না! দুমতানা… না, দুমতানা… না! মাঝরাতে ডায়ালগ দিয়ে ব্যাগ গোছানোর ন্যাকামি করছ? চুপচাপ বিছানায় গিয়ে শোও। আমি ওই পাশের রুমে গিয়ে ঘুমাচ্ছি, যাও! আর কালকে সকাল হতেই লিভিং রুম থেকে আস্ত সোফাটা ক্রেন দিয়ে টেনে হিড়হিড় করে এই ঘরে নিয়ে আসব, এবার খুশি?”
মেহের রুদ্রর এই অদ্ভুত রূপটার দিকে তাকিয়ে আর কথা বাড়াল না। রাগ সামলাতে গিয়েও তার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে আলতো করে মাথা নাড়ল।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩০