মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৫
ফারহানা নিঝুম
হোটেলকক্ষের দরজাটি বন্ধ হতেই যেনো সমগ্র পৃথিবীর কোলাহল বাইরে রুদ্ধ হয়ে গেল। দীর্ঘ ভ্রমণের অবসাদে জুঁই প্রায় ভেঙে পড়েছে। কোনো রকমে ব্যাগটা একপাশে ছুঁড়ে দিয়ে ধপাস করে নরম বিছানার উপর শরীর এলিয়ে দিল সে।
অবসন্ন নিশ্বাস ফেলে বিরক্ত স্বরে বিড়বিড় করল,
“উফ্, আর পারছি না! এই একটা জার্নিতেই যেনো প্রাণ বেরিয়ে গেল!”
তার কপালের কিনারায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘামবিন্দু জমেছে। বাংলাদেশের আর্দ্র উষ্ণতা যেনো শরীরের সমস্ত শক্তি শুষে নিয়েছে। অপরদিকে আব্রাহাম যথারীতি স্থির ও সংযত। সে ল্যাগেজ খুলে পরিপাটি ভঙ্গিতে জামাকাপড় বের করতে লাগল। এই গ্রেড হোটেলটিতেই তারা প্রায় প্রতি বিজনেস ট্রিপে অবস্থান করে। এবারের সফরও তার ব্যতিক্রম নয়। পাশের কক্ষেই অবস্থান করছেন জেসমিন বাদশাহ ও রাজিব বাদশাহ।
জুঁইয়ের কাহিল অবস্থা দেখে আব্রাহামের অধরে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল। গভীর স্নেহমিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“জুঁইফুল, ওঠো। তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হতে হবে তো।”
জুঁই কাতর আলস্যে গড়িয়ে পড়ে বলল,
“না প্লিজ। আমার একদম ইচ্ছে করছে না।”
কিন্তু আব্রাহাম যেনো সেই অনুনয় শ্রবণই করল না। পরমুহূর্তেই আচমকা তাকে দু’হাতে তুলে নিল বুকে।
অপ্রস্তুত জুঁই আতঙ্কে হকচকিয়ে উঠে বাধ্য হয়ে তার গলা আঁকড়ে ধরল। বিস্ফারিত নয়নে বলল,
“এই! কী করছেন? নামান আমাকে!”
“হুঁশ,,
গভীর স্বরে থামিয়ে দিল আব্রাহাম।
এরপর দীর্ঘ পদক্ষেপে তাকে নিয়ে প্রবেশ করল ওয়াশরুমে। সাদা মার্বেলঘেরা প্রশস্ত স্থানটিতে শীতল সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছিল। আলতো করে জুঁইকে শাওয়ারের নিচে নামিয়ে দিতেই আব্রাহাম জলধারা চালু করে দিল।
পরক্ষণেই বরফশীতল জলের প্রবল ধারা দু’জনকে সম্পূর্ণ ভিজিয়ে দিল।
জুঁই কেঁপে উঠল। ঠান্ডার আকস্মিক স্পর্শে শরীর অবশপ্রায়। ভীত শিশুর ন্যায় আব্রাহামের কলার চেপে তার বুকের ভেতর আশ্রয় নিল সে।
কিন্তু সেই মুহূর্তে সে অনুধাবনই করতে পারল না আব্রাহাম নিবিড় মোহাবিষ্ট দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে।
ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল বেয়ে নেমে এসেছে। জলের ক্ষুদ্র কণাগুলো কাঁপতে থাকা অধরে ঝিলমিল করছে। এক অদ্ভুত কোমলতায় আচ্ছন্ন দেখাচ্ছে জুঁইকে।
হঠাৎই সেই দৃষ্টি অনুভব করে আড়ষ্ট হয়ে গেল কন্যাটি। কাঁপা কণ্ঠে বলল,
“কি,,,কী দেখছেন?”
আব্রাহাম ধীরে ধীরে তার আরো নিকটে ঝুঁকল। তার কণ্ঠ তখন মাদকতায় ভারী।
“আমার জুঁইফুলকে দেখছি।”
বাক্যটি শ্রবণ করতেই জুঁইয়ের হৃদস্পন্দন যেনো অকারণে দ্রুততর হয়ে উঠল। লজ্জায় অবনত হয়ে এলো তার দৃষ্টি।
আব্রাহাম আরও একপা অগ্রসর হলো। তারপর অত্যন্ত নিম্নস্বরে বলল,
“জুঁই,তোমাকে একটু ছুঁতে পারব?”
প্রশ্নটি শুনে যেনো সময় থমকে গেল। জুঁইয়ের সমগ্র অস্তিত্ব হঠাৎ অদ্ভুত শিহরণে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। কী উত্তর দেবে বুঝতে পারল না। কণ্ঠরোধ হয়ে এলো।
আব্রাহাম তখন আর নিজেকে সম্পূর্ণ সংযত রাখতে পারল না। ধীরে ধীরে তার লতানো কোমরে হাত রাখল। ভেজা শরীরের উষ্ণ কম্পন অনুভব করতেই যেনো দু’জনের মাঝখানের সমস্ত দূরত্ব বিলীন হয়ে গেল।
জুঁইকে আলতো চাপ দিয়ে দেয়ালের সঙ্গে আবদ্ধ করল সে। তাদের মাঝখানে তখন কেবল দ্রুততর নিশ্বাসের শব্দ।
অতঃপর আব্রাহাম অত্যন্ত নিবিড় আবেশে তার কপালে, তারপর অধরে স্নিগ্ধ চুম্বন এঁকে দিল।
মুহূর্তেই জুঁইয়ের চোখ বুজে এলো।
সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে তার। মনে হচ্ছে চারপাশের পৃথিবী রঙিন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। এই অনুভূতির ভাষা নেই এ যেনো দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হঠাৎ প্রাপ্ত কোনো নিষিদ্ধ স্বপ্নের স্পর্শ।
দু’জনের নিঃশ্বাস একাকার হয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল শীতল জলধারার শব্দে। বাইরে হয়তো এখনও ব্যস্ত নগরী জেগে আছে, কিন্তু সেই ক্ষুদ্র ওয়াশরুমের ভেতর তখন কেবল তাদের নীরব অনুভূতিরই।
“হ্যাঁ, আমরা ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছে গেছি। তুমি বলো, বাকিরা কোথায় আছে এখন?”
হোটেলের নরম আলোকচ্ছটায় মোবাইল কানে নিয়ে মৃদুস্বরে প্রশ্ন করলেন জেসমিন বাদশাহ। তার কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনদের খোঁজ পাওয়ার প্রশান্তি।
ওপাশ থেকে তারা বাদশাহ শান্ত গলায় উত্তর দিলেন,
“রিমঝিম নিজের ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। আর ঝুমঝুম এখনও বাড়ি ফেরেনি। স্টুডিওতে গেছে।”
কথাগুলো শ্রবণ করতেই জেসমিন বাদশাহর অন্তরজুড়ে যেনো এক অদ্ভুত স্বস্তির তরঙ্গ বয়ে গেল। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার যন্ত্রণা তিনি অন্য যেকোনো মানুষের তুলনায় অধিক গভীরভাবে অনুভব করেন। জীবনের দীর্ঘ বারোটি বছর নিঃসঙ্গতার দহন বুকে নিয়ে অতিবাহিত করেছেন তিনি।
এখন আর সেই শূন্যতায় ফিরে যাওয়ার সামর্থ্য নেই তার।
এখন তিনি মানুষগুলোর কোলাহল চান। চান সংসারের উষ্ণতা। চান প্রিয় মুখগুলোর উপস্থিতি।
তারা বাদশাহর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপ শেষ করেই ধীর পদক্ষেপে আব্রাহামের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলেন তিনি। করিডোরজুড়ে নরম সুগন্ধি আর মৃদু আলোকসজ্জা ছড়িয়ে আছে। দরজায় সশব্দে টোকা দিতেই কিছুক্ষণ পর সেটি খুলে দিল জুঁই।
সদ্য ফ্রেশ হওয়া কন্যাটির মুখমণ্ডলে তখনও ক্লান্তির আবছা ছায়া রয়ে গেছে। ভেজা চুলের ডগা থেকে ক্ষুদ্র জলকণা ঝরে পড়ছে। জেসমিন বাদশাহ স্নিগ্ধ হাসি হেসে বললেন,
“ভেতরে আসব?”
জুঁই তৎক্ষণাৎ সংকোচমিশ্রিত স্বরে বলে উঠল,
“পারমিশন নিচ্ছো কেন মামুনি? এসো।”
ভেতরে প্রবেশ করতেই জেসমিন বাদশাহর দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো আব্রাহামের উপর। সে তখন তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম দিক থেকে বেরিয়ে আসছে।
পুত্রকে দেখে জেসমিন বাদশাহর অধরে মৃদু হাস্যরেখা ফুটে উঠল। অতঃপর তিনি বললেন,
“রাতে তৈরি থাকিস আব্রাহাম। আজ আমরা চৌধুরী বাড়িতে যাবো। আজগর চৌধুরী নিজে অপেক্ষা করতে বলেছেন।”
আজগর চৌধুরী নামটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেনো জুঁইয়ের মুখাবয়বের সমস্ত উজ্জ্বলতা নিমেষে নিভে গেল।
মুহূর্তকাল পূর্বেও যেখানে তার চোখে ক্ষীণ উজ্জ্বলতা ছিল, সেখানে এখন নেমে এলো এক অদৃশ্য গম্ভীরতা।
কেনই বা হবে না? যে মানুষটি র’ক্তের সম্পর্কে তার বাবা, সেই মানুষটিই তো কোনোদিন তাকে প্রকৃত কন্যার মর্যাদা দিয়ে বুকে আগলে রাখেনি। স্নেহমাখা আহ্বানে কাছে ডাকেনি। তার শৈশবের অধিকাংশ স্মৃতিজুড়েই রয়েছে এক শীতল দূরত্ব এক নির্মম অবহেলা।
বাবা নামক আশ্রয়টি তার জীবনে কখনো সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেনি। জেসমিন বাদশাহ অবশ্য সেই অন্তর্লীন ঝড় অনুভব করতে পারলেন না। তিনি স্নেহভরে জুঁইয়ের চিবুক স্পর্শ করে কোমল কণ্ঠে বললেন,
“নিশ্চয়ই জুঁই ভীষণ খুশি? এতদিন পর বাবার কাছে যাবে বলে?”
জুঁই অধরে কৃত্রিম হাসির ক্ষীণ রেখা টেনে মাথা নাড়ল।
হাসিটা ছিল কিন্তু তাতে উচ্ছ্বাস ছিল না। ছিল না কোনো আকাঙ্ক্ষা। বরং সেখানে লুকিয়ে ছিল বহুদিনের অব্যক্ত অভিমান। আব্রাহাম নীরবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। জুঁইয়ের চোখের ভাষা তার অচেনা নয়। কন্যাটির অন্তর্নিহিত বেদনার ক্ষীণতম কম্পনও এড়ায় না তার দৃষ্টি।
সে স্পষ্ট অনুভব করল জুঁই বাহ্যিক স্বাভাবিকতার আবরণে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করছে, অথচ অন্তরে তার বহু পুরনো ক্ষ’ত আবারও র’ক্তাক্ত হয়ে উঠেছে!
মাশা: বেয়াররর! লুক হোয়াট আই ফাউন্ড!
বেয়ার: ওহ নো নট এগেইন।
মাশা: ডোন্ট ওরি, আই উইল হেল্প ইউ!
বেয়ার: দ্যাটস এক্স্যাক্টলি হোয়াট ওয়ারিজ মি।
মাশা: হোয়াই আর ইউ সো সিরিয়াস?
বেয়ার: বিকজ ইউ আর অ্যারাউন্ড।
মাশা: বেয়ার, ওয়েট ফর মিইই!
বেয়ার: মাশা, স্লো ডাউন!
মাশা: আই’ম নট নটি জাস্ট কিউরিয়াস!
বেয়ার: কিউরিওসিটি কজেস ট্রাবল।
মাশা: উই আর বেস্ট ফ্রেন্ডস ফরএভার!
বেয়ার: হুম, ফরএভার ইনডিড।
মাশা: উইদাউট মি ইউ’ড বি বোরড!
বেয়ার: মেবি।
মাশা: বেয়ার, ইউ লাভ মি, রাইট?
বেয়ার: ইউ টক টু মাচ।
মাইক্রোফোনের লাল আলোকবিন্দুটি নিভে যেতেই সমগ্র ডাবিং স্টুডিওজুড়ে একপ্রকার প্রশান্ত নীরবতা নেমে এলো। মুহূর্তকাল পূর্বেও যেখানে মাশা আর বেয়ারের চপল সংলাপে চারদিক সরগরম হয়ে উঠেছিল, সেখানে এখন কেবল ভেসে আসছে দমকা হাসির ক্ষীণ প্রতিধ্বনি।
ঝুমঝুম ধীরে ধীরে হেডফোনটি কানের পাশ থেকে সরিয়ে রাখল। অতঃপর কাচঘেরা রেকর্ডিং বুথ থেকে বেরিয়ে আসতেই তার অধরে প্রস্ফুটিত হলো একরাশ উচ্ছল হাস্যরেখা। সদ্য সমাপ্ত সংলাপের স্মৃতি যেনো এখনও তার চেতনায় ঝঙ্কার তুলছে।
কিম জন যে এতক্ষণ বেয়ারের গম্ভীর কণ্ঠস্বরের আড়ালে নিজেকে আড়াল করে রেখেছিল সেও মৃদু হেসে উঠল। তার হাসির ভঙ্গিমায় ছিল প্রশ্রয়মিশ্রিত স্নিগ্ধতা। ঝুমঝুমের শিশুসুলভ প্রাণচাঞ্চল্য দেখলে প্রায়শই বিস্ময়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে সে। যেনো কন্যাটি নিজেই এক জীবন্ত কার্টুন অদম্য, দুরন্ত, হৃদয়গ্রাহী।
“গুড জব, ঝুমঝুম।”
নিম্নস্বরে বলল জন। ঝুমঝুম কেবল ক্লান্ত হাসি উপহার দিল। আজ সারাদিনের অবিরাম রেকর্ডিংয়ে তার শরীর প্রায় অবসন্ন। চোখের নীচে ক্লান্তির গাঢ় ছাপ স্পষ্ট। তবুও সকলকে নম্র বিদায় জানিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে স্টুডিও ত্যাগ করল সে।
বাইরের আবহাওয়ায় তখন সন্ধ্যার নরম শীতলতা। নগরীর নিয়নবাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। রাস্তাজুড়ে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা, গাড়ির কোলাহল।
নিজের সাইকেলটি ধীরগতিতে চালাতে চালাতে ঝুমঝুমের হঠাৎ মনে পড়ল খরগোশটার কথা। গত সপ্তাহে শহরের এক পোষাপ্রাণীর দোকান থেকে সে বিশেষভাবে একটি সাদা খরগোশ পছন্দ করেছিল। তুলোর মতো নরম পশম, লালচে কাচের মতো চোখ আর অবিশ্বাস্য শান্ত স্বভাব প্রথম দেখাতেই প্রাণীটির প্রতি মায়াজাল বিস্তার করেছিল ঝুমঝুমের হৃদয়ে।
সেদিন অগ্রিম পেমেন্ট পর্যন্ত পরিশোধ করে এসেছিল সে। দোকানদার আশ্বাস দিয়েছিল, এক সপ্তাহ পর এসে নিয়ে যাবেন ম্যাম।
সেই স্মৃতি মনে হতেই ক্লান্ত মুখেও একচিলতে প্রশান্তির আভা ফুটে উঠল। খরগোশের দোকানের সম্মুখে পৌঁছে সাইকেল থামাল ঝুমঝুম। কিন্তু ঠিক পরমুহূর্তেই তার দৃষ্টি স্থবির হয়ে গেল।
দোকানের কাঁচের দরজা ঠেলে এক দম্পতি বেরিয়ে আসছে। আর তাদের হাতেই রয়েছে সেই খরগোশটি!
মুহূর্তেই যেনো সমগ্র পৃথিবী স্থির হয়ে গেল ঝুমঝুমের কাছে। বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।
না, ভুল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। খরগোশটির ডান কানের কাছে থাকা ক্ষুদ্র ধূসর দাগটি স্পষ্ট চিনতে পারল সে। এটাই তার খরগোশ। তার পছন্দের। তার জন্য সংরক্ষিত।
“এক্সকিউজ মি!”
প্রায় ছুটে ভেতরে প্রবেশ করল ঝুমঝুম।
কাউন্টারের পেছনে থাকা কর্মচারী প্রথমে বিস্মিত হয়ে তাকাল। ঝুমঝুম কাঁপা অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“এটা কী হচ্ছে? উনারা কার খরগোশ নিয়ে গেলেন?”
লোকটি কম্পিউটারের স্ক্রিনে কিছুক্ষণ চোখ বুলিয়ে নির্বিকার স্বরে বলল,
“ওহ,,দশ। এই নাম্বারটা?”
পরক্ষণেই ঝুমঝুমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল।
“এটা কোন ধরণের আচরণ? আমি সেই খরগোশ নিজের জন্য বুক করেছি! পেমেন্ট পর্যন্ত করেছি! আপনারা কীভাবে অন্য কাউকে দিয়ে দিলেন?”
কণ্ঠস্বরের তীব্রতা সমগ্র দোকানে প্রতিধ্বনিত হলো। আশেপাশের ক্রেতারাও কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর অন্তঃকক্ষ থেকে ম্যানেজার বেরিয়ে এলো। মাঝবয়সী লোকটির চেহারায় বিরক্তির রেখা স্পষ্ট। কঠোর স্বরে কোরিয়ান ভাষায় বলল,
“এক্সকিউজমি ম্যাম! এভাবে উচ্চস্বরে চিৎকার করছেন কেন?”
ঝুমঝুম ক্রুদ্ধ নয়নে তাকাল তার দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল অপমান, বিস্ময় এবং দহ’নজ্বালা।
“আমি আপনাদের অগ্রিম পেমেন্ট করেছি। আপনারা আমার খরগোশ অন্য কাউকে কীভাবে দিয়ে দিতে পারেন?”
ম্যানেজার এবার একরকম নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“দেখুন ম্যাম, আপনি চাইলে অন্য একটা নিয়ে নিন। ওই ভদ্রমহিলার খরগোশটা খুব পছন্দ হয়েছিল। উনারা দ্বিগুণ মূল্য দিতেও রাজি ছিলেন।”
বাক্যটি শ্রবণ করা মাত্রই ঝুমঝুমের মুখাবয়বে অবিশ্বাসের ছায়া নেমে এলো। যেনো নিজের কর্ণকুহরকেই বিশ্বাস করতে পারছে না সে।
“তাহলে অর্থের বিনিময়ে আপনারা প্রতিশ্রুতি বিক্রি করেন?”
শীতল অথচ বিদ্ধকারী স্বরে উচ্চারণ করল সে। অতঃপর প্রত্যুত্তর পেলো না ম্যানেজারের।
“হাউ ডেয়ার ইউ?”
কন্যার চোখদুটো রক্তাভ হয়ে উঠেছে। অক্ষিপটে জমাট বেঁধেছে ক্রোধের দাবানল। বুকের ভেতরে যেনো অপমানের বিষাক্ত স্রোত বইছে।
ম্যানেজার বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করল। বিকল্প খরগোশ দেখাল। কেউ একজন বলল,
“এইটা আরও সুন্দর ম্যাম।”
কিন্তু ঝুমঝুমের কাছে বিষয়টা আর কেবল একটি খরগোশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি তার অনুভূতির অবমূল্যায়ন। তার পছন্দকে উপেক্ষা করে অর্থের কাছে নীতিবোধের পরাজয়।
অবশেষে আর একটি শব্দও উচ্চারণ না করে হনহনিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এলো সে।
বাইরের শীতল বাতাস হঠাৎই অসহনীয় মনে হতে লাগল। সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই অনুভব করল তার আঙুল কাঁপছে। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারে আচ্ছন্ন হয়ে উঠেছে।
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৪
চোখ জ্বালা করছে। কান্নারা গলায় দলা পাকিয়ে আটকে আছে। সামান্য একটি খরগোশের জন্য এত কষ্ট পাওয়া কি অস্বাভাবিক? হয়তো না। কারণ মানুষ প্রায়শই বস্তু হারিয়ে কাঁদে না কাঁদে সেই বস্তুটির সাথে জড়িয়ে থাকা অনুভূতি হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণায়।
