মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২ (২)
ফারহানা নিঝুম
সকালবেলার নির্মল নীরবতাকে আচমকাই ভেদ করে উঠল কলিংবেলের কর্কশ ধ্বনি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সদর দরজার কপাট খুলে দিল মিস ইয়েরিন।
ড্রেসিং টেবিলের সম্মুখে রাজকীয় ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান শয্য যেন কোনো অভিজাত সাম্রাজ্যের যুবরাজ। ধীর, পরিমিত গতিতে সাদা ফর্মাল শার্টের প্রতিটি বোতাম লাগাচ্ছিল সে এমন নিখুঁত মনোযোগে, যেন সামান্য অসামঞ্জস্যও তার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে বেমানান। আয়নার স্বচ্ছ প্রতিফলনে পুরুষটিকে আজ অস্বাভাবিক রকম সুদর্শন লাগছিল।
নতুন রূপের জন্য তার দীর্ঘ কেশরাশি হালকা বাদামি আভায় রঞ্জিত করা হয়েছে। মৃদু আলোয় সেই বাদামি চুলগুলো এমন ঝলমল করছিল, যেন শরতের বিকেলে রোদ মেখে থাকা শুকনো গমের শীষ। ঘাড়ের কাছে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো নরম চুলগুলো তার গম্ভীর মুখাবয়বে এক রহস্যময় সৌন্দর্যের আবরণ এঁকে দিয়েছে। এই মুহূর্তে তাকে অবিকল জেসমিন বাদশাহর মতো দেখাচ্ছে অভিজাত, শীতল, অথচ দহন জাগানো ব্যক্তিত্ব।
টেবিলের উপর রাখা দামি ব্র্যান্ডেড ঘড়িটি হাতে তুলে নিতেই ধাতব আবরণে আলো প্রতিফলিত হয়ে এক তীক্ষ্ণ দীপ্তি ছড়িয়ে দিল। কব্জিতে ঘড়িটি পরার সময় আরেকবার নিজেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করল শয্য; যেন নিশ্চিত হতে চাইলো তার এই পরিশীলিত ফর্মাল অবয়বে বিন্দুমাত্র ত্রুটি অবশিষ্ট নেই।
আঁটসাঁট সাদা শার্টের নিচে তার সুঠাম বাহুগুলো এতটাই বলিষ্ঠ ও দৃঢ় প্রতীয়মান হচ্ছিল যে, মনে হচ্ছিল সামান্য টান পড়লেই কাপড় বিদীর্ণ হয়ে যাবে। ইস্পাতকঠিন চোয়াল, গাঢ় দৃষ্টি আর সংযত অভিব্যক্তির অন্তরালে এমন এক গাম্ভীর্য লুকিয়ে ছিল, যা সহজেই মানুষকে ভীত ও আকৃষ্ট দু’টোই করতে সক্ষম।
বিছানার প্রান্তে বসে মোজা পরতে পরতেই জুতো হাতে নিয়েছিল সে, এমন সময় পুনরায় বেজে উঠল কলিংবেল। শয্য একবার ধীর দৃষ্টিতে মুখ তুলে তাকালো। সকালের এই অসময়ে কে এসেছে, তা অনুমান করতে তার বিশেষ বেগ পেতে হলো না।
জুতোগুলো পাশে সরিয়ে রেখে, পায়ে কেবল কালো মোজা পরিহিত অবস্থায় উঠে দাঁড়াল সে। নীরব পায়ে রুমের দরজা অতিক্রম করে এগিয়ে গেল সদর দরজার দিকে।
মিস ইয়েরিন দরজা থেকে সরার সঙ্গে সঙ্গেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে থাকা জুঁইকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠল।
“চলে আসুন।”
শয্য ভেতরের দিকে অগ্রসর হতেই জুঁই জুতো খুলে ঘরে প্রবেশ করল। ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এলো আরেকটি প্রাণবন্ত কণ্ঠস্বর,
“আমিও এসেছি, শয্য ভাইয়া!”
কণ্ঠস্বর শুনে শয্য নিচুস্বরে হাসল। ধীর নিঃশ্বাস ত্যাগ করে পেছন ফিরে তাকাতেই চোখে পড়ল ঝুমঝুমকে। লাল রঙের টপসের উপর হুডি জড়ানো ছিপছিপে শরীরটা যেন অদ্ভুত চঞ্চলতায় ভরপুর। তাড়াহুড়ো করে জুতো খুলে সে ভেতরে ঢুকল।
“গুড মর্নিং, শয্য ভাইয়া!”
হাসি চেপে কিছুটা দুষ্টুমি মিশ্রিত স্বরে বলল সে।
শয্য ভ্রু কুঁচকে শুষ্ক কণ্ঠে বলল,
“ডোন্ট কল মি ভাইয়া। আমি তোর ভাই না। শুধু শয্য বলবি।”
মুহূর্তেই ঝুমঝুমের মুখ ফুলে উঠল অভিমানে। বেয়াদব পুরুষ।এমন ভাব করছে যেন দুচোখে তাকে দেখতে পারেনা! অথচ কাল রাতে চুপিচুপি এতগুলো বই উপহার দিয়েছে!ঠোঁট উল্টে বলল,
“ভাইয়াকে ভাইয়া ডাকবো না তো কি দাদা ডাকবো? নাকি নানা ডাকবো? শয্য নানা!”
এই অবান্তর কথায় শয্যর ডান ভ্রুতে থাকা পিয়ার্সিং হালকা নড়ে উঠল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঝুমঝুম তৎক্ষণাৎ নিজের মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।
শয্য বিরক্ত দৃষ্টিতে তাদের এড়িয়ে তাকাল জুঁইয়ের দিকে।
“কি বলতে চান, অননি?”
“অননি” শব্দটি উচ্চারিত হতেই জুঁইয়ের কপাল ভাঁজ পড়ে গেল। কিছুটা অভিমানী স্বরে বলল,
“আচ্ছা, আপনি আমাকে সরাসরি গালাগালি করছেন কেন? আমি তো সেদিন সবার ভালোর জন্যই মিথ্যে বলেছিলাম! একসাথে একটু খাওয়া-দাওয়া করলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত?”
জুঁইয়ের কথায় ঝুমঝুম বিস্ফারিত চোখে কখনো শয্য, কখনো জুঁইয়ের দিকে তাকাতে লাগল। তার বিস্ময়ের অন্ত রইল না। শয্য কি সত্যিই জুঁইকে ‘ভাবি’ সম্বোধন করেছে?
“এই ভাবি, এসব কি বলছো?”
ঝুমঝুমের কথা শুনে জুঁই প্রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল,
“তুমি জানো না তোমার এই ভাইয়া আমাকে কিভাবে গালি দিচ্ছে!”
শয্য গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। মাঝে মাঝে সত্যিই তার মনে হয়, বাদশাহ পরিবারের মেয়েদের চিন্তাশক্তি বুঝি জন্মগতভাবেই কিছুটা বিশৃঙ্খল।
ঝুমঝুম এবার আরেকটু এগিয়ে এসে বলল,
“আরে ভাবি, উনি তোমাকে গালি দেননি!”
জুঁই ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই শয্য নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
“সার্চ ইন দ্য গুগল হোয়াট ইজ অননি।”
জুঁই তৎক্ষণাৎ ফোন বের করতেই ঝুমঝুম খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।
“আরে, অননি মানে তো ভাবি!”
জুঁই মুহূর্তেই হতবাক হয়ে গেল।
“সত্যি?”
ঝুমঝুম দুষ্টুমি ভরা হাসি নিয়ে বলল,
“আমিও অবাক হয়েছি! শয্য ভাইয়া তোমাকে ভাবি ডাকছে?”
শয্য আর কোনো উত্তর না দিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে গেল কিচেন কাউন্টারের দিকে।
জুঁই তড়িঘড়ি করে বলল,
“কি করবেন? আমি বানিয়ে দিচ্ছি!”
কফি মেকারে কফি প্রস্তুত করতে করতে শয্য নিরাসক্ত কণ্ঠে বলল,
“নো, থ্যাংকস।”
এদিকে ঝুমঝুম ঘরের চারপাশে কৌতূহলী চোখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তার দৃষ্টি বারবার আটকে যাচ্ছিল দেয়ালে টাঙানো মোনালিসার পেইন্টিংয়ের পাশে থাকা রহস্যময় দাগওয়ালা আর্টটায়।
ঠিক তখনই কর্ণকুহরে নরম অথচ দৃঢ় স্বরে ভেসে এলো ,
“মাশা, রেডি হয়ে আয়। ফাস্ট।”
চমকে উঠল ঝুমঝুম। কয়েক সেকেন্ড সে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। শয্য কি সত্যিই তাকে “মাশা” বলে ডাকল?
জুঁই সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
“কোথায় নিয়ে যাবেন ওকে?”
শয্য ধীরে ধীরে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,
“মেহুর কাছে।”
“মেহু” নামটা শুনতেই জুঁইয়ের মুখে অস্বস্তির ছায়া নেমে এলো। ঝুমঝুমের কাছ থেকে সে শুনেছে, মেহরিমা আব্রাহাম আসলে আব্রাহাম পরিবারেরই আপন মেয়ে। কিন্তু ঝুমঝুমের ভাই রাকিবকে বিয়ে করায় তাকে পরিবার থেকে ত্যাজ্য করা হয়েছে।
হঠাৎ করেই জুঁই উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে উঠল,
“আমিও যাবো!”
ঝুমঝুমও তড়িঘড়ি পায়ে এগিয়ে এসে উচ্ছ্বাসে বলল,
“আমিও! মেহু আপুর কাছে যাব!”
পরক্ষণেই উচ্ছ্বাস টুকু উবে গেল! তাকে তো ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে! চিন্তিত ঝুমঝুমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জুঁই বলল,
“কি হয়েছে তোমার?”
ঝুমঝুম ভয়ার্ত চোখে তাকালো শয্যের দিকে। মিনমিনে গলায় বলল,
“কিন্তু আমারতো ইউনিভার্সিটিতে যেতে হবে!”
শয্য কঠিন চোখে তাকায় কন্যার সরল মুখপানে, অতঃপর ক্ষিপ্ত হয়ে বলে,
“আজ যেতে হবে না। আমি বলেছি যখন,তখন তুই আমার সাথেই যাবি। গট ইট?”
ঝুমঝুম আঁতকে উঠে, শয্য কাপ রেখে হনহন পদেক্ষপে দোতলায় যেতে যেতে বলল,
“বাইরে গিয়ে ওয়েট কর, আমি আসছি।”
ঝুমঝুম তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বেরুতে নিল,তার আগে আগেই জুঁই বেরিয়ে এলো। ঝুমঝুম কি ভেবে থমকে গিয়ে পিছন ফিরে তাকালো। শয্য তখনো তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। চোখাচোখি হয় দুজনের, ঝুমঝুম চওড়া হেসে বলে ওঠে,
“থ্যাংক ইয়্যু!”
শয্য কিছু বলল না। ঝুমঝুম যেতে যেতে বলল,
“এখন থেকে প্রতিদিন রাগিয়ে দিয়ে বই হাতিয়ে নেব। দারুণ আইডিয়া!”
ঝুমঝুম পালাতেই ঠোঁট কামড়ে হাসল,আপন মনে বিড়বিড় করে বলল,
“পরের বার রাগলে বই নয় চুমু দিয়ে রাগ ভাঙাব!”
ঝুমঝুম এবং জুঁইকে কার্যত জোরপূর্বক মেহরিমার নিকট রেখে এসেই স্থান ত্যাগ করেছিল শয্য। পরিকল্পনাটা পূর্বনির্ধারিতই ছিল আজ অন্তত কোনোভাবেই যেন ঝুমঝুম আর্ট ইউনিভার্সিটিতে পা রাখতে না পারে। সেই উদ্দেশ্য সফল করেই সে সরাসরি উপস্থিত হয়েছে কায়নাত কায়রার প্রাসাদের ন্যায় বাড়িতে।
মিস্টার কায়দার খান স্বয়ং তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। দুপুরের ভোজ তাদের সঙ্গেই গ্রহণ করতে হবেএমনটাই ছিল অনুরোধ। সাধারণত এধরনের সামাজিক আমন্ত্রণ বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতেই অভ্যস্ত শয্য; কিন্তু কায়দার খান ফোনালাপে স্পষ্ট করেছিলেন, জরুরি এক আলাপও নাকি রয়েছে তার সঙ্গে। তদুপরি, KK Group of Industries এর সঙ্গে শয্যের এক্সক্লুসিভ চুক্তি বিদ্যমান। ফলে সরাসরি অসম্মতি জ্ঞাপন করাটা কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সমীচীন হতো না।
বহুতল অট্টালিকার সম্মুখভাগে গাড়ি থামতেই অভ্যর্থনার জন্য এগিয়ে এলেন মিস্টার কায়দার খান। মুখজুড়ে সৌজন্যমণ্ডিত হাসি টেনে কোরিয়ান উচ্চারণ মিশ্রিত ইংরেজিতে বললেন,
“ওয়েলকাম, শয্য। ওয়েলকাম টু কায়নাত কায়রা হাউস!”
শয্য তার স্বভাবসিদ্ধ সংযত ভঙ্গিতেই মৃদু মাথা নত করল।
“থ্যাংক ইউ, মিস্টার খান।”
কায়দার খান তাকে ভেতরে নিয়ে আসতেই উপরের সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত পদক্ষেপে নিচে নেমে এলো সুরাইয়া। তার চোখেমুখে যেন উৎফুল্লতার উজ্জ্বল দীপ্তি। নিচে এসেই বিন্দুমাত্র সংকোচ না করে শয্যকে জড়িয়ে ধরল সে।
উচ্ছ্বাসে কম্পিত কণ্ঠে বলে উঠল,
“আই অ্যাম সো হ্যাপি, শয্য! তুমি এসেছ, সত্যিই খুব ভালো লাগছে!”
শয্য হাসল না। তার মুখাবয়ব বরাবরের মতোই অনমনীয় ও স্থির রইল। তবে শীতল সৌজন্যে বলল,
“থ্যাংকস, সুরাইয়া।”
মূলত সুরাইয়ার অনুরোধেই কায়দার খান শয্যকে এখানে আসতে বাধ্য করেছেন। সামনেই সুরাইয়ার জন্মদিন। আর সেই বিশেষ দিনে শয্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করতেই যেন তার এই পরোক্ষ আয়োজন। কিন্তু শয্য নামক মানুষটি সহজে কারও ইচ্ছের বশবর্তী হয় না। তার ব্যক্তিত্বে একরোখা গাম্ভীর্যের এমন এক কঠিন আবরণ রয়েছে, যা ভেদ করা প্রায় অসম্ভব। মিস্টার কায়দার খান পরিবেশকে আরও স্বাভাবিক করতে বললেন,
“তোমরা বসে গল্প করো। আমি সার্ভেন্টদের বলছি খাবারের আয়োজন করতে।”
শয্য তৎক্ষণাৎ মূল প্রসঙ্গে ফিরে এলো।
“আপনি বলেছিলেন কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছিল, মিস্টার খান?”
কায়দার খান মেয়ের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় ভঙ্গিতে মুচকি হাসলেন। কিন্তু তার উত্তর দেওয়ার আগেই সুরাইয়া তড়িঘড়ি বলে উঠল,
“ওসব পরে হবে। আগে একটা সেলফি তুলি, চলো!”
শয্য দীর্ঘ, তপ্ত এক নিঃশ্বাস ত্যাগ করল। জোরপূর্বক ঘনিষ্ঠতা কিংবা আরোপিত বন্ধুত্ব দুটোর প্রতিই তার সুস্পষ্ট বিরাগ রয়েছে। তাকে কখনো কেউ কোনো বিষয়ে বাধ্য করতে পারেনি; অন্তত এখন পর্যন্ত নয়।
তবুও পরিস্থিতির প্রয়োজনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। সুরাইয়া ফোন উঁচু করে একের পর এক সেলফি তুলতে লাগল। প্রতিবারই উৎফুল্ল কণ্ঠে বলছিল,
“শয্য, একটু হাসো না!”
কিন্তু শয্যের চেহারায় বিন্দুমাত্র পরিবর্তন এলো না। তার মুখাবয়ব আগের মতোই গম্ভীর, প্রস্তরমূর্তির ন্যায় অনড়।
কিছুক্ষণ পর সুরাইয়া কণ্ঠ নরম করে বলল,
“শয্য শোনো, নেক্সট উইকে আমার বার্থডে। সেদিন কিন্তু তোমাকে আসতেই হবে।”
কথাটা শুনে ছেলেটার কপালে সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটে উঠল। সামান্য বিলম্ব না করেই সংযত কণ্ঠে বলল,
“আমি এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, সুরাইয়া। বাট আই উইল ট্রাই।”
উত্তরটা শুনে মুহূর্তেই সুরাইয়ার মুখাবয়ব ম্লান হয়ে গেল। ঠোঁটের কোণের হাসিটুকুও নিভে এলো ধীরে ধীরে।
তবে সে সহজে হাল ছাড়ার মেয়ে নয়। অন্তর্গত আত্মবিশ্বাসে নিজেকেই আশ্বস্ত করল, প্রয়োজন হলে বাবাকেই ব্যবহার করবে সে। কায়দার খান যা চাইবেন, শয্য শেষ পর্যন্ত হয়তো তা প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না।
দরজাটা আস্তে টেনে বন্ধ করলেন তারা বাদশাহ। নিঃশব্দ ঘরে কেবল তাঁর নিঃশ্বাসের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। পুরোনো আলমারিটার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। আলমারির উপর ধুলো জমে ধূসর হয়ে গেছে; আঁচল দিয়ে আলতো করে মুছে দিলেন। এক চিলতে গন্ধ, একরাশ স্মৃতি যেন চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
ধীরে ধীরে খুললেন দরজাটা ভেতরে স্তব্ধ হয়ে আছে এক হারানো অতীত।
ধীরে ধীরে বের করে আনলেন ছোট্ট একটি শিশুর গেঞ্জি আর ক্ষুদ্র প্যান্ট। কাপড় দুটো বুকে চেপে ধরে কাঁপা হাতে নাকে ঠেকালেন। গভীর নিঃশ্বাসে সেই বহুদিন আগের ঘ্রাণটুকু অনুভব করার চেষ্টা করলেন। এখনও তাঁর মনে হচ্ছে এই কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে রাকিবের হাসি, তার ছোট্ট নিঃশ্বাস, দৌড়ে এসে মা বলে জড়িয়ে ধরার উষ্ণতা।
স্মৃতির প্রচণ্ড অভিঘাতে চোখের পাতা ভিজে উঠল। ঠোঁট কেঁপে উঠল অসহায় কম্পনে। অতঃপর আচমকাই কান্নায় ভেঙে পড়লেন তারা শেখ।
কাপড়গুলো ধীরে পাশে সরিয়ে রেখে এবার আলমারির গভীর থেকে বের করলেন একটি পুরোনো ফটোফ্রেম।
ফ্রেমবন্দী ছবিটিতে স্থির হয়ে আছে এক সুখী পরিবারের হাসিমাখা মুহূর্ত ।শাওন বাদশাহ, রিমঝিম বাদশাহ, তারা শেখ এবং মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের আদরের ছেলে রাকিব বাদশাহ।
একসময় যে দৃশ্য ছিল জীবন্ত, প্রাণময় ও পরিপূর্ণ আজ তা কেবল কাঠের ফ্রেমে আটকে থাকা নিষ্প্রাণ স্মৃতি।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর বুকের ভেতর হঠাৎই চাপা আর্তনাদের মতো কিছু একটা মোচড় দিয়ে উঠল। যন্ত্রণার ভারে গলা রুদ্ধ হয়ে এলো।
অবশেষে ফেটে পড়ল তাঁর কণ্ঠ,
“আমার সাজানো সংসারটা কে ভেঙে দিল? আমার স্বামী আমার সন্তান,, আহ্,,,আমার জীবনটা এমন হলো কেন?”
চারদেয়ালের বদ্ধ নীরবতার ভেতর তাঁর আর্তচিৎকার যেন ছিন্নভিন্ন করে দিল সমস্ত স্থিরতা। কান্নার প্রতিধ্বনি ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগল। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজাটা কিঞ্চিৎ শব্দ তুলে খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করল রিমঝিম।
প্রথম দেখাতেই দৃশ্যটা যেন তাকে মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিল। খোলা আলমারি, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ধুলো ধূসর কাপড়, পুরোনো স্মৃতির অবশিষ্টাংশ, আর সেইসবের মাঝখানে ভেঙে পড়া তারা শেখ চোখে অশ্রুর লবণাক্ত কুয়াশা।
রিমঝিম কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। তারপর অত্যন্ত চাপা স্বরে বলল,
“তুমি আবার এগুলো কেন বের করছো, মা?”
তারা বাদশাহ কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি স্থির বসে রইলেন। শুধু চোখ বেয়ে নেমে আসতে লাগল নীরব যন্ত্রণার উষ্ণ জলধারা।
রিমঝিম দ্রুত এগিয়ে এলো। তাড়াহুড়ো করে শিশুর প্যান্ট আর গেঞ্জিটা হাতে তুলে নিল। ফটোফ্রেমটাও সাবধানে সরিয়ে রাখতে রাখতে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
‘ঝুমঝুম দেখলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে, মা! এসব এখন রাখো আলমারির ভেতরেই থাকুক।”
তার কণ্ঠে রাগ ছিল না, ছিল আতঙ্ক। এমন এক মেয়ের আতঙ্ক, যে নিজের মায়ের ভেঙে পড়া মানসিক অবস্থাকে সামাল দিতে শিখেনি।
হঠাৎই তারা বাদশাহ মেয়ের বাহু শক্ত করে চেপে ধরলেন। তাঁর চোখের পাতা কাঁপছে, বুক দ্রুত ওঠানামা করছে উত্তেজনায়। বহুদিনের জমাটবাঁধা যন্ত্রণা যেন এক মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়ে বেরিয়ে এলো।
“কেন জানবে না? ওর জানা উচিত! কেন আমি একা এই কষ্ট বয়ে বেড়াব?”
রিমঝিম নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মায়ের দিকে।
কিন্তু তারা বাদশাহ থামলেন না। তাঁর কণ্ঠ বিদীর্ণ হয়ে উঠল,
“ওর জানা উচিত আমার এই ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবনের পেছনে মাশা দায়ী!”
মুহূর্তেই ঘরের পরিবেশ ভারী, থমথমে ও আতঙ্কময় হয়ে উঠল। রিমঝিম যেন পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল। অবিশ্বাসে বড় হয়ে উঠল তার চোখ।
“মা প্লিজ, থামো!”
ঠিক তখনই পেছন থেকে চাপা চিৎকার ভেসে এলো।
চোখভর্তি আতঙ্ক নিয়ে সে বলে উঠল,
“ঝুমঝুম নির্দোষ, মা! ও একটা নিষ্পাপ মেয়ে! ও তো কিছুই জানে না!”
মেরিগোল্ড সেনোরিটা পর্ব ২২
তারা বাদশাহর চোখে তখন ক্রোধ, অপমান, অভিমান আর দহনময় শোক একাকার হয়ে জ্বলছে। কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর আচমকাই সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলা মানুষের মতো নীরব কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
আর কোনো উত্তর দিলেন না। কোনো উত্তর না দিয়ে, সবকিছু ফেলে, ঝড়ের মতো রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনি।
