ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩০
মারিয়াম ফুল
মেহের নিজের মুখের চিলতে হাসিটা চট করে লুকিয়ে একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করল। রুদ্রর দিকে তাকিয়ে এক জোড়া অনুসন্ধিৎসু চোখে চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, আপনি কি খুব সিরিয়াল দেখেন নাকি?”
মেহেরের গম্ভীর হওয়ার ভান করা মুখটা দেখে রুদ্র নিজের হাতটা তুলে নিজের মাথার চুলগুলো একটু এলোমেলো করে দিল । পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লে ওর ঠোঁটের কোণে অবিন্যস্ত একটা হাসি ফুটে উঠলো । ও বলতে শুরু করল—
“আপনার দাদী শাশুড়ি এসব ড্রামা দেখতেন….. ছোটবেলায় ভাইয়া আর আমি ছিলাম ডাব্লিউডাব্লিউই (WWE)-এর ফ্যান । জন সিনা আর আন্ডারটেকারের ফাইট দেখার জন্য আমরা দুই ভাই সব সময় এক্সাইটেড থাকতাম, টিভির সামনে বসার জন্য অস্থির হয়ে থাকতাম। কিন্তু মুশকিল ছিল রিমোটটা থাকত দাদার দখলে।
ঠিক যে সময়টায় আমাদের ম্যাচ শুরু হতো, তখনই দাদা আগেভাগে সিরিয়াল দেখার জন্য হল রুমে বসে থাকতো । তো, রিমোটের দখল নেওয়ার জন্য ভাইয়া আর আমি দাদার আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম। দাদুর পিঠ চুলকে দিচ্ছি, কখনো পায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিচ্ছি—উদ্দেশ্য একটাই, কখন দাদু একটু অসাবধান হবে আর আমরা রিমোটটা ছোঁ মেরে নেব……
কিন্তু দাদাও কম ছিলেন না , রিমোটটা আঁচলের নিচে এমনভাবে লুকিয়ে রাখতেন যে উদ্ধারের কোনো উপায় থাকত না। ফল যা হওয়ার তাই হতো; রিমোট তো পেতামই না, উল্টো না চাইতেও দাদুর পাশে বসে ওইসব সিরিয়াল দেখা লাগতো।
রুদ্ররের কথা শুনে মেহের নিজের অবদমিত যন্ত্রণার মাঝেও হালকা করে হেসে ফেলল। তার ঠোঁটের কোণে সেই চিলতে হাসিটুকু দেখা যেতেই রুদ্র হঠাৎ করেই নিজের স্বভাবসুলভ হাসিমুখটা কেমন যেন শক্ত করে ফেলল। চোখের সেই স্নিগ্ধ ভাবটা এক পলকে মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক অদ্ভুত কাঠিন্য আর দূরত্ব নেমে এল, রুদ্র আর কথা বাড়ালে না।
অত্যন্ত আনমনে, কিছুটা যেন এক অতৃপ্তি আর ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় রুদ্রর পায়ের শব্দে এক ধরনের ভারী ভাব ছিল, আর সে গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের ভেতরেই এক অদ্ভুত অস্থিরতা টের পাচ্ছে সে। হচ্ছেটা কী তার সাথে? সে তো কখনো এমন ছিল না। মেহেরের সামনে আসলেই তার আচরণ এমন বাচ্চার মতো হয়ে যাচ্ছে কেন দিন দিন?
ডাইনিং রুমে এসে ফ্রিজটা এক ঝটকায় খুলল রুদ্র। ভেতর থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতলটা বের করল। গ্লাস নেওয়ারও কোনো প্রয়োজন মনে করল না,বোতলটা সরাসরি মুখে তুলে একনাগাড়ে কয়েক ঢোক গিলে নিল। শীতল পানির তীব্রতা তার শ্বাসনালী বেয়ে নেমে যেতেই বুকের ভেতরের জ্বলনটা কিছুটা শান্ত হলো। সে চায় না তার বাবা যেন এসে দেখুক তারা দুজন সম্পূর্ণ আলাদা দুটো ঘরে ঘুমাচ্ছে ।
রুদ্রর কাছে নিজের বাবা ভীষণ প্রিয়। তার এই আটাশ বছরের ছন্নছাড়া, বেপরোয়া জীবনে সে অগুনতি ভুল করেছে; কিন্তু প্রতিবার তার বাবা এক বিশাল বটবৃক্ষের মতো ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে সেই ভুলগুলো শুধরে দিয়েছেন। এমনকি এমন এমন অনেক কঠিন সত্যকে তিনি নিজের বুকে পাথর চেপে গোপন করে রেখেছেন, যা দুনিয়ার সামনে তো দূর, নিজের ঘরের মানুষের সামনেও কখনো আসতে দেননি।
রুদ্র বাইরে যতই দায়িত্বজ্ঞানহীনতা দেখাক না কেন নিজের পরিবারের জন্য, সে সবকিছু করতে পারে।
ওদিকে রুদ্র চলে যাওয়ার পর মেহের বিছানায় স্তব্ধ হয়ে একা বসে রইল। চারপাশের হঠাৎ নেমে আসা নিস্তব্ধতা তাকে এক ঝটকায় টেনে নিয়ে গেল গত আড়াই মাসের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে। ডিভিশন সেলের সেই স্যাঁতসেঁতে, অন্ধকার ঘরে কাটানো প্রতিটা মুহূর্ত তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। সেখানে এক ঢোক পরিষ্কার পানি খাওয়ার জন্য কী তীব্র হাহাকারটাই না করতে হতো তাকে। অযত্ন আর মানসিক অত্যাচারে শরীরটা যেন আড়ষ্ট হয়ে গেছে, হাত-পাগুলো কেমন ঝিম ধরে অবশ হয়ে আসে একটুতেই।
নিজের দুই চোখের পাতা হাত দিয়ে মুছতেই মেহেরের মনের মণিকোঠায় ভেসে উঠল ঠিক একটু আগে দেখা রুদ্রর সেই হাসি-মাখা মুখটা। কেন জানি রুদ্রর ওই অদ্ভুত আচরণ, এই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে তার দমবন্ধ বুকে সামান্য অক্সিজেনের মতো কাজ করল। মেহের তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নামল। কিন্তু বিছানায় পা রাখতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই কেমন যেন মুচড়ে উঠল। তীব্র এক অস্বস্তি আর বমিভাব দলা পাকিয়ে এল তার গলার কাছে।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দ্রুত পায়ে বাথরুমে ঢুকে বেসিনের ওপর ঝুঁকে পড়ল। তীব্র পেট মোচড়ানো বমি হতে লাগল তার। পিত্তথলি অব্দি যেন উথলে উঠছিল শূন্য পেটের মোচড়ানিতে। বমি শেষে কাঁপতে কাঁপতে বেসিনের কলটা ছেড়ে মুখে-চোখে কয়েকবার পানির ঝাপটা মারল সে। পানির ঠাণ্ডা স্পর্শে শরীরটা চাঙ্গা হওয়ার বদলে যেন আরও বেশি অবশ আর দুর্বল ঠেকছিল।
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত চোখে মেহের যখন সামনের ঝাপসা আয়নাটার দিকে তাকাল, তখন বুকের ভেতরের হৃদস্পন্দনটা যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। আয়নার ঝাপসা কাচে ওটা কার অবয়ব? আবছা, ফ্যাকাশে অথচ এক তীব্র চেনা মুখ… অন্তু!
“অন্তু… অন্তু এসেছে…?” মেহেরের অবচেতন মন চিৎকার করে উঠল।
সে পাগলের মতো হাত বাড়িয়ে আয়নার সেই অবয়বটাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করল। কিন্তু ছায়াটা যেন হাত থেকে হড়কে গেল। মেহের ফিসফিস করে কেঁদে উঠল,
“অন্তু, যেও না! দোহাই তোমার, হাতটা ধরো একবার…” সে বারবার শূন্যে হাত বাড়াতে লাগল, কিন্তু প্রতিবারই অন্তু তার হাতের নাগাল থেকে ছুটে যাচ্ছিল। তীব্র মানসিক অবসাদ, চরম একাকীত্ব আর এই দীর্ঘদিনের ট্রমা মেহেরকে এক গভীর সাইকোটিক ডিপ্রেশনের অতলে ঠেলে দিচ্ছিল, যেখানে বাস্তব আর কল্পনার দেয়ালটা মুছে যায়।
উন্মাত্তের মতো পিছু হটতে গিয়ে বাথরুমের দেয়ালের সাথে সজোরে ধাক্কা খেল মেহের। সেই আকস্মিক ধাক্কায় তার কনুইয়ের অংশটা গিয়ে লাগল শাওয়ারের নব-এ। সাথে সাথে ওপর থেকে ঝমঝম করে ঠাণ্ডা পানির ধারা আছড়ে পড়ল তার পুরো শরীরে। মেহের সেই পানির নিচে দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসে পড়ল। তার পরনের কাপড়, চুল সব মুহূর্তের মধ্যে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে গেল।
পানির শব্দের মাঝেই মেহের আচমকা ডুকরে কেঁদে উঠল, তার চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। সে দেখতে পেল অন্তুর হাসছে …মেহের দেয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে চিৎকার করে বলল,
“অন্তু! তুমি হাসছ কেন? হাসছ কেন তুমি এভাবে? কই, আমি তো সুখে নেই! আমি তো এভাবে হাসতে পারি না… আমার এই সর্বনাশে, আমার এই কষ্টে অন্তু কেন হাসবে?”
মেহেরের ভেতরে তীব্র এক রাগ আর ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠল অন্তুর উপর । সে নিজের ভিজে হাত দুটো দিয়ে কান চেপে ধরে বিড়বিড় করতে লাগল,
“এই, তুমি হাসছ কেন, হ্যাঁ? দেখো… আমি কিন্তু হাসছি না…একদম হাসবে না… দেখছ না আমি শাস্তি পাচ্ছি? তোমাকে ভালোবাসার শাস্তি… জানো, তোমার সাথে একটা ছোট্ট সংসার করার বড্ড লোভ হয়েছিল আমার। দেখো, আজ সেই লোভের ঋণ শোধ করছি। লোকে বলে লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। দেখো, আমারও তো মৃত্যু হয়েছে… অনেক আগে, যেদিন তোমার রক্তে ভেজা ওই শার্টটা ছুঁয়েছিলাম, অথচ কিছু করতে পারিনি… আমি তো সেদিনই মরে গেছি।”
হঠাৎ করেই যেন মাথার ভেতরের তীব্র ঝড়ের বেগটা কমে এল। মেহের ধক করে এক ধাক্কায় হ্যালুসিনেশন থেকে বাস্তবে ফিরে এল। শাওয়ারের ঠাণ্ডা পানি তখনো তার মাথায় অবিরাম পড়ছে। সে অদ্ভুত এক শূন্য, নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে নিজের ভিজে শরীরের দিকে তাকাল। শরীরটা কাঁপছে থরথর করে। কী হচ্ছে এসব তার সাথে? কেন সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে?
মেহের কোনোমতে নিজেকে টেনে তুলল। ভেজা শরীর আর লেপ্টে থাকা কাপড় নিয়ে কোনো রকমে ঘরে ফিরে এল সে। আলমারি থেকে একটা কাপড় বের করে কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে নিল। মাথাটা বড্ড ভারী লাগছে, চোখ দুটো বুজে আসছে এক তীব্র জ্বরের ঘোরে। সে আর পারল না, বিছানায় ধপ করে পড়ে মাথাটা এলিয়ে দিল এলানো বালিশে।
পরদিন যখন মেহেরের ঘুম ভাঙল, তখন জানালার ফাঁক গলে দিনের কড়া আলো ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে। ঘড়িতে তখন সকাল সাড়ে এগারোটা। সাধারণত মেহেরের এত দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নেই, কিন্তু কাল রাতের সেই মানসিক ধকলে সে অবশ হয়ে পড়েছিল।
বিছানা থেকে উঠে মেহের আলতো পায়ে গিয়ে ঘরের জানালাটা খুলে দিল। বাইরের রোদের আলোয় চোখটা একটু কুঁচকে আসতেই তার নজর পড়ল ঘরের এক কোণে। সেখানে একটা সোফা রাখা…
মেহের স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। তার মানে রুদ্র সত্যি সত্যি লিভিং রুম থেকে এই ভারী সোফাটা টেনে এই ঘরে এনে রেখে গেছে? মানুষটা মুখে যা বলে, তা করে —তা সে যতই অদ্ভুত কাজ হোক না কেন। মেহেরের ঠোঁটের কোণে না চাইতেও মলিন হাসি ফুটে উঠল।
সে ঘর থেকে বের হয়ে ডাইনিং স্পেসের দিকে আসতেই দেখল রেহানা চৌধুরী ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। ঠিক তখনই অ্যাপার্টমেন্টের মূল দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল রুদ্র। তার পরনে জিম করার ট্র্যাকস্যুট, কপালে আর ঘাড়ে ঘামের বিন্দু চিকচিক করছে। তাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল সে মাত্রই বাইরে থেকে ওয়ার্কআউট শেষ করে ফিরল।
রেহানা চৌধুরী ছেলের দিকে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে তীব্র বিস্ময় মেশানো গলায় বললেন, “তাতিন, তুমি কখন আসলে?”
রুদ্র ডাইনিং টেবিলের এক কোণে রাখা তার প্রোটিন শেকের বোতলটা টেনে নিয়ে অত্যন্ত ধীরেসুস্থে পাউডার মেশাতে লাগল। মুখে তার বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো বা উত্তেজনার ছাপ নেই। সে যেন পাশের ঘর থেকে হেঁটে এসেছে —
এমন একটা নির্বিকার ভঙ্গিতে শেকারটা নাড়াতে নাড়াতে বলল, “কালকে।”
রেহানা চৌধুরী হাতের বাটিটা টেবিলে নামিয়ে রেখে চোখজোড়া বড় বড় করলেন,
“কালকে কখন? যখন আমরা বাইরে ছিলাম , তখন?”
“হুম।”
“মানে কী! তুমি ইউএসএ থেকে এভাবে এলে, কাউকে জানানোর প্রয়োজনবোধ মনে করল না?” রেহানা চৌধুরীর কণ্ঠ দিয়ে যেন কথা সরছিল না। ফ্ল্যাটটাতে মেহেরকে নিয়ে আসার পর তিনি ভাবতেও পারেননি রুদ্র ইতিমধ্যেই এখানে এসে হাজির হয়েছে…
তিনি আবার বলতে লাগলেন…
“ আমেরিকার থেকে দেশে ছেলে এত মাস পর ফিরল, অথচ কেউ কিছু জানলামই না।”
রুদ্র প্রোটিন শেকারটা এবার ডান হাতের আঙুলের ডগায় নিয়ে স্পিনারের মতো হালকা একটা চক্কর খাওয়াল।
“মা, তুমি আমাকে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলে আমি কোথায়? করোনি। তুমি শুধু জিজ্ঞেস করেছিলে আমি বের হয়েছি কি না। আমি তো এয়ারপোর্ট থেকেই বের হচ্ছিলাম, তাই বললাম বের হয়েছি। তুমি যদি জিজ্ঞেস করতে আমি কোন দেশে আছি, আমি তো বলতাম বাংলাদেশেই আছি আর নিজের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে যাচ্ছি।”
ছেলের এমন অদ্ভুত যুক্তি শুনে রেহানা চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে রইলেন।
রুদ্র নিজের মতো করে শেকটাকে জোরে জোরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে লাগলো ।
রেহানা চৌধুরী কী বলবেন ছেলের যুক্তির জবাবে, তিনি খুঁজে পেলেন না। রেহানা চৌধুরী ছেলের দিকে একবার তাকালেন, তারপর…সামনের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলেন মেহেরকে।” ছেলের এমন অতিমাত্রায় উদাসীনতা আর অদ্ভুত তর্কে রেহানা চৌধুরী মনে মনে বললেন, ‘এই ছেলের সাথে কথা বলাই ভুল। পুরো দুনিয়া উল্টে গেলেও ও ওনার সোজা কথার কোনোদিন সোজা উত্তর দেবে না। ”
তিনি আর রুদ্রর দিকে না তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ডাইনিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেরকে দেখে নিজের গলার স্বরটা নরম করে বললেন, “মেহের, এসো মা, এখানে বসো।”
মেহের কিছুটা অস্বস্তি আর অপরাধবোধ নিয়ে এগিয়ে এসে বলল, “মা, সরি। আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেল।”
রেহানা চৌধুরী তক্ষুনি মেহেরের কাছে এগিয়ে এলেন। পরম মমতায় তার থুতনিতে হাত রেখে মুখটা একটু উঁচু করে বললেন,
“ওমা! একি কথা! সরি কেন বলবে? আমি কি তোমাকে এই বাড়ির ছেলের বউয়ের মতো দেখি নাকি? তুমি তো আমার নিজের মেয়ের মতো। দেখো তো, আড়াই মাসে কী অবস্থা হয়েছে তোমার শরীরটার ”
তিনি অত্যন্ত যত্নে মেহেরের প্লেটে খবর তুলে দিলেন। মেহের চামচটা হাতে নিয়ে খাবারের দিকে তাকিয়ে রইল। তার হঠাৎ মনে হলো, কত যুগ পর কেউ তাকে এভাবে ভালোবেসে, আগলে রেখে যত্ন করে খেতে দিচ্ছে! জেলের সেই থমথমে দিনগুলোতে এই মাতৃস্নেহটুকুর জন্য তার আত্মা কতটা হাহাকার করেছে, তা শুধু ওই চার দেয়ালই জানে।
ঠিক তখনই রুদ্ররের ফোনে একটা বিজনেস কল আসায় সে ফোনটা কানে চেপে বারান্দার দিকে চলে গেল। রেহানা চৌধুরী মেহেরের পাশে বসে তার মাথায় হাত রাখতেই হঠাৎ থমকে গেলেন। মেহেরের কপাল গরম ঠেকল তার কাছে । খুব বেশি চড়া না হলেও, একটা হালকা স্যাঁতসেঁতে জ্বর মেহেরের শরীরকে গ্রাস করে আছে।
তিনি চিন্তিত গলায় বলে উঠলেন,
“মেহের…তোমার শরীরটা এমন গরম কেন মা? জ্বর উঠেছে নাকি?”
রুদ্র তখন বারান্দায় ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত, হয়তো সে শুনতে পায়নি হয়েতো। রেহানা চৌধুরী ব্যস্ত হয়ে বললেন, “দাঁড়াও, আমি এখনই ডাক্তারকে একটা কল দিচ্ছি।”
মেহের চট করে রেহানা চৌধুরীর হাতটা চেপে ধরে মৃদু স্বরে আটকাল, “লাগবে না মা। এমনিতেই সেরে যাবে। তেমন কিছু হয়নি, সামান্য একটু ।”
কিন্তু রেহানা চৌধুরী শুনলেন না। তিনি মেহেরের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে জেদ ধরে নিজের ফোনটা বের করে পারিবারিক ডাক্তারকে ডায়াল করতে লাগলেন। মেহের আর আপত্তি করল না। সে শান্ত মুখে খাওয়া শেষ করে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মা… বাবাকে তো দেখছি না। উনি কোথায়?”
রেহানা চৌধুরী ফোনটা কানের কাছে ধরে মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো হেসে বললেন, “উনি খুব সকাল সকাল চৌধুরী বাড়িতে গেছেন তোমার দাদিকে দেখতে। বৃদ্ধ মানুষ, ওদিকে করোনার পরিস্থিতিও খারাপ। আমিই ওনাকে জোর করে পাঠালাম। বললাম, মেহেরকে তো এই অবস্থায় একা রেখে আমি যেতে পারব না, আপনিই একাই ঘুরে আসুন।”
মেহের চট করে রেহানা চৌধুরীর হাতটা চেপে ধরে মৃদু স্বরে আটকাল, “লাগবে না মা। এমনিতেই সেরে যাবে। তেমন কিছু হয়নি, সামান্য একটু ।”
কিন্তু রেহানা চৌধুরী শুনলেন না। তিনি মেহেরের ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে জেদ ধরে নিজের ফোনটা বের করে পারিবারিক ডাক্তারকে ডায়াল করতে লাগলেন। মেহের আর আপত্তি করল না। সে শান্ত মুখে খাওয়া শেষ করে চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “মা… বাবাকে তো দেখছি না। উনি কোথায়?”
রেহানা চৌধুরী ফোনটা কানের কাছে ধরে মেহেরের মাথায় হাত বুলিয়ে আলতো হেসে বললেন, “উনি খুব সকাল সকাল চৌধুরী বাড়িতে গেছেন তোমার দাদিকে দেখতে। বৃদ্ধ মানুষ, ওদিকে করোনার পরিস্থিতিও খারাপ। আমিই ওনাকে জোর করে পাঠালাম। বললাম, মেহেরকে তো এই অবস্থায় একা রেখে আমি যেতে পারব না, আপনিই একাই ঘুরে আসুন।”
রেহানা চৌধুরীর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা শুনে মেহেরের চোখের কোণটা ভিজে উঠল। সে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। চেয়ার থেকে উঠে রেহানা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরল। তার কাঁধে মাথা রেখে রুদ্ধ গলায় বলল, “মা… আমার জন্য আপনারা এত কষ্ট করছেন। আমি সারাজীবন আপনাদের এই ঋণের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকব।”
রেহানা চৌধুরী মেহেরের পিঠে হাত বুলিয়ে পরম মমতায় বললেন, “দূর বোকা মেয়ে! নিজের মায়ের সাথে কেউ এমন করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নাকি? চুপচাপ গিয়ে বিশ্রাম নাও। আর বিকেলে কী খেতে ইচ্ছে করে মাকে বলো, আমি রেঁধে দেব।”
মেহের মৃদু হেসে বলল, “আপনার যা ইচ্ছা রাঁধুন মা, আমার আলাদা কোনো ইচ্ছে নেই।”
বিকেলের দিকে….
লকডাউনের কারণে রুদ্র সারাদিন অ্যাপার্টমেন্টেই আটকে রইল, বাইরে বের হওয়ার উপায় ছিল না। ফ্ল্যাটের নিচে চব্বিশ ঘণ্টা পুলিশ পাহারা দিচ্ছে, আর কিছুক্ষণ পর পরই ওপরের ফ্ল্যাটে এসে মেহেরের খোঁজ নিয়ে যাচ্ছে তারা। বসে বসে অলস সময় কাটানো রুদ্রর স্বভাবের বাইরে। একজন কমার্শিয়াল পাইলট হিসেবে ককপিটের চড়া প্রেশার আর সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যে অ্যাড্রেনালিন রাশ তার রক্তে মিশে আছে, এই লকডাউনের চার দেয়ালে তা যেন দমবন্ধ হয়ে আসছিল তার ।
রুদ্র তার বাইকের চাবিটা তুলে নিয়ে লকডাউনের নিস্তব্ধ ঢাকা চিরে বেরিয়ে পড়ল। গুলশানের একটা অভিজাত, মেম্বারশিপ-অনলি প্রাইভেট ফিটনেস অ্যান্ড কমব্যাট ক্লাবের সামনে এসে থামল সে। সাধারণ মানুষের জন্য লকডাউনে এটি সম্পূর্ণ বন্ধ থাকলেও, রুদ্র চৌধুরীর মতো এলিট ক্লাসের মেম্বারদের জন্য এর পেছনের বিশেষ গেটটা সবসময়ই খোলা থাকে।
এখানের ইন্টেরিয়রটা সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের…উন্নত প্রযুক্তির রিং, দামি ম্যাট আর চারপাশের স্পিকারে বাজছে লো-ভলিউমের একটা চড়া বেইজের মেটাল মিউজিক।
রুদ্র লকার রুমে গিয়ে শার্টটা খুলে ট্র্যাকিং ট্রাউজারটা পরে নিল। একজন পাইলটের যেমন সুঠাম ও ফিট বডি থাকা বাধ্যতামূলক, রুদ্রর শরীরটা ঠিক তেমনই নিখুঁত চওড়া কাঁধ আর পেশিবহুল গ্রিপ। দুই হাতে প্রফেশনাল লেদার র্যাপার পেঁচিয়ে সে যখন মেইন কমব্যাট জোনে এসে দাঁড়াল, তখন রিংয়ের ভেতর ওভিসি ও র্যাম্প মডেলিংয়ের পরিচিত মুখ জিশান গ্লাভস পরে ওয়ার্মআপ করছিল।
জিশান রুদ্রকে দেখে আইব্রো নাচিয়ে হালকা হাসল, “রুদ্র ? ইউএসএ থেকে ফিরেই রিংয়ে? ফ্লাইটের ক্লান্তি মগজ থেকে নামেনি এখনো ?”
রুদ্র কোনো কথা না বলে কেবল বুড়ো আঙুল দিয়ে নিজের মাউথগার্ডটা মুখের ভেতর সেট করে নিল। তার চোখের তীক্ষ্ণ চিল-দৃষ্টি জিশানের ওপর স্থির হলো। রিংয়ের দড়ি গলে সে ভেতরে ঢুকতেই ট্রেইনার এসে বেল বাজাল।
টুং… টুং!
জিশান শুরুতেই বেশ টেকনিক্যাল চাল চালল। একজন ভালো বক্সারের মতোই সে নিখুঁত ফুঁটওয়ার্ক দিয়ে এগিয়ে এসে রুদ্রর গার্ড ভেঙে একটা লেফট-জ্যাব ছুড়ল। কিন্তু রুদ্রর রিফ্লেক্স সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত—সে সেকেন্ডের ভগ্নাংশে মাথাটা সামান্য ঘুরিয়ে জিশানের বুকে পাঞ্চ করল।
জিশান দমে না গিয়ে সাথে সাথে একটা রাইট-হুক চালাল। এবার রুদ্রর ডিফেন্স ফাঁকা থাকায় পাঞ্চটা সরাসরি এসে লাগল তার চোয়ালের ঠিক নিচে।
আঘাতের তীব্রতায় রুদ্রর মাথাটা একটু ঝিলিক দিয়ে উঠল, ঠোঁটের কোণটা সামান্য কেটে রক্ত জমাট বাঁধল। জিশান একটু ডাঁট দেখিয়ে হালকা হাসল।
কিন্তু ওই এক ফোঁটা রক্তই যেন রুদ্রর ভেতরের ঘুমন্ত ঈগলটাকে জাগিয়ে তুলল। রুদ্রর ঠোঁটের কোণে এক ভয়ংকর, অত্যন্ত কুল কিন্তু শীতল হাসি ফুটে উঠল। সে গ্লাভসের পিঠ দিয়ে ঠোঁটের রক্তটুকু আলতো করে মুছে নিয়ে এক সেকেন্ডে নিজের পজিশন বদলে ফেলল।
এবার রুদ্রর কাউন্টার অ্যাটাকের পালা। জিশান কিছু বুঝে ওঠার আগেই রুদ্র বিদ্যুৎ গতিতে ওর রেঞ্জ বাউন্ডারির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ধুপ! ধুপ!
রুদ্রর প্রথম সলিড কম্বিনেশন পাঞ্চটা গিয়ে লাগল জিশানের পাঁজরে। জিশান ব্যথায় নিজেকে সামলানোর আগেই রুদ্র একনাগাড়ে বাঁ-হাত দিয়ে ওর পেটে আর ডান হাত দিয়ে ওর মুখে একের পর এক প্রফেশনাল শট বসাতে লাগল। প্রতিটি পাঞ্চের নিখুঁত টেকনিক আর পাওয়ারে রিংয়ের চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল। রুদ্র যেন জিশানের সাথে লড়ছে না, সে লড়ছে নিজের ভেতরের সমস্ত ট্রমা, রাগ আর মেহেরকে ঘিরে তৈরি হওয়া ওই অদ্ভুত খামখেয়ালিপনার সাথে। প্রতিটা পাঞ্চের সাথে সাথে সে তার ভেতরের সমস্ত ধোঁয়াশাকে আছড়ে ফেলছিল।
“ডিফেন্ড কর, জিশান! কাম অন ” রুদ্রর ঠান্ডা, ভারী গলা রিংয়ে প্রতিধ্বনিত হলো।
জিশান নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে একটা কাউন্টার আপার-কাট মারতে গেল, কিন্তু রুদ্র অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে নিচে ঝুঁকে ওটাকে ডজ করল এবং নিচ থেকেই এক মারাত্মক ক্লোজ-রেঞ্জ পাঞ্চ বসিয়ে দিল সরাসরি জিশানের গালে।
ঠাস!
আঘাতটা এতটাই জোরালো আর টেকনিক্যাল ছিল যে জিশান ভারসাম্য হারিয়ে রিংয়ের ম্যাটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে হাত তুলে ইশারা করল—
আই অ্যাম ডান! ও আর এই মুহূর্তে লড়ার মতো অবস্থায় ছিল না, জোরে জোরে হাঁপাচ্ছিল।
চারপাশে তখন পিনপতন নীরবতা। রুদ্র বুক ভরে লম্বা শ্বাস নিতে নিতে রিংয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। তার কপাল আর ঘাড় বেয়ে ঘাম ঝরছে। চোখের সেই লড়াকু ভাবটা আস্তে আস্তে কেটে গিয়ে সেখানে আবার সেই চিরচেনা গভীর ভাবটা ফিরে এল। এই তীব্র শারীরিক লড়াইটাই একমাত্র পথ, যা তার মগজের ভেতরের জটগুলোকে সাময়িকভাবে আলগা করে দেয়।
সে গ্লাভস জোড়া খুলে রিংয়ের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। ট্রেইনার এগিয়ে এসে ওনার হাতে একটা পানির বোতল আর সাদা তোয়ালে তুলে দিল। রুদ্র তোয়ালে দিয়ে মুখের ঘাম আর রক্তটুকু মুছে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শরীরটা এখন শান্ত, কিন্তু মনটা অদ্ভুত রকমের নির্লিপ্ত। সে অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এলো। নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল একটা দীর্ঘ হট-ওয়াটার বাথ নেওয়ার জন্য।
রাত তখন আনুমানিক দুটো। সারা বাড়ি নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। রুদ্র সবেমাত্র ওয়াশরুম থেকে শাওয়ার নিয়ে বের হলো। গায়ে একটা কালো ট্রাউজার্স আর কাঁধে তোয়ালে ছড়ানো। চুলগুলো এখনো ভেজা, সেখান থেকে দু-এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে তার চওড়া বুকে।
সে ভেবেছিল নিজের ঘরে গিয়ে টেবিলে রাখা অফিশিয়াল ফাইলপত্রগুলো একবার চেক করবে, তারপর ঘুমিয়ে পড়বে।
কিন্তু হঠাৎই কারো অবয়ব তার চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠল। রুদ্র এক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল।
মেহের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘুমন্ত মুখের সেই নির্ভার প্রশান্তি আর নিস্তব্ধ উপস্থিতি মুহূর্তেই রুদ্রের দৃষ্টি আটকে দিল। পুরো ঘরজুড়ে যেন এক ধরনের শান্ত স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে আছে।
বক্সিং শেষ করে অ্যাপার্টমেন্টে ফেরার সময় রুদ্র এতটাই ক্লান্ত ছিল যে চারপাশে একবার ভালো করে দেখারও অবকাশ পায়নি। ঘরে আর কেউ আছে কি না, সেটাও খেয়াল করেনি। মেহেরের কথাও যেন ক্লান্তির চাপে সাময়িকভাবে মাথা থেকে সরে গিয়েছিল।
রুদ্র কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেহেরের দিকে । অকারণেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা অনুভব করল সে।
মেহের বিকেল থেকে একবারের জন্যও ঘর থেকে বের হয়নি, কিংবা রুদ্র কখন এল বা কী করল—সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল করেনি।
রুদ্র তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ফাইলগুলো তুলে নিয়ে অন্য রুমে চলে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু ঠিক তখনই তার কানে এল একটা অতি ক্ষীণ, যন্ত্রণাদায়ক গোঙানির শব্দ।
রুদ্রর চোখ দুটো সরু হয়ে এল। সে দেখল মেহের ঘুমের ঘোরে ভীষণ ছটফট করছে। তার ঠোঁট দুটো শুকিয়ে পুরো কাঠ হয়ে গেছে,কপালে জমে উঠেছে সূক্ষ্ম ঘামের বিন্দু। মূলত মেহেরের জ্বরটা একদমই কমেনি; বরং বেলা বাড়ার সাথে সাথে এবং রাতের অন্ধকার নামার পর তা আরও তীব্র, ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। সকালে রেহানা চৌধুরী যখন ফোনে মেহেরের জ্বরের কথা বলছিলেন,
রুদ্র তখন জরুরী কলে থাকলেও মায়ের প্রতিটা কথা তার কান অবদি ঠিকই পৌঁছেছিল। মুখে গুরুত্ব না দিলেও অবচেতন মনে কোথাও যেন একটা খটকা রয়েই গিয়েছিল।
রুদ্র ধীর পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মেহেরের দিকে হাত বাড়াতে গিয়েও থমকে গেল রুদ্র। ইউএসএতে থাকাকালীন দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল তার । কত মেয়ের সাথে সে মিশেছে, কত পার্টি, কত ক্লাব! মেয়েদের সাথে অবলীলায় ফ্রি হয়েছে সে । বহু নারী তার জীবনে এসেছে এবং গেছে। কিন্তু মেহেরকে বিনা অনুমতিতে স্পর্শ করার কথা ভাবতেই তার ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করল।
মেহের সবার মতো নয়। মেয়েটা যেন ভীষণ আলাদা—তার ভাবনা, তার ব্যক্তিত্ব, তার উপস্থিতি; সবকিছুই অন্যদের থেকে আলাদা ।রুদ্র বেশ কিছুক্ষণ দ্বিধায় কাটাল। নানা ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খাওয়ার পর ধীরে ধীরে হাত বাড়াল সে। তার ডান হাতটা বাড়িয়ে মেহেরের কপালে রাখল।
হাতের তালুটা মেহেরের নরম চামড়ায় ছোঁয়া মাত্রই রুদ্র অনুভব করল, মেহেরের জ্বর এসেছে ! গা যেন পুরো পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।
রুদ্র প্রথমে কিছুক্ষণের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল, বুঝতে পারল না ঠিক কী করা উচিত। হুট করেই তার ভেতরের ইগো মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। সে ঝট করে হাতটা সরিয়ে নিল। ঘর থেকে বের হয়ে চলে যেতে যেতে মনে মনে ভাবল,
—— আমার কী! মা তো ডক্টরকে কল দিয়েছেই, ওরাই দেখবে। আমার এত ভাবার কী আছে?
কিন্তু লিভিং রুমে এসেও রুদ্র শান্ত হতে পারল না। হাতের ফাইলগুলো টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলে সে কয়েক মিনিট ঘরের এমাথা-ওমাথা অস্থির পায়ে পায়চারি করল। কিন্তু কোনো কিছুতেই তার মন মানল না। মেহেরের ওই ফ্যাকাশে, ছটফটে, অসহায় মুখটা বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। এক অদ্ভুত অপরাধবোধ আর টান তাকে যেন পেছনের দিকে টানছিল।
অবশেষে রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের জেদ বিসর্জন দিল। নিঃশব্দে রান্নাঘরে গিয়ে একটা মগে একদম ঠাণ্ডা পানি আর একটা ছোট পরিষ্কার তোয়ালে নিয়ে সে আবার মেহেরের ঘরে ফিরে এল। বিছানার পাশে কাঠের চেয়ারটা টেনে বসল সে। তোয়ালেটা ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে আলতো হাতে নিংড়ে নিল, তারপর অত্যন্ত সাবধানে মেহেরের কপালে জলপট্টিটা বিছিয়ে দিল। সে ভীষণভাবে খেয়াল রাখছিল যেন মেহেরের শরীরের সাথে তার অযাচিত বা অপ্রয়োজনীয় কোনো শারীরিক স্পর্শ না ঘটে।
একবার, দুবার, তিনবার… করে এভাবে বারবার তোয়ালেটা মগের পানিতে ভিজিয়ে সে মেহেরের কপালে ছোঁয়াতে লাগল। মেহেরের তপ্ত, উত্তপ্ত শরীরটা আস্তে আস্তে সেই ঠাণ্ডা পানির শীতল ছোঁয়ায় শান্ত হয়ে আসতে লাগল। তার শরীরের ছটফটানি কমে এল। এই পরম নিশ্চিন্ততার মাঝে মেহেরের দ্রুত চলতে থাকা শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেল।
কতক্ষণ ধরে রুদ্র একটানা এই কাজটা করছিল, তার নিজেরও কোনো খেয়াল ছিল না। গভীর রাতে এভাবে ঘাড় গুঁজে জলপট্টি দিতে দিতে সে নিজেও ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। একসময় মেহেরের বিছানার পাশে রাখা চওড়া কাঠের চেয়ারটায় শরীরটা পুরোপুরি এলিয়ে দিল সে। দেয়ালের সাথে মাথাটা ঠেস দিয়ে, মেহেরের শান্ত মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে কখন যে সে নিজেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, তা টেরও পেল না।
ভোর তখন আনুমানিক ছয়টা। মেহেরের ঘরের জানালার ভারী পর্দাটা একপাশে সরানো ছিল, জানালাটাও খোলাই ছিল। পাশের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সেই ছোট বেড়াল কার্নিশ বেয়ে মেহেরের ঘরের জানালার সানশেডে এসে বসল। সেখান থেকে একটা লাফ দিয়ে ঘরের ভেতরের সোফাটার ওপর এসে নামল সে। বেড়ালটার নড়াচড়ার শব্দ আর হালকা ‘মিউ মিউ’ আওয়াজে রুদ্রর ঘুমটা এক ঝটকায় ভেঙ্গে গেল।
সে ধড়ফড় করে চোখ মেলে তাকাল। ঘাড়টা একটু সোজা করতেই মেরুদণ্ড থেকে একটা তীব্র ব্যথার সুড়সুড়ি অনুভব করল সে—সারারাত অমন শক্ত কাঠের চেয়ারে অস্বস্তিকরভাবে বসে ঘুমানোর অবধারিত ফল। রুদ্র সোফার দিকে তাকিয়ে বেড়ালটাকে দেখল, যে মেহেরের বিছানার দিকে এগোনোর চেষ্টা করছে। রুদ্র আলতো পায়ে এগিয়ে গিয়ে বেড়ালটাকে কোলে তুলে নিল, যাতে তার শব্দে মেহেরের ঘুম না ভেঙে যায়।
এরপর সে মেহেরের বিছানার দিকে তাকাল। মেহের তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন, তবে তার ফ্যাকাশে মুখে এখন আর সেই কাল রাতের জ্বরের ছটফটানি বা যন্ত্রণার ছাপ নেই। ভোরের আলোয় মেহেরের মুখটা ভীষণ শান্ত, নিষ্পাপ লাগছিল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ২৯
রুদ্র কোলের বেড়ালটার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে, নিজের ঠোঁটে তর্জনী আঙুল চেপে বলে উঠল, “হুশ!… শি ইজ স্লিপিং। ডোন্ট মেক নয়েজ। নাহলে আবার খেপে যাবে আমার উপর।”
বেড়ালটা যেন রুদ্রর সেই গম্ভীর চোখের ভাষা আর হুকুম বুঝতে পারল। সে একদম শান্ত হয়ে রুদ্রর চওড়া কোলের মধ্যে মাথা গুঁজে দিল। রুদ্র মেহেরের দিকে আরেকটিবার তাকাল। তারপর বেড়ালটাকে কোলে নিয়েই, কোনো শব্দ না করে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
