Home মেরিগোল্ড সেনোরিটা মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৩

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৩

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৩
ফারহানা নিঝুম

“শাট আপ,মাশা! আর একটাও কথা বলবে না ‌। তুমি জানো আমি কতক্ষন তোমার জন্যেই অপেক্ষা করেছিলাম? অথচ তুমি আমাকে বলেছিলে তুমি ইউনিভার্সিটিতে আসবে!”
প্রণয়ের কণ্ঠস্বর যেন হঠাৎ করেই বজ্রনিনাদের মতো কর্কশ ও অনমনীয় হয়ে উঠল। তার এই রূঢ়, অনমনীয় স্বরধ্বনি শুনে সম্পূর্ণরূপে বিমূঢ় হয়ে গেল ঝুমঝুম। যে মানুষটি কখনো তার সঙ্গে এতটা নির্মম বা তীক্ষ্ণ ভাষায় কথা বলেনি, আজ হঠাৎ তার এমন উগ্র প্রতিক্রিয়া এ যেন অবিশ্বাস্য এক অভিঘা’ত।
অন্তরে গভীর বিষাদ নেমে এলো কন্যার। হৃদয়টা যেন ক্ষণিকেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি ধূসর হয়ে আসতে লাগল, অশ্রুবিন্দু জমে উঠল দৃষ্টিপটে। মুহূর্তের মধ্যেই প্রণয় ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিল।
ঝুমঝুম টের পেল শারীরিক ব্যথা নয়, কিন্তু এক অদ্ভুত মানসিক ভার তার বুকে চেপে বসেছে। অস্বস্তির সেই তীব্র অনুভূতিই তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
এই অস্বস্তির জায়গা থেকেই সে মৃদু স্বরে বলল,

“বাড়ি যেতে চাই, মেহু আপু ভালো লাগছে না।”
মেহরিমা তার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। স্নেহমিশ্রিত কন্ঠে বলল,
“কতদিন পর প্রথমবার জুঁইকে দেখলাম। এখনই চলে যাবি? অন্তত লাঞ্চটা করে যা।”
ঝুমঝুম অসহায় দৃষ্টিতে জুঁইয়ের দিকে চেয়ে রইল। পরিস্থিতি তাকে যেন স্থবির করে ফেলেছে।
আজই প্রথম জুঁইকে দেখে রাকিব ও মেহরিমা উভয়েই অতিশয় উৎফুল্ল। তাদের মুখাবয়বে আনন্দের উচ্ছ্বাস স্পষ্ট। রাকিব তো ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে ক্যাফের দায়িত্ব সামলাবে, সবাইকে নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরতে হবে। ফলে মেহরিমা জোর করে প্রায় ধরে বেঁধেই ঝুমঝুম ও জুঁইকে নিয়ে এসেছে।
সেই পুরো সময় জুড়ে মেহরিমা রাকিবের প্রেমকাহিনি থেকে শুরু করে নানা আড্ডার গল্প বলে চলেছে, কিন্তু ঝুমঝুমের মন ছিল অস্থির, বিক্ষিপ্ত। তার একমাত্র চিন্তা প্রণয়ের সঙ্গে দেখা হলো না।
অথচ সেই প্রণয়ের ধমকের পর হঠাৎ করেই তার ভেতরের উত্তেজনা যেন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে; অবশিষ্ট রয়েছে কেবল এক গভীর নীরবতা ও অদ্ভুত শূন্যতা।

লাঞ্চ প্রস্তুতের ব্যস্ততায় মগ্ন জুঁই ও মেহরিমা তখনো নিজেদের কথোপকথনে নিমগ্ন। সেই সুযোগে আলস্যমিশ্রিত ভঙ্গিতে ঝুমঝুম পকেট থেকে ফোন বের করল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল মাশার একটি ছোট্ট ছবি। আনলক করার পরও একই ছবি ওয়ালপেপার হিসেবে জ্বলজ্বল করছে, যেন তার ভেতরের এক অদৃশ্য অনুভূতির প্রতিচ্ছবি।
মনের ভার লাঘব করতে সে ইনস্টাগ্রামে প্রবেশ করল। স্ক্রল করতেই প্রথমেই তার চোখে পড়ল প্রণয়ের আইডি।
কিছুক্ষণ তাকিয়েও না তাকানোর ভান করে সে সার্চ অপশনে গেল, কিন্তু ঠিক তখনই থমকে গেল।
একটি ভিডিও তার দৃষ্টি আটকে দিল।

টিম আলফার জুনেদ শয্য বাদশাহ এবং KK Group of Industries-এর সুরাইয়া কায়নাতকে ঘিরে ভক্তদের প্রতিক্রিয়া। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে অনেকেই তীব্র আবেগে ভেঙে পড়েছে; কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করছে, কেউ আবার তাদের সম্ভাব্য জুটিকে সমর্থন জানাচ্ছে। কেউ প্রশ্ন তুলছে এ কি শুধুই নতুন মিউজিক প্রজেক্ট? নাকি শয্যের নতুন সলো অ্যালবামের অংশ?
ঝুমঝুমের মন মুহূর্তেই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। অজানা এক অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল। তৎক্ষণাৎ সে সুরাইয়ার ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইল খুঁজে বের করল।
প্রোফাইল ওপেন করতেই মেইন ছবিটি তার চোখে পড়ল। মুহূর্তেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত চাপ অনুভূত হলো যেন কেউ হৃদপিণ্ডকে দৃঢ়ভাবে খামচে ধরেছে।
ব্যথাটা এমন নয় যে প্রণয়ের ধমকে হয়েছিল এটি তার চেয়েও গভীর, অচেনা, এবং অযৌক্তিকভাবে তীব্র।
সে কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে শয্য ও সুরাইয়ার ছবি পর্যবেক্ষণ করল। তারপর হঠাৎই তার মধ্যে এক তীব্র, অকারণ রাগ জন্ম নিল।
নিজের মনে বিড়বিড় করে বলল,

“দুজনকে একসাথে একদমই মানাচ্ছে না। এই বস্তির মাইয়া সুরাইয়া কোনোভাবেই তার ভাবি হতে পারে না!”
অকারণেই তার বারবার প্রিয়ার সেই কথাটা মনে পড়ছিল। প্রিয়া কি বলেছিল? বলেছিল শয্য তাকে অন্য চোখে দেখে!
তাছাড়া কিছুক্ষণ আগেও গাড়ি দিয়ে আসার সময় শয্য অদ্ভুত এক কান্ড ঘটিয়েছে!
কিছুক্ষণ আগে….
মন্থর গতিতে সিউলের প্রশস্ত সড়ক চিরে এগিয়ে চলেছে কৃষ্ণবর্ণ এসইউভি। জানালার ওপারে সারি সারি চেরি ব্লসম, কাচের অট্টালিকা আর ব্যস্ত নগরজীবন যেন রঙিন চলচ্চিত্রের দৃশ্যের মতো পিছিয়ে পড়ছে।
পেছনের সিটে পাশাপাশি বসে আছে ঝুমঝুম আর জুঁই। জুঁই বাইরে মগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করছে, আর ঝুমঝুম কখনো জানালার বাইরে, কখনো সামনের সিটে বসে থাকা শয্যের দিকে চোরাচোখে তাকাচ্ছে।
হঠাৎ করেই গাড়ির গতি থেমে গেল একটি অভিজাত ব্র্যান্ডেড শপের সামনে।দু’জনেই বিস্মিত।
জুঁই ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে শয্য ভাইয়া?”
শয্য কোনো উত্তর দিল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে দরজা খুলে নেমে যেতে যেতে শুধু বলল,
“গিভ মি ফাইভ মিনিটস।”
কথাটুকুই।কিন্তু পাঁচ মিনিট গড়িয়ে দশ মিনিট পেরিয়ে গেল।
অবশেষে সে ফিরে এলো। হাতে ছোট্ট একটি বিলাসবহুল শপিং ব্যাগ।
ব্যাগটার ভেতরে কী আছে, তা নিয়ে কৌতূহলী হয়ে উঠল ঝুমঝুম। ওর দৃষ্টি বারবার সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে।
গাড়িতে বসেই শয্য ব্যাগটা কোনো ভূমিকা ছাড়াই ঝুমঝুমের কোলের ওপর ছুঁড়ে ফেলল।
ঝুমঝুম চমকে উঠল।
শয্য দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। টাইম এলে আমি নিজেই সব হ্যান্ডেল করব। একটু ধৈর্য ধরতে শিখ!”
কথাটার অর্থ মাথার উপর দিয়ে চলে গেল ঝুমঝুমের।
সে বিভ্রান্ত মুখে মাথা চুলকে মিনমিনিয়ে বলল,

“মানে?”
শয্য এবার ধীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল।
তার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য নেমে এলো কন্যার উন্মুক্ত বক্ষদেশে, যেখানে পোশাকের কাটিংয়ের ফাঁক দিয়ে শুভ্র ত্বকের অংশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওই সুগোল উরোজদ্বয় ফুটে ওঠেছে স্পষ্টভাবে! যা দেখে চোয়াল শক্ত হয়ে গেল যুবকের।
তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,
“তোকে কি ওই প্যাকেটটা কোলে নিয়ে বসে থাকতে দিয়েছি?”
ঝুমঝুম আর কিছু না বুঝেই ব্যাগটা খুলে ফেলল।
ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে এলো অপূর্ব নকশার পাঁচটি স্কার্ফ।
রেশমি কাপড়ে তৈরি, প্রতিটির রঙ আলাদা যে কোনো পোশাকের সঙ্গে মানিয়ে যাবে। স্কার্ফগুলো হাতে নিয়েই বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল ঝুমঝুমের চোখ।
ঠিক তখনই শয্যের কথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করল জুঁই। তার দৃষ্টি নিঃশব্দে গিয়ে থামল ঝুমঝুমের পোশাকের কাটিংয়ে।
অবচেতনে ঠোঁট কামড়ে মনে মনে ফিসফিস করল,

“সামথিং ইজ রং!”
অথচ ঝুমঝুম এখনো কিছুই বোঝেনি। শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে বলল,
“ইয়ে.. মানে এগুলো আমার?”
শয্য কোনো উত্তর না দিয়ে ইঞ্জিন স্টার্ট করল। গাড়ি চলতে শুরু করার ঠিক আগে আবারও এক ঝলক তাকাল ঝুমঝুমের দিকে। অসন্তুষ্টির ছাপ স্পষ্ট তার চোখে।
শুষ্ক কণ্ঠে বলল,
“ওগুলোর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার জন্য দিইনি। পরে নে, ইডিয়ট।”
একটু থেমে আবার যোগ করল,
“অ্যান্ড লিসেন,আমার জিনিসকে এভাবে অবহেলা করা আমি একদম টলারেট করি না। আন্ডারস্ট্যান্ড?”
ঝুমঝুম কিছুই না বুঝে শুধু মাথা নাড়ল। পাঁচটি স্কার্ফের মধ্যে নিজের আউটফিটের সঙ্গে মানানসই একটি বেছে নিয়ে গলায় জড়িয়ে নিল। স্কার্ফটা পরতেই তার উন্মুক্ত উরোজ আড়াল হয়ে গেল।
স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখেই আড়চোখে সেই দৃশ্য দেখল শয্য।
তার শক্ত হয়ে থাকা চোয়াল ধীরে ধীরে শিথিল হলো।
মনের ভেতর চাপা স্বরে বিড়বিড় করল,
“ক্যাফেতে কত রকম মানুষের আনাগোনা। সবাইকে কী উরোজ দেখিয়ে বেড়াবে নাকি? একেবারে ইডিয়ট মেয়ে?”
তবুও ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য এক তৃপ্তির রেখা ফুটে উঠল।

অবচেতন রাগে শয্যের প্রোফাইলে প্রবেশ করল ঝুমঝুম। প্রোফাইল প্রায় নীরব। শেষ পোস্টটি গতকাল সন্ধ্যায়, এরপর আর কিছু নেই।
প্রোফাইল পিকচারে শয্যের একটি অনন্য ছবি উলফ-কাট চুল, ভ্রুতে পিয়ারসিং, এবং এক অদ্ভুত মোহময় হাসি। সৌন্দর্য ও রহস্যের এক নিখুঁত সমন্বয়।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পরই আবার তার মন সুরাইয়ার দিকে ফিরে গেল। বুকের ভেতর অস্বস্তি আরও ঘনীভূত হলো। নিঃশ্বাস যেন ভারী হয়ে আসছে। হঠাৎ করেই সে চিৎকার করে উঠল
“আপি, আমি বাড়ি যাবো! এখুনি, এখুনি যেতে হবে!”
মেহরিমা ও জুঁই একসাথে চমকে উঠল। জুঁই এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল,
“কি হয়েছে তোমার, মাশা?”
ঝুমঝুম তখন অস্থির, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত, কণ্ঠ কাঁপছে। মাথায় তীব্র ব্যথা অনুভূত হচ্ছে, যেন ভেতরটা জ্বলছে।
“প্লিজ, আমাকে বাড়ি যেতে দাও। আমি এখানে থাকতে পারছি না।”
তার এই অবস্থা দেখে মেহরিমার মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিল। সে দ্রুত ফোন বের করে রাকিবকে কল করতে গেল।
তৎক্ষণাৎ জুঁই বাধা দিল,

“না, না! ও তো অনেক দূরে আছে। তাকে বিরক্ত না করাই ভালো। আমি বরং আব্রাহামকে বলছি।”
ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এড়াতে জুঁই দ্রুত আব্রাহামকে ফোন করল।
ঝুমঝুম তখন এক জায়গায় স্থির থাকতে পারছে না। তার শরীর যেন উত্তপ্ত, মন আরও বেশি অস্থির। রাত নামতেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল।
বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে আছে ঝুমঝুম। শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন। আসার পরপরই সে ঘুমিয়ে পড়েছে। কেন তার মন খারাপ সে নিজেও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। রিমঝিম কয়েকবার জিজ্ঞেস করলেও সে নীরব থেকেছে।
কিন্তু সত্যি কথা হলো সে নিজেও জানে না, এই অস্থিরতার প্রকৃত কারণ কী।
নিচতলায় ইতিমধ্যেই ব্যাগ গোছানোর ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। রিমঝিম, তারা বাদশাহ এবং ঝুমঝুম ছাড়া সবাই বাংলাদেশে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। চারদিকে এক ধরনের বিদায়ী তৎপরতা চলছে যাত্রার পূর্ব মুহূর্তের উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলা।
আর ঝুমঝুম? মেয়েটা মনমরা হয়ে শুয়ে আছে!

কলিং বেলের তীক্ষ্ণ ধ্বনি ঘুমের নিস্তব্ধতা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। অর্ধনিদ্রালু, ক্লান্ত শয্য ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল। তার মুখাবয়বে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ; যেন ঘুমের অপমান তাকে ক্রোধে উত্তেজিত করছে।
গতরাতে দীর্ঘ সময় রিহার্সাল শেষে অতি বিলম্বে বাসায় ফিরেছিল সে। শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন তবুও এই অবাঞ্ছিত বিঘ্ন তার একমাত্র বিশ্রামকেও কেড়ে নিচ্ছে। উপরন্তু সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত মন্তব্যগুলো তাকে আরও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। একটিই বিষয় শয্য ও সুরাইয়ার ছবি ঘিরে অকারণ বিতর্ক, কটু মন্তব্য ও অবান্তর সমালোচনা।
তার অন্তরাত্মা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মানুষ কি এতটাই অন্ধ ও নির্বোধ যে সামান্য একটি ছবি নিয়েও এমন বিষাক্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারে?
অলসতাকে অগ্রাহ্য করে সে ধীরপদে বিছানা ত্যাগ করে দরজার দিকে অগ্রসর হলো, কিন্তু দরজা খোলার আগেই লক্ষ্য করল তার বানরদল ইতোমধ্যেই নিরাপত্তা কোড ব্যবহার করে ভেতরে প্রবেশ করেছে।
“তোরা এভাবে অনুমতি ছাড়া কেন ভেতরে এলি? এই তোদের জন্য আমি পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করেও শান্তি পাইনা কেন?”

হিউন জে দাঁত দেখিয়ে হাসলো। এই পাসওয়ার্ড পাসওয়ার্ড খেলা কারসাজি তার!
শয্যকে দেখামাত্রই জিয়ান আবেগপ্রবণ উচ্ছ্বাসে তার কাঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শয্য বিরক্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
“তুই সবসময় এমন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করিস কেন?”
জিয়ান হেসে উঠে বলল,
“কি রে খরগোশ ,রাগ করেছিস নাকি?”
এই “খরগোশ” সম্বোধনটি শয্যের সহ্যসীমার বাইরে ছিল। ইতোমধ্যেই ক্ষিপ্ত মেজাজ আরও তীব্র হয়ে উঠল।
অন্যদিকে মেহবুব, হিউন জে-র দিকে চোরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে গোপন ইশারায় কিছু বোঝাপড়া সেরে নিল। তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও বলল,
“তোকে মিস করছিলাম। আর মাশাকেও খুব মনে পড়ছিল।”
মাশার নাম উচ্চারিত হতেই শয্যের ভ্রু কুঞ্চিত হলো। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।

“হোয়াট? হোয়াট ডিড ইউ সে?”
তার কণ্ঠে চাপা ক্রোধ। মেহবুব কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল। মুহূর্তেই পরিস্থিতির উত্তেজনা অনুভব করে সে দ্রুত বলল,
“না না, মানে, মাশা খুবই মিষ্টি মেয়ে। তার সঙ্গে কথা না বলে থাকা কঠিন।”
শয্যের দৃষ্টিতে হঠাৎ শীতলতা নেমে এলো। সে আঙুল তুলে সতর্ক করল,
“দূরে থাক ওর কাছ থেকে নয়তো..
কিন্তু তার কথা সম্পূর্ণ হতে দিল না হিউন জে। সে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“নয়তো কী? আর যদি মেহবুব ওকে পছন্দ করেও, তাতে তোর সমস্যা প্রবলেম কোথায়?”
এই কথায় শয্যের মেজাজ যেন বিস্ফোরণের পর্যায়ে পৌঁছাল। তার শরীর কাঁপতে লাগল ক্রোধে।
জিয়ান পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিয়ে বলল,

“মেহবুব আর মাশা কিন্তু দারুণ মানাবে, তাই না হিউন জে?”
হিউন জে সহমত জানাল,
“একদম পারফেক্ট।”
মুহূর্তেই মেহবুব বিপাকে পড়ে গেল। তার মুখমণ্ডলে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। সবাই যেন তাকে শয্যের সামনে বলির পাঁঠা বানিয়ে ফেলেছে।
শয্য এগিয়ে এসে তার কলার চেপে ধরল। কণ্ঠ ছিল বরফশীতল, অথচ ভেতরে আগুন,
“একটা কথাও বলবি না ওকে নিয়ে বুঝেছিস? তাছাড়া আমার কোনো প্রবলেম নেই আই রিপিট কোনো প্রবলেম নেই!”
ঠিক সেই মুহূর্তে জেসমিন বাদশাহ প্রবেশ করলেন। পরিবেশের উত্তেজনা দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত স্বরে বললেন,
“ওহ! আমার আলফা ছেলেরা এসেছে!”
জিয়ান মজা করে তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপনার এই খরগোশ ছেলে তো আমাদের দেখে মোটেও খুশি না, আন্টি।”
শয্যের চোখ সংকুচিত হলো। জেসমিন বাদশাহ হালকা ধমকের ভঙ্গিতে বললেন,
ওর কথা তোমরা শুনবে না। যখন ইচ্ছা আসবে। এটাই তো তোমাদের বাড়ি।তাছাড়া আসলে ফেইরি ল্যান্ডে কেন পড়ে থাকো? বাদশাহ ভিলায় যাবে!”
তপ্ত নিঃশ্বাস ছাড়ল শয্য। মেহবুব আবদার জুড়ে দিয়ে বলল,

“আন্টি আপনার হাতের কফি খাওয়ার ভীষণ ক্রেভিস উঠেছে।‌”
জেসমিন বাদশাহ হালকা হেসে বললেন,
“হোয়াই নট? আজকে তো অফিসও নেই আমার। এখুনি নিয়ে আসছি!”
জেসমিন বাদশাহ বেরিয়ে গেলেন!
বাদশাহ ভিলায় গিয়ে কফি বানিয়ে নিয়ে এলেন!
কিছুক্ষণ পর থাই গ্লাসের দিকে শয্যের দৃষ্টি পড়তেই তার দেহে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক মেয়েকে দেখে সে স্থির হয়ে গেল। মাশা হালকা পোশাকে, কোমল , অস্থির ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
এইযে মাশার মতো ড্রেস আপ করে বাইরে ঘুরঘুর করছে কন্যা! হাতটা দেখল শয্য! পাড়ে এগারো ছুঁই ছুঁই! আজকে তো ওর ইউনিভার্সিটিতে ক্লাস নেই, তাহলে ওখানে কি করছে?
তৎক্ষণাৎ দেখল জেসমিন বাদশাহ আসতে দেখে ঝুমঝুম নিজেও তার হাত থেকে ট্রে নিয়ে নিলো। জেসমিন বাদশাহ ভেতরে গিয়ে স্ন্যাকস নিয়ে আসতে গেলেন!
ঝুমঝুম কুন্ঠিত পায়ে দরজায় এসে উকি দিলো! হিউন জে তাকে ঠিকই দেখে ফেলল!

“আরে ওইতো মাশা। হেই মাশা কাম!”
“হোয়ান ইয়ং হাম নি দা।”
(আপনাদের স্বাগতম।)
সকলেই মৃদু হাসল। জিয়ান ইশারায় মেহবুবকে কিছু বোঝাল, মেহবুবও তা বুঝে নিল। ঝুমঝুম স্বভাবসিদ্ধ বলল,
“আপনাদের জন্য কফি পাঠিয়েছে,ফু আম্মু। উনি স্ন্যাকস আনতে গিয়েছেন!”
মেহবুব বড্ড আহ্লাদি কন্ঠে বলল,
“তুমি বসো না প্লিজ।”
ঝুমঝুম আড়চোখে দেখে শয্যকে! কেমন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই বুঝি অপমান করে বের করে দিলো! লোকটা যাচ্ছে তাই।
জিয়ান হঠাৎ বলল,
“কাল সুরাইয়ার ছবিটা দেখেছিস? আমার তো অন্য কিছুই মনে হচ্ছে। তুমি কী বলো, মাশা?”
এই প্রশ্নে মাশার ভেতরে চাপা উত্তেজনা জেগে উঠল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে উত্তর দিল

“মোটেও ভালো লাগেনি।”
মেহবুব কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
মাশার চোখে হালকা তাচ্ছিল্যের ছায়া পড়ল। সে দৃঢ় স্বরে বলল,
“ওই বস্তির মেয়ে সুরাইয়ার সঙ্গে তাকে একদমই মানায় না।”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২ (২)

এই মন্তব্য উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘরজুড়ে নেমে এলো বিস্ময়, অবিশ্বাস ও হতবাক নীরবতা। জিয়ান, মেহবুব ও হিউন জে একসাথে চমকে উঠে বলল,
“হোয়্যাট? বস্তির মাইয়া সুরাইয়া?”

মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২৪