ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৩
মারিয়াম ফুল
ওটির ভেতরে ঢুকেও ডক্টর নিদিতার মুখে লেগে ছিল হালকা হাসি। তিনি মেহেরের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন, “মিসেস চৌধুরী, আপনার কপাল কিন্তু সত্যিই অনেক ভালো। আপনার হাজবেন্ড আপনাকে নিয়ে বড্ড বেশি দুশ্চিন্তা করছেন। উনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে ওটিতে উনি নিজে ঢোকার জন্য তৈরি হচ্ছেন! এরকম কেয়ারিং হাজবেন্ড কিন্তু আজকাল সহজে পাওয়া যায় না।”
মেহেরের শরীর তখন যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল। ডক্টর নিদিতা কী বলছেন, কেন হাসছেন—এসব তার কানে অস্পষ্ট কথার মতো পৌঁছালেও মাথার ভেতর কিছুই ঢুকছিল না। তবে ‘রুদ্র’ নামটা আর ডক্টরের হাসিটা তার সহ্য হলো না। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে চ্যাঁচাতে গিয়েও হাঁপিয়ে উঠে বলল, ““ডাক্তার, উনি চিন্তা করছেন এটা আমাকে এতবার জানাচ্ছেন কেন? আমি কি উনার চিন্তার লাইভ আপডেট চেয়েছি?”
আরেক দফা তীব্র ব্যথা উঠতেই মেহেরের পুরো শরীরটা কেঁপে উঠল। পেটের ওপর হাত রেখে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল সে। ব্যথার চাপে কয়েক মুহূর্ত ঠিকমতো কথাই বলতে পারল না। দ্রুত দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।কিন্তু আশপাশের সবার মুখ দেখে মেহেরের ধৈর্যের শেষটুকুও উধাও হয়ে গেল। কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“আমার এত কষ্ট হচ্ছে, আর আপনারা সবাই মিলে উনার চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত! উনি চিন্তা করুক, কান্না করুক, চাইলে হাসপাতালের সামনে বসে দোয়াও পড়ুক। আমাকে আগে এই কষ্টটা থেকে বাঁচান!”
আবারও ব্যথার ঢেউ উঠতেই মেহের চোখ বন্ধ করে গোঙানির মতো শব্দ করে শ্বাস ছাড়ল। কয়েক সেকেন্ড পর দাঁত চেপে বলল,“আর উনি যদি এতই চিন্তা করেন, তাহলে উনাকেই ওটিতে এনে অপারেশন করেন! আমি বাইরে দাঁড়িয়ে উনার জন্য চিন্তা করব!”
ব্যথার মাঝেও কথাটা বলে মেহের এমনভাবে মুখ বাঁকাল, যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমস্যাটাই হচ্ছে রুদ্রের অতিরিক্ত চিন্তা! ডক্টর নিদিতা মিটি মিটি হেসে বললেন,“এই সময়ে অনেকেই এমন করেন, মেহের।” মেহেরের গায়ের চাদরটা ঠিক করে দিয়ে তিনি নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন,“মেহের, রিল্যাক্স! একদম প্যানিক করবেন না। শান্ত হন। এত টেনশন করার কিছু নেই।”
মেহের ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে ডাক্তারের দিকে তাকাল।
ডক্টর নিদিতা আবারও মৃদু হেসে বললেন,“আপনি যত বেশি রাগবেন, তত বেশি কষ্ট হবে।”
মেহের সঙ্গে সঙ্গে বলল,“তাহলে আপনি হাসছেন কেন? আপনার তো কোনো কষ্ট হচ্ছে না!”
ডক্টর নিদিতা আর কিছু বললেন না। তিনি ভালো করেই জানেন, এই সময়ে রোগীকে বেশি কথা বলে বোঝানোর চেয়ে নিজের মতো করে শান্ত হতে দেওয়াটাই ভালো। তাই মেহেরকে আর কিছু না বলে তিনি ধীরে ধীরে প্রসিডিউর শুরু করলেন।
এদিকে ওটির বাইরে রাখা বেঞ্চটায় মাথা নিচু করে বসে ছিল রুদ্র। দুহাত দিয়ে মুখ ঢেকে কতক্ষণ ধরে যে একইভাবে বসে আছে, তার হিসাব নেই। কপাল বেয়ে আর ঘাড়ের কাছে ঠাণ্ডা ঘাম জমেছে। হাসপাতালের এই গন্ধ, ওটির বন্ধ দরজা আর ভেতর থেকে ভেসে আসা অস্পষ্ট শব্দগুলো যেন তার বুকের ভেতরটা ক্রমশ ভারী করে তুলছে।
ঠিক তখনই পকেটে থাকা ফোনটা হঠাৎ জোরে কেঁপে উঠল।
রুদ্র চমকে উঠল, থরথর করে কাঁপতে থাকা হাতে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“বাবা…..“
হামজা চৌধুরী কল করেছেন।হাসপাতালে পা রাখার পর থেকেই রুদ্রর গলা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও এই মুহূর্তে তার ভেতরের সমস্ত সাহস কোথায় যেন হারিয়ে গেল। মেহেরের কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতর অজানা একটা আশঙ্কা আরও চেপে বসল।
কাঁপা আঙুলে কলটা রিসিভ করল রুদ্র। ফোনটা কানে তুলেও কোনো কথা বলল না। শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল, ওপাশ থেকে বাবার কণ্ঠ শোনার অপেক্ষায়।
ওপাশ থেকে হামজা চৌধুরী কোনো সাড়া না পেয়ে উসখুস করে উঠলেন, “রুদ্র? কই তুমি? কথা বলছ না কেন? কী হয়েছে?”
বাবার কণ্ঠ শুনে রুদ্রর ঘোর কাটল। সে কোনো মতে গলাটা পরিষ্কার করে থেমে থেমে বলল, “বাবার… বাবা, হাসপাতালে…”
“কী! হাসপাতালে কেন? কী হয়েছে রুদ্র?” হামজা চৌধুরীর কণ্ঠে একমুহূর্তেই উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল।
“মেহের… মেহেরের…” রুদ্র তোতলাতে লাগল।
হামজা চৌধুরী অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, “আহা, পরিষ্কার করে বলো! মেহেরের কী হয়েছে?”
“ডেলিভারি পেইন উঠেছে বাবা।”
“ডাক্তার কী বলছে? ওটিতে নিয়েছে?” হামজা চৌধুরী ভেবে পেলেন না, তার ছেলে একা একা ঢাকায় এই পরিস্থিতিতে কীভাবে কী সামলাচ্ছে। কিন্তু হঠাৎই তার মনে একটা খটকা লাগল। মেহেরের তো এখন মাত্র সাড়ে সাত মাস চলে! তিনি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, “এখনই? কিন্তু সময় তো আরও বাকি ছিল ”
বাবার কথা শুনে রুদ্রের যেন হঠাৎ হুঁশ ফিরল। মেহেরকে ডেলিভারির জন্য নেওয়া হয়েছে, কথাটা বাবার কাছে গোপন রাখারই চেষ্টা করছিল সে। অথচ দুশ্চিন্তার ঘোরে কখন যে নিজের অজান্তেই বলে ফেলেছে, নিজেই টের পায়নি।
মনে মনে নিজেকেই ধমক দিল রুদ্র। তারপর এক মুহূর্ত থেমে নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনের ওপাশে বাবাকে বলল, “ডাক্তার বললেন… অস্বাভাবিক কিছু না। এরকম হতেই পারে।”
হামজা চৌধুরী ঘন ঘন মাথা নাড়লেন, “হাঁ, হাঁ। অনাবিয়ার জন্মও তো সাড়ে সাত মাসেই হয়েছিল। ঠিক আছে, আমি এখন আর কথা বাড়াচ্ছি না। রেহানাকে নিয়ে কাল সকালের মধ্যেই ঢাকা রওনা হচ্ছি।”
রুদ্র আর কথা বাড়াতে চাইল না। এক ধরনের তীব্র অস্বস্তি তাকে চেপে ধরছিল। বাবার কাছে কথাটা গোপন রাখতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত নিজের অজান্তে বলে ফেলেছে সে। এখন বাবার আরও কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না। তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সে কলটি কেটে দিল।
কয়েক মুহূর্ত ফোনটা হাতেই ধরে দাঁড়িয়ে রইল রুদ্র। তারপর ধীরে ধীরে সেটি পকেটে রেখে করিডোর ধরে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল। হাসপাতালের করিডোরজুড়ে মানুষের ব্যস্ত আনাগোনা, দূর থেকে ভেসে আসা নার্সদের কথাবার্তা, কোথাও কোনো রোগীর স্বজনের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ, সবকিছুই তার কানে আসছিল। অথচ সেসবের কোনোটাতেই মনোযোগ দিতে পারছিল না সে। তার সমস্ত চিন্তা যেন এক জায়গাতেই আটকে আছে, মেহেরের কাছে।
ওয়াশরুমে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই রুদ্র থমকে গেল। আয়নায় দেখা মানুষটাকে কয়েক মুহূর্ত নিজের বলেই মনে হলো না। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর লেপ্টে আছে, শার্টের কলারটা অগোছালো, চোখেমুখে স্পষ্ট ক্লান্তির ছাপ। রুদ্র ধীরে করে চোখ নামিয়ে নিল। নিজেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে, ডাক্তাররা আছেন, সবকিছু সামলে নেবেন। তবু মনটা কোনোভাবেই শান্ত হচ্ছে না।নিজেকে শান্ত করার জন্য বেসিনের কল ছেড়ে দুহাতে মুখে-চোখে ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিল।
পানি দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে নিজের ওপরই একরাশ বিরক্তি আর রাগ জমে উঠল রুদ্রর। কেন সে ওভাবে লোকজনের সামনে ‘ওয়াইফ ওয়াইফ’ করে চ্যাঁচাল? এত মানুষ, এত নার্স-ডাক্তারের সামনে কী থেকে কী বলে ফেলল! মানসিকভাবে যে চাপটা সে এতক্ষণ বয়ে বেড়াচ্ছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে গেছে এভাবে—ভেবে নিজের ওপরই মেজাজ খারাপ হতে লাগল তার। মুখটা তোয়ালে দিয়ে মুছে, ধীরপায়ে সোজা আবার ওটির দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল ওটির দরজার দিকে। দেখল, ডক্টর নিদিতা আবার ওটি থেকে বের হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন!
রুদ্রর ভেতরের রাগটা এক লহমায় সপ্তমে চড়ে গেল। এই মহিলা ভেতরে অপারেশনে না থেকে বারবার বাইরে আসছে কেন? চোখের সামনে এক মুহূর্তের জন্য মেহেরের রক্তবর্ণ হয়ে যাওয়া মুখটা ভেসে উঠল। সে হনহন করে ডক্টরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রায় গর্জে উঠল, “ডক্টর! আমার স্ত্রী ভেতরে যন্ত্রণায় ছটফট করছে আর আপনি এখানে এসে দাঁড়িয়ে আছেন?! তাড়াতাড়ি ভেতরে যান! আমার বউয়ের যদি কিছু হয়, আমি কিন্তু কাউকে ছেড়ে কথা বলব না! ওর যে কতটা কষ্ট হচ্ছে, সেটা কি আপনি দেখতে পাচ্ছেন না?!”
একশ্বাসে কথাগুলো বলে রুদ্র হাঁপাচ্ছিল। ডক্টর নিদিতা তার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর মৃদু হেসে কয়েক পা এগিয়ে এলেন।
“মি. রাইহাম চৌধুরী, শান্ত হন। আপনি বাবা হয়েছেন। যার জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন, সে চলে এসেছে। কনগ্র্যাচুলেশনস!”
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, সে হয়তো কোনো ভুল শুনছে বা হ্যালুসিনেট করছে। ডক্টর কি ভুল বলছেন?কয়েক সেকেন্ড নিথর হয়ে থাকার পর রুদ্র আবার অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “আ-আপনি শিওর ডক্টর?”
“হ্যাঁ, মি. চৌধুরী! আপনি পুত্রসন্তানের বাবা হয়েছেন ! আসলে ওটিতে নেওয়ার পর সি-সেকশনের আর প্রয়োজনই পড়েনি। আপনার ছেলের একদমই তর সইছিল না, ভীষণ তাড়াহুড়ো করে পৃথিবীতে চলে এসেছে।”
রুদ্রর গলার আওয়াজ পুরোপুরি কেঁপে গেল। সে অস্পষ্ট স্বরে বলল, “ছেলে…? আর… আর মেহের?”
ডক্টর নিদিতা আশ্বস্ত করে বললেন, “মা আর বাচ্চা দুজনেই একদম সুস্থ আছে। বাচ্চাকে ক্লিন করে আনা হচ্ছে, আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মেহেরকে রেস্ট রুমে শিফট করে দেওয়া হবে। চিন্তার কিছু নেই।”
একটু থেমে ডক্টর নিদিতা হেসে বললেন,”অ্যান্ড ইউ আর অ্যান অ্যামেজিং হাজবেন্ড, মি. চৌধুরী। প্রথম থেকে দেখছি, আপনি যেভাবে ওর খেয়াল রাখছেন…”
রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে চোখ নিচু করে ফেলল। সে নিজের অজান্তেই কীভাবে মেহেরের জন্য এত ব্যাকুল হয়ে উঠল, কেন এমন আচরণ করল—তার নিজের কাছেই কোনো উত্তর নেই। একজন পেশাদার ডাক্তারের সামনে এভাবে মেজাজ হারানোটা যে মোটেও উচিত হয়নি, তা বুঝতে পেরে তার মধ্যে অপরাধবোধ কাজ করতে লাগল।
রুদ্র নিচু গলায় বলল, “আই অ্যাম সরি, ডক্টর নিদিতা। আসলে… আমার এভাবে রিয়্যাক্ট করা একদম উচিত হয়নি।”
“ইটস ওকে, মি. চৌধুরী। আমি কিছু মনে করিনি। আমাদের পেশায় এসব প্রতিদিনের ঘটনা। রিল্যাক্স ” ঠিক তখনই ডক্টর নিদিতার ফোনে একটি কল এলো। কথা শেষ করে তিনি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাচ্চাকে আনা হচ্ছে, আপনি এখানেই একটু ওয়েট করুন। আমি আসছি।”
ডক্টর নিদিতা চলে যাওয়ার পর রুদ্র নিস্তব্ধ করিডোরে একাই দাঁড়িয়ে রইল।রুদ্রর বুকের ভেতর আটকে থাকা ভারী চাপটা যেন এক অচেনা অনুভূতির কাছে ধীরে ধীরে হার মানতে শুরু করল। এতক্ষণ যে অস্বস্তিটা তাকে দুমড়ে-মুচড়ে খাচ্ছিল, সেটা কোথায় যেন তলিয়ে গেল। কেন যে বুকের ভেতরটা এভাবে এক অনাবিল খুশিতে উপচে উঠছে, তার কোনো হিসেব রুদ্র নিজেও মেলাতে পারছে না। মিস অ্যারোফোবিয়া মা হয়ে গেল?
চিন্তার মাঝেই ওটির দরজাটা নড়ে উঠল। এতক্ষণ ধরে যে বন্ধ দরজাটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিল রুদ্র, সেটার দিকে নজর পড়তেই বুকের ভেতরটা আবার ধক করে উঠল।
দরজা ঠেলে এক নার্স তোয়ালে দিয়ে পেঁচানো ছোট্ট এক সদ্যজাতকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তোয়ালে দিয়ে খুব ভালোভাবে মোড়ানো থাকায় বাচ্চাটার মুখটা প্রথম দর্শনে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তোয়ালের ভাঁজের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে থাকা পুঁচকে দুটো আঙুল আর পায়ের সামান্য অংশ চোখ পড়তে রুদ্রর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। এত ছোট! এতটাই ছোট যে, ওর এক হাতের তালুতেই বুঝি পুরো শরীরটা এঁটে যাবে।
নার্স ধীরপায়ে রুদ্রর কাছে এগিয়ে এলেন। মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে হাত বাড়িয়ে বললেন, “আপনার ছেলে…”
‘আপনার ছেলে’—কথাটা কানে যেতেই রুদ্রর বুকের ভেতর অচেনা এক স্পন্দন দোলা দিয়ে গেল।তার ছেলে?
শব্দ দুটো যেন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। এতদিন যে সম্পর্কটাকে কেবল দূর থেকে অনুভব করেছে, আজ সেটাই তার দুহাতের নাগালে। নার্স তাড়া দিয়ে বললেন, “স্যার? আপনার ছেলেকে কোলে নেবেন না?”
নার্সের কণ্ঠস্বরেই রুদ্রর ভাবনার ঘোর কেটে গেল। এতক্ষণ নিজের ভেতরেই ডুবে ছিল সে। এবার ধীরে ধীরে দুহাত বাড়িয়ে দিল শিশুটাকে নিজের কাছে নেওয়ার জন্য।অদ্ভুতভাবে কাঁপছে হাত দুটো। নিজের অজান্তেই আঙুলগুলো কেঁপে উঠছে, অথচ রুদ্র সেগুলো স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এই কাঁপুনির ভেতর যেন অকারণেই ফিরে এলো আট বছর আগের সেই দিনটা।
ঠিক আজ থেকে আট বছর আগে অনাবিয়াকেও এভাবেই প্রথম কোলে নিয়েছিল সে। সাদা তোয়ালে জড়ানো সেই ক্ষুদ্র শরীরটা প্রথমবার নিজের বাহুর মধ্যে নেওয়ার মুহূর্তটা আজও স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন বুকের ভেতর ছিল বিস্ময়, আনন্দ আর এক নতুন জীবনের আগমনে জন্ম নেওয়া অপার মুগ্ধতা।আজও সামনে একই রকম একটি ছোট্ট শরীর। একই সাদা তোয়ালে। অথচ অনুভূতিটা যেন সম্পূর্ণ অন্যরকম।
আজকের এই আনন্দের ভেতরেও কোথা থেকে যেন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে এক পুরোনো আতঙ্ক। আট বছর আগের সেই স্মৃতি আচমকা বুকের গভীরে চাপ ফেলতেই গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল কিছু একটা। রুদ্র কষ্ট করে ঢোকটা গিলে নিল। বুকের ভেতরটা একবার মোচড় দিয়ে উঠলেও এবার সে চোখ সরাল না।নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে জোর করে সামলে নিল রুদ্র। তারপর আরও একটু এগিয়ে গিয়ে অত্যন্ত সাবধানে শিশুটাকে দুহাতের মধ্যে তুলে নিল।কোলে আসতেই ক্ষুদ্র শরীরটার উষ্ণতা ছুঁয়ে গেল তার বুক।
মনে হলো, যেন তুলোর একটা হালকা পুটলি তুলে নিয়েছে সে! এতটুকু একটা মানুষ কীভাবে এতটা অসহায় হতে পারে, ভাবতেই বুকের ভেতরটা চরম মমতায় নরম হয়ে এলো। কোথায় হাত রাখবে, কতটা শক্ত করে ধরবে—কিছুই যেন বুঝে উঠতে পারছিল না সে।
সদ্য জন্মানো বাচ্চাটা নিজের এক হাত মুখে দিয়ে শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। মাঝে মাঝে তার চোখের পাতলা পাপড়ি দুটো কেঁপে উঠছে, ছোট্ট শরীরটা একটু বাঁকিয়ে আলতো মোচড় দিচ্ছে। রুদ্রর মনে হলো, ও যেন এক জীবন্ত পুতুল কোলে ধরে আছে। এত ক্ষুদ্র একটা প্রাণ তার বুকের ওপর নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। অথচ এই ছোট্ট প্রাণটাকেই ঘিরে রুদ্রর ভেতরটা যেন এক নিমেষে মায়া আর ভালোবাসায় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল।
বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রইল রুদ্র। কিছুক্ষণ যেন চোখ সরাতেই পারল না। এত ছোট্ট একটা মানুষ, অথচ কী আশ্চর্য শান্ত তার মুখ! মসৃণ, তুলতুলে গাল দুটো ঘুমের মধ্যেও কেমন নরম হয়ে আছে। পেন্সিলের ডগা দিয়ে খুব যত্ন করে এঁকে দেওয়া মনে হয় ছোট্ট দুটো ভ্রু। চোখ দুটো বন্ধ, পাতার ওপর চিকন কালো পাপড়িগুলো নিশ্চুপ পড়ে আছে। এতটুকু একটা মুখে এতটা মায়া কী করে থাকে, রুদ্রর মাথায় এল না।
আরও একটু ঝুঁকে তাকাল সে।পরক্ষণেই কেমন যেন থমকে গেল রুদ্র। প্রথম দেখায় যা চোখে পড়েনি, এবার তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই মুখটা যে মেহেরের! একেবারে মেহেরের মতো।
নাকটা মেহেরের মতোই ছোট আর সরু। চোখের গড়নেও সেই একই পরিচিত ছাপ। ঘুমিয়ে থাকায় চোখ দুটো এখন দেখা যাচ্ছে না, তবুও বন্ধ চোখের পাতার আকারটুকুতেই রুদ্র মেহেরকে চিনে ফেলল। ঠোঁটের নিচে ছোট্ট একটা তিল, ডান চোখের পাশেও আবছা একটা তিল উঁকি দিচ্ছে। রুদ্র কিছুক্ষণ নিঃশব্দে সেদিকেই তাকিয়ে রইল।
এতটুকু একটা মানুষ, অথচ তার মুখজুড়ে মেহেরের এত চেনা ছাপ! রুদ্রর বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।রুদ্র আলতো করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। মনে মনে ভাবল, আরেকটা অ্যারোফোবিয়া চলে এলো?
পরক্ষণেই নিজের ভেতরের সেই কঠিন খোলসটা আর ধরে রাখতে পারল না সে। নিজেকে তো দূর, নিজের মনকেও যেন ধমক দেওয়ার কোনো পথ অবশিষ্ট নেই এখন।
বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে রুদ্রর ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটে উঠল। ও আলতো গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল, “উফ… একদম মায়ের মতো হয়েছে আমার ছেলেটা!”
বলেই আবার বাচ্চাটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল।
“এই যে! মায়ের সবকিছু চুরি করে নিয়ে এসেছেন দেখি…”
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪২ (২)
রুদ্র আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় বাচ্চাটার তুলতুলে গাল স্পর্শ করল। তারপর দুই হাতের আঙুল দিয়ে ওর এতটুকু মুখটার মাপ নিতে নিতে হালকা হেসে বলল,
“নাকটা চুরি, চোখ দুটো চুরি, তিলও চুরি…হুম? না,না
দেখতে একদম বিড়ালের বাচ্চার মতো হয়েছে। এতটুকুন নাক, এতটুকুন মুখ…”
