মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৪
ফারহানা নিঝুম
ড্রয়িংরুম জুড়ে তখন গাঢ় নীরবতার আবরণ। ক্রিস্টালের ঝাড়বাতির মৃদু আলোকচ্ছটা সাদা মার্বেলের উপর পড়ে এক অদ্ভুত শীতল আবহ সৃষ্টি করেছে। বাইরে সন্ধ্যার আবছায়া ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে,।
ঝুমঝুম সোফার কিনারায় গুটিসুটি মেরে বসে ছিল। তার চোখেমুখে কৌতূহল, বিস্ময় আর অকারণ সাহসের মিশ্র প্রতিচ্ছবি। অথচ পরবর্তী মুহূর্তেই সেই সাহস খানখান হয়ে গেল।
শয্য হঠাৎই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কড়া স্বরে বলে উঠল,
”আর ইউ ইনসেন্স? কাকে কি বলছিস, মাথায় আছে তোর?”
কথাগুলো ছিল ছুরির ফলার ন্যায় ধারালো। মুহূর্তেই থমকে গেল ঝুমঝুম। মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে এলো। মনে হলো বুকের ভেতরকার সমস্ত শব্দ কেউ এক নিমিষে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
তৎক্ষণাৎ জিয়ান বলে ওঠে,
”সো হোয়্যাট? বলেছে তো কি হয়েছে?”
জিয়ানের দিকে অগ্নিদগ্ধ নয়নে তাকালো শয্য! বেচারা জিয়ান ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেল।
ঝুমঝুম ইতস্তত কণ্ঠে বলল,
”আ… আসলে আমি… আমার যেটা মনে হয়েছে তাই বললাম!”
কিন্তু শয্যের চোখের দিকে তাকানোর দুঃসাহস পর্যন্ত হলো না তার। দৃষ্টি নিম্নমুখী করেই সে দ্রুত সকলের হাতে কফির কাপ ধরিয়ে দিতে লাগল। যেন নিজের অস্বস্তিকে কাজের আড়ালে গোপন করতে চাইছে। কিন্তু মনে মনে নিজেকে সাবাসি দিচ্ছে,যা বলেছে একদম ঠিক বলেছে।ওই মেয়ের যোগ্যতা আছে নাকি জুনেদ শয্য বাদশাহর বউ হবার!
অকস্মাৎ ব্যস্ত হাত দুটি থামলো ঝুমঝুমের। নিজেকে প্রশ্ন করল,
”আসলেই কি যোগ্যতা নেই? সে তো ভীষণ সুন্দরী!’
ঝুমঝুম উত্তর খুঁজে পেলো না। কেন তার এতটা দ্বিমত এ ব্যাপারে?
শয্য বিরক্ত ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে বিশাল থাইগ্লাসের জানালার নিকট গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরের আধো আঁধার শহরটা কাঁচের ওপারে ঝাপসা লাগছিল। ধীর ভঙ্গিতে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে গুঁজে নিল সে। পরক্ষণেই লাইটারের ক্ষুদ্র অগ্নিশিখা জ্বলে উঠল।
দুই টান দিতেই ধোঁয়ার কুণ্ডলী বাতাসে মিশে গেল। আর সেই দৃশ্য দেখেই যেন স্তব্ধ হয়ে গেল ঝুমঝুম। তার চোখদুটো বিস্ফারিত। হৃদপিণ্ড অকারণে দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে।
তাহলে গুজবটা সত্যি?
কেপপ ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় আইডল জুনেদ শয্য বাদশাহ সত্যিই সিগারেট পান করে?
হ্যাঁ। কিছুদিন পূর্বে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। গভীর রাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে ধোঁয়া উড়াতে দেখা গিয়েছিল তাকে। যদিও ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তির পরিচয় অজ্ঞাতই রয়ে গিয়েছিল।
তখনও ঝুমঝুম বিশ্বাস করেনি। অথচ আজ নিজের চোখের সম্মুখে দৃশ্যটা প্রত্যক্ষ করছে সে।
অবিশ্বাস্য। ঠিক সেই মুহূর্তেই ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন জেসমিন বাদশাহ। হাতে ট্রে ভর্তি স্ন্যাকস।
মাকে দেখামাত্রই চমকে উঠল শয্য। এমন তৎপরতায় সিগারেটটা ফেলে দিল যেন অপরাধে হাতেনাতে ধরা পড়েছে। তারপর এক হাত নেড়ে ধোঁয়া সরাতে লাগল এমনভাবে, যেন ঘরে মশা তাড়ানোর অভিযান চলছে।
দৃশ্যটা দেখে প্রায় হা হয়ে গেল ঝুমঝুম।
কি নিখুঁত অভিনয়! কি অসাধারণ চালাকি!
জেসমিন বাদশাহ কিছুই বুঝলেন না। বরং মমতাভরা কণ্ঠে ঝুমঝুমের হাতে এক কাপ কফি ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
”এটা শয্যকে দিয়ে আয় তো মা।”
ঝুমঝুমের বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল। ধীর পদক্ষেপে সে এগিয়ে গেল শয্যের দিকে।
নত মুখে কাপটা বাড়িয়ে বলল,
”আপনার কফি।”
শয্য তৎক্ষণাৎ ঘাড় কাত করে তাকালো তার মুখপানে।
মেয়েটা যেন অপরাধী শিশুর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখ নিচু। কাঁধ সামান্য ঝুঁকে। আঙুলের ডগায় কাপ কাঁপছে মৃদু।
শয্য সঙ্গে সঙ্গে কাপ নিল না। কিছুক্ষণ রয়ে সয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীর ভঙ্গিতে কাপটা গ্রহণ করল।
কিন্তু ঠিক তখনই আচমকা সাহস সঞ্চয় করে ঝুমঝুম বলে উঠল,
”সিগারেট কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর!”
শয্যের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কফির কাপে চুমুক দিয়ে অত্যন্ত ধীর, স্থির ও গম্ভীর স্বরে বলল,
”সিগারেট ছিল কার্ডিয়াক টিস্যুর পুরোনো অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, আর তুই সাইকো-বায়োলজিক্যাল আপডেটেড টক্সিন। যা ইমোশনাল জিন এক্সপ্রেশন বদলে দিয়ে হার্টকে ধীরে ধীরে সাইলেন্ট ডিজঅর্ডারে নিয়ে যাস।”
ঝুমঝুমের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে কথাগুলোর একবিন্দুও প্রবেশ করল না।
সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কাঁপা স্বরে শুধালো,
”মানে?”
”তোর মাথা!”
নাক মুখ কুঁচকে নিল কন্যার!
”আপনার মাথা!”
কথাটা মুখ ফসকে বলে ফেলল ঠিকই কিন্তু পরক্ষণেই মুখ চেপে ধরে।
কিন্তু শয্য উত্তর দিল না। বরং আচমকাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
”গেটের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলি কেন?”
ঝুমঝুম শুষ্ক ঢোক গিলল। তারপর বিড়বিড় করে বলল,
”আ,,,আসলে আমার একটা পার্সেল আসবে।”
”পার্সেল?”
শয্যের দৃষ্টি মুহূর্তেই সঙ্কুচিত হয়ে এলো। কণ্ঠস্বর হয়ে উঠল গম্ভীর।
”কিসের পার্সেল?”
ঝুমঝুমের বুকের ভেতর তখন ধুকপুকানি চলছে। সত্যিটা বললে যদি রাগ করে? সে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
”ইয়ে মানে আমার উপন্যাস বইয়ের পার্সেল। দেশি-বিদেশি কিছু বই আনিয়েছি।”
শয্য ভ্রু কুঁচকাল। সে কখনোই বুঝে উঠতে পারে না এই কন্যা এত সময় কোথায় পায়। সারাদিন পেইন্টিং করে। স্টুডিওতে গিয়ে কার্টুন ক্যারেক্টারের কণ্ঠ দেয়। অদ্ভুত অদ্ভুত স্বরে কথা বলে। আবার সুযোগ পেলেই উপন্যাসের সাগরে ডুবে থাকে। অসহ্য রহস্যময় এক প্রাণী! ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ডেলিভারি বয়ের কল।
ঝুমঝুম ফোন তুলতে যাবে, তার আগেই শয্য ক্ষিপ্রতায় ফোনটা কেড়ে নিল। ঝুমঝুম হতবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
শয্য ফোন কানে নিয়ে বলল,
”হ্যালো?”
ওপাশ থেকে ভদ্র স্বরে কোরিয়ান ভাষায় ভেসে এলো,
”ঝুমঝুম মাশা আছেন? আসলে উনার একটা পার্সেল ছিল।”
শয্য ধীর দৃষ্টিতে একবার ঝুমঝুমের দিকে তাকালো। তারপর ফোন হাতে নিয়ে হনহনিয়ে ড্রয়িংরুম ত্যাগ করে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
এদিকে ঝুমঝুম উৎকণ্ঠায় নখ কামড়াতে লাগল।
নিশ্চয়ই বকা খেতে হবে! এতগুলো উপন্যাসের বই একসাথে আনিয়েছে এটা শয্য মোটেও ভালোভাবে নেবে না! লোকটা নিশ্চয়ই বলবে,
”তোকে না আমি এতগুলো বই দিয়েছি? তাহলে আবার বই আনিয়েছিস কোন সাহসে?”
বাইরে গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই শয্য দেখতে পেল ডেলিভারি বয় অপেক্ষা করছে।
শয্য সংক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে জানাল, সে-ই পার্সেল রিসিভ করবে।
কিন্তু ছেলেটি সন্দিহান চোখে তাকালো তার দিকে। মুখে মাস্ক। ব্যক্তিত্বে অদ্ভুত গাম্ভীর্য।
সে ইতস্তত করে বলল,
”আপনি উনার কে হন জানতে পারি?”
শয্য টানটান ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা।
তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সাবলীল কণ্ঠে বলল,
”সি ইজ মাই ওয়াইফ।”
ছেলেটা আশ্চর্য হলো আজকাল হাসব্যান্ডরা তার ওয়াইফ কে উপন্যাসের বইও কিনে দেয়? ছেলেটা চিনে মেয়েটাকে, মাসে তারই তো অনেক গুলো পার্সেল ডেলিভারী করতে আসে। সেই সুবাদে পরিচয় হয়েছে। কিন্তু এরকম জেন্টলম্যান ইয়াং ছেলের ওই বাচ্চা বউ? বয়সের হিসেব কষতে বসলে তো মেয়েটা ছেলেটার হাঁটুর বয়সী হবে বলেই মনে হচ্ছে তার। শয্য যাত্রা পথে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না।
সিউলের ব্যস্ত নগরীর বুকে তখন গোধূলির শেষ আলো নিভু নিভু। উঁচু দালানগুলোর কাঁচঘেরা প্রাচীরে নেয়ন আলোর প্রতিফলন পড়ে শহরটাকে অবাস্তব রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। রাস্তার দু’পাশে মানুষের অবিরাম চলাচল, অচেনা ভাষার কোলাহল, গাড়ির কর্কশ হর্ন সব মিলিয়ে যেন এক বিশৃঙ্খল অথচ জীবন্ত নগরসভ্যতা।
এই অপরিচিত শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে প্রিয়ার মনে হচ্ছিল, সে যেন সম্পূর্ণ একা।
বিদেশে পড়তে আসার স্বপ্নটা শুনতে যতটা রঙিন ছিল, বাস্তবে ততটাই বিভ্রান্তিকর। ভাষা অপরিচিত, মানুষ অপরিচিত, নিয়মকানুন পর্যন্ত অজানা। তার উপর আজকের দিনটাই যেন শুরু হয়েছে বিপর্যয় দিয়ে।
ট্যাক্সির ভেতরে বসে অস্থির ভঙ্গিতে ব্যাগ হাতড়াচ্ছিল সে। কপালের উপর চিকচিক করছে ঘাম। হৃদস্পন্দন ক্রমেই অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। পার্স নেই। হোস্টেলে রেখে এসেছে। এই উপলব্ধি হতেই যেন সমগ্র শরীর নিস্তেজ হয়ে এলো তার। ঠিক সেই মুহূর্তেই পেছন দিক থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত, মখমলি পুরুষকণ্ঠ,
”হ্যালো, প্রীটি লেডি!”
কণ্ঠস্বরটি কানে পৌঁছাতেই প্রায় আঁতকে উঠল প্রিয়া।
দ্রুত ঘুরে তাকাতেই চোখের সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটিকে দেখে তার চোয়াল প্রায় ঝুলে পড়ল।
সেই মানুষটি। সেদিনকার সেই মাস্ক পরিহিত রহস্যময় পুরুষ। কালো মাস্কে আবৃত মুখমণ্ডল, অথচ চোখদুটি অস্বাভাবিক সৌন্দর্যে মোড়ানো। দীর্ঘদেহী, সুগঠিত, ব্যক্তিত্বে ভয়ংকর রকমের আকর্ষণীয়। প্রিয়া সম্পূর্ণ থতমত খেয়ে গেল।
নাকের উপর সরে আসা চশমাটা কাঁপা হাতে ঠেলে দিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
”আ… আপনি?”
জিয়ান প্রিয়ার কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুখশ্রী দেখে মৃদু হাসল। সেই হাসিতে ছিল আত্মবিশ্বাস, কৌতুক আর অদ্ভুত কোমলতা।
অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
”ইয়েস, আমি।”
প্রিয়ার ইচ্ছে করছিল মাটির সঙ্গে মিশে যেতে।
এমনিতেই সে প্রথম দিন থেকেই নানাবিধ বিপাকে জড়িয়ে আছে। তার উপর এই বিশ্বখ্যাত সেলিব্রিটি আইডল বারবার তার জীবনের অপ্রস্তুত মুহূর্তগুলোতেই আবির্ভূত হচ্ছে!
এর মাঝেই ট্যাক্সি ড্রাইভার বিরক্ত হয়ে কোরিয়ান ভাষায় ধমকে উঠল,
”এই যে! ভাড়া দিবেন কি-না?”
কণ্ঠস্বরটা ছিল কর্কশ ও বিরক্তিপূর্ণ। প্রিয়ার চোখ মুহূর্তেই জলে ভরে উঠল। অপমান, লজ্জা আর অসহায়ত্ব মিলেমিশে বুকের ভেতর কেমন ভারী অনুভূতির সৃষ্টি করল।
তার মনে হচ্ছিল বাংলাদেশই ভালো ছিল।
সেখানে অন্তত মানুষগুলো পরিচিত ছিল। ভাষাটা নিজের ছিল। এখানে প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে বেমানান লাগে।
হঠাৎ বাবার উপর জেদ করে বিদেশে পড়তে আসার সিদ্ধান্তটাকে ভীষণ ভুল মনে হতে লাগল তার।
জিয়ান কপাল কুঁচকে প্রিয়ার দিকে তাকালো। তার অস্বস্তি, অপমানবোধ ও সংকোচ সবকিছুই যেন মুহূর্তেই পড়ে ফেলল সে। গভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,
”হোয়াট হ্যাপেন্ড, প্রিয়া?”
প্রিয়া এতটাই লজ্জিত হয়ে পড়েছিল যে চোখ তুলে তাকাতেও পারছিল না। দুই হাত অস্থিরভাবে কচলাতে কচলাতে নিচু স্বরে বলল,
”আসলে আমি আমার পার্স হোস্টেলে ফেলে এসেছি। এখন ভাড়া,,,
বাকিটুকু আর বলতে পারল না। নত, লজ্জায় রাঙা হয়ে যাওয়া মুখখানি দেখে জিয়ানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতির সঞ্চার হলো। তার জীবনে অসংখ্য সুন্দরী নারী এসেছে। জনপ্রিয় অভিনেত্রী, আন্তর্জাতিক মডেল, বিখ্যাত সেলিব্রিটি কাউকেই নতুন লাগেনি তার কাছে।
কিন্তু এই মেয়েটা। অতি সাধারণ সাজসজ্জা, এলোমেলো চুল, কাঁপা কণ্ঠস্বর আর সরলতায় ভরা চোখ তবুও কী অদ্ভুত নির্মল! কোনো কৃত্রিমতা নেই। কোনো অভিনয় নেই।
ঠিক যেন বিশৃঙ্খল পৃথিবীর মাঝখানে এক টুকরো স্বচ্ছ নির্ভেজালতা। জিয়ান আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
ওয়ালেট থেকে কয়েকটি ডলার বের করে ড্রাইভারের দিকে এগিয়ে দিল। ড্রাইভার ডলার পেয়েই মুহূর্তে শান্ত হয়ে গেল। অতঃপর গজগজ করতে করতে সেখান থেকে বিদায় নিল।
প্রিয়া যেন দীর্ঘক্ষণ পর প্রথমবার নিঃশ্বাস নিতে পারল।
সে স্বস্তির দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দ্রুত বলে উঠল,
”আমি এখনই হোস্টেলে গিয়ে আপনার ডলার ফেরত দিয়ে দেব!”
জিয়ান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি টেনে বলল,
”আমার গাড়িতে ওঠো।”
প্রিয়া কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। যেন কথাটার অর্থই বুঝতে পারেনি।
”হ্যাঁ?”
জিয়ান এবার গাড়ির দরজা খুলে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
”গেট ইন দ্য কার।”
প্রিয়া বোকাসোকা ভঙ্গিতে মাথা চুলকাল।
এভাবে হঠাৎ করে একজন আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটির গাড়িতে উঠে বসা ব্যাপারটা এখনও তার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকছে। তবুও জিয়ান পুনরায় ইশারা করতেই বহু সংকোচ ও ইতস্তততা নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল সে। গাড়ির অভ্যন্তরটা জিয়ানের পারফিউমের সুবাসে মাতাল করার মতো
বাইরে শহরের আলো দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে। স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে গাড়ি চালাচ্ছিল জিয়ান। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর প্রিয়া মিনমিনে কণ্ঠে বলল,
”থ্যাংকস। আপনি সাহায্য না করলে আজ খুব বিশ্রী একটা ঘটনা হয়ে যেত।”
জিয়ান মৃদু হাসল। তারপর অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
”মাশার ফ্রেন্ড মানে আমারও ফ্রেন্ড। এটুকু হেল্প তো করতেই হয়।”
কথাটা শুনে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল প্রিয়ার মনে।
এতদিন তার ধারণা ছিল। বর্তমান সময়ের সেলিব্রিটি আইডলরা ভীষণ উদ্ধত হয়। ফ্যানদের মানুষ বলেই গণ্য করে না। কিন্তু জিয়ান সম্পূর্ণ আলাদা। তার ব্যক্তিত্বে যেমন তারকাসুলভ জৌলুস আছে, তেমনি আচরণে আছে অপ্রত্যাশিত ভদ্রতা ও সৌজন্য। আর সেই মুহূর্তে, অচেনা বিদেশি শহরের কোলাহলের মাঝখানে বসে প্রিয়ার প্রথমবারের মতো মনে হলো হয়তো সিউল শহরটা এতটাও নিষ্ঠুর নয়।
কোরিয়া থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ছুটে চলা দীর্ঘপাল্লার সেই নিশাচর ফ্লাইটে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতার আবরণ। জানালার ওপারে কৃষ্ণাভ আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে তুলোর মতো মেঘরাজি, আর ভেতরে মৃদু আলোকচ্ছটায় আবৃত কেবিনজুড়ে বিরাজ করছে প্রশান্ত নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতার মাঝেই আতঙ্কে দিশেহারা জুঁই, অবচেতন প্রবৃত্তিতে শক্ত মুঠোয় আঁকড়ে ধরেছে আব্রাহামের প্রশস্ত করতল। দীর্ঘ নখর যুগল প্রায় বিদীর্ণ করে ফেলেছে পুরুষটির ত্বকস্তর।
কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরতেই নিজের কাণ্ড উপলব্ধি করে ভীতসন্ত্রস্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
”সরি… সরি! আমি ইচ্ছে করে করিনি!”
তৎক্ষণাৎ আব্রাহাম তর্জনী তুলে নিবিড়ভাবে চেপে ধরল তার কোমল অধরযুগল।
”হিইসস,,,
মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল জুঁই। বুকের ভেতরকার হৃদস্পন্দন যেন অস্বাভাবিক তীব্রতায় ধুকপুক করতে লাগল।
অপরদিকে আব্রাহামের দৃষ্টি নিবদ্ধ রইল সেই কাঁপতে থাকা গোলাপাভ ওষ্ঠের উপর। অদ্ভুত এক আকর্ষণ তাকে টানছিল প্রবলভাবে। মনে হচ্ছিল, এই ক্ষণেই সমস্ত দূরত্ব বিলীন করে দিক সে। কিন্তু বাস্তবতার সংযমী প্রাচীর তাকে আটকে দিল।
ধীরে আঙুল সরিয়ে নিম্নস্বরে বলল,
”জুঁই, বি নরমাল ওকে? আই অ্যাম ইউর হাজব্যান্ড।”
শুষ্ক কণ্ঠে ঢোক গিলল জুঁই। সত্যিই তো আব্রাহাম তার স্বামী। তবুও এই মানুষটার সান্নিধ্যে এলেই অদ্ভুত এক সংকোচ তাকে গ্রাস করে ফেলে।
মৃদু, মিনমিনে স্বরে বলল সে,
”সরি, আসলে আমার ফ্লাইটে খুব ভয় লাগে। সেদিন মামুনি জড়িয়ে ধরেছিলেন বলে এতটা লাগেনি। কিন্তু আজ,,,
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৩
আব্রাহামের অধরে তখন দুষ্টুমিভরা ক্ষীণ হাসি।
”আমি জড়িয়ে ধরি?”
প্রশ্নটা শুনে থমকে গেল জুঁই। প্রতিউত্তর জানানোর অবকাশ না দিয়েই আব্রাহাম দু’হাত প্রসারিত করে টেনে নিল তাকে নিজের বক্ষপিঞ্জরে।
পুরুষটির উষ্ণ আলিঙ্গনে যেন মুহূর্তেই গলে যেতে লাগল জুঁইয়ের সমস্ত ভয়। বুকের গভীরে তার হৃদস্পন্দন উন্মত্ত ছন্দে কাঁপছে, আর সেই কম্পন স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে আব্রাহামও।
লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল জুঁইয়ের গালদ্বয়।
আব্রাহাম ধীরে মুখ নামিয়ে তার কর্ণকুহরের পাশে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল,
”স্লিপ নাউ।”
