Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪২ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪২ (২)

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪২ (২)
মারিয়াম ফুল

সময় আসলে ভারী অদ্ভুত এক নদীর মতো। সে কারও বেদনায় থমকে দাঁড়ায় না, আবার কারও আকুল প্রতীক্ষার তাড়নাতেও একটুখানি দ্রুত বয়ে চলে না। নিজের ছন্দে, নিজের নিয়মে সে কেবল সামনের দিকেই এগিয়ে যায়। দেখতে দেখতে চোখের পলকে পেরিয়ে গেল আরও চৌদ্দটি দিন। ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা সাদা-কালো সংখ্যাগুলো যেন শুধু সময়ের হিসাবই রাখে না, নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয়, মানুষ যতই কিছু আঁকড়ে ধরে রাখতে চাইুক না কেন, সময় শেষ পর্যন্ত সবকিছুকেই আলতো করে আঙুলের ফাঁক গলে ঝরে পড়া বালুকণার মতো দূরে সরিয়ে নেয়।

নভেম্বরের শেষ বিকেল। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে বাতাসে মিশে আছে হালকা কুয়াশার স্নিগ্ধ আবরণ। জানালার কাচে জমে থাকা ধূসর আস্তরণ বাইরের পৃথিবীটাকে ঝাপসা করে দিয়েছে, যেন প্রকৃতিও আজ বিষণ্ণতার এক নীরব ছবি এঁকে রেখেছে। সূর্যের শেষ আলো কুয়াশার পর্দা ভেদ করতে না পেরে মলিন হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, আর চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন অদৃশ্য কোনো অপেক্ষার গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে।
মেহেরের জীবনে মাতৃত্বের শেষ প্রহর চলছে। দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই ওর শরীরের প্রতিটি পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের প্রতিচ্ছবিটাকে কখনো কখনো নিজেরই অচেনা মনে হয়। একসময় যে শরীরটা ছিল হালকা ও স্বাভাবিক, এখন তা পূর্ণতার ভারে বদলে গেছে। পা দুটোও এতটাই ফুলে থাকে যে অল্প কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা কয়েক কদম হাঁটলেও শরীরজুড়ে তীব্র অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ে।

গত কয়েক রাত ধরে ঠিকমতো ঘুম বলতে কিছুই নেই। গভীর ক্লান্তি শরীরকে অবসন্ন করে রাখলেও চোখে ঘুম নামে না। কখনো ডান কাত, কখনো বাঁ কাত, কখনো আবার আধশোয়া হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেয় মেহের। বিছানায় একটু আরাম করে শোয়ার মতো ভঙ্গি যেন আর খুঁজেই পায় না। পেটের ভারে নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়, আর বসা থেকে ওঠা কিংবা শুয়ে থাকা অবস্থান থেকে উঠে বসার মতো সাধারণ কাজগুলোও এখন ওর কাছে ছোটখাটো যুদ্ধের মতো মনে হয়।
এই পার হয়ে যাওয়া ১৪ দিনের হিসাব যদি মেহের মিলাতে বসে, তবে খুব সম্ভবত রুদ্রর সাথে ওর দেখা হয়েছে মাত্র ৪ কি ৫ বার!

আগামী ,৬ ডিসেম্বর বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন। দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই রাজনৈতিক মাঠে হামজা চৌধুরীর ব্যস্ততা আর চাপ যেন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। একদিকে সিলেটের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, টেক্সটাইল মিল ধসের বিপর্যয়, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সোলেমান খানের একের পর এক কূটচাল। সবকিছু সামলাতে গিয়েই গত কয়েক সপ্তাহ রুদ্রর অধিকাংশ সময় কেটে গেছে।
চৌধুরী পরিবারের ব্যবসায়িক ক্ষতির পরিমাণ এতটাই ভয়াবহ যে, রুদ্র নিজের এভিয়েশন ক্যারিয়ার আপাতত পাশে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক সংকট সামাল দেওয়া থেকে শুরু করে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাগুলোকে আবার ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টা, সব দায়িত্ব যেন একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে সে।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে পুরো দেশ যেন অস্থিরতার এক অদৃশ্য আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রাজপথজুড়ে মিছিল, হঠাৎ হঠাৎ অবরোধ, ভাঙচুর, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, আর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে জনজীবন প্রায় স্থবির। কে কাকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করবে, সেই লড়াইয়ে প্রতিদিনই নতুন নতুন কৌশল আর ষড়যন্ত্রের জন্ম হচ্ছে। চারদিকে বিরাজ করছে এক থমথমে, অস্বস্তিকর পরিবেশ।
সিলেটের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ইতোমধ্যে চারজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে তদন্ত যতই এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে, তারা কেবল দাবার গুটিমাত্র। ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে, আর তাদের খুঁজে বের করতেই প্রশাসনের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছে রুদ্র।

মেহের এই নীরব, নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে ধীরে ধীরে নিজেকে নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছিল। সময় যেন ওকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়েছে। একসময় যে নীরবতা ওকে ভেঙে দিত, এখন সেই নীরবতাকেই সঙ্গী করে দিন পার করতে শিখেছে সে।
এই কদিনের ব্যবধানে মেহের দুইবার হাসপাতালে গিয়ে নিয়মিত চেকআপ করিয়েছে। প্রতিবারই চিকিৎসক সন্তানের শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে আশ্বস্ত করেছেন, মা ও সন্তান দুজনেই সুস্থ আছে।
তবে ডাক্তার আগেই জানিয়ে ছিল, সবকিছু স্বাভাবিক থাকলে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়েই সন্তান জন্মের সম্ভাবনা। তাই তার আগে কোনোভাবেই আকাশপথে দীর্ঘ যাত্রা বা দূরের কোথাও ভ্রমণ করা মেহেরের জন্য নিরাপদ নয়। গর্ভাবস্থার এই শেষ সময়ে সামান্য ঝুঁকিও বড় ধরনের জটিলতার কারণ হতে পারে
ডাক্তারের এই স্পষ্ট নির্দেশের পর আপাতত মেহেরের যুক্তরাজ্য যাত্রার পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে হয়েছে। হাসপাতাল থেকে ফিরেই সে মাশফিকে ফোন করে সব খুলে বলেছিল। মাশফি শান্ত কণ্ঠে জানিয়েছিল, এতদিন যখন অপেক্ষা করেছে, তখন আর কয়েকটা মাস অপেক্ষা করতে তার আপত্তি নেই। নিজের কিংবা অনাগত সন্তানের জীবন নিয়ে একটুও ঝুঁকি নিতে রাজি নয় সে। মেহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সন্তান নিরাপদে পৃথিবীতে আসার পরই সে নতুন জীবনের উদ্দেশে দেশ ছাড়বে।

তিন দিন আগে মাশফি ফোন করে জানিয়ে ছিল। সে আজ বিকেলেই দেশে ফিরছে। কিছুদিন বাংলাদেশে থেকে প্রয়োজনীয় সব কাজ গুছিয়ে, তারপর মেহের, মেঘলা এবং মেহেরের সন্তানকে নিয়ে একসঙ্গে যুক্তরাজ্যে চলে যাবে। সে ইতোমধ্যেই সেখানকার সব আইনি ও অফিসিয়াল কাগজপত্র প্রায় সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে ফেলেছে। এমনকি মেহের ও রুদ্রর বিচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক নথিও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
এখন আর তাড়াহুড়োর কিছু নেই।সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। শুধু সময়ের অপেক্ষা। ডিসেম্বরের সেই প্রতীক্ষিত দিনটি এলেই, জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে মেহের পা রাখবে সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়ে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে এগোচ্ছে। জানালার হালকা পর্দাটা বাতাসে বারবার দুলে উঠছে, আর ফাঁক গলে শীতল হাওয়া ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ছে। বাইরে শেষ শরতের ম্লান রোদ ছড়িয়ে থাকলেও তাতে উষ্ণতার ছোঁয়া নেই বললেই চলে। চারপাশ যেন ধূসর এক নীরবতায় ঢেকে আছে। হাওয়ার ঝাপটায় রিডিং টেবিলের ওপর খোলা পড়ে থাকা বইটার পাতাগুলো খসখস শব্দ তুলে একটার পর একটা উল্টে যাচ্ছে।

মেহের ধীর পায়ে নিজের রুমে প্রবেশ করল। ঘরে ঢুকতেই সোজা সামনে থাকা ড্রেসিংটেবিলের আয়নাটার দিকে চোখ গেল তার।
কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে আয়নার ঠিক সামনে দাঁড়াল মেহের। ঘাড় বাঁকিয়ে, আলতো হাতে চুলগুলো একপাশে সরিয়ে এক নজর বুলিয়ে নিল নিজের পুরো শরীরে। গর্ভাবস্থার পুরো নয়টি মাস অতিক্রম হতে চলল, অথচ ওর শরীরে বাইরের কোনো বড়সড় বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন সহজে চোখে পড়ে না। মেহের কখনোই খুব একটা স্থূল শরীরের অধিকারী ছিল না, তাই হয়তো পেটটুকু ছাড়া বাকি অবয়ব খুব একটা বদলায়নি। তবে হ্যাঁ, কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন তো এসেই গেছে। মুখটা আজকের দিনে কেমন যেন অস্বাভাবিক ফোলা ফোলা লাগছে, চোখের নিচে এক চিলতে কালচে ছোপ। আর পা দুটো? বিগত কয়েকদিন ধরে জল জমে ফোলা ফোলা হয়ে লালচে রঙ ধারণ করে আছে।

মেহের বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে আয়নার সামনে রাখা কাঠের টুলটা টেনে বসল। আজ সকাল থেকেই শরীরটা ভীষণ অবসন্ন লাগছে, হাত-পায়ের প্রতিটি গিট যেন খুলে আসছে।টুলে বসতেই অকারণেই মেহেরের মনে একটি ভাবনা এসে ভিড় করল। ক্যাপ্টেন সাহেব কি আজ অ্যাপার্টমেন্টেই আছেন?
সেই রাতের পর থেকে রুদ্রর সঙ্গে আর খুব একটা দেখা হয়নি মেহেরের। হামজা চৌধুরী রাজনৈতিক ব্যস্ততার মাঝেও কয়েকবার ঢাকা ছুটে এসেছেন মেহেরের খোঁজ নিতে। একবার রেহানা চৌধুরীও তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন। তবে পরিবারের এত দায়িত্ব আর রাজনীতির টানাপোড়েনের ভিড়ে রুদ্রকে দেখা যেন সত্যিই দুর্লভ হয়ে উঠেছে। সিলেটের টেক্সটাইল মিল ধস ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সৃষ্ট বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সামলাতেই দিন-রাত এক করে ফেলেছে সে।

মেহেরের বুকের ভেতর থেকে অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো,
ইশ! ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে ডিভোর্সের ব্যাপারটা নিয়ে আর একবার কথা বলা উচিত ছিল। অথচ সেটাও আর হয়ে উঠছে না। সকালেই বেরিয়ে পড়েন, ফিরতে ফিরতে গভীর রাত হয়ে যায়। দিনের পর দিন একই রুটিন। একই ছাদের নিচে থেকেও গত কদিনে মানুষটার সঙ্গে ঠিকমতো দেখাই হয়নি।
ভাবতে ভাবতেই মেহের টেবিল থেকে চিরুনিটা হাতে নিল। কাঁধে জড়ানো শালটা বিরক্ত লাগছিল, তাই খুলে বিছানার একপাশে ফেলে দিল। ভেতরটা কেমন যেন অস্থির লাগছিল, ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিল না।
ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় নিজের অবয়ব দেখতে দেখতে আবারও নিজের অজান্তেই রুদ্রর ভাবনায় তলিয়ে গেল মেহের।
এই যে পুরো নয় মাসে মোটে কয়েকটা দিন ওদের সামনাসামনি দেখা হয়েছে, তাও তো কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলেনি! মেহের রুদ্রর সাথে শেষ কয়েকদিনের তর্ক আর বাকযুদ্ধের মুহূর্তগুলোর কথা ভেবে নিজের অজান্তেই মৃদু একটু হাসল। লোকটা বড্ড অদ্ভুত, বড্ড বেশি একরোখা আর কঠিন খোলসে আবৃত এক মানুষ!
মেহের আয়নার দিকে তাকিয়ে মনে মনে রুদ্রের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করল—

‘ক্যাপ্টেন সাহেব… ভীষণ একরোখা আর কঠিন আপনি ? আপনার ওপর আমার কত না ক্ষোভ জমা ছিল, কত নালিশ ছিল। অথচ আপনাকে একটু একটু করে জানার পর, থেকে আপনার প্রতি আর কোনো রাগ আমি খুঁজে পাই না। সেদিন যখন বললেন আমি যেন পেটে পাপের বোঝা নিয়ে ঘুরছি তখন মনে হয়েছিল কেউ যেন আমার সারা গায়ে কলঙ্কের কালি ছিটিয়ে দিচ্ছে… প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল আপনার ওপর! তারপর বিয়ের প্রথম দিন যখন বললেন , ৬৫ পার্সেন্ট সম্পত্তি চান, তখনও আপনাকে কত ভুল বুঝেছিলাম! ভেবেছিলাম একটা মানুষ অন্যের চরম অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কীভাবে এতটা নিকৃষ্ট হতে পারে?’
একটু থেমে মেহের আবার বলল,

‘ না, তারপর বুঝলাম — আপনি নিজেকে একটা কাল্পনিক খোলসের ভেতর লুকিয়ে রাখতে ভীষণ পটু! আট-আটটি বছর ধরে বুকের ভেতর এক জীবন্ত চিতার আগুন বয়ে বেড়াচ্ছেন, অথচ আটটা সেকেন্ডের জন্যও কাউকে সেই আগুনের আঁচ টের পেতে দেননি! আপনি ওপর থেকে নিজেকে যতটাই খিটখিটে, অহংকারী ,খারাপ দেখান না কেন… আপনি আসলে তেমন নন।
চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে মেহের বলল, ‘জানেন? ইদানীং আপনার জন্য মন থেকে দোয়া করি। আল্লাহর কাছে চাই, তিনি যেন আপনাকে হেদায়েত দেন, আপনার মনে আবার তাঁর প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে দেন। ‘
কথাটা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মেহেরের হাত থেকে চিরুনিটা ফসকে কাঠের মেঝেতে পড়ে গেল।চিরুনিটা তুলতে গিয়ে মেহের একটু নিচু হতেই তলপেটের ভেতর হঠাৎ চিমটি কাটার মতো একটা ব্যথা টের পেল। তবে ব্যথাটা বেশিক্ষণ থাকল না, মুহূর্তের মধ্যেই মিলিয়ে গেল। মেহের এক হাত দিয়ে পেটটা চেপে ধরে কোনোমতে চিরুনিটা তুলে আবার ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে দিল।

তারপর আয়নায় নিজের দিকে আবারও তাকাতেই মেহের টের পেল—পেটের ঠিক ডান পাশে ছোট্ট প্রাণটা যেন হঠাৎ করেই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে জোরে একটা লাথি মেরে উঠল!
বিগত কয়েক মাস ধরে প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত নিজের শরীরের ভেতর বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটার অস্তিত্ব অনুভব করে আসছে মেহের। প্রথম দিকে নড়াচড়াগুলো ছিল খুবই মৃদু—যেন প্রজাপতির ডানার হালকা ছোঁয়া। তারপর ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অনুভূতিগুলো আরও স্পষ্ট হয়েছে। এখন প্রায় প্রতিদিনই কখনো আলতো নড়ে ওঠে, কখনো আবার হঠাৎ করেই জোরে লাথি মেরে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় ছোট্ট মানুষটা। যেন মায়ের সঙ্গেই নিজের মতো করে গল্প করছে।
মেহেরের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক বিষাদমাখা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। এই লাথিগুলো অনেক সময় বেশ ব্যথা দেয়। বিশেষ করে যখন একটানা কয়েকবার নড়েচড়ে বসে, তখন মনে হয় যেন পেটের ভেতরেই ছোট্ট একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। ব্যথায় বুক কেঁপে ওঠে, মুখটা কুঁচকে যায়, কখনো কখনো নিঃশ্বাসটাও আটকে আসে।

তবুও সেই ব্যথার মাঝেও লুকিয়ে থাকে এমন এক তৃপ্তি, যার কোনো তুলনা হয় না। কারণ প্রতিটা লাথি, প্রতিটা নড়াচড়াই মেহেরকে মনে করিয়ে দেয়—ও একা নয়। ওর ভেতরে আরেকটা ছোট্ট প্রাণ ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছে।
মেহের আলতো ছন্দে নিজের ফুলে থাকা পেটের ওপর ডান হাতটা বুলাতে লাগল। তারপর অনাগত সন্তানের সাথে আপন মনে কথা বলতে শুরু করল—“এই যে লিটল চ্যাম্প … দিন দিন বড্ড দুষ্টু হয়ে উঠছ ! মাম্মা যে কষ্ট পায়, সেটা বুঝি একদম খেয়াল থাকে না? মাম্মাকে এত জ্বালাচ্ছ কেন, হুম…?”
কথাটা শেষ হতে না হতেই পেটের ভেতর থেকে আবারও একটা জোরালো ধাক্কা এলো!
মেহের হালকা একটু হেসে আবারও বলল,“লিটল চ্যাম্প! তুমি কি মাম্মার কথা শুনতে পাচ্ছ? শোনো… এই যে দুষ্ট , তুমি কার মতো এত দুষ্টু হয়েছ বলো তো, হুম? তোমার মা, বাবা—আমরা তো কেউ এমন দুষ্টু ছিলাম না…?”

‘বাবা’ শব্দটা মুখ দিয়ে বের হতেই মেহেরের ঠোঁটের সমস্ত হাসি এক নিমিষে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন শূন্য হয়ে হাহাকার করে উঠল। অন্তুর বিদায়বেলার মলিন মুখটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল। মেহের নিজের নিচের ঠোঁটটা শক্ত করে চেপে ধরল।
অন্তুর কথা মনে পড়লেই আজও বুকের গভীর কোথাও অচেনা এক যন্ত্রণা নীরবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তবে গত নয়টা মাসে মেহের নিজেকে অনেকটাই সামলে নিতে শিখেছে। সত্যি তো আর বদলে দেওয়া যায় না। তাই নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে অন্তুর স্মৃতিটুকু বুকে আগলে রেখেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে ও।
অসময়ে যারা ওপারে চলে যায়, তাদের আর একবার দেখার যে অপূর্ণ তৃষ্ণা, সেই তৃষ্ণাতেই আজও দগ্ধ হয় মেহের। তবু এখন আর শুধু নিজের জন্য নয়, ওর ভেতরে বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটার জন্যও ওকে বাঁচতে হবে। সব কষ্ট, সব শূন্যতা বুকের ভেতর চাপা রেখেও শক্ত থাকতে হবে— নিজের বাচ্চার জন্য।
মেহের একটু নিজেকে সামলে নিয়ে বাচ্চার উদ্দেশ্যে আবার ফিসফিস করে বলল—

“লিটল চ্যাম্প… তুমি… তুমি কি তোমার বাবার , নাকি মায়ের মত দেখতে হবে? শোনো সোনা, তোমার এই অভাগী মা তোমাকে পৃথিবীতে আসার আগে একটা স্বাভাবিক পরিবেশ দিতে পারে নি… কিন্তু মা তোমাকে কথা দিচ্ছে, তুমি দুনিয়ায় এলেই মা তোমাকে নিজের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে দেবে। তোমাকে সাথে নিয়ে আমি অনেক দূরে চলে যাব… অনেক দূরে! যেখানে কেউ আমাদের ডিস্টার্ব করবে না… বোঝলে?”
মেহেরের চোখ দুটো নোনা জলে টলমল করে উঠল। গলার আওয়াজটা কান্নায় জড়িয়ে এলো। ও কেঁপে ওঠা গলায় বলতে লাগল—

তোমার মাম্মা তোমাকে এই পৃথিবীতে আনার জন্য কত যুদ্ধ করেছে জানো সোনা…? মাম্মাকে কখনো ভুল বুঝবে না তো, বলো…? মাম্মা ভীষণ সরি… তোমার কাছে অনেক সরি সোনা! তুমি দুনিয়াতে আসার আগেই কত মানসিক কষ্ট সহ্য করতে হলো তোমাকে, আর তোমার অভাগী মাম্মা তোমার জন্য কিচ্ছু করতে পারল না…”
কথাগুলো শেষ করে মেহের চোখের কোণের জলটুকু মুছে নিল। নিজেকে শান্ত করার জন্য বুক ভরে পরপর দুই-তিনবার শ্বাস টেনে নিল।
কিন্তু শ্বাসটা পুরোপুরি ছাড়ার আগেই—মেহের অনুভব করল ওর তলপেটের ডান কোণে আবার হালকা একটা ব্যথার টান শুরু হয়েছে।

ব্যথাটা খুবই মৃদু ছিল, তাই মেহের প্রথমে বিশেষ পাত্তা দিল না। ডাক্তার তো আগের ভিজিটে স্পষ্ট বলেই দিয়েছিলেন যে, শেষ দিনগুলোতে এমন কিছু ‘ফলস পেইন’ হওয়া খুবই স্বাভাবিক।ডেলিভারির সময় আসতে তো এখনও অন্তত হাত দুই সপ্তাহের মতো বাকি আছে।
মেহের টোলটার হাতলে ভর দিয়ে ধীরগতিতে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তলপেটের একদম নিচ থেকে হঠাৎ করেই তীব্র এক ব্যথা উঠল। এতটাই আকস্মিক আর অসহনীয় ছিল যন্ত্রণাটা যে মেহেরের পুরো শরীর কেঁপে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে মনে হলো, কেউ যেন ভেতর থেকে সমস্ত শক্তি দিয়ে ওর শরীরটা মুচড়ে ধরেছে। প্রতিটা রগ, প্রতিটা মাংসপেশী যেন একসাথে টান খেয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। ব্যথার তীব্রতায় ওর নিঃশ্বাস আটকে এলো, চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ হয়ে গেল, আর ঠোঁট ফাঁক করে বেরিয়ে এল এক চাপা আর্তনাদ।

“আআআআহ্… আল্লাহ্!”
চোখের সামনে নিমেষে ঘরের চারপাশটা কেমন যেন ঝাপসা আর অন্ধকার হয়ে এলো। মেহের দুই হাত বাড়িয়ে কোনোমতে বিছানার কোণটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল, কিন্তু হাত-পায়ের পেশীগুলো থেকে সব শক্তি যেন এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেছে। সে নিজের শরীরের ভারসাম্য আর ধরে রাখতে পারল না… দুই হাঁটু কেঁপে উঠে ধপ করে মেঝের ওপর নেমে এলো । কোনোরকমে নিজেকে মেঝে থেকে তুলে আবার বিছানায় গিয়ে আশ্রয় নিল মেহের।

বিছানায় কপাল আর হাত ঠেকিয়ে কোনোমতে শরীরটা ধরে রাখার চেষ্টা করল মেহের। কিন্তু না শোওয়া, বসা কিংবা হাঁটু গেড়ে থাকা, কোনোভাবেই পেটের ভেতরের মোচড় আর কোমরের ব্যথাটা একটুও কমছে না। ব্যথার তীব্রতার সাথে সাথে মেহেরের কপালে, গালের পাশে আর ঘাড়ে ঠাণ্ডা ঘাম জমতে শুরু করেছে। যন্ত্রণায় তার মুখটা বিকৃত হয়ে আসছে, প্রতিটি শ্বাস নিতে এখন বুকে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
কোনো উপায় না পেয়ে মেহের কাঁপতে থাকা ডান হাতটা বাড়িয়ে সাইড টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করল। হাত এত বেশি কাঁপছিল যে প্রথমবারে ফোনটা পড়ে যাচ্ছিল, দ্বিতীয়বারে সামলে নিয়ে তুলে নিল। ঝাপসা চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দ্রুত মেঘলার নম্বরে কল করল। ফোনটা কানে তুলতেই রিং হতে লাগল—একবার… দুবার… তিনবার… পুরো রিং হয়েও কলটা কেটে গেল। মেঘলা হয়তো তখন মাশফিকে এয়ারপোর্ট থেকে রিসিভ করার শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততায় ছিল। সেই তাড়াহুড়োর মাঝেই ফোনটা বেজেছে, কিন্তু ওর কানে পৌঁছায়নি।

ফোনটা নামিয়ে এনে মেহেরের এবার হঠাৎ মনে পড়ল রুদ্রর কথা। কিন্তু পরক্ষণেই সে থেমে গেল। রুদ্রর নাম্বর তার মোবাইলে সেভ করাই নেই, কখনো প্রয়োজন মনে করে সে রাখেওনি। আর তাছাড়া আজ সকালেই রুদ্র সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে, ফ্যাক্টরির কাজ শেষ করে তার ঢাকায় ফিরতে ফিরতে মাঝরাত পেরিয়ে যাবে।
বুকের ভেতর ধীরে ধীরে চেপে বসল একাকীত্ব আর অজানা ভয়। এই বিশাল ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় কোনো মানুষ নেই, যাকে একবার ডাক দেবে কিংবা সাহায্যের জন্য হাত বাড়াবে। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন মুহূর্তেই আরও ভারী হয়ে উঠল। অসহ্য ব্যথার তীব্রতায় আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না মেহের।
ঠিক তখনই মেহের তলপেটের ভেতর এক অদ্ভুত চাপ অনুভব করল। পরের মুহূর্তেই পায়ের ফাঁক দিয়ে উষ্ণ তরল গড়িয়ে পড়ার অনুভূতি হতেই ওর বুক ধক করে উঠল। বুঝতে আর বাকি রইল না—ওর ওয়াটার ব্রেক হয়ে গেছে।

মুহূর্তেই ডাক্তারের কথাগুলো কানে ভেসে উঠল, “ওয়াটার ব্রেক হয়ে গেলে আর দেরি করা যাবে না। এর মানে প্রসবের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে যেতে হবে।”
কথাগুলো মনে পড়তেই মেহেরের বুকের ভেতর আতঙ্ক আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। একদিকে অসহ্য প্রসববেদনা, অন্যদিকে চারপাশে সাহায্য করার মতো একজন মানুষও নেই।
ব্যথার তীব্রতা যত বাড়তে লাগল, মেহেরের মনে হতে লাগল যেন শরীরের ভেতর থেকে বাতাস ফুরিয়ে যাচ্ছে। সে বারবার হাঁ করে বুকভরে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু যেন কোনোভাবেই যথেষ্ট অক্সিজেন পাচ্ছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে, বুকের খাঁচাটা দ্রুত ওঠানামা করছে। জল থেকে তুলে আনা মাছ যেমন শ্বাসের জন্য ছটফট করে, মেহেরের অবস্থাও যেন ঠিক তেমনই।
একটু আরাম পাওয়ার আশায় মেঝের ওপর ছটফট করতে লাগল সে। একবার ডান পাশে কাৎ হয়ে শুয়ে পড়ছে, পরক্ষণেই আবার বাঁ পাশে ঘুরে যাচ্ছে। কোনো ভঙ্গিতেই ব্যথাটা একটুও কমছে না। শেষমেশ হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে কপালটা মেঝেতে ঠেকিয়ে হাঁপাতে লাগল। প্রতিটা শ্বাস যেন বুক চিরে বেরিয়ে আসছে, আর প্রতিটা মুহূর্তের সঙ্গে সঙ্গে প্রসববেদনাটা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।
ব্যথার চোটে গলার ভেতর থেকে যেন কোনো চিৎকার বের না হয়ে আসে, তাই মেহের নিজের স ওড়নাটা দুহাতে টেনে নিয়ে মুখে পুরে দিল। ওড়নার কাপড়টা দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরে সে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল।

মেহেরের মনে হতে লাগল, সে বোধহয় আর বাঁচবে না। এই অসহনীয় যন্ত্রণা সহ্য করে টিকে থাকা কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়। মৃত্যুভয় এক শীতল স্রোতের মতো ধীরে ধীরে তার সমগ্র শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। বুকভরা আতঙ্ক আর অসহায়তা নিয়ে বলতে লাগল,
“আল্লাহ… ও আল্লাহ… আমাকে সাহায্য করো। আমার কিছু হয়ে যাক, কিন্তু আমার বাচ্চাটার যেন কিছু না হয়। ইয়াহ্ আল্লাহ, আমি আর পারছি না… সত্যিই আর পারছি না…”
শেষবারের মতো সাহায্যের আশায় মেহের কোনো রকমে নিজেকে টেনে-হিঁচড়ে লিভিং রুমের দিকে এগোতে লাগল। কনুই আর হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে একটুখানি সামনে যাওয়াও যেন তার কাছে একেকটা যুদ্ধ। প্রতিবার সামনে এগোতেই তলপেটে অসহ্য ব্যথার ঢেউ আছড়ে পড়ছে, পুরো শরীর কেঁপে উঠছে, তবু সে থামছে না। অনাগত সন্তানটার কথা মনে করেই দাঁতে দাঁত চেপে আবারও সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। হয়তো কেউ এসে দরজায় কড়া নাড়বে, হয়তো কেউ ওর চিৎকার শুনে ছুটে আসবে—এই ক্ষীণ আশাটুকুই তখন ওকে হার মানতে দিচ্ছিল না।

অনেক কষ্টে টেনে-হিঁচড়ে লিভিং রুমের সোফার কাছে পৌঁছাতেই হঠাৎ মেহেরের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। পরের মুহূর্তেই চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল। মনে হলো পুরো ঘরটা যেন ঘুরছে। কানে শুধু একটানা ভোঁ ভোঁ শব্দ, শরীরের কোথাও আর শক্তি অবশিষ্ট নেই।
মেহের শেষবারের মতো সোফাটা আঁকড়ে ধরে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। হাতের মুঠো আলগা হয়ে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে সোফার পাশেই মেঝেতে পড়ে গেল সে। কয়েক সেকেন্ড ছটফট করার পর শরীরটা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এলো। ঠান্ডা মেঝের ওপর পড়ে থাকা মেহের শুধু ভারী ভারী শ্বাস নিচ্ছিল। চোখ দুটো আধবোজা, ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু আর নড়ে বসার মতো শক্তিটুকুও অবশিষ্ট ছিল না।
অন্যদিকে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে খাবারের মৌ মৌ গন্ধ। পোলাও, খাসির মাংসের রোস্ট থেকে শুরু করে রকমারি মিষ্টি—সবই আজ তৈরি হচ্ছে বাড়ির ছোট ছেলে মাশফির পছন্দ অনুযায়ী। পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে পাড়ি দিয়েছিল সে। দেখতে দেখতে দীর্ঘ ছয়টি বছর পর আজ নিজের ভিটেমাটিতে ফিরেছে ছেলেটা।

বাড়ির ড্রয়িংরুমে যেন ছোট্ট এক মিলনমেলা বসেছে। এতদিন পর সবাই একসঙ্গে হয়েছে। সোফার মাঝখানে বসে আছে মাশফি, আর তার পাশেই সায়েদ ইমরান। বহুদিন পর ছেলেকে এতটা কাছে পেয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা যেন প্রশান্তিতে ভরে উঠল। এক হাতে মাশফিকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। সেই আলিঙ্গনে ছিল বহুদিনের অপেক্ষা, অগণিত না-বলা অনুভূতি আর জমে থাকা শূন্যতাকে এক নিমেষে ভরিয়ে দেওয়ার আকুলতা।
মাশফি চোখ তুলে চারপাশে তাকাল। দেয়াল, আসবাবপত্র, —সবই যেন চেনা, তবু কোথাও যেন অচেনার ছোঁয়া লেগে আছে। বিদেশের মাটিতে প্রথম পা রাখার পর কত রাত যে দেশের কথা ভেবে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছে!
আজ ছয় বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরে মাশফির মনে হলো, সময় যেন সত্যিই অনেক কিছু বদলে দেয়। পরিচিত দেয়ালগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মানুষগুলোর মুখে পড়েছে সময়ের ছাপ। কোথাও নতুন রঙ, কোথাও বদলে যাওয়া আসবাব, কোথাও আবার ছোটখাটো পরিবর্তন। তবু এসবের মাঝেও একটা জিনিস একটুও বদলায়নি—এই বাড়ির আপন অনুভূতি। মনে হচ্ছিল, ছয় বছরের সমস্ত ক্লান্তি আর দূরত্ব যেন ফিরে আসতেই ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

সায়েদ কামিনী আস্তে করে এসে মাশফির পাশে বসলেন। ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,”অবশেষে দেশে ফিরলি রে বাপ আমার…”
সায়েদ ইমরান ছেলের কাঁধে একটা হালকা চাপ দিয়ে প্রশ্ন করলেন,”তা, কয়দিনের জন্য থাকা হচ্ছে এবার?”
মাশফি একটু হাসল। মাথাটা একপাশে নেড়ে বেশ জবাব দিল,”এই তো বাবা, মাসখানেক। ফেরার টিকিট এখনও কাটিনি… দেখি আগে।”
সায়েদের বাড়ির কেউই জানেন না যে, মাশফি আর মেঘলার সঙ্গে মেহেরও যাবে। মেঘলা ছাড়া এই পরিকল্পনার কথা আর কারও জানা নেই। পুরো পরিকল্পনাটাই মেঘলা আর মাশফি মিলে করেছে।একবার মেহের তাদের সঙ্গে চলে গেলে পরে বাড়িতে জানিয়ে দেওয়া যাবে। নাহলে মেহেরকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়াটা অনেক কঠিন হয়ে পড়বে।
ছেলেকে চোখের সামনে ফিরে পেয়ে সায়েদ ইমরান আর সায়েদ কামিনী যেন কথার ঝুড়ি খুলে বসেছেন। পাশে বসে আছেন মেঘলার বাবা-মা-ও। বিদেশের পড়াশোনা কেমন, একা একা এতগুলো দিন কীভাবে কাটল, ওখানকার আবহাওয়া বা দিনযাপনের ধরণ কেমন—এসব নিয়েই গল্প জমে উঠেছে।
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের দরজার পাশে এসে দাঁড়াল নূর।
মাশফি যখন ইউকেতে যায়, তখন নূরের সাথে এই বাড়ির কোনো যোগসূত্র ছিল না। মাশফি দেশ ছাড়ার পরেই মির্জার সাথে নূরের বিয়ে হয়। এবারই প্রথম নূরকে দেখছে মাশফি। নুরকে দরজার মুখে দাঁড়াতে দেখে মাশফি তড়িঘড়ি করে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বেশ বিনয়ের সাথে হাত ইশারা করে বলল,”ভাবী, প্লিজ আসুন না ভেতরে।”

নূর দরজার কাছে থমকে দাঁড়িয়ে কোলে থাকা ছোট্ট ছেলেটার গায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“না না, থাক । আপনারা গল্প করুন, কোনো সমস্যা নেই।”
মাশফি নূরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সোজা এগিয়ে গেল ওর কাছে। দু’হাত বাড়িয়ে মির্জা আর নূরের ছোট্ট ছেলেটাকে নূরের কোল থেকে নিজের কোলে তুলে নিল।
বাচ্চাটাকে আলতো করে একটু ওপরে তুলে ধরে চওড়া হাসি হেসে বলল, “আরে শাবাশ! মাই বয়! দেখতে তো একদম চাচ্চার মতো হয়েছ”
চার মাসের ছোট্ট বাচ্চাটা গোল গোল চোখে মাশফির দিকে তাকিয়ে ভ্রু দুটো কুঁচকে আবার তুলে ফেলল। তারপর আধো আধো গলায় নিজের মতো করেই জবাব দিল,
— “আআআ… মমম…আআ…”
মাশফি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। বাচ্চার তুলতুলে গাল দুটোতে পর পর কয়েকটি চুমু এঁকে দিল। কোল ঝাঁকিয়ে দোল খাওয়াতে খাওয়াতে মৃদু হাসল সে। তবে কোল দোলাতে দোলাতেই হঠাৎ ওর চোখ দুটো ঘরের চারপাশে কাকে যেন খুঁজতে শুরু করল, মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে উঠল,
” মা, ভাইয়াকে তো দেখছি না? ভাইয়া কোথায়? আর মেহেক কই…? আল্লাহ্ জানে কত বড় হয়ে গেছে!”
সায়েদ কামিনী একটু হেসে বললেন,

“মেহেক তো কলেজে গেছে বাবা। আর মির্জা গেছে ওর কাজের কাজে। চলে আসবে এখনই।”
মাশফির কথা শুনে নূর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে মেঝের দিকে তাকাল। তারপর এক পা এগিয়ে মাশফির পাশ থেকে ছেলেকে নিজের কোলে ফিরিয়ে নিতে নিতে বলল,
“দেবর সাহেব, যাঁর খোঁজ নেওয়ার দরকার সেটার তো কোনো নামগন্ধও নিচ্ছেন না! যাঁর জন্য এতদূর এলেন, সে কিন্তু ছাদে বসে আছে… পরে সবার খোঁজ নেওয়া যাবে । আমার ননদটা আবার বড্ড লজ্জাবতী! তাড়াতাড়ি ওইখানে যান তো দেখি।”
কথাটার ইঙ্গিত বুঝতেই মাশফির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। বাড়িতে আসার পর থেকে একবারও মেঘলাকে চোখে পড়েনি। হয়তো ওকে দেখেই লজ্জায় কোথাও লুকিয়ে পড়েছে! সবার সামনে তো আর নিজের নতুন বউয়ের খোঁজ সরাসরি করা যায় না। তাই মনে মনে ঠিক করল, নিজের ঘরে গিয়েই একবার দেখে নেবে।
ইউকেতে যাওয়ার সময় মেঘলা ছিল সবে কৈশোরে পা রাখা এক কিশোরী। তখন ওকে দেখে মাশফির মনে কোনো অনুভূতির ঢেউ ওঠেনি। কিন্তু বিয়ের পর মেঘলা যখন ওর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল, তখন অজান্তেই হৃদয়ের ভেতর জন্ম নিতে লাগল এক অদ্ভুত অনুভূতি।
মাশফি ঘরের সবার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বলল,”মা, আমি একটু আসি… একটু রেস্ট নিই।”
অথচ ওর উদ্দেশ্য যে রেস্ট নেওয়া নয়, বরং ছাদে গিয়ে মেঘলার সাথে একান্তে কথা বলা—সেটা ঘরের কারও বুঝতে বাকি রইল না।
নূর ঠোঁট টিপে হেসে একটু তাড়া দেওয়ার গলায় বলল,”হুম, তাড়াতাড়ি যাও একটু!”
সায়েদ কামিনীও ছেলের ক্লান্তির কথা ভেবে মাথা নেড়ে সায় দিলেন,”হ্যাঁ হ্যাঁ, যা যা। কত দূর থেকে এসেছিস, একটু বিশ্রাম নেওয়ার বেশ প্রয়োজন।”

সবার অনুমতি পেতেই মাশফি ধীর পায়ে ড্রয়িংরুম থেকে বের হয়ে এলো। কিন্তু নিজের শোবার ঘরের দিকে না গিয়ে, বেশ সতর্ক পায়ে করিডোর পেরিয়ে ওপরের ছাদে উঠতে শুরু করল ।
সিঁড়ির শেষ ধাপটা পেরিয়ে ছাদের খোলা হাওয়ায় পা রাখল মাশফি। চোখ পড়তেই দেখল, ছাদের একপাশে রেলিং ধরে উল্টো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা। সূর্যাস্তের শেষ আলো এসে পড়েছে ওর শাড়ির আঁচলে।
মাশফি ইচ্ছে করেই গলার ভেতর থেকে একটু শব্দ তৈরি করল,”আহেম… আহেম!”
হঠাৎ কারো গলার শব্দে মেঘলার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল! ধরফর করে ঘাড় ঘুরিয়ে মাশফির দিকে তাকাল সে।
চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা-চওড়া, সুঠাম দেহের একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। যার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে মেঘলার দিকেই। এত কাছ থেকে মাশফিকে দেখতেই মেঘলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। অজান্তেই চোখের পাতা নিচু হয়ে এলো। নিজের অস্বস্তি সামলাতে নিঃশব্দে একবার ঢোক গিলে নিল সে। কী বলবে, কী করবে—কিছুই যেন মাথায় আসছে না। শুধু বুঝতে পারছে লজ্জা ধীরে ধীরে ওকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

মাশফি ধীরপায়ে মেঘলার দিকে এগিয়ে এলো। ছয় বছর আগের ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে আজকের মেঘলার যেন কোনো মিলই নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে বদলে গেছে অনেকটা। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের দোরগোড়ায় পা রাখা এক অপূর্ব রূপসী তরুণী।
মাশফি এসে মেঘলার একদম মুখোমুখি দাঁড়াল। ওর চোখেমুখে খেলে যাওয়া লজ্জা আর অস্বস্তি ছাপ গভীর মনোযোগে লক্ষ্য করে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি আমাকে পছন্দ করেন না?”
মেঘলা দ্রুত মাথা নাড়ল। দুই পাশে মাথা দুলিয়ে বোঝাল—না, তা নয়।
মাশফি ঠোঁটের কোণের হাসিটা ধরে রেখে আবার বলল,”তার মানে সত্যি করেন না?”
মেঘলা এবার হঠাৎ চমকে উঠে আমতা আমতা করে বলে উঠল,”আরেহ্ না না! কেন করব না…? করি তো, খুব করি!”
মাশফির ঠোঁটের কোণের হাসিটা এবার আরও চওড়া হয়ে উঠল। মাশফি একটু ঝুঁকে বেশ কৌতুহলী গলায় জিজ্ঞেস করল,
“খুব করেন?”
মাশফির এই প্রশ্নে আর মুখের এত কাছের উপস্থিতি দেখে মেঘলা এক মুহূর্তের জন্য দম আটকে থমকে গেল! নিজের মুখের ওপর মাশফির নিঃশ্বাসের উষ্ণ ছোঁয়া পেয়ে কী বলবে না বলবে, মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল ওর।
মাশফি চোখের দৃষ্টি আরও একটু গভীর করে বলল,

“আমাকে দেখতে এতই বারণ যে একবার নিচে নেমেও দেখতে আসলেন না…?”
মেঘলা হাতের আঙুল দিয়ে নিজের শাড়ির আঁচল পেঁচাতে পেঁচাতে চোখ মুখ লাল করে বলল,”লজ্জা লাগে তো… দেখতে চাইব না কেন…?”
মাশফি এক পা আরও এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,”এত লজ্জা কিসের, হুম?”
মেঘলা আর একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের করতে পারল না। কথাগুলো যেন ওর গলার ভেতর জড়িয়ে যাচ্ছে। মাশফি যেভাবে ওর দিকে তাকিয়ে আছে, আর এক সেকেন্ড যদি ও এই নির্জন ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে—তবে যে কী থেকে কী হয়ে যাবে, তা ভেবেই মেঘলার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল গুণ গুণ শব্দে!
“আমি… আমি জানি না! আমি আসছি…!”
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, শাড়ির আঁচল সামলে নিয়ে মেঘলা এক দৌড়ে মাশফিকে পাশ কাটিয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল!
মাশফি মেঘলার এই কাণ্ড দেখে হো হো করে হেসে উঠল। ছোট থাকতে যে মেয়েটা কথা বলতে বলতে অনায়াসে ওর কোলে এসে বসে পড়ত, সেই মেয়েটাই আজ ওর সামান্য দৃষ্টির সামনে দাঁড়াতে না পেরে লজ্জায় লাল হয়ে পালিয়ে গেল!
মেঘলার এমন লাজুক আচরণ আর তড়িঘড়ি করে পালিয়ে যাওয়া দেখে মাশফির ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। মুগ্ধ চোখে সিঁড়ির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ও নিঃশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

ঘড়ির কাঁটা নিজের নিয়মে ঘুরে চলেছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক—প্রায় এক ঘণ্টা পনেরো মিনিটের মতো সময় পার হয়ে গেছে।
যন্ত্রণার প্রচণ্ড ধাক্কায় কিছুক্ষণ আগেই জ্ঞান হারিয়েছিল মেহের। ধীরে ধীরে যখন জ্ঞান ফিরল, তখন চোখের পাতাগুলো খুলতেই যেন ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। সারা শরীর অবশ হয়ে এলেও পেট আর কোমরের অসহ্য ব্যথাটা ঠিকই টের পাচ্ছে সে। মনে হচ্ছে, শরীরের প্রতিটা হাড় যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ব্যথার তীব্রতাও যেন আরও বাড়ছে।
মেহের নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে ফেলল। অস্পষ্ট চেতনায় বারবার একটাই ভাবনা ফিরে আসছে—হয়তো আর বাঁচবে না সে। এই যন্ত্রণার পর হয়তো আর কোনো সকাল ওর জন্য অপেক্ষা করছে না।
প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে ওর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না, কেবল ওড়নার অংশটা দাঁতে চেপে ধরে নিঃশব্দে একাই যন্ত্রণার সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছে সে।
ঠিক এমন সংকটময় এক মুহূর্তে ফ্ল্যাটের দরজায় একটা ধাতব শব্দটা হলো।

আজ সকালেই রুদ্রর সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে হঠাৎ করেই পরিকল্পনা বদলে যায়। সিলেট যাওয়ার বদলে ঢাকার ভেতরে থাকা ওদের কয়েকটি টেক্সটাইল মিল আর গোডাউন পরিদর্শনে যেতে হয় তাকে। ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষরা যেভাবে একের পর এক ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, তাতে কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি রুদ্র। তাই সারাদিন এক মিল থেকে আরেক মিলে ঘুরে সবকিছু নিজের চোখে দেখে নিশ্চিত হতে হয়েছে।
দিনভর সেই দৌড়ঝাঁপ, ক্লান্তিকর কাজ আর মানসিক চাপ সামলে বিকেলের দিকে অবশেষে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরল রুদ্র।
পকেটে থাকা এক্সট্রা চাবি দিয়ে লক খুলে ড্রয়িংরুমে পা রাখল রুদ্র। ক্লান্তিতে ওর চোখের পাতা নিচু হয়ে আসছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকে কয়েক পা এগোতেই থমকে গেল সে।
ডাইনিং পার হয়ে লিভিং এরিয়ায় পা রাখতেই রুদ্রর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। সোফার পাশেই মেঝেতে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে মেহের। চোখ দুটো আধবোজা, কপাল আর মুখজুড়ে জমে থাকা ঘামে চুলগুলো লেপ্টে আছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে যেন—বারবার হাঁপিয়ে উঠে যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে সে।
মেহেরের শরীরের এই অবস্থা দেখে যে কেউ এক পলকে বলে দিতে পারবে—সে কতটা অমানুষিক কষ্টে ছটফট করছে!
রুদ্র এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে দ্রুত এগিয়ে গেল মেহেরের কাছে। মেঝের ওপর এক হাঁটু মুড়ে বসে ব্যাকুল কণ্ঠে ডেকে উঠল,

“মেহের! মেহের… এই যে মিস অ্যারোফোবিয়া!কী হয়েছে…?”
মেহেরের আবছা, ঝাপসা চোখে রুদ্রর অবয়বটা ফুটে উঠল। মস্তিষ্ক তখনও পুরো সজাগ নয়, তবুও ও বুঝতে পারল—রুদ্র এসেছে! মেহের তো ভেবেছিল আজ রাত না হলে রুদ্র কোনোভাবেই ফিরবে না। তবে কি আল্লাহ্ ওর প্রার্থনা শুনেছেন?
মেহের কোনোমতে কাঁপতে থাকা ঠোঁট দুটো ফাঁক করে অতি ক্ষীণ কণ্ঠে বলল,”আমাকে… আমাকে হসপিটালে নিয়ে যান…”
রুদ্র মেহেরের এই অবস্থা দেখে এক মুহূর্তের জন্য একদম দিশেহারা হয়ে পড়ল! কী করবে, কোথা থেকে শুরু করবে—মাথা যেন কাজ করা বন্ধ করে দিল।
মেহের একটু জোর দিয়ে বুজে আসা চোখ দুটো মেলে রুদ্রর দিকে তাকাল। তার কন্ঠে তখন বাঁচার আকুতি আর কষ্টের তীব্র হাহাকার,

“আমি পারছি না আর… আমি মরে যাব! আমাকে… আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যান…”
রুদ্র আর এক সেকেন্ডও ইতস্তত করল না।
কোনো কিছু না ভেবেই এক ঝটকায় হাত দুটি বাড়িয়ে মেহের কে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল।
যন্ত্রণার চরম সাগরে ভাসতে থাকা মেহের কোনোমতে ওর কাঁপতে থাকা হাত দুটো বাড়িয়ে রুদ্রর শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। মেহেরের অবচেতন মন আজকে বারবার সতর্ক করছে—আজ বোধহয় সে আর পারবে না! জীবনের এই কঠিনতম বাঁক পেরিয়ে ওর বেঁচে ফেরার আর কোনো উপায় নেই…।
কোলে মেহেরকে নিয়ে দ্রুত পায়ে ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে লিফটের বোতাম চাপল রুদ্র। নিজের গাড়ির পেছনের সিটে মেহেরকে খুব সাবধানে শুইয়ে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। স্টার্ট দিল ইঞ্জিন।
ভাগ্য ভালো ছিল যে এই সময়ে রাস্তায় তেমন কোনো জানজট ছিল না। স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে গাড়ি চালিয়ে প্রায় পনেরো-বিশ মিনিটের মাথায় রুদ্র গাড়ি নিয়ে সোজা সিটি হাসপাতালের ইমার্জেন্সির সামনে পৌঁছে গেল।

গাড়ির থামা মাত্রই রুদ্র হাঁক ছেড়ে স্ট্রাচারের ব্যবস্থা করল। মেহেরের অবস্থা দেখে চটজলদি নার্স আর অ্যাটেনডেন্টরা অ্যাটেন্ড করল ওকে। দ্রুত গতিতে মেহেরকে স্ট্রাচারে শুইয়ে দিয়ে
ওটি -র ( OT) দিকে ট্রলি ঠেলতে শুরু করল নার্সরা।
রুদ্র মেহেরের স্ট্রাচারের পাশাপাশি দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। মেহের কাঁপতে থাকা হাতে রুদ্রর হাতটা চেপে ধরল। চোখের কোন বেয়ে অনবরত নোনা জল ঝরে পড়ছে ওর। ও ডুকরে কেঁদে উঠে বলল,”ক্যাপ্টেন সাহেব…!”
রুদ্র নিজের হাতের মুঠোয় মেহেরের ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
” বল, আমি শুনছি…”
“আমার… আমার একটা আবদার আছে আপনার কাছে। রাখবেন…?” মেহের কান্না করতে করতে বলল।
রুদ্র মাথা নাড়ল,
“হ্যাঁ সব আবদার রাখবো, বলো কি চাও ”

মেহেরের চোখ দুটো বুজে আসছে যন্ত্রণায়। ও জড়িয়ে যাওয়া কণ্ঠে শেষ শক্তির চরমবিন্দু দিয়ে বলল,
“আমার… আমার মনে হচ্ছে আমি আর বাঁচব না। প্লিজ… আমার যদি কিছু হয়ে যায়, আমার বাচ্চাটাকে আমার বাবার বাড়ির কারও কাছে দেবেন না! প্লিজ…”
রুদ্র কী বলবে বা কীভাবে ওকে শান্ত করবে তা ভেবে পাচ্ছিল না।
মেহের রুদ্রর শার্টের হাতা খামচে ধরে আবার আকুতি জানিয়ে বলল,
“ওকে আপনার কাছেই রেখে দেবেন! আমি জানি… আমি জানি আপনি ওকে আগলে রাখতে পারবেন। আমার কেউ নেই আপনি ছাড়া… কথা দিন, ওকে রাখবেন আপনি?”
রুদ্রর বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে উঠল। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে মেহেরের ঝাপসা হয়ে আসা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,

” তোমার কিচ্ছু হবে না মিস অ্যারোফোবিয়া! কিচ্ছু হতে দেব না আমি, শান্ত হও!”
মেহের কান্নায় ভেঙে পড়ে জেদ ধরে বলল,
“কথা দিন আগে! কথা দিন…”
রুদ্র আর না পেরে মেহেরের চোখের দিকে তাকিয়ে জোর দিয়ে মাথা নাড়ল,
“কথা দিচ্ছি মিস অ্যারোফোবিয়া! আমি কথা দিচ্ছি… আমি ওকে দেখে রাখব, সব দায়িত্ব আমার! এবার শান্ত হও।”
ট্রলি ঠেলতে থাকা নার্সদের একজন রুদ্রকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল,
“দেখুন, উনাকে এখন ওটিতে নেওয়া হচ্ছে। আপনি দয়া করে বাইরে অপেক্ষা করুন।”
মেহেরকে নিয়ে ওটির ভারী দরজা দুটো বন্ধ হয়ে গেল।
কয়েক মিনিট পার হতেই করিডোর দিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে এলেন ডক্টর নিদিতা। গর্ভাবস্থার প্রথম দিন থেকে মেহেরের সমস্ত হিস্ট্রি আর চিকিৎসা ডক্টর নিদিতাই পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তাই এই পরিস্থিতিতে রুদ্র তাঁকেই ফোন করে হাসপাতালে ডেকে আনিয়েছে ।
রুদ্র ওটির বাইরের বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসেছিল। ডক্টর নিদিতাকে দেখতে পেয়েই এক ঝটকায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল সে। ব্যাকুল দৃষ্টিতে ওটি দরজার দিকে ইশারা করে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনো স্পষ্ট শব্দ বের হলো না।
ডক্টর নিদিতা রুদ্রর এই অবস্থা দেখে শান্ত কণ্ঠে বললেন,

“মিস্টার রাইহাম চৌধুরী, প্লিজ! প্যানিক করবেন না। শান্ত হন, এটা খুব নরম্যাল একটা সিচুয়েশন।”
‘নরম্যাল’ শব্দটা শুনতেই রুদ্রর ভেতরের চেপে রাখা উত্তাপ এক লহমায় ফেটে বের হয়ে এলো! মেহেরের যন্ত্রণাদগ্ধ মুখটা ওর চোখের সামনে ভাসছিল। রুদ্র প্রায় চেঁচিয়ে উঠে বলল,
“আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন নাকি ডক্টর?! আমার ওয়াইফ ভেতরে মরণ যন্ত্রণায় ছটফট করছে আর আপনি বলছেন এটা নরম্যাল?!”
ডক্টর নিদিতা রুদ্রর এই ব্যাকুলতা দেখে মৃদু একটু হাসলেন।
রুদ্র নিজেকে শান্ত করতে পারল না, কন্ঠে এবার এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব ফুটে উঠল,
“আমার ওয়াইফের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে ডক্টর… প্লেইজ! আপনি এভাবে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরে যান, কিছু একটা করুন! She is in extreme pain!”
ডক্টর নিদিতা হাত তুলে রুদ্রকে থামিয়ে শান্ত সুরে বললেন,

“কুল ডাউন, মিস্টার চৌধুরী… কুল ডাউন! আপনার বাচ্চার পৃথিবীতে আসার বড্ড তাড়া দেখা যাচ্ছে, তাই সে দুই সপ্তাহ আগেই চলে আসতে চাইছে। ওয়াটার ব্রেক হয়ে গেছে, তাই আমাদের এখনই একটা ইমার্জেন্সি সি-সেকশন করতে হবে।”

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪২

রুদ্র এক মুহূর্তও চিন্তা না করে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে আকুল কণ্ঠে বলে উঠল,
“আপনার যা যা প্রয়োজন করুন! যা ইমার্জেন্সি প্রসিডিউর লাগে করুন—কিন্তু আমার ওয়াইফকে সুস্থ করে দিন! সুস্থভাবে ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন, দয়া করে…”
ডক্টর নিদিতা মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ওটির ভেতরে ঢুকে গেলেন।

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৩